#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১১.
তোহার খুব হাঁসফাঁস লাগছে। স্নেহা তার সামনেই দাঁড়ালো। ট্রে-তে করে আনা দুই গ্লাস বরফশীতল জুস সেন্টার টেবিলের উপর রাখল। তারপর শাড়ির আঁচল ঠিক করে একদম তোহার বরাবর বসল। চুলের খোপা খুলে দিল। বেরিয়ে এলো একরাশ ভারী রেশমি চুল। শ্যাম্পুর তীব্র গন্ধে মো মো করতে লাগল ঘরটা। তোহার শরীর রাগে জ্বলছে। স্নেহার অস্বাভাবিক সৌন্দর্য্য তার অন্তর্দহন শতগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। কেন মেয়েটাকে এতো সুন্দর হতে হলো? একটা নারীর সৌন্দর্য্য ঠিক তার বিপরীত নারীটির জন্য নারকীয় যন্ত্রণার সমান! এই সত্য আগে কখনও বোঝেনি তোহা।
স্নেহা প্রীত হেসে বলল,” কেমন আছো?”
তোহা তীব্র অস্বস্তি নিয়ে জবাব দিল,” জ্বী, ভালো আছি।”
” তোমার বাবার মৃত্যুর খবরটা শুনলাম। আমার খুবই খারাপ লেগেছে। তিনি জান্নাতবাসী হোক।”
” আমিন।”
” তুমি যেন এখানে কতদিন ধরে আছো?”
তোহা উত্তর দেওয়ার আগেই স্নেহা নিজে থেকে বলল,” এক সপ্তাহ রাইট?”
তোহা কিছু না বলে কেবল মাথা নাড়ল এবার। স্নেহা ফিচেল হেসে বলল,” প্রেমে পড়ার জন্য এটুকু সময় যথেষ্ট তাই না?”
চমকে উঠল তোহা। ছলাৎ করে উঠল তার হৃদযন্ত্রের স্পন্দন। অবাক বিস্ময় নিয়ে সে চাইল স্নেহার মুখের দিকে। স্নেহার সুন্দর একজোড়া চোখ চকচক করছে। ঠোঁটে স্পষ্ট বিদ্রুপের হাসি।
” অবাক হওয়ার কিছু নেই। তুমি যেই মুহূর্ত থেকে আমীরের প্রেমে পড়েছো সেই মুহূর্ত থেকেই আমি সব জানি।”
তোহা নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা চালালো। এতো দ্রুত সে নর্ভাস হচ্ছে কেন? গম্ভীর হয়ে বলল,” কি যা-তা বলছেন? ছিঃ!”
” তুমি অস্বীকার করতে পারো না। আমি প্রমাণ করে দিতে পারি যে তুমি আমার স্বামীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছো।”
কান গরম হয়ে উঠল তোহার। মেয়েটা তাকে ভদ্র ভাষায় অপমান করতে ডেকে এনেছে নাকি? এতো দ্রুত মেজাজ হারালে চলবে না৷ তোহা হতভম্ব হয়ে বলল,” আপনার কি আমাকে এতোটাই সস্তা মনে হয়?”
স্নেহা উঠে গিয়ে ড্রয়ার থেকে চিঠিটা বের করল। তোহা আরও বিস্মিত হলো। স্নেহা কিভাবে বুঝল যে ওই ড্রয়ারে একটা চিঠি আছে? এই মেয়ে কি মাইন্ড রিডিং জানে? সাংঘাতিক ব্যাপার-স্যাপার! তোহা চুপচাপ বসে রইল। তাকে স্বাভাবিক থাকতে হবে। সে তো কোনো অন্যায় করেনি। তাহলে কেন ভয় পাচ্ছে? স্নেহা চিঠিটা খুলে সুন্দর সুরে পড়তে লাগল। শেষের লাইনগুলো দ্বিতীয়বার পড়ল। তারপর একটু ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” আচ্ছা, এই লাইনগুলো তুমি কেটে দিলে কেন? এর মানে কি তোমার আমাকে ভালো মেয়ে মনে হয়নি? আর আমরা সারাজীবন একসাথে ভালো থাকি, এটাও তুমি চাও না?”
তোহা শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,” এই ব্যাপারে আমি আপনাকে কৈফিয়ৎ দিবো না।”
স্নেহা ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়তে লাগল। যেন তোহার কথা বোঝার চেষ্টা করছে। তারপর আবার চিঠির দিকে চেয়ে বলল,” আচ্ছা, এই বাড়িতে তুমি আর এক মুহূর্ত টিকতে পারছো না। এখানে কাল পর্যন্ত থাকা দুঃসাধ্য ব্যাপার… এসব কেন লিখেছো চিঠিতে? এখানে তুমি কেন থাকতে পারছো না আমি কি জানতে পারি?”
তোহা একটা বিরক্তিভরা নিঃশ্বাস ছাড়ল। ধৈর্য্য নিয়ে বলল,” যে বাড়িতে আমি আমার বাবার মৃ-ত্যুর কথা শুনেছি, বাবার লাশ জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি, সেই লাশ দাফন হতে দেখেছি সেই বাড়িতে থাকতে আমার কষ্ট হবে এটাই তো স্বাভাবিক!”
” তোমার বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ হয়ে গেছে মায়া। এতোদিন তো তোমার এখানে থাকতে অসুবিধা হয়নি! মাঝরাতে আমীরের ঘরে এসে শুতেও অসুবিধা হয়নি। তাহলে আমি আসার পরেই কেন…”
স্নেহা আর কিছু বলার আগেই তোহা অগ্নিকণ্ঠে বলল,” মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ!”
