#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৭.
জাবিদ সাহেবের জানাযা শুরু হলো যোহরের পর। তোহার ইচ্ছেতে মাদ্রাসার কিছু অনাথ ছাত্রদের ডাকা হলো। বড় ইমাম সাহেব এসে কোরআন তেলওয়াত করলেন। তোহা সাদা সেলোয়ার-কামিজ গায়ে জড়িয়ে সবাইকে নিজ হাতে বিরিয়ানি পরিবেশন করল। জানাযা থেকে ফিরে এসে সবাই খেতে বসেছে। তোহা আন্তরিক দৃষ্টিতে সবাইকে বলে,” আমার বাবার জন্য আপনারা দোয়া করবেন। আল্লাহ যেনো তাকে জান্নাত নসিব করেন।”
সকলে একসাথে উচ্চারণ করল,” আমিন।”
তোহা উপরে তাকিয়ে দেখল আমীর তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি শান্ত। তোহার মনে হলো, এই মানুষটির কাছে তার ঋণের শেষ নেই। সে না থাকলে আজকে হয়তো তোহা বাবার মৃত্যুর পর এতোকিছু করার সুযোগ পেতো না। এতো দ্রুত সবকিছু সামলেও উঠতে পারতো না। যদিও তোহার মনে হচ্ছে, পুরোটাই স্বপ্ন। একটু পরেই হয়তো বাবা ঘরে চলে আসবেন। হাসিমুখে স্নেহার্দ্র কণ্ঠে বলবেন,” মায়া, এদিকে একটু আয় তো মা। তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি। আগে চা খাওয়া তারপর দেখাবো।
অথবা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে তোহাকে জাগ্রত দেখে বলবেন, ” বাইরে জোৎস্না নাকি? চলতো, বারান্দায় চেয়ার পেতে বসি একটু।”
তোহা হয়তো তখন ভয়ে ভয়ে কোনো আবদার পেশ করবে। বাবা কখনোই তাকে কলেজের বাইরে কোথাও যেতে দেননি। কিন্তু তোহার ঘুরে বেড়ানোর খুব শখ ছিল। বাবা এমন চাকরি করতেন যে চাইলেই সহজে ছুটি কাটাতে পারতেন না। তাই তোহাকে সবসময় ঘরবন্দী থাকতে হয়েছে। একটু সুযোগ পেলেই সে উড়তে চাইতো। কিন্তু জাবিদ সাহেব মেয়েকে একা ছাড়তে ভয় পেতেন। নীতিবান পুলিশ অফিসার হওয়ার কারণে তার শত্রুর অভাব ছিল না। যদি তারা তোহার কোনো ক্ষতি করে বসে! এই ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকতেন। মানুষ ভাবে পুলিশের মেয়ে হিসেবে তোহার জীবনে নিরাপত্তা বেশি। কিন্তু আসলে তার জীবন কতটা দুঃসহ ছিল তা কেবল সে জানতো আর তার বাবা!
আমীরের দরজায় এসে কড়া নাড়ল তোহা। আমীর হাসানের সাথে জরুরী বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। তোহা শুধু এইটুকু শুনতে পেল আমীর কঠোরভাবে হাসানকে নির্দেশ দিচ্ছে, জাহাঙ্গীর আলমের লা*শ সে নিজের পায়ের তলায় দেখতে চায়। এসব খু*ন-খারাবির কথা শুনতে আর ভালো লাগল না তোহার। সে ফিরে যেতে নিচ্ছিল। তখনি আমীর তাকে ডাকল। হাসান বেরিয়ে যাওয়ার পর তোহা ভেতরে প্রবেশ করল। আমীর সৌজন্যময় হেসে জিজ্ঞেস করল,” কিছু বলবে?”
