কাননবালা পর্ব- ৪২ ( শেষ অংশ)

0
1287

#কাননবালা!
#আয়েশা_সিদ্দিকা
শেষ পর্ব

ফাল্গুনীর পাতা ঝড়া বিকেল।প্রকৃতিতে মৃদুমন্দ সমীরণ। জ্বলজ্বলে সূর্যের আলো মিয়িয়ে আসছে।নরম সন্ধ্যা আলোর পেলবতা ছুঁয়ে দিচ্ছে চারপাশ।
সেই নরম আলোয় গা ভিজিয়ে,টুপটাপ ঝরে পরা পাতার ঝিরিঝিরি শব্দ মিলিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে।হাঁটার গতি মন্থর! পাড়টানা ছাই রঙা সুতি শাড়ির আঁচলখানি মাটি স্পর্শ করেছে মেয়েটির অজান্তেই!চোখ দুটো কেমন রুক্ষ, বিষন্ন! ঠোঁটের কোণে চাপা অভিমান।এই সুক্ষ্ম সূচালো অভিমান কার উপর?মেয়েটি বুঝতে পারছে না। নিজ ভাগ্য নাকি ওই উপরে বসে থাকা সৃষ্টিকর্তার উপর! কিছুই বুঝতে পারছে না। মেয়েটি হাঁটছে আলস্য পায়ে, ক্লান্ত শরীরটা টেনে টেনে। একটু খানি সুখ,একটু প্রাণোচ্ছল হাসি যেন কোন অলিক স্বপ্ন! বুকের ভাঁজে বিধ্বস্ত অনুভূতির হাহাকার। চোখ জ্বলছে।জ্বলছে মনভূমি অঞ্চল! মেয়েটি রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে পড়ে।নিঃশ্বাস আটকে আসছে যেন। হা করে বড় বড় শ্বাস নেয়। চঞ্চল চড়ুইর মত দিগ্বিদিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। নিজেকে বড় একা মনে হয়। আবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করে আকাশ পানে দৃষ্টি মেলে কষ্টমিশ্রিত চোখে হাসে! মেয়েটি বড় অদ্ভুত! ছোট থেকেই একদলা কষ্টে জড়াজড়ি করেও হাসতে জানে।
মুহুর্তেই মেয়েটির টনক নড়ে। সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মাটি ছুঁই ছুঁই শাড়ির আঁচলটা যত্নে তুলে কাঁধে ফেলে।হাতের ইশারায় রিকশা ডেকে উঠে পড়ে। ঠিক তখনই মেয়েটির সেলফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষালী গমগমে অস্থির স্বরে বলে ওঠে, “তুই ঠিক আছিস নীতু?”

“আমি ঠিক আছি দাদাভাই।এবং খুব ভালো আছি।” ভীষণ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ।

জায়েদ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে।
নীতু ফিসফিস করে বলে,”আমি সত্যিটা জানতে চাই দাদাভাই। সেই সত্যিটা যতই কুৎসিত হোক তবুও আমি জানতে চাই।এত দ্বিধা, সন্দেহ, কষ্ট নিয়ে বাঁচা যায় না।জানো তো দাদাভাই,তোমার বোন এতটাও শক্ত নয়!সব হারিয়েছি, এখন একটু স্বস্তির আফসোস আর করতে চাই না। ”

নীতুর বলার আঁচে জায়েদ কেঁপে ওঠে। আজকের রাতটা শুধু। এরপর হয়তো কিছু কুৎসিত সত্যি বেড়িয়ে আসবে নতুবা সব ঠিক থাকবে।অজানা ভয়ে জায়েদের শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। সব কিছু ঠিক হবে তো? নাকি আবার এলোমেলো হয়ে যাবে?

********

কলিং বেলটা বেজে উঠতেই রুশিয়া বেগম সচেতন হোন।তটস্থ পায়ে হেঁটে এসে সদর দরজা খুলতেই নীতুর শান্ত মায়াবী মুখটা দেখে একগাল হেসে ওঠেন। নীতুও ক্লান্ত ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে শাশুড়ীর হাসির বদলে হাসি দেয়। রুশিয়া বেগম বুঝে যান। নীতুর কিছু একটা হয়েছে। নীতু চুপচাপ নিজের ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে নিজের রুমে প্রবেশ করে। হ্যান্ডব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে মেরে বিছানায় শুয়ে পড়ে।ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা ক্রমেই জড়িয়ে আসতে শুরু করে।

রুশিয়া বেগমের মন খারাপ হয়ে গেলো। নীতুর দৈন্যদশা তাকে ক্রমেই কাতর করে ফেলছে। ধীরপায়ে হেঁটে রুমে যায় তিনি।নীতুকে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে দেখে ভাবেন চলে যাবেন।পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলে নীতুর শিয়রে বসে পড়েন। মা মা দৃষ্টিতে বুঝে ফেলেন, নীতু ঘুমায়নি। কিছু একটা হয়েছে তার মেয়ের।সেই কিছু একটা তার শক্ত মেয়েটিকে ভেঙে চূড়ে দিচ্ছে। রুশিয়া বেগম সরলেন না।আলতো হাতে মেয়ে সম ছেলের বউয়ের মাথায় হাত বুলাতে শুরু করলেন।

নীতু বুঝলো এই আদর মাখা মমতায় মিশে আছে তার জন্য গভীর চিন্তা। নীতু তবু নড়লো না।চাইলো না।কেবল চোখ বুঝে থম মেরে পড়ে রইলো।
নীতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রুশিয়া বেগমের সেই ভয়ংকর সন্ধ্যাটার কথা মনে পড়ে গেলো।যেই সন্ধ্যায় তার ছেলের বউ নিয়ে ফেরার কথা।অথচ তার বদলে একটা দুঃসংবাদ এসেছিল তার দ্বোর গোড়ায়! কি ভয়ংকর সবকিছু।সবাই পাগলের মত ছুটেছিল সেই স্পটে।কিন্তু তিনি ঠায় বসে রয়েছিলেন বরণডালা নিয়ে। রুমি পাগলের মত কাঁদতে কাঁদতে তাকে ধরে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলো।কত মানুষ করিডোর জুড়ে।কেউবা দুই পক্ষের আত্মীয় স্বজন। কেউবা কৌতুহলী হয়ে দেখছে মর্মান্তিক ঘটনা।সবার আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিল চারপাশ।দুটো স্ট্রেচারের উপর শুয়ে আছে দু’জন। বিয়ের পোশাকে দুজন আবরিত! রক্তে রাঙায়িত তাদের অবয়ব!কি অদ্ভুত ভয়ানক দৃশ্য!
রুশিয়া বেগমের চোখ ভিজে আসে।আঁচলে চোখ মুছেন।সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে আজও তার বুক কাঁপে।

চিন্তিত মুখে কোলে সাত মাসের ছেলে নিয়ে রুমি নীতুর রুমে প্রবেশ করে।শাশুড়ীকে ভেজা চোখে বসে থাকতে দেখে বুঝে ফেলে সেদিনের সেই কাল রাতের স্মৃতি মনে করে কাঁদছে। রুমি নিজেও শান্ত ভঙ্গিতে পায়ের কাছে বসে থাকে।খাটের উপর বিধ্বস্ত মুখশ্রীর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রয় অপলক চোখে!
রুমির কাছে নীতু হলো এক আশ্চর্য মেয়ে।এত এত তীব্র কষ্ট অথচ মেয়েটা কতটা শান্ত,ধীর! রুমি নিজেও এতটা পারতো না।নীতুর মত মেয়েরা হয়তো কষ্ট সইতে সইতে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়।

রুমির চোখেও ভেসে ওঠে সেই কাল রাত্রি। অভীকের ইনজুরি ছিল বেশি।মাথায় তীব্র আঘাত।পাজর ভেঙে গিয়েছিল। হাতে পায়ে অজস্র জখম। নীতুর পেটে ছিল অজস্র কাঁচের টুকরোর আঘাত।ওভারিতে পর্যন্ত ঢুকেগিয়েছিল।অন্যান্য জখম আর প্রচুর রক্তক্ষরণে দুজনেই মৃতপ্রায়। ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।সেই মুহুর্তে রুমির মনে হয়েছিল কেয়ামত বুঝি এসে গেছে। দুটো নিঃস্ব মায়ের আহাজারি আর অভীক নীতুর ভাইবোনদের জড়াজড়ি কান্নায় পুরো হসপিটাল কেঁপে উঠেছিল।সবার একটাই মিনতি।বেঁচে ফিরুক স্বপ্নবাজ মানুষদুটো।যাদের একসাথে বাঁচার কথা ছিল,ভালোবাসার কথা ছিল,ঘর সাজানোর কথা ছিলো! কিন্তু একসাথে মরার কথা তো ছিল না!

অভীক কোমায় চলে গিয়েছিল। আর নীতু দীর্ঘ সাতাশ দিনের মরণ যন্ত্রণা সয়ে বেঁচে তো ফিরেছিল কিন্তু সেই সাথে হারিয়েছিল মাতৃত্ব! সেই নির্বাক নীতুকে দেখে কেঁদেছিল বুঝি পাষাণও। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে নীতু উঠে দাঁড়িয়েছিল।নিস্তেজ মানুষগুলো কে আশা দিয়েছিলো।অনীকের হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিলো,”আমার অভী-কে মাদ্রাজ নেয়ার ব্যবস্থা করুন ভাইয়া।যতদ্রুত!আর না হলে আমার জ্যান্ত দাফনের ব্যবস্থা করুন!”

