#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৫.
তোহা আমীরের পাশাপাশি এসে দাঁড়াল,” এতোরাতে কি করছেন?”
আমীর অকপটে জবাব দিল,” কিছু না৷” তারপর কাঠখোট্টা মুরব্বির মতো শাসনের সুরে প্রশ্ন করল,” ঘুম নেই তোমার?”
” ঘুম আসছে না বলেই ছাদে এসেছি। ঘরে খুব সাফোকেশন হচ্ছিল।”
” ঘুম আসবে না কেন? এখন আবার বোলো না যে তুমি একা ঘুমাতেও পারো না। তাহলে কিন্তু বিপদ। ঘুমে তোমাকে কোম্পানি দেওয়ার মতো এখানে কেউ নেই।”
তোহা শব্দ করে হেসে উঠল,” বাহ, আপনি তো বেশ জোকও করতে পারেন। আপনাকে আমি বেরসিক মানুষ ভেবেছিলাম।”
” আমি এমন আরও অনেক কিছুই করতে পারি, যা তুমি কল্পনাও করতে পারো না।” আমীর সকৌতুকে তাকাল। দৃষ্টি শীতল। তোহার গা শিরশিরে একটা অনুভূতি হচ্ছে। শুরু থেকেই খেয়াল করেছে সে, কিছু মানুষ সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বললে অস্বস্তি হয়। আমীরও সেরকম। মনে হয় চাহনী দিয়েই সে ছুঁয়ে দিচ্ছে। তোহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে তাকাল। উদাসী গলায় বলল,” বাবা বাইরে থাকলে আমার ঘুম আসে না।”
” তুমি কি বাবা ছাড়া একটা কথাও বলতে পারো না?” আমীর চোয়াল শক্ত করল।
” আমার বাবার ব্যাপারে কথা বললে আপনার গাঁয়ে ফোশকা পড়ছে কেন শুনি? আপনি কি রাফসান?”
” হু ইজ দিজ?”
” রাফসান আমার কলেজ ফ্রেন্ড। ভার্সিটিতেও আমরা একসাথে পড়ছি। কিন্তু ডিপার্টমেন্ট ভিন্ন। ওর সাথে আমি যতবার বাবার গল্প করি ততবারই ও এটম বোমের মতো ফোঁস করে ওঠে। আসলে বাবা ওকে খুব একটা পছন্দ করে না তো। ও লাফাঙ্গার ধরণের ছেলে। এজন্য রাফসানও বাবার আলাপ পছন্দ করে না। কিন্তু আপনার সমস্যা কি? বাবা তো আপনার ভালো বন্ধু তাই না?”
” মায়া, আমার মনে হয় তুমি তোমার বাবার প্রতি একটু বেশি অবসেসড। ”
” আপনার ধারণা একদম সঠিক। বাবার প্রতি অবসেসড হওয়াটা কি খারাপ?”