একটা গ্লাস তুলে সজোরে স্নেহার মুখের ছুঁড়ে মারল সে৷ রঙিন পানীয়ে মাখামাখি হলো স্নেহার শরীর। তোহা ক্রোধসিক্ত, থমথমে কণ্ঠে বলল,” আমার সাথে এভাবে কথা বলার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি।”
দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিল কয়েকজন। সরব উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল,” ম্যাডাম, অ্যানি প্রবলেম?”
স্নেহা ঠান্ডা মাথায় বলল,” নো প্রবলেম। আপনি যেতে পারেন।”
সরব বের হয়ে গেল। তোহা শান্ত হয়ে এলো দ্রুত। সে বুঝতে পারছে এই কাজটা ঠিক হয়নি। রাগের বশে অনেকটা সিন ক্রিয়েট করে ফেলেছে সে। কিন্তু স্নেহাও তো কিছু কম বলেনি। আচ্ছা প্রেমে পড়ার আগে কি সে জানতো যে আমীর বিবাহিত? জানলে তো কখনোই প্রেমে পড়তো না। আর এতোকিছু ঘটতোও না। পুরো ব্যাপারটাই কেমন বিশ্রী আর জঘন্য হয়ে যাচ্ছে। তোহা অনুতপ্ত স্বরে বলল,” আই এম স্যরি।”
স্নেহা বিনয়ী কণ্ঠে বলল,” কোনো ব্যাপার না। আমি শাড়িটা বদলে আসছি।”
তোহা আশ্চর্য হলো একটু। সে ভেবেছিল স্নেহা আরও বড় সিন ক্রিয়েট করবে এই ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু সে এতো দ্রুত শান্ত হয়ে গেল কিভাবে? তোহার মস্তিষ্কের শিরা রীতিমতো দপদপ করে লাফাচ্ছে। সে কেন নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না?
স্নেহা পোশাক বদলে এলো। কিন্তু এবার সে বসল না। তোহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,” চলো আমার সাথে।”
______________
ড্রাইভ করতে করতে অনেকটা পথ চলে এসেছে আমীর। এই রাস্তা সে চেনেও না। এমন অগোছালোভাবে গাড়ি চালাতে থাকলে যেকোনো সময় এক্সিডেন্ট হতে পারে। আমীর একটু থামল। স্টেয়ারিং এ হাত রেখে বার কয়েক শ্বাস নিল জোরে জোরে। ইদানীং তার এই সমস্যাটা হয়েছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় হঠাৎ করেই। দূরে কোথাও একটা ঘটনা ঘটেছে। কেউ এক্সিডেন্ট করল নাকি? মানুষের উপচে পড়া ভীর। একটা ছোট্ট মেয়ের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। অনেকগুলো মানুষ একসাথে কথা বলার কারণে কিছু বোঝাও যাচ্ছে না ঠিক-ঠাক। একজন লোক আমীরের গাড়িকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। তাকেই প্রশ্ন করল আমীর,
” আচ্ছা ভাই, এদিকে কি হয়েছে?”
পথচারী বলল,” একটা ভিক্ষুক খুব অসুস্থ। মনে হচ্ছে বাঁচবে না।”
” ভিক্ষুক?”
” জ্বী। অনেকদিন অসুস্থ ছিল। আমি প্রায়ই এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের টাকা দিতাম।”
” কাঁদছে কে এভাবে?”
” উনার মেয়েটা। মা-মেয়ে একসাথে ভিক্ষা করতো। এখন মা মারা গেলে মেয়ের কি হবে?”
” কতটুকু মেয়ে?”
” খুবই ছোট। এই সাত-আটবছর হবে!”
আমীর গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পথচারী লোকটিও তার পেছনে আসছে। মেয়েটি মুখে আঁচল চেপে কাঁদছে। খুব মিনতি করে বলছে,” আমার আম্মারে কেউ হাসপাতালে নিয়া যাইবেন? হাসপাতালে গেলে আম্মা বাঁচবো।”
যে অসুস্থ মহিলা ছালা-বস্তার উপর শুয়ে আছে, তার মুখ থেকে লালা পড়ছে৷ দেখে মনে হচ্ছে সে খুব বেসামাল। এতোগুলো মানুষ তাকে ঘিরে আছে, এটুকু বোধও হয়তো তার মধ্যে নেই। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে শূন্যে। আমীর একটু উচ্চস্বরে বলল,” আপনারা সবাই হেল্প করুন আমাকে। উনাকে গাড়িতে তুলতে হবে।”
প্রথমে সবাই একটু অবাক হয়ে তাকাল। যেন আমীর খুবই অদ্ভুত কিছু বলেছে। একজন ভিক্ষুককে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কখনোই কোনো কাজের কথা হতে পারে না৷ যে পথচারীর সঙ্গে আমীরের কথা হয়েছে, সে-ই সর্বপ্রথম এগিয়ে এলো। তারপর একে একে আরও সবাই সাহায্য করল। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে আমীরের দিকে গাঢ় কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকায়। আমীর তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,” ডন্ট ওরি, তোমার আম্মা ঠিক হয়ে যাবেন।”
মেয়েটা কান্না মুছে সাথে সাথেই মুখে হাসি আনল। এমন ভরসার একটা হাতই যেন সে নিজের মাথায় খুঁজছিল এতোক্ষণ।
