#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৭.
আবির বিন ইফাত। তখন বারো বছরের কিশোর সে। জন্মের কিছুদিনের মাথায় মা আবিরকে ছেড়ে চলে যায়। কোথায় যায় সেই খবর কেউ জানে না। ছোটকাল থেকেই শুধুমাত্র এই কারণে আবির তার মাকে প্রচন্ড ঘৃণা করে। তার কাছে দুনিয়া বলতে কেবল তার বাবা আর অনন্যা আন্টি!
পরমা সুন্দরী অনন্যা ছিল আবিরের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তাকে আবিরের দেখা-শুনার জন্য রাখা হলেও ব্যক্তিগতভাবে সে ইফাত রহমানের রক্ষিতা। ইফাত রহমান, আবিরের বাবা। পোশাক শিল্পের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। এছাড়াও নামকরা সফল প্রযোজক ছিলেন তিনি। পুরো নাম সৈয়দ ইফাত রহমান।
অল্প বয়স্ক মেয়েরা নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শহরে আসে। বড় বড় প্রযোজকরা টাকার বিনিময়ে তাদেরকে নিজের মনোরঞ্জনের জন্য কিনে নেয়। সেভাবে অনন্যাও এসেছিল। কিন্তু তাকে থেকে যেতে হয় ইফাতের স্থায়ী রক্ষিতা হিসেবে। আবিরের সাথে অনন্যার বেশ গাঢ় একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেল। আবির তার বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসতো। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে সে বুঝতে পারে, বাবা তার জীবনের হিরো নয়। বরং ভিলেন।
প্রযোজক হওয়ার খাতিরে ইফাত রহমানের বাড়িতে নায়ক-নায়িকাদের ভীর স্বাভাবিক বিষয় ছিল। তখনকার সময়ে মৈত্রী ছিল বেশ জনপ্রিয় অভিনেত্রী। আবির তার স্কুল, কোচিং কিংবা প্লেগ্রাউন্ডে মৈত্রী আর নিজের বাবা সম্বন্ধে কটাক্ষ শুনতো। নায়িকা মৈত্রী আর নিজের বাবাকে জড়িয়ে নোংরা মন্তব্য তার মানসিক হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে আবির কখনও কারো কথা শুনে নিজের বাবাকে বিচার করেনি। কিন্তু একদিন-
ইফাত কথা দিয়েছিলেন রাতে ফিরে এসে আবিরের সাথে সিনেমা দেখবেন। আবির মুভির ক্যাসেট নিয়ে ডিভিডি চালিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বাবার জন্য অপেক্ষা করে। একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যায়। মাঝরাতে ঘুম ভাঙতেই তার মনে পড়ল বাবার আসার কথা ছিল কিন্তু তিনি আসেননি।
তাদের বাড়িটা ট্রিপ্লেক্স। আবিরের ঘর দুইতলায়। ইফাত রহমান থাকেন তিনতলায়। সেখানে প্রয়োজন ছাড়া কারো যাওয়া নিষিদ্ধ। এমনকি আবিরও অনুমতি ছাড়া সেখানে যেতে পারতো না। মাঝে মাঝে সে বাবার সঙ্গে ঘুমানোর বায়না করতো। বাবা এতোই ব্যস্ত থাকতেন যে ছেলের সঙ্গে একটা রাত ঘুমানোর সময় করে উঠতে পারতেন না।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পর আবির তিনতলায় উঠে বাবার ঘরের দিকে গেল। ট্রান্সপারেন্ট দরজা দিয়ে সে দেখে জনপ্রিয় নায়িকা মৈত্রী তার বাবার বিছানায় নগ্ন অবস্থায় শুয়ে আছে। দৃশ্যটি দেখা মাত্রই সে নিঃশব্দে নিচে নেমে এলো। সেদিন থেকে বাবার প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণায় আবিরের মন বিষাদ হয়ে যায়৷ একমাত্র ভালোবাসার জায়গা বাবার এমন নোংরা রূপ তার জন্য বিরাট ধাক্কা।
রোজই অল্প বয়স্ক সুন্দরী রমণীরা তাদের বাড়িতে আসে। এই নিয়ে অনন্যা আর ইফাতের মাঝে তর্ক হয়। একদিন সেই তর্ক বিরাট ঝগড়ার রূপ নিল।
” আপনি রোজ নতুন নতুন মেয়েদের নিয়ে ফূর্তি করেন। আবির বড় হচ্ছে। সে এখন সবই বুঝে। এমন একটা পরিবেশ তার জন্য ক্ষতিকর।”
ইফাত দায়সারা জবাব দেয়,” আমার ছেলেকে নিয়ে আমার চেয়ে বেশি চিন্তা তোমার করার কোনো প্রয়োজন দেখি না।”
” আপনি যদি ওকে নিয়ে চিন্তাই না করেন তাহলে আমাকে তো করতেই হবে। হয় আপনি এসব বেলেল্লাপনা বন্ধ করবেন নাহলে আমি আবিরকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে অন্যকোথাও চলে যাবো।”
” কি বললে? আমার ছেলেকে নিয়ে তুমি আমার বাড়ি থেকে চলে যাবে?”
” নিশ্চয়ই যাবো। আমি চাই না সেও আপনার মতো অমানুষ তৈরী হোক।”
ইফাত ভীষণ ক্ষীপ্ত হয়ে অনন্যাকে প্রহার করলেন। আবির নিজের ঘরে থেকেও স্পষ্ট শুনতে পারে তার অনন্যা আন্টির আর্তনাদ। পরদিন সকালে যখন অনন্যা আবিরকে নাস্তা খাওয়াতে এলো তখন তার কপালে, ঘাড়ে আর গলায় জখমের দাগ দেখে আবির প্রশ্ন করে,” তোমার কি হয়েছে আন্টি?”
অনন্যা ম্লান মুখে জবাব দিল,” তেমন কিছু না বাবা। সিঁড়ি থেকে পড়ে ব্যথা পেয়েছিলাম।”
” চলো তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।”
” লাগবে না। তোমার বাবা শুনলে রাগ করবেন।”
” রাগ করুক। তার রাগে আমার কিছু যায়-আসে না।”
” ছিঃ বাবা, এরকম বলে না। বাবা যেমনই হোক কখনও তুমি তাকে অসম্মান করবে না। মনে রাখবে তিনি তোমাকে জন্ম দিয়েছেন।”
অনন্যার সাথে প্রায়ই ইফাত দূর্ব্যবহার করেন। মাঝে মাঝে গেস্টদের সামনে তাকে চড় মা-রেন। অনন্যা ঘরে এসে লুকিয়ে কাঁদে। এসব দেখেই একটু একটু করে বাবার প্রতি অসামান্য ক্রোধ সৃষ্টি হয় আবিরের।
একবার ইফাত আর মৈত্রী ঠিক করল তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। এমনিতেও তাদের সম্পর্ক নিয়ে মিডিয়া জগতে অনেক তোলপাড় হয়। বিয়েটা মৈত্রীর ক্যারিয়ারের জন্য ভালো টার্ণিং পয়েন্ট হতে পারে। কিন্তু আবির এই বিয়ের ব্যাপারটা কিছুতেই মানতে পারছিল না। সে সরাসরি বাবার কাছে গিয়ে বলল,” মৈত্রী আন্টি আমাদের বাড়িতে আসুক সেটা আমি চাই না।”
শান্ত-শিষ্ট আবির কখনও তার বাবার মতের বিরুদ্ধে কথা বলেনি। তাই তার হঠাৎ প্রতিবাদে ইফাত খুব বিস্মিত হলেন। তবে তিনি ছেলের সামনে মেজাজ দেখালেন না। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,” কেন চাও না? সে তো তোমাকে অনেক আদর করে। তোমারও মায়ের দরকার আছে।”
আবির অকপটে বলল,” আমার কোনো মা দরকার নেই।”
” তোমাকে এসব কে শিখিয়েছে? অনন্যা?”