এই এতটুকুরই বুঝি দরকার ছিল। ডাক্তারের কথায় আশা ছেড়ে দেয়া প্রত্যেকে আবার আশা দেখেছিল।শাশুড়ী মা নীতুর কোমড় জড়িয়ে কেঁদেছিল শিশুর মত।সেই শিশু মাকে নীতু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল,”কাঁদবেন না মা।অভীক কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করবে না।ও ফিরবে!আমার কাছে,আপনার কাছে!আমাদের এখনো অনেক হিসেব বাকি যে! ওকে যে ফিরতেই হবে!”

সেই দূর্বল নিস্তেজ নীতু অভীকের জন্য গোটা পৃথিবীর সাথে লড়েছে।অনীক, জায়েদ মাদ্রাজে থাকাকালীন সময় অবাক হয়ে দেখতো ধৈর্য্যশীল নারীকে।যে জোর করে খেতো না খাওয়ার মত!যে নিভু চোখে চেয়ে থাকতো নতুন ভোরের জন্য! যে ঠোঁট নাড়াতো প্রিয় মানুষটার জন্য!

আল্লাহর ইচ্ছে হয়তো ছিলো অন্যরকম।ভালোবাসা ময় দুটো মানুষকে ভালোবাসার তীব্র দহনে ফেলে পরিক্ষা করছিলো।একমাস সতেরো দিন পর অভীক কোমা থেকে ফিরে।মাথা আর পাজরের জন্য করা হয় তিনটা অপারেশন।
রুমির মনে আছে অনীক তাকে ফোন করে সেই সময়ের ঘটনা বলতো আর কাঁদতো।অনীকের নীতুকে নিয়ে ভয় হতো।কখন যেন ডাক্তার দুঃসংবাদ দেয় আর অর্ধমৃত নীতু পুরোপুরি মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে। জায়নামাজের পাটিতে বসে রোজা রাখা স্ত্রীটিকে স্বামীর জন্য প্রার্থনায় মত্ত থাকতে দেখতো।অনীক,জায়েদ আশ্চর্য হতো।এত মনোবল!এত ধৈর্য্য! এত আত্মবিশ্বাস কি করে কোন নারীর থাকতে পারে!এই নারীকে উপেক্ষা করা কি এতই সহজ?

সৃষ্টিকর্তা উপেক্ষা করতে পারে নি।গোটা চারটা মাস লেগেছিল অভীকের পুরো সুস্থ হতে।সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটির জন্য তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করা নীতু অভীকের সুস্থতা শুনেও সামনে দাঁড়ালো না।অনীক, জায়েদ ভীষণ বিস্মিত হয়েছিলো।এই খবরে গোটা পরিবার খুশিতে ভাসছিল অথচ নীতু ছিল নির্বেকার।হোটেল রুমে শুয়ে বসে থাকতো আর পড়ে পড়ে ঘুমাতো।অভীক কে প্রথম থেকে সব খুলে বলেছিল অনীক।সব থেকে বড় বিস্ময় অভীকও একবার বললো না, নীতুকে নিয়ে আসতে। জায়েদ, অনীকের বুক কেঁপে উঠেছিল।অজানা ভয়ে! আবার কোন ঝড় আসছে না তো? অভীক কি তবে নীতুর অক্ষমতা মানবে না?

ঠিক সাতদিন পর লাল রঙের একটা শাড়ি পরে,খোলা চুলে নীতু হসপিটাল করিডোরে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো।স্নিগ্ধ রুপে!অনীকের মুখ আমচুর হয়ে গিয়েছিল। নীতুর অসম সাহসী রুপ অনীককে ততদিনে মুগ্ধ করেছিলো।ভাইয়ের এমন নিরাবতা যদি এই মেয়েটিকে কষ্ট দেয়? তবে?মরে যাবে তো নীতু!

নীতুকে একা ছাড়লো না।কেবিনে জায়েদ,অনীক তারাও প্রবেশ করলো নীতুর সাথে। ভয়ে তাদের কলিজা কাঁপছে।

অভীক হসপিটালের বেডে আধশোয়া হয়ে কাচের দেয়াল গলে দূরের আকাশ দেখছিলো।শরীর সুস্থ হলেও অসুস্থতার ছাপ এখনো দূর হয়নি। শুভ্র মুখটা কেমন মলিন।চোখের দৃষ্টি নিষ্প্রাণ।
দরজা খোলার শব্দে অভীক তাকালো।নীতুকে দেখা মাত্র নিষ্প্রাণ চোখে যেন মৃদু ঝিলিক দিয়ে উঠলো। ঠোঁটের কোণটাও হালকা প্রসারিত হলো বুঝি? কে জানে!

নীতু শ্লথ পায়ে হেঁটে অভীকের বেডে গিয়ে বসলো। ঠিক অভীকের বুকের কাছ বরাবার। অভীকের কপাল কুঁচকে গেলো।দন্ডায়মান দুটো আহাম্মককে দেখে মেজাজ খারাপ হলো।সেই আহাম্মকেরা কিন্তু কিছু বুঝলো না।তারা দুরুদুরু বুকে চেয়ে রইলো।
নীতু পদ্ম ডাগর চোখে চঞ্চল দৃষ্টি মেলে অভীককে পরখ করলো।খুব সূচালো ভাবে!কখনো ভালোবাসার দৃষ্টিতে! কখনো ব্যথিত দৃষ্টিতে!
আলতো হাতে শুভ্র ব্যান্ডেজে হাত বুলালো।হাত বুলালো অভীকের শুভ্র মুখটিতে! কি তৃষ্ণার্ত চাহনি! পিপার্সাত মন।
আলতো করে অভীকের বুকে মাথা রাখলো।অভীক কেঁপে উঠলো! নীতু ফিসফিস করে বললো,””আমার অস্তিত্বকে হারিয়ে আমি আপনাকে পেয়েছি!তবে কি আপনাকে আমি সত্যিই পেয়েছি, অভী?”

কি ব্যথাতুর অভিমানী কন্ঠ!

“পেয়েছো।”….. অভীকের কন্ঠস্বর ভেজা শোনালো।খানিকটা কাঁপলও বুঝি। নীতু কাঁদছে না।তবুও অভীক খোলা চুলে হাত বুলাচ্ছে। অভীকের চোখ দুটো কেমন অশ্রুসিক্ত!

অনীক জায়েদ হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।কি নির্ভার প্রাণোচ্ছল কথা।’আপনাকে কি আমি পেয়েছি?’ সত্যিই তো নীতু নারীর মূল অস্তিত্ব হারিয়েছে।মাতৃত্বহীন নারী কি সত্যিই অভীককে পেয়েছে? অভীকের ছোট্ট উত্তর বলে দিলো সবকিছু! দু’জনেই যেন জেনে গেলো শত প্রতিবন্ধকতা শেষেও তারা একে অপরের।ভালোবাসতে
সবাই পারে।কিন্তু সকল খারাপ পরিস্থিতিতে সেই ভালোবাসাকে ভালো রাখতে সবাই পারে না!

অনীক আর জায়েদকে জড়াজড়ি করে কাঁদতে দেখে অভীক কান্নামিশ্রিত কন্ঠে ধমকে বলে,” বড়ো,দাদাভাই তোমরা দু’জন এখানে কি করছো?তোমাদের জন্য বউটাকে একটু ঠিকমত জড়িয়ে ধরতে পারছিনা!কি বোকা তোমরা!”

ওরা দু’জন কান্না চোখে হাসতে হাসতে বেড়িয়ে গেলো।অভীক নীতুকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলো বুকের মাঝে।চোখ থেকে টপটপ করে পড়ছে অশ্রুকণা।কিন্তু আশ্চর্য! নীতু কাঁদছে না।একফোঁটাও না।চোখের দৃষ্টি কাচের দেয়াল গলে দূর আকাশে।ক্লান্ত মস্তক অভীকের প্রশস্ত বুকে। অভীক একসময় মৃদু স্বরে ডেকে ওঠে ,”কাননবউ?”

“হুম।”

“ভালোবাসি!”

“আমিও!”…. নীতুর নিরব কন্ঠ।

অভীক আরো একটু শক্ত করে ধরে নীতুকে।নীতু ঘাপটি মেরে পরে থাকে বুকের ভাজে।খোলা চুল ফ্যানের বাতাসে উড়তে থাকে।নীতুর চোখে অদ্ভুত শান্তিতে ঘুম নেমে আসে। নীতু বিড়বিড় করে বলে,” এইখানটায় এত শান্তি কেন অভী? এত শান্তি এইখানটায় পুষে কেন রাখলেন?আপনি ছাড়া সকল কিছু কেন এত অশান্তিময়?কেন অভী?”

