#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৪.
গাঢ় একাকিত্ব আর বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছে তোহাকে৷ এই ঘরের বাথরুমে একটা ভেন্টিলেটর লাগানো। কোনোভাবে যদি সেটা ভেঙে ফেলা যায় তাহলে হয়তোবা এখান থেকে পালানো সম্ভব। নতুবা এই মৃত্যুকূপেই তার মৃত্যু নিশ্চিত। তোহা ঘোর সংশয়ে আছে। কি করবে সে? স্নেহার ডায়েরীটা নিয়ে বসল কিছুসময়ের জন্য৷ কেন জানি তার মনে হচ্ছে মনোযোগের সাথে এই ডায়েরী পড়লে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। আসলেই কি তাই? কিছু অংশ পড়ার পর তোহা বুঝতে পারে এই ডায়েরীটি আসলে স্নেহার নয়৷ ডায়েরীটি অন্যকারো।
ডায়েরী থেকে-
জীবনে যখন প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম, তখন আমার বয়স মাত্র ষোল। কোনো অল্প বয়সের আবেগী প্রেম নয়। ভয়াবহ পাগলামীর সেই প্রেম। তাকে না দেখলে একটা দিনও আমার ভালো কা-টে না। সে ছিল আমার কিশোরী মনের কল্পনায় সর্বদা বিচরণকারী রাজকুমার। শয়নে-স্বপনে তাকে নিয়ে চিন্তা করা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় অভ্যাস। তাকে ভালোবাসার মধ্যেই যেন জীবনের সকল সুখ নিহিত।
রোজ বিকেলে মিউজিক ক্লাসে আমি পিয়ানো বাজানো শিখতে যেতাম। সেখানেই তার সঙ্গে আমার দেখা। সে অন্যদের ভায়োলিন বাজানো শেখাতো। পিয়ানো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ভায়োলিন ক্লাসে চলে যেতাম শুধু তাকে দেখার উদ্দেশ্যে। এভাবে ধরাও খেয়েছি অনেক। বাবা আমার সঙ্গীতের প্রতি এই আগ্রহ খুব একটা পছন্দ করলেন না। তিনি আমার পড়াশুনার দোহাই দিয়ে মিউজিক ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। তবে আমার ধারণা, বড় আপুর কুমন্ত্রণায় বাবা এই কাজ করেছিলেন। ছোট থেকে বাবা বড় আপুকে সবচেয়ে বিশ্বাস করে৷ তার কথা মা-বাবা দু’জনেই পীরের মতো মানে। ছোটবেলা থেকেই তার যন্ত্রণায় আমার এই জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। এতোটাই অতিষ্ট… যে আমি মাঝে মাঝে চাইতাম বড় আপু মরে যাক৷ নিজের এই অন্যায় চাহিদার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি কতবার! কিন্তু বড় আপুর প্রতি নিজের মনের এই ঘৃণা বিন্দুমাত্র কমাতে পারিনি। বরং তা যেন ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছিল।
আমার বড় আপুর নাম সায়েদা মুশতারি স্নেহা। স্বভাবে আমি যতটা সাধারণ আমার আপু ঠিক ততটাই অসাধারণ। ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য করেছি তার মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রবল। সে যে-কোনো মানুষের অতীত কেবল মুখ দেখেই বুঝে ফেলতে পারে। তাই একটা মানুষ ভালো নাকি খারাপ এটুকু বুঝতে তার কখনও অসুবিধা হয়নি। তার এই ক্ষমতা আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ আমি জানি না। তবে আমার জীবনে তা কেবল সর্বনাশই বয়ে আনছিল। মানুষের অতীত বুঝে ফেলার অপরাধে সে সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়। কোনো মুখোশধারী মানুষ সামনে এলেই মুখের উপর সত্য উন্মোচন করা তার অভ্যাস। এভাবে সবার কাছে সে হয়ে উঠল চোখের বিষ। তাই একটা সত্য আমি ছোট থেকেই উপলব্ধি করে এসেছি। এই পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে নিজের অতীত, সবচেয়ে বেশি ভুলে থাকতে চায় নিজের অতীত!
আমি আনাহিতা রশিদ ফীহা৷ বড় আপুর অস্বাভাবিক ক্ষমতার কারণে আমার জীবনে ঘটে গেছে অনেকগুলো ঘূর্ণিঝড়। সেগুলোই আজ আমি লিখব।
বাবা বড় আপুর পরামর্শ শুনে কলেজ ছাড়া বাড়ির বাইরে পা রাখা আমার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। এটা আপু করেছিল শুধুমাত্র আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। সে দেখতে ভীষণ সুন্দরী। আমরা দুইবোন দেখতে একই রকম হলেও আমাদের মধ্যে একটা বিস্তর পার্থক্য হলো আমি কৃষ্ণাঙ্গী আর সে শ্বেতাঙ্গী। তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এলে যথাযথ কারণে তা সবসময় ভেঙে যেতো। আর প্রত্যেকবারই সেই একই পাত্রপক্ষ আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতো৷ এর প্রধান কারণ বড় আপুর সেই অস্বাভাবিক ক্ষমতা। আমাদের গ্রামের মানুষ মনে করতো, আপুর উপর জ্বীনের আছর রয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা তার নামে এমন সব গুজব রটিয়ে রেখেছিল যে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত তাকে দেখলে ভয়ে শিউরে উঠতো৷ আমার বাবা গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কোনোকিছু আটকাতে পারলেন না। বরং বড় আপুকে ঘরবন্দী রাখতে হলো। সে ভীষণ পাগলামি করতো মাঝে মাঝে। তাকে শিকল দিয়েও বেঁধে রাখা হতো। সে তার জীবনে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতো আমাকে। কারণ তার চেয়ে অসুন্দর হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের জন্য সবাই আমাকেই পছন্দ করতো। সবাই বলতো, আমার চেহারায় নাকি একটা কোমল মায়া আছে। আর বড় আপুর চেহারা ছিল ইস্পাতের মতো কঠিন।
সে আমাকে এতোটাই ঘৃণা করতো যে ছোটবেলায় একবার আমাকে পুকুরে ডুবিয়ে মা-রতে চেয়েছিল। রাগান্বিত হলেই সে আমাকে আঘাত করতো৷ একবার ভয়ংকরভাবে সে আমার হাত কামড়ে র-ক্তাক্ত করে দিয়েছিল। সেই দাগ এখনও আমার হাতে আছে। এতোকিছুর পরেও বাবা-মা কখনও তাকে শাসন করেনি। তার সকল অন্যায়ের শাস্তি সবসময় আমাকেই ভোগ করতে হয়েছে। অথচ সবচেয়ে বেশি অন্যায় আমার সাথেই হচ্ছিল!
বাবা-মা যখন স্নেহা আপুর কথা শুনে বিনা কারণেই আমাকে ঘরবন্দী করে ফেললেন, আমার অবস্থা তখন পাগলের মতো হয়ে যায়। তাকে না দেখে আমি থাকব কি করে এই দুঃখে কাতর হয়ে উঠেছিলাম।
তারপর হঠাৎ একদিন তুখোড় গরমে খা খা করা মরুভূমির প্রান্তরে যেন সতেজ শীতল বৃষ্টি নামল। বাবা আমার জন্য হোম টিউটর ঠিক করলেন। সে অন্যকেউ নয়, আমীর! আমার একমাত্র আসক্তি!
