#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
সূচনা পর্ব
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
১.
সেল নম্বর টুয়েন্টি টু।কারাগারের একেবারে পশ্চিম পাশে এই সেলের অবস্থান।এখন সময় সকাল দশটা আঠারো।অথচ কারা প্রকোষ্ঠ ডুব দিয়েছে ঘন কালো আঁধারে। চারিদিকে কংক্রিটের শক্ত দেয়াল।দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় কারা প্রকোষ্ঠে বন্দি অগণিত প্রাণের আর্তচিৎকার।কংক্রিটের মজবুত দেয়াল ভেদ করে এখানে সূর্যের আলো আসতে পারে না।কারাবন্দী মানুষজন জানতে পারে না এখন আকাশে কি দেখা যাচ্ছে।চন্দ্র নাকি সূর্য?সবটাই আঁধারে ঢাকা।ঠিক তাদের জীবনেই মতো।
কালো রঙের অদৃশ্য চাদরে মুড়ানো এই কারাগারের প্রতিটা সেলের আলাদা আলাদা গল্প আছে।সেই গল্প পড়তে কেউ ইচ্ছুক না।সাদা কালো পোশাকে জড়ানো এই প্রাণীদের পরিচয় একটাই-আসামী।তবে এতো এতো বন্দীর ভীড়ে একজন ছিলো ভীষণ অন্যরকম।যাকে খুব সহজেই আর পাঁচজন আসামীদের থেকে আলাদা করা যেত।তার ভাব গাম্ভীর্য,তার দৃষ্টির প্রখরতা,তার অনুমানশক্তি-সবকিছুই ছিলো বাকিদের চেয়ে ভিন্ন।কারাগারের বন্ধ দেয়ালের মাঝেও সে চলতো নিজস্ব ঠাটবাট আর জন্মসূত্রে প্রাপ্ত আভিজাত্য নিয়ে।যেন কারাগারটা তার নিজের স্বত্বাধিকার করা কোনো স্থান।সেই এখানের রাজা,বাকি সবাই তার দাস।
সাব ইন্সপেক্টর ইয়াসিন খুবই ব্যস্তার সাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন।সেল নম্বর টুয়েন্টি টু এর সামনে আসতেই তার কদম শ্লথ হলো।দৃষ্টি আপনাআপনি মাটিতে নেমে এলো।
কারাগারের লোহার শিক।তার একপাশে ইয়াসিন।অন্যপাশে টুয়েন্টি টু তে থাকা আসামি।তার পরনে সাদা কালো পোশাক।মস্তক অবনমিত।শক্ত খড়খড়ে মেঝেতে আঙুল দিয়ে আনমনে আঁকিবুঁকি করছিলো সে।
ইয়াসিন শান্ত দৃষ্টিতে তাকে পরোখ করল।তাকে এই মুহূর্তে শান্ত দেখাচ্ছে।পা দু’টো সুন্দর করে ভাঁজ করে রেখেছে।চুলগুলো চোখ পর্যন্ত নেমে এসেছে বিধায় তার চোখের দৃষ্টি বোঝা যাচ্ছে না।তার ডান হাতে ব্যান্ডেজ পেঁচানো।কাল রাতেই এগারো নম্বর সেলের আসামির সাথে মারামারি করেছে সে।
ইয়াসিন একটা শুকনো ঢোক গিলল।এগারো নম্বর সেলের ঐ আসামি এখন আইসিইউ তে।কি ভয়ংকর এই দানব! সে কোনো ভাবেই মানুষ হতে পারে না।সে বাস্তবিক অর্থেই একটা দানব।সে তো অস্ত্র ছাড়াই মানুষ মা’রতে পারে।তার যা গায়ের জোর! সেই জোর দিয়েই সে আস্ত মানুষ মে’রে ফেলতে পারবে।তাকে কারাগারে রাখা কারাগারের বাকিদের জন্য বিপজ্জনক।অন্যান্য আসামিরা ভয়ে তার ধাঁরও ঘেষে না।ইয়াসিন নিজেও খুব একটা তার কাছাকাছি যায় না।সে কথা বলে খুব অল্প।গুনে গুনে কয়েকটা।তার চোখ মুখ দেখলে এমনিতেই ভয়ে কন্ঠ শুকিয়ে যায়।ইয়াসিন পারলে তাকে আজীবনের জন্য কনডেম সেলে পুরে রাখতো।কিন্তু সেটা অসম্ভব।এই ক্ষমতা ইয়াসিনের নেই।উপরন্তু এই ছেলের ক্ষমতা আছে এতো কিছুর পরেও মুক্তভাবে বুক চিতিয়ে খোলা রাস্তায় হেঁটে বেড়ানোর।
ইয়াসিন সামান্য ঝুকলো।অতিশয় শান্ত গলায় বলল,’জনাব হামাদ।আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’
সে অবিচল,বিন্দু পরিমান নড়ল না।যেন ইয়াসিনের কথা তার কানেই যায়নি।ইয়াসিন পুনরায় ডাকলো,’হামাদ! আপনি কি শুনছেন?’