___________
তোহা কোনো প্রশ্ন না করেই স্নেহার পেছন পেছন এলো। সবাই তাদের ঘাড় বাড়িয়ে দেখছে৷ তোহার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগের ওই সিন ক্রিয়েটটা না ঘটলে এমন হতো না৷ সবাই কেমন ভয়ে-ভয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে স্নেহাকে এরা একটু ভয় পায়। আচমকা একটি দেয়ালের সামনে এসে থামল স্নেহা। সাদা রঙের পেইন্টিং ঝুলানো দেয়ালে। তারা সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এসেছে। এদিকটায় সচরাচর কেউ আসে না৷ তোহা যে সাতদিন এই বাড়িতে ছিল, কখনও মনে হয়নি এখানে আসার কথা। স্নেহা পেইন্টিং সরাতেই ভেসে উঠল একটি দরজা। ধুলো-ময়লায় জমাট বাঁধা এই দরজাটি দেখে তোহা ভয় পেয়ে গেল। স্নেহা চাবি বের করে বড় তালাটি খুলল। তারপর বাতি জ্বেলে দিল৷ ঘরের দরজাটি যত অপরিষ্কার, ঘরটি ঠিক ততই পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি। তোহা বিস্ময় নিয়ে দেখতে লাগল প্রতিটি দেয়ালজুড়ে আমীর-স্নেহার চমৎকার সব ছবি আর বিভিন্ন স্মৃতিময় জিনিসপত্র রাখা। ছবিগুলোর প্রত্যেকটিতেই আমীরের চেহারায় হাসি। কি ঘনিষ্ট তারা। একে-অন্যের সাথে যেন তারা চিরসুখী মানুষ। অথচ এইযে সাতদিন ধরে তোহা আমীরকে দেখছে, কখনও এভাবে হাসতে দেখেনি তো! কখনও তো মনে হয়নি আমীর এতো সুখী! বরং মনে হয়েছে কোথায় যেন একটা বিষাদের ছায়া সারাক্ষণ ঢেউ খেলে যায় তার চোখে-মুখে। খুব অন্যমনস্ক হয়ে তোহা ছবিগুলো দেখতে লাগল।
স্নেহা গৌরবান্বিত কণ্ঠে বলল,” এই ঘরটা কোনো ঘর নয়। আমাদের ছোট্ট জগৎ। যেখানে শুধু আমি আছি, আর আছে আমীর! তোমাকে এই ঘরে কেন নিয়ে এলাম জানো? ”
তোহা দুইপাশে মাথা নাড়ল। সে জানবে কি করে? স্নেহা ঠোঁটের হাসি চওড়া করে বলল,” আমাদের এই সুন্দর জগৎ এর সাথে পরিচয় করানোর জন্য। এখানে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি আসার সুযোগ নেই। তুমি হয়তো ভাবতে পারো আমি তোমাকে নিয়ে ইনসিকিউরড ফীল করছি….কিন্তু আসলে সেরকম না। আমি জানি, আমীর সবসময় আমার ছিল আর আমারই থাকবে। সে একান্তই আমার নিজের।”
তোহার কষ্ট হলেও সে নিজের অনুভূতি ধামাচাপা দিতে জানে। হাস্যমুখে বলল,” শুভকামনা আপনাদের জন্য।”
স্নেহা একটু কাছে এসে চাপা স্বরে বলল,” তুমি সুন্দরী হলে আমার ভয়ের কারণ থাকতে পারতো… কিন্তু তুমি এতোটাও সুন্দরী নও যে আমীরকে আটকাতে পারবে।”
অপমানে শিরশির করে উঠল তোহার শরীরটা। মুখের পেশি শক্ত করে বলে উঠল,” অন্যের স্বামীকে আটকানোর মানসিকতা আমার নেই।”
” কিন্তু অন্যের স্বামীর প্রেমে পড়ার মানসিকতা তোমার আছে!”
তোহা নিজেকে ধাতস্থ করতে পারছে না৷ এক চড় মেরে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির দাঁত খুলে ফেলা উচিৎ। স্নেহা আমীরের ভালোবাসা না হলে তোহা তাই করতো হয়তো।
স্নেহার ফোন বেজে উঠল হঠাৎ। সে ফিসফিসিয়ে বলল,” একটু অপেক্ষা করো।”
তোহা চুপচাপ বসে রইল ঘরটিতে। আমীর আর স্নেহার ছবিগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও স্নেহা এলো না৷ তোহা দরজার কাছে গিয়ে দেখল বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক চিৎকার-চেঁচামেচির পরেও কেউ দরজা খুলতে এলো না৷ তোহা খুব দেরিতে বুঝতে পারল যে তাকে বন্দী করে ফেলা হয়েছে।
চলবে
®Sidratul মুন্তায
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১২.
হাসপাতালের ক্যান্টিনে বসে আছে তারা। আমীর শান্ত হয়ে মেয়েটির খাওয়া দেখছে। মনে হচ্ছে সে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত ছিল। শরীফাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ তোহার কথা মনে পড়ল। আচ্ছা, সে কি রাতে খেয়েছে? তার তো জ্বর ছিল। জ্বরের কারণে জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছিল। এখন তার কি অবস্থা জানা দরকার। আমীর পকেট থেকে সেলফোনটা বের করল। তখনি দেখল সরবের মেসেজ। এর আগে কয়েকবার কলও দিয়েছিল সে। কিন্তু আমীরের ফোন সাইলেন্ট ছিল বলে টের পায়নি। সরব খুব জরুরী না হলে সাধারণত মেসেজ দেয় না। তোহার কিছু হয়নি তো? আমীর উৎকণ্ঠিত হলো। মেসেজবক্সটা ওপেন করতেই দেখল স্নেহা আর তোহার দেখা হওয়া অতঃপর কথা কাটাকাটি… সবকিছু গুছিয়ে একটা বড়সড় মেসেজ লিখে পাঠিয়েছে সরব। আমীরের মাথা গরম হয়ে উঠল। সে যা ধারণা করেছিল তাই হয়েছে। ক্যান্টিন থেকে বেরিয়েই অবিলম্বে স্নেহাকে ফোন করল আমীর।
” হ্যালো ডার্লিং, বলো। কোথায় আছো তুমি?” স্নেহার আমুদে কণ্ঠ শুনে আমীর খুবই বিরক্ত হলো। রুক্ষ স্বরে বলল,” আছি একটা জায়গায়। তুমি মায়াকে ফোনটা দাও।”
স্নেহা চমকে উঠল,” মায়া?” না বোঝার ভাণ করল। আমীর ঠান্ডা স্বরে বলল,” আমি জানি ও তোমার সাথেই আছে। আছে না?”