আমীরের হাসিটা দেখে তোহার কষ্ট হলো। কেমন যেন মেকী হাসি। মানুষটা কি তার সামনে জোর করে হাসে? তোহা নতমুখে বলল,” সবকিছুর জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
আমীর একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। সে কি এমন করেছে? পুরোটাই ছিল প্রায়শ্চিত্ত। আবারও হাসার চেষ্টা করে বলল,” ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। তোমার বাবার কাছে আমি অনেক ঋণী। তার জন্য এইটুকু করতেই পারি।”
তোহাকে সাদা পোশাকে কেমন নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে। মুখটা বিরস, ছোট। চেহারার প্রাঞ্জল ভাবটা গায়েব। আমীর একটু ইতস্তত কণ্ঠে বলল,” দাঁড়িয়ে কেন? বসো।”
তোহা ভূমিকা ছাড়া কথা বলল,” আজ বিকালে আমি চলে যাবো।”
” কোথায় যাবে?” আমীর অবাক। তোহা মলিন হেসে বলল,” এই বাড়িতে তো থাকার আর প্রয়োজনীয়তা দেখছি না৷ শুধু শুধু আপনাকে বিরক্ত করা।”
” তুমি থাকলে আমি বিরক্ত হবো এই কথা কে বলল? তাছাড়া তোমার বাবাকে আমি একটা কথা দিয়েছিলাম। তোমাকে ইটালি পাঠিয়ে দিবো। সেই ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবে তুমি।”
” ইটালি?” প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তোহা তাকাল৷ এই বিষয়ে কিছুই জানতো না সে। আমীর মাথা নেড়ে বলল,” হুম। সেখানে নাকি তোমার রেশমা ফুপু থাকেন। তোমার বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল তুমি উনার কাছে চলে যাবে৷ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আর দায়িত্ব তো পালন করতে হবে তাই না?”
তোহা বিস্ময়ে অস্থির হয়ে উঠল। রুদ্ধশ্বাসে বলল,” এই দায়িত্ব তিনি আপনাকে কেন দিলেন? এর মানে কি বাবা জানতেন তিনি ম-রে যাবেন?”
আমীর অপ্রস্তুত হলো। ধরা পড়া চোরের মতো মুখ লুকিয়ে অন্যদিকে পলক ফেলে বলল,” তোমার বাবার তো অনেক শত্রু ছিল। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন তারা বেশি দিন উনাকে বাঁচতে দিবে না। তাই আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।”
তোহা মুখ চেপে ধরল। বুকের চাপা কষ্টটা কান্নায় রূপ নিয়ে গলা অবধি উঠে গেল। ফুঁপিয়ে বলল তোহা,” অথচ আমাকে কখনও বুঝতে দিলেন না। এভাবে ছেড়ে চলে গেলেন! এই পৃথিবীতে আমার আর কে আছে?”
আমীর কাছে এসে তোহার মাথায় হাত রাখল। তোহা কাঁপল একটু। আমীর বলল,” আমি আছি। তোমার প্রয়োজনে আমাকে সবসময় পাশে পাবে।’
তারপর আরও যোগ করল,” যতদিন না ইটালি যাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, তুমি এখানেই থাকো। ওই বাড়ি তোমার জন্য সেইফ না। তাছাড়া সেখানে গেলে আরও তোমার বাবার কথা মনে পড়বে৷ তুমি কিছুই ভুলতে পারবে না। কষ্ট হবে।”
তোহা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে আমীরের দিকে চেয়ে থেকে বলল,” আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে আমি একদম একা হয়ে যেতাম।”
” আমি সবসময় থাকব। চিন্তা কোরো না।”
তোহার এতো ভালো লাগল কথাটা। সবসময় থাকবে! কেউ তো এভাবে আগে কখনও বলেনি। এই মানুষটাকে তার এতো আপন লাগছে কেন? সে বাবার কাছের বন্ধু ছিল বলে নাকি বাবার মতো তোহাকে ‘মায়া’ বলে ডাকছে বলে?
তোহা আমীরের স্টাডিরুম থেকে বের হয়ে দেখল হাসান বাইরে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। কণ্ঠ অসম্ভব থমথমে। তোহা বুঝতে পারে আবারও সেইসব খু*ন/খারাবির আলাপ। উল্টো ঘুরে চলে যেতে নিলেই হাসান ফোন রেখে তার পথ আটকে দাঁড়ায়।
” ম্যাডাম।”
” কিছু বলবেন হাসান সাহেব?”
