#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
১০.
এহতেশামের মাইগ্রেনের সমস্যা বহুদিন আগের।খুব বেশি সময় শোরগোলের ভেতর থাকলে তার মাথা ধরে যায়।আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।বিকেল থেকে সন্ধ্যা,সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত সবার চিৎকার চেঁচামেচি তে তার মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা হওয়া শুরু করলো।সে রাতে কোনোরকমে খেয়ে একটা টাফনিল খেয়ে নিচতালার একটা ঘরে চলে গেল।তার মাথা ভার ভার করছে,যন্ত্রনায় দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।সে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারলো না।খাটে শুয়ে মুখের উপর বালিশ চাপতেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
রাত তখন গভীর।দূর থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।এহতেশাম তখন গাঢ় ঘুমে।তার বুক পর্যন্ত চাদর টানা।মাথা ব্যাথার কারণে সে জানালার পর্দা আগে থেকেই টেনে রেখেছিলো।ঘরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার।অনুমানে হাঁটা ব্যাতীত আর কোনো উপায় নেই।তার ঘরের দরজা কেবল ভিড়িয়ে রাখা।
ক্যাচ ক্যাচ শব্দে ঘরের দরজা ফাঁক হলো।এহতেশাম একটু কপাল কুঁচকে অন্য দিকে ফিরে গেল।টাফনিলের প্রভাবে তখন তার দুই চোখ বার বার বন্ধ হয়ে আসছিল।মনে হচ্ছিল শরীরের জোরও একটু কমে গেছে।
আগন্তুক পা টিপে টিপে নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।তার হাতে থাকা ধাঁরালো অস্ত্র তখনো শিকারের খোঁজে ব্যস্ত।সে এক পা এক পা করে সামনে এগিয়ে গেল।এই ঘর তার মুখস্ত।আগেও তো কতো এসেছে।সে হেঁটে গিয়ে একেবারে তার মুখোমুখি দাঁড়ালো।
এহতেশামের চোখ বন্ধ।ক্লান্তিতে তার শরীর অবসন্ন।আঘাত করার এটাই উপযুক্ত সময়।সে হাতে থাকা ধাঁরালো বস্তুটা উপরে তুলল।তারপর তীব্র বেগে সেটা দিয়ে সামনে থাকা ব্যক্তিকে প্রহার করার জন্য এগিয়ে গেল।
অথচ সেই ছুরি এহতেশামের বুক চিরে বেরুলো না।তার আগেই একটি হাত আচানক খপ করে তার একহাতের মুষ্টি চেপে ধরল।মুহূর্তেই চোখ খুলল এহতেশাম।
ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।কিচ্ছু দেখার জো নেই।এহতেশাম সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখতে পেল না।তবুও অন্য হাত দিয়ে অনুমানে তার মুখ বরাবর জোরালো ঘুষি মারলো।এক ঘুষিতেই আগন্তুক দুই পা পিছিয়ে গেল।হাতে থাকা ছুরি টা শব্দ তুলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।সেই ঝনঝন শব্দে এহতেশামের মস্তিষ্ক সচল হয়।অথচ হাই পাওয়ারের ঔষধের প্রভাবে তখনও তার শরীর নাজুক,খুব বেশি ক্লান্ত।
সে উঠার আগেই আরেক দফা তাকে আঘাত করার অপচেষ্টা চালানো হলো।এবার এহতেশাম কেবল তার হাত ধরল না।এক হ্যাঁচকা টানে তার থেকে ছুরি টা নিজের হাতে কেড়ে নিল।তার মনে হলো ছুরিটা অন্যদিকের মানুষটার আঙুলে সামান্য আঁচড় কেটে তারপর তার হাতে এসেছে।সে ছুরিটা হাতে নিয়েই গর্জন করলো,’এ্যাই তুই কে?মামা,,ছোট মামা।নানুমণি,হাশিম,হৃদি…….’
তার হাতের বন্ধন জোরালো,ছাড়া পাওয়া মুশকিল।অন্য পাশের মানুষটার মুখে আঁধার নেমে এলো।সে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে এক দৌড়ে দরজার দিকে ছুটে পালালো।এহতেশাম নিজেও গায়ের উপর রাখা চাদরটা মাটিতে ছুড়ে দরজার দিকে ছুট লাগায়।কিন্তু অন্ধকারে খাটের পায়ার সাথে হোঁচট খেতেই সে হাঁটু ভেঙে মাটিতে গিয়ে বসলো।মাটিতে বসতেই আপনাআপনি তার মেজাজ গরম হলো।নিজের পায়ে একটা কিল বসিয়ে সে দাঁত চেপে বলল,’ড্যাম ইট।ধরতে পারলাম না,শীট!’
রিজোয়ানা আর হুসেইন এক প্রকার ছুটতে ছুটতে তার ঘরে এলেন।হুসেইন সাহেব ঘরে এসেই বাতি জ্বালালেন।হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,’কি হয়েছে এহতেশাম?’
এহতেশাম তখন মাটিতে বসা।তার হাতে একটা ছুরি।যার শীর্ষে গাঢ় লাল রঙের সামান্য তরল লেপ্টে আছে।
****
অরুনিমার তখন চোখ লেগে এসেছিল।বারান্দায় থাকা ছোট্ট চেয়ারে পা দোলাতে দোলাতে কখন যে সে ঘুমিয়ে গেছে সে নিজেও জানে না।আচমকা দরজায় পর পর কড়াঘাতের শব্দে তার তন্দ্রা ছুটে গেল।সে ধড়ফড় করে উঠে বসে বুকে হাত দিলো।তারপর বারান্দা থেকে ঘরের দিকে ছুটে গেল।
অভি তখন খাটে বসা।হঠাৎ শব্দে সে নিজেও চমকালো।শব্দটা যখন ধীরে ধীরে বাড়লো,তখনই তার মেজাজ খারাপ হলো।সে চোখ মুখ খিঁচে উঠে গিয়ে দরজার কাছে যেতে যেতে বলল,’কি ব্যাপার?সমস্যা কি?এতোবার কে দরজা ধাক্কায়?’