সে বাড়িতে আসার পর থেকে আমার জীবনটাই বদলে গেল। পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ অনেক বেড়ে গেল৷ দিনে দুইবার আমি তার কাছে পড়তে বসি। ওইটুকু সময় আমার জন্য স্বর্গীয়। একবার সকালে আরেকবার সন্ধ্যায় সে আমাকে পড়ায়। সে থাকে আমাদের বাড়ির গেস্টরুমে। আমার ঘর থেকে দশ মিটার দূরত্বে তার ঘর। বাগান পেরিয়ে যেতে হতো। কারণে-অকারণে আমি সেখানে যাওয়ার ছুঁতো খুঁজতাম। সে হয়তো বুঝতেও পারে তার প্রতি আমার অনুভূতি। কিন্তু সে খুব বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন। আমার মতো আবেগী নয়। আমার প্রতি তার ভালোবাসা তৈরী হবে না জেনেও আমি নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম৷ কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি যে সেও আমার ডাকে সাড়া দিবে। আমি তার থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে একটা প্রেম পত্র পেলাম। আমার ফিজিক্স বইয়ের মাঝখানে চিঠিটা রেখে দিয়েছিল সে। আমার জীবন ফুলের মতো রঙিন আর সুবাসিত হয়ে উঠল। দিন-রাত এক করে সারাখন আমি শুধু সেই প্রেমপত্র পড়ি। সেটি হয়ে উঠল আমার জীবনীশক্তি। তার সামনে যেতে আমার ভয়ংকর লজ্জা হতো তখন। আমি যে মানুষটিকে চাই, সেও আমাকে একইরকম ভাবে চায়। এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ অনুভূতি আর কি হতে পারে?
কিন্তু অভাগীর কপালে সুখ সয় না বেশিদিন। আমার মতো অভাগীর জন্য বিধাতা হয়তো সুখ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। একদিন সে নিজে থেকেই আমাকে বলল,” শোনো ফীহা, তুমি আমার ছাত্রী। আমার পক্ষে কখনও তোমাকে অন্য নজরে দেখা সম্ভব না। এই কথা আমি সরাসরি বলছি কারণ তোমাকে বুঝতে হবে….তুমি আমাকে নিয়ে যেটা চিন্তা করো সেটা অসম্ভব। ”
আমার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অসম্ভব কষ্টে চারদিকের সব অন্ধকার দেখতে পেলাম।
এতটুকু পড়ার পর ডায়েরীটা বন্ধ করে ফেলল তোহা। ফীহার অনুভূতি যেন সে নিজের মন দিয়ে অনুভব করতে পারছে। তার খারাপ লাগছে ফীহা নামের অচেনা মেয়েটির জন্য। স্নেহা শত অন্যায় করার পরেও তার বাবা-মা সবসময় তার পক্ষই নিতো। বোঝা যাচ্ছে এর পেছনে কোনো রহস্য আছে। হয়তো স্নেহা তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দিয়ে নিজের বাবা-মাকে ভয় দেখিয়ে রেখেছিল। স্নেহার বাবা-মায়ের এমন কোনো অতীত কি আছে যা স্নেহা গোপন রেখেছিল? আর বিনিময়ে তারা স্নেহার সব অন্যায় মেনে নিচ্ছিল? তাহলে আমীরের ব্যাপারটা কি? সে কেন ফীহাদের বাড়িতে হোম টিউটর হিসেবে গেল? তার তো এমন চাকরির কোনো প্রয়োজন ছিল না। উত্তর জানতে তোহা পুনরায় ডায়েরী পড়তে শুরু করল।
সেদিন থেকে তার সঙ্গে পুরোপুরি কথা বলা বন্ধ করে দিলাম আমি। তার ঘরের আশেপাশেও যেতাম না। বাবাকে বলে দিলাম আমার জন্য নতুন টিউটর খুঁজতে। আমি কোনোভাবেই আমীরস্যারের কাছে আর পড়ব না। বাবা আমার কথা কখনও মানতেন না। কিন্তু এই ব্যাপারটা মেনে নিলেন। কারণ বড় আপুরও এতে সম্মতি ছিল। আর বড় আপু যেখানে ‘হ্যাঁ’ বলে আমার বাবারও সেখানে ‘হ্যাঁ’ বলা বাঞ্চনীয়।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, আমীর স্যার বাড়ি আসার পর থেকে বড় আপুর আচরণ খুব বদলে গেল। সে সবসময় সেজে-গুজে থাকতো।আর ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে ঘুরতো। তাকে আমি আমীরস্যারের ঘরের আশেপাশেই ঘুরঘুর করতে দেখতাম। তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক হতে পারে এমন সম্ভাবনা আমার মনে কখনও উঁকি দেয়নি। কিন্তু আমি বিরাট ভ্রান্তির মধ্যে ছিলাম। সেদিন আমীর স্যারের থেকে ওই সব কথা শোনার পর আমার মনে হয়েছিল আমীর স্যার ওই প্রেম পত্র ইচ্ছে করে লিখেছিলেন। শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। এভাবে আমার মন নিয়ে খেলার অধিকার তাকে কে দিয়েছে?
একদিন মাঝরাতে আমি বড় আপুকে সবুজ শাড়ি পরে সেজে-গুজে বের হতে দেখলাম। সে আমীর স্যারের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। আমার সারা রাত ঘুম এলো না। বালিশে মুখ গুঁজে ভীষণ কাঁদলাম। বড় আপু এসেছিল ভোর সকালে। আমার আর আপুর ঘর পাশাপাশি হওয়ায় সে যখনি বের হতো কিংবা ঢুকতো, আমি টের পেয়ে যেতাম৷ তাদের মধ্যে সেদিন কি হয়েছিল সেটুকু বোঝার মতো জ্ঞান আমার আছে। আমীর স্যারের প্রতি তীব্র অভিমানে আমি তাকে ঘৃণা করতে লাগলাম সেদিন থেকে।
তারপর হঠাৎ একদিন আমি জানতে পারলাম ফিজিক্স বইয়ে গুঁজে রাখা চিঠিটি আমীর স্যারের পক্ষ থেকে আসেনি। সেই চিঠি লিখেছিল আমার বড় আপু। আমীর স্যারের প্রতি আমার সংবেদনশীল অনুভূতি বুঝতে পেরেই সে এই গর্হিত কাজটি করেছিল। আমাকে কষ্ট দেওয়াই তার আসল উদ্দেশ্য। ছোটবেলা থেকেই সে এসব করে পৈশাচিক আনন্দ পায়। তাহলে এতোদিন আমি বিনা কারণে আমীরস্যারকে ঘৃণা করেছি। তার তো আসলে কোনো দোষ ছিল না। আমাকে সে ভালোবাসেনি…এটা তো তার দোষ হতে পারে না! কিন্তু সেদিন রাতের ঘটনা আমি ভুলে যেতে পারলাম না। আমীর স্যার আমার মায়াতে আটকায়নি, আটকেছিল বড় আপুর রূপে!