নির্জীব কণ্ঠে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় তোহা। হাসানের মনটা সকাল থেকেই বিষণ্ণ লাগছে। নিজেকে কঠিন অপরাধী ছাড়া কিছু মনে হচ্ছে না। সে কিছুতেই মনের এই অস্থিরতা দমাতে পারছে না৷ তোহাকে সান্ত্বনা দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই সাহসটুকুও সে সঞ্চয় করতে পারছে না। শুধু নরম গলায় বলল,” আপনার যে-কোনো প্রয়োজনে আমাকে ডাকবেন। আপনার মনের অবস্থা ভালো নেই বুঝতে পারছি। যদি বাইরে যেতে ইচ্ছে করে তাহলে বলবেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো।”
বাইরে যাওয়ার কথা শুনে তোহা হাসল। আনমনে বলল,” আমার এখন থেকে আর বাইরে যেতে ইচ্ছে করবে না হাসান সাহেব।”
” কেন?”
” জানি না।”
হাসান কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তোহার সামনে। যেন এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তোহা হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার মতো বলল,” আচ্ছা হাসান সাহেব মানুষ মা-রাটা আপনাদের কাছে কোনো ব্যাপার নয়, তাই না?”
বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল হাসানের। আচম্বিত কণ্ঠে শুধাল,” জ্বী?”
” এইযে সারাক্ষণ আপনারা খু*ন -খারাবি নিয়ে কথা বলেন, পিস্তল, ছুরি, এসব নিয়ে ঘোরা-ফেরা করেন, আপনাদের ভয় লাগে না?”
হাসান এবার একটু স্বাভাবিক হয়ে বলল,” প্রথম প্রথম লাগতো। এখন কিছু মনে হয় না।”
” আপনারা এসব কেন করেন? এগুলো তো ভালো কাজ না। ছেড়ে দিতে পারেন না?”
” ভালো কাজ চাইলেই ছেড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু খারাপ কাজ ছাড়া যায় না।”
” তাই?” তোহাকে খুব অপ্রকৃতস্থ দেখায়। হাসান বলল,” চলুন আপনাকে ঘরে দিয়ে আসি।”
তোহা হাত বাড়িয়ে বাঁধা দিল,” না৷ আমি একাই যেতে পারব। ” তারপর স্বগতোক্তি করল,” এখন থেকে তো আমাকে একাই চলতে হবে।”
_______________
মাঝরাতে দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে ঘুম ছুটে গেল আমীরের। এতো রাতে খুব জরুরী দরকার না হলে তার দরজায় কেউ এভাবে কড়া নাড়বে না৷ চশমাটা চোখে লাগিয়েই উঠে বসে বলল,” কে?”
হাসানের কণ্ঠটা ভেসে আসে,” স্যার আমি।”
” কি হয়েছে?”
” ম্যাডামের খুব জ্বর এসেছে, স্যার। জ্বরে একদম গা পুড়ে যাচ্ছে। এলোমেলো কথা বলছে। আমি বুঝতে পারছি না কি করব!”
আমীর বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে দরজা খুলল। হাসানকে খুব উদগ্রীব দেখাচ্ছে। আমীর ভ্রু কুচকে বলল,” তোমার কি হলো?”
হাসান ব্যথিত নয়নে বলল,” জানি না স্যার। আমার খুব খারাপ লাগছে। উনি বার-বার বাবার নাম নিচ্ছেন।”
” তার বাবার নাম সে নিচ্ছে। তাতে তোমার কান্না-কাটি করার কি হলো? চোখ মোছো।”
হাসান এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারল না৷ আলতো হাতে চোখের জল মুছল। আমীর হনহন করে হেঁটে তোহার ঘরে ঢুকল। তার উষ্ণ কপালে হাত রেখে কোমল গলায় বলল,” মায়া, কি অবস্থা দেখি?”