অভীক কিচ্ছু বললো না।শুধু শক্ত করে ধরে রাখলে তার কাননবউকে।

সেই সব স্মৃতি আজ শুধুই বেদনার। দেড় বছর আগের স্মৃতি না চাইতেও সামনে আসে। রুমি তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে শাশুড়ী মাকে রুম থেকে নিয়ে যায়।

রুশিয়া বেগম সোফায় বসে হাহাকার করে বলে,”ও রুমি আমার মেয়েটার আবার কি হলো? ”

রুমি নিজের চিন্তা আড়াল করে বলে,”কিচ্ছু হয়নি মা।আমাদের নীতু খুব সাহসী। কোন কিছু ওকে ভেঙে দিতে পারবে না। হয়তো মনটা ভালো নেই।”

রুশিয়া বেগমের চিন্তা দূর হয় না।রুমি অতুল কে কোলে নিয়ে নীতুর রুমের দরজার উড়ন্ত পর্দাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। মাদ্রাজ থেকে ফেরার পর এই বাড়িতে উৎসব লেগেছিল।কিন্তু সবাই যেন নীতুকে আক্রমণ করতেই লেগে পড়েছিল।নীতু অপয়া!বিয়ের দিন না হলে কেন ওমন ঘটনা ঘটলো?তারউপর মা হতে পারবে না।বন্ধ্যা!সকল কথা কানে গেলেও নীতু ছিল নির্বেকার।এক্সিডেন্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত নীতুকে কেউ কাঁদতে দেখেনি।সবার কথায় তখনও কাঁদলো না। শাশুড়ী মা সবার উপর রেগে গিয়েছিলেন।সবাইকে বলেছিলেন,”যাদের মনে হয় আমার বউ অপয়া তাদের বলছি,ওই গাড়িতে শুধু নীতু নয় অভীকও ছিল।তবে অপয়া দুজনেই।আর যদি বলেন নীতু বন্ধ্যা?তবে বলবো আমার সন্তানরা যদি আজ বেঁচে না থাকতো তবে কি এসব বলতে পারতেন?কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয়।আমার সন্তান ফিরছে।এই যথেষ্ট। আর আজকাল বাচ্চা কত ভাবে আনা যায়।তাই যারা যারা এই অহেতুক চিন্তা করছেন তারা এখুনি বের হোন।আপনাদের কু নজর আমার পরিবারে আর চাই না।আমরা ভালো থাকতে চাই।”
শাশুড়ী মার কথায় সেদিন রুমি ভীষণ গর্বিত হয়েছিলো।এমন একটা পরিবারকে সে কি না আগে অবহেলা করতো?ছি!নিজের উপরও ঘৃণা হয়েছিল।

নীতুর কাছে রুমির অনেক ঋন।অতুল জন্ডিস নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিল।শিশু ওয়ার্ডে রাখতে হয়েছে টানা দশদিন।ওই সময় নীতু দিনরাত এক করে অতুলের কাছে থেকেছে।তাই তো আজ অতুলের মামণির স্থান পেয়েছে নীতু। অতুল উসখুস করে ওঠে। তার মামণি আজ তাকে একবারো কোলে নেয়নি।আদর করেনি।ছোট্ট শিশুটির এমন ছটফটে স্বভাবে রুমির মন খারাপ হয়ে যায়।রোজ অফিস শেষে নীতু বাড়ি ফিরে অতুলকে নিয়ে পরে থাকে।তখন হাতে পায়ে ঝাড়া দিয়ে রুমি ঘুরেফিরে।কখনো অনীকের সাথে বাহিরে যায়। নিজেকে সময় দেয়।

অভীক ফিরলো রাত দশটায়। অভীককে দেখে অনীক মেজাজ খারাপ করে বললো,”এত দেরি কেন করেছিস?অফিস কি তুই একলাই করিস? ”

অভীক সোফায় গা এলিয়ে বলে,”মেজাজ দেখাচ্ছো কেন বড়ো?কাল বিদেশি ক্লায়েন্ট আসবে। অনেক কাজ ছিলো।”

“তুই তোর কাজ নিয়ে থাক।নীতুর কোন খবর কি রাখিস? মেয়েটা বাড়ি ফেরার পর থেকে নিজের রুমে শুয়ে আছে।কোন কথা বলছে না।কি হলো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

অভীক আলতো হাসে।ভাইয়ের কপালে নীতুর জন্য চিন্তার ভাঁজ দেখে ভালোও লাগে।ভাবি আর মাকে চিন্তিত মুখে বসে থাকতে দেখে বলে,”চিন্তা করো না ভাইয়া।নীতুর মনোবল সবার মত না।ও নিজেকে ভেঙে চূড়ে গড়ে নিতে জানে।তাই তো তোমার ভাই তাকে এত ভালোবাসে। আর সবকিছুর জন্য আমি তো আছি!এত চিন্তা কিসের?”

‘আমি তো আছি’ এই বাক্যটা অনীকের চিন্তা দূর করে দেয়। অভীক টাইয়ের নটটা লুজ করতে করতে রুমে যায়। নীতুকে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে দেখে বিছানার উপর ঝুঁকে নীতুর কপালে আলতো চুমু দেয়।মাথায় হাত বুলিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় শাওয়ার নিতে। শাওয়ার নিয়ে ট্রাউজার পরে খালি গায়ে এসে নীতুর পাশে শুয়ে পড়ে।সদ্য গোসল করা ঠান্ডা শরীর দিয়ে নীতুকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। হিম শীতল করা স্পর্শে নীতু কেঁপে ওঠে।সেই আলতো কাঁপন টুকু বুঝতে পেরে অভীক মৃদু হাসে।জোর করে নীতুকে নিজের দিকে ফিরিয়ে গালের দু’পাশে আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে বলে,”অভিনয়ে তুমি বড্ড কাঁচা কাননবউ।তবুও মিছে কষ্ট কেন করো?”

নীতু টিপটিপ করে তাকায়। অভীক টুকুস করে নীতুর নাকের ডগায় চুমু খায়। মৃদুহেসে অভীকের নগ্ন বুকে মুখ গুঁজে নীতু।অভীক একহাতে নীতুকে আরো কাছে টানে।আরেক হাতে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,”জানতে চাইবো না এই মন বিষন্নের কারণ কি?জানতে চাইবো না কোন কষ্ট লুকাচ্ছো আমার বুকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে? তোমার যখন ইচ্ছে হবে তখন বলো।শুধু এতটুকু বলবো, তোমার কষ্ট মাখা মুখ আমার অসুখের কারণ কাননবউ!তা কি তুমি জানো না?নাকি জেনেও আমাকে অসুখে ভুগাতে ভালো লাগে তোমার?”

নীতু কিছু বলে না।নিজেও অভীককে আঁকড়ে ধরে জোড়ালো ভাবে।মিশে যেতে চায় ওই আকাশের মত প্রশস্ত বুকে। যেখানে কোন নোংরামি নেই,নেই কোন কপটতা! আছে শুধু নির্মল ভালোবাসা!

অভীকের কন্ঠে দুষ্টুমির আভাস।নীতুর কানে ফিসফিস করে বলে,”তুমি দিনদিন দুষ্ট হয়ে যাচ্ছো কাননবউ!শুধু আদর নেয়ার বাহানা খোঁজো। বললেই তো হয়। আমি কি আর না করি?”

নীতু অভীকের বুক থেকে মুখ তুলে চোখ গরম করে তাকায়। অভীক ঠোঁট কামড়ে হাসে।নীতু মেজাজ দেখিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ে।অভীক এবার গা দুলিয়ে শব্দ করে হেসে ফেলে।

*********

নীতু যখন জায়েদের কল পেলো তখন মধ্য দুপুর।দুপুরী রোদে চরাচর খাঁ খাঁ করছে।অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নীতু বেড়িয়ে পড়ে।অভীক একবার জানতে চাইছিলো কিন্তু অফিসে আছে বলে কোন জোড় করতে পারে নি।

জায়েদ একটা নির্জন পার্কে বসে পায়চারি করছে।হাতে কিছু আশ্চর্য মূলক সত্য প্রমাণের কপি। জায়েদে মাথা ধরে আসে।ভোঁতা যন্ত্রণায় ফেটে পড়ছে মাথা।দূর থেকে নীতুকে হন্তদন্ত পায়ে হেঁটে আসতে দেখে জায়েদ ফাঁকা ঢোক গিলে।মেয়েটিকে কি করে দেখাবে সব? বেঁচে থেকেও যে মরে যাবে মেয়েটা!

নীতু সামনে এসে দাঁড়ায়। উত্তেজনায় হাত পা কাঁপছে নীতুর। নীতুর হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে জায়েদ ফাঁকা বেঞ্চ টাতে বসে পড়ে।নীতু স্তব্ধ দৃষ্টিতে কাগজে স্বীকারোক্তি মূলক বাণী পড়ে।চোখে তখনও একরাশ অবিশ্বাস। জায়েদ ব্যথিত দৃষ্টিতে নীতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা এ জীবনে আর কত আঘাত সইবে?

নীতু অস্ফুটে বলে, “দাদাভাই? আমার ধারণা মিথ্যে কেন হলো না?মিথ্যে কেন হলো না?”

ক্ষণকাল পরেই নীতু হাতের মুঠোয় কাগজটা শক্ত করে ধরে উল্টো পথে হাঁটা ধরে।জায়েদ হতভম্বের মত কতক্ষণ চেয়ে থেকে নিজেও নীতুর পিছু নেয়।

*******

এক্সিডেন্টের পর যখন সব কিছু ঠিক হতে চলছে তখন হুট করেই একদিন নীতু ফোন করে বললো জায়েদকে,”দাদাভাই ওই নির্জন রাস্তায় ওত বড় ট্রাক কি করছিল? আর পুরো রাস্তা ফাঁকা থাকতে কেন ধাক্কা দিতে হলো? আমার সন্দেহ হচ্ছে দাদাভাই।তুমি খোঁজ নেও।আমি সত্যিটা জানতে চাই।”

জায়েদ আপ্রাণ চেষ্টা চালালো।কিছুই জানতে পারলো না।সময় গড়াতে লাগলো।পরে এ ব্যাপরে রিশাকে নীতু বললো। রিশা কি করে যেন সেই ট্রাক ড্রাইভারকে ধরে ফেললো।আস্তে আস্তে টোপ ফেলে তাকে আয়ত্তে এনে সব জানলো।পুলিশের হেফাজতে কাল রাতে সব কিছু স্বীকার করেছে গাড়ি চালকটি।যেখানে সে স্পষ্ট ভাবে বলেছে,সব কিছু সে তাজের কথায় করেছে।