সে খট করে ছিটকিনি ফেলে দরজা খুলল।দরজার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে তার আরো আগে মেজাজ বিগড়ালো।
এহতেশাম তীরের ফলার মতো তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালো।অভি খেঁকিয়ে উঠলো,’সমস্যা কি?আমার ঘরে তোর কি কাজ?রাত বিরেতে অশান্তি না করলে তোর হয় না।তাই না?’
অরুনিমা ভয়ে ভয়ে দুইজনের চেহারা দেখে।রিজোয়ানা আর হুসেইন ততক্ষণে দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছেন।এহতেশাম ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো।অভির রক্তিম চাহনি আর খিটখিটে মেজাজের জবাবে সে কেবল শীতল চোখে ঠান্ডা মেজাজে তার দিকে তাকালো।তারপর তাকালো তার হাতের দিকে।তার আঙুলের ব্যান্ডেজ টা দেখেই সে তাচ্ছিল্য করে হাসলো।জানতো এমনটাই হবে।
অভি মোটা স্বরে বলল,’সমস্যা কি তোর?পাগলের মতো হাসছিস কেন?’
এহতেশাম জবাব দিলো না।কেবল একহাতে তার হাতের কবজি চেপে ধরে সেটা হুসেইন সাহেবের মুখোমুখি তুলে বিদ্রুপ করে বলল,’ভালো।আরো বেশি একে জেল থেকে বের করে আনো।আরো বেশি প্রশ্রয় দেও।যেন প্রশ্রয় পেয়ে পেয়ে সে বারবার আমার দিকে ছুরি নিয়ে তেড়ে আসতে পারে।’
অভি তেঁতেঁ উঠল হঠাৎ।তিতিবিরক্ত হয়ে বলল,’এ্যাই তুই কি আবোল তাবোল বলছিস?আমি তোকে কি করেছি?মানে যা তা।অনুমানে কথা কম বলবি।বলদ একটা!’
‘অভি!’
‘ধমকাবি না।তোর ধমকে আমি ভয় পাই না।’
এহতেশাম তার কলার টেনে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,’ধমক ভয় পেতে হবে না।আমায় ভয় পা।তবেই হবে।সাহস থাকলে রাতের অন্ধকারে শরীরে শাল পেঁচিয়ে আঘাত না করে সরাসরি আঘাত কর।’
অভি তেঁতেঁ উঠল,’মিথ্যুক! চুপ করে আছি বলে যা তা বলছিস! কবে আমি রাতের অন্ধকারে তোকে আঘাত করেছি?যতোসব গাঁজাখুরি কথাবার্তা।’
এহতেশাম কর্কশ গলায় বলল,’তুই ই আমার ঘরে গিয়েছিস।আমার স্পষ্ট খেয়াল আছে,যে আমার ঘরে গিয়েছে,তার হাতে ছুরির আঁচড় লেগেছে।’
অভি আঘাত পাওয়া হায়নার মতো গর্জন করলো,’আমি তোর ঘরে যাই নি বাল।’
‘তাহলে তোর হাত কেটেছে কিভাবে?’
অভি একবার নিজের হাত দেখলো।তারপর ফুশতে ফুশতে জবাব দিলো,’ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে।আমার ঘুড়ি কাটা পড়েছিল।’
এহতেশাম কটাক্ষ করে বলল,’পরের বার থেকে একটু বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা বানাবি।এসব কথা শুনলেও হাসি পায়।’
অভির সমস্ত শরীর তখন প্রচন্ড ক্রোধে দাউ দাউ করছে।সে কাঁপতে কাঁপতে বলল,’আর কয় হাজার বার বলবো আমি তোকে মারি নি?আমি আমার ঘর থেকেই বের হইনি।’
সে পেছন ফিরে অরুনিমাকে দেখামাত্র চেঁচাল,’অরুনিমা! এ্যাই অরুনিমা।আমি কি ঘরের বাইরে গিয়েছি একবারো?’
তার কন্ঠ শুনেই অরুনিমা দুই পা পিছিয়ে গেল।একটা শুকনো ঢোক গিলে দুই পাশে মাথা নেড়ে বলল,’না….না তো।’
এহতেশাম সেই কথার তোয়াজ করলো না।কেবল তার হাতে থাকা ছুরিটা অভির হাতে ধরিয়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল,’আর যদি কখনো আমার ঘরে এভাবে চোরের মতো গিয়েছিস,তাহলে সেখানেই জ/বা/ই করে দিবো।বেয়াদব কোথাকার।বাস্টা…’
সে শেষ করার আগেই অভি তারই মতো করে তার কলার টেনে ধরে হুংকার দিলো,’খবরদার! মুখ খারাপ করবি না।আন্দাজে কথা বলবি না তুই।আমি কারো ঘরে যাই নি।আল্লাহর কসম।’
এহতেশাম তার দিকে কতোক্ষণ চেয়ে রইল।একেবারে ঘৃণা ভরা দৃষ্টি।শেষে তাকে ছেড়ে দিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলল,’সিরিয়াসলি?এখন তুই মিথ্যা কসম দেওয়াও শুরু করেছিস?থাক,আর কথা বাড়াতে হবে না।আমি বিশ্বাস করলাম তুই কোথাও যাসনি।ছু’রিটা উড়ে এসে আমায় আঘাত করেছে।হয়েছে?যা এবার ঘুমা।’
দুই জনের উচ্চস্বরের চেঁচামেচিতে তখন সবার ঘুম ছুটে গেছে।সবাই অলস ভঙ্গিতে হেঁটে এসে অভির ঘরের সামনে ভীড় জমালো।জাহানারা বেগমের খুব ভেঙেছে।তিনি তার ঘর থেকে চেঁচামেচি করছেন।রিজোয়ানা মাথায় কাপড় তুলে বললেন,’আমি গিয়ে একটু দেখি আসি।’
হৃদির দুই চোখ তখন ঘুমে ভেঙে যাচ্ছিল।সে চোখ বুজেই ঘুম জড়ানো গলায় প্রশ্ন করে,’এহতেশাম ভাইজান! কি হয়েছে?’