কিছুদিনের মধ্যেই আমীরস্যারের সাথে স্নেহা আপুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি বাবা শুধু এই কারণে আমীরস্যারকে বাড়িতে এনেছিলেন। আমাকে পড়ানো তো শুধু একটা বাহানা ছিল মাত্র৷ আসল কারণ হচ্ছে বড় আপুর সাথে আমীরস্যারের বিয়ে। আর সেই বিয়েতে আমীর স্যারেরও কোনো অমত নেই। আমি দুঃখিত হলাম, একদম ভেঙে পড়লাম। একবার তো মনে হলো, কেন তাকে ভালোবেসেছিলাম? তাকে ভালোবাসার অপরাধে নিজেকে শেষ করে দিতে মন চাইল।
বিয়ের দিন যত ঘনিয়ে আসতে লাগল ততই আমার হতাশা বাড়তে লাগল। আমি ঠিক করলাম কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। এই বিয়ে নিজের চোখে দেখা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু তখনও একটা নিগূঢ় সত্য আমার অজানা ছিল। একদিন মা আর বড় আপুর কথোপকথন আড়ি পেতে শুনে জানতে পারলাম, বড় আপু অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু তার সেই বাচ্চাটি আমীরস্যারের নয়। সেদিন মাঝরাতে বড় আপু যখন সবুজ শাড়ি পরে আমীরস্যারের ঘরে গিয়েছিল তখন আমীর স্যার তাকে তাড়িয়ে দেয়। অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা মেটাতে বড় আপু সেই রাতেই রাশেদের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। রাশেদ ছিল আমাদের হাবিলদারের ছেলে। ঢাকায় পড়াশুনা করতো। মাঝে মাঝে গ্রামে আসতো সে স্নেহা আপুর প্রেমে উন্মাদ ছিল। তাকে পাওয়ার জন্য সব করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু স্নেহা আপু তাকে শুধুই ব্যবহার করেছিল।
সবকিছু আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল সেদিন। আমীরস্যার কেন আপুকে বিয়ে করতে বাধ্য সেটাও বুঝতে পারলাম। কিন্তু তার প্রতি এতোবড় অন্যায় আমি কিছুতেই হতে দিবো না। আমার বয়স তখন অল্প। আবেগের তীব্রতা অনেক বেশি। বুঝ কম। আমি করে ফেললাম একটি দুঃসাহসিক ভুল।
চলবে
– Sidratul Muntaz
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৫.
রাত বারোটার মধ্যেই আমাদের বাড়ির সবাই শুয়ে পড়ে। আমি হাতে ব্লেড নিয়ে আমীরস্যারের ঘরে গেলাম। এতোরাতে আমাকে দেখে তার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
” ফীহা, তুমি এইসময়?”
” আমি আপনার কাছে একটা জিনিস চাইবো। দিবেন?”
আমীরস্যার এদিক-ওদিক তাকাল। গম্ভীরমুখে বলল,” কেউ দেখে ফেললে কি হবে? ভেতরে এসো।”
আমি ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে তার বিছানায় বসে পড়লাম। সে আমার পাশে বসল না। দরজার কাছে দাঁড়ানো থেকেই হাত ভাঁজ করে শুধালো,” বলো। কি বলতে চাও?”
আমি মেঝের দিকে দৃষ্টি অবনত রাখলাম। কঠিনগলায় বললাম,” আপনি স্নেহা আপুকে বিয়ে করবেন না।”
” এই কথা বলার জন্য এতোরাতে তুমি এইখানে এসেছো?”
আমি শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আগের চেয়েও কঠিনভাবে বললাম,” আপনি বিয়ে করবেন না।”
” এসব ছেলেমানুষীর কোনো মানে হয় না। চলে যাও এখান থেকে। ”
তার ধমকে আমার ভাবান্তর হলো না। আগের চেয়েও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে একই বাক্য আওড়ালাম আমি,” আপনি বিয়ে করবেন না।”
আমীরস্যার এবার আমার হাত ধরে উঠিয়ে আমাকে ঘরের বাইরে বের করে দিল। রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,” আর কখনও তুমি এখানে আসবে না।”
আমি এতোক্ষণ যেটা আড়াল করে রেখেছিলাম সেটা বের করলাম। আমার হাতে ব্লেড দেখে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকাল আমীরস্যার। এগিয়ে এসে জিনিসটা আমার হাত থেকে কেঁড়ে নিতে চাইল। আমি দিলাম না। সাথে সাথে পিছিয়ে এসে হাতের শিরায় ব্লেডের ধারালো অংশ চেপে ধরলাম। উন্মত্ত গলায় বললাম,” আপনি এই বিয়ে করতে পারবেন না। কিছুতেই না।”
আমীরস্যার হতভম্ব হয়ে মন্তব্য করল,” ফীহা তুমি পাগল হয়ে গেছো।”
” হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। সত্যিই পাগল হয়ে গেছি আমি। আপনি যদি এই বিয়েটা করেন তাহলে নিজেকে শেষ করে দিবো।”
এই কথা বলেই ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগলাম। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে আমাকে দেখল আমীরস্যার। কাছে এসে নরম স্বরে বলল,” কেন এসব করছো? বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমাকে কখনও ভালোবাসিনি। নিজেকে এতোটা সস্তা করে কেন তুলে ধরছো? আমি তোমার থেকে এমন পাগলামি আশা করিনি। ছাত্রী হিসেবে তোমাকে স্নেহ করতাম৷ কিন্তু তুমি আমাকে ডিজেপয়েন্টেড করছো।”
আমি ক্রন্দনরত গলায় বললাম,” আমাকে ভালোবাসতে হবে না আপনার। সবার ভাগ্যে সবকিছু থাকে না আর আমি সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমার আপুকেও বিয়ে করতে পারবেন না আপনি। আমি আপনাকে বড়বোনের হাসব্যান্ড হিসেবে এক্সেপ্ট করতে পারব না।”
আমীর স্যার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,” এটা তোমার ব্যর্থতা। সেজন্য আমি কেন বিয়ে ভাঙব? তাছাড়া তোমার আপুর সাথে আমার সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। এখন বিয়ে ভাঙাও অসম্ভব। জীবনে সবকিছু তো আর আমাদের মনমতো হয় না ফীহা! কিন্তু মানিয়ে নিতে হবে। তোমাকেও এটা মানতে হবে। আর না মানলে কিছু করার নেই।”
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। ভাগ্যিস এই পাষাণ মানুষটাকে পাওয়ার আশা বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছি। নয়তো সারাজীবন হাপিত্যেশ করে ম-রলেও সে ফিরে তাকাতো না। আমীর স্যার দরজা বন্ধ করার আগে বলল,” ঘরে যাও ফীহা। গুড নাইট। ”
আমি তখন সত্যিটা না বলে থাকতে পারলাম না। ফরফর করে বলে উঠলাম,” আপনি কি জানেন আপু যে প্রেগন্যান্ট?”
আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে আমীরস্যার শান্ত এবং স্পষ্ট গলায় বলল,” হ্যাঁ জানি।”
আমি এতোটাই বিস্মিত হলাম যে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও হারিয়ে গেল। দেয়াল ধরে বললাম,” জানার পরেও বিয়ে করতে যাচ্ছেন? এই বিয়ে কি জায়েজ হবে?”
