ওয়ান ফোর থ্রি পর্ব-৯+১০

0
670

#ওয়ান_ফোর_থ্রি
৯.
সকাল থেকেই মহা আয়োজনে ঘর-দোর পরিপাটি করে গুছানো হচ্ছে। এমনিতেও এই বাড়িটি যথেষ্ট ছিমছাম রাখা হয়। আজ একদম ফুল লাগিয়ে ডেকোরেশন করা হচ্ছে। তোহা সকালে ঘুম ভেঙে এসব দেখে খুব অবাক হলো। সরব তার ঘরে এসে জানালো,” আপনার ভিসা কনফার্ম হয়ে গেছে ম্যাডাম। আগামীকাল সন্ধ্যার ফ্লাইটে আপনি ইটলি যাচ্ছেন।”

তোহা বেশ অবাক হওয়া কণ্ঠে বলল,” বলেন কি? এতো দ্রুত ভিসা রেডি?”

সরব মৃদু হাসল।

” আমাদের স্যারের কাছে কিছুই অসম্ভব না। ” তার কণ্ঠে গমগমে গৌরব। তোহা শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইল,

” আমি একা যাব?”

” অবশ্যই না। আপনার নিরাপত্তার জন্য বডিগার্ড যাবে।”

” আমি কি বডিগার্ডদের মধ্য থেকে কাউকে সিলেক্ট করতে পারবো?”

সরব কিছুক্ষণ চুপ থেকে দ্বিধাভরা কণ্ঠে উত্তর দিল,” জানি না… আপনার ইচ্ছা। এই বিষয়ে স্যারের সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে।”

তোহা চোখ বন্ধ করেই হাসল। হাই তুলতে তুলতে ফরমায়েশ করল,” হাসান সাহেবকে পাঠিয়ে দিন।”

সরবকে একটু বিব্রত দেখাল। কোনো উত্তর না পেয়ে তোহা চোখ খুলে চাইতেই সরব বলল,” হাসান এখানে নেই।”

” আচ্ছা, তাহলে উনি ফিরলে বলবেন আমার সঙ্গে দেখা করতে।”

” সে ফিরবে না।”

তোহা শোয়া থেকে ধপ করে উঠে বসল এবার।

” ফিরবে না কেন?” কৌতুহল ঠিকরে বের হলো কণ্ঠ থেকে। সরব সতর্কতার সাথে জবাব দিল,” কাজের কারণে তাকে অন্য কোথাও ট্রান্সফার করা হয়েছে। এজন্য ফিরবে না।”

তোহা এই পর্যায় একটু শান্ত হলো। সে তো অনেক কিছু ভেবে নিয়েছিল। গতকাল তাদের কথোপকথন শুনে হাসানকে আবার কেউ মে-রে ফেলেনি তো? এই বাড়িতে আসার পর থেকে তোহার মনে হয় মানুষ খু/ন করা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু হাসান না ফিরলে তার সমস্যা হয়ে যাবে। এই বাড়িতে বিশ্বস্ত অন্যকাউকে খুঁজে বের করা মুশকিল। একমাত্র হাসানকেই নরম হৃদয়ের মানুষ মনে হয়েছিল। যাকে দিয়ে সব করানো যায়। অন্যরা কেমন যেন… আমীরের মতো কাঠখোট্টা, নির্জীব। এরা কেউ তোহার সমস্যা বুঝবে বলে মনে হয় না। কিন্তু হাসান তোহার সঙ্গে দেখা না করেই চলে গেল? সে কি আসলেই চলে গেছে নাকি তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে?

_____________
মেয়েটা বেশ লম্বা। কোমর পর্যন্ত চুল। রূপবতী, অনন্যা। তোহা যতদূর জানে, এই বাড়িতে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সেদিন বৃষ্টি আসতে চেয়েছিল কিন্তু অনুমতি দেওয়া হলো না। আর আজ এই সুন্দরী ললনা কি অকপটে ঢুকে গেছে বাড়িতে! সবার উপর এমনভাবে হুকুম জারি করছে, যেন বাড়িটা তার নিজের৷ তোহা ফিসফিসিয়ে জানতে চাইল,” উনি কে?”

সরব গাল ভরাট করে হাসল,” উনি আমাদের ম্যাডাম।”

” ম্যাডাম মানে?”

