#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৩.
তোহা হতভম্ব কণ্ঠে বলল,” মেয়ে নিষেধ মানে? তাহলে আমি এই বাড়িতে কি করছি? আমি কি মেয়ে না?”
” আপনাকে স্পেশাল কন্ডিশনে রাখা হয়েছে, ম্যাডাম।”
বাইরে থেকে কেউ আওয়াজ দিল,” হাসান, তোমাকে স্যার ডাকছেন।”
তোহা এই কথা শুনে হাসানের আগে নিজেই বের হয়ে গেল। হাসানের মুখ আতঙ্কে নীল হয়ে উঠল।
” আপনি কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম?”
তোহার পেছন পেছন এলো তোহাকে থামানোর উদ্দেশ্যে। তোহা কোনো জবাব দিচ্ছে না৷ সোজা আমীরের ঘরে ঢুকে পড়ল। আমীর তোহাকে দেখে ভ্রু কুচকাল। মাড়িতে জীভ ঠেকিয়ে হাসানের দিয়ে তাকাল। হাসান অপরাধীর মতো বলল,” হঠাৎ করে ঢুকে গেছে স্যার। আমি আটকাতে পারিনি।”
আমীর হাসানকে ডেকেছিল তোহার ব্যাপারে জানার জন্য। তাই কোনো রকম উচ্চবাচ্য না করে শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,” ওকে। আমি হ্যান্ডেল করছি। তুমি যাও।”
হাসান বের হয়ে গেলেই তোহা তোতাপাখির মতো কথা বলা শুরু করল,” আপনি আমাকে অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন সেজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনার সব কথা আমাকে শুনতে হবে। এখানে আমার নিজেকে বন্দিনী মনে হচ্ছে। আমার বাবা কোথায়? তিনি কখন আসবেন?”
আমীর খুব ঠান্ডা স্বরে প্রশ্ন করল,” শুনলাম তুমি নাকি খাওয়া-দাওয়া কিছুই করছো না?”
তোহার মুখটা অভিমানে থমথমে হয়ে উঠল। হাত ভাঁজ করে অন্যদিকে তাকাল। ছোট্ট করে জবাব দিল,” না।”
আমীর এবার চেয়ারটা ঘুরিয়ে সরাসরি দেখল মেয়েটাকে। চোখ দিয়ে স্ক্যান করল কয়েক মুহূর্ত। বয়সে যুবতী হলেও কিশোরীর মতো ছিপছিপে ছোট্ট শরীর। চেহারার আদলে কোথায় যেন একটা ছেলেমানুষী ভাব। ঘাড় পর্যন্ত লম্বা, সিল্কি চুল। পাতলা গড়নের গোল-গাল ছোট্ট মুখ। যে মুখ দেখেই বোঝা যায় খুব জেদ তার। তোহা বলল,” বাবা না এলে আমি কিছুই খাবো না। পানিও না। আমার বাবা কখন আসবে বলুন?”
আমীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,” তোমার বাবা আসবে না।”
” আসবে না মানে?” তোহার দৃষ্টি বিস্ফারিত হয়ে উঠল। আমীর সামান্য অপ্রতিভ স্বরে বলল,” মানে আসবে। কিন্তু আজকে না। তোমার খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। তুমি যদি এমন ছেলেমানুষী করো তাহলে তো তোমার বাবা কাজে মনোযোগ দিতে পারবে না, তাই না?”