” না হোক। সেটা কেউ জানবে না।”
” আপনি আপুকে বাঁচানোর জন্য এটা করছেন তাই না? আপু নিশ্চয়ই আপনাকে কোনোভাবে ব্লেকমেইল করেছে। কিন্তু আমি এই অন্যায় সহ্য করব না। আপনার সাথে আপুর বিয়ে আমি হতে দিবো না।”
” ফীহা, দিজ ইজ নান অফ ইউর বিজনেস।”
আমি আমীরস্যারের কথার তোয়াক্কা না করে হুড়মুড় করে তার ঘরে ঢুকে পড়লাম। মেঝেতে সটান বসে পড়ে বললাম,” যতক্ষণ আপনি বিয়ে ভাঙতে রাজি না হবেন ততক্ষণ আমি এখান থেকে যাবো না। আমাকে কেউ বিন্দুমাত্র সরাতে পারবে না।”
” তুমি কিন্তু আমাকে রাগাচ্ছো।”
” রাগালে কি করবেন? মারবেন? ঠিকাছে মারুন, কা-টুন, যা ইচ্ছা তাই করুন। আমি এখান থেকে যাবো না মানে যাবোই না। আর যদি আপনি বেশি বাড়াবাড়ি করেন তাহলে আমি আত্মহত্যা করব।”
আমীরস্যার বিছানায় বসল। মাথা নিচু করে মুখে হাত রেখে কিছু একটা চিন্তা করল। হঠাৎ বলে উঠল,” তুমি জানো আমি এখানে কেন এসেছি?”
” হ্যাঁ জানি। বাবা আমাকে পড়ানোর কথা বলে আপুর সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য এখানে নিয়ে এসেছেন। কারণ আপুর বিয়ে হওয়াটা জরুরী। নাহলে সে আমাদের সবার জীবন অতিষ্ট করে তুলেছে। বিয়ের পর আপনার জীবনও অতিষ্ট করে তুলবে।”
আমার কণ্ঠে সীমাহীন ক্রোধ। আমি যে আপুকে অসম্ভব অপছন্দ করি সেটা আমার কথা শুনলে যে কেউ আন্দাজ করবে। হয়তো আমীরস্যারও আন্দাজ করতে পারল। সে থমথমে শীতল গলায় বলল,
” ভুল জানো তুমি। তোমার বাবার জন্য না। আমি নিজেই তোমার আপুকে বিয়ে করতে চেয়েছি। ”
” কি?” আমি হতবাক হয়ে রইলাম। আমীরস্যার মাথা নাড়লেন,” হুম। আর আমি টিচার না। তোমাকে পড়ানো এই বাড়িতে আসার জন্য একটা বাহানা ছিল। আসলে আমি এখানে এসেছি তোমার আপুর জন্য। মনে আছে একবছর আগে স্নেহা ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় গিয়েছিল? সেখানেই আমাদের প্রথম পরিচয়।”
আমীরস্যারের এসব কথা শুনে আকাশটা ভেঙে পড়ল আমার মাথায়। সাইকোলজিক্যাল কিছু সমস্যার জন্য আপুকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল। প্রায় সতেরোদিনের মতো আপু সেখানে ছিল। কিন্তু আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে এই বিয়ের পেছনে এতো ঘটনা থাকতে পারে।
” আপনি কি আপুকে ভালোবাসেন?” প্রশ্নটা করতে গিয়ে আমার গলা ধরে এলো। প্রচন্ড কষ্টে শ্বাস আটকে আসছিল। আমীরস্যার উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,” অলরেডি অনেক কিছু বলে ফেলেছি৷ তোমার আর একটা প্রশ্নের উত্তরও আমি দিবো না৷ তুমি এখান থেকে যাও নাহলে তোমার বাবাকে ডাকবো।”
আমি নাছোড়বান্দা। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বললাম,” সারা গ্রামবাসীকে ডেকে আনলেও আমি যাবো না।”
এই কথা বলে দেয়ালে পিঠ ঠেঁকিয়ে বসলাম। আমীর স্যার তার চশমার মোটা ফ্রেমে আবৃত চোখ দু’টোয় রাজ্যের বিরক্তি ঢেলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর আমি তাকিয়ে রইলাম শূন্যে।
খট করে বাথরুমে একটা শব্দ হতেই ডায়েরী বন্ধ করে উঠে বসল তোহা। ভয় লাগছে। বুকটা ধুকপুক করছে। মাথায় ঘুরছে হাজারও কৌতুহল। এরপর কি হয়েছিল? ফীহা নিশ্চয়ই বিয়েটা ভাঙতে পারেনি। কিন্তু সে এখন কোথায়? আদৌ বেঁচে আছে তো! এসব চিন্তা করতে করতে তোহা বাথরুমে ঢুকে দেখল ভেন্টিলেটর ভেঙে পড়ে আছে। ভয়ে চিৎকার দিতে নিয়েও দিল না সে। ঘরে কি কোনো চোর ঢোকার চেষ্টা করেছে? তাহলে তো তার নিজের জন্যই ভালো। সে পালানোর সুযোগ পেয়ে গেল। হাই কমোডের ফ্লাশবক্সের উপর উঠে দাঁড়ালো সহজেই এখান থেকে লাফ দেওয়া যায়। তোহা জানালার কাছে যেতেই একটা চিরকুট পেল। ইংরেজিতে লেখা,” Jump from here and I will rescue you.”
তোহা বাইরে তাকিয়ে দেখল একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অজান্তেই মুখে হাসি ফুটল। খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়ার পর পাখি যেভাবে ছটফট করে তোহাও সেভাবে ছটফটিয়ে উঠল। তবে লাফ দেওয়ার আগে সে ডায়েরীটা নিতে ভুলল না।
____________
তখন সন্ধ্যা। নূরজাহান বড় একটা প্লেটে খাবার সাজিয়ে নিয়েছে। স্নেহার ব্যক্তিগত সহকর্মী সে। সবসময় স্নেহার সাথে সাথেই থাকে। রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার সময় স্নেহা বলল,” কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”
নূরজাহান বিনয়ের সাথে বলল,” গ্রাউন্ডফ্লোরে যাচ্ছি ম্যাডাম।”
” গুড। আমাকে দাও। আমি নিয়ে যাবো।”
নূরজাহান প্লেট দিয়ে দিল। স্নেহা যেতে যেতে বলল,” রাশেদকেও আসতে বলো।”
” ওকে।”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হাজির হলো রাশেদ। স্নেহা বলল,” মেয়েটাকে কাল থেকে কিছু দেওয়া হয়নি৷ আমি এখন ওর ঘরে যাচ্ছি খাবারটা দিতে। তুমি আমার পেছন পেছন থাকবে আর খেয়াল রাখবে কেউ যেন আমাদের দেখে না ফেলে। এই বাড়িতে আমীরের বিশ্বস্ত মানুষের অভাব নেই। ওরা আমীরকে জানিয়ে দিলে আমরা বিপদে পড়ব।”
” বুঝতে পেরেছি ম্যাডাম।”
স্নেহা সামনে হাঁটতে লাগল আর রাশেদ তার পেছনে। গ্রাউন্ডফ্লোরে এসে রাশেদ চাবি দিয়ে দরজা খুলতে নিলেই স্নেহা ফিসফিস করে বলল,” দরজা খোলার সাথে সাথে ও কিন্তু পালানোর চেষ্টা করবে। তাই তুমি দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থেকো। ভেতরে শুধু আমি যাবো।”
রাশেদ মাথা নেড়ে তালা খুলল। স্নেহা ভেতরে ঢুকে স্তব্ধীভূত। কেউ নেই। বাথরুমের দরজাটাও খোলা। স্নেহা টেবিলে খাবারটা রেখে বাথরুমে গিয়ে দেখল ভেন্টিলেটর ভেঙে পড়ে আছে। ক্রোধে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল স্নেহা। রাশেদ সাথে সাথে ভেতরে এলো,” ম্যাডাম, কি হয়েছে?”