” মানে ভাবী। স্যারের একমাত্র ওয়াইফ। আজকের স্পেশাল গেস্ট। উনার জন্যই তো এতো আয়োজন।”

তোহার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। সে কি চোখে ঝাপসা দেখছে নাকি কানে ভুল শুনছে? এর মধ্যে কি হলো সরব যেন কিছুই বুঝল না। তোহা থম মে-রে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ মাথা ঘুরেই পড়ে গেল।

চোখ মেলার পর তোহা দেখতে পেল তার সামনে বসে আছে আমীর৷ একটা থার্মোমিটার এগিয়ে বলল,” হা করো।”

তোহা তার কথা কিছুই বুঝল না। পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। আমীর অনুচ্চ স্বরে বলল,” মায়া, হা করো।”

তোহা সঙ্গে সঙ্গে হা করল। আমীর তার মুখে থার্মোমিটার গুঁজে দিয়ে কপালে হাত রাখল৷ একটু চিন্তিত গলায় বলল,” জ্বর তো এখনও কমেনি৷ এটা ভালো লক্ষণ না। আমাকে কেউ কিছু জানায়নি কেন?”

সরব ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,” আপনি ভাবী ম্যাডামের ওয়েলকাম পার্টি নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিলেন যে এসব জানিয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি, স্যার। এই ম্যাডাম তো সকাল থেকে খাওয়া-দাওয়াও করেননি।”

” শিট!” আমীর হতাশ চোখে তোহার দিকে তাকায়।

” কেন খাওয়া-দাওয়া করোনি তুমি?”

তোহার আরেকবার মনে পড়ে গেল সকালের ঘটনা। সেই সুন্দরী রমণীকে তাহলে সে স্বপ্নে দেখেনি। সে সত্যি এসেছে! সে আমীরের বউ। তোহার কাশি উঠে গেল। সে এতো বেশি পরিমাণে কাশতে লাগল যে তৎক্ষণাৎ তার মুখ থেকে থার্মোমিটার বের করে নিতে হলো। আমীর গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে বলল,” নাও, পানি খাও।”

তোহা ক্রোধপূর্ণ কণ্ঠে জানাল,” খাবো না পানি। আপনার এতো কি? আমাকে নিয়ে চিন্তা না করে আপনি নিজের কাজে যান।”

সরব ভীত এবং বিস্মিত দৃষ্টিতে বলল,” ম্যাডাম এসব আপনি কি বলছেন? স্যার আপনার জন্য এতো টেনশন করছেন আর আপনি স্যারের সাথে এমন বিহেভ করছেন? এটা তো ঠিক না।”

” কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সেটা কি আমার আপনার থেকে শিখতে হবে?”

এই কথা বলেই আমীরের হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে নিজের মাথায় ঢেলে দিল তোহা। তারপর অদ্ভুত হেসে বলল,” এইতো, পানি খেয়েছি আমি। এবার খুশি?”

সরব এবং আমীর তোহার অদ্ভুত কান্ড দেখে নির্বাক হয়ে গেল৷ দু’জন একবার চোখাচোখি করল। আমীর ধাতস্থ হয়ে বলল,” বুঝতে পারছি আঙ্কেলের মৃ-ত্যুতে তোমার মাথা ঠিক নেই। কিন্তু তাই বলে তুমি এমন করবে কেন? মায়া, এগুলো তো কোনো সমাধান না।”

” খবরদার আমাকে মায়া বলবেন না। এই নামে আমাকে শুধু আমার আপনজনেরা ডাকে। আপনি আমার কে হোন যে কথায় কথায় এই নামে ডাকছেন?”

আমীর থতমত খেয়ে গেল। খানিকক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ ভ্রু কুঞ্চিত করল। সামান্য ক্রুদ্ধস্বরেই বলল,” কারণ আমি তোমার অন্যকোনো নাম জানি না।”

” আমার নাম পাগল। এখন থেকে আমাকে পাগল নামে ডাকবেন।”

আমীর আরও ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। হঠাৎ ঝনঝন শব্দ বেজে উঠল সিঁড়িঘরে। স্নেহা এক ধাক্কায় কাঁচের এক্যুরিয়াম ভেঙে ফেলেছে। তারপর ইচ্ছেমতো চেঁচামেচি শুরু করেছে। এক্যুরিয়াম থেকে তার পছন্দের মাছ গায়েব। কার এতো সাহস হলো তার মাছ সরানোর? একজন তাকে জানাল, মাছটি ম-রে গেছে। স্নেহা তার মাছের কবর দেখতে চাইল। কিন্তু মাছকে তো কবর দেওয়া হয়নি। এই নিয়ে সে আরও রাগারাগি শুরু করল। আমীর বউয়ের রাগ ভাঙাতে হন্তদন্ত হয়ে বের হলো। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে বউয়ের কাছে যেতে না পারলে নির্ঘাত কোনো অনর্থ বেঁধে যাবে। পুরো ব্যাপারটাই তোহার হৃদয়ে প্রবলভাবে আঘাত হানল।আমীর চলে যেতেই তোহা বিরবির করে বলল,” যার স্বামী মানুষ মে-রে ফেলে সে মাছের মৃত্যু নিয়ে আফসোস করছে? ব্যাপারটা অদ্ভুত না?”