স্নেহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে যে তোহার সাথে দেখা করেছে এই ব্যাপারটা কেউ যাতে আমীরকে না জানায় সেজন্য কড়া নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিল সবাইকে। কিন্তু তবুও আমীর জেনে গেছে। অর্থাৎ কেউ না কেউ তাকে জানিয়েছে। কিন্তু কে জানাল? কার এতো সাহস?স্নেহা কোমল গলায় বলল,” ও তো এখানে নেই, হানি।”
” তাহলে কোথায়? তুমি ওকে কি বলেছো?”
” বলেছি অনেক কিছুই। আমাদের মাঝে অনেক গল্প হয়েছে। তারপর হঠাৎ ওর কি যেন হলো… ও বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।”
আমীর উচ্চগলায় জানতে চাইল,” চলে গেল মানে? কোথায় গেল?”
” আমি কিভাবে জানব কোথায় গেল? আমাকে তো ও বলে যায়নি। আমি হলাম ওর শত্রুপক্ষ।”
আমীর কপালে হাত ঠেঁকাল। তোহা এই রাতের বেলা কোথায় যেতে পারে? স্নেহা আবার বলল,” তুমি টেনশন কোরো না। ও যেখানেই যাক, তোমাকে অবশ্যই জানাবে। তোমার জন্য চিঠিও রেখে গেছে একটা। পড়ে শোনাবো নাকি?”
” শোনাও।”
স্নেহা সম্পূর্ণ চিঠি পড়ে শোনাল। শেষের লাইনগুলো দুইবার করে পড়ল আর বলল,” এগুলো কিন্তু কে-টে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই লেখাগুলো মিথ্যা। সে চায় না আমরা দু’জন সারাজীবন একসঙ্গে ভালো থাকি। কিন্তু ওর চাওয়া-না চাওয়ায় কি যায় আসে বলো? আমরা তো সবসময় একসাথেই থাকব, তাই না?”
আমীর ফোন রেখে দিল। শরীফা কখন যেন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার দুই চোখ ভর্তি জল। আমীর অবাক হয়ে বলল,” কি ব্যাপার?”
শরীফা মাথা নিচু করে বলল,” আম্মা মইরা গেছে।”
এই কথা বলেই দুইহাতে চোখের জল মুছল সে। পুনরায় জল চলে এলো তার চোখে। সে আবার মুছল। মুছতেই থাকল। আমীর কাছে এসে শরীফার কাঁধে হাত রাখল। ভ্রু কুচকে বলল,” কে বলেছে মরে গেছে?”
” আমি দেখছি। ওরা আম্মারে সাদা কাপড় দিয়া ঢাইকা দিছে। আমারে কইছে আপনারে খবর দিতে।”
আমীরের হতাশ মন আরও হতাশ হয়ে উঠল। নিজের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণায় বুক ভার হয়ে এলো। শুধু মানুষের প্রাণ নেওয়ার ক্ষমতাই কি তার আছে? কাউকে বাঁচানোর ক্ষমতা কেন নেই? ইচ্ছে করলেই কারো প্রাণ নেওয়া যায়। তাহলে ইচ্ছে করলেই কাউকে প্রাণ দেওয়া যায় না কেন?
নিগূঢ় অপরাধবোধ আমীরকে ভেতর থেকে জেঁকে ধরেছে কঠিনভাবে। সে জাবিদ সাহেবকে বাঁচাতে পারেনি; শরীফার মাকেও বাঁচাতে পারল না। কেন মনে হচ্ছে শরীফার মায়ের মৃত্যুর জন্য সে নিজেই দায়ী?
শরীফার মায়ের কবর, তারপর জানাযা শেষ করতে অনেক সময় লেগে গেল। আমীর শরীফাকে একটা নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করে গাড়ি নিয়ে মাঝ সড়কে নেমে পড়ল। তার দিশেহারার মতো লাগছে। তোহাকে খুঁজে বের করতেই হবে। প্রথমেই সে গেল তোহাদের বাড়িতে। কিন্তু সেখানে কেউ নেই, বড় একটা তালা ঝুলছে দরজায়।
ঘড়িতে রাত এগারোটা বাজছে৷ ঘরের সব জিনিসপত্র খুঁটিয়ে দেখছিল তোহা। হঠাৎ একটা ডায়েরী খুঁজে পেল। ডায়েরীটা স্নেহার ব্যাক্তিগত। এখানকার সমস্ত কথাও খুব ব্যক্তিগত। সেই ডায়েরীর কিছু অংশ পড়তে পড়তে কখন যেন তন্দ্রার মতো লেগে এলো। তন্দ্রার ঘোরে তোহা স্বপ্নও দেখল। জাবিদ সাহেব এসে তোহার পাশে বসেছেন। তোহার যে কি ভীষণ আনন্দ হলো বাবাকে দেখে! সে মৃদু হেসে বলল, ” বাবা, কেমন আছো তুমি?”
” ভালো আছিরে মা, তুই কেমন আছিস?”