” মোটেও না। আমি নিজেই এসেছি। তুমি যদি বিয়ে করো তাহলে আমি অনন্যা আন্টিকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবো।”
ইফাত হতভম্ব হলেন ছেলের স্পর্ধা দেখে। পরদিন সকালে আবিরের ঘুম ভাঙল বীভৎস চিৎকারের শব্দে। সেই চিৎকার অন্যকারো নয়, অনন্যার। গতকাল আবিরের করা বেয়াদবির জন্য ইফাত অনন্যাকেই দায়ী মনে করেছেন। এজন্য তাকে নিদারুণ শাস্তি পেতে হলো। বারো ঘণ্টা তাকে একটা ঘরে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছিল। পানি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তার চোখের প্রতিটি জল আর গায়ের প্রতিটি ক্ষত আবির গুণে রাখল। একদিন বাবার থেকে সবকিছুর হিসাব নিবে তাই।
মনখারাপ হলেই ভায়োলিন বাজানো অনন্যার অন্যতম প্রিয় শখ। সে আবিরকেও এটা শিখিয়েছিল।একমাত্র অনন্যার সাথেই তার আনন্দের সময়গুলো কা-টতো। একদিন আবির ঘরে এসে দেখল অনন্যা ভায়োলিন নিয়ে বসেছে। সে একমনে ভায়োলিন বাজাচ্ছে আর তার চোখ দিয়ে নামছে অশ্রুধারা। আবির গিয়ে অশ্রু মুছে দিতেই অনন্যা চোখ মেলে হাসল। আবির বলল,” বাবা মৈত্রী আন্টিকে বিয়ে করছে বলে কি তোমার মনখারাপ?”
অনন্যা বলল,” একদম না বাবা। আমি শুধু ভাবছি তোমাকে নিয়ে। তোমার নতুন মা এলে হয়তো আমাকে এই বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে। আমি তোমাকে না দেখে কিভাবে থাকব আবির?”
” তুমি কোথাও যাবে না। গেলে আমরা দু’জন একসাথে যাবো। আমি তোমার মতো করে আর কাউকে ভালোবাসব না।”
অনন্যা হেসে আবিরের কপালে চুমু দিল। আবির অনন্যার কোলে মাথা রাখল। অনন্যা পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিল তার চুলে। মা না হয়েও অনন্যা আবিরকে এতো ভালোবাসা দিয়েছিল যে আবিরের মনে হতো মা না থাকাই ভালো। তার মা নেই কিন্তু অনন্যা আন্টি আছে। যে মায়ের চেয়েও পবিত্র, মায়ের চেয়েও সুন্দর।
কিন্তু আবিরের জীবনে মায়ের চেয়েও সুন্দর অনন্যা আন্টিকেও কেঁড়ে নিলেন বাবা। একদিন আবির ঘুম থেকে উঠে জানতে পারল অনন্যা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আবির প্রচন্ড একটা ধাক্কা খায়। তার জীবন নরক হয়ে উঠল সেদিন থেকে। অনন্যার শূন্যতা তাকে ক্রমেই নিঃস্ব বানিয়ে দেয়। জন্মের পর থেকে যাকে মায়ের মতো ভালোবেসে এসেছে তার হঠাৎ প্রস্থানে জীবন বিষাদময় হয়ে উঠল। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিল সে।
মৈত্রী আর ইফাত বিয়ে করে নেয়। কিন্তু মৈত্রী তার ক্যারিয়ার নিয়ে এতো ব্যস্ত যে আবিরের খেয়াল রাখার সময় তার হাতে মোটেও নেই। দিনে দিনে নিঃসঙ্গতা জেঁকে ধরল আবিরকে। সে এতো নিশ্চুপ হয়ে যায় যে প্রয়োজন ছাড়া টু শব্দটুকু উচ্চারণ করতো না। আবিরকে দেখা-শুনা করার জন্য নতুন কাউকে রাখা হলো। তার নাম রানু। সুন্দরী, শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী৷ কিন্তু আবিরের জীবনে অনন্যার অভাব অপূরণীয়।
রানু সবসময় গোমরা মুখে থাকতো। তাকে দেখে মন ভালো হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না উল্টা মনখারাপ হতো। ইফাত অনন্যার সাথে যেমন দূর্ব্যবহার করতো, রানুর সাথেও তেমনই করতো। সে ইফাতের অত্যাচারে অসহ্য হয়ে উঠছিল দিন দিন। সেটা আবির বুঝতো। কিন্তু অনন্যা ছিল অন্যরকম। শত কষ্টের পরেও আবিরের কাছে এলে তার চোখ ঝলমল করতো। মুখে হাসি জ্বলজ্বল করতো। সে আবিরের কাছে মায়ের চেয়েও দামী ছিল।
একদিন আবিরকে নিয়ে হলে সিনেমা দেখতে গেলেন ইফাত। প্রথমবারের মতো সারাদিন বাবা-ছেলে ঘুরল, শপিং করল, আবিরের প্রিয় বই, ভিডিও গেইম, বাই- সাইকেল কেনা হলো। রাতে তারা একসঙ্গে ডিনার করল একটা রেস্টুরেন্টে। ইফাত ছেলেকে প্রশ্ন করলেন,” তোমার আর কি লাগবে বাবা? আমাকে বলো। আমার ছেলের হাসি ফিরিয়ে আনার জন্য যদি পৃথিবীর সবচেয়ে দামী জিনিসও আনতে হয় আমি এনে দিবো।”
আবির গম্ভীর গলায় বলল,” অনন্যা আন্টিকে লাগবে।”
এই কথা শুনে ইফাতের মাথা গরম হলেও সেটা তিনি প্রকাশ করলেন না। ছেলের সামনে হেসে ফেললেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,” আচ্ছা, তোমার কাছে দু’টো অপশন। প্রতিদিন আমার সাথে এভাবে সময় কাটাতে পারবে নয়তো শুধু অনন্যা আন্টির কাছে চলে যেতে হবে। কোনটা?”
আমীর অকপটে বলল,” আমি অনন্যা আন্টির কাছে যেতে চাই।”
” ভেবে বলছো? তাহলে কিন্তু বাবাকে আর কোনোদিন দেখবে না।”
” সমস্যা নেই।”
বিস্ময়ের সীমা রইল না ইফাতের। আশ্চর্য হয়ে তিনি ভাবলেন ছেলে এখন আর তাঁকে আগের মতো চায় না। আবিরের জল্পনা-কল্পনা জুড়ে রয়েছে শুধুই অনন্যা। এমন হবে তিনি কখনও কল্পনা করেননি।আবিরকে স্বাভাবিক করার জন্য তিনি অনন্যাকে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছিলেন।
আবিরের জীবনে স্বপ্নের মতো ছিল সেই দিনটি। তার জন্মদিনের সকাল। বাবা বললেন একটা সারপ্রাইজ আছে। আবির নিচে নামতেই সারপ্রাইজ হিসেবে দেখল অনন্যা বসে আছে তাদের লিভিংরুমে। আবিরের খুশির সীমা রইল না। অনন্যাকে জড়িয়ে ধরে আকুল কণ্ঠে বলল,” আন্টি, আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি। আর কখনও আমাকে ছেড়ে যেও না প্লিজ। ”
” যাবো না বাবা।”
“প্রমিস করো যে আর যাবে না!”