এহতেশাম কড়া চোখে একবার অভির দিকে তাকালো।তারপর কলার ঠিক করে হনহনিয়ে তার ঘরে যেতে যেতে বলল,’কিছু হয়নি।যা গিয়ে ঘুমা।’
বলেই সে ঘরে গিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করলো।সবাই একবার তার ঘরের দিকে,একবার অভির দিকে নজর দিলো।অভি সবার গোল গোল দৃষ্টি দেখতেই চোখ মুখ খিঁচে ধাম করে তাদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো।সবার বিভ্রান্ত দৃষ্টি,বিচলিত হয়ে চোখ ডলতে ডলতে এদিক ওদিক দেখতে ব্যস্ত।শুধু একজনের তর্জনী তখনও রক্ত শুকিয়ে লাল হয়েছিল।সে নিরুবে নিভৃতে সরে এলো।সকালের আগেই তাকে সেভলন দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে।
***
কাঁচের ফুলদানিটা ঝনঝন শব্দ করে মাটিতে আছড়ে পড়লো।অরুনিমা দুই হাত কানে চেপে ঘরের এক কোণায় গিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।অভি ফুলদানি ভেঙেই ক্ষ্যান্ত হয়নি।আয়নার সামনে থাকা সুগন্ধির শিশি টা হাতে তুলে সে প্রচন্ড বেগে সেটা আয়নার উপর নিক্ষেপ করলো।মুহুর্তেই কাঁচ ভাঙার কচকচ শব্দে পুরো ঘর আন্দোলিত হলো।অরুনিমা দুই চোখ বন্ধ করে বেড়াল ছানার মতো নিজেকে গুটিয়ে নিল।তার সমস্ত শরীর আতঙ্কে,সঙ্কায়,দুঃচিন্তায় থরথর করে কাঁপছে।অভির সাথে বিয়ের পর এই প্রথম সে সত্যি সত্যি আবিষ্কার করেছে তার বর আসলেই জেল ফেরত আসামি।এতোদিন সে যথেষ্ট সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ করেছে।অথচ আজ তার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো আঘাতপ্রাপ্ত জংলি পশু।যার ভেতর কোনো মায়া দয়া,ভালোবাসা অনুভূতি কিচ্ছু নেই।
অভি ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,’কু//ত্তার বাচ্চা একটা! কিছু বলি না বলে যখন যা মনে হয়,সব আমার উপর চাপিয়ে দেয়।ফালতু কোথাকার!’
অরু অল্প করে চোখ খুলে তার দিকে তাকায়।তার সাথে চোখাচোখি হতেই অভি খেঁকিয়ে উঠল,’এই মেয়ে!! তুমি দেখো নি আমি যে ঘর থেকে বের হইনি?’
অরুনিমা চাবি ঘোরানো পুতুলের ন্যায় উপরনিচ মাথা নাড়লো।অভি তেঁতেঁ ওঠল,’তাহলে জোর গলায় বললে না কেন?’
অরু আর শব্দ করলো না।অভি কতোক্ষণ সাপের মতো ফোস ফোস করে শেষে খাটের উপর উপুড় হয়ে শুলো।অরু দেখল তার পায়ে একটা কাঁচভাঙা বিঁধেছে।অথচ তার কোনো বিকার নেই।সে দুই হাতে মাথা চেপে চেঁচিয়ে উঠল,’বাতি নেভাও অরুনিমা।আলো আমার অসহ্য লাগে।’
অরু খুব সাবধানী পা ফেলে কাঁচভাঙা এড়িয়ে সুইচবোর্ড পর্যন্ত এগিয়ে যায়।তারপর আস্তে করে বাতি নিভায়।অভি নিথর হয়ে খাটের উপড় পড়ে থাকলো।শেষে আচমকাই কেমন অদ্ভুত সুরে বলে উঠল,’শালা মা বাপ ছাড়া জীবন হইলো কু’ত্তার জীবন।কু’ত্তাও এর চেয়ে ভালো থাকে।’
সে একটু থামলো।তারপর আবার চাপা স্বরে বলল,’বাড়িতে যাই হোক,দোষ ঘুরে ফিরে অভির।কেন?কারণ অভির তো মা বাপ নেই।অভি তো একটা কু’ত্তার বাচ্চা।শালার জীবন!!’
অরুনিমা সুইচবোর্ড ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার কথা শুনলো।সে আস্তে করে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে মাটিতে বসলো।সে ভেবে নিয়েছে ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত সে এখানেই থাকবে।পুরো ঘরে কাঁচভাঙা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।অরু অন্ধকারে এসবের উপর হাঁটবে কেমন করে?’
***
পরদিন সারা সকাল অভি ঘর থেকে বের হলো না।অরু ভোরের আলো ফুটতেই কোনোরকমে পুরো ঘর পরিষ্কার করে গোসল সেরে নিল।খাওয়ার জন্য নিচে নামতেই সৃজনী তাকে এক কোণায় ডেকে নিয়ে বলল,’ভাইজানের কি অবস্থা অরুনিমা?’
সে নির্বিকার হয়ে জবাব দেয়,’জানি না।আমাকে কিছু বলেনি।’
সৃজনী বলল,’রাতে কি ঘরে ভাঙচুর করেছে?’
সে হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে।সৃজনী বলল,’আমাকে একটু তোমার ঘরে নিয়ে যাবে?’
