কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-১৪

0
23

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

১৪.

অরুনিমা পা ঝুলিয়ে খাটের এক প্রান্তে বসেছিল।অভি ঘরে এসেই ধপ করে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ল।একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে অরুর পাংশু মুখখানা দেখল।তাকে খুব মলিন দেখাচ্ছে।খুব সম্ভবত মন খারাপ।কিন্তু অভির তার মন খারাপের কারণ জানতে ইচ্ছে হলো না।সারাদিন তো চটপটে আচরণ করে।মাঝে মাঝে একটু মন খারাপ থাকা মন্দ কিছু না।

অরুনিমা তাকে দেখলো।সে শুয়ে আছে উপুড় হয়ে।অরু পা তুলে খাটে বসলো।অভি মাথা না তুলেই গম্ভীর হয়ে বলল,’কি চাই তোমার?’

অরু নির্বিকার।
‘আমার কিছু চাই না।’

‘তবে খাট থেকে নামো।’

অরু মন খারাপ করে বলল,’এমন করো কেন তুমি?’

‘কি করেছে আমি?’

কিছুটা বিরক্তি মেশানো কন্ঠস্বর।অরুনিমা মলিন মুখ করে বলল,’তুমি আমাকে একদমই দেখতে পারো না।তুমি আমার সাথে ভালো করে কথাও বলো না।’

‘আমি এমনই।’

অরুনিমা কোলের উপর হাত ফেলে চুপচাপ বসে থাকে।শেষে একটা আঙুল দিয়ে অভির বাহুতে স্পর্শ করে চাপা স্বরে ডাকে,’হামাদ! ও হামাদ!’

অভি মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলল,’কি সমস্যা তোমার?’

‘তুমি আমার সাথে একটু কথা বলো হামাদ।এখানে কেউ আমার সাথে কথা বলে না।’

কথাটা অভির কেমন যেন লাগলো।শোনার পরেই সে একটু নড়ে উঠলো।একপাশ হয়ে শুয়ে তার দিকে ফিরে ভ্রু কুঁচকে বলল,’কেন?কেউ কথা বলে না কেন?’

অরু দুঃখমাখা গলায় বলল,’তারা ভাবে আমি তোমার কাছে কথা লাগাই,আমি সংসারে অশান্তি বাঁধাই।’

অভি চটে গিয়ে বলল,’অদ্ভুত ব্যাপার! তুমি তাদের কিছু বলো না কেন?’

‘কি বলবো?’

অভি কয়েক পল তার দিকে তাকায়।তারপরই আচানক তার একটা হাত চেপে ধরে বলে,’চলো।’

অরু চমকে উঠে।
‘কি?কোথায় যাব?’

‘রিজোয়ানার ঘরে।আমি জিজ্ঞেস করবো তোমার সাথে এই আচরণের মানে কি।’

অরু দ্রুত নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়।দুই দিকে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলে,’না না।প্লিজ।এই কাজ করবেন না।আমার সাথে পরে আরো বাজে আচরণ করবে।’

অভি চোয়াল শক্ত করে বলল,’কি আশ্চর্য! আমার কাজের প্রেক্ষিতে মানুষ তোমার সাথে এমন করবে কেন?’

অরুনিমা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছোট করে বলল,’জানি না।’

অভি আর কথা বাড়ালো না।গম্ভীর মুখে শুধু বলল,’রিজোয়ানা কোনো ঝামেলা করলে আমায় বলবে।এসব ফালতু লোকদের ভয় পায় কে?’

অরু চোখ পাকিয়ে বলল,’বা রে! যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয়?’

অভি খেঁকিয়ে উঠল,’বাড়ি থেকে বের করবে মানে?
শোনো অরুনিমা! এটা আমার দিদানের বাড়ি।আমার দিদান এই বাড়ির মালিক।ঐ রিজোয়ানার বাপেরও ক্ষমতা নেই কাউকে এই বাড়ি থেকে বের করার।যতোসব আজগুবি কথাবার্তা।’

সে অন্যপাশ ফিরে মাথার উপর চাদর টানে।অরু গালের নিচে হাত রেখে পুনরায় তাকে ডাকলো,
‘হামাদ! এ্যাই হামাদ।’

‘কি সমস্যা?’