মূর্তির ন্যায় বসে থাকা সুঠামদেহী মানব এবার সামান্য নড়ে উঠল।সবার প্রথমেই হাঁটুর ভাঁজে গুজে রাখা মাথা তুলে সরাসরি ইয়াসিনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।সেই দৃষ্টিতে কি ছিলো ইয়াসিন জানে না,দৃষ্টি বিনিময় হতেই তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।
তলোয়ারের মতোন ধাঁরালো এক জোড়া চোখ,যেই চোখ খনিকের ব্যবধানেই সবকিছু এফোড় ওফোড় করে দিতে পারে।যেই চোখে বিদ্যুৎের ঝলকানি আছে।যেই ঝলকানিতে ভ’স্ম হতে পারে সবকিছু।সে পলক ফেললো দুইবার।দেখে মনে হলো সে কোনো আগ্নেয়গিরি,যার অতলে গ্রাস হচ্ছে পারিপার্শ্বিক সবকিছু।
ইয়াসিন কিছুক্ষণ সেভাবেই রইল।যুবকটা একবার মাথা তুলতেই পরমুহূর্তে আবার মাথা নামিয়ে নিলো।মেঘ ডাকার মতোন গমগমে আওয়াজে বলল,’কি হয়েছে?’
ইয়াসিন চাপা কন্ঠে বলল,’বেরিয়ে আসুন।আপনার জামিন মঞ্জুর হয়েছে।’
জামিন শব্দটা প্রত্যেক আসামির কাছে অত্যন্ত আনন্দের।কারাগারের লোহার শিকের ভেতরে থাকা প্রতিটা জীব এই শব্দ শুনতে মরিয়া।জামিনের খবর শুনতেই তাদের ঠোঁট খেলা করে অদ্ভুতরকমের প্রশাস্তি।অথচ সেল নম্বর টুয়েন্টি টু একেবারেই নির্লিপ্ত।যেন জামিনে তার কিছুই যায় আসে না।সে জানতো এমনটা হবে।হয়েছেও তাই।
সে হেলে দুলে উঠে দাঁড়ালো।উঠতে গিয়ে হাতে একটু চোট পেল।তবে গায়ে মাখল না।আড়মোড়া ভেঙে সামনে দেখে বলল,’চাচাজান এসেছে?’