” কারো উপর বেশি এতো ডিপেন্ডেড হওয়া উচিৎ নয় যে সেই মানুষটা ছেড়ে গেলে আমাদের একেবারে শূন্য হয়ে যেতে হবে।”
” হঠাৎ ছেড়ে যাওয়ার কথা কেন এলো? ” তোহার কণ্ঠ থমথমে হয়ে উঠল।
” এমনিই বলছি। লাইফ তো খুব আনপ্রেডিক্টেবল। ”
” শুনুন, বাবা আমাকে কখনও ছেড়ে যাবে না। কারণ বাবা জানে, তাকে ছাড়া আমি একদম শূন্য। সে ছাড়া পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম।”
তোহা খুব বিভোর হয়ে গল্প বলতে লাগল,” যখন মানবশিশুকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠানো হচ্ছিল তখন সে খুব ভয় পেয়ে সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করল, ওই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আমি টিকব কিভাবে? শুনেছি পৃথিবী নাকি খুব ভয়ংকর জায়গা। আর আমি সেখানে যাবো অবুঝ এক শিশু হয়ে। আমার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কি? তখন সৃষ্টিকর্তা উত্তর দিলেন, আমি পৃথিবীতে তোমার জন্য একজন এঞ্জেল রেখেছি। যে তোমাকে সব বিপদ থেকে বাঁচাবে। তোমাকে আগলে রাখবে। খুব আদর করবে। তোমাকে নিজের থেকে, পৃথিবীর সবার থেকে অনেক বেশি ভালোবাসবে৷ মানবশিশুটি উৎফুল্ল হয়ে বলল, আমি তাকে চিনবো কি করে? তার নাম কি হবে? সৃষ্টিকর্তা বললেন, তার যে কোনো নাম হতে পারে। কিন্তু তুমি সবসময় তাকে ‘মা’ বলে ডাকবে। ”
আমীর চুপ করে আছে। তোহা বলল,” সেই শিশুর সাথে আমার পার্থক্য হলো, আমি আমার এঞ্জেলকে ‘ বাবা’ বলে ডাকি। ” এবার তোহা বা’হাতে চোখ মুছে হাসল,” বাবা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে এই কথা আমি ভাবতেও পারি না৷ আমার এতো মায়া দেখে বাবা আমাকে মায়া বলে ডাকেন। আমি বাবার পৃথিবীর একমাত্র মায়া।”
আমীর রুদ্ধশ্বাসে বলল,” আ’ম স্যরি।”
তোহা অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তাকাল,” আপনি কেন স্যরি বলছেন?”
” আমি জানি না।” আমীর মাথা নিচু করল। তোহা লজ্জিত কণ্ঠে বলল,” আমি অযথাই খুব ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি। স্যরি, যদি আপনাকে বেশি বোর করে থাকি। আচ্ছা, গুড নাইট।”
আমীর কি জবাব দিবে বুঝতে পারল না। নিশ্চুপ হয়ে রইল। তোহা অবশ্য জবাবের অপেক্ষাতেও রইল না, বের হয়ে গেল। তার খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এতো কান্না পাচ্ছে! হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে, বাবা যদি তাকে ছেড়ে সত্যি কখনও চলে যায় তখন তার কি হবে? পুরো পৃথিবীতে যাদের কেউ নেই তারা কিভাবে বাঁচে?
___________
” ম্যাডাম, আমি কি ভেতরে আসব?”
” হাসান সাহেব, আসুন।”
লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে বলল,” আমি হাসান না, আমার নাম সরব।”
তোহা ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করল। মানুষটি দেখতে কিছুটা বয়স্ক। তাকে কি আঙ্কেল ডাকা উচিৎ নাকি ভাইয়া? খুবই বিভ্রান্তিকর ব্যাপার৷ তোহা কিছুই ডাকল না। মানুষটি মাথা নিচু করে আছে। তোহার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না।
” আপনি কি এখন ব্রেকফাস্ট করবেন নাকি পরে?”