তোহা সঙ্গে সঙ্গে হাতটা চেপে ধরল আমীরের। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে লাগল,” বাবা, আমাকে ছেড়ে যেও না বাবা প্লিজ। তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। বাবা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”
তোহার আর্তনাদ শুনে মনে হয় দশ-এগারো বছরের অবুঝ কিশোরী। আমীরের অস্বস্তি বোধ হলেও হাতটা টেনে সরিয়ে নিল না৷ ধৈর্য্য ধরে থার্মোমিটার দিয়ে তোহার জ্বর মেপে নিল। তারপর নাপা ট্যাবলেট খাওয়ালো।
” যদি এর মধ্যে জ্বর না কমে তাহলে ডাক্তার ডাকতে হবে। ” হাসানের দিকে চেয়ে আমীর বলল কথাটা। তোহা সাথে সাথেই প্রতিবাদ করল,”ডাক্তার লাগবে না। আমি ঠিক হয়ে যাব।”
” ডাক্তার লাগবে কি-না সেটা আমি বুঝব। তোমার কথা বলার দরকার নেই। চুপচাপ শুয়ে থাকো। রেস্ট নাও।”
” আপনি শুধু শুধুই কষ্ট করলেন। আমার এখন মোটামুটি ভালো লাগছে। আপনি যেতে পারেন।”
” শিউর তুমি?”
” হুম।”
আমীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। দরজার কাছে যেতে নিয়ে দেখল হাসান ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমীর একটু বিরক্ত হয়ে বলল,” তোমার কি সমস্যা হাসান? আসছো না কেন?”
হাসান বিব্রত স্বরে বলল,” আমি থাকি? ম্যাডামের যদি কোনোকিছুর প্রয়োজন হয়?”
আমীর খুব অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। যেন হাসানের কথার অর্থ তার বোধগম্য হচ্ছে না। এমন সময় তোহা মৃদু হেসে বলল,” আপনি যেতে পারেন হাসান সাহেব। এই মুহূর্তে আমার কিছু লাগবে না। প্রয়োজন হলে আপনাকে ডেকে নিবো।”
হাসানও বুঝতে পারছে এতোরাতে তার তোহার বেডরুমে বসে থাকা সমীচীন নয়৷ তাই বাধ্য হয়ে বের হয়ে গেল।
ঘরে এসে আমীর বিছানায় গা এলিয়ে দিল। যত দ্রুত সম্ভব তোহাকে ইতালি পাঠানোর বন্দোবস্ত করতে হবে। এই কাজটি সেরে ফেলতে পারলেই তার দায়িত্ব শেষ। এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। একটু পর আবার দরজায় খটখট শব্দ। আমীর ভাবল হাসানই এসেছে। তাই কোনো প্রশ্ন না করেই দরজা খুলে দিল। কিন্তু দেখল তোহা দাঁড়িয়ে। আমীর হকচকিয়ে গেল।
” আরে, তুমি কেন এই শরীর নিয়ে উঠে এলে? ডাকলেই তো হতো।”
তোহা অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল,” আমি কি একটু ভেতরে বসতে পারি?”
” আসো।”
তোহা আমীরের বিছানায় এসে বসল। খুবই উশখুশ করতে করতে বলল,” আমার একা ঘরে শুতে ভয় লাগছে। শুধু বাবার কথা মনে পড়ছে। যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি আজকে রাতটা এই ঘরে থাকতে পারি?”
আমীর হতচকিত দৃষ্টিতে তাকাল। কি উত্তর দেওয়া যায় তৎক্ষণাৎ বুঝতে উঠতে পারল না। চেহারায় চাপা অস্বস্তি খেলা করছে। তোহা আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলল,” মানে, আমি শুধু বসে থাকব। ঘুমাব না। এই ঘরটা তো যথেষ্ট বড়। আমি যদি ওই সোফাসেটের ওদিকটায় বসে থাকি তাহলে কি আপনার ঘুমের খুব অসুবিধা হবে? যদি হয় তাহলে আমি চলে যাচ্ছি।”
তোহা উঠে পড়তে নিলেই আমীর ধীর-স্থিরভাবে বলল,” অসুবিধা নেই।”
” থ্যাঙ্কিউ। ”
চলবে
-.Sidratul Muntaz
#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৮.