শব্দ করে কেঁদে উঠল অনন্যা। আবিরকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,” কখনও যাবো না। এবার শুধু মৃত্যুই পারবে আমাদের আলাদা করতে। ”
সেদিন গভীর রাতে অনন্যা খুব বীভৎস একটা স্বপ্ন দেখল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শুধু অনন্যাকে আঘাত করে যাচ্ছেন ইফাত। তার আর্তচিৎকারে বাগানের গাছগুলোও যেন হাহাকার করে উঠছিল। ওই সময় হাতে একটা পিস্তল নিয়ে ছুটে আসে আবির। অনন্যা বাঁধা দেওয়ার আগেই সে তার বাবাকে শ্যুট করে।
চোখের পলকেই সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বদলে যায়। চারদিকে তখন শো শো বাতাস শুরু হয়েছে। মেঘের গর্জনের কাছে প্রকৃতি নিস্তব্ধ। অনন্যা দেখল তার সামনে মৃত লাশ হয়ে পড়ে আছেন ইফাত রহমান। আবির তার ছোট্ট হাত দিয়ে বড় একটি পিস্তল সুনিপুণভাবে ধরে আছে। তার দুই চোখ রক্তিম। আচম্বিত বিদ্যুৎ চমকের আলোয় আবিরের হিংস্র মুখখানা কি ভয়াবহ করুণ! গা শিউরে ওঠার মতো এই দৃশ্য দেখে আহত, রক্তা-ক্ত অনন্যা চিৎকার করে উঠল। তারপর সে বুঝতে পারে পুরোটাই দুঃস্বপ্ন ছিল। আবিরের ঘরে দৌড়ে ছুটে গেল সে। ঘুমিয়ে আছে আবির। কিছুক্ষণ আবিরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদল অনন্যা। তারপর সিদ্ধান্ত নিল, আবিরকে নিয়ে এখান থেকে পালাবে সে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
সেদিন বাড়িতে শুধু আবির আর অনন্যা ছাড়া কেউ ছিল না৷ ইফাত মৈত্রীকে নিয়ে একটা অ্যাওয়ার্ড ফাংশনে গেছেন৷ রানুও গিয়েছিল তাদের সাথে। কাজের লোকদের খাবারে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে ফেলল অনন্যা। তারপর আবিরকে ডেকে বলল,” চলো বাবা, আমাদের এখনি পালাতে হবে।”
আবির ঘুমো ঘুমো চোখে চেয়ে দেখল অনন্যার হাতে একটা বিশাল ব্যাগ। নিজেরসহ আবিরের জিনিসপত্রও গুছিয়ে নিয়েছে সে। আবির প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিল না। তারা কেন পালাবে? অনন্যা বলল,” এখান থেকে না পালালে তোমার জীবনটা শেষ হয়ে যাবে, বাবা৷ আমার সোনা বাবা, চলো আমরা চলে যাই। এই জাহান্নামে তোমাকে আমি রাখব না। তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবো।”
অনন্যার কান্না-কাটি দেখে আবিরের মন গলে যায়। সে পালাতে রাজি হয়। মায়ের প্রতি আবিরের অভিমান তখন অনেকটা কমে এসেছিল। তার বাবার মতো মানুষের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয় বলেই মা চলে গেছে সেটা আবির এখন বোঝে। তাই মাকে সে ক্ষমাও করে দিয়েছে। অনন্যা প্রথমে আবিরকে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়৷ কিন্তু সেখানেও গার্ড পাহারা দিচ্ছে। তাই রিস্ক নিয়ে তারা দু’জন ছাদে গিয়ে সেখান থেকে দড়ি ফেলে নামার পরিকল্পনা করে। আবির সহজেই নেমে যেতে পারল। কিন্তু অনন্যা নামার সময় দড়ি ছিঁড়ে যায় আর সে ভয়ে চিৎকার করে ফেলে। তখনি একজন গার্ড হুইসেল বাজায় আর দু’জন বডিগার্ড পিস্তলসহ বাংলো থেকে বেরিয়ে আসে।
ইফাত ফিরে এসে যখন সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে পারলেন তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রচন্ড রেগে গেলেন।অনন্যার চুলের মুঠি ধরে অকথ্য ভাষায় গালা-গাল দিয়ে তাকে প্রহার করতে লাগলেন। ভীষণ জোরে পেটে লাথি মারলেন। আবিরের সামনেই গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে অনন্যাকে অমানুষিক নির্যাতন করতে লাগলেন। অনন্যা মিনতি করে বলল,
” দোহাই আপনার। ছেলেটাকে এখান থেকে নিয়ে যান। ও এসব সহ্য করতে পারছে না।”
দু’জন আবিরকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল। নিজের ঘর থেকেও আবির শুনতে পাচ্ছিল কি নিষ্ঠুরভাবে অনন্যাকে আঘাত করছেন ইফাত। তার প্রতিটি আর্তচিৎকার আবিরের শরীরের রোমকূপে ফলার মতো বিঁধে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার রূপ নেয়। সহ্য করতে না পেরে আবির যখন ঘর থেকে বের হতে যাবে তখন দেখল বাইরে থেকে দরজা আটকানো। আবিরের হাত-পা থরথর করে কাঁপতে থাকে। চোখ-মুখের রঙ বদলে যায়। সেই তীব্র অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনন্যা সকালে মৃত্যুবরণ করে। কি নিদারুণ ভয়ংকর সেই মৃত্যু! আবির কিছুই করতে পারেনি সেদিন।
তারপর সবকিছু বদলে যায়। অনন্যার মৃ-ত্যু নিয়ে কেউ টু-শব্দটিও করে না। বাড়ির পাশে অনন্যার কবরস্থান তৈরী হয়। সবাই জানল অসুস্থতার কারণে মা-রা গেছে সে। আবির খুব স্তব্ধের মতো হয়ে যায়। প্রয়োজন ছাড়া নিজের ঘর থেকেও বের হতো না। কল্পনায় অনন্যাকে দেখতে পেতো। একদিন ইফাত আবিরের ঘর দিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করলেন আবির কারো সাথে কথা বলছে। অথচ তার ঘরে কেউ নেই। ইফাত আবিরের নাম ধরে ডাকতেই সে নিশ্চুপ হয়ে গেল।
ইফাত দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। আবির গাঁট হয়ে বসে আছে বিছানায়। ইফাত তার পাশে বসে প্রশ্ন করলেন,” অনন্যার মৃ-ত্যুর জন্য কি তুমি আমাকে দায়ী করো?”