তোহা মুখ ভার করে বলল,” বাবা এতোক্ষণ আমার সঙ্গে কথা না বলে থাকতেই পারে না। নিশ্চয়ই বাবার কিছু হয়েছে। বাবাকে না দেখা পর্যন্ত আমার শান্তি লাগবে না। গলা দিয়ে খাবার নামবে না। এই কথাগুলো আপনি প্লিজ বাবাকে বলে দিন। উনি যেন আমাকে অন্তত একবার ফোন করেন। তাহলেই আমি খেয়ে নিবো, প্রমিস।”
আমীর উচ্চগলায় হাসানকে ডাকল। হাসান উপস্থিত হতেই সে বলল,” ওকে নিয়ে গার্ডেনে যাও। সারাদিন ঘরে বসে থাকতে থাকতে মাথা জ্যাম হয়ে গেছে।”
তোহা রেগে-মেগে বলল,” মানে? আমার মাথা একদম ঠিকাছে। আর আমি এখানে ঘুরাঘুরির জন্য আসিনি। শুনুন, আপনি যদি আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যেতে না পারেন তাহলে আমি একাই চলে যাবো৷ কোথায় আছে আমার বাবা? এড্রেস দিন।”
আমীর কোনো জবাব না দিয়ে কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হাসান তোহাকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল। তোহা কটমট করে বলল,” আপনি আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?”
” আপনি বাইরে চলুন ম্যাডাম।”
” আমার বাবা কোথায়? বাবা না এলে আমি কিছুই করব না। আপনারা চাইছেনটা কি?”
তোহা সিন ক্রিয়েট শুরু করল। তার চিৎকার প্রতিধ্বনি তুলছে দেয়ালে। আমীর যথেষ্টই বিরক্ত। বিরবির করে বলল,” আই হেইট শাউটিং। আই হেইট গার্লস।”
তোহা চোখের জল মুছল। হাসানের খুব মায়া লাগছে। মেয়েটি বাবার অপেক্ষায় অস্থির। কিন্তু তার বাবা যে কোনোদিন আসবে না, এই নিগূঢ় সত্যিটা তাকে বলা যাচ্ছে না। সিঁড়ির কাছে, বসার ঘরে, সোফায়, অনেক মানুষ উপস্থিত। সবার ড্রেসকোড সেইম। কালো ফুল স্লিভ শার্ট আর কালো জিন্স। সবার স্লিভ গুটানো। সবার উচ্চতা কাছাকাছি। আচ্ছা, এরা কি জমজ ভাই? নাকি পোশাক এক বলে দেখতেও এক লাগছে? প্রত্যেকে তোহাকে এমনভাবে দেখছে, যেন তোহা কোনো এলিয়েন। হাসান গরম দৃষ্টিতে সবার উদ্দেশ্যে বলল,” নিচে তাকাও।”
সবাই তটস্থ হয়ে নিজেদের কাজে ব্যস্ত হলো। তোহা হাত ছাড়িয়ে বলল,” আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আমি যাবো না।”
সে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে নিলেই হাসান তাকে আটকে দিল। পুলিশ যেভাবে আসামী ধরে, হাসানও তাকে ধরে আছে। তোহা চোখ-মুখ বিকৃত করে বলল,” আমি ব্যথা পাচ্ছি, ছাড়ুন।”
” স্যরি ম্যাডাম। কিন্তু আপনি কথা শুনছেন না।”
বাগানের এক মাথায় শিউলি ফুলের গাছ। একটা ফাঁকা স্থানে কয়েকজন ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তোহা সামনে এগোতেই দেখল মাসুদকে। হাঁটু গেঁড়ে মাথা নিচু করে স্থানুবৎ হয়ে আছে। তার দুইহাত পেছন দিকে বাঁধা। চোখে পট্টি। তোহার ব্রক্ষতালু জ্বলে উঠল। চোখের দৃষ্টি আক্রোশে কেঁপে কেঁপে উঠছে। গতরাতের কথা মনে পড়তেই সে দৌড়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি কয়েকটা লাথি মা-রল মাসুদকে। হাসান হতবাক। সে তোহাকে এইখানে এনেছিল মাসুদকে মে-রে র/ক্তাক্ত বানানোর দৃশ্যটি দেখাতে। তোহার ভালো লাগতো। কিন্তু সে যে নিজেই এভাবে আক্রমণ করে বসবে সেটা হাসান ভাবতে পারেনি। মেয়েটির সাহস আছে বলতে হয়।