‘একটু এদিকে ফিরো।’

‘পারবো না।এভাবেই বলো।’

‘আমি তোমার সাথে ঘুমাই?’

অভি ভড়কে গিয়ে বলল,’কিহহ?’

‘আমি ফ্লোরে ঘুমাবো না।কতো বড়ো খাট! ফ্লোরে কেন শুবো?আমি তোমার পাশেই ঘুমাবো।বিশ্বাস করো,আমার ঘুমের ভেতর নড়াচড়া করার স্বভাব নেই।’

অভি ঘাড় ঘুরিয়ে গোল গোল চোখে তাকে দেখে।তারপরই মৃদুস্বরে বলে,’আচ্ছা।ঘুমাও আমার পাশে।’

বলতে দেরি হলো,কিন্তু অরুর ধপাস করে খাটে শুয়ে পড়তে দেরি হলো না।নরম তোষকে গা এলিয়ে দিয়েই সে প্রসন্ন কন্ঠে বলল,’আহা! কি শান্তি! কতো নরম তোমাদের তোষক! আমাদের বাড়িতে তো খাটের পায়া টা পর্যন্ত নড়ে,তোষক তো পরের বিষয়।

অভি অন্যদিকে ফিরে নিঃশব্দে হাসলো।হাসতে গিয়েই তার মনে পড়লো আজ অনেকদিন পর সে মন ভরে হেসেছে।চাদরটা পুনরায় মুখের উপর টেনে সে গম্ভীর স্বরে বলল,’ঘুমাও অরুনিমা।অনেক রাত হয়েছে।’
.
.
.
.
দূরবীন দিয়ে দূরের দুর্গের অবস্থান ঠিক মতো আন্দাজ করার চেষ্টা করলো অয়ন।সে দূরবীনটা চোখ থেকে নামাতেই মাহিম বলল,’কি?কতোদূর দেখলে?’

‘আরো আধ কিলোমিটার দূরে।সামনে কাঁদামাটি।ক্রলিং করলে শব্দ হবে না?’

মাহিম তার থেকে দূরবীন নিয়ে সেটাতে চোখ রেখে বলল,’হবে হয়তো।কিন্তু ফোর্টের ভেতর যাবে বলে মনে হচ্ছে না।’

সে রিভলভারে হাত রাখে।দুই পাশ দেখে গভীর স্বরে বলে,’চলো,সামনে যাওয়া যাক।’

সাত জন ব্যাটেলিয়নের ছোট্ট একটা ইউনিট।এদের সবার হাতে একটা করে অস্ত্র।তারা আজ সামনের দুর্গে আক্রমণ চালাবে।সেই দুর্গের ভেতরে থাকা ব্যক্তিকে ধরাশায়ী করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

আজকের দিনটা কিছুটা গুমোট।আকাশে কালো মেঘ জমে চারদিক আঁধার হয়ে এসেছে।জিতু আকাশের সেই কৃষ্ণকালো রূপ দেখে বলল,’অদ্ভুত তো! শীতকালে এমন মেঘলা আবহাওয়া হচ্ছে কেন?’

ইয়াকুব বিরক্ত হলো তার কথায়।সামনে দেখতে দেখতে বলল,’বাজে কথা ছাড়ো জিতু।কথা না বাড়িয়ে সামনে চলো।’

সাতজন যুবক নিঃশব্দে সামনে এগিয়ে যায়।রাফিদ যেতে যেতে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,’আমরা পারবো তো?’