আবির কোনো জবাব দিল না। ইফাত বললেন,” আমার ছেলেকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল ও৷ তোমাকে কোথাও বিক্রি করে দিতো। ও একটা ক্রিমিনাল। ওকে বাঁচিয়ে রাখা কি ঠিক? আমার উচিৎ ছিল তখনি ওকে মে-রে ফেলা। কিন্তু আমি সেটা করিনি। ওর মৃ-ত্যুটা ন্যাচরাল। কোনো হ-ত্যাকান্ড নয়৷ কিন্তু তোমার আচার-ব্যবহারে মনে হচ্ছে তুমি আমাকে খু-নী ভাবছো।”
আবির স্বাভাবিক স্বরে বলল,” আমি তোমাকে খু-নী ভাবছি না বাবা।”
ইফাত ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,” শুয়ে পড়ো। তুমি চাইলে আজকে আমি তোমার সাথে থাকতে পারি।”
” লাগবে না। আমার সাথে অনন্যা আন্টি থাকবে।” আবির প্রতিটি কথা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলছিল। ইফাত হতবাক হয়ে বলে উঠলেন,” অনন্যা আন্টি থাকবে মানে? নির্বোধের মতো কথা বলছো কেন? সে তো মা-রা গেছে।”
” মা-রা যায়নি।”
ইফাত আর এই ব্যাপারে কথা বাড়ালেন না। আবিরের ঘরের লাইট বন্ধ করে দরজা ভিঁড়িয়ে চলে গেলেন। সকালে উঠে আবির খুব সতর্কতার সাথে ইফাতের গাড়ির ব্রেইক ফেইল করে দিল। সেই গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার পর ভয়াবহ এক্সিডেন্ট ঘটে। ইফাত প্রায় তেরোদিন হসপিটালে ভর্তি ছিলেন।
চলবে
®Sidratul মুন্তায
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৮.
তেরোদিন পর ইফাতকে বাড়ি আনা হলো। এর মধ্যে একবারও আবির হাসপাতালে বাবার সাথে দেখা করতে যায়নি। বাড়ি ফিরে ইফাত নিজেই ছেলের সাথে দেখা করতে চাইলেন। দুপুরে লাঞ্চের সময় আবিরকে ডেকে পাঠানো হয়। অনেকদিন পর আবির ডাইনিংরুমে বাবার সাথে খেতে বসল। রানু আবিরকে খাবার বেড়ে দিতে নিলেই ইফাত বললেন,” উহুম। লাগবে না৷ তুমি যাও। আমার ছেলেকে আমি নিজে বেড়ে খাওয়াবো।”
রানু চলে যায়। ইফাত আবিরের পছন্দের চিংড়ীর মালাইকারী পাতে তুলে দিয়ে বললেন,” খাও বাবা, কতদিন তোমাকে নিজের সামনে বসিয়ে খাওয়াই না।”
আবির খাবারে হাতও লাগাল না। মুখে নেওয়া তো দূর। ইফাত ভ্রু কুচকে বললেন,” খাবার ভালো লাগেনি? তোমার সব পছন্দের আইটেম করতে বলেছি। খাও বাবা৷ রোস্ট দিবো?”
আবির দুইপাশে মাথা নাড়ল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,” আমার ক্ষিধে নেই।”
” ক্ষিধে নেই কেন?”
আবির চুপ করে রইল। ইফাত রেগে বললেন,” তুমি কি ভাবছো আমি তোমার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছি?”
এবারও কোনো কথা বলল না আবির।মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইল শূন্যে। ইফাত দরাজ গলায় বললেন,
“তোমার মতো আহাম্মক না আমি যে নিজের ছেলেকে মে-রে ফেলতে চাইবো। তোমাকে আমি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি৷ আর তুমি সামান্য একটা কাজের লোকের জন্য আমাকে মে-রে ফেলতে চাও? সিসিটিবি ফুটেজে দেখা গেছে সেদিন গাড়ির ব্রেইক ফেইল তোমার জন্য হয়েছিল। এইযে এক্সিডেন্টের পর আমি এতো সাফার করলাম এই সবকিছুর জন্য তুমি দায়ী। প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হয়েছে তোমার? যদি আমি সেদিন ম-রে যেতাম তাহলে তোমার কি হতো ইডিয়েট?এই পৃথিবীতে বাবা ছাড়া বেঁচে থাকা কত কঠিন সেটা যাদের বাবা নেই তারা জানে৷ আর তুমি তোমার বাবাকেই মে-রে ফেলতে চাও সামান্য একটা কাজের লোকের জন্য!”
আবিরের চোখ-মুখ অন্যরকম হয়ে উঠল। সে রক্তিম দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে দৃঢ় গলায় বলল,” অনন্যা আন্টি কাজের লোক না।”
ইফাত রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সজোরে আবিরের গালে একটা থাপ্পড় মা-রলেন। গালে থাপ্পড় নিয়ে তৎক্ষণাৎ টেবিল থেকে উঠে চলে গেল আবির। ইফাত কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে কপালে হাত রাখলেন। আবিরকে আঘাত করে তিনি আবার একটা ভুল করেছেন।
দিন দিন গাঢ় বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে ইফাতকে। ছেলের সঙ্গে তৈরী হওয়া দূরত্ব তিনি মেটানোর চেষ্টা করেন কিন্তু আবিরের দিক থেকে কোনো সাড়া আসে না।মৈত্রীও তার কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত৷ মাঝে মাঝে তার সাথে বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামে শোপিস হিসেবে যাওয়া ছাড়া অন্যকোনো কাজই যেন নেই ইফাতের। একদিনের ঘটনা-
বাংলোটি নিঝুম, নীরব। ঈদের ছুটিতে সব কাজের লোক ছুটিতে। শুধু রানু আছে। মৈত্রী ছিল তার শ্যুটিং-এ। সময় সন্ধ্যা। ইফাত নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছেন। হঠাৎ কারো পায়চারীর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ইফাত চোখ মেলে দেখলেন আবির একটা ধারালো ছুরি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার ঘন পাপড়িতে আবৃত চোখ দু’টি কি ভয়ংকর রক্তিম! প্রচন্ড ভয়ে হাত-পা অসাড় হয়ে আসে ইফাতের। এসির বাতাসেও ঘামতে লাগলেন তিনি। বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠতেই রানু ছুটে এলো। ইফাতকে ঠান্ডা পানি খেতে দিয়ে বলল,
” কি হয়েছে স্যার? আপনি ঠিকাছেন?”
ইফাত প্রবল আতঙ্ক নিয়ে উচ্চারণ করলেন,” আবির এসেছিল। আবির… ও ছুরি কোথায় পেল? ওর হাতে কে ছুরি দিয়েছে?”
রানু হতভম্ব হয়ে বলল,” আবির কিভাবে আসবে? ও তো ওর ঘরে ঘুমায়।”
ইফাত তৎক্ষণাৎ আবিরের ঘরে ছুটে গেলেন। আসলেই ঘুমাচ্ছিল আবির। তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। পুরোটাই তাহলে কল্পনা ছিল। কিন্তু কোনো কল্পনা এতো ভয়ংকর কি করে হতে পারে? তারপর থেকে ইফাতের জীবন দূর্বিসহ হতে শুরু করে। বছরের পর বছর কেটে যায় কিন্তু তাঁর ভয় কমে না। চারবছরে মৃ-ত্যুভয় তাঁকে এমনভাবে গ্রাস করে নেয় যে তিনি মানসিক রোগীতে পরিণত হলেন।
গল্পের এই পর্যায়ে স্নেহা আপু হাসতে হাসতে আমাকে বলল,” সেদিন আসলেই আবির এসেছিল এবং এরপর থেকে সবসময় আসতো। কিন্তু ইফাত আঙ্কেল ভাবতেন কল্পনা। পুরো ব্যাপারটাই রানু আন্টি আর আবিরের প্ল্যান ছিল। ইফাত আঙ্কেলকে মেন্টাল প্রেশার দেওয়ার জন্য৷।”
আমি কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম,” আমীর স্যার কি উনার বাবাকে সত্যি খু-ন করেছিলেন?”