” পালিয়েছে। কিভাবে পালালো?”
অগ্নিদৃষ্টিতে চেয়ে উচ্চস্বরে প্রশ্ন করল স্নেহা। রাশেদের মুখ কাঁচুমাচু। সে এই বিষয়ে কিছুই জানে না। স্নেহা ক্ষীপ্ত হয়ে রাশেদের শার্ট খামচে ধরে বলল,” ওর একার পক্ষে এই ভেন্টিলেটর ভেঙে পালানো সম্ভব না। ওকে নিশ্চয়ই কেউ সাহায্য করেছে।”
রাশেদ থতমত খেয়ে প্রশ্ন করল,” কে?”
স্নেহা ক্রোধসিক্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,” আমীর। আহ, আমি ছাড়ব না ওকে। আমার সাথে চালাকি করার পরিণাম ওকে ভোগাবে।”
____________
তোহা গাড়ির জানালা খুলে দিল। তার ঘাড় পর্যন্ত ছোট চুল বাতাসে উড়ছে। ভীষণ হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে বহুদিন পর সে মুক্ত হয়েছে। বড় করে শ্বাস নিয়ে খোশমেজাজে বলল,” আচ্ছা, আপনি বুঝলেন কি করে যে আমি ওখানে আছি?”
আমীর গম্ভীর স্বরে বলল,” বাড়িটা আমার। সেখানে আমার থেকে একটা সুতোও লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। আর তুমি তো আস্তো মানুষ। ”
তোহা হেসে উঠল,” আমরা যাচ্ছি কোথায়?”
এই প্রশ্নের উত্তর দিল না আমীর। তার নজর পড়ে গেল তোহার কোলের উপর রাখা ডায়েরীটার দিকে। ভ্রু কুচকে বলল,” এটা কি?”
তোহা অপ্রস্তুত হয়ে ডায়েরীটা লুকানোর চেষ্টা করল। প্রসঙ্গ এড়াতে বলল,” তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।”
আমীরও এই বিষয়ে আর প্রশ্ন করল না। সে হয়তো ডায়েরীর ব্যাপারে কিছু জানে না। নাহলে তো দেখেই চিনতে পারতো। নাকি অন্ধকারে বুঝতে পারেনি? কে জানে? তোহা কৃতজ্ঞ স্বরে বলল,” আমাকে ওই জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করার জন্য আপনাকে থ্যাংকস।”
” থ্যাংকস বলার কিছু নেই। আমি তোমাকে বাঁচিয়েছি আমার স্বার্থে। স্বার্থ ছাড়া আমি কিছু করি না।”
” মানে আপনি বলতে চান আমাকে বাঁচানোর পেছনে আপনার স্বার্থ আছে?”
” অফকোর্স আছে।”
তোহা একটু সাবধান হয়ে সংকীর্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,” যেহেতু স্বার্থ ছাড়া আপনি কিছু করেন না… তাহলে কি স্নেহাকে বিয়ে করার পেছনেও আপনার কোনো স্বার্থ ছিল?”
আচম্বিতে প্রচন্ড জোরে ব্রেক কষল গাড়িটা। তোহা ধাক্কা খেয়ে সামনে ঝুঁকে এলো। আমীর কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,” আমার পারসোনাল লাইফ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
হঠাৎ আমীরের এমন রেগে যাওয়া দেখে ভ্যাবাচেকা খেল তোহা। তরল গলায় বলল,” আই এম স্যরি।”
চলবে
® Sidratul মুন্তায
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৬.
গাড়ি থামল একটি নির্জন বাংলোর সামনে। তোহা দেখল তাদের পেছনে আরও দুইটা বড় গাড়ি আসছে। এতোক্ষণ এই গাড়িগুলো লক্ষ্য করেনি সে। প্রথমেই গাড়ি থেকে বের হলো সরব। তারপর একে একে আরও কয়েকজন। এদের মধ্যে কেবল সরবকেই ভালো করে চেনে তোহা। সরব হাসিমুখে বলল,” ওয়েলকাম ম্যাডাম, ভালো আছেন?”
” ধন্যবাদ। আমি ভালো আছি। ”
আমীর চোখমুখ অন্ধকার করে বলল,” তোমাদের কাউকে আসতে হবে না৷ এখানেই অপেক্ষা করো।”
তারপর তোহাকে কিছু না বলেই সে ভেতরে যেতে লাগল। তোহা অনুগতের মতো তার পেছনে গেল। আমীর একটা কথাও তার সঙ্গে আর বলেনি ওই ঘটনার পর। তোহা বুঝতে পারল না, সামান্য একটা প্রশ্নে এতো রেগে যাওয়ার কি আছে? পরে অবশ্য তোহা ভেবে দেখেছে, প্রশ্নটা সামান্য নয়৷ এতো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার মতো ঘনিষ্টতা আমীরের সাথে তার কখনও হয়নি৷ সুতরাং রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে এমন রূঢ় আচরণ করতে হবে? আশ্চর্য!
ড্রয়িংরুমটা বেশ বড়। উত্তর দিক থেকে উঠে গেছে উপরে যাওয়ার সিঁড়ি। এই বাড়িটা আগের বাড়ির মতো নয়। কিন্তু খুব বিলাসবহুল আর সুন্দর। একদম একটা মায়া মায়া পরিবেশ। পুরনো ধাঁচের বাড়ি হলেও বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে লোভনীয় খাবারের সুঘ্রাণ। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে তোহার। সে দীর্ঘসময় ধরে অভুক্ত। সংকোচ কাটিয়ে বলতেও পারছে না কথাটা।
একজন ভদ্রমহিলা হাসিমুখে ভেতরে ঢুকল। তার হাতের ট্রে ভর্তি অনেক খাবার। পায়েস, নাড়ু, পিঠা, নুডলস,ফল, শরবত। এসব দেখে তোহার ক্ষিধে আরও বেড়ে গেল। আমীরকে দেখেই ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেলল। খাবারের ট্রে টেবিলে রেখে আমীরকে জড়িয়ে ধরল। তোহার সেদিকে খেয়াল নেই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে খাবারের দিকে।
রানু বলল,” বাবা, কতদিন পর এসেছিস। দরকার না থাকলে বুঝি রানু আন্টির কথা মনে পড়ে না?
” কি বলছো আন্টি? কেন মনে পড়বে না?”
রানু তোহার দিকে তাকাল,” এটাই কি আমার গেস্ট?”