তনয়ের দৃষ্টি সূচালো।একটা গাঢ় শ্বাস ছেড়ে বলল,’আই হোপ সো।’

তারা বড়ো বড়ো করে শ্বাস ছেড়ে দুর্গের দিকে এগিয়ে যায়।একটি কাছাকাছি যেতেই সাদাফ বলল,’এবার ক্রলিং করে যেতে হবে।সবাই মাটিতে বসো।’

সাতজন হাঁটুগেড়ে মাটিতে বসে।শ্বাস বন্ধ করে হামাগুড়ি দিয়ে একেবারে নিঃশব্দে তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।কাঁদা মেখে অয়নের সমস্ত মুখ ভরে যাচ্ছিল।সে চোখের সামনে থেকে কাঁদা সরায়।আজ তার জীবনের অতি গুরত্বপূর্ণ দিন।

তাদের লক্ষ্য পাহাড়চূড়ায় থাকা দুর্গে আক্রমণ চালানো।সেই দুর্গে একজন দুর্ধর্ষ শিকারী তাদের অপেক্ষা করছে।তারা ভীষণ সতর্কভাবে সামনে এগোয়।ক্রলিংয়ের ফাঁকেই ইয়াকুব ব্যাথাতুর কন্ঠে বলল,’উফফ! হাত ছিঁলে গেছে আমার।’

সাতজন সিপাহী দুর্গের কাছাকাছি আসতেই একটা ভয়াবহ কান্ড ঘটলো।কাছে কোথাও প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটলো।সেই বিস্ফোরণের শব্দে সাতজনই কেঁপে উঠলো সহসা।অয়ন ছিটকে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,’দূরে সরো তোমরা।মাটিতে বোমা পুতে রাখা ছিলো।’

ছোট্ট একটা বিস্ফোরণে সাতজনের দলটি পুরোপুরি ছন্নছাড়া হয়ে গেল।এলোমেলো হয়ে একেকজন একেক দিশায় ছুটে গেল।তারা দলচ্যুত হতেই দুর্গের আড়াল থেকে সাঁই সাঁই করে অসংখ্য রাবার বুলেট তাদের দিকে ছুটে এলো।মনে হলো দূর আকাশ থেকে এক ঝাঁক উল্কা ছুটে এসে তাদের সমস্ত দল ভেঙে দিয়ে গেল,চূর্ণ করে দিলো তাদের সমস্ত যুদ্ধ কৌশল।

একেকজন ভড়কে গিয়ে শূন্য চোখে চারপাশ দেখে যাচ্ছিল।দুর্গের আড়াল থেকে রাবার বুলেটের তান্ডব তখনো চলমান।সেদিকে দেখেই সব দুই কদম পিছিয়ে এলো।

যুদ্ধবাজ সৈনিকের একের পর এক অকস্মাৎ আক্রমণে সাত সদস্যের ছোট্ট ব্যাটেলিয়ন অল্পতেই নাজেহাল হয়ে উঠল।আক্রমনের চিন্তা বাদ দিয়ে তারা তখন আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত।কেউ আর দুর্গের দিকে এগিয়ে গেল না।উল্টো আতঙ্কিত হয়ে একটু একটু করে পিছিয়ে এলো।তাদের আজ মন ভালো নেই।তাদের মিশন পুরোপুরি ভাবে ফেইল হয়েছে।

একটু পরেই দুর্গের আড়াল থেকে দৃপ্ত কদমে,চিরায়ত ঠাটবাট বজায় রেখে,কাঁদা মাটিতে বুট জুতার শব্দ ফেলে একজন ফৌজি বেরিয়ে এলো।তার হাতে একটা সাধারণ পিস্তল,চোখে অদ্ভুত রকমের তৃপ্তি,আর ঠোঁটে ভাঁজে মেশানো ছিলো এক চিলতে হাসি।সে প্রমাণ করে দিয়েছে যোগ্যতায় আর অভিজ্ঞতায় সে তাদের অনেক উপরে।

সাতজন ক্যাডেট বড় বড় চোখে তার পদক্ষেপ দেখে।সেই সাথে দেখে তার চোখে মুখে লেপ্টে থাকা দম্ভ,অহংকার আর আকাশ পরিমান তাচ্ছিল্য।তারা পারে নি তাকে ধরাশায়ী করতে।সেই কারণে লোকটার মুখজুড়ে বিদ্রুপের হাসি খেলা করছে।সে তাদের সামনে এসেই বাঁকা হেসে বলল,’সাত জন মিলে আমাকে হারাতে পারলে না?শেইম!শেইম!লজ্জা থাকলে ব্যাচগুলো খুলে ফেলো।আর কখনো হাত দিও না সেসবে।রাস্কেল যতোসব!’