জাবিদ সাহেব হাত বুলাচ্ছেন তোহার মাথায়। এতো আরাম হচ্ছে! তোহা আবেশী কণ্ঠে বলল,” তুমি কিন্তু ম-রার পর অনেক হ্যান্ডসাম হয়ে গেছো বাবা।”
উচ্চস্বরে হাসলেন জাবিদ সাহেব,” হওয়ারই কথা। এইখানে এসে তোর মায়ের সাথেও দেখা হয়ে গেছে। দু’জন মিলে সারাক্ষণ গল্প-গুজব করছি। খুব ভালো সময় কা-টছে আমাদের। শুধু মাঝে মাঝে তোকে নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা হয়৷ দু’জনই তোকে একলা রেখে চলে এলাম… তুই পৃথিবীতে কিভাবে আছিস তা তো আমরা জানি না।”
” আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি এখানে ভালোই আছি। আমীরসাহেব আমার খুব খেয়াল রাখেন।”
” ছেলেটা খুবই ভালো। তুই এক কাজ কর… ওকে বিয়ে করে ফেল।”
তোহা হালকা লজ্জা পেয়ে গেল এই কথায়।
” ধূর, কি যা-তা বলছো? উনি তো বিবাহিত।”
জাবিদ সাহেব চুপ করে গেলেন। মনে হলো আমীর যে বিবাহিত এই খবর শুনে তিনি দুঃখিত হয়েছেন। তোহা ডাকল,” বাবা, এই বাবা, কথা বলছো না কেন তুমি?”
জাবিদ সাহেব আর কোনো জবাব দিলেন না। তিনি কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। তোহা চেঁচিয়ে ডাকল,” বাবা, যেও না। আমার এখানে একা থাকতে খুব ভয় লাগছে বাবা! আমাকেও সাথে নিয়ে যাও।”
তোহার ঘুম ছুটে গেল। বুক ধড়ফড় করছে। চোখে পানি জমে গেছে। বাবার কথা মনে পড়ায় ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এভাবে বাবা তাকে একা ফেলে কেন চলে গেল? যদি বাবা থাকতো তাহলে সে অন্তত কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে পারতো৷ তার এখন এই পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ রইল না। সে কিভাবে বাঁচবে এই একাকিত্ব নিয়ে? দরজার কাছে একটা চিঠি পাওয়া গেল৷ হঠাৎ নজরে পড়তেই তোহা দ্রুত গিয়ে চিঠিটা তুলল। সেখানে লেখা…
” ভয়ের কিছু নেই। তোমার ক্ষতি করব না আমি। তবে কিছুদিন তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। যে আমার অপছন্দের কাজ করে তাকেই আমি শাস্তি দেই। এক্ষেত্রে আমি মায়ের পেটের বোনকেও মাফ করিনি। আর তুমি তো কোন ছাড়! শাস্তিটা তোমার প্রাপ্য। এখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই। আর চেঁচিয়ে গলা ফাটানোও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না৷ কারন এটা সাউন্ডপ্রুফ রুম। তুমি বরং বসে বসে আমাদের ছবিগুলো দেখো আর আমীরকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো। সেটাই তোমার জন্য মঙ্গলজনক।
– ইতি
আমীরের অর্ধাঙ্গিনী স্নেহা।”
তোহা চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইল। তারপর ছিঁড়ে কয়েক টুকরো করল। অসহ্য লাগছে তার সবকিছু। চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইছে। তোহা কিছুক্ষণ রাগে মাথার চুল ছিঁড়ল। তারপর হঠাৎই তার কিছু একটা মাথায় এলো। ছিঁড়ে ফেলা কাগজের টুকরোগুলো পুনরায় হাতে নিল সে। বিছানায় থাকা স্নেহার ডায়েরীটাও হাতে নিল। এই ডায়েরীটা পড়তে পড়তেই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল কিন্তু ডায়েরীর লেখাগুলো স্পষ্ট চোখে ভাসছে। এইতো, এই লেখার সাথে চিঠির লেখার কোনো মিল নেই। মনে হচ্ছে যেন দু’টো আলাদা মানুষ লিখেছে। তোহা খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল৷ তারপর সে স্নেহার ছবির দিকে তাকাল। এবার তার নজরে পড়ল আরও একটি টনক নড়ার মতো ব্যাপার। ছবিতে স্নেহার গলায় কোনো জন্মদাগ নেই। অথচ যখন তোহা রেগে স্নেহার গায়ের উপর জুস ফেলে দিয়েছিল তখন খেয়াল করেছিল স্নেহার গলায় একটা কালো জন্মদাগ! তাহলে ছবিতে এটা দেখা যাচ্ছে না কেন?
তোহা উঠে পায়চারী করতে লাগল। অনেক বড় একটা রহস্য কি উন্মোচন হয়ে গেছে তার সামনে? নাকি সে আজগুবি চিন্তা করছে? চিঠির টুকরোগুলো জড়ো করে আবারও পড়ল সে। এবার নজর আটকে গেল,” এক্ষেত্রে আমি মায়ের পেটের বোনকেও মাফ করিনি”- এই লাইনটিতে৷
স্নেহা এই কথা কেন লিখল? আচ্ছা তাহলে কি তোহা যা ভাবছে তাই? সে আসল স্নেহা নয়? ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে, সে-ই আসল স্নেহা। আমীরের আসল স্ত্রী। আর এই বাড়িতে যে আছে সে স্নেহার জমজ বোন। এমনটা হওয়া কি খুব অস্বাভাবিক? তোহার মাথায় সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। যদি তাই হয় তাহলে আমীরকে এখনি সব জানাতে হবে। সে কি জানে কত বিরাট ধোঁকা হচ্ছে তার সাথে! কিন্তু তাকে জানানোর জন্য হলেও তোহাকে এই ঘর থেকে বের হতে হবে। সে কিভাবে বের হবে?