মাসুদকে চারপাশ থেকে ঘিরে যে কয়জন দাঁড়িয়ে ছিল তারা প্রত্যেকেই হাসানের ইশারায় সরে গেল। সবাই বড় বড় চোখ করে তোহার কান্ড দেখছে। ছোট-খাটো একটি মিষ্টি মেয়ে কি হিংস্রভাবেই না যুবকটিকে মার-ছে! এই ব্যাপারটাই অনেকের বিশ্বাস হচ্ছে না। মাসুদের চুল খামচে ধরে দুইগালে ইচ্ছেমতো চড় দিল তোহা। কমপক্ষে বিশটিরও বেশি। পেটে লাথি মারল অবিরাম। মাসুদ কঁকিয়ে উঠতে লাগল। চোখ বাঁধা বলে সে জানতেও পারছে তাকে কে আঘাত করছে! এভাবে তোহার শান্তি লাগল না। সে যখন মা-রতে মা-রতে ক্লান্ত হয়ে গেছে, তখন মাসুদের চোখের পট্টি খুলে দিল। চোখের সামনে গোলাপি কামিজ পরিহিত তোহাকে দেখে মাসুদ হকচকিয়ে গেল। তোহা নিচু হয়ে বলল,” আমার অবস্থা খারাপ করার কথা বলিছিলি তাই না? এখন দ্যাখ, তোর অবস্থা আমি কি করি!”
বলেই আরও কয়েক চোট লাথি মারল। মাসুদ মুখ বিকৃত করে চেঁচাচ্ছে। তোহা তার মুখে একদলা থুতু মেরেই স্বগতোক্তি করল,” শালা!” মাসুদের চেহারা ক্ষত-বিক্ষিত, র-ক্তিম। হাসান এগিয়ে এসে হাত-তালি দিল,” ওয়েল ডান, ম্যাডাম।”
তোহা চুল ঠিক করতে করতে স্মিত হাসল। তার এখন অনেকটা ভালো লাগছে। চারপাশে তাকাতেই দেখল প্রত্যেকটি মানুষ হাঁ করে তার মুখের দিকে চেয়ে আছে। সবার দৃষ্টিতে বিস্ময়। তোহা একটু লজ্জা পেয়ে গেল। উপরে তাকাতেই দেখল আমীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখছে। তোহা মৃদু হাসল। এই মানুষটির প্রতি আবারও চরম কৃতজ্ঞতা মন ভরে উঠল।
চলবে
– Sidratul Muntaz
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৪.
রাতে খাওয়ার সময় তোহাকেও ডেকে নিল আমীর। তোহা খোশমেজাজে এসে আমীরের পাশের চেয়ারটিতেই বসল। আমীরের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তোহার গা থেকে একটা মেয়েলী সুগন্ধ সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে। অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে যেন কেউ সাবান মেখে খেতে বসেছে। ভদ্রতার খাতিরে তোহাকে দূরে গিয়ে বসার কথা বলতে পারল না আমীর। নিঃশ্বাস আটকে খেতে লাগল।
তোহা হাসিমুখে বলল,” আমার একা খেতে একদম ভালো লাগে না। ভালোই হলো যে আপনি আছেন। আচ্ছা, বাবার সাথে কি একবারও কথা হয়েছে আপনার? তিনি কি রাতে খেয়েছেন?”
” তোমার বাবা খেয়েছে কি খায়নি সেই খবর নেওয়ার দায়িত্ব কি আমার?”
আমীরের কঠিন উত্তরে তোহা একটু অপ্রস্তুত হলো। তার কণ্ঠস্বর এতো তীক্ষ্ণ আর ভারী যে তোহা প্রত্যেকবারই খুব হকচকিয়ে যায়। সে হাসিমুখে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল,” আপনি বসবেন না?”