অরু অবাক হয়ে জবাব দেয়,’অদ্ভুত! আমি কেন নিয়ে যাবো?তুমিই তো ঘর চেনো।’
সৃজনী অপ্রস্তুত বোধ করলো।ইতস্তত করতে করতে বলল,’না মানে তুমি সহ থাকলে ভালো হতো।’
অরুনিমা ঠোঁট উল্টে বলল,’আচ্ছা ঠিক আছে।চলো।’
ঘরের দরজা খুলেই সৃজনী একবার খাটের দিকে তাকায়।অভি তখনোও উপুড় হয়ে শোয়া।সৃজনী কোমল চোখে তার দিকে তাকায়।তাকে এক নজর দেখতেই সে ব্যস্ত হয়ে বলল,’সেকি! পা কেটে গেছে তো।দেখো নি তুমি?’
অরু বলল,’দেখেছি তো।’
‘তাহলে?কাঁচটা বের করো নি কেন?’
সে বুকে হাত চেপে ভয়াতুর কন্ঠে বলল,’পাগল নাকি?জেনেবুঝে বাঘের গুহায় হাত দিবো?’
সৃজনী বলল,’ভারি অন্যায় হয়েছে।মানুষটা কতোটা সময় ধরে যন্ত্রনা সহ্য করলো!’
সে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসলো।অরু নখ কামড়াতে কামড়াতে গোল গোল চোখে তার দিকে তাকালো।সৃজনী বলল সাইডবক্সের নিচের ড্রয়ারে একটা বক্স আছে।একটু কষ্ট করে দিবে?’
অরু গিয়ে বক্স বের করলো।তারপর সৃজনীর পাশাপাশি গিয়ে গালে হাত রেখে বসলো।কাঁচের টুকরো টা আলতো করে টান দেওয়াতে বের হলো না।একটু জোরে হ্যাঁচকা টান দিতেই সেটা মাংস ছিঁ”ড়ে বেরিয়ে এলো।অভি যন্ত্রনায় অস্ফুট আর্তনাদ করল।পা নেড়ে ধমক দিলো,’সৃজনী! ঘর থেকে যা বলছি।এসব আদিখ্যেতা বিরক্ত লাগে আমার।’
সৃজনী সেই কথা শুনলো না।অভি কথা শেষেই আবার ঘুমে তলিয়ে গেল।অরুনিমা গালের নিচে হাত রেখে সৃজনীর কাজকর্ম দেখে।সে তুলায় সেভলন লাগিয়ে অভির ক্ষতস্থান মুছে দিচ্ছে।হঠাৎ তার চোখের দিকে চোখ পড়তেই অরু বিচলিত হয়ে বলল,’সেকি সৃজনী! তোমার চোখে পানি কেন?তুমি কাঁদছো?’
___
বিকেলে এহতেশাম মুস্তাফা দুই দিনের সফর শেষে তার বাড়ি ফিরে গেল।তার ছুটির দিন শেষে।রাতের শেষ ভাগেই তাকে জিপে করে রাঙামাটি ফিরতে হবে।তার মিলিটারি জীবন শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি।
সে ব্যাগ গোছালো।মায়ের থেকে বিদায় নিলো।শেষে বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দু’টো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।মোসলেম তখন একদৃষ্টিতে সিলিং দেখছিলেন।এহতেশাম খুব সাবধানী পায়ে হেঁটে তার পাশাপাশি বসলো।তার একটা হাত আঁকড়ে ধরে ডাকলো,’বাবা!’
মোসলেম জবাব দিলেন না।জবাব দেওয়ার অবস্থা তার নেই।কেবল চোখের পাতা দুইবার ঝাপটা দিলেন।বোঝালেন তিনি শুনতে পাচ্ছেন।এহতেশাম তার হাতে কপাল ঠেকিয়ে বলল,’আমি চলে যাচ্ছি বাবা।আজ রাতেই চলে যাবো।তুমি তোমার খেয়াল রেখো।’
কিছুক্ষণ নিরবতা।এহতেশাম একটু কেশে নিয়ে নিজ থেকে বলল,’আমি তোমার সাথে হওয়া সবকিছুর শোধ নিয়েই ছাড়বো বাবা।আমি আমার প্রতিজ্ঞায় অটল।কিন্তু এইবার আমি প্রচন্ড ক্লান্ত।নানুমণির অসহায় মুখটা দেখলে ঐ অভিকে কিছু করতে পারি না আমি।নয়তো ঐ বাড়ি আমি কবেই জ্বালিয়ে দিতাম।অভির সাথে আমার হিসেব মিটেনি।তবে আপাতত তাকে ছেড়ে দিলাম।আমার মাথায় এখন অনেক প্রেশার বাবা।’
মোসলেম সাহেবের চোখের মনি সামান্য নড়লো।তিনি বুক ভরে শ্বাস নিলেন।এর বেশি আর কোনো কিছু করার সক্ষমতা তার নেই।এহতেশাম একবার শান্ত চোখে তার শরীরে বিদ্যমান শত শত কাঁটাছেড়া গুলো দেখে।তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,’বাবা! সামনের মাসে আমায় মিশনে যেতে হবে।এবার গেলেই রেইডার্স টিম বানিয়ে কিছুদিন অনুশীলনে থাকতে হবে।তারপর সেই অনিশ্চিত জীবন নিয়ে মিশনের পথে যাত্রা।জানি না ফিরব নাকি।যদি ফিরে আসি,তবে আবারো দেখা হবে।তুমি ভালো থাকো।’
সে আর দেরি করল না।উঠে গিয়ে দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।হাবিবা বললেন,’কাল বিকেলে গেলেও তো পারতি।এতো তাড়া কিসের তোর?’
এহতেশাম পানি খেতে খেতে বলল,’ভালো লাগে না এখানে।বিরক্ত লাগে।ক্যাম্পের জীবনেই শান্তি লাগে আমার।’
হাবিবা ভেজা চোখে বললেন,’আবার কবে দেখা হবে বাবা?’