চলবে
®Sidratul মুন্তায
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৩.
দিশেহারার মতো সারারাত গাড়ি নিয়ে খুঁজল আমীর। রাতের শহর চষে ফেলল। তোহা নেই, কোথাও নেই। ভোর সকালে ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা নিয়ে গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। একটা অদ্ভুত ধরণের স্বপ্ন এলো। এই ধরণের স্বপ্ন আজ-কাল রোজই দেখছে আমীর। একটা ছোট্ট মেয়ের ডাকে তার ঘুম ভাঙে।
মেয়েটি গাড়ির জানালায় ঠোকাঠুকি করছে। আমীর আড়মোড়া ভেঙে চশমাটি নিয়ে চোখে পরতেই দেখল মেয়েটি চলে যাচ্ছে। আমীর গাড়ির গ্লাস নামিয়ে ডাকল তাকে,” এই মেয়ে, দাঁড়াও।”
মেয়েটি ভয়াতুর দৃষ্টিতে তাকাল। আমীর ডাকল আবারও,” এদিকে এসো।”
ধীরে ধীরে কাছে এসে থতমত খাওয়া গলায় বলল মেয়েটি,” ফুল নিবেন, স্যার?”
তার গায়ে ময়লা একটি ফ্রক। হাতভর্তি তাজা ফুল।
আমীর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,” ফুল বিক্রি করার জন্য তুমি আমার ঘুম ভাঙাওনি। সত্যি কথা বলো। কি সমস্যা?”
মেয়েটি মাথা নিচু করে বলল,” আপামণি বলছে আপনারে ডাকতে।”
‘আপামণি’ মানে স্নেহা। এই কথা বুঝতে অসুবিধা হলো না আমীরের। সে মঙ্গলগ্রহে হারিয়ে গেলেও স্নেহা তাকে খুঁজে বের করবে। আমীর সেটা জানে। স্নেহার এই বাড়াবাড়িটা চাইলেই বন্ধ করা যায়। কিন্তু আমীর তা করবে না। সে স্নেহাকে প্রশ্রয়ে রাখতে চায়।
আমীর হাসল। মেয়েটি বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। প্রথম দেখায় যাকে খুব ভয়ংকর মনে হচ্ছিল, হাসার পর তাকে খুব চমৎকার মনে হচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটি হাসিমুখে বলল,” আপনার জন্য আপামণি ফুল পাঠাইছে।”
আমীর ফুলগুলো হাতে তুলে নিল।
” থ্যাঙ্কিউ। তোমার আপামণিকে ডাকো।”
স্নেহা আশেপাশেই ছিল হয়তো। তাদের কথাও শুনতে পাচ্ছিল। সে এগিয়ে এলো এবার। কোমরে হাত গুঁজে বলল,” আমার নাম বলতে নিষেধ করেছিলাম।”
মেয়েটির মুখ মলিন হয়ে উঠল। আমীর বলল,” ওর দোষ নেই। আমি জানতাম তুমি আসবে।”
” কি করে জানলে?”
” আমি যেখানেই যাই, তুমি ঠিক আমাকে খুঁজে বের করবে৷ এটা তো নতুন কিছু না।”
স্নেহা হাসিমুখে গাড়িতে উঠে বসল। মেয়েটির দিকে চেয়ে বলল,” তোকে ধন্যবাদ৷ এই নে তোর গিফট।”
কিছু টাকা মেয়েটির হাতে দিতেই সে খুশিমনে টাকাগুলো নিয়ে দৌড়ে গেল। আমীর ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,” সুন্দর!”
স্নেহা গালে হাত রেখে আমীরের দিকে তাকাল। চোখ দু’টো কেমন লাল হয়ে ফুলে আছে আমীরের। সারারাত না ঘুমানোর কুফল। সে মনমরা হয়ে বলল,” অনেক বেশি চিন্তা করছো মায়াকে নিয়ে?”
আমীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। স্নেহা তার কাঁধে হাত তুলে ভরসা যোগানো গলায় বলল,” চিন্তা কোরো না। আমরা ওকে খুঁজে বের করব। তার আগে চলো কোথাও ব্রেকফাস্ট করি। তুমি কালরাত থেকে না খেয়ে আছো।”
আমীর নিচের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল। স্নেহা হালকা গলায় বলল,” শরীফার সাথে দেখা করে এসেছি। খুব ভালো মেয়েটা। আমি ভাবছি ওকে স্কুলে ভর্তি করাবো। তুমি কি বলো?”
” তোমার ইচ্ছা।”
স্নেহা সামান্য ঝুঁকে এসে প্রশ্ন করল,” তুমি এসব মায়ার জন্য করছো তাই না? তোমার মনে হচ্ছে মায়ার বাবাকে খু-ন করে তুমি অন্যায় করেছো। সেই অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে তুমি শরীফার মাকে বাঁচাতে চেয়েছো। কিন্তু তাকেও বাঁচানো গেল না… তাই তোমার হতাশা আরও বেড়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ মায়া তোমাকে মাফ না করবে ততক্ষণ এই হতাশা কা-টবে না। আমি ঠিক বললাম তো?”
আমীর রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,” তুমি সবসময় ঠিক বলো। কিন্তু সে আমাকে কখনোই মাফ করবে না।”
স্নেহা মৃদু হেসে আমীরের কাঁধে মাথা রাখল,” নিশ্চয়ই করবে। আমি জানি… ”
স্নেহা কখনও ভুল বলে না। তাই আমীরের বিশ্বাস করতে মন চাইছে তার কথা। সত্যিই কি এতোবড় অপরাধের পরেও মায়া তাকে মাফ করবে?