********
অনবরত কলিং বেলের শব্দে সেতুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।এত অধৈর্য্য হয় মানুষ!
সদর দরজা খুলতেই নীতুর মুখটা দেখে বিরক্তি উবে গিয়ে একরাশ খুশি ঝলমলিয়ে উঠলো। নীতুর তখন বিধ্বস্ত অবস্থা!কলিজা পুড়ছে!শরীর জ্বলছে!
বোনের খুশি মাখা মুখটা যেন আরো ব্যথিত করে তুললো। তেজস্বী কন্ঠে বললো,”তাজ কোথায়? ”

আপির বলার ভঙ্গিমায় সেতু চমকালো।আপির পিছনে চিন্তিত মুখে জায়েদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো অবাক হলো।সেতু কপালে ভাঁজ ফেলে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো।

রুমের পর্দা সরিয়ে তাজ বের হলো। কে এসেছে দেখার জন্য। বসার রুমে আসতেই রুদ্রমূর্তি নীতুকে দেখে চমকালো।এরি মধ্যে রুমে তাজের বাবা মাও এসে হাজির। নীতু তাজের সরল,নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো। নীতুর এমন রুপে সবাই অবাক! তাজ কিছু বলতে চাইলো কিন্তু পারলো না।মুহুর্তেই নীতু ঝড়ের মত ঝাপিয়ে পড়লো তাজের উপর।এলোপাতাড়ি চর থাপ্পড় দিলো।সবাই অবাক! তাজ চেষ্টা করলো বাঁধা দেয়ার কিন্তু পারলো না। নীতু যেন বদ্ধ উন্মাদ! তাজের দৃষ্টি ক্রমেই ভয়ে জড়িয়ে আসলো।নীতু থামলো।তাজের কলার চেপে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে দিলো। বহু দিনের জমানো কান্না!

কান্না,রাগ মিলে মিশে চিৎকার করে বললো,”কেন তাজ?কেন? এভাবে শেষ না করলেও পারতে!….. তাজ মেরে ফেলতে চাইছিলে আমায়?এতটাই ঘৃণা জমেছিলো! কেন করলে?মরিনি তাজ কিন্তু বেঁচে থেকেও মরে গেছি আমি।আমার মাতৃত্ব কেড়ে নিয়েছো তুমি! যে মানুষটা শুধু একটু সুখ দিতে চেয়েছিল আমায় তাকে তুমি চরম আঘাত করেছো।চিরজীবনের জন্য বাবা ডাক মুছে দিয়েছো!কেন করলে তাজ?আমাদের সম্পর্কের শেষ হয়েছিল তাজ কিন্তু শেষটা তো সুন্দর ছিলো!তুমি কেন সব কিছু ধ্বংস করলে!…….আমার প্রথম প্রেম তুমি,প্রথম ভালো লাগা,প্রথম পুরুষ হয়ে কি করে পারলে আমার সব শেষ করে দিতে? বুক কাঁপলো না একবারও? ভয় হলো না।যাকে ভালোবাসো তার মৃত্যু কামনা কি করে করলে? ”

ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে নীতু।কৃষ্ণ মুখশ্রী রক্তাভ!কণ্ঠমণি তে স্পষ্ট তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি! শরীরে বিষের আলোড়ন! তাজ নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে।নীতু পাগলের মত মেঝেতে বসে পড়লো।নিজের চুল খামছে ধরলো।বিড়বিড় করে বললো,”ঠকে গিয়েছি আমি।তীব্র ভাবে ঠকেছি।”

নীতু পুনরায় উঠে দাঁড়ায়। তাজের নত মাথা সোজা করে নিজ হাত দিয়ে।চোখে চোখ রেখে বলে,”বিশ্বাস করিনি তাজ।বারবার নিজেকে ভেঙেছি।তবুও বিশ্বাস করিনি। আমার সুখটুকু এভাবে কেড়ে নিলে!একদম নিঃস্ব আমি।তাকাও তাজ।লজ্জা পাচ্ছো?দেখো আমাকে।কি তীব্র হাহাকারে পুড়ছি।মা না হওয়ার যন্ত্রণা কুঁড়ে কুঁড়ে খায়! যখনই কোন ছোট্ট বাচ্চা দেখি বুকের মাঝে চেপে ধরি। স্বার্থপরটা বুঝতে পারছো? আমাদের মারতে চেয়েছিলে দেখো কি সুন্দর মরে গেছি।সেদিন সেই আঘাতে মৃত্যু না হলেও আজ বেঁচে থেকেও মৃত আমি!…..তাজ আমার জীবনে তোমার আগমণ অমাবস্যার মত!ঠিক যেন কুৎসিত কোন অভিশাপ! ”

নীতু আর কিছু না বলে ছুটে বেড়িয়ে যায়। তাজ অবাক চোখে নীতুর ঘৃণামিশ্রিত প্রস্থান দেখলো।জায়েদ কি করবে ভেবে পেলো না। কাকে সামলাবে?নীতুকে নাকি দেয়াল ঘেষে মেঝেতে বসা স্তব্ধ সেতুকে।জায়েদ মোবাইল বের করে অভীককে সংক্ষিপ্ত টেক্সট করে সেতুর কাছে যায়।সেতু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে জায়েদের মুখপানে। জায়েদ বসে পরে।সেতু আকস্মিক হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে জায়েদকে ধরে।জায়েদ প্রাণপণে নিজের চোখের জল আটকায়।সেতু চিৎকার করে কাঁদছে।তাজ দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চল! সেতুর এক একটা চিৎকারে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।জায়েদ চোখ বুঁজে! এত কষ্ট কেন চারপাশে?
,

#কাননবালা!
#আয়েশা_সিদ্দিকা
শেষ পর্বের বাকি অংশ।

*********
ফাল্গুনে বৈশাখী ঝড়।চারপাশ উত্তাল।নীতুর ভিতরের ঝড় প্রাকৃতিক এই ঝড়কেও হার মানায়। ঠিক সন্ধ্যা ক্ষণে টুপাটুপ বৃষ্টিতে ভিজে নীতু বাসায় আসে।রুশিয়া বেগম আৎকে ওঠেন।নীতুর চোখ টকটকে লাল।শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে।চোখে বহমান ঝর্ণাঅশ্রু! নীতু শাশুড়ী কে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মত কেঁদে ওঠে। নীতুর আহাজারিতে তিনি ভয় পেয়ে যান।রুমি ছুটে আসে। পরক্ষণেই নীতু ছুটে গিয়ে নিজের রুমে যায়। নিজেকে কি করে সামলাবে? কি করে বুঝাবে?

অভীক বাসায় ফিরে চিন্তিত মুখে।সারাপথ নীতুকে খুঁজেও পায়নি।বসার রুমে সবাইকে ভয়ার্ত চেহারায় বসে থাকতে দেখে অভীকের বুক তীব্র ভয়ে আলোড়িত হয়।নীতু ঠিক আছে তো?
ঠিক তখনই কারো কান্নার শব্দে চমকে ওঠে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়।রুমের পরিস্থিতি বিধ্বস্ত! বিছানার চাদর,বালিশ ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে।নীতু মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে।চোখ দুটো কেমন নিষ্প্রাণ! থেমে থেম কাঁদছে।নিজেকে খামছে ক্ষত বিক্ষত করছে।অভীক ব্যস্ত হাতে নীতুকে আঁকড়ে ধরে।নিজেও মেঝেতে বসে নীতুকে কোলের মাঝে নিয়ে আসে।নীতু হিতাহিতজ্ঞান শূন্য। পাগলের মত কাঁদছে।অভীক শক্ত করে চেপে ধরে রাখে! যে সত্যটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছে আজ তা প্রকাশ পেয়েই গেলো।এই ভয়টাই পাচ্ছিল অভীক।নীতু আপন মানুষের থেকে পাওয়া আঘাত সইতে পারবে না। অভীক নীতুর এলোমেলো চুল কোনরকম গুছিয়ে দিয়ে চোখের জল মুছে দিয়ে বলে,”শান্ত হও।কিচ্ছু হয়নি।দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাও। জানো তো সৃষ্টিকর্তা উত্তম পরিকল্পনাকারী!”

নীতু শান্ত হয় না।বাহিরের তুমুল ঝড়ের মতই অশান্ত আজ সে।অভীকের মায়া হয়।কেন এই মেয়েটাকে সে পরিপূর্ণ সুখ দিতে পারলো না।অভীক হাতের পিঠে নীতুর চোখ মুছে দিয়ে বলে,”কাঁদিস না পাগলী! তোর চোখের একবিন্দু জল আমার কলিজা এফোঁড়ওফোঁড় করে দিতে যথেষ্ট! ”

নীতু ফুঁপিয়ে ওঠে। ফিসফিস করে বলে,”আমাকে ধরো না অভী!পাপী আমি।আমার পাপে আজ তুমি নিঃস্ব।”

অভীক ধমকে ওঠে,”আজেবাজে কথা বললে মারবো কিন্তু! ”

নীতু আবার কেঁদে ফেলে।অভীককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,”আমি মা হতে পারবো না অভী।কখনো না।তুমি বাবা ডাক শুনবে না।কেউ আমাদের ঘরে ছোট ছোট পায়ে হাঁটবে না।এই তীব্র কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে।আমি তোমার সব শেষ করে দিলাম।আমাকে ভালোবেসে ভুল করেছো অভী!তোমার শূন্যতাটুকু আরো শূন্য করে দিলাম!”

অভীক নীতুকে হাত পায়ের বাঁধনে শক্ত করে আটকে ধরে বলে,” ভালোবেসে ভুল করেছি আর বলো না নীতু।ভালোবাসি তো!বাচ্চা নেই মানে আমরা সুখী না।তাতো না! আমরা সুখী হবো তুমি আমি মিলে।ঠিকাছে?”

ঠিক তখনই রুমি এসে দাঁড়ায় দরজায়। মুখটা মলিন। নীতু নীরবে কাঁদছে।অভীক বলে,”ভাবি কিছু বলবে?”