এহতেশাম মৃদু স্বরে বলল,’জানি না।’
হাবিবা তার কাছে ছুটে গেলেন।তাকে জাপটে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে উঠে বললেন,’বাবা! তুমি কি বুঝো না মা তোমাকে কতো ভালোবাসি? তুমি বলো তুমি ঠিকঠাক ফিরে আসবে।জানি না আবার কেমন কথা?’
এহতেশাম সামান্য হাসল।একটা হাত হাবিবার পিঠে রেখে বলল,’মা! আমি বলেছি কবে দেখা হবে সেটা জানি না।আসবো না সেটা তো বলিনি।আমি অবশ্যই আসবো।হয় সুস্থ সবল ভাবে,নয়তো ওয়াকিং স্টিকে ভয় দিয়ে,নয়তো হুইলচেয়ারে করে,আর নয়তো লাল সবুজে মোড়ানো কফিনে করে।’
হাবিবা হাউমাউ করে বললেন,’দোহাই লাগে এহতেশাম।এসব কথা আর বলো না।’
সে আর কিছু বললো না।সামান্য একটু খেয়েই রাত তিনটার দিকে সে জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।গিয়াসের সাথে একটা কথা বলার ছিলো।যাক গে,ফোন তো আছেই।ক্যাম্পে ফিরেই সব বলা যাবে।
যেতে যেতেই সে একবার তার বুক পকেটে হাত রাখে।সেখানে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি আছে।এই ছবিটা মেজর খুব যত্ন করে আগলে রেখেছে।
নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে মেজর এহতেশামের গাড়ি রাঙামাটির পথে এগিয়ে যায়।তার সাথে সাথেই এগোতে থাকে আমাদের গল্প।
চলবে-
#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
১১.
অরুনিমা পা দোলাতে দোলাতে টেলিভিশন দেখছিলো।হৃদিতা তখন কোচিং-এ।সামির তিয়াশা তুরান-সবাই বিকেলের দিকেই চলে গেছে।সৃজনী আর হাবিবা অবশ্য যায় নি।তারা জাহানারা বেগমের ঘরে বসে কথা বলছিলো।অরুনিমা সেই ঘরে যায় নি।খামোখা বুড়ির ক্যাচাল শোনার কোনো শখ তার নেই।তাকে দেখলেই বুড়ির মনে পড়ে তার একটা বোন আছে।আর বোনটার তালাক হয়ে গেছে।কি অসহ্য! অরু পারতে তার মুখোমুখি হয় না।
সে সোফায় বসে বসে টেলিভিশন দেখায় মন দেয়।তার বড্ড ভালো লাগে টেলিভিশন দেখতে।তিন্নিদের বাড়িতে এর চেয়ে ছোট একটা টেলিভিশন ছিলো।অরু কতোবার যে কলেজের নাম করে তার বাড়িতে গিয়েছে তার কোনো ইয়াত্তা নেই।তার সিনেমা ভীষণ পছন্দ।যদি টাকা থাকতো,তাহলে সে সব সিনেমা থিয়েটারে গিয়েই দেখতো।সে শুনেছে থিয়েটারে নাকি দারুণভাবে সিনেমা উপভোগ করা যায়।রিতু তার প্রেমিকের সাথে সেইবার সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো।অরুর যেহেতু কোনো প্রেমিক নেই,তাই তার আর সিনেমা দেখতে যাওয়া হলো না।
সে গালের নিচে হাত রেখে কল্পনায় বিভোর হয়।প্রেমিক নেই তো কি হয়েছে?একটা বর তো আছে।মুহূর্তেই তার মুখ কুঁচকে এলো।বর যে একটা আছে,সেটা থাকা আর না থাকা একই কথা।অরুকে দেখামাত্রই সে কেমন অদ্ভুত মুখ করে রাখে।সংসারে তার কোনো মনোযোগ নাই।সে আছে গলির মোড়ে কি করে গ্যাঞ্জাম বাঁধানো যায়,এই ধান্দায়।
আজ সকালে অরু তার পা দেখে বলল,’তোমার পায়ে কি অনেক ব্যাথা?’
সে একদম জঘন্য মুখ করে বলল,’না।আমার পায়ে অনেক সুখ।’
কি অদ্ভুত! অরু তো ভালো কথাই বলেছে।এমন ত্যাড়া উত্তর দিলো কেন?
সে ভাবতে ভাবতেই টিভির স্ক্রিনে তাকায়।দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে সিনেমার শেষ দৃশ্য চলে আসছে।অরু অপেক্ষা করছে তার সেই কাঙ্ক্ষিত বাক্য শোনার জন্য।অথচ সেই বাক্য শোনা হলো না।তার আগেই বিদ্যুৎ চলে গেল।অরুনিমার মেজাজ পুরোপুরি বিগড়ে গেল।সে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে সোফা থেকে উঠে এলো।
বাড়িতে জেনারেটর আছে।সুতরাং বিদ্যুৎ না থাকলেও বাতি চলে।অরু ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়ি দেখে।কতো সুন্দর এই বাড়ি! আলমারি ভর্তি জামা,টেবিলভর্তি ফল,ফ্রিজ ভর্তি মাছ মাংস।ইশশ! কি মজার জীবন।কিন্তু তবুও সে পুরোপুরি এই জীবনের মজা নিতে পারছে না।নিরু আপা আর তুতুনের মুখটা বড্ড মনে পড়ে।
নিরু আপা কতো যত্নে তাকে খাইয়ে দিতো।আপার হাতের ডাল ভাত মাখাও তো অরুর কাছে অমৃতের মতো লাগতো।অথচ এখানের এতো দামি দামি খাবারেও সেই স্বাদ নেই।তুতুন বাচ্চাটা টেলিভিশন দেখতে পেলে কতো খুশি হতো! তাকে এদিকে এনে টিভির সামনে বসালেই তো সে খুশিতে গদো গদো হতো।
অরুনিমা ভেবে রেখেছে বড় হয়ে সে একটা সুন্দর টেলিভিশন কিনে তুতুন কে উপহার দিবে।আর নিজের জন্য একটা ক্যামেরা কিনবে।তারপর জীবনে যা কিছু ঘটবে,সবকিছুর ছবি তুলে রাখবে।
সে খাবার ঘরের গিয়ে একবার পূর্ণদৃষ্টিতে টেবিলের দিকে তাকায়।সেখানে দুই ঝুড়িভর্তি ফল আর ফল।অরুনিমা একটা আঙুরের থোকা হাতে নিয়ে এক দৌঁড়ে একটা চেয়ারে গিয়ে বসলো।
তারপর পায়ের উপর পা তুলে আঙুরের থোকা টা মুখের সামনে ধরে খুব আয়েশ করে একটা আঙুর খেলো।মুখ নেড়ে নেড়ে বলল,’আমরা বড়োলোক রা সারাক্ষণই এসব দামি দামি খাবার খাই।’
বলেই সে মুখ টিপে হাসলো।তারপর আরো একটা আঙুর খেতে খেতে উদাস গলায় বলল,’শুধু বাড়িটার লোভে এখানে পড়ে আছি।নয়তো ঐ নিমাই পাগলের সংসার ছেড়ে কবেই দূরে কোথাও চলে যেতাম!’