তোহা এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,” বাবা কি আজও আসবে না? ”
” এই ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। স্যার বলতে পারবেন।”
“আমাকে এইখানে আর কয়দিন থাকতে হবে বলুন তো? আমি কিন্তু খুব বোর হচ্ছি।”
” স্যার যখন বলবেন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে।”
” তাহলে আমি আপনার সাথে কেন কথা বলছি? সবই যেহেতু স্যার বলবেন, আমি স্যারের সাথে কথা বললেই তো পারি।”
” স্যারের সাথে এখন কথা বলা যাবে না। তিনি ব্যস্ত।”
তোহা সরবের শেষ কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে গেল। করিডোর পার হয়ে আমীরের বেডরুমে দৌড়ে যেতে তার তিনমিনিট সময় লাগল।
_______________
অর্ণব আমীরের খুবই বিশ্বস্ত সহচর। ছয়বছর ধরে সে আমীরের হয়ে কাজ করেছে। ধীরে ধীরে আমীরের ডানহাত হয়ে উঠেছিল। হঠাৎই তাকে একটি মিথ্যা কেইসে জড়িয়ে ফাঁসির ব্যবস্থা করা হয়।যারা এমন করেছে তারা মূলত আমীরকে দূর্বল বানাতে চেয়েছে। আমীর সেই সময় দেশের বাইরে ছিল বলে এই ব্যাপারে কিছুই জানতো না। দেশে ফেরার পর সব জানতে পারে। অর্ণবের বিরুদ্ধে যে লয়্যার দাঁড়িয়েছিল তাকে হ-ত্যা করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল সবাই শাস্তি পেয়েছে। শুধু বেঁচে গেছে জাহাঙ্গীর আলম। আমীরের ধারণা তাকে কেউ প্রটেক্ট করেছে। আর সেই ‘কেউ’ নিঃসন্দেহে আমীরের বিশ্বস্ত কেউ। নয়তো এমন ভুল হতো না। আচ্ছা, যে এটা করেছে তার মূল উদ্দেশ্য কি ছিল? জাহাঙ্গীর আলমকে প্রটেক্ট করা নাকি জাবিদ আলমকে বিপদে ফেলা? বিষয়টা বোঝার জন্য আমীর গোপনে তার সব কর্মচারীদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া শুরু করল। হাসান সকালের মধ্যেই সবার অতীতের রেকর্ডের সবকিছু এনালাইসিস করে আমীরকে আসল তথ্য জানাল,” স্যার, শাদীদের সাথে জাবিদ সাহেবের ব্যক্তিগত একটা শত্রুতা ছিল। একবার ধ*ষণের অভিযোগে শাদীদ জেলে যায়। সেখানে যে পুলিশ অফিসার তাকে মে-রে র/ক্তাক্ত করে তিনিই জাবিদ সাহেব। তখন থেকেই শাদীদের সাথে তার ঝামেলা। এই ব্যাপারটা আমরা কেউ জানতাম না।”
আমীরের চোখে ক্রোধের আগুন ধিক করে জ্বলে উঠল। আক্রোশে চোয়াল শক্ত করে বলল,” শাদীদকে আসতে বলো।”
” ওকে স্যার।” হাসান বের হয়ে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করল,” জাবিদ আলমের মৃ-ত্যুর কথা তার মেয়ে জানবে কখন স্যার?”
” এখনি কিছু জানানোর দরকার নেই। সময়মতো তাকে সব বলা হবে।”
হাসানের মনটা উশখুশ করেছে। তোহার জন্য খুব খারাপ লাগে তার। সামান্য ভুল বোঝা-বুঝির কারণে জাবিদ সাহেবকে ম-রতে হলো। ব্যাপারটা সে মানতেই পারছে না। রুম থেকে বের হতেই দেখল তোহা দাঁড়িয়ে আছে। হাসান থতমত খেল। তোহার মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা গেল যে ভেতরের সব কথাই শুনেছে। হাসান অপ্রস্তুতভাবে কিছু বলার আগেই তোহা তারস্বরে চিৎকার করে উঠল,” আমার বাবা কোথায়? বলুন, বাবা কোথায়?”
হাসান জবাব দেওয়ার আগেই ভেতর থেকে বের হয়ে এলো আমীর। তোহা ছুটে গিয়ে আমীরের কলার চেপে ধরে পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল। তার এহেন উন্মাদি আচরণে ভ্যাবাচেকা খেয়ে স্তব্ধীভূত হয়ে রইল আমীর। ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের মতো তোহা গর্জন করে বলল,” আমার বাবা ম-রেনি। আমার বাবা ম-রেনি! সত্যি কথা বলুন। আমার বাবা কোথায়? আমি সবকিছু ধ্বংস করে দিবো। সবাইকে ধ্বংস করে দিবো। বাবা! আমার বাবা কোথায়?”