স্নেহা আবেগী কণ্ঠে বলল,” তোমার মনে আছে? আমাদের বাড়ির বাগানেও এই বকুল ফুলের গাছ ছিল। একদিন তুমি একটা ফুলের মালা আমার বইতে রেখে দিলে। কিন্তু কোনোভাবেই স্বীকার করলে না যে ওটা তুমি রেখেছো।”
আমীর গাড়ির গ্লাসের দিকে চেয়ে অগোছালো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,” তারপর তুমি মঝরাতে সেই বকুল ফুলের মালা আর সবুজ শাড়ি পরে আমার ঘরে এসেছিলে। তোমার অনেক সাহস ছিল মায়া।”
” কি বললে? মায়া?”
আমীর থমকালো। অপ্রস্তুত দৃষ্টিতে তাকাতেই উচ্চশব্দে হেসে উঠল স্নেহা। স্তিমিত হয়ে এলো আমীরের কণ্ঠস্বর,” স্যরি, স্নেহা…”
স্নেহা আমুদে কণ্ঠে বলল,” তোমার মাথায় তো মায়ার ভূত একদম জেঁকে বসে আছে দেখছি!”
” তুমি হাসছো কেন?”
” তাহলে কি আমার কাঁদা উচিৎ? ” স্নেহা তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে নিল।
__________
দিনের বেলাতে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর ঘরটি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসে। এ যেন একটি কবরস্থান! রক্ত হীম হয়ে আসার মতো নীরবতা চারদিকে। ভয়ের চেয়েও দূর্বলতা বেশি অনুভব করছে তোহা। স্নেহার ডায়েরীর কিছু পেইজ পড়ার পর রেখে দিল। আপাতত ডায়েরী পড়তে ইচ্ছে করছে না তার৷ পেটে অসম্ভব ক্ষুধার যন্ত্রণা। তোহা কখনও না খেয়ে থাকতে পারে না। গতরাত থেকে এই পর্যন্ত একফোঁটা পানিও পেটে পড়েনি। এইভাবে কতদিন বাঁচতে হবে তাকে? আদৌ কি তাকে কখনও বের করা হবে এই মৃত্যকূপ থেকে? নাকি এখানেই তার জীবনের ইতি ঘটবে?
হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো। কেউ তালা খুলছে। চাতক পাখির মতো উঠে বসল তোহা। রাশেদ ভেতরে প্রবেশ করেছে। তাকে দেখেই মুখে হাসি ফুটল। উতলা কণ্ঠে বলল,” রাশেদ সাহেব, আমাকে এখান থেকে বের করুন প্লিজ। আমি আর পারছি না…”
” আপনাকে নিয়ে যেতেই এসেছি ম্যাডাম।”
” থ্যাঙ্কিউ। আমীরসাহেব নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরেছে! আমি আগে উনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। উনার সাথে আমার ভীষণ জরুরী একটা কথা আছে।”
তোহা উদগ্রীব। রাশেদ থমথমে, শীতল কণ্ঠে বলল,” আমীর স্যারের সাথে আপনার আর কখনও দেখা হবে না।”
” কেন? ভ্রু কুচকালো তোহা।
দেখা না হলে সে আমীরকে সত্যি কথাটা জানাবে কি করে? তাকে দেখা করতেই হবে আমীরের সাথে। এক ধাক্কায় রাশেদকে সরিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। কিন্তু যেতে পারল না বেশিদূর। দরজার চৌকাঠ মারানোর আগেই রাশেদ বলিষ্ঠ হাতে তাকে ধরে ফেলল। তোহা চিৎকার দিতে গেলেই রাশেদ তার মুখটা চেপে ধরল। তোহারই ওরনা দিয়ে তার মুখ বাঁধল। তারপর জোর করে তাকে নিয়ে মই বেয়ে সানসেটের উপরে উঠতে লাগল।
দেয়ালে ফুঁটো করে তৈরী হয়েছে গোপন রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে ছাদে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু রাশেদ তাকে নিয়ে ছাদে উঠছে কেন? ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার জন্য নয়তো? তোহাকে কি সত্যি জেনে ফেলার অপরাধে ম-রতে হবে তাহলে?
রাশেদ ছাদের মাথায় এসে থামল। তোহা হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। রাশেদ পকেট থেকে পিস্তল বের করে তোহার মাথায় ঠেঁকিয়ে রাখল। যাতে সে কোনোরকম উনিশ-বিশ করতে না পারে। এইখানে একটা হেলিকপ্টার আসার কথা। রাশেদের কাজ শুধু অপেক্ষা করা। ব্যবসায়িক কাজে এই ছাদে হেলিকপ্টার প্রায়ই নামে। সেজন্য কেউ সন্দেহ করবে না। তোহাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে যেখান থেকে আমীর কোনোদিন তার হদিশ বের করতে পারবে না। তোহা থাকবে আমীরের নাগালের বাহিরে। কাজটি রাশেদ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করছে। আমীর জানতে পারলে তার মৃত্যু নিশ্চিত!