ডিম লাইটের মৃদু টিমটিমে আলোয় ঘর ভরে আছে। বাইরে ভরা পূর্ণিমা। চাঁদটা কি আশ্চর্য সুন্দর! তোহা নিষ্পলক কিছুক্ষণ চাঁদের দিকে চেয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ চোখ গেল আমীরের দিকে। মানুষটা উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। চোখে এখন আর চশমা নেই। তোহার কেন যে এতো ভালো লাগে! সে শুধু এই মানুষটির দিকে চেয়ে সবকিছু ভুলে থাকবে বলে এই ঘরে এসেছে। ভয় কেবল একটি বাহানা মাত্র! আমীরের গভীর চোখের দৃষ্টিতে যে এক সম্মোহনী শক্তি আছে সেই শক্তির কাছে তোহা বশ্যতা স্বীকার করেছে অনেক আগে। সে টিপটিপ পায়ে হেঁটে আমীরের নৈকট্যে বসল। তাকে কাছ থেকে দেখতে পারার লোভটা সামলানো গেল না। গভীর ঘুমেও তার চেহারায় গম্ভীরতা। তোহা কি কখনও ভেবেছিল এমন গম্ভীর ধাচের মানুষ তার হৃদয়ে আসন গেঁড়ে বসবে? সে নিজে প্রাণোচ্ছল, তাই তার পছন্দও প্রাণোচ্ছল, চঞ্চল। তোহার কল্পনার পুরুষের সাথে আমীরের কোনো মিল নেই। তবুও সব সংশয় পার করে আজ আমীরই যেন তার হৃদয়ের একমাত্র অধিপতি। মন কখন কাকে আপন করে নেয় তা আগে থেকে বলা যায় না। তোহা ভাবছে, কবে এতোটা গভীরভাবে প্রেম জেগে উঠল তার মনে? সেই ভ*য়ংকর রাতের প্রথম স্পর্শেই কি মন দুলেছিল তবে? আমীর তার দিকে হাত বাড়িয়ে যখন বলেছিল,” উঠে এসো, মায়া।”
তখনি কি উঠে আসার বদলেই হোচট খেয়ে পড়ে গেছিল সে? আজন্ম প্রেমগর্ভে বিলীন হয়েছিল মন? কে জানে? তার মনটা যে বড্ড উথাল-পাথাল করে আজ-কাল। আমীরের চোখের দিকে তাকাতে বড় লজ্জা লাগে। তার জন্য মানুষটির মনে কি কোনো অনুভূতি নেই? সে থাকুক আর নাইবা থাকুক, তোহা নিজের সর্বনাশ টের পেয়ে গেছে। একাকীত্বের এই জীবনে একমাত্র চাওয়া হিসেবে ভাগ্যের কাছে তার শুধু আমীরকেই চাই।
তোহার উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেই চোখ তুলে তাকালো আমীর। সে এতোক্ষণ সচকিতই ছিল। মেয়েটা তার পাশে এসে বসা মাত্রই সে টের পেয়েছে। তোহার গায়ের মেয়েলী সুবাতাস নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করা মাত্রই রগে রগে প্রবেশ করেছে অস্থিরতা। অস্বস্তির পাল্লা ক্রমেই বাড়ছে। তাকে চোখ খুলতে দেখে তোহা ভীষণ ভয়ে উঠে দাঁড়ালো। আমতা-আমতা করে কৈফিয়ৎ দেওয়ার মতো বলল,” জানালার বাতাসে খুব ঠান্ডা লাগছিল। তাই এখানে এসে বসেছি। আপনার ঘুমের ডিস্টার্ব হবে বুঝিনি। স্যরি।”
যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে আমীর পাশ ফিরল। গুমোট দায়সারা স্বরে বলল,” জানালা বন্ধ করে দাও। ” বলেই সে চোখ বুজল।
তোহার ভেতর থেকে বের হলো অস্বস্তির একটি চাপা নিঃশ্বাস। অপমানে কাঁটা দিল শরীর৷ সে কি বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? তাড়াহুড়ো করে একছুটে ঘর থেকে বের হতে নিচ্ছিল। তখন চোখ আটকে গেল দরজার পাশের টেবিলের একটি ছবিতে৷ ছবির মানুষটিকে সে চেনে। কিন্তু নাম মনে করতে পারছে না। সে কিছুক্ষণ ছবিটি ইনিয়ে-বিনিয়ে দেখার পর হঠাৎ প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল,” ইফাত আব্রাহাম!”