তোহার চিৎকারে ভবন কেঁপে উঠছে। আমীর আচমকা তার মুখ চেপে ধরে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল,” তোমার বাবা মা-রা গেছে। বুঝেছো? তোমার বাবা মা-রা গেছে মানে এটাই সত্যি। এভাবে চিৎকার করলেই তিনি ফিরে আসবেন না। তাই স্টপ ইট।”
তোহা ভ্রু কুচকে শুনল পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম বাক্যগুলো। একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ভাবতে লাগল, উনি মানুষ না অন্যকিছু? এতো নিষ্ঠুর কেউ কিভাবে হতে পারে? বিন্দুমাত্র দয়া কি তার মাঝে নেই? এমন পাষন্ড, পাথর হৃদয়ের মানুষ তোহা আগে কখনও দেখেনি। কখনও না!
চলবে
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৬.
বাগানের উত্তর পাশে সারি সারি গাছের মেলা। একদম সারির শেষ মাথায় কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে শাদীদ। মুক্ত বাতাসেও নিঃশ্বাস আসছে না। মুখ পাণ্ডুবর্ণ। ধরা খাওয়ার আগেই দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল। ভেবেছিল তার পরিকল্পনা কাজ করবে। মাত্র গতরাতেই সে আমীরকে ভুলের ব্যাপারটি জানিয়েছিল। এতো দ্রুত যে আমীর সন্দেহ করে তাকে খুঁজে বের করে ফেলবে তা কল্পনাতীত। তবুও রিস্ক যেন নিতে না হয় তাই সে পাসপোর্ট, ভিসা সব তৈরী করেই রেখেছিল। প্লেনেও উঠে পড়েছিল। বেশ কিছু ঘণ্টার ব্যবধানে পৌঁছে যেতো সিঙ্গাপুর। সে যেহেতু সবার আগে ভুলের কথা জানিয়েছে তাই আমীর এই ব্যাপারে তাকে সন্দেহ করবে এটা ঘূণাক্ষরেও ভাবেনি শাদীদ। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়। আমীর তার ক্ষমতা বলে ফ্লাইট ক্যান্সেল করিয়ে শাদীদকে ধরে এনেছে এখানে। শাদীদ হাঁটু গেঁড়ে অবিচল ভঙ্গিতে নিজের অপরাধ অস্বীকার করে নিষ্ঠুর শাস্তি থেকে বাঁচার প্রয়াস চালাচ্ছে। হাসান ঠিক তার মাথা বরাবর পিস্তল ধরে রাখল। বাকিদের হাতেও পিস্তল। প্রত্যেকে শাদীদের দিকে তাঁক করে রেখেছে। হাসান রূঢস্বরে বলল,” যা করতে বলা হয়েছে, তাই করবি শুধু।”
গগন নামের একজন যুবক বিশাল কোদাল এনে শাদীদের সামনে ছুঁড়ল। শাদীদ করুণ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে সবার দিকে তাকাচ্ছে। হাসান ইশারায় বলল,” চালু, শুরু কর।”
শাদীদ ভয়ে মুখ দিয়ে প্রশ্ন করার ফুরসত পেল না। দ্রুত হাতে কোদাল নিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ছে কপালে বেয়ে। মুখ শুকিয়ে এতোটুকু। আত্মা নিভু নিভু করছে। যে-কোনো সময় তার মৃ-ত্যু হতে পারে। তবে বাঁচার জন্য সে সব করতে প্রস্তুত। উপরে বারান্দা থেকে সম্পূর্ণ দৃশ্য অবলোকন করছে আমীর। তার চেয়ারায় প্রশান্তি। শাদীদ একবার সেদিকে তাকিয়েই হাঁটু গেঁড়ে বসে দুইহাত তুলে বলতে লাগল,” স্যার, স্যার মাফ করে দিন। স্যার আমি কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আমার স্ত্রী-সন্তান আছে। আমি ম-রলে তাদের কি হবে? তাদের কথা ভেবে আমাকে ছেড়ে দিন।”
হাসান সামান্য দয়াময় দৃষ্টিতে তাকাল আমীরের দিকে। আমীর সম্মতিপূর্ণ ইশারা দিতেই সে শ্যুট করল। প্রথম শ্যুটেই শাদীদ বেহুঁশ হয়ে যায়। তারপর অনবরত আরও কয়েকবার শ্যুট করে তার পুঁতে রাখা কবরেই তাকে দাফন করা হয়।
সরব বিচলিত ভঙ্গিতে এসে দাঁড়ালো আমীরের মাস্টার বেডরুমের দরজায়। অস্থিরচিত্তে জানাল,” স্যার, ম্যাডাম খুব ঝামেলা করছে।”
বাগানের দিকে দৃষ্টি ধরে রেখেই আমীর শান্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,” কি ধরণের ঝামেলা?”