“অতুলের যেন কি হয়েছে অভীক।সকাল থেকে কিচ্ছু খাচ্ছে না।কেমন যেন করছে…..” শঙ্কিত কন্ঠে বলে রুমি।

মুহুর্তেই নীতু নিজের কান্না ভুলে যায়।তটস্থ পায়ে উঠে দাঁড়ায়। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে রুমিকে বিরক্তি নিয়ে বলে,”আমাকে আগে কেন বলো নি ভাবি?তুমি যে কি? মা কেবল মুখে মুখে!”…. বলেই অতুলকে কোলে নিয়ে উল্টে পাল্টে পরখ করে।মামণির কোলে গিয়ে অতুলও লেপ্টে থাকে। নীতু অতুলকে কোলে নিয়েই রান্নাঘরে ছুট লাগায়। যেতে যেতে আহ্লাদী স্বরে বলে,”অতুল সোনা!কি হয়েছে বাবা? খাচ্ছো না কেন?সুপ নুডলস খাবে? চলো এখনি রেঁধে ফেলি!”

রুমি আলতো হাসে।অভীক ভাবির দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকায়। অতুল না হলে কি করে এই ঝড় সামলাতো সে?

******-

মাঝ রাত।ঝড় শেষ হয়েছে মাত্র। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে চারপাশ। তার রেশ বুঝি এই চারকোণা রুম জুড়েও। সেতু বসে আছে রুমের এক কোণে রাখা বেতের চেয়ারে।চোখের দৃষ্টি শূন্য!

বিছানায় ঘুমিয়ে আছে তাদের দেড় বছরের মেয়ে আয়াত। তাজ ঘুমন্ত মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। মেয়েটা দেখতে হয়েছে অবিকল নীতুর মত।চোখ দুটো ভাসা ভাসা। গাল দুটো হালকা চাপা!উপরের ঠোঁটটা কেমন অভিমানী!গায়ের রঙ কৃষ্ণ বর্ণ। তাজ ঝুঁকে মেয়ের কপালে চুমু খায়।
সেতু সবসময় বলতো,আয়াতকে পেটে নিয়ে আপিকে দেখেছি তাই আপির মত হয়েছে।
তাজেরও তাই মনে হয়।এই মেয়েটা তার জান।ছোট্ট আয়াত তার সকল দুঃখ মুছে দিয়েছে।অথচ বুকের কোণে ঠিকই আফসোস লেগে থাকতো।একটা অপরাধ বোধ! আজ বুঝি তারও অবসন হলো।

সেতুর কথায় তাজের ধ্যানভঙ্গ হয়। “মনে আছে আপিকে কি অবলীলায় স্বার্থপর বলেছিলে।আপিকে কি সত্যিই ভালোবাসতে তাজ?”

তাজ কথা বলে না। সেতু ফুঁপিয়ে ওঠে। মৃদুস্বরে বলে,”মেনে নিয়েছিলাম তো তাজ।থেকে গিয়েছিলাম তোমার কাছে।ধরে রাখতে পারলে কই?কেন ধরে রাখতে পারলে না আমায়?”

তাজ তখনও নিরুত্তর। সেতু পুনরায় বলে,”আজ যদি তোমার মেয়ের সাথে এসব হতো।আল্লাহর কি বিচার দেখেছো?এই জন্যই বুঝি মেয়ে দিয়েছে তোমাকে!”

তাজ উঠে দাঁড়ায়। সেতু যে চেয়ারে বসেছে তার পায়ের কাছে বসে পড়ে।সেতুর দৃষ্টি ঘোলাটে! তাজ সেতুর পা আঁকড়ে ধরে বলে,”আমি ভুল করেছি সেতু।তবুও চলে যাওয়ার কথা বলো না।আয়াতকে ছাড়া বাঁচবো না।আয়াত ছোট্ট ওকে জড়িয়ে এসব কথা বলো না।”

সেতু গগনবিহারী হেসে বলে,”আর আমার আপি?আমি? তুমি একটা খুনি তাজ!কি সুন্দর করে হত্যা করো তুমি। কখনো কারো মন কখনো কারো শরীর!”

“আমার মাথা ঠিক ছিল না সেতু।কেবলই মনে হতো আমি যাকে ভালোবেসে পুড়ছি সে কেন এত সুখে থাকবে?কেন তাকে অন্য পুরুষ ছুঁয়ে দেখবে?কেন আমাকে ছাড়া অন্যের সাথে এতটা সুখী থাকবে! কেন অন্য পুরুষ আমার কৃষ্ণবতীর ঘ্রাণে আসক্ত হবে? ঠিক সেই মুহুর্তে নীতুর হাসিমুখ, অভীকের বিজয়ী বেশ আমার সহ্য হচ্ছিল না।মনে হয়েছিল হয়তো নীতু আমার হবে। যা সম্ভব ছিল না।তাই অন্য কারো হওয়ার আগে সব শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম।বাঁচতে চেয়েছিলাম সেতু।নীতু অন্য কারো এ যে আমার কাছে মৃত্যুসম!”

“তাজ তুমি একজন আত্মকেন্দ্রিক চরম স্বার্থপর মানুষ।”…. প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে বলে সেতু।

ঠিক তখনই রাবেয়া বেগম এসে দরজা নক করেন। তাজ দরজা খুলে দিতেই ভয়ার্ত স্বরে বলেন,” বাবা বাড়িতে পুলিশ!”
তাজ চমকে সেতুর দিকে তাকায়। সেতু নিরবে হাসছে।ভয়ংকর হাসি।তাজ পুনরায় মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,”বসতে বলো আমি আসছি।”

রাবেয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে চলে যান।সেতু উঠে এসে তাজের সামনে দাঁড়ায়। তাজ চেয়ে আছে ভাবলেশহীন চোখে।সেতু তাজের বুকে আলতো করে মাথা রাখে। ফিসফিস করে বলে,”ভালোবাসতাম তাজ!হয়তো আয়াত আমি তুমি মিলে একটা নতুন দ্বিতীয় সূচনা হতে পারতো।কিন্তু হলো না।আমার আপিকে যে মানুষটা মেরে ফেলতে চেয়েছে তাকে কি ক্ষমা করা যায়?যায় না তো।তাজ আমার আর আয়াতের সামনে কখনো এসো না।তাহলে নিজেদের মেরে ফেলতে দু’বার ভাববো না। তাজ ভালোবাসা ধ্বংসাত্মক কোন অনুভূতি না।ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা!”

তাজ নড়লো না।থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো।একসময় সেতু সরে যেতে নিলে সেতুকে বুকের মাঝে চেপে ধরে বললো,” আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারিনি কিন্তু তোমার মায়ায় বাঁধা পড়েছিলাম ভীষণ করে!সেই এক পৃথিবী মায়া বুকে নিয়ে বাঁচবো কি করে বলতো?”

সেতু নিশ্চুপ। তাজ সেতুকে ছেড়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো।ঘুমন্ত মেয়ের সারা মুখে চুমু দিয়ে বিছানায় রেখে হনহন করে হেঁটে বেড়িয়ে গেলো। সেতু সেখান থেকেই দেখলো তাজ নিজের সব দোষ স্বীকার করে পুলিশের জিপে উঠে পড়েছে।সেতু বসে পড়লো।তীব্র বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভাসিত হলো চারপাশ!

**********

আয়াত কাঁদছে।চিৎকার করে কাঁদছে।সেদিকে মনোযোগ নেই সেতুর।জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে তাকিয়ে আছে দূর দিগন্তে!
নিখিল আর মা রুমে ঢুকে। মা আয়াত কে কোলে নিয়ে কান্না থামায়।নিখিল বোনের কাঁধে হাত রাখে।সেতু ভাইয়ের দিকে ফিরে আলতো হাসে। নিখিলের চোখ ছলছল করে ওঠে।তার আদরের দুটি বোনের জীবন আজ ভঙ্গুর! ভাই হয়ে এ যন্ত্রণা কাকে বলবে?অভীক কল করে জানিয়েছে এই সাত দিন ধরে নীতুর জ্বর।নীতু বিছানা থেকে উঠে না।তার শক্ত বোনটা ভেঙে পড়েছে।আর সেতু! সে তো বেঁচে আছে না বাঁচার মত!

নিখিল বোনের মাথা চেপে ধরে বুকে।সেতু ফিসফিস করে বলে,”আমার কেন কান্না পায় না ভাইয়া?”

নিখিল কিছু বলতে পারে না।অজানা কান্নায় কন্ঠ রোধ হয়ে আসে!

*********

নীতু ঘুমিয়ে আছে।সকালের মিষ্টি রোদ জানালা গলে নীতুর মুখে পড়ে।কেমন অদ্ভুত সৌন্দর্যে আভাসিত হয় চারপাশ। অভীক তাকিয়ে থাকে।আঙুল দিয়ে বিলি কাটে চুলে।নীতু ঘুমঘুম চোখে তাকায়। অভীকের উদ্বিগ্ন মনে এক ঝলক নির্মল হাসি খিলখিলিয়ে উঠে!

অভীক আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় নীতুর ললাটে।নীতুর চোখ ভিজে উঠে! এই পুরুষটা ভালোবেসে তাকে এক সমুদ্র ঋণে জর্জরিত করেছে!এই ভালোবাসার ঋণ কি করে শোধ করবে?