অভি তখন ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি ভাঙছিলো।নামতে নামতেই তার চোখ গেল খাবার ঘরের দিকে।অরু তখন নিজে নিজে কথা বলায় ব্যস্ত।অভি থামলো।গোল গোল চোখে তার কাজকর্ম দেখলো।এক মিনিট দেখার পরেই তার মুখ ছেয়ে গেল এক রাশ বিরক্তিতে।সে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো,’পাগল ছাগল কোথাকার!’
তারপরই ধপ ধপ করে নেমে জাহানারা বেগমের ঘরে চলে গেল।
জাহানারা বেগমের ঘরে ঢুকতেই সে কিছুটা বিরক্ত হলো।সৃজনী আর হাবিবা এখানে থাকবে সে আশা করে নি।জাহানারা তাকে দেখতেই ডাকলেন,’দাদুভাই! আসছো তুমি! আসো বসো।’
অভি বসলো না।খানিকটা অধৈর্য হয়ে বলল,’না দিদান।বসবো না।’
হাবিবা বললেন,’বোস না পাঁচ মিনিট অভি।তোর যে ফুফু এলো বাড়িতে,তুই কি একটা বেলা তার সাথে কথা বলেছিস?’
অভি বিরক্ত হয়ে বলল,’বাজে বকো না তো ফুফু।এতো কথা আমি কারো সাথেই বলি না।’
হাবিবা কথা বাড়ালেন না।শুধু চোখ খাঁড়া করে বললেন,’যাচ্ছিস কোথায় তুই?’
সে দ্বিগুণ বিরক্ত হয়ে জবাব দিলো,’বিনুদের বাড়িতে।’
‘রাতে ফিরবি কখন?’
‘জানি না।’
সৃজনী বলল,’তুমি না পায়ে চোট পেয়েছো?’
অভি মহাবিরক্ত হয়ে বলল,’তাতে তোর কি?আমার পা ফেটে রক্ত বের হোক।আমি মরে যাই।তোকে মাথা ঘামাতে বলেছি?বিরক্তকর।’
সৃজনী পুরোপুরি দমে গেল।আনমনেই তার চোখ ভিজে উঠল।অভি তার ছলছল চোখকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে জাহানারার দিকে দেখে বলল,’আমি বিনুদের বাড়ি যাচ্ছি।রাতে সেখানেই খাবো।’
বলেই সে আর দাঁড়ালো না।হনহনিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিলো।জাহানারা বললেন,’দাদুভাই! হাতে টাকা আছে?দাদুর কাঠের বাক্সে টাকা আছে।লাগলে নেও।’
অভি থামলো।পেছন ফিরে একবার হাবিবা আর সৃজনীকে দেখল।সে এখানে এসেছে মূলত টাকার জন্য।অথচ হাবিবা আর সৃজনীর সামনে সে ঠিক মতো কিছু বলতেও পারছে না।জাহানারা টাকার কথা বলতেই সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে কাঠের বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল।সেখান থেকে দু’শো টাকা বের করে পকেটে পুরে সে হেলেদুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হাবিবার সেদিকে দেখতে দেখতে বললেন,’একে কিছু বলো না কেন আম্মা?এর স্বভাবে তো কোনো পরিবর্তন নাই।’
জাহানারা খাটে হেলান দিয়ে বললেন,’কি কমু তারে?মা নাই,বাপ নাই।ভালা স্বভাব হওয়ার লেগ্গা যা যা লাগে,কোনোডাই তো নাই।এখন আমি কিছু কইলে যা একটু আমার কাছে আসে,ঐডাও আসতো না।আমি তারে বারণ করতে পারি না হাবিবা।’
হাবিবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।মাথা নেড়ে বললেন,’এভাবে হয় না আম্মা।সে তোমার লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠছে।পাড়ায় মহল্লায় রোজ রোজ সে ঝামেলা করে।বড়ো বাড়ির ছেলে বলে লোকে কিছু বলে না।সে কি এই জীবনে কামাই রোজকার কিছু করবে না?’
জাহানারা বললেন,’কামাই করার কি দরকার?আমার দাদুভাইরে আমি সব লেইখা দিমু।ঐডি বেইচ্চা সে আজীবন চলবে।’
‘খুব ভালো।এমনই চিন্তা করো তুমি।তোমার নাতিকে তুমি বসে বসে খাওয়াও।যতোসব!’