সরব চাপা স্বরে উত্তর দিল,” আরও অনেক অদ্ভুত ব্যাপার দেখবেন ম্যাডাম। আমার ধারণা মতে স্যার সবচেয়ে দুঃখী বিবাহিত পুরুষ। ”

” এই কথা কেন বললেন?”

” অবস্থা দেখছেন না? এই শান্তির বাড়িতে অশান্তি মাত্র শুরু। আমাদের স্যারের ভয়ে সবাই কাঁপে। কিন্তু স্যার কাঁপে তার বউয়ের ভয়ে।”

” এটাই তো স্বাভাবিক। পুরুষ মানুষ যতই সাহসী হোক, বউয়ের কাছে সবাই ভেজা বিড়াল।”

“ঠিক বলেছেন ম্যাডাম। এ কারণেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কখনও বিয়ে করব না। স্যারের অবস্থা দেখে আমার এতো মায়া হয়!আপনি কিন্তু ভুল করেও ঘরের বাইরে পা রাখবেন না ম্যাডাম। স্নেহা ম্যাডাম এখন প্রচন্ড রেগে আছেন৷ এই অবস্থায় যদি তিনি দেখেন বাড়িতে কোনো মেয়ে মানুষ আছে তাহলে কেলেংকারী হবে।”

তোহা সামান্য আগ্রহী হয়ে জানতে চাইল,” কিরকম কেলেংকারী হতে পারে?”

সরব বিপর্যস্ত কণ্ঠে জানালো,” স্নেহা ম্যাডাম স্যারকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যেতে পারেন।”

” তাহলে তো ভালোই। আপনাদের স্যার বেঁচে গেল!”

তোহার শেষ কথা না শুনেই সরব দ্রুত দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। যেন সব ঝামেলা আজ তাকেই সামলাতে হবে। সে এক্ষুণি না গেলে কিছুই ঠিক হবে না। তোহা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর ভাবল, তার অবশ্যই একবার স্নেহার সামনে যাওয়া উচিৎ। যে বাড়িতে মেয়ে নিষেধ সেই বাড়িতে সে মেয়ে হয়েও দিব্যি ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া গতরাতে সে আমীরের ঘরেও থেকেছিল। এসব খবর স্নেহা জানলে কি হবে? ছিঃ, তোহা এসব কি চিন্তা করছে? সে কি অনেক বাজে মেয়ে হয়ে যাচ্ছে? নাহলে অন্যের সংসার ভাঙার মতো জঘন্য চিন্তা তার মাথায় কেন আসবে?

চলবে

– Sidratul মুন্তায

#ওয়ান_ফোর_থ্রি

১০.
আমীর-স্নেহার বিয়ের বয়স মাত্র তিনমাস। সারাজীবন একাকিত্ব নিয়ে কাটাতে চাওয়া আমীর হঠাৎ স্নেহার মতো একটি মেয়েকে কিভাবে বিয়ে করে ফেলল সে এক বিরাট রহস্য।

” আপনারা এই রহস্যের কিছুই জানেন না?”

রাশেদ বলল,” কিভাবে জানব ম্যাডাম? স্যারকে প্রশ্ন করার সাহস কারো নেই।”

তোহা চোখ সরু করে বলল,” প্রশ্নটা যদি আমি করি?”

রাশেদের চেহারা চিমসে গেল। সে এসেছিল তোহার ঘরটা গুছিয়ে দিতে। এই ফাঁকে তোহা তাকে নানান প্রশ্ন করছিল। তার উত্তর দিতে গিয়ে মুখ ফসকে সে অনেক কথা বলে ফেলেছে। এসব স্যারের কানে পৌঁছালে হাসানের মতো তারও চাকরি যেতে পারে। যদিও স্নেহা আছে তার চাকরি বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সে স্নেহাকে বিপদে ফেলতে চায় না। রাশেদ কাতর স্বরে বলল,” ম্যাডাম প্লিজ, এসব নিয়ে ঝামেলা বাড়াবেন না। স্যার তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা পছন্দ করেন না। আমি যে আপনাকে এসব বলেছি তা জানাজানি হলে….”