” হ্যাঁ। ওর কথাই বলেছিলাম। ওর নাম মায়া। এক সপ্তাহ আগে ওর বাবা মা-রা গেছে। দুইটা দিন তোমার এখানে থাকবে।”
বাবার কথা শুনেই হাসিমুখ মলিন হয়ে উঠল তোহার। বুকের ভেতর টাল-মাটাল বিরহ ঢেউ টের পেল। অস্থির লাগা শুরু হলো৷ রানু বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল,” আহারে, আল্লাহ তোমার বাবাকে জান্নাত নসীব করুক মা। দোয়া করি।”
” ধন্যবাদ আন্টি।”
রানু তোহার মুখের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,” মাত্র দুইটা দিন কেন? আমি চাই এমন মিষ্টি একটা মেয়ে আজীবন আমার সাথে থাকুক।”
তোহা হেসে ফেলল। রানু আমীরের দিকে চেয়ে উতলা গলায় বলল,” অনেকদিন পর এসেছিস। আমি খুব খুশি হয়েছি। আজরাতে এখানে থাকতে হবে কিন্তু। আমি তোকে কোথাও যেতে দিবো না।”
আমীর মৃদু হেসে বলল,” সেটা সম্ভব না আন্টি। বাড়িতে স্নেহা আছে।”
রানু ধমকানোর চেষ্টা করল,” একটা রাত তুই না থাকলে তোর বউ মরে যাবে না।”
” সেটা কথা না। দু’জন মেয়ে মানুষের মধ্যে আমি কিভাবে থাকব?”
“মেয়ে মানুষ কোথায়? আমি হলাম তোর মা
মানুষ। ছোটবেলা থেকে ছেলের মতো কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি। আমি আর অন্য মেয়েমানুষ কি এক?”
” বোঝার চেষ্টা করো। আমি থাকলে তোমার গেস্টের অসুবিধা হতে পারে…” তোহার দোহাই দিয়ে বাঁচতে চাইল আমীর। কিন্তু তোহা সেটা হতে দিল না।
সাথে সাথেই বলে উঠল,” কেউ থাকলে আমার কোনো অসুবিধা নেই।”
রানু হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,” এইতো, লক্ষী মেয়ের মতো কথা।”
আমীর বিপাকে পড়ে গেল। আর অন্যকোনো অযূহাতও খুঁজে পাচ্ছে না দেওয়ার মতো। রানু জোর করে তাকে বসালো। অন্তত ডিনার করে যেতেই হবে। আমীর বলল,” বাইরে সরবরা অপেক্ষা করছে। আমি বরং ওদের চলে যেতে বলি।”
” যেতে বলবি কেন? এসেছে যখন ওরাও খেয়ে যাবে। ডাক ওদের।”
” ভাগ্যিস বলোনি যে ওদেরও থাকতে হবে!” আমীর রসিকতা করল। রানু বলল,” থাকতেই পারে। বাড়িতে জায়গার অভাব আছে নাকি?”
হাসল আমীর। রানু রান্নাঘরে ছুটে গেল। তার চোখমুখ খুশিতে জ্বলজ্বল করছে। একাকী জীবন তার। বাড়িতে কেউ এলে অত্যন্ত খুশি লাগে৷ মানুষজনকে রান্না করে খাওয়ানো তার অন্যতম প্রিয় শখ।
ভেতরে এসেই সবাই খাবারের উপর হামলে পড়ল। রানু আন্টির রান্নার হাত অসাধারণ। সবাই খুব প্রশংসা করছে। রান্নাঘর থেকে রানু আরও খাবার আনল। সবাই খাচ্ছে শুধু তোহা ছাড়া। তাকে ভূতগ্রস্তের মতো বসে থাকতে দেখে রানু বলল,” তুমি খাচ্ছো না কেন মা? খাবার ভালো লাগেনি?”
তোহা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,” সেরকম কিছু না আন্টি। খাবার ভালো। কিন্তু আমার ক্ষিদে নেই।”
আমীর রানুর দিকে তাকিয়ে বলল,” কে বলেছে ক্ষিদে নেই? ও গতকাল থেকে না খেয়ে আছে আন্টি। তুমি ওকে খেতে বলো।”
রানু বিস্মিত হয়ে বলল,” আগে বলবি না এই কথা? এসো মা, তোমাকে ভাত খেতে দেই। খালি পেটে এসব খাওয়ার দরকার নেই।”
তোহা অভিমানী কণ্ঠে বলল,” লাগবে না আন্টি। যে আমার সাথে কথা বলে না তার বাড়িতে আমি কিছু খাই না।”
আমীর তার দিকে না তাকিয়ে বলল,” এটা আমার বাড়ি নয়। রানু আন্টির বাড়ি৷ সুতরাং আপনি খেতে পারেন।”
তোহার বিরক্ত লাগল। আমীর তার সাথে অপরিচিত মানুষের মতো কথা বলছে। আগে তো ‘তুমি’ করে বলতো। এখন হঠাৎ ‘আপনি’ করে বলার ভং ধরল কেন?
_________
প্রচন্ড রাগে ঘরের এই মাথা থেকে ওই মাথা পায়চারী করছে স্নেহা। তার গা জ্বালা করছে। এসির ঠান্ডা বাতাসটাও অসহ্য মনে হচ্ছে। ধাক্কা মেরে ড্রেসিংটেবিলের সমস্ত কসমেটিক্স ফেলে দিয়েও শান্তি লাগল না। বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সে৷ লোহার বাউন্ডারি চেপে ধরে ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস নিতে লাগল। চিন্তা করল, আমীরকে এতো হালকাভাবে নেওয়া উচিৎ হয়নি। যদি আগে বুঝতো আমীরের মাথায় এসব চলছে তাহলে তোহাকে এখানে রাখতোই না কখনও৷ তার বোকামির জন্যই এমন হয়েছে। তখন রাশেদকে থামানোই উচিৎ হয়নি। তোহার অস্তিত্ব এতোক্ষণে গুম হয়ে যেতো। আর আমীর তার হদিশও খুঁজে পেতো না কখনও। স্নেহা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সামলাতে চাইছে। এতোবড় বোকামি সে কিভাবে করল? কিছুতেই মানছে না মন। সে এই হার মানতে রাজি নয়।
নিচ থেকে গাড়ি থামার শব্দ হলো। আমীরের চ্যালাপেলা ফিরে এসেছে। কিন্তু আমীরের গাড়ি এখনও আসেনি। সরবকে ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল৷ স্নেহার মাথায় মুহূর্তেই খেলে গেল একটা দূর্দান্ত পরিকল্পনা। মৃদু হেসে ঘরে ঢুকল সে। বিছানায় বসে পায়ের পা তুলে ডাকল,” নূরজাহান!”
” ডেকেছেন ম্যাডাম?” ডাকা মাত্রই উপস্থিত হলো নূরজাহান। স্নেহা হাতের ইশারায় কাছে ডাকল তাকে। পাশে বসতে বলল। মাথা নিচু করে নূরজাহান বসল স্নেহার পাশে।
” তুমি আমার জন্য কি কি করতে পারো আর কতটুকু করতে পারো নূর?”