” আমি খেয়েছি ম্যাডাম।”
” ও। আসলে বাড়িতে থাকলে তো সবসময় বাবার সঙ্গেই খাওয়া হয়। বাবা বাইরে থাকলে ফোন করে জেনে নেই খেয়েছে কি-না। এটা আমার ছোটবেলার অভ্যাস।”
পাশ থেকে সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত শেফ বলল,” আপনাকে ইলিশ মাছ দিবো?”
” আমি তো কাঁটা বাছতে পারি না। বাবা থাকলে আমাকে কাঁটা বেছে দিতেন।”
” এটা আপনি খেতে পারেন। এই মাছে কাঁটা নেই। ভিনেগার দিয়ে কাঁটা গলিয়ে রান্না হয়েছে।”
” ওয়াও। তাহলে তো খাওয়াই যায়।”
আমীর টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে উঠে যেতে নিলেই তোহা বলল,” আরে, আপনার খাওয়া শেষ নাকি? প্লিজ একটু বসুন। আমার না একা খেতে একদম ভালো লাগে না।”
আমীর একটু থতমত খেয়ে তাকাল। এভাবে কেউ তার সঙ্গে কখনও কথা বলে না। তার ইচ্ছে করল কঠিনভাবে এখনি একটা ধমক দিতে। কিন্তু খুব কষ্টে নিজেকে সংযত করল। আমীরের মাঝে ভদ্রতা, নম্রতা, বিনয় কিংবা সৌজন্যতার কোনো প্রভাব নেই। তোহার সামনে কৃত্রিম সেজে থাকতে তার খুবই অসহ্য লাগছে৷
তোহা খেতে খেতে বলল,” কথা না বললে আমি খেতে পারি না। আপনি মনে হয় একটু কম কথা বলেন। আচ্ছা, আমার বাবার সাথে আপনার পরিচয় কিভাবে হলো? তিনি আপনার বন্ধু কিভাবে হলেন? মানে আমার বাবার সাথে আপনার বয়সের তো আকাশ-পাতাল পার্থক্য!”
” বন্ধুত্ব করার জন্য কি সমবয়সী হওয়া জরুরী? ”
তোহা একটু ইতস্তত করে বলল,” তা নয়..”
আমীর তোহার চোখের দিকে তাকাল,” অসম বয়সের শত্রু যদি হতে পারে তাহলে অসম বয়সের বন্ধু কেন হওয়া যাবে না?”
তোহার পেটে কথা সাজানো থাকলেও বলে ফেলতে পারল না। আমীর তার চোখের দিকে তাকালেই সবকিছু ঘোলাটে মনে হয়। তোহা মাথা নিচু করে বলল,” ফ্রেন্ডশীপ করার জন্য তো মেন্টাল ম্যাচও লাগে। অনেস্টলি বলছি, বাবার সাথে আপনার কোনো মিল নেই। আমার বাবা হাসি-খুশি মানুষ। আপনার মতো কাঠখোট্টা স্বভাবের বন্ধু যে বাবার থাকতে পারে এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। অবশ্য শত্রু হলে ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য ছিল। ”
তোহা শেষ কথা মজার ছলে বললেও আমীর বিব্রত হয়ে হাসানের দিকে তাকালো। হাসানের দৃষ্টিতে শংকা। তোহা বলল,” আমার বাবা ভালো মানুষ হলেও তার শত্রুর অভাব নেই।”
সব কথা খাবারের প্লেটে তাকিয়েই বলছে তোহা৷ আমীরের মুখভঙ্গি দেখতে পারছে না। আমীর যেন বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে জবাব দিল,” ভালো মানুষ হলে তো শত্রু থাকার কথা না।”
তোহা হালকা প্রতিবাদী সুরে বলল,” কে বলেছে এই কথা? ভালো মানুষদেরই শত্রু বেশি থাকে। কারণ ভালো মানুষদের সবসময় স্রোতের বিপরীতে চলতে হয়।”
পেছন থেকে একজন এসে জরুরী গলায় বলল,” স্যার আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে। আর্জেন্ট।”
আমীর উঠে চলে গেল। তোহা এবার হাসানের সঙ্গে গল্প করায় ব্যস্ত হলো।