অভীক হাত দিয়ে কপাল ছুঁয়ে নীতুর জ্বর মাপে। আগের থেকে কম।নীতুকে উঠে বসায়।এলোমেলো চুলগুলো খোপা করে দিয়ে বলে,”ভীষণ মনোবল সিক্ত আত্মবিশ্বাসী বউকে মিস করছি।এই ফ্যাচ ফ্যাচ করা মেয়েটিকে বলো আমার সাহসী বউকে ফিরিয়ে দিতে।যে শত আঘাতেও টিকে থাকতে জানে!তীব্র ঝড়েও ভেঙে পড়ে না।যে হাজার কষ্টে হাসতে জানে! তাকে চাই আমার!যত দ্রুত আমার নীতুকে আমাকে ফিরিয়ে দাও!”

নীতু অভীকের চোখের দিকে তাকায়। কি গভীর প্রগাঢ়তা সেই চোখে! তাজ আর অভীকের মধ্যে কত তফাৎ। ভালোবেসে পাগলামি করলেই হয় না। ভালোবাসাকে ভালো রাখতে হয়।

তাজ ভুল করেছে। সেই ভুলে শুধরে না নিয়ে নতুন ভুল করেছে।আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ দেখতে পাওয়া যায় যারা নিজেদের অক্ষমতা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়।নিজে ভালো থাকবে না তো অন্যের ভালো দেখতে পারে না।এই মানুষ গুলো দূরের হয়না।আমাদের খুব কাছে বসবাস করে!তাজ চাইলেই পারতো নিজের সুখ নিজে তৈরি করতে!হয়তো কষ্ট হতো।তবুও একসময় ভালো থাকতো।এই গল্পে তাজ ভালোবেসেছে পাগলের মত!কিন্তু ভালোবাসাকে ভালো রাখতে শিখেনি এক ফোঁটাও! আত্মকেন্দ্রিক হাহাকারে জ্বলেছে।সেই আগুনের আঁচে দুটো নিষ্পাপ মেয়ের জীবন ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে! নিজের ভালোবাসাকে হারিয়ে ঈর্ষান্বিত হয়েছে অথচ তারই সামনে একজন এক পৃথিবী ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করেছিল। নিজে ভালো নেই তো অন্য কেউ কেন ভালো থাকবে! এই ধরনের মানুষ গুলো খুব ভয়ংকর হয়।এরা ইচ্ছে করলে সব পারে!সব! তাজের একচেটিয়া বিধ্বস্ত অনুভূতি তাজ সহ সকলের ধ্বংসের কারণ হয়েছে!

***********

গল্পট কি এখানেই শেষ? না তো! আসুন এবার সুখের গল্প পড়ি।

একটা মাস কেটে গেলো খুব নিরবে। যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত।তাজের বাবা মা জেল থেকে ছাড়ানোর বহু চেষ্টা করলেও তাজ নিজেই কোন পদক্ষেপ নিলো না।

এক সকালে সেতু ঘুমিয়ে ছিলো।পাশে ছোট্ট আয়াত। সেতুর রাত কাটে নির্ঘুমে।তাই সকাল হলে মরার মত ঘুমায়। নিজেকে নিয়ে যখন চরম ডিপ্রশনে তখন মোবাইলে একটা মেসেজ আসে।সেতু ঘুমঘুম চোখে মেসেজ টি পড়ে,
” সুইট হার্ট কেমন আছিস?তোর বোন আমার ডার্লিং।সেই সুবাদে সুইটহার্ট তোকে বলতেই পারি। মিষ্টি মেয়ে!সবাই বলে, জীবনটা ছোট অথচ সেই ছোট্ট জীবনটা বয়ে বেড়াতে হয় আমাদের দীর্ঘ কাল! কষ্ট পেয়েছিস বলে থমকে যেতে হবে,পিছুটান বয়ে বেড়াতে হবে এমন তো নয়।তোর এখন উড়াল যৌবন! উড়ে বেড়াতে দোষ কি?বদ্ধ রুমে ডিপ্রেশনে ধুঁকে ধুঁকে কেন মরবি?তাও স্বার্থপর মানুষের জন্য।শুনেছি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়ে ছিস?তুই কি বোকা? ঘর থেকে দু’পা নেমে দেখ পৃথিবীটা সুন্দর। একটা মানুষ আমাদের জীবনে আসবে, তার মর্জিমত আমাদের জীবনটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিবে তা তো হয় না!সুইটহার্ট পাহাড়ের মত কঠিন হ।যাতে সমুদ্রের শত আঘাতেও অটল থাকতে পারিস!

তোর রিশু আপু।

লেখাটা পড়তে পড়তে সেতুর চোখ কখন যেন জলে ভিজে আসে।

গত দুদিন ধরে সেতু নীতুর বাসায় এসেছে। নীতু পরম মমতায় বোনকে আগলে রেখেছে।দু’জনে গত দুদিন ভুলে গেছে নিজেদের সকল কষ্ট।একসাথে হেসেছে।কথা বলেছে অফুরন্ত। জড়াজড়ি করে কেঁদেছে।বিকেল হলে চায়ের আড্ডা বসেছে ছাদে।সঙ্গী প্রানবন্ত রুমি।যেন ওদেরই একজন।আয়াত অতুলকে নিয়ে অভীক অনীক ঘুরতে বের হতো।আর বাসায় রুশিয়া বেগমের সাথে বসতো ওদের আড্ডা। পুরানো গল্প শুনে সেতু খিলখিল করে হাসতো।বোনের হাসি মুখ দেখে নীতুর চোখ ভিজে আসতো।নিজেকে অপরাধী মনে হত।নিষ্পাপ মেয়েটা কিসের শাস্তি ভোগ করছে?

এক সপ্তাহ হতে চলেছে সেতু নীতুর বাসায়। কাল চলে যাবে।এই নিয়ে নীতুর মন খারাপ। অভীক বউয়ের মন ভালো করতে রাতে খাবার টেবিলে বললো,”সেতু আমার কোন বোন নেই।তুমি আমার বোন।যা কিছু নীতুর তার সব কিছুই তে আমার অধিকার আছে বলে মনে করি।তেমন আমার বেলায় সে কথা প্রযোজ্য। তাই বলছি ভাইয়ের কাছে থেকে যাও।এখানেই পড়াশোনা কন্টিনিউ করলে।আর নীতুরও ভালো লাগতো।”

নীতুর চোখ চকচক করে উঠলো।খুশিতে বোনের হাত ধরে বললো,”থাকবি সোনা?”

সেতু মৃদু হাসলো।কলিজাটায় কেমন কাঁপন ধরলো যেন! কিচ্ছু বললো না। অভীক ফের বললো,”দয়া করছি ভেবো না সেতু।তোমার বোন নিজেই একা তোমার খেয়াল রাখতে পারে। সে ক্যাপাসিটি ওর আছে। আর তুমিও কিছু করলে। ভেবে সিদ্ধান্ত নাও।ঠিকাছে? ”

রুশিয়া বেগম, রুমি তারাও সহমত হলো।জোর করলো।সেতু কিচ্ছু বললো না। গোটা রাতটা নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো।আয়াতের দিকে তাকিয়ে তাজের কথা মনে পড়ে গেলো।কতক্ষণ নিরবে কাঁদলো।যখন ভোরের সূর্যটা রাতের কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার ভেদ করে পৃথিবীটাকে নিজস্ব আলোয় রাঙায়িত করলো ঠিক সে সময় সেতু বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলো।সম্পূর্ণ একা।তার ছোট্ট আত্মজাকে ফেলে। কঠিন এই সিদ্ধান্ত টা নিতে সেতুর সময় লেগেছে তবুও নিয়েছে। কোথায় যাবে এই নিয়ে তার চিন্তা নেই।শুধু জানে সবার থেকে দূরে থাকতে হবে।এক আকাশ অভিমান পুষে বিদায় নিয়েছে ছোট্ট মেয়েটা!

সকালে সেতুকে ডাকতে এসে কোথাও না পেয়ে নীতু চমকে গেলো।বিছানায় ছোট্ট আয়াত হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।তার পাশে একটা চিঠি রাখা।সাদা কাগজটা হাতে নিতেই নীতুর হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো। অভীক বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো।সবাই ছুটে আসলো।নীতু চিঠিটা মেলতেই দেখলো গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

আপি,
বকবে না।আমি কিন্তু আর ছোট নেই।তোমার বোন বড় হয়েছে।এই কঠিন পৃথিবীর নিয়ম জানতে শিখেছে। আপি চলে যাচ্ছি। ভাবছো অভিমান করেছি? করেছি তো।কেন এমন হলো আপি? কেঁদো না তো! আমি মরে যাচ্ছি না।হারিয়ে যাচ্ছি!আর কত আগলে রাখবে আপি? এ কয়দিন তোমার চোখে আমার জন্য কষ্ট দেখেছি।আড়ালে চোখের জল মুছতে।আমার কষ্ট হত আপি।কাছের মানুষ গুলো কেন এত পর হয়ে যায়? বাবার বাড়ি টাকে আর নিজের কেন মনে হয় না আপি?যেখানেই যাই মনে হয় সবাই আমায় করুণা করছে।আমার মেয়েটার জন্য সবার আফসোস আমার মনটা বিষিয়ে তুলতো।দমবন্ধ লাগতো আপি। মনে হত মরে গিয়েও বেঁচে আছি। আপি কেঁদো না। এই মানুষ গুলোর কাছে থাকলে আমি মরে যেতাম।আমার মেয়েটা সুন্দর ভাবে বড় হতে পারতো না।একটু বড় হলেই ওকে জানানো হত, ওর বাবা ওর মাকে ভালোবাসেনি।ওর বাবা খুন করতে চেয়েছিল। এসব কথা ওকে বাঁচতে দিতো না আপি। আমার ছোট্ট আয়াতকে তোমায় দিয়ে গেলাম।তোমার আর ভাইয়ার মেয়ে আজ থেকে।অনেক দূরে চলে যেও আপি।এই পৃথিবীর নিকৃষ্ট বাতাস ওকে যেন ছুঁতে পারে না।পৃথিবীর শুদ্ধতম মা বাবা তোমরা! আয়াত ভালো থাকবে। তাজের মেয়ে মনে করো না আপি।ও আমার মেয়ে! তোমার বোনের মেয়ে। যে ভীষণ ভঙ্গুর। এই পৃথিবীর সাথে লড়াই করে তোমার বোনের একার পক্ষে কখনোই সম্ভব না একটা সুন্দর জীবন দেয়া আয়াতকে! আমি চাই আয়াত মা বাবা দুজনের ভালোবাসা পাক। তোমার বোনটা বড্ড খারাপ আপি।আমি আয়াতের ভালো মা হতে পারবো না।তাকে কখনো বাবার আদর দিতে পারবো না।সংগ্রাম করে বাঁচতে হত ওকে।তার থেকে এই ভালো। আপি আমি সব গুছিয়ে দিয়ে গেছি।কেউ কখনো আয়াতকে নিয়ে প্রশ্ন করবে না। তবু বলছি যদি পারো দূরে চলে যেও। আপি তোমার সাথে আর কখনো যোগাযোগ করা হবে না।তবুও মনে রেখো আপি,আমি তোমাদের থেকে দূরে থাকবো না।তোমার বোন তোমার মেয়ের ভিতরে আজীবন থাকবে। ভাইয়াকে বলো,তার বোন তাকে গুরুদায়িত্ব দিয়ে গেলো।পৃথিবীর শুদ্ধতম বাবা মা হয়েও! তোমার মেয়েকে নিয়ে ভালো থেকো!