” সেই প্রসঙ্গে আসার আগে একটা প্রশ্ন করি তোকে। তোর তো অনেক বুদ্ধি। আমীরের মা বেঁচে আছে নাকি ম-রে গেছে অনুমান করে বলতো!”
স্নেহা আপু প্রশ্নটা করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
” এটা আমি কি করে অনুমান করব?” বিস্মিত হলাম। স্নেহা আপু স্মিত হেসে বলল,” ঘটনাটা মনোযোগ দিয়ে শুনলে আর একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারতি আমীরের মা হলো অনন্যা আন্টি।”
বিস্ময়ে আমার দুই ঠোঁট নিজস্ব শক্তিতে আলাদা হয়ে গেল। উচ্চারণ করলাম আশ্চর্য হয়ে,” কি?”
” হুম। একটু ভেবে দ্যাখ, অনন্যা আন্টি যখন আমীরকে নিয়ে পালাতে যাচ্ছিল তখন কিন্তু সে বলেছিল আমীরকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাবে। অথচ আমীরের মায়ের খোঁজ কেউ জানতো না। অনন্যা আন্টি কি করে জানল?”
অবাক বিস্ময়ে আমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলাম। আপু বলে গেল,” ইফাত আঙ্কেল কেন অনন্যা আন্টিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল জানিস? যাতে আমীর এই সত্যি কোনোদিন জানতে না পারে।”
” কিন্তু কেন? আমীর স্যারকে কেন জানতে দেওয়া হয়নি? আর অনন্যা আন্টি কখনও তাকে বলেনি কেন যে সে-ই তার মা?”
স্নেহা আপু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,” অনেক কারণ থাকতে পারে ফীহা। প্রথমত অনন্যা আন্টি ইফাত আঙ্কেলের ভয়ে মুখ খুলেনি। আর সে ছিল সাধারণ একজন রক্ষিতা। তার সামাজিক কোনো পরিচিতি ছিল না। ইফাত আঙ্কেল বিখ্যাত মানুষ। অনন্যা আন্টিকে আমীরের মা হিসেবে পরিচয় দিতে গেলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠতো। আর তিনি এতোটাও মহৎ মানুষ না যে রক্ষিতাকে বিয়ে করে স্ত্রীর পরিচয় দিবেন। তাই সহজ উপায় ছিল মিথ্যা গল্প বানানো। আমীরের মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে এমন একটা গল্প প্রচার করে তিনি পাবলিকের সিমপ্যাথি আদায় করলেন আবার ছেলেকেও নিজের ন্যাওটা বানাতে পারলেন। অনন্যা আমীরকে জন্ম দিয়েও তার মায়ের সম্মান পেল না। তাকে পরিচয় পেতে হলো বেতনভুক্ত আয়া হিসেবে।”
আমি তাকিয়ে আছি স্তব্ধ হয়ে। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগল আমার। কিছুক্ষণ পর প্রশ্ন করলাম,” ইফাত আঙ্কেল রক্ষিতার গর্ভে নিজের সন্তানকে জন্ম দিলেন কেন?”
“কারণ তার উত্তরাধিকারীর প্রয়োজন ছিল। কোনো সন্তান না থাকলে অঢেল সম্পদের মালিক কে হবে?”
আমি দেয়ালে মাথা ঠেঁকালাম। কত নির্মম এই অদৃষ্ট!
” আমীর স্যার কি এই সত্যি জানে?”
স্নেহা আপু আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গল্পের বাকি অংশ বলতে শুরু করল,” দিন দিন ইফাত আঙ্কেল মানসিক রোগীর ন্যায় আচরণ শুরু করেন। একা থাকলেই তিনি আবিরকে দেখতে পেতেন। আবির তাকে মা-রতে আসছে। কখনও তার হাতে পিস্তল থাকে, কখনও চাপাতি, কিংবা মোটা দড়ি। মৈত্রী তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করায়। ডাক্তার বললেন কিছুদিন থাকলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানেই তার মৃ-ত্যু ঘটে। সবাই ধরে নেয় হ্যালুসিনেশন থেকে তিনি আত্ম-হত্যা করেছেন। কিন্তু সেটা আসলে মার্ডার ছিল।”
আমি আৎকে উঠে জানতে চাইলাম,” কিভাবে? আমীর স্যার মার্ডার করেছেন?”
স্নেহা আপু কঠিন মুখে বলল,” সেই কাহিনী আমি তোকে বলব না। সেটা গোপনই থাকুক।”
” আমীর স্যার কি জানতে পেরেছিলেন যে অনন্যাই তার মা?”
” মৃত্যুর আগে ইফাত আঙ্কেল বলতে চেয়েছিলেন। ”
ইফাতকে যেদিন মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হবে সেদিন তিনি গোপনে আবিরের সাথে কথা বলতে চাইলেন। আবিরের তখন ষোল বছর। সারাক্ষণ সে পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত। সে এতো শান্ত-শিষ্ট আর সরল ছিল যে কেউ তার বিরুদ্ধে ভয়ংকর অভিযোগ বিশ্বাসই করবে না। ইফাত সাহেব প্রশ্ন করলেন,” আমাকে খু-ন করতে চাও?”
আবির কোনো কথা বলল না। ইফাত হাসিমুখে বললেন,” আমাকে মে-রে ফেললে তুমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করবে। তোমার মা কোথায় আছে সেটা তুমি এখনও জানো না। নিশ্চয়ই তুমি তোমার মাকে খুঁজে পেতে চাও। আমি তোমাকে তোমার মায়ের খোঁজ দিবো। কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে যে তুমি আমার কোনো ক্ষতি করবে না।”
স্নেহা আপু থামল। আমি উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলাম,” আমীর স্যার কি করলেন তখন? রাজি হয়ে গেলেন?”
” না। আবির প্রতিশোধ নিতে এতোই মরিয়া ছিল যে বাবার কোনো কথাই সে গ্রাহ্য করেনি। আমার মনে হয় এটাই ঠিক হয়েছে। কারণ ইফাত সাহেব কোনোদিনও সত্যিটা আমীরকে জানতে দিতেন না। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন নতুন কোনো মহিলাকে আমীরের মা সাজিয়ে আনবেন। কারণ আসল সত্যি জানতে পারলে আবির আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠতো।”
আমি চোখের জল মুছে বললাম,” ঠিক বলেছো। এর মানে এখনও আমীর স্যার সত্যিটা জানে না!”
আপু এবারও আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে বলল,” ইফাত আঙ্কেলকে হ-ত্যা করার পর আবির নিজেই পুলিশের কাছে যায় সাইরেন্ডার করতে। তাকে কিছুদিন কাস্টাডিতে রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ রানু পরিচিত উকিল দিয়ে প্রমাণ করেছিল আবির মানসিকভাবে অসুস্থ। তাছাড়া সব প্রমাণই বলছিল এটা আত্ম-হত্যা। কেউ বিশ্বাসই করেনি এইটা মার্ডার কেইস হতে পারে। আবিরকেও মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। তারপর থেকে আবিরের জীবন পরিবর্তন হতে শুরু করে। মৈত্রী বিদেশে চলে যায়। আবির তার নাম বদলে ফেলে। বাবার সাথে জড়িত সমস্ত কিছু মুছে ফেলে। বাড়ির পাশে অনন্যার কবরস্থানটা বড় করে তৈরী হয়। অতীত আমীরের জীবনের অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। এখন তার একটা বিশেষ লক্ষ্য হলো নিজের মাকে খুঁজে বের করা। সে তার মাকে কোনোদিন দেখেনি। তাই কখনও খুঁজে পেলেও চিনবে কেমন করে? ”
” কিন্তু তুমিই তো বললে আমীর স্যারের মা অনন্যা আন্টি!”