___________
আবির বিন ইফাত। ছোটবেলায় বাবা ডাকতো আবির বলে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে কেউ তাকে এই নামে ডাকেনি। ছোটবেলার আবিরের সাথে বর্তমান আমীরের বিস্তর পার্থক্য। অতীতে সে শুধুই আবির ছিল। এখন সে শুধুই আমীর। যতটা বদলানোর পর মানুষ নিজেকেও আর চিনে উঠতে পারে না, তার চেয়েও অনেক বেশি বদলেছে আবির৷ এই বদলানো নিয়ে তার আক্ষেপ নেই। ভাগ্যিস তার কোনো আপনজনও নেই৷ থাকলে নিশ্চয়ই আক্ষেপ করতো। আমীর কি চায় তাকে নিয়ে কেউ আক্ষেপ করুক? তার শরীর খারাপ হলে কারো একটু মাথা ব্যথা হোক? সে না খেয়ে থাকলে কারো অস্থির লাগুক! হঠাৎ করে এসব ভাবনা কেন মাথায় আসছে, আমীর জানে না। বাবার প্রতি তোহার ভয়ানক ব্যাকুলতা আমীরকে ক্ষণে ক্ষণে তার শৈশব মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেই শৈশব, যা সে কবর দিয়েছিল। নিঃসঙ্গতা আমীরের পরম সঙ্গী। এই বাড়িতে এতো মানুষ, সবার ভীড়েও সে চিরনিঃসঙ্গ। দিনশেষে সবার পরিবার আছে। আমীরের তো কেউ নেই।
শাদীদ খান লিভিংরুমের সোফায় বসে আছে। মুখ আতঙ্কে জড়োসড়ো। আমীরকে দেখেই উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে উঠে সালাম দিল। আমীর হাতের ইশারায় বসতে বলল তাকে। নিজেও বসল তার বরাবর। শাদীদ খুব বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বলল,” স্যার, অনেক বড় একটা ব্লেন্ডার হয়ে গেছে।”
” শর্টকাটে বলো। ডন্ট এক্সপ্লেইন।”
শাদীদের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেও সে আমীরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ভয় পায়। অথচ আমীরকে সব কঠিন সংবাদগুলো জানানোর দায়িত্ব সবসময় তার কাঁধেই পড়ে। খুব আমতা-আমতা করে বলল,” আমরা ভুল মানুষকে ধরে এনেছিলাম।”
” মানে?”
বড় একটা শ্বাস নিয়ে শাদীদ ঝেড়ে কাশল,” জাবিদ সাহেবের সাথে অর্ণবের কেইসটার কোনো সম্পর্ক নেই। যে অফিসার ঘুষ নিয়েছিল তার চারমাস আগে বান্দরবান পোস্টিং হয়েছে। তার নাম জাহাঙ্গীর আলম। কিন্তু আমরা যাকে ধরে এনেছি সে জাবিদ আলম। পোস্ট এক, নামের শেষেও এক। তাই ব্লেন্ডার হয়ে গেছে..”
আমীরের কথাগুলো বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। কিছুক্ষণ ভ্রুকুটি করে চেয়ে থেকেই বজ্রকণ্ঠে বলল,” হোয়াট ডু ইউ মিন?”
শাদীদের চেহারা সাদা কাগজের মতো দেখাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়ালো। আমীর প্রশ্ন করল কঠোর ভঙ্গিতে,” তুমি বলতে চাও অর্ণবের ফাঁসির জন্য অন্যকেউ দায়ী? আর আমরা নিরপরাধকে শাস্তি দিয়েছি?”
শাদীদ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,” স্যরি স্যার কিন্তু এতে আমার কোনো দোষ ছিল না। আমাকে যতটুকু করতে বলা হয়েছিল ততটুকুই করেছিলাম।”
পাশ থেকে সরব গর্জন করে বলল,” তোমার দোষ ছিল না? এটা কতবড় ভুল তুমি কি জানো?”