আমীর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল,” আমার বাবা।”
তোহা কেঁপে উঠল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল,” আপনি ইফাত আব্রাহামের ছেলে?”
আমীর চোখ খুলে তার দিকে তাকাল একবার। অসন্তোষজনক কণ্ঠেই শুধাল,” কেন? বিশ্বাস হচ্ছে না?”
তোহা যেই হাতে ছবি ধরে আছে সেই হাত কাঁপছে। চোখে অবিশ্বাস্য উদ্বেগ। কিয়ৎক্ষণ চেয়ে থাকার পর সে ধরা গলায় বলল,” আমি শুনেছিলাম, তিনি নিজের ছেলের হাতে খু*ন হয়েছিলেন।”
আমীর অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে জানাল,” ঠিক শুনেছো। আমিই সেই খু’নী ছেলে।”
তোহার হাত থেকে পিছলে পড়ে গেল ছবিটি। শিরদাঁড়া বেয়ে প্রবাহিত হলো শীতল স্রোত৷ আতঙ্কে জমে উঠল শরীরটা। আমীর নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে একবার তোহার দিকে তো আরেকবার পড়ে যাওয়া ছবিটির দিকে তাকাল। তারপর বিছানা থেকে নেমে এসে মেঝে থেকে ছবিটি তুলে টেবিলে যেভাবে সাজানো ছিল, সেভাবেই সাজিয়ে রাখল। কিছুই হয়নি এমন ভাব করে তোহার দিকে তাকিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,” আর ইউ ওকে?”
তোহার মুখের রক্ত গায়েব হয়ে সাদা ফ্যাকাশে রং ধারণ করেছে। চোখের দৃষ্টি অস্থির। ঝটিতে আমীরের হাত সরিয়ে সে এক ছুটে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। একবারের জন্যেও পেছনে ফিরে তাকাল না। তাকালেই হয়তো দেখতে পেতো আমীরের ঠোঁটের পরিষ্কার হাসিটা।
____________
সকালে তোহার ঘরে ব্রেকফাস্ট নিয়ে হাজির হলো হাসান। দরজায় নক করে বলল,” ম্যাডাম, আসব?”
তোহা শক্ত পাথরের মতো জমাট বেঁধে বসে আছে। কোনো জবাব সে দিল না। হাসান আবার ডাকল,” ম্যাডাম!”
তোহা একটু চমকে উঠল, যেন ভয় পেল। হাসান হাসিমুখে অনুমতি চাইল,” ভেতরে আসব?”
তোহা ধাতস্থ হয়ে বলল,” আসুন।”
হাসান ঢুকল। তার পেছনে পেছনে খাবার নিয়ে ঢুকল আরেকজন। ছোট্ট টেবিলের উপর খাবারগুলো গুছিয়ে রেখে সে চলে গেল। হাসান আন্তরিকভাবে বলল,” কালকে থেকে কিছু খাচ্ছেন না। একটু খেয়ে নিন ম্যাডাম। নাহলে শক্তি পাবেন না। ”
তোহা ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। হাসান খুব ইতস্ততবোধ করল। তার পাশে গিয়ে বসতে ভয় লাগছে। তাও সাহস করে গেল। তোহার পাশে বসেই বলল,” এনি প্রবলেম ম্যাডাম?”
তোহা হাসানের চোখের দিকে তাকাল। কেমন যেন একটি ভরসার আলো খুঁজে পেল। লোকটি সবসময় তার কথা ভাবে। তার জন্য উতলা হয়ে থাকে। তোহা আর্দ্র কণ্ঠে বলল,” আমাকে একটা সাহায্য করবেন হাসান সাহেব?”
তোহার প্রশ্নে দ্রবীভূত হয়ে হাসান হাসল। বাধ্য কণ্ঠে বলল,” নিশ্চয়ই করব।”
করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় তোহার ঘরের দরজা খোলা দেখে কৌতুহলবশতই একটু ঘাড় বাড়িয়ে তাকাল আমীর। দেখতে পেল তোহা বিবশের মতো কাঁদছে আর হাসান তার পিঠে হাত বুলাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথেই নিজের ঘরে গিয়ে হাসানকে ডেকে পাঠাল সে৷ হাসান এলো বেশ কিছুক্ষণ পর।
” স্যার, ডেকেছিলেন?”