” এটা তো আমীর জানে না।সে যদি জানে তাহলে আমাদের বিয়েটা অর্থহীন হয়ে যাবে। আমি তাকে এটা জানাবো না। সে তার মাকে খুঁজে পেতেই আমাকে বিয়ে করছে।”
আমি ক্ষীপ্ত হয়ে বললাম,” নিজের স্বার্থের জন্য উনার সাথে এতোবড় অন্যায় তুমি করতে পারো না। তার সবকিছু জানার অধিকার আছে। আমি তাকে সব জানাবো।”
” যদি ওর ভালো চাস তাহলে তুইও ওকে কিছু জানাবি না।”
” মানে? কি বলতে চাও?”
” তুই কি জানিস আমীর কেন বেঁচে আছে? শুধু ওর মাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। সবার জীবনেই একটা লক্ষ্য থাকে। আমীরের বেঁচে থাকার কারণ তার মা। যেদিন থেকে সে জানতে পারবে তার মা মা-রা গেছে, সেদিন থেকে সে নিজেও আর বাঁচতে চাইবে না।”
আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম,” কি বলছো এসব! তিনি কেন বাঁচতে চাইবেন না? আমি তাকে ভালো রাখবো।”
” তুই তাকে ভালো রাখলেও সে তোকে ভালো রাখতে পারবে না। কারণ আমীর শারীরিকভাবে একজন অক্ষম পুরুষ।”
আমি অবিশ্বাসী কণ্ঠে আওড়ালাম,” মিথ্যা বলছো তুমি।”
আপু সামান্য ঝুঁকে এসে বলল,” সেদিন রাতে আমীরের ঘর থেকে আমাকে কেন ফিরে আসতে হয়েছিল জানিস? এটাই তার একমাত্র কারণ। তোর কি ধারণা… আমার মতো সুন্দরীকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কোনো স্বাভাবিক পুরুষের আছে?”
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। প্রচন্ড আঘাত পেলাম। আপু উঠে দাঁড়িয়ে বলল,” সে অক্ষম জেনেও আমি তাকে বিয়ে করছি।এটা কি আমার মহানুভবতা নয়?”
আমার আপুর মধ্যে আরও একটা স্পেশাল পাওয়ার আছে। সে ভালো ব্রেইন ওয়াশ করতে পারে। আমাকেও সে ব্রেইন ওয়াশ করেছিল। যে কারণে আমি তাদের বিয়েতে কোনো রকম বাঁধা প্রদান করিনি সেদিন। আর আমীর স্যারকে সত্যিটা আমি আজও জানাতে পারিনি।
তোহা ডায়েরী বন্ধ করে একদৌড়ে ছুটে গেল বাইরে। সকাল প্রায় হয়ে এসেছে। কবরস্থানে স্থানুর মতো এখনও বসে আছে আমীর। তোহা আরেকটু কাছে যেতেই বুঝল, আমীর ঘুমাচ্ছে। শুকনো মাটির উপর মাথা ঠেঁকিয়ে কি নিশ্চিন্তের ঘুম! তার হাতের মুষ্টিতে তার চশমাটা। তোহা কবরের পাশে সাইনবোর্ডটির দিকে তাকাল। ” অনন্যা চৌধুরী” নামটা জ্বলজ্বল করছে বোর্ডে। কিছুসময় নিষ্পলক নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকতেই টলমল হয়ে এলো তোহার দৃষ্টি। কৃষ্ণচূড়ার গাছ কবরটিকে ছাউনির মতো ঘিরে রেখেছে। লাল লাল রক্তের মতো কৃষ্ণচূড়ার কোমল পাপড়ি এসে পড়েছে আমীরের নির্মল মুখে। কি দারুণ দেখাচ্ছে। তোহা দুইহাতে চোখের জল মুছে বসল আমীরের পাশে।
চলবে
® Sidratul মুন্তায
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
১৯.
তোহা দুইহাতে চোখের জল মুছে আমীরের পাশে বসল। তার ওই নিটোল, নিষ্প্রভ ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে থেকে কান্না পেয়ে গেল অচিরেই। এতোদিন নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে হতভাগী বলে ভেবে এসেছিল সে। কিন্তু এখন আমীরের অতীত জেনে মনে হচ্ছে তার চেয়েও হতভাগা আরও আছে। আমীর তো মৃ-ত্যুর আগে মাকে একবার মা বলেও ডাকতে পারেনি। নিজের মায়ের মৃ-ত্যু স্বচক্ষে দেখেও কিছু করতে পারেনি। তার শৈশব কে-টেছে মায়ের আর্তনাদ শুনে। আর জীবনের অর্ধেক সময় কে-টে যাচ্ছে সেই মাকে খুঁজে পেতে অথচ সে জানেও না তার মা এই নিস্তব্ধ কবরেই শুয়ে আছে। এর চেয়ে হতভাগা কি আর কেউ হতে পারে?
আচ্ছা, যখন আমীর জানবে তার মা বেঁচে নেই, চিরদিনের জন্য দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে বহু আগেই তখন কি অবস্থা হবে তার? এই কথা কল্পনা করেই আরও বেশি কান্না পায় তোহার। নিজেকে সামলাতে ডানহাতটা মুখে চেপে ধরল। টুপটুপ করে দুই চোখ বেয়ে অশ্রু পড়ছে। বামহাতটা নিয়ে আমীরের মাথার উপর রাখল সে। এতো মায়া লাগছে কেন এই মানুষটির জন্য? প্রিয় মানুষ হারানোর দুঃখ তোহার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। সেজন্যই হয়তো আমীরের কষ্টটা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারছে সে। ইশ, যদি পারতো পৃথিবী লন্ড-ভন্ড করে হলেও আমীরের জীবনের সব দুঃখ মুছে দিতো। করুণাময়ের কাছে এই মুহূর্তে তোহা শুধু একটাই প্রার্থনা করল, সে যেন এই মানুষটার সব কষ্ট মুছে দিতে পারে। কেন এতো গভীর মায়ায় মন ব্যাকুল হয়ে উঠছে এই লোকটার জন্য? তোহা খুব যত্নে আমীরের মাথায় হাত বুলাতে লাগল। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো রানুর ডাক,” আবির, বাবা কোথায় তুই?”
রানু আবিরের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে এদিকেই আসছে হয়তো। আমীরের ঘুম ভেঙে গেল। তোহা ত্বরিতে নিজের হাতটা সরিয়ে নেয়। কিন্তু এর আগেই আমীর লক্ষ্য করে ফেলল যে তোহার হাতটা তার মাথার উপর ছিল। আশ্চর্য হয়ে ভ্রু কুঞ্চিত করল আমীর। তোহা চোখের জল আড়াল করতে অন্যদিকে ঘুরে যায়। আলগোছে চোখের পানিটাও মুছে নিল খুব দ্রুত। আমীর মাথা তুলে বুঝতে পারল গতরাতে এখানেই শুয়ে পড়েছিল সে৷ ঘাড়ের একপাশে ব্যথা করছে। একহাতে ঘাড় মালিশ করতে করতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তোহার দিকে তাকালো সে। চশমা চোখে নিয়ে প্রশ্ন করল,” তুমি এখানে কি করছো?”