তার ভারি স্বর কানে যেতেই ইয়াসিন মাথা নাড়ল।চাবি ঘুরানো পুতুলের মতো দ্রুততার সাথে উত্তর দিলো,’জ্বী।আপনার চাচা এসেছেন।’
সে আর কথা বাড়ালো না।শম্বুক গতিতে সেলের লোহার শিক বরাবর এসে দাঁড়ালো।কপাল ছুঁইছুঁই চুলগুলো একহাতে পেছনে ঠেলে দিয়ে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।তার চোখের ভাষা দুর্বোধ্য।সেই ভাষা বোঝার কোনো ইচ্ছে ইয়াসিন রহমানের নেই।
****
জেলগেটের বাইরেই মস্ত বড় দু’টো গাড়ি দাঁড় করানো ছিলো।গাড়ির যাত্রীদের চোখ কারাগারের খুপরি আকৃতির ছোট্ট দুয়ারের দিকে।অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দুয়ার খোলা হলো।সেখান থেকে নত মস্তকে বেরিয়ে এলো একজন যুবক,যার আজ জামিন মঞ্জুর হয়েছে।
মুক্ত বাতাসের ঘ্রাণ নাকে লাগতেই সে একটু গা ঝাড়া দেয়।সে কাপড় পাল্টেছে একটু আগে।ঢিলেঢালা প্যান্টের পকেটে একহাত পুরে সে সামনে তাকায়।তার শরীর ক্লান্তিতে ঝিমঝিম করছে।একটু ঠেস দেওয়ার জায়গা পেলেই সে ঘুমিয়ে যাবে।চোখ তুলে একনজর আকাশের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে সে।আবহাওয়া খুবই গুমোট।এখন কোন ঋতু চলছে সে জানে না,বেলা কি সেটাও তার জানা নেই।তবে চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আশেপাশে কিছু একটাই হবে সময়।
জেলগেটের বাইরে হুসেইন শিকদার বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলেন।কাঙ্ক্ষিত মুখটা চোখের সামনে আসতেই তিনি নড়েচড়ে উঠলেন।প্রবল উৎসাহ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
‘ওয়েলকাম মাই সান।কেমন আছো তুমি?’
তার দৃষ্টি স্থির।শান্ত চোখে একবার সামনে থাকা মানুষটাকে দেখেই সে গুরুগম্ভীর গলায় জবাব দেয়,’আমি ভালো আছি চাচাজান।তুমি কেমন আছো?’
হুসেইন সাহেব প্রগাঢ় হাসলেন।বললেন,’তুমি ছাড়া পেয়েছো।আর আমি ভালো না থাকি কেমন করে বলো?আজ আমার খুব আনন্দ হচ্ছে অভি।’
অভি কপাল কুঞ্চন করে চারদিক দেখে বলল,’এখন সময় কি চাচাজান?’
‘এই তো বিকেল চারটা চল্লিশ।’
অভি মাথা নাড়ল,কোনো উত্তর দিলো না।ডানে বায়ে দেখে বলল,’গাড়ি এনেছো?বাড়ি গিয়ে গোসল করব।গরম লাগছে আমার।’
হুসেইন শিকদার দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ব্যস্ত হয়ে বললেন,’হ্যাঁ হ্যাঁ।আসো না।গাড়ি রেডি আছে।’
অভি হেলেদুলে সামনে হেঁটে যায়।মাঝখানে একবার হাত দিয়ে কপাল আর ঘাড়ের ঘাম মুছে।বাড়িতে গিয়ে গোসল করেই সে টানা ঘুম দিবে।শরীর বড্ড ভার ভার লাগছে তার।
***
‘আপনি আমাকে মোট দশটা হাওয়াই মিঠাই দিন।’
হাওয়াই মিঠাইয়ের স্টিক হাতে দাঁড়ানো ছেলেটা আগাগোড়া তাকে দেখল।তার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি নীল রঙের কুর্তি পরেছে।মাথার উপর ধবধবে সাদা ওড়না চাপানো।গায়ের রং অতিমাত্রায় উজ্জ্বল।চোখের মণিতে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই,একদম গাঢ় কালো।চুল তেমন দেখা যাচ্ছে না।তবে ছেলেটা অনুমান করলো,সেটাও চোখের মণির ন্যায় কালোই হবে।সে অবাক হয়ে বলল,’আপনে দশটা হাওয়াই মিঠাই একলা খাবেন?’
মেয়েটা দারুণ বিরক্ত হয়।মুখ কুঁচকে জবাব দেয়,’আমি খাবো নাকি দশজন মিলে খাবো,সেটা দিয়ে তোমার কি?তোমাকে তো দশটার টাকাই দিচ্ছি।কথা না বাড়িয়ে জলদি দশটা হাওয়াই মিঠাই দাও আমাকে।’
গুনে গুনে দশটা হাওয়াই মিঠাই দুই হাতের মুঠোয় নিতেই সে নতুন করে আবারো বিপাকে পড়লো।দুই হাত ব্যস্ত।ব্যাগ থেকে টাকা বের করবে কেমন করে?সে কন্ঠ উঁচু করে ডাকে,’তামান্না! এখানে আয় না।একটু ব্যাগের চেইন খুলে টাকার ব্যাগটা বের করে দে আমার।’
তামান্না অলস পায়ে হেঁটে আসে।চোখে মুখে তার নিদারুণ বিরক্তিভাব।সামনে থাকা মেয়েটার রোজ রোজ এমন জ্বালাতনে সে রীতিমতো বিরক্ত।সে ব্যাগ থেকে টাকার ব্যাগ বের করে সেখান থেকে একশো টাকা বের করে ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দেয়।পুনরায় সামনে তাকিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলে,’তুই কোনো কাজ একবারে করতে পারিস না।তাই না অরু?’