ইতি
সেতু

নীতু চিঠিটা পড়ে চিৎকার করে কাঁদছে।নিজেকে দোষারোপ করছে। একসময় অতিরিক্ত টেনশন আর কান্নার ফলে সেন্সলেস হয়ে পড়লো।অভীক নীতুকে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা ছোট্ট আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইলো।এই মেয়েটা আজ থেকে তার?তাকে বাবা বলে ডাকবে?ভাবতেই হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো।

নীতুর যখন সেন্স ফিরলো।তখন সকাল দশটা।পিটপিট করে তাকাতেই দেখলো ভাসা ভাসা চোখে আয়াত তার দিকে তাকিয়ে আছে।ঠোঁটে ফোকলা হাসি।নীতু চেয়ে রইলো!চোখ ভিজে উঠলো।আয়াতকে বুকের ভিতর টেনে নিলো।অভীক পাশে বসে দেখলো অদ্ভুত এক দৃশ্য! এক কৃষ্ণবতীর বুকে আর একটি ছোট্ট কৃষ্ণফুল হাসছে!ক্রমশই অভীকের চোখ ভিজে আসলো!

যে নিজ ইচ্ছায় হারিয়ে যায় তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? সবাই খুঁজলো। থানায় ডায়েরি করা হলো।নিখিল, জায়েদ, মিলন পাগলের মত খুঁজলো। মহিমা বেগম আফসোসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন।সব সময় মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন।কিন্তু ওদের প্রকৃত মা হতে পারেন নি।
জেলখানার বদ্ধ ঘরেও গিয়ে পৌছালো এই খবর।রাবেয়া বেগম কেঁদে কেঁদে ছেলেকে বললেন।তাজ শুনলো। নিরবে হাসলো।সেতুর অভিমানী মুখটা মনে পড়তেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো!রাবেয়া বেগম প্রচন্ড জেদে বললেন,”সেতু চলে গেছে, যাক।আমার নাতিকে কেন অন্যের ঘরে দিয়ে আসবে?নিতে গেলাম।তোর বউ সব ডকুমেন্টস দিয়ে গেছে।আয়াত কে কেউ দেখতে পর্যন্ত পারবে না।বদ মেয়েটা কত বড় সর্বনাশ করলো আমার।ছেলেটাকে জেলে দিয়েছে।ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে।নাতিটাকে দিয়ে গেছে পরের ঘরে!” রাবেয়া বেগমের কন্ঠে প্রচন্ড আক্রোশ!

তাজ বিষন্ন চোখে চাইলো।মায়ের হাতটা ধরে কাতর কন্ঠে বললো,”মা এখনো বুঝলে না?বোকা মেয়েটা যে আমায় বড্ড ভালোবাসে!আমার করা কর্মকান্ডের প্রায়শ্চিত্ত করলো মা!বোকা মেয়েটা আমায় দায়মুক্তি দিলো!ও কেন এত ভালোবাসলো? আমাকেই কেন? অযোগ্য জেনেও কেন চলে গেলো না?তুমি বুঝতে পারছো মা?আমাকে ভালোবেসে মাতৃত্ব ত্যাগ করেছে!আমার পাপের বোঝা কমিয়ে দিলো।অথচ আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে দিলো না!”

ছেলের ব্যকুল কান্নায় রাবেয়া বেগমের ইচ্ছে করলো মরে যেতে!বেঁচে থেকেও বেঁচে আর আছে কই?

***************

পাঁচ বছর পর,

রাত দশটা।মেহেদী কম্পিউটারের দোকান বন্ধ করলো।তার নিজের এখন তিনটে দোকান।ব্যবসাটাও রমরমা।বাবা মা মারা গেলো তিন বছরের ডিফারেন্সে। ভাই বোন থাকলেও তেমন একটা যাওয়া আসা করে না মেহেদি।গেলেই বিয়ের জন্য চাপ দেয়। ভালো লাগে না। মেহেদির এখন ভরাট শরীর।প্রশস্ত কাঁধ।গাল ভরা চাপ দাঁড়ি। পুরুষালী অবয়ব ঢেকে দিয়েছে প্রানবন্ত যুবক মেহেদিকে। গম্ভীর চাহনিতে যে কোন মেয়ের হৃদয় ভেদ করতে সক্ষম! কিন্তু একটা মুখ তাকে শান্তি দেয় না।একটা প্রশ্ন তাকে ঘুমাতে দেয় না।কেন এভাবে হারিয়ে গেলি সেতু? আমাকে কি তো বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি? সেতুর জীবনে যখন ট্রাজেডি চলছে তখন সেতু কোন যোগাযোগ রাখে নি।ফোন করলেই বলতো।বেড়াতে এসেছি। এমন করে হারিয়ে গেলি সেতু?

রাস্তায় নেমে কতক্ষণ উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটলো।বাসায় যেতে ইচ্ছে করলো না।বাসাটাকে ঘর বানাতে ইচ্ছে করে!ঘর কি আর একা একা হয় সেতু? মনে মনে সেতুকে শুধায়! সেতু কোন উত্তর দেয় না। তবুও তো কত প্রশ্ন মেহেদির!

ঠিক তখনই একটা স্কুটি এসে থামে ঠিক তার শরীর বরাবার।একটুর জন্য এক্সিডেন্ট হলো না মেহেদির।ছিটকে সরে গেলো।পায়ের গোড়ালিতে হালকা ব্যথা পেলো মাত্র। মেহেদি রাগে খিঁচে একটা গালি দিলো। সোডিয়ামের নিয়ন আলোতে স্কুটিতে বসা মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠলো। মেহেদি চমকালো! মেয়েটি শাড়ি পরা।চোখে কাজল দিয়েছে!ববকাট চুল গুলো কিছুটা বড় হয়ে পিঠ ছুঁয়েছে! মেহেদি অতি বিস্ময়ে অস্ফুটে বললো,”রিশা!”

রিশা কাজল চোখে চোখ মেরে হাসলো।মেহেদি মুগ্ধ হলো।এলোমেলো বাউন্ডুলে রিশার পরিবর্তন রুপ দেখে!ঠিক তখনই খেয়াল করলো স্কুটির পিছনে একটা ছেলে বসা।ছেলেটিও হাসছে! মেহেদি আবারো মুগ্ধ হলো। কথা বলতে ভুলে গেলো। রিশা মেহেদির হাতের মুঠোয় একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো।মেহেদি চূড়ান্ত অবাক।রিশা ঝড়ের মত এসে ঝড়ের মত চলে গেলো।রেখে গেলো এলোমেলো মেহেদিকে। হালকা হলুদ আলোয় মেহেদি কাগজটা মেললো।পড়তে পড়তে মেহেদির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।গম্ভীর চোখ দুটো ভিজে উঠলো।

মেহেদি আবার পড়লো,
“মেদু পাহাড় দেখেছা কখনো?কঠিন পাহাড়! প্রচন্ড অভিমান পুষে রাখা পাহাড়!সেই পাহাড়কে নড়ানো যায় না।কিন্তু আগলে রাখা যায় বুকের মাঝে! পাহাড়কে ছুঁতে হলে বিশাল আকাশ হতে হয়!বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়তে হয় তার বুকে! কঠিন মায়ায় বাঁধতে হয়!পারবে তো মেদু? সেতুমন্ত্রীর বিশাল আকাশ হতে? ”

নিচে ছোট্ট একটা ঠিকানা লেখা। চিঠিটা পড়ে মেহেদির হাত পা কাঁপতে লাগলো। সেতুর ঠিকানা! সেতুকে ফিরে পাবে তো?হ্যা পেতে হবে! আর হারাতে দিবে না।যদি ফিরিয়ে দেয়? তবে নির্লজ্জ হবে! বেহায়ার চূড়ান্ত হবে!অবাধ্য প্রেমিক হবে!
তবু সেতু তোকে চাই! খুব করে চাই!অধিকার ছিল না বলে পিছুপা হয়েছিলাম। এবার মৃত্যু ছাড়া ফিরবো না।তোকে জয় করবোই। মনে মনে বললো মেহেদি।উত্তেজনায় ঘামতে লাগলো। এটিএম থেকে টাকা উঠিয়ে বাসট্যান্ডে গেলো।সোজা বান্দরবান যাবে। সেখান থেকে ছোট্ট গ্রাম মুরংদের।তারপর তার সেতু। মেহেদি বাসে বসে অন্ধকারে ফুঁপিয়ে উঠলো, বিড়বিড় করে বললো,”আমি আসছি পাগলি!তোর মেদু আসছে।তোর সব কষ্ট ভাগ করে নিবো। আমি একজন অভীক হবো দেখিস।যে ছেড়ে যাবে না। কোন পরিস্থিতিতেই না!হোক তা ভালো আর মন্দ!”