নূরজাহান দ্বিধায় পড়ে গেল। বিভ্রান্তি নিয়ে বলল,” আমি আমার সাধ্যমতো আপনার আদেশ পালনের চেষ্টা করব।”
” সরব তোমাকে একবার প্রপোজ করেছিল। মনে আছে? তুমি তাকে রিজেক্ট করে দিয়েছিলে।”
নূরজাহানের পিলে চমকে উঠল। এই কথা সে নিজেও ভুলে গেছিল। কাউকে জানায়নি কখনও। তাহলে স্নেহা কি করে জানল? নূরজাহানের ধারণা স্নেহার মধ্যে অতিপ্রাকৃত কোনো ক্ষমতা আছে৷ তার থেকে কিছুই গোপন করা যায় না। আজ না হোক কাল, সে সব জেনে ফেলে। হয়তো চোখ দেখেই সে মানুষের মন পড়ে ফেলে। কে জানে? নূরজাহান হতবিহ্বল কণ্ঠে বলল,” জ্বী ম্যাডাম। মনে আছে।”
স্নেহা মসৃণ হেসে বলল,” সে আমীরের অনেক বিশ্বস্ত। তোমাকে এমন কিছু করতে হবে যাতে ও আমাদের কথা শোনে। যদি এই কাজটি করতে পারো তাহলে তোমার জীবন বদলে যাবে।”
নূরজাহান দ্বিধাগ্রস্ত। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।সরবকে তার পছন্দ নয়। সে এই কাজ করতে চায় না। কিন্তু স্নেহা বলল,” ভেবে দেখো, তোমার ছয়মাসের স্যালারি একদিনে দিবো।”
এবার চোখ ঝলমল করে উঠল নূরজাহানের। টাকার খুব প্রয়োজন তার। ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব পড়ে। আগে জীবনের মোড় বদলাতে হবে। আর ভালো লাগে না এই দৈন্যতায় ভরা জীবন। নূরজাহান রাজি হয়ে গেল।
” ঠিকাছে ম্যাডাম। আমি রাজি।”
স্নেহা প্রসন্ন হয়ে নূরজাহানার কাঁধে হাত রাখল,” ভেরি গুড।”
এমন সময় তার ফোনটা বেজে উঠে। আমীরের নাম্বার দেখে মনে মনে একটা ভয়ানক গালি বেরিয়ে আসে মুখ দিয়ে। নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,” তুমি এখন যাও নূর।”
নূরজাহান চলে যেতেই ফোন রিসিভ করল স্নেহা। আহ্লাদে সিক্ত কণ্ঠে বলল,” জান, কোথায় আছো তুমি?”
স্নেহার আদুরে কণ্ঠ শুনে আমীর মুচকি হাসল। এতোক্ষণে নিশ্চয়ই সব জেনে গেছে সে। তার এই আহ্লাদভরা কণ্ঠে পেছনে লুকিয়ে আছে ক্ষোভ। যা সে প্রকাশ করছে না। আমীর বলল,” আছি কোনো এক জায়গায়। রাতে নাও ফিরতে পারি। সেটা জানানোর জন্যই ফোন করেছি।”
স্নেহার মাথা গরম হয়ে উঠল। তোহাকে নিয়ে সে এমন কোথায় গেল যে রাতেও ফিরবে না? স্নেহা কোমল গলায় জিজ্ঞাসা করল,” মায়া কি তোমার সাথে আছে?”
” হ্যাঁ আছে। ওকে খুঁজে পেয়েছি। তুমি ঠিকই বলেছিলে। আমার নাগালের বাইরে যেতে পারে এমন সাধ্য কারো নেই।”
এই কথার দ্বারা যে আমীর স্পষ্ট তাকে খোঁচা মারল সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না স্নেহার। রাগ সংবরণ করে বলল,” হুম জানি। তোমরা কোথায় আছো? ওকে বাসায় নিয়ে আসলেও তো পারো।”
” আমার মনে হচ্ছে বাসাটা ওর জন্য সেইফ না।”
” তোমার এমন কেন মনে হচ্ছে হানি?”
” জানি না। আচ্ছা এখন রাখি। তুমি শুয়ে পড়ো। গুড নাইট।”
ফোন রাখতেই দুইহাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরল স্নেহা। সে একটা অগ্নিবলয়। সেই অগ্নিবলয়ে ঘি ঢালার চেষ্টা করছে আমীর। কিন্তু সে জানে না এতে একসময় সবকিছু ছাড়খাড় হয়ে যেতে পারে।
___________
” তোমার নামটা যেন কি মা? ভুলে গেছি।”
তোহা মিষ্টি হেসে বলল,” তোহা।”
আমীর কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে তাকাল। এই নাম সে জানতো না। রানু বলল,” খুব সুন্দর নাম।”
তোহা আঁড়চোখে তাকাল। আমীর সপ্রতিভ স্বরে বলল,” আমি কি তাহলে আপনাকে এই নামেই ডাকব?”
” আপনার ইচ্ছা!” অন্যদিকে চেয়ে দায়সারা জবাব দিল তোহা। আমীর গম্ভীর হয়ে বলল,” আপনি তো বলেছিলেন ‘মায়া’ নামটা শুধু কাছের মানুষের জন্য৷ নিশ্চয়ই এই নামে ডাকা আমার উচিৎ হবে না।”
তোহা মনে মনে বলল,” ঢং।”
রানু উঠে দাঁড়ালো,” রাতে কফি খাওয়ার অভ্যাস আছে তোমাদের?”
আমীর বলল,” হ্যাঁ আমার।”
” তুই যে খাবি সেটা আমি জানি। তোহা তুমি কি খাবে?”
তোহা উৎফুল্ল হয়ে বলল,” আমি কফি খাই না। কিন্তু বানাতে ভালো লাগে। আগে বাবার জন্য খুব কফি বানাতাম। এখন তো বাবা নেই। কার জন্য বানাবো? কিন্তু বানাতে ইচ্ছে করছে।”
আমীর নিশ্চুপ হয়ে গেল। রানু আর্দ্র কণ্ঠে বলল,” আহারে… ঠিকাছে আমরা আজ তোমার হাতে বানানো কফি খাব।”
” সত্যি? আমি এখনি যাচ্ছি। কার জন্য কেমন কফি বানাব?”
রানু বলল,” আমার কফিতে শুধু দুধ দিবে। চিনি ছাড়া।”
এবার তোহা আমীরের দিকে তাকাল। আমীর অবনত দৃষ্টিতে বলল,” হার্ড কফি।”
” একদম আমার বাবার মতো!” তোহার এই কথায় আমীর সামান্য চমকালো। অপ্রস্তুত বোধ করল।
দশমিনিটের মধ্যে কফি নিয়ে হাজির হলো তোহা। রানু কফিতে চুমুক দিয়েই আপ্লুত গলায় বলল,”,আহ, অমৃতের মতো স্বাদ হয়েছে। বাবা আবির, তুই এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে পারলি না?”
হালকা কেশে উঠল আমীর। রানু ক্রোধ নিয়ে বলল,” কোথাকার কোন রাক্ষসীকে ধরে বিয়ে করেছিস৷ জীবনটাই ছাড়খাড় করে দিচ্ছে তোর।”
তোহা মুখ আড়াল করে হাসতে লাগল। আমীর রেগে তাকাল,” রানু আন্টি!”
তার হুংকারে দমল না রানু। শ্রাগ করে বলল,” আমার আর কি? তোর জীবন তুই বুঝবি। আমার কথার কি কোনো দাম আছে?”