তার জলদগম্ভীর কণ্ঠ শুনে তোহা থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। কি উত্তর দিবে এখন? এতোটা আবেগী হয়ে উঠেছিল যে অন্যকিছু খেয়ালও নেই৷ আমীর কোনো উত্তর না পেয়ে রাগী কণ্ঠে বলল,” কথা বলছো না কেন?”
তোহা আমতা-আমতা করে নিচু গলায় উত্তর দিল,” আপনি এখানেই শুয়ে পড়েছিলেন তাই ডাকতে এসেছিলাম যদি…”
আমীরের কণ্ঠ আরও তীব্র হয়ে উঠল,”তোমাকে আমার ব্যক্তিগত বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম। কি সমস্যা তোমার? আমি যেখানেই শুয়ে পড়ি দ্যাটস নান অফ ইউর বিজনেস।”
” আমার চিন্তা হচ্ছিল আপনার জন্য….”
” আমার জন্য কেন এতো চিন্তা তোমার? আমি কি বলেছি আমার জন্য চিন্তা করো?”
তোহা আমীরের প্রতিটি গর্জনে কেঁপে কেঁপে উঠছে। অন্যকেউ হলে নিঃসন্দেহে কঠিন গলায় কিছু একটা শুনিয়ে দিতো। চুপচাপ কটূ বাক্য হজম করার মেয়ে সে নয়। কিন্তু আমীরকে কিছু বলতে পারছে না কেন? আমীর উঠে দাঁড়িয়ে তোহার হাত টেনে তাকে নিজের দিকে ঘুরালো। তোহার চোখ দু’টি আটকে গেল আমীরের চশমার আড়ালে ঢাকা গভীর কালো রহস্যজালে। গা শিরশির করে উঠল হঠাৎ। ওই ভয়ংকর দৃষ্টি কাছ থেকে দেখলেই তোহা খেই হারিয়ে ফেলে, সুর কে-টে যায়, ঘোর লেগে যায়। আমীর থমথমে শীতল কণ্ঠে বলল,” আমার থেকে দূরে থাকো। কারণ আমি খুব ডেঞ্জারাস।”
এই কথা বলেই তোহাকে ঝটকা মেরে সরিয়ে গটগট করে হেঁটে গেল সে। রানু তখনি এসে দাঁড়ালো আমীরের সামনে। পেছনে তোহাকে দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে বলল,” ওমা, তোরা দুইজনই এইখানে? আমি তো সারা বাড়ি তন্ন-তন্ন করে খুঁজছিলাম৷ তোদের না দেখে ভয় পেয়ে গেলাম।”
তোহা মাথা নিচু করে আছে। তার চোখে বিন্দু বিন্দু জল। দূর থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। আর আমীর কোনো কথা বলল না। দু’জনকেই নিশ্চুপ দেখে রানু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,” নাস্তা করবি আয়। তোহা তুমিও আসো মা।”
আমীর রাশভারী কণ্ঠে বলল,” আমাকে বাসায় যেতে হবে রানু আন্টি। এখন নাস্তা করব না।”
সাথে সাথেই তেতে উঠল রানু। চোখ পাকিয়ে বলল,” এতো কিসের যাওয়ার তাড়া? আমার বাড়িতে এসেছিস, আমার মর্জি মতো চলতে হবে। আরেকবার যাওয়ার কথা বললে কিন্তু মারব। লাঞ্চ করে বিকালের দিকে যাবি একদম।”
আমীর বিরক্তি নিয়ে উচ্চারণ করল,” কি আশ্চর্য! ”
” আশ্চর্যের কিছু নেই। মেইন গেইট তালা দিয়ে চাবি লুকিয়ে রেখেছি। দেখি কিভাবে বের হোস তুই।”
” সত্যিই মেইন গেইট তালা দিয়ে রেখেছো নাকি?” আমীর বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল। রানু হাসতে হাসতে বলল,” ভেতরে চল।”
নাস্তার টেবিলে বসে মুখ ফুলিয়ে রাখল তোহা। আমীর তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছে। তাকে দ্রুত উঠতে হবে। অন্যকোনো দিকে তাকানোর সময়ই তার নেই। রানু রান্নাঘর থেকে গরম গরম রুটি সেঁকে এনে তোহার প্লেটে দিল। তোহা সাথে সাথেই বলল,” আমার ক্ষিধে নেই আন্টি। পরে খাবো।”
এই কথা শুনে আমীর এক ঝলক তাকাল তোহার দিকে। তারপর আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। রানু উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,” কি হয়েছে মা? মনখারাপ নাকি? আবির আবার কিছু বলেছে তোমাকে?”
তোহা আঁড়চোখে আমীরের দিকে তাকিয়ে বলল,” সেরকম কিছু না।”
” তাহলে খাবে না কেন? রাতেও তেমন কিছু খাওনি তুমি। ক্ষিধে নেই বললেই আমি বিশ্বাস করব নাকি? কি হয়েছে বলো?”
তোহা কথা বলল না। আমীর বলল,” খেতে না চাইলে জোর করার কি দরকার আন্টি? বাদ দাও।”
তোহা এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল,” আমি যাচ্ছি।”
রানু সঙ্গে সঙ্গে তোহার হাত টেনে ধরল। চোখ বড় করে বলল,” বসো। বুঝেছি আবার আবিরের সাথে কিছু হয়েছে তোমার। সকালের ঘটনা তো আমি আর দেখিনি৷ এই আবির, তুই কি পেয়েছিস? বার-বার মেয়েটাকে রাগিয়ে দিবি আর ও না খেয়ে নিজের অবস্থা খারাপ করবে? এমন করলে তো এই মেয়ে অসুস্থ হয়ে যাবে। তুই কি মেয়েটাকে মা-রতে চাস?”
আমীর খুব আশ্চর্য হয়ে বলল,” আমি কি কাউকে খেতে নিষেধ করেছি? কি আজব!”
” তুই ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবি আর ও তোর বাড়িতে বসে গান্ডে-পিন্ডে গিলবে এমন তো হতে পারে না। এতো সস্তা পেয়েছিস নাকি? চুপচাপ স্যরি বল। নাহলে কিন্তু খবর আছে।”
আমীর নির্বিকার গলায় বলল,” স্যরি।”
তোহা অসন্তুষ্ট মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। রানু বলল,” হয়নি। ভালো করে বল।”
” আমি কি এখন ওর পায়ে পড়ব নাকি?” আমীরকে বিপর্যস্ত দেখালো।
তোহার হাসি পেয়ে গেল তার এমন গোবেচারার মতো মুখটা দেখে। দ্রুত হাসিটা মুছে নিয়েই বলল,” আমি এমন অহংকারী এপোলোজি এক্সেপ্ট করি না আন্টি। ভালো করে এপোলোজাইস করতে বলো।”
রানু দরাজ গলায় বলল,” শুনেছিস? ভালো করে এপোলোজাইস কর।”
আমীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুখে একটা মেকী হাসি আনার চেষ্টা করে বলল,” আই এম স্যরি। এবার যদি দয়া করে আপনি খেতে বসেন তাহলে আমি খুব ব্লেসড ফীল করব।”
রানু খিলখিল করে হেসে উঠল৷ তোহা মুখে আলতো হাসি আর আলতো গাম্ভীর্যতা নিয়ে বসল। রানু তার প্লেটে ভাজা ইলিশ মাছ দিল। তোহা অবাক হয়ে বলল,” রুটি দিয়ে ইলিশ মাছ কিভাবে খাবো?”