*********

তুরস্কের বৃহত্তম সুন্দর নগরী ইস্তাম্বুল। সেখানে সাদা পাথরের ছোট্ট কুটিরে নিবাস এক দম্পত্তির। যারা ভীষণ সুখী এক দম্পতি! অল্পতেই তাদের মান অভিমানের সংসার। সেই দম্পতি আর কেউ নয় অভীক নীতু দম্পতি! আর তাদের ছোট্ট রাজকন্যা আনায়া!

বাংলাদেশ থেকে প্রথমে জার্মানি তারপর এই ইস্তাম্বুলে এসে তারা তাদেন নিবাস তৈরি করেছে।অভীকের এখানে একটা রেস্টুরেন্ট আছে।ঠিক সমুদ্রের পাশে।রেস্টুরেন্ট আগে অন্যের ছিল পড়ে অভীক সেখানে কাজ করে টাকা জমিয়ে নিজের আয়ত্তে এনেছে!।

মেয়ের আবদারে আজ দ্রুত ফিরেছে অভীক।তাছাড়া আজ অনীক রা আসবে।মা আসবে।তাদের কাছে।তাই এত দ্রুত ফেরা।তবে দ্রুত ফিরে কোন লাভ হলো না।বাঘিনী খেপে আছে।তাই ভেজা বেড়ালের মত দুই বাপ বেটি চুপচাপ সাদা কাঠের সোফাটায় চুপটি করে বসে আছে!

অভীক আধশোয়া হয়ে বসে আছে। আর তার কোলের উপর ছোট্ট আনায়া কোঁকড়া চুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছে। সাত বছরের আনায়া বাবার বুকে নাক ঘসে বলে,” মা বকেছে। আনায়া খুব কষ্ট পেয়েছে।আনু-পাখির এখন একটা পাপ্পা চাই বাবা!”

অভীক মেয়ের কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে আলতো হাসে।তারপর মেয়ের নাকে চোখে দুই গালে পটাপট কতগুলো পাপ্পা দেয়। আনায়ার খুশিতে চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠে।বাবাকে ফিসফিস করে বলে,” তুমি কি আনায়াকে খুব ভালোবাসো?না হলে এত্তগুলো আদর কেন দিলে?”

মেয়ের পাকা পাকা কথায় অভীক মুগ্ধ। মেয়ের কপালে ফের দুটে চুমু দিয়ে বলে,”বাবা লাভস আনায়া দা.. মোস্ট ”

আনায়া খুশিতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।ঠিক তখনই হাজির হয় নীতু।সাদা শাড়ি, এলোমেলো খোঁপা,নাকের ডগায় ঘাম। চোখে রুদ্রমূর্তি রাগ! অভীক মুগ্ধ হয়। পরক্ষণেই মুগ্ধতা ভুলে গিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে কাচুমাচু হয়ে বসে থাকে।নীতু রাগত্ব স্বরে বলে,” তোমরা আসলে কি চাও বলতো?আমি পাগল হয়ে যাই!কতবার বলেছি মেয়েকে এত আহ্লাদ করবে না।আজ মিস রিপোর্ট করেছে ওর নামে!আর অভী কতবার বলেছি বাহির থেকে ফিরে জামা কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে না।জুতাটা সু-কেসে রাখবে।কেন এত অবাধ্য তোমরা?”

অভীক মেয়েকে পিঠে তুলে বারান্দায় যেতে যেতে বলে,” কারণ তুমি ভীষণ বাধ্য! ”

নীতু অবাক হতে গিয়েও হয় না।অভীক মেয়েকে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে খরগোশের বাচ্চা দুটোকে খাবার দেয়। তাদের সাথে খেলা শুরু করে। আনায়া ফিসফিস করে বলে,”বাবা মা খু্ব রেগেছে!”

অভীক মেয়ের চিন্তিত মুখ দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসে।আনায়া জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব নিয়ে বলে,”বাবা তুমি মাকে ইচ্ছে করে রাগাও!”

অভীক খরগোশের বাচ্চা কোলে নিয়ে বলে,” কারণ বাবা তোমার মায়ের রাগ ভালোবাসে।আর তুমি কেন রাগাও?”

“কারণ আনায়াও মায়ের রাগ ভালোবাসে!”….. বলে দুই বাবা মেয়ে খিলখিল করে হেসে দেয়।তাদের হাসির শব্দ নীতু রান্না ঘর থেকে শুনতে পায়। পুনরায় মেজাজ গরম হয় নীতুর। এরা দু’জন ওর হাড় মাংস কয়লা করে ছাড়বে জ্বালাতে জ্বালাতে!

মেয়েকে খায়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় অভীক।অভীকের বুকেই ঘুমিয়ে ছিলো। আস্তে করে বিছানায় রেখে কম্বল গায়ে জড়িয়ে দেয়।কপালে আলতো চুমু দিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে নীতুর খোঁজে বের হয়।

নীতু সবে সদ্য গোসল করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি পরছে।তোয়ালের ফাঁক গলে ভেজা চুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঁধে পরেছে।অভীক মুগ্ধ চোখে দেখে।নিজের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গায়ে জড়ানো পোলো শার্টটা খুলে রাখে একপাশে। শরীরে শুধু ঢিলে ট্রাউজার। অভীক টিপে টিপে পা ফেলে নীতুর পায়ের কাছে বসে পড়ে কুঁচি ধরে।নীতু সূচালো দৃষ্টিতে তাকায়। অভীক বাচ্চাদের মত করে বলে,” ঠিক করে দেই?”

নীতু কিছু বলে না।চোখের চাহনিতে ভস্ম করে দেয় অভীককে।অভীক তবুও কুঁচি ঠিক করায় মন দেয়। নীতু মনে মনে হাসে। রাগ ভাঙাতে এসেছে?নীতু এত দ্রুত পটবে না। অভীক কুঁচি ঠিক করতে করতে ঘোর লাগা চোখে বারবার তাকায় নীতুর দিকে। নীতু চোখ গরম দেয়। অভীক ঠোঁট টিপে হাসে।নীতু মুগ্ধ হয়! অসভ্যটা তার রাগ পানি করতে এসেছে শার্ট না পরে।প্রশস্ত নগ্ন বুকটা যে নীতুর দূর্বলতা তা এই বদ লোক টের পেয়েছে অনেক আগেই!হায়! নীতু চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিছুতেই আর তাকাবে না।তবুও অবাধ্য চোখ ফের তাকিয়ে ফেলে।দেখে অভীক তাকেই দেখছে।কুঁচি ঠিক করে অভীক মুখোমুখি দাঁড়ায়। নীতু সরে যেতে নিলে কুঁচি পা দিয়ে চেপে ধরে। ভেজা তোয়ালেটা চুল থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে মেঝেতে।নীতু হতাশ।অভীক ভেজা চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলে,”বেশি রাগ করেছো কাননবউ?”
নীতু উত্তর দিতে পারে না।কন্ঠরোধ হয়ে আসে।এতদিন হয়ে গেলো তবুও মানুষটার খুব কাছে আসা নীতু নিতে পারে না।দমবন্ধকর এক অনুভূতি ঘিরে ধরে। নিজের সাথে যুদ্ধ করে বলে,”এসব কি অভী?পা সরাও। ”

অভীক সরে না।কোমড় চেপে ধরে চোখে চোখ রাখে।নীতু ক্ষীণ স্বরে বলে,”ভাইয়াদের আসার সময় হয়েছে এয়ারপোর্টে যাবে না?”

অভীকের ত্যাড়চা উত্তর, “বড়ো সামলে নিবে!”

“ছাড়ো!”

অভীক ছাড়ে না।বেসামাল অভীক চূড়ান্ত অবাধ্য। বসন্তের বিবাগী কোকিলের মত অবাধ্য! পরিপাটি শাড়ির কুঁচি গুলো ধরে অভীক মুহূর্তেই মেঝেতে ছড়িয়ে দেয়! নীতু হালছাড়া ভঙ্গিতে তাকায়।

পরক্ষণেই নীতুকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে এগোয়। নীতু কিছু বলার আগেই অভীক বলে,”ডিস্টার্ব করবে না কাননবউ!এমনিতেই সামনের দিনগুলোতে তোমাকে পাবো না।বাড়ির লক্ষী বউ হয়ে যাবে!আমাকে চিনতেই পারবে না।সো নাউ টাইম ইজ মাই…..ন!” অভীকের ঘোরলাগা কন্ঠে নীতু ভেসে যেতে শুরু করে।অভীক আলতো হাসে।পেলব কপালে অধর ছুঁইয়ে বলে,”ভালোবাসি কাননবউ!”

নীতুর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।একেই কি বলে তবে সুখের জল?কে জানে!
নীতু শুধু জানে মানুষটা সঠিক হলে যত বড় ঝড়ই আসুক জীবনে তা মোকাবিলা করা সহজ হয়! পথটা মসৃণ হয়!

ভালো থাকুক ওরা!ভালো থাকুক মেদুর আকাশসম অপেক্ষা!

সমাপ্ত।