তোহার দিকে চাইল আমীর। তোহা ঠোঁট কামড়ে হাসছে অনবরত। আমীর বিব্রত হয়ে বলল,” আমি শুতে গেলাম। গুড নাইট।”
এই কথা বলেই সে উঠে গেল। রানু বলল,” বউয়ের প্রতি দরদ কত দেখো! কিচ্ছু বলা যায় না।এদিকে আসো মা। তুমি আমার পাশে বসো। ”
তোহা নীরবে আদেশ পালন করল। রানু বলল ফিসফিসিয়ে,” ওমন একটা ডাইনিকে যে কোন দুঃখে আবির বিয়ে করেছে তা আমি আজও বুঝতে পারলাম না।”
তোহা শব্দ করে হেসে উঠল।
” এতোদিন তুমি আবিরের বাড়িতে ছিলে না? সত্যি করে বলো, ওই ডাইনি তোমাকে জ্বালায়নি তো?”
” না আন্টি। সেরকম কিছু হয়নি।”
” দেখো আবার, ডাইনিটা কিন্তু ডেঞ্জারাস।”
তোহা মনে মনে ভাবল, স্নেহা যে কত ভয়ংকর সেটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। একটু পরেই রানু ঘুমাতে চলে গেল। তোহার ঘুম আসছে না। ডায়েরীটা নিয়ে বসলে হয়। সে লিভিংরুমে এসে বসল। জোছনা রাত। চাঁদের মায়াবী আলোয় বাগান ছেয়ে আছে। ডিম লাইট জ্বলছে ব্যালকনিতে। যথেষ্ট আলোপূর্ণ পরিবেশ। সহজেই ডায়েরীর লেখাগুলো পড়া যাচ্ছে। কিন্তু মন বসল না তোহার। কোথা থেকে যেন একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে। তোহা সামান্য এগুতেই দেখল দূরে কবরস্থানের সামনে একটা কালো ছায়া। বুক ধ্বক করে উঠল। ধীরপায়ে কিছুটা এগিয়েই ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,” কে ওখানে? কে?”
থমথমে শীতল কণ্ঠে উত্তর এলো,” আপনি ঘুমাননি কেন এখনও?”
তোহা ভ্রু কুচকে আরও একটু এগিয়ে গেল। চাঁদের আনম্র আলোয় দেখতে পেল আমীরের মুখটা। সে কাঁদছে। রহস্যময় চোখ দু’টো জলে ভরা। চশমা খুলে রেখেছে। এই প্রথম তাকে চশমা ছাড়া দেখল তোহা। কি মায়াময় একটা মুখ! তার চোখের জল দেখে তোহা অবাক হলো,” এভাবে কবরস্থানের সামনে বসে কেন কাঁদছেন আপনি? এটা কার কবর? ”
আমীর তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। ভারী গলায় বলল,” ভেতরে যান।”
তোহা চলে এলো দ্রুত। মন বিষণ্ণ হয়ে উঠল তার। আমীরকে এই প্রথম কাঁদতে দেখেছে সে।
____________
ডায়েরী থেকে-
পুরোটা রাত আমি ওভাবেই স্থবির হয়ে বসে রইলাম। আমীর স্যার আমাকে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু আমি নিজের অবস্থানে অনড়। এই বিয়ে হওয়ার চেয়ে ভালো আমি মৃত্যুকে বরণ করে নিবো। ভোর সকালে আমীর স্যার নিরুপায় হয়ে স্নেহা আপুকে ডেকে আনল। সে ঘরে এসেই আমাকে এলোপাতাড়ি চড় মারতে লাগল। আমীর স্যার তাকে থামানোর চেষ্টা করলে সে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,” আমাদের বোনের মাঝখানে তুমি আসবে না।”
আমীর স্যার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,” ওকে তুমি কিছু করবে না স্নেহা৷ তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না।”
আমাকে নিয়ে আমীর স্যার চিন্তা করছে এই ভেবে আমি আপ্লুত হলাম। স্নেহা আপু আমাকে টেনে-হিঁচড়ে ওই ঘর থেকে বের করে আনল। আমি প্রস্তুত ছিলাম এখন হয়তো সারা বাড়িতে এই কথা জানাজানি হবে। আপু কাউকে না জানিয়ে ক্ষান্ত হবে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেরকম কিছুই হলো না। আপু আমাকে তার ঘরে নিয়ে দরজা আটকালো। ঠান্ডা স্বরে বলল,
” তুই কি চাস ফীহা? আমার সাথে বিয়ে না হলেও ও কখনও তোর হবে না। বোকা মেয়ের মতো কেন নিজের জীবন শেষ করতে চাইছিস? তুই মরে গেলেও আমাদের বিয়ে হবে আর বেঁচে থাকলেও হবে। এরপরেও যদি তুই ম-রতে চাস তাহলে ম-র। তোর ইচ্ছা।”
আমি বিস্মিত হয়ে শুধালাম,” আমি ম-রে গেলেও তোমাদের বিয়ে হবে?”
” নিশ্চয়ই হবে। পৃথিবী যদি ধ্বংস না হয়ে যায় তাহলে আমাদের বিয়ে হবেই। কোনো বাঁধা এই বিয়ে আটকাতে পারবে না।”
আমি কাঁদতে শুরু করলাম। ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে। প্রশ্ন করলাম ব্যাকুল হয়ে,” উনি কি তোমাকে ভালোবাসে আপু?”
স্নেহা আপু হাসল। বিছানায় বসে পায়ের উপর পা তুলে বলল,” ভালোবাসা কি না জানি না৷ কিন্তু যেকোনো বুদ্ধিমান মানুষ আমাকে বিয়ে করতে চাইবে। আমীর বুদ্ধিমান। তাই ও আমাকে বেছে নিয়েছে। বোকা হলে তোকে বেছে নিতো।”
গৌরবে চোখ চকচক করছিল তার। আমার হৃদয়ে অবাধ তোলপাড় শুরু হলো। আগেও বলেছিলাম,
আপুর বিয়ের জন্য এই পর্যন্ত যত পাত্র এসেছে তারা সবাই আপুকে রিজেক্ট করে আমাকে পছন্দ করেছে। যে কারণে আমার প্রতি তার একটা ক্ষোভ তৈরী হয়৷ সেই ক্ষোভ থেকেই সে প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমার ভালোবাসাকে আমার চোখের সামনে বিয়ে করে এতো কঠিন প্রতিশোধ! কিন্তু আমীর স্যার কেন তাকে বিয়ে করতে এতো উদগ্রীব তা আমার বোধগম্য হলো না। সেই কারণটাও আমাকে আপু জানাল।
আমার আপুর মতো ভয়ংকর মেয়ে শুধু এই গ্রামে কেন? হয়তো পুরো পৃথিবীতেও নেই। নির্জন দুপুরে কিংবা গভীর রাতে সে গাছের ডালে বসে মানুষকে ভয় দেখায়। ওই সময় ওই রাস্তা দিয়ে যে হেঁটে তারই নাম ধরে ডাক এবং গড়গড় করে তার অতীতের সব অপকর্মের কথা শুনিয়ে দেয়। মানুষটির তখন হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থা হয়। আমীর স্যারই একমাত্র মানুষ, যিনি আপুর এমন অস্বাভাবিক আচরণে ঘাবড়ে যায়নি। বরং মুগ্ধ হয়েছে।
আমীর স্যারের জীবনেও একটা বিস্ময়কর কালো অতীত আছে। আপু সেই অতীত জানে। এখন আমি সেই অতীতের ব্যাপারেই লিখতে যাচ্ছি। যে অতীতের কথা আমীর স্যার কাউকে কখনও বলেনি।
চলবে
® Sidratul Muntaz