শাদীদ খুব আর্তনাদের সুরে ক্ষমা চাইতে লাগল। কিন্তু আমীর চিন্তা করছে অন্য বিষয়। সত্যিই কি তার এতোবড় ভুল হলো? সে যাচাই-বাছাই ছাড়া একজন নিরপরাধকে মে-রে ফেলবে এমন বেফাঁস কাজ তো কখনও করেনি। তবুও যেহেতু ভুল হয়েছে এর মানে বিশ্বস্ত কেউই বিশ্বাস ভেঙেছে। আপাতত শাদীদকে কিছু বলল না আমীর। ব্যাপারটা নিয়ে সে নিজে ইনভেস্টিগেশন করতে চায় আগে। ডাইনিং রুম পার হয়ে দুইতলায় যাওয়ার সময় আমীর দেখল তোহা হাসানের সাথে গল্প করতে করতে খুব হাসছে। আমীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়ল একসময়। মনে মনে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
রাতে তোহা বাবাকে খুব মিস করছিল। এর আগেও অনেকবার বাবা কাজের সুবাদে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে। টানা তিনদিন ধরে বাবার কোনো খোঁজ নেই এমনও হয়েছে। নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলে তো ফোন করে জানানো সম্ভব হয় না। তবে এইবার তোহার একটু বেশিই অস্থির লাগছে। কেন এমন লাগছে কে জানে? তোহা ফোন হাতে নিয়ে ম্যাসেজ করল,” আই মিস ইউ সো মাচ বাবা।”
আমীর পায়চারী করছিল। ম্যাসেজের টোন শুনতে পেয়েই মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল তোহার ম্যাসেজ। কিছুক্ষণ ভাবল কি করবে? এরই মধ্যে আবার একটা ম্যাসেজ এলো।
” একটা কথা বলবো বাবা? কখনও সরাসরি বলা হবে না। তাই ভাবলাম ম্যাসেজেই বলে দেই। আজ বলতে এতো ইচ্ছে করছে! আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি বাবা। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। তুমি আমার পৃথিবীর একমাত্র শীতল ছায়া। যে ছায়ার নিরাপদ আশ্রয়ে আমি সবসময় শান্তি খুঁজে পাই। গতমাসে আমি একটা ভয়াবহ অন্যায় করেছিলাম। তোমাকে না জানিয়েই বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার গিয়েছিলাম৷ বিপদের আশংকায় তুমি আমাকে কখনও কোথাও যেতে দাওনি। তাই মিথ্যা বলতে হয়েছে। কিন্তু সত্যিটা তোমাকে না বলা পর্যন্ত শান্তিই লাগছিল না। তুমি কষ্ট পাওনি তো, বাবা? প্লিজ বলো!”
আমীর উত্তরে বলল,” না।”
” থ্যাংক ইউ সো মাচ বাবা। আমি জানি, তুমি আমার উপর রাগ করতেই পারবে না। আমার মিষ্টি বাবা, গুড নাইট।”
” গুড নাইট।”
রিপ্লাই দেখে তোহার মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। উফ, এর মানে কি বাবা তার উপর রেগে আছে? রেগে না থাকলে এভাবে বলতো,” আমার মিষ্টি মামনি, গুড নাইট।”
তোহার অস্থিরতা আবার বেড়ে গেল। কিছুই ঠিক লাগছে না। ঘরে সাফোকেশন হচ্ছিল বলে সে ছাদে উঠল। ছাদের কার্ণিশে দেখল লম্বা একটি কালো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। অন্যকেউ হলে ভাবতো জ্বিন-ভূত। কিন্তু তোহা ঠিক চিনতে পারল মানুষটিকে। মৃদু হেসে বলল,” গুড ইভনিং মিস্টার আমীর।”
আমীর চমকে উঠল। হাতে ধরে থাকা ফোনটি চট করে পকেটে ভরে নিল।
চলবে
– Sidratul Muntaz