” ভাঙচুর করছে। বলছে তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে না দিলে সে কিছুতেই থামবে না।”
আমীর কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর হঠাৎ উদ্যোগী হয়ে বলল,” আচ্ছা, চলো দেখি।”
তোহার ঘরের দিকে ছুটে গেল আমীর। ইতোমধ্যে সারাঘর এলোমেলো করে তুলেছে সে। বিছানার চাদর উল্টে-পাল্টে,ড্রেসিংটেবিলের আয়না ভেঙে গুঁড়ো করে, দৃষ্টিনন্দন শো পিস, প্রসাধন সামগ্রী চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এমনভাবে ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাস নিচ্ছে যেন সে কোনো মানসিক বিকারগস্ত রোগী। তাকে এমনভাবে ধ্বংসলীলা চালাতে দেখে আমীর শক্তভাবে তার হাত দু’টো ধরে পেছনে আটকালো। তারপর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুব কঠোর ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়ল,” কি শুরু করেছো এসব?”
তোহার ক্ষীপ্ত-রক্তিম দৃষ্টি আচানক আলতো হয়ে গেল আমীরের টানটান পেশিযুক্ত মুখের সামনে। রহস্যময় সেই চোখের সামনে। ক্ষণমুহূর্ত চেয়ে থেকে খুব আড়ষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করল,” আমার বাবা ম-রেনি।”
আমীর তোহার চোয়াল হালকা হাতে চেপে ধরেই বলল,” উনি ম-রে গেছে৷ আর এটাই সত্যি।”
তোহা দূর্বল কণ্ঠে আওড়াল,” আমি বিশ্বাস করি না। ”
পরমুহূর্তেই তুখোড় তেজে ঝলসে উঠে বলল,” আমার বাবার কিছু হয়নি বুঝেছেন আপনি?”
আমীর তোহার হাত ছেড়ে খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। মুখভঙ্গি অত্যন্ত স্বাভাবিক রেখে মাথা নাড়িয়ে বলল,” নিদারুণ সত্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকো তাহলে।”
আমীরের কথার অর্থ বুঝল না তোহা। ধারালো একটি বিষণ্ণতার অনুভূতি দাঁপাদাঁপি করছে মনে। আঘাত লাগছে ভীষণ। দুই হাতে মাথা খামচে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল সে। আমীর বের হয়ে যাওয়ার সময় বলল,” জাবিদ সাহেবের ডেডবডি এই বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করো, সরব।”
তোহার পিলে চমকে উঠল কথাটি শুনে। সামনেই রাখা ছিল অর্ধভাঙা একটি টি-পট। পা দিয়ে মাড়িয়ে সেটিও গুঁড়িয়ে দিল একমুহূর্তে। তারপর চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল,” আমার বাবার কিছু হয়নি। না, কিছু হয়নি। বাবা, প্লিজ কামব্যাক! আই নীড ইউ বাবা। প্লিজ কামব্যাক।”
____________
এম্বুলেন্সে করে চিরজীবনের মতো নিস্তব্ধ দেহটি লিভিংরুমের মাঝখানে এনে রাখা হলো। তোহা ত্রস্তপায়ে হেঁটে আসছে। ভ্রু-এ কুঞ্চন। সবকিছু একটা ঘোরের মতো লাগছে। জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর স্বপ্নটি কি সে এই মুহূর্তে দেখছে? মাথা ঝাজরা করা কয়েকটি গুলি নিয়ে শুয়ে আছেন জাবিদ সাহেব৷ অথচ দেখে মনে হচ্ছে তিনি ঘুমন্ত। তোহা নতজানু হয়ে ডাকল,” বাবা, এই বাবা।”
জাবিদ সাহেব কোনো জবাব দিল না। তোহা তার বাবার হাত দু’টো ধরে নিজের গালে স্পর্শ করালো। তার চোখ ছাপিয়ে জল নেমেছে। অসহায়ের মতো সে ডাকছে,” ও বাবা, বাবা!”