” ইলিশ মাছ এমনি খাও। আর রুটি দিয়ে সবজি খাও।”
” না আন্টি, আপনি আমাকে শুধু সবজিই দিন। এই মাছটা নিয়ে যান। আমি কাঁটা বাছতে পারি না।”
” বলো কি? আচ্ছা, আমি কাঁটা বেছে দিচ্ছি দাঁড়াও।”
তোহা আন্তরিক হেসে বলল,” সো সুইট অফ ইউ আন্টি। আপনি একদম আমার বাবার মতো।”
আমীরের শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো। রুটির টুকরো মুখে নিতে গিয়েও নামিয়ে রাখল। এক গ্লাস পানি খেয়ে উঠে যাওয়ার কথা ভাবছিল ঠিক তখনি রানু বলল,” আবিরকেও ছোটবেলায় এভাবে মাছের কাঁটা বেছে খাইয়েছি৷ তুমি জানো, তেরো বছর বয়সেও ও নিজের হাতে খেতে পারতো না। ওকে খাইয়ে দিতে হতো।”
তোহা হেসে উঠল,” তাই নাকি?”
” হুম। অনন্যা ওর অভ্যাসটা খারাপ করে দিয়ে গেছে। এতো আদর করতো ওকে…”
রানু থামল। আমীরের মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে। তোহা তাদের দু’জনের মুখের হঠাৎ পরিবর্তনের এই ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই খেয়াল করল। আমীর উঠে চলে যাচ্ছিল তখনি তোহা প্রশ্নটা করল,” অনন্যা কে?”
আমীর আবার থামল। রানু কিছু বলার আগেই সে শক্ত কণ্ঠে জবাব দিল,” কেউ না।”
এই বলেই দ্রুত লিভিংরুম ছেড়ে বের হয়ে গেল। তোহার চোখ টলমল করে উঠল অজান্তেই। কিছু মানুষ থাকে প্রচন্ড ইন্ট্রোভার্ট। তারা ভেতরে ভেতরে ক্ষত-বিক্ষত হবে, গুমরে ম-রে যাবে তাও কখনও মনের কথা শেয়ার করবে না। আমীর হলো ঠিক সেই ধাঁচের মানুষ। ডায়েরী না পড়লে হয়তো কখনোই তোহা জানতে পারতো না ওমন শক্ত-সমর্থ শরীরের ভেতরটা এতো ভঙ্গুর, এতো রক্তাক্ত!
রানু মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বলল,” খেয়ে নাও। এই ব্যাপারে আমীরকে আর প্রশ্ন কোরো না। মনে থাকবে?”
” মনে থাকবে আন্টি।” খাওয়া শেষ করে তোহা বাইরে বের হলো। আমীর দূরে একটা ফুলগাছের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। না চাইতেও তোহা শুনে ফেলল,” জাহাঙ্গীর আলমকে বসিয়ে রাখো সরব। আমি দ্রুত আসছি। নিজের হাতে তাকে শ্যুট করব। এর আগে কেউ কিছু করবে না।”
এমন ভয়ংকর কথা শুনে অচিরেই দাঁড়িয়ে পড়ল তোহা। শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। শৈশব আমীরকে অনেক বদলে দিয়েছে। তাই বলে সে সহজ-সরল জীবন ছেড়ে বেছে নেবে এমন নৃশংস জীবন? কেন? খুব আক্ষেপ নিয়ে তোহা তাকিয়ে রইল লম্বাটে মানুষটির দিকে। একটা স্বাভাবিক জীবনের জন্য একটা স্বাভাবিক অতীত থাকা খুব অপরিহার্য। আমীর হঠাৎ পেছনে ফিরতেই তোহাকে দেখে ফেলল। তোহা ভ্যাবাচেকা খেয়ে সরে যেতেই নিচ্ছিল। আমীর ডাকল,” শুনুন।”
তোহা থামল। আমীর প্রশ্ন করল,” কিছু বলবেন?”
তোহা কোমরে হাত গুঁজে বলল,” দেখুন, হয় তুমি না হয় আপনি। যেকোনো একটা বলে ডাকুন। একবার আপনি আরেকবার তুমি শুনে শুনে আমি কিন্তু সত্যিই অনেক কনফিউজড হয়ে যাচ্ছি।”
আমীর মুচকি হাসল। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,” কিছু বলতে এসেছিলে তুমি?”
তোহা এগিয়ে গেল। কৌতুহলী গলায় জানতে চাইল,” আচ্ছা, মানুষ মা-রা কি আপনার প্যাশন?”
আমীর গম্ভীর হয়ে গেল। অন্যদিকে চেয়ে কিছুটা রুক্ষ গলায় বলল,” না। কিন্তু যারা আমার আপন মানুষদের সাথে অন্যায় করে তাদেরকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারি না।”
” জাহাঙ্গীর আলম আপনার কি ক্ষতি করেছিল?”
” তুমি জেনে কি করবে?”
” এমনি। কৌতুহল।”
” সব বিষয়ে কৌতুহল থাকা উচিৎ না। অতিরিক্ত কৌতুহল মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে। ”
আমীর চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে তোহা বলে উঠল,” আমার বাবা আমার পৃথিবী ছিলেন। তাহলে আমারও কি উচিৎ তার খু-নিকে নিজ হাতে শাস্তি দেওয়া?”
দাঁড়িয়ে গেল আমীর। বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ওভাবেই। ধারালো একটা অপরাধবোধ খঞ্জরের মতো আঘাত করে গেল বিবেকের কাঠগোঁড়ায়। টনটন করে উঠল ভেতরটা। অন্তর্দহনে ছাড়খাড় হয়ে যাওয়া কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল,” তুমি তোমার বাবার খু-নিকে খুঁজে পেতে চাও?”
প্রশ্নটা করেই পেছন ফিরে তাকাল আমীর। তোহা স্পষ্টবাদীর গলায় বলল,”নিশ্চয়ই চাই। নিজহাতে খু-ন না করলেও অন্তত তাকে অভিশাপ দিতে চাই। যতটা কষ্ট আমি পেয়েছি তার চেয়েও দশগুণ কষ্ট যেন সে ফেরত পায়। ”
অসামান্য ক্রোধে ধিক করে জ্বলে উঠল তোহার দৃষ্টি। শক্ত হলো চোয়াল। আমীর কিছু বলতে নিচ্ছিল ঠিক তখনি মেইন গেইট খোলার আওয়াজ পাওয়া যায়। স্নেহা ভেতরে ঢুকছে তার পেছনে রাশেদ মাথা নিচু করে হাঁটছে৷ বাগানে আমীরকে দাঁড়ানো দেখতে পেয়েই দৌড়ে এদিকে এলো সে। তোহাকে যেন খেয়ালই করেনি এমন একটা ভাব ধরে আমীরকে জড়িয়ে ধরল। গালে চুমু দিয়ে বলল,” আই মিসড ইউ সো মাচ।”
তোহা পিছিয়ে এলো কয়েক পা। তারপর দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ল। স্নেহা আমীরের বুকে মাথা ঠেঁকিয়ে তোহার পালিয়ে যাওয়া দেখল। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে ধাক্কা মেরে সরালো আমীর। রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,” তুমি এখানে কি করছো?”
” কেন? আসতে পারি না আমি?”
চলবে
®Sidratul Muntaz