সে তাচ্ছিল্য করে সামান্য হাসলো।বুকে হাত বেঁধে সামনে দাঁড়ানো সাত জনকে উদ্দেশ্য করে বলল,’অপোনেন্টের দুর্গে অ্যাটাক করবে,আর সে কি বসে বসে তোমাদের দেখবে?সবার আগেই যেটা মাথায় রাখতে হবে,তা হলো মাইন অর গ্রেনেড।তারা অবশ্যই তাদের ঘাঁটিকে সুরক্ষিত রাখবে।সেজন্য তারা এর আশেপাশে গ্রেনেড পুঁতে রাখবে।আক্রমণ করার আগে সেই বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।বুঝেছো?’

সাতজন একসাথে মাথা নাড়ল।তনয় কেবল চোখ তুলে একনজর তার ব্যাচটা দেখে।সেখানে কেবল মুস্তাফা লিখা।সে পদে একজন মেজর।দুই দিন আগেই তারা প্রশিক্ষণের জন্য রাঙামাটিতে এসেছে।তাদের দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মেজর মুস্তাফা কে।সামনে তাদের মিশন।সেই জন্য এখন থেকেই রেইডার্স টিম বানানো হয়েছে।তাদের রেইডার্স টিমের অধিনায়ক মেজর মুস্তাফা।

তনয়ের ধারণা,এই লোক স্বাভাবিক না।এখানে আসার পর থেকে সে তাকে লক্ষ্য করছে।এই লোক প্রয়োজন বাদে কারো সাথে কোনো কথা বলে না।

আজ তাদের সিমুলেশন ট্রেইনিংয়ের প্রথম দিন।তাদের সাতজনের লক্ষ্য ছিলো মেজরের অবস্থানরত দুর্গে আক্রমণ চালিয়ে তাকে ধরাশায়ী করা।অথচ ঐ লোকটাকে তারা ধরতে তো পারলোই না,উল্টো ঐ লোক তাদের নাস্তানাবুদ করে দিয়েছে।অয়ন অন্যমনস্ক হয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ে।সে তো অহংকার করবেই।তার তো সেই যোগ্যতা আছে।বার বার নিজের আচরণে সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিচ্ছে।রেইডার্স টিমের বাকি সদস্যরা কেবল চোখ মেলে তার কার্যকলাপ দেখছে।সে যুদ্ধবাজ,সে সাহসী,সে অদম্য,সে বেপরোয়া।প্রতি মুহূর্তে,প্রতিটি কাজে সে সেই কথাই সত্য প্রমাণ করে যাচ্ছে।

‘মেজর এহতেশাম!’

এহতেশাম পেছন ফিরে।বুকে হাতঁ বেঁধে গম্ভীর গলায় জানতে চায়,’জ্বী স্যার।’

কর্ণেল আহাদ এগিয়ে আসেন।একনজর সামনে দেখে বলেন,’কি অবস্থা তোমার টিমের?কেমন পারছে তারা?’

এহতেশাম মৃদু হাসলো।ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বলল,’অবস্থা খুবই খারাপ।রাইফেলটাও স্মুথলি চালাতে পারে না।’

‘সমস্যা কি?তুমি তো আছোই।তুমি শিখিয়ে দাও ভালো মতো।’

এহতেশাম ক্লান্ত স্বরে বলল,’জ্বী স্যার।চেষ্টা করছি।’

আচমকা কিছু মনে পড়তেই কর্ণেল আহাদ বললেন,’ওহ ভালো কথা।ক্যাপ্টেন আশিক তোমায় খুঁজছিলো।তুমি নাকি সেদিন ডাকে চিঠি পাঠিয়েছিলে?’