হাসান দৃশ্যটি সহ্য করতে না পেরে অন্যদিকে তাকাল।আঙুলের ডগা দিয়ে গঁড়িয়ে পড়া জল আটকে উপরে দৃষ্টিপাত করতেই দেখল আমীর তাকিয়ে আছে নিচে৷ জীবনে এই প্রথম নিজহাতে হত্যা করার পর কাউকে মর্গ থেকে তুলে এনেছে সে। জাবিদ সাহেবের নাকি জানাযাও হবে। সেই জানাযায় অংশগ্রহণ করতে হবে সবাইকে। নিতান্তই ভুলের বশবর্তী হয়ে যে জঘন্য অন্যায় সে করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত করতেই এতো প্রচেষ্টা। তোহা তার বাবার বুকে আছড়ে পড়ে পাগলের মতো কাঁদতে শুরু করল হঠাৎ। অবস্থা বেগতিক দেখে আমীর ইশারায় বলল, মৃতব্যক্তির স্ট্রেচার সরিয়ে নিতে। সবাই যখন জাবিদ সাহেবকে তুলতে অগ্রসর হলো তখন সাথে সাথেই তোহা সেন্টার টেবিল থেকে একটি কাঁচের ফ্লাওয়ার বাজ তুলে সেটি ভেঙে সবার দিকে তাঁক করে বলল,” কেউ আমার বাবার কাছে আসবে না। তাহলে এই মুহূর্তে আমি সবাইকে খু*ন করে ফেলবো।”
আচমকা তোহার এহেন আচরণে ঘাবড়ালো সবাই। আফশান বলল,” এটা রাখুন ম্যাম। লাশ দাফন করতে এমনিতেও অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
” খবরদার আমার বাবাকে লাশ বলবে না। ”
তোহার ধমকে পিছিয়ে গেল আফশান। আমীর নেমে এসে শান্ত গলায় বলল,” এইরকম কেন করছো মায়া?”
‘মায়া’ নামটি শুনেই বুক ধড়াস করে কেঁপে উঠল তোহার। তার মনে হলো যেন বাবা এখনি উঠে যাবেন। তাকে আবার ‘মায়া’ বলে ডাকবেন! কিন্তু বাবা ডাকছেন না৷ তাই আমীরের মুখে নামটি শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। আমীর কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দিল,” ওইটা রেখে উঠে আসো প্লিজ।”
সবাইকে হতবাক করে দিয়ে তোহা আমীরের আদেশ পালন করল। হাতে ধরে থাকা কাঁচ খন্ডটি রেখে সে আমীরের হাতটি ধরল৷ আমীর তাকে টেনে তুলতেই আচমকা লুটিয়ে পড়ল সে আমীরের বুকে। তাকে জড়িয়ে ধরে বাঁধভাঙা নদীর মতো কেঁদে উঠল। আমীর অনুভব করল তার বুকের বামপাশে অবিরাম অস্থিরতা। তীক্ষ্ণ একটি ব্যথা। অপরাধবোধ নাকি অন্যকিছু?ভাবতে পারল না। তোহা ক্রন্দনরত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,” আমার বাবার হ-ত্যাকারীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
আমীর অনেকটা চমকে উঠল। কোন শাস্তির কথা বলছে সে? তোহা কি তাহলে শাদীদকে তার বাবার খু*নি ভাবছে? দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আমীর। প্রত্যক্ষ না হোক, পরোক্ষভাবে হলেও শাদীদ এই খু*নের জন্য দায়ী। কিন্তু তোহা পুরো সত্যিটা এখনও জানে না!
চলবে
– Sidratul Muntaz