আমীর ঠান্ডা কণ্ঠে জিগ্যেস করল,” কোথায় ছিলে এতোক্ষণ? ”
হাসান সামান্য লজ্জিত স্বরে বলল,” ম্যাডামের সাথে গল্প করছিলাম।”
আমীর অবাক হয়ে তাকাতেই হাসান থতমত খেয়ে বলল,” আসলে উনার মনটা ভালো নেই তো। আমার কাছে অনেক কিছু বলে কাঁদলেন।”
” আর তুমি কি সান্ত্বনা দিলে?” আমীর যেন কৌতুক করল। হাসানের মুখ শুকিয়ে অর্ধেক। মাথা নিচু করে অস্ফূটস্বরে বলল,”স্যরি স্যার।”
” স্যরি বলার কিছু নেই। তুমি যেটা করেছো সেটা খুবই এপ্রিশিয়েবল কাজ। ওয়েল ডান। ”
হাসান একটু চমকাল। তারপর হেসে বলল,” থ্যাঙ্কিউ স্যার।”
আমীর ঠোঁটের নিচে আঙুল রেখে একটু ভাবুক হয়ে বলল,” এমন কাজ করার জন্য তোমাকে আমার পুরষ্কৃত করতে ইচ্ছে করছে। কি চাও তুমি বলো?”
হাসান বিব্রত ভঙ্গিতে বলল,” ছিঃ স্যার, কি বলেন? এটা তো আমার কাজেরই অংশ। আমার কিছু লাগবে না।”
আমীর তার জন্য মাত্র রেখে যাওয়া ঠান্ডা স্মুথির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,” সেটা বললে কিভাবে হয়? নিশ্চয়ই লাগবে। আচ্ছা যাও, তুমি ডিসাইড করতে না পারলে আমিই বলি। আজকে থেকে তোমার ছুটি। আগামী একমাস আমার আশেপাশে তোমাকে আসতে হবে না। তুমি তোমার ফ্যামিলির সাথে সময় কাটাও। ইচ্ছে হলে ট্যুরেও যেতে পারো। প্রয়োজনীয় খরচ-পাতি মোবারক আঙ্কেলের থেকে নিয়ে যাও। এটাই তোমার পুরষ্কার।”
হাসান পুরোপুরি চুপসে গেল। বুঝতে পারল এতোক্ষণ আমীর যা বলছিল তা সবই ছিল রসিকতা। সে সুকৌশলে হাসানকে চাকরি থেকে ছাটাই করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা বোঝা মাত্রই হাসানের চেহারায় ভর করল অসহায়ত্ব। উদগ্রীব হয়ে বলল,” আ’ম স্যরি স্যার। আমি কি কোনো ভুল করেছি? আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু এতোবড় শাস্তি দিবেন না দয়া করে। এই চাকরি আমার খুব দরকার।”
আমীর চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,” তোমার চাকরি তোমারই আছে হাসান। মাত্র একমাসের জন্য আমি তোমাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দিচ্ছি। এতে তোমারই লাভ৷ তাছাড়া সারাদিন এতো খাটনি যায় তোমার উপর দিয়ে..একটু রেস্টেরও তো দরকার আছে।”
” আমার কোনো রেস্টের দরকার নেই স্যার। প্লিজ এমন করবেন না।” হাসানের চোখে জমে উঠল অশ্রু। সে জানে একবার এই বাড়ি থেকে বের করা হলে সে আর কোনোদিনও ঢুকতে পারবে না। আমীর তাকে ভদ্রভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছে। সে হাঁটু গেঁড়ে বসে অনুরোধ শুরু করতে লাগল। কিন্তু আমীর এসব কিছুই শোনার তাগিদ অনুভব করল না। দৃঢ়স্বরে বলল,” ডন্ট ফোর্স মি টু বি রুড। জাস্ট গেট আউট।”
চলবে
– Sidratul Muntaz