হুট করেই কিছুটা চঞ্চল হলো এহতেশাম,সেই সাথে খানিকটা বিচলিত।অপ্রস্তুত স্বরে জবাব দিলো,’হ্যাঁ।আমার একটা চিঠি পাঠানোর কথা ছিলো।’

আহাদ গম্ভীর হয়ে বললেন,’হুম।বুঝেছি।’

এহতেশাম আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না।বড় বড় পা ফেলে তাবুর দিকে এগিয়ে যায়।আশিককে সেই ডাকে পাঠিয়েছিলো।আশিক কি তার জন্য ফিরতি চিঠি এনেছে?আসলেই কি মেয়েটা তার চিঠির জবাব দিয়েছে?সে কৈশোরের আবেগী ছেলেটার মতো তীব্র উত্তেজনা নিয়ে আশিকের তাবুর দিকে এগোতে থাকে।যেতে যেতে টের পায় তার হৃদস্পন্দন বাড়ছে তর তর করে।
.
.
.
.
অরু টেলিভিশন দেখতে পছন্দ করে।এই কথা পুরো বাড়ির সবাই জানে।সন্ধ্যা হলেই সে চঞ্চল পায়ে বসার ঘরের সোফায় গিয়ে বসে।তারপর দুই পা সোফায় তুলে আরাম করে টিভি দেখে।তার সিনেমা দেখতে খুব ভালো লাগে।দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে,কুচ কুচ হোতা হ্যায় তার প্রিয় সিনেমা।এছাড়া সে বাকের ভাইয়ের পাগলা ভক্ত।”কোথাও কেউ নেই” ধারাবাহিকটি শেষ হয়েছে আরো অনেক বছর আগে।অথচ অরুনিমা অপেক্ষা করে পুরোনো পর্ব গুলো আরো একবার দেখার।সন্ধ্যা নামলেই সে বিটিভি চালু করে বসে।চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে বাকের ভাইকে একনজর দেখার।

রিজোয়ানা খাবার ঘরে এসেই বসার ঘরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।অরুনিমা বেশ আরাম করে টেলিভিশন দেখছিলো।টেলিভিশন দেখার সময় তার দুই চোখে অপার্থিব আনন্দ খেলা করে।রিজোয়ানা সেই আনন্দ,সেই উচ্ছ্বাস খালি চোখে দেখতে পান।

রিজোয়ানা তার কাছে এগিয়ে গেলেন।দুই হাত বগলদাবা করে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কড়া স্বরে বললেন,’টিভি বন্ধ করো অরুনিমা।’

অভি তখন মাত্রই বাড়ি ফিরেছে।কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে দশটার দিকে সে আবার বেরিয়ে যাবে।বাড়িতে আসার পরই সবার প্রথমে তার চোখ গেলো বসার ঘরের দিকে।সে থামলো।তার চোখ জোড়া প্রসারিত হলো সহসা।সে মনোযোগ দিয়ে রিজোয়ানা আর অরুনিমার কথপোকথন শোনার চেষ্টা করলো।

রিজোয়ানা আরো একবার কঠিন সুরে বললেন,’টিভি বন্ধ করো অরুনিমা।’

অরুনিমা মলিন মুখে বলল,’কেন?কি হয়েছে?আমি তো আজ কাজ করেছি।আলু ছিলে দিয়েছি আমি।এখন একটু দেখি না।’

রিজোয়ানার মুখ থমথমে।অরুর প্রশ্ন কানে যেতেই গম্ভীর হয়ে বললেন,’হৃদির সামনে পরীক্ষা।তোমার এই টিভির শব্দে হৃদির সমস্যা হয় পড়তে।’

অরু সাথে সাথে ভলিউম কমায়।হাসি হাসি মুখে বলে,’এই দেখো আওয়াজ কমিয়ে দিয়েছি।এখন ঠিক আছে?’

রিজোয়ানা কটমট চোখে বললেন,’সমস্যা আছে।টিভিটা বন্ধ করো তুমি।সারাক্ষণ এসব নাটক সিনেমা নিয়ে পড়ে থাকো কেন?রান্নাঘরে আসো।পেয়াজ গুলো কেটে দাও।’

অরু নখ কামড়াতে কামড়াতে চোখ তুলে বলল,’আমি কেন পেয়াজ কাটবো?আমেনা খালা আর রওশন খালা তো আছেই।আমি কেন পেয়াজ কাটবো?’