অরুনিমা জিভ কাটলো।প্রগাঢ় হেসে বলল,’সরি পাখি।পরের বার থেকে সবকিছু গুছিয়ে করবো।’
দু’জনে গুটি গুটি পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।আজ ভাদ্র মাসের ছাব্বিশ তারিখ।সকালে আবহাওয়া ছিলো চমৎকার।একদম ফকফকে সাদা আকাশ! এখন অবশ্য চারপাশ কিছুটা গুমোট।অরুনিমা আট টা হাওয়াই মিঠাই আটজনের হাতে তুলে দিলো।তিথি বলল,’বাকি দু’টো কার?’
‘নিরু আপা আর তুতুনের।’
‘নিরু আপা হাওয়াই মিঠাই খাবে?’ দিশা ভাবুক হয়ে জানতে চায়।
অরু চোখ পাকিয়ে বলল,’কেন খাবে না?আমরা খেতে পারলে নিরু আপা খেতে পারবে না কেন?’
তামান্না হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিলো।সবার হাতে থাকা হাওয়াই মিঠাইটা দেখিয়ে বলল,’আর কথা না বাড়িয়ে এটা খা।বেলা বাড়ছে।বাড়ি ফিরতে হবে।’
অরুনিমা নিজেও তড়িঘড়ি করে বলল,’হ্যাঁ হ্যাঁ।আমারও আজ দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে।কাল তুতুনের বার্থডে।’
রমা খেতে খেতেই প্রশ্ন করে,’তুতুনের যেন কয় বছর হলো?’
‘এই তো কাল তিনে পড়বে।’
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে অস্ত যাবার জোড়ার।অরু চঞ্চল চপলা পায়ে মূল সড়কের দিকে ছুটে যায়।পাঁচটার দিকে একটা বাস যায়।যে করেই হোক,তাকে সেটা ধরতে হবে।সেটা ধরতে না পারলে আবার সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে।
***
“আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস,
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।
যদি আর-কারে ভালোবাস, যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো॥”
একটি বিষাদ জড়ানো সুমিষ্ট কোমল নারী কন্ঠ সমতট লেনের সরু রাস্তা বরাবর নদীর শান্ত প্রবাহের মতো ভেসে গেল।সেই কন্ঠে চাপা গলির আশপাশ খানিকটা প্রকম্পিত হয়।কেউ আবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে আওয়াজের উৎস শোনার চেষ্টা করে।
নিরুপমা গালের নিচে হাত রাখে।উদাস চোখে জানালার শিক গলিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে।বিকেল হয়ে যাচ্ছে।অরু এখনো বাড়ি ফিরেনি।মেয়েটা কে নিয়ে তার চিন্তা হয় ভীষণ।নিজের ভালো তো সে বোঝে না।
খাটের উপর নিহাদ হাত পা ছড়িয়ে ঘুমুচ্ছে।কি নিষ্পাপ দেখাচ্ছে তাকে!
নিরু জানালার ধাঁর থেকে উঠে তার শিয়রে গিয়ে বসল।আনমনে একটা হাত তার মাথায় বুলিয়ে দিলো।তারপরই কিছু একটা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
মিনিট দশেক বাদেই অরুনিমা চঞ্চল পায়ে ঘরে এলো।সে মুখ খোলার আগেই নিরুপমা তাকে ধমক দিলো,’আস্তে কথা বল অরু।তুতুন এইমাত্র ঘুমিয়েছে।এখন ঘুম ভেঙে গেলে অনেক জ্বালাতন করবে।’
অরুনিমা দ্রুত মুখে হাত চাপে।পা টিপে টিপে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।একবার নিহাদের ঘুমন্ত মুখটা দেখেই ফিসফিস করে বলে,’এই অসময়ে ঘুম পাড়িয়েছো কেন?রাতে তো ঘুমাতে পারবে না।’
নিরুপমা দুই হাতে খোপা বাঁধতে বাঁধতে জবাব দিলো,’দুপুর থেকেই ঘুমে ঝিমুচ্ছিলো।একটু আগে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।ওমনি ঘুমিয়ে গেল।’
অরু নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল,’মা কোথায়?’