তোহা বিছানায় বসে পা নাচাতে নাচাতে রিল্যাক্স হয়ে বলল,” আপনি এতো ভাববেন না। আপনার কথা কেউ জানবে না। শুধু আমাকে এইটুকু বলুন, তাদের বিয়েটা কিভাবে হয়েছিল? আর তাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন?”

” আপনি এসব জেনে কি করবেন ম্যাডাম?”

” এমনি জানতে চাই… কৌতুহল!”

” বিয়ে তো হঠাৎ করেই হয়েছিল। এর আগে তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি-না আমি বলতে পারব না। স্যার খুব ইন্ট্রোভার্ট। তার মনের কথা জানা খুব কঠিন। তবে এটা আমরা সবাই জানি যে স্যার স্নেহা ম্যাডামকে অসম্ভব ভালোবাসেন। শুধু ম্যাডাম ছাড়া আজ অবধি তিনি অন্যকোনো মেয়ের দিকে তাকাননি, কথাও বলেননি। স্নেহা ম্যাডামকে ছাড়া তিনি কিচ্ছু বোঝেন না৷ একবার স্নেহা ম্যাডামের কঠিন অসুখ হলো। বাঁচার কোনো আশংকা নেই। আমীর স্যার তখন কি করতেন জানেন? সারাক্ষণ নামাযে সিজদায় পড়ে থাকতেন। ধর্মের প্রতি স্যারের এতো বিশ্বাস আমরা সেই প্রথম দেখলাম। স্যার তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্নেহা ম্যাডামের কিছু হলে তিনিও বাঁচবেন না। আত্মহননের সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যবশত স্নেহা ম্যাডাম বেঁচে গেলেন। আমরাও আবার আমাদের স্যারকে ফিরে পেলাম।”

রাশেদ বানিয়ে বানিয়ে অনেক গুলো মিথ্যা বলে থামল।এমনিও অসহ্য জ্বালাতনে ছটফট করছে তোহা সকাল থেকে৷ তার উপর এসব শুনে তার হৃদয় দহন আরও বেড়ে গেল। চোখ জ্বালা করতে লাগল। ভ্রু কুচকে বলল,” হয়েছে। চুপ থাকুন এবার৷ আমি আর শুনতে চাচ্ছি না।”

রাশেদ চলে যেতে উদ্যত হলেই তোহা প্রশ্ন করল,” আচ্ছা, হাসান সাহেব কি আর আসবেন না?”

” বলতে পারছি না ম্যাডাম।”

” ঠিকাছে, যান।”

রাশেদ গিয়েও আবার ফিরে এলো।

” ম্যাডাম, একটা কথা।”

” বলুন।”

” আগামীকাল আপনাকে যেতে হবে। যতক্ষণ এখানে আছেন… ঘর থেকে বের হবেন না প্লিজ। স্নেহা ম্যাডাম আপনাকে দেখলে প্রবলেম হতে পারে। ”

” কেন?”

” আপনি তো জানেন এই বাড়িতে মেয়ে নিষেধ। ”

তোহা কিছু বলল না। কেবল মাথা নাড়ল। রাশেদ চলে যাওয়ার পর সে ভাবতে লাগল। আচ্ছা, স্নেহার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা থেকেই কি আমীর নিজের বাড়িতে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে? স্নেহা ছাড়া অন্যকোনো মেয়ে তার সংস্পর্শেও আসতে পারবে না এটাও কি আমীরের ভালোবাসার নীতি? স্নেহা নামক মেয়েটির প্রতি অস্বাভাবিক ঈর্ষায় তোহার হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে আসছে। বাবার মৃত্যুর পর ভরসা করার মতো একজন মানুষকে সে পেয়েছিল। অথচ সেই মানুষটিও তাকে ধোঁকা দিল। আগে যদি সে জানতো আমীর বিবাহিত, তাহলে কখনও তার প্রেমে পড়তো না! আচ্ছা, সেদিন রাতে যে তোহা আমীরের ঘরে থাকতে গিয়েছিল তখন আমীর তাকে একবারও বাঁধা দিল না কেন? অবশ্য সে তখনও তোহার অনুভূতির কথা জানতো না। এখনও জানে না। তোহার কি উচিৎ সব জানিয়ে দেওয়া? সে আমীরকে একটা চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নিল। চিঠিটা ড্রয়ারে রেখে সে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে আজরাতেই।