রিজোয়ানা ক্রোধান্বিত চোখে তার দিকে তাকান।কটমটে সুরে বললেন,’আমেনা আর রওশনের সাথে তুমিও কাজ করবে।কোনো সমস্যা তো নেই।’

অরু কপাল কুঁচাকায়।কিছুটা আশাহত হয়ে বলে,’তুমি,হৃদি,সৃজনী কেউ তো এসব করো না।আমাকে কেন করতে বলছো?’

রিজোয়ানা তেঁতেঁ উঠলেন আচমকা।
‘বড্ড বাড়াবাড়ি করো তুমি! তোমার সাথে আমাদের তুলনা কেন দিচ্ছো?’

‘বাড়াবাড়ি কোথায় করেছে অরুনিমা?’

পেছন থেকে একটা গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো।

রিজোয়ানা সাথে সাথে পেছন ফিরলেন।অরু নিজেও ঘাঁড় ঘুরিয়ে পেছনে উঁকি দেয়।অভি পকেটে হাত গুঁজে সামনে এগিয়ে এলো।রিজোয়ানার মুখোমুখি হতেই পুনরায় হাস্কি স্বরে প্রশ্ন করলো,’কি বাড়াবাড়ি করেছে অরুনিমা?’

রিজোয়ানা ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন,’হৃদির সামনে পরীক্ষা।এসময় টিভিটা না ছাড়লে কি খুব বেশি সমস্যা হয়?’

‘ভলিউম কমালো তো।এখন অসুবিধা কিসের?’

রিয়োজানা চোয়াল শক্ত করে বললেন,’অসুবিধা তো আছে।কিন্তু তুমি বুঝবে কেমন করে?তুমি তো কখনো এতো মন দিয়ে পরীক্ষা দাওনি।তুমি জানো পরীক্ষার গুরুত্ব কতখানি?’

অভি স্থির চোখে তার দিকে তাকায়।প্রতিউত্তরে কিছু বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত আর উত্তর দেয় না।কেবল একগাল মেকি হেসে বলে,’তুমিও তো পড়াশোনা করোনি।তুমি কেমন করে জানো পড়াশোনার গুরুত্ব?আমিও সেভাবেই জানি।’

অপমানে রিজোয়ানার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো।সে স্তব্ধ হলো পুরোপুরি।কথা সব গলার কাছেই দলা পাকিয়ে গেল।অভি সেই করুন চোখের তোয়াক্কা করলো না।রিজোয়ানার দিকে কোনোরকম ভ্রুক্ষেপ না করেই সে অরুনিমার দিকে তাকায়।অরুনিমা তখন চাতক পাখির ন্যায় বুক ভরা আশা নিয়ে তার দিকে চেয়ে ছিলো।

রিজোয়ানা হনহনিয়ে এক প্রকার পালিয়ে গেল বসার ঘর থেকে।ঐ ছেলে তাকে পড়াশোনা নিয়েও অপমান করেছে।রিজোয়ানা এই জীবনে তার সাথে কথা বলবে না।

অভি রিমোট দিয়ে টেলিভিশন বন্ধ করলো।তারপর খপ করে অরুনিমার একহাতের কবজি চেপে ধরে বলল,’তুমি কি টেলিভিশন দেখতে চাও অরুনিমা?’

অরুনিমা অসহায় ভঙ্গিতে উপরনিচ মাথা নাড়ে।অভি তাকে বসা থেকে টেনে তুলল।তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি চোখে পড়তেই রাশভারি কন্ঠে বলল,’চলো তাহলে আমার সাথে।’

অরু উদগ্রীব হয়ে শুধায়,’কোথায় যাবো?’

অভি নির্বিকার।অরুর হাত ধরে সামনে হেঁটে যেতে যেতে জবাব দেয়,’জগলুদের বাড়ি যাবো।তুমি আজ থেকে ঐদিকে টিভি দেখবে।এই ফালতু বাড়ির ফালতু টিভি তোমার না দেখলেও চলবে।’

চলবে-