‘কাঁথা সেলাই করে।বসার ঘরেই আছে।আসার সময় দেখিসনি?’
‘খেয়াল করিনি।’
সে কথা শেষ করেই তার হাতে থাকা হাওয়াই মিঠাই দু’টো দেখে।নিরু বলল,’এগুলা কার জন্য?’
‘একটা তোমার,একটা তুতুনের।আমি ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষায় পাশ করেছি।তাই সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছি।’
‘আমার জন্য কেন এনেছিস?আমি এসব খাই?’
অরুনিমা বিরক্ত হলো।খানিকটা চেঁচিয়ে উঠে বলল,’কেন খাও না?তুমি কি সত্তর বছরের বুড়ি?সবকিছুতে এমন বয়স্ক মহিলাদের মতো করো কেন?’
নিরু সে কথার প্রতিউত্তর করে না।অন্যমনস্ক হয়ে এদিক সেদিক তাকায়।শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,’দুপুরে কিছু খেয়েছিস?’
‘না খাইনি।’
নিরুপমা অলস কায়দায় খাট থেকে নামলো।সামনে হেঁটে যেতে যেতে ক্ষীণ কন্ঠে বলল,’চুপচাপ বসে থাক।আপা ভাত মেখে খাইয়ে দিচ্ছি।তোর আর হাত ভরাতে হবে না।’
***
‘উস্তাদ! শিকদারদের বড়ো ছেলে তো জামিন পেয়ে গেছে।আজ বিকেলের দিকেই তার জামিন হয়েছে।দুই দুইটা খু’ন করার পরেও সে কেমন করে এতো সহজে ছাড়া পেল আমার মাথায় আসে না।’
গিয়াসের কন্ঠে বিস্ময়,সেই সাথে চাপা ক্রোধ।ঐ অমানুষটার এতো সহজে জামিন হয়েছে,এ কথা মানতে তার কষ্ট হচ্ছে।সে কথা শেষ করেই সামনে তাকায়।তার সামনে থাকা মানুষটা তার কথা শুনেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না।কেবল ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে চোখে মুখে ধোঁয়া ছাড়লো।তারপর আবার সিগারেটে একটা টান দিলো।
পুরোটা সিগারেট শেষ করার পর এহতেশাম গিয়াসের দিকে ফিরল।রাশভারি কন্ঠে বলল,’কে জামিন করিয়েছে?তার চাচা?’
‘জ্বী উস্তাদ।তার চাচাই দুই মাস ধরে একশোরকম আইনজীবীর কাছে ছুটোছুটি করে তাকে বের করে এনেছে।’
এহতেশাম অল্প হাসলো।গিয়াসের কাছে সেই হাসি দুর্বোধ্য ঠেকালো।অভি জেল থেকে বেরিয়েছে,অথচ ভাইয়ের আচরন এতো ঠান্ডা।বিষয়টা এক নিমিষেই হজম করার মতো না।
এহতেশাম হাস্কি স্বরে বলল,’গিয়াস আরেকটটা সিগারেট দে।’
গিয়াস দ্রুত পকেট হাতড়ায়।প্যাকেট টা খুজে পেতেই দ্রুত একটা সিগারেট বের করে ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়।এহতেশাম বড়ো করে দুইবার সিগারেটে টান দেয়।মাথাটা ইজিচেয়ারের সাথে এলিয়ে দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে।সেই ধোঁয়া উড়ে উড়ে চারদিক কিছুটা ঘোলাটে আর আবছা করে দেয়।
ভারিক্কি কন্ঠটা আচমকাই ভীষণ গম্ভীর শোনায়।এহতেশাম চোখ বুজেই বলল,’তার জামিন হয়েছে,এতে আমি খুশিই হয়েছি।ঐ চার দেয়ালের মাঝে সে ভালোই ছিলো।এখন আর ভালো থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।আমি তাকে ভালো থাকতে দিবো না।’
***
অভি কোনোরকমে গোসল করে তোয়ালে গলায় ঝুলিয়ে ধপ করে খাটে শুয়ে পড়লো।গোসলের পর তার ঘুম ঘুম ভাব চলে গেছে।তবে ক্লান্তি যায় নি।হাত পা কেমন ব্যাথা করছে।কাল ঐ হতচ্ছাড়া কে পেটাতে গিয়ে হাতের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে।নিজের উপর সে নিজেই ভীষণ বিরক্ত।মেজাজ টা কি আরেকটু ঠান্ডা রাখা যায় না?