আমীরের বাড়িটা কোনো বাড়ি নয়। পুরোটাই তার অফিস। তার জগৎ শুধু তার কাজেই সীমাবদ্ধ। তার একটা অস্বাভাবিক অতীত আছে সেই কথা সবাই জানে। যে অতীতের কারণে আমীর পরিবার কেন্দ্রিক জীবন ভীষণ অপছন্দ করে। সে তার আশেপাশে কোনো আপন মানুষের বিচরণও সহ্য করতে পারে না। তাকে সবসময় অপরিচিতরা ঘিরে থাকবে আর প্রত্যেকে তার ভয়ে মাথা নুইয়ে রাখবে এটাই সে চায়।

আমীর কাউকে শতভাগ বিশ্বাস করে না। কারো প্রতি মায়া জন্মায় না তার। মানুষ হত্যা করায় সে দক্ষ। এই নিয়ে তার মধ্যে কোন অনুশোচনাও ছিল না। তবে এই প্রথম জাবিদ সাহেবের জীবন নেওয়ার পর তার আফসোস হচ্ছে। সে একজন সৎ, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। একটা নিষ্পাপ মেয়েকে এতিম বানিয়েছে। এই অপরাধবোধ আমীরকে ঘুমাতে দিচ্ছে না!

আমীর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে কপালে হাত ঠেঁকাল। চিন্তা করতে লাগল তোহার কথা। তখন হঠাৎ আমীরের হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে কেমন নিজের মাথায় ঢেলে দিল তোহা! আমীর এই দৃশ্য ভুলতে পারছে না। মেয়েটা এমন অস্বাভাবিক আচরণ কেন করছে? বাবার মৃত্যুর কারণে কি সে কোনো সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারে ভুগছে? দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল স্নেহা। আমীর সাথে সাথে তার পিসি অন করল।

স্নেহা কাছে এসে দাঁড়ালো। রাগী কণ্ঠে বলল,” কি সমস্যা তোমার? তুমি এমন কেন?”

স্নেহার বড় বড় চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে আগুন। আমীর সরল দৃষ্টিতে চাইল। নম্র কণ্ঠে শুধাল,” কেমন?”

” আমি এই বাড়িতে এসেছি প্রায় একঘণ্টা হতে চলল। অথচ তুমি আমার সাথে একটা কথাও বলোনি। এটলিস্ট এইটা তো জিজ্ঞেস করতে পারতে যে আমি কেমন আছি?”

আমীর তার চশমা ঠিক করে অতি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,” স্যরি। তুমি কেমন আছো?”

স্নেহার রাগ আরও বৃদ্ধি পেল। কিড়মিড় করে বলল,” মনে হয় আমি একটা রোবটের সাথে সংসার করছি। তুমি কি কোনোদিন বদলাবে না?”

” শুধু শুধু বদলাতে যাব কেন? আমি যেরকম ছিলাম সেরকম জেনেই তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে স্নেহা৷ তাহলে এখন হঠাৎ বদলানোর প্রসঙ্গ কেন আসছে?”

স্নেহা তীব্র কণ্ঠে চেঁচালো,” আমাকে ওয়েলকাম জানাতে বলেছিলাম। তোমার এই অফিস নামক বাড়িকে ফুল দিয়ে কভার করতে বলিনি। এভাবে সারাবাড়িতে ফুল না লাগিয়ে যদি তুমি আমার হাতে একটা গোলাপ তুলে দিতে তাহলে আজকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন হতো। ”

” স্যরি।”

স্নেহা কাঁদতে শুরু করল হঠাৎ। আমীর কোনো কথা বলছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কম্পিউটার স্ক্রিনে। স্নেহা আমীরকে সজোরে একটা ধাক্কা মেরে বিছানায় এসে বসল। অভিযোগ করে বলল,” আমি বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে তোমার এমপ্লয়িরা ম্যাডাম, ম্যাডাম করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার গায়ে ফুল ছিটাতে লাগল। অথচ তোমার দেখা নেই। তুমি আছো তোমার কাজ নিয়ে। এতোদিন পর আমি ফিরলাম কিন্তু তোমার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। আচ্ছা তুমি কি আমাকে একটুও মিস করোনি?”