রাশেদের ফোন বেজে উঠল। পিস্তলটা বামহাতে ধরে রেখে ডানহাত দিয়ে ফোন রিসিভ করল সে,” হ্যালো ম্যাডাম।”
ওই পাশ থেকে স্নেহার চাপা কণ্ঠ ভেসে এলো,” ওকে ছেড়ে দাও। যেভাবে এনেছিলে সেভাবেই আবার বন্দী করে আসো।”
রাশেদ প্রশ্ন করতে নিয়েও থেমে গেল। স্নেহার মুখের উপর কথা বলার সাধ্য তার নেই। তবুও মৃদু কণ্ঠে বলল,” বাড়িতে এভাবে রাখলে স্যার জেনে যাবে ম্যাডাম।”
” জানবে না। ”
আমীর কিছু জানার আগেই স্নেহা তাকে মেরে ফেলতে চায়। কিন্তু এতো সহজে নয়। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারবে। তোহার প্রতি তার ক্ষোভ এখন আকাশসম। আর তার মৃতদেহ দেখে আমীরের কি অবস্থা হয় সেটাও জানার খুব ইচ্ছে!
স্নেহার কণ্ঠে তীব্র হিংস্রতা প্রকাশ পাচ্ছে। রাশেদের ভয় হয়। আতঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন করল,” স্যার আপনাকে সন্দেহ করবে না তো ম্যাডাম?”
স্নেহা শীতলভাবে হাসল। সে তো চায়ই আমীর সন্দেহ করুক। স্নেহা কত ভয়ংকর হতে পারে সেটা তাকে জানতে হবে।
স্নেহা বলল,” তুমি চিন্তা কোরো না। তোমাকে বাঁচানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার।”
” আমি শুধু নিজের কথা ভাবছি না ম্যাডাম। আপনাকে নিয়েও ভাবছি।”
” আমাকে নিয়ে ভাবার কোনো দরকার নেই তোমার। তুমি শুধু নিজের কাজ মনোযোগ দিয়ে করো।”
“আপনি যা বলবেন তাই হবে।”
” ভেরি গুড!”
রাশেদ স্নেহার জন্য জীবন দিতে পারে। সেখানে এইটুকু ঝুঁকি তার কাছে কোনো ব্যাপার না। সে নিঃশব্দে স্নেহার আদেশ পালন করল। তোহা দেখল তাকে আবার গ্রাউন্ডফ্লোরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগের ঘরটিতেই ধাক্কা মেরে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হলো। তোহা চিৎকার করে বলল,” আমার কি দোষ? কি অন্যায় করেছি আমি? কেন আমার সাথে এমন করছেন?”
রাগে-জেদে দরজার দেয়ালে খামচাতে লাগল তোহা। এতোবড় বাড়িতেও কি তার আর্তনাদ শোনার মতো কেউ নেই?
_____________
রেস্টুরেন্টে বসে রাশেদের সাথে কথা বলছিল স্নেহা। আমীর ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখল স্নেহা ফোনটা নামিয়ে রাখছে। আমীর চেয়ার টেনে বসতে বসতে প্রশ্ন করল,” কার সাথে কথা বললে?”
” ফ্রেন্ড।”
স্নেহা অনেক কিছু অর্ডার করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। সবই আমীরের পছন্দের খাবার। আমীরের খুঁটিনাটি সম্পর্কে স্নেহার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। প্রথমেই আমীর কফিতে চুমুক দিল। স্নেহা বলল,
” মায়াকে কিভাবে খুঁজবে সব ঠিক করেছো? চিন্তা কোরো না। তোমার নাগালের বাইরে যেতে পারে… এমন সাধ্য কারো নেই।”
আমীর চোখ তুলে তাকাল, বলল,” কারো নেই? তোমার তো আছে।”
” কিন্তু আমি কখনও তোমার নাগালের বাইরে যাব না। এটা তুমি খুব ভালো করেই জানো।”
আমীর জানালার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,” তুমি যাকে খুশি আমার নাগালের বাইরে পাঠাতে পারো। এতোটুকু ক্ষমতা তোমার আছে।”
” তুমি কি বলতে চাইছো আমিই মায়াকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছি?”
” না। তা কেন বলব?”
” অস্বীকার করবে না৷ তোমার কথা শুনে সেটাই মনে হচ্ছে।” স্নেহা রেগে যাচ্ছে। রাগলে তার নাকের ডগা তিরতির করে কাঁপে। চোখ দু’টো অস্বাভাবিক বড় হয়ে যায়।
আমীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,” ঠিকাছে৷ স্বীকার করলাম। আমার মনে হয় মায়া বাড়িতেই আছে৷ তাকে ওখানেই সবার আগে খুঁজলে কেমন হয়? ”
স্নেহা উঠে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলল,” ঠিকাছে। চলো আমার সাথে। যদি মায়াকে বাড়িতে পাওয়া যায় তাহলে তুমি যা শাস্তি দিবে আমি মানব। আর যদি ওকে না পাওয়া যায়…. তাহলে আমি তোমার বাড়ি থেকে চলে যাব৷ যে আমাকে অবিশ্বাস করে তার সাথে আমি থাকতে চাই না।”
আশেপাশের সব মানুষ অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। স্নেহার চোখ ছলছল করছে। যেকোনো সময় চোখ ছাপিয়ে নামবে বর্ষণ। আমীর পরিস্থিতি সামলাতে কোমল গলায় বলল,” আ’ম স্যরি। আমি তোমাকে অবিশ্বাস করিনি স্নেহা। বসো।”
স্নেহা শান্ত হয়ে বসল। আমীর বলল,” থাক বাদ দাও। বাড়িতে খুঁজব না।”
” কেন খুঁজবে না? অবশ্যই খুঁজতে হবে। একবার যখন সন্দেহ করেছো তখন সেটা ক্লিয়ার করতে হবে।”
” কোনো সন্দেহ নেই। আমি বিশ্বাস করি তোমাকে।”
” সত্যি তো?”
” সত্যি!”
স্নেহা মিষ্টি করে হেসে বলল,” এসো তাহলে খাইয়ে দেই তোমাকে।”
চলবে
®Sidratul Muntaz