খাটে শুয়ে সে ঘাড় মালিশ করতে করতে কিছু একটা ভাবে।একটু হিসেব করার চেষ্টা করে কতোদিন পর এই ঘরে সে পা রেখেছে।অনেকদিন।অভি গুনে শেষ করতে পারবে না।
হুসেইন শিকদার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।গলা উঁচু করে বললেন,’আসবো অভি?’
অভি কেবল ঘাড় বাঁকা করে এক পলক তাকে দেখল।তারপর আবার উপুড় হয়ে শুয়ে গম্ভীর গলায় বলল,’আসো।’
হুসেইন সাহেব ঘরে আসলেন।কোনোরকম ভণিতা না করে শুরুতেই বললেন,’তুমি বলেছিলে বিয়ে নিয়ে তোমার কোনো নিজস্ব মত নেই।আমি যা পছন্দ করবো,সেটাই তোমার পছন্দ।তাই তো?’
সে চোখ খুলে না।যেমন ছিলো,ওমন করেই জবাব দেয়,’হুম।তাই।’
‘আমি একটা মেয়েকে পছন্দ করেছি তোমার জন্য।তুমি কি বিয়ে টা করবে?’
অভি নির্লিপ্ত।নির্লিপ্ততার সাথেই জবাব দিলো,’আমি তো বললামই আমার কোনো আপত্তি নেই।কোনদিন বিয়ে করতে হবে বলে দিও।গিয়ে করে ফেলবো।’
হুসেইন সাহেব কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।কিন্তু পুরোপুরি না।অভির উপর তার বিশ্বাস নেই।তিনি গলা খাকারি দিয়ে গম্ভীর হয়ে বললেন,’মেয়েটার নাম নিরুপমা।মাশাআল্লাহ খুবই সুন্দর মেয়ে।খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল।কিন্তু যার সাথে বিয়ে হয়েছিল,সে বড্ড উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবের,বউয়ের গায়ে হাত তুলতো।পরে আর বিয়েটা টিকেনি।বিয়ের দুই তিন বছরের মাথায় তাদের তালাক হয়েছে।নিরুপমার একটা ছোট্ট ছেলেও আছে।নিহাদ নাম।নিরুপমা অন্যত্র বিয়ে করলেও তাকে নিজের সাথে রাখতে চায়।তোমার এতে কোনো আপত্তি নেই তো?’
অভি তার কথায় বিন্দু পরিমান প্রতিক্রিয়া দেখালো না।বরং আগের চেয়েও ঠান্ডা স্বরে বলল,’একটার জায়গায় দশটা ছেলে থাকলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।আমার ভেতর এসব বিয়ে শাদি নিয়ে কোনো অনুভূতি কাজ করে না চাচাজান।পাত্রীর আগে কয় বিয়ে হলো এসবে আমার কিছুই যায় আসে না।’
সে থামল।একটু দম নিয়ে বলল,’তাছাড়া অমন সুন্দর মেয়ের সাথে আমার মতো লোকের বিয়ে দিচ্ছো কেন?খামোখা মেয়েটার জীবন নষ্ট হবে।আমি বড়ো বাউন্ডুলে স্বভাবের।ওসব রূপ লাবন্য দিয়ে আমায় সংসারে বাঁধা যাবে?’
চলবে-