জাহানারা সেই কথার জবাব দিলেন না।শুধু কিছুটা উদাস হয়ে বললেন,’অভি দাদুভাই আমার খুব আদরের।আমি তারে খুব ভালোবাসি হাবিবা।তার মনডা একদম সাফ।তুমি জানো না সে আমারে কতো ভালোবাসে।’
হাবিবা কিছু বলতে গিয়েও বললেন না।মনে হয় না তার বলাতে কোনো কাজ হবে।উল্টো মা আরো রেগে যাবে।সে কোলের উপর হাত ফেলে বলল,’আচ্ছা বাদ দাও।চলো অন্য কথা বলি।’
***
রাতে সবার খেতে খেতে দশটা বাজলো।অরুনিমা আর হৃদিতা মিলে রান্নাঘর থেকে খাবারের বাটিগুলো টেবিলে আনছিলো।হৃদির তখন দুই চোখে ঘুম।সে হাঁটতে হাঁটতেও ঝিমুচ্ছিলো।অরু বলল,’তোমার এতো ঘুম পাচ্ছে কেন?’
হৃদি হাই তুলতে তুলতে বলল,’কাল সারারাত তুরানদের সাথে হাসাহাসি করেছি।কতো দেরিতে ঘুমিয়েছি জানো?’
অরুনিমা আর কথা বাড়ায় না।সে চুপচাপ গিয়ে টেবিলের এক মাথায় দাঁড়ায়।এই বাড়ির একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে।আগে বাড়ির কর্তা আর তাদের ছেলে মেয়েরা খেতে বসে।তারা খাওয়া শেষ করলে তাদের বউরা খেতে বসে।এই নিয়ম অরুনিমা রহমানের সাংঘাতিক অপছন্দ।এটা আবার কেমন কথা?তার খিদে পেয়েছে,সে খাবে।খাবারের বাটি চোখের সামনে রেখেও খেতে না পারার কষ্ট তারা কি করে বুঝবে?ধ্যাত! এতো নিয়মকানুন ভালো লাগে না।
হাশিম বসলো সবার ডান দিকের চেয়ারে।অরুনিমার সাথে চোখাচোখি হতেই সে সৌজন্য দেখিয়ে সামান্য হাসলো।অরুনিমাও বিনিময়ে তাকে এক গাল স্বচ্ছ হাসি উপহার দিলো।হুসেইন সাহেব টেবিলে বসেই বললেন,’অভি কি এখনো বাড়ি ফিরে নি?’
হৃদি মুখভার করে বলল,’সে তো এক ঘন্টা আগেই বেরিয়ে গেছে।’
হুসেইন সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,’ঠান্ডা বাড়ছে।ছেলেটা যে রাত বিরেতে বাইরে থেকে কি আনন্দ পায় কে জানে?’
হাবিবা চটে যাওয়া মেজাজে বললেন,’এসব ঠিক না হুসেইন।তুমি তাকে লাই দিবে না একদম।বোঝাও তাকে।বাড়িতে বউ ফেলে এসব কেমন বাউন্ডুলে স্বভাব তার?’
হুসেইন সাহেব খাবার খাওয়ায় মন দিলেন।সবার ঐ এক কথা।তিনি তাকে লাই দিচ্ছেন।লাই কোথায় দিচ্ছেন তিনি?যে মানুষ বাঁধনছাড়া,তাকে হুসেইন বাঁধবে কি করে?
অভি একটা মুক্ত,স্বাধীন,ছন্নছাড়া ব্যক্তিত্ব।পরাধীনতার শেকল কবেই বা তাকে কেউ পরাতে পেরেছে?সে বড্ড এলোমেলো।গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা সে কোনোদিনই করে নি।
অরুনিমা সবাইকে এটা সেটা বেড়ে দিচ্ছিলো।হাশিম কে মাংসের টুকরো দিতে গেলেই সে বাম হাত তুলে বলল,’হয়েছে।আর লাগবে না।’
অরুনিমা থামলো।আচমকা কিছু চোখে পড়তেই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল।সে টের পেল তার দুই হাত কেমন অল্প অল্প কাঁপছে।সে একটা শুকনো ঢোক গিলে দুই কদম পিছিয়ে এলো।
তার চোখ তখনো হাশিমের বাম হাতের তর্জনীর দিকে নিবদ্ধ।যেখানে একটা ক্ষতচিহ্নের স্পষ্ট দাগ দৃশ্যমান।ব্যান্ডেজ না বাঁধায় একেবারে দগদগে ঘা হয়ে আছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে দুই একদিন আগের ক্ষত।আরো একনজর দেখার আগে হাশিম দ্রুত হাত নামিয়ে নিল।
অরুনিমার মস্তিষ্ক সচল হয়।সেদিন এহতেশাম ভাইজান বলেছিল তাকে যে মেরেছে তার হাতে তিনি জখম করেছেন।দোষ গিয়ে পড়লো বেচারা হামাদের উপর।অথচ অরুনিমার মনে হলো না এই কাজ হামাদের।সে যেই লোক! ঘুমন্ত অবস্থায় কাউকে প্রহার করার মতো কাজ হামাদ শিকদার কখনোই করবে না।এই কয়দিনে অরুনিমা তাকে এইটুকু অন্তত চিনতে পেরেছে।সে যা,সে তাই।পুরোটাই আসল।এর মাঝে কোনো ভেজাল মেশানো নেই।
তার দুই চোখে তখনও বিস্ময়।হৃদস্পন্দন বেড়েছে অস্বাভাবিক রকমে।হাশিম সেদিন এই কাজ করেছে?কিন্তু কেন?সেদিন বিকেলেও তো সে কতো হাসিখুশি ছিলো।রাত হতেই এমন কি হলো যে সে এহতেশাম ভাইজানকে মারতে গেল?