স্নেহা জানে আমীরের উত্তর ‘না’ হবে৷ তবুও কেন প্রশ্নটা করল? কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। যদি কোনোভাবে উত্তরটা বদলানো যায়, সেই আশায়! কিন্তু স্নেহার জীবনে কিছু বদলায়নি। আমীর আগে যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। তিনমাসেও যেখানে কিছু পরিবর্তন হয়নি সেখানে তিনবছরে কিছু পরিবর্তন হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

_________
তোহা নিজের ঘরে উশখুশ করছে। পুরো ঘরময় প্রায় দশবার চক্কর কাটল। কিন্তু অস্থিরতা কমল না। তাকে আসলেই ঘরবন্দী রাখা হয়েছে। কেউ তাকে বের হতে দিচ্ছে না। এভাবে সারাদিন ধরে সে একটা মেয়ের ভয়ে ঘরে বসে থাকবে নাকি? এতোই যখন বউয়ের ভয় তাহলে তোহাকে এনেছে কেন এখানে? বাইরে থেকে মেইন গেইট খোলার শব্দ এলো। তোহা দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখল একটা বিশাল গাড়ি বের হচ্ছে। সম্ভবত আমীর আছে গাড়ির ভেতরে। সে ছাড়া এতোরাতে গাড়ি নিয়ে আর কেইবা বের হবে? তোহার মনে হলো এইতো সুযোগ! সে এখন আমীরের অনুপস্থিতিতে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। ফিরে এসে আমীর তাকে খুঁজে পাবে না৷ এটাই তার শাস্তি৷ তোহা প্রথমে চিঠি লেখা সম্পন্ন করল।

শ্রদ্ধেয় আমীর সাহেব,

সালাম নিবেন। আপনার বাড়িতে মেহমান হিসেবে আমি সাতদিন ছিলাম। একদিনও আমার আদর-যত্নের কমতি হয়নি। আমি পরিতৃপ্ত, সন্তুষ্ট। তবে আপনার বাড়ি ছেড়ে আমাকে যেতে হবে। আপনি আমার বাবাকে কথা দিয়েছিলেন। আমাকে ইটালি পৌঁছে দিবেন। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আপনার কথা আমি আপনাকে রাখতে দিতে পারব না৷ এই বাড়িতে আমি আর এক মুহূর্ত টিকতে পারছি না। আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। আমি ইটালিও যেতে চাই না। আমাকে ক্ষমা করবেন আপনাকে না জানিয়ে এভাবে চলে যাচ্ছি তাই। আমি বিদায় নিচ্ছি, আপনি ভালো থাকবেন।”

এতোটুকু লেখার পর তোহা নিচে গুটি গুটি করে আরও কয়েক লাইন লিখল। তারপর একটানে কেটে দিল। অথচ কেটে দেওয়ার পরও লেখাগুলো দেখা যাচ্ছিল-

” আপনার স্ত্রী খুব সুন্দরী। আমি দূর থেকে দেখেছি। মনে হয় সে খুব ভালো মেয়ে। আপনারা সবসময় একসঙ্গে ভালো থাকুন, এটাই আমার দোয়া।
-মায়া।”

তোহা চিঠিটা ভাঁজ করে ড্রয়ারে রাখল। এবার সে তৈরী হয়ে নিচে নামল৷ তাকে প্রথমেই মেইন গেইটে থামানো হলো।

” কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম?”

” বাইরে হাঁটতে যাচ্ছি।”

” স্যরি ম্যাডাম, স্যারের অনুমতি ছাড়া আপনি বের হতে পারবেন না।”

তোহা রাগে-ক্রোধে ফেটে উঠল,” মানে? আপনাদের স্যার কি আমার গার্ডিয়ান যে তার অনুমতি ছাড়া বের হওয়া নিষেধ?”

গার্ড শান্ত স্বরে বলল,” মেইন গেইট খোলা সম্ভব না। স্যার চাবি নিয়ে গেছেন সাথে করে। যতক্ষণ তিনি না ফিরছেন ততক্ষণ কেউ বের হতে পারবে না।”

বিরক্তিতে তোহার কপাল কুচকে গেল। কি অদ্ভুত ব্যাপার! নিজেকে বন্দিনি মনে হচ্ছে তার। সে ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিল। হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে উপরে তাকাল গার্ড। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তোহাও তাকাল।একজোড়া সুন্দর চোখ তোহাকে পর্যবেক্ষণ করছে উপর থেকে। সেদিকে তাকাতেই চমকে উঠল তোহা। স্নেহা মৃদু হাসল। মেয়েটার হাসি অসম্ভব মিষ্টি! তোহার সর্বাঙ্গ তীব্র ঈর্ষায় জ্বলে-পুড়ে উঠল।

চলবে

®Sidratul Muntaz