অরু একহাতে মুখ চেপে আরো একটু পিছিয়ে এলো।তার মাথা ঘুরছে।সে কোনোরকম অযুহাত দিয়ে এক ছুটে সেখান থেকে সরে এলো।নিজের ঘরে এসেই সে সবার আগে নিজের মুঠোফোন খুঁজল।নিরু আপাকে একটা ফোন দিতে হবে।নিরু আপাই এই মুহূর্তে তার মাথা ঠান্ডা করতে পারবে।
অথচ নিরু আপা ফোন ধরল না।পাঁচবার ফোন দেওয়া স্বত্তেও আপা ফোন তুলল না।অরুনিমা বিক্ষিপ্ত মেজাজে ফোন কাটলো।আপার এই এক সমস্যা।ফোনের কাছে তাকে পাওয়া যায় না।সে কতোক্ষণ অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করলো।তার ভেতরটা খচখচ করছে।হাশিমের হাত দেখার পর থেকে তার আরো বেশি অস্থির লাগছে।হাশিম কেন এই কাজ করল?অরুর ছোট্ট মস্তিষ্ক সেই উত্তর হাতড়ে হাতড়েও খুঁজে পায় না।
সেদিন অরু ভাত খেল খুব জলদি।অদ্ভুত রকমের চাপা উৎকন্ঠায় সে কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারছিলো না।তার মনে হলো বিষয়টা কাউকে জানানো দরকার।নয়তো এতো বড়ো কথা পেটের ভেতর চেপে রাখলে সে নির্ঘাত পেট ফেটে মরে যাবে।
একবার সে ভাবলো রিজোয়ানা কে সবটা জানাবে।তারপর আবার ভাবলো রিজোয়ানা নিশ্চয়ই তার ছেলের নামে নালিশ শুনে খুব একটা খুশি হবে না?আর কাকে বলা যায়?হুসেইন চাচাকে?কিন্তু উনি তো এতোক্ষণে তার ঘরে চলে গেছেন।আর কে বাকি রইল?বুড়ি?তার সাথে তো অরুনিার এমনিতেও বনে না।এই কথা বললে তো বুড়ি তাকে বাড়ির শত্রু বানিয়ে দিবে।
প্রচন্ড দোলাচালে অরুর সময় কাটে।রাত যখন দু’টো ছুঁইছুঁই,তখন অভি গুনগুন করতে করতে বাড়ি ফিরল।অরু তখন চিন্তিত ভঙ্গিতে ঘরের এমাথা থেকে ঐ মাথা পায়চারি করছিলো।অভিকে দেখতেই সে বোকা বোকা হাসলো।
অভি একনজর সেদিকে দেখে আবার নিজের চোখ সরিয়ে নিল।ঘাড় মালিশ করতে করতে খাটে গিয়ে বসলো।অরুনিমা কোমরে হাত রেখে বলল,’তুমি কি খেয়েছো রাতে?’
অভি ত্যাড়া গলায় বলল,’কু’ত্তার মাংস দিয়ে ভাত।’
বলেই বিরক্তিধরা গলায় বিড়বিড় করল,’যতোসব ফালতু প্রশ্ন!’
অরুনিমার মুখ মলিন হয়ে এলো।অভি সেটা খেয়াল করতেই গম্ভীর হয়ে বলল,’আলু ভর্তা আর ডিমভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছি।সাথে দু’টো কাচামরিচ।হয়েছে?’
অরুনিমা উপর নিচ মাথা নাড়ল।ছুটে গিয়ে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে অভির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,’নাও।পানি খাও।’
অভি খাটে আধশোয়া হয়ে বলল,’আমি পানি খেয়েছি।তোমাকে এতো স্বামীভক্তি দেখাতে হবে না।’
সে একহাত মুখের উপর রেখে চোখ বুজল।অরুনিমা নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল,’আচ্ছা,তোমার মেজাজ কেমন এখন?ভালো না খারাপ?’
অভির দিক থেকে উত্তর এলো না।মেয়েটা এতো বিরক্তকর কেন?এমন অবান্তর প্রশ্ন করে মাথা খাচ্ছে কেন?
অরুনিমা হাঁটু গেড়ে বসল।করুণ গলায় বলল,’আমি যদি একটা কথা বলি,তাহলে কি তুমি রাগ হবে?’
এবার সে মুখ খুলল।চোখের পর থেকে হাত সরিয়ে কিছুটা ধমকে উঠে বলল,’তো রাগ হওয়ার মতো কথা বললে কি করবো?খুশিতে হাসবো?পাগলের কথাবার্তা!’
অরু সাথে সাথে থেমে গেল।কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ মেঝের এক কোণায় গিয়ে বসলো।তার ভালো লাগছে না।এতো বড়ো কথা পেটে নিয়ে ঘুরতে তার কষ্ট হচ্ছে।
অভির কি হলো কে জানে,আচানক সে চোখ খুলে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,’বলতে ইচ্ছে হলে বলে দাও।এমনিতেও আমি বাড়ি থাকি না।তোমার কথা তোমার আর আমার ভেতরই থাকবে।’
অরুনিমা কিছুটা জোর পেল।সে দ্রুত খাটের কাছে এগিয়ে এসে অভির গা ঘেঁষে বসল।অভি দেখল,তবে শব্দ করল না।শুধু ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্নাত্মক চোখে তার দিকে চেয়ে রইল।অরু কিছুক্ষণ ইতিউতি করে বলল,’জানো আমি আজ একটা জিনিস দেখেছি।’
অভি বিরক্ত হয়ে বলল,’শেষ?এটাই তোমার কথা?’
‘উহু।মূল কথা এটা না।’
‘তাহলে আসল টা বলো না।বিরক্ত লাগছে আমার।’
অরু একটু ঝুকল।অভি খানিকটা ভড়কে গিয়ে তার দিকে তাকালো।অরু সেই চাহনি উপেক্ষা করেই তার কানের কাছে এসে একেবারে নিচু স্বরে বলল,’হাশিম ভাইজানের হাতে আমি একটা কাটা দাগ দেখেছি হামাদ।একদম নতুন নতুন কেটেছে।ভালো করে কাপড়ও বাধেনি।আমার মনে হচ্ছে ঐদিন এহতেশাম ভাইজানের ঘরে হাশিমই গিয়েছিল।’
চলবে-