কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-১৫

0
27

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

১৫.

গলির মোড়ে একটা টং দোকান।সেখানে কাউন্টারের সামনে বানের প্যাকেট আর কেকের প্যাকেট ঝুলছিলো।একটা কেতলি তখনো চুলায় বসানো।সেখানে টগবগ করে লিকার ফুটছে।চারপাশ চা পাতার সুন্দর ঘ্রাণে ম-ম করছে।দোকানের সামনে তিনটে বেঞ্চ পাতা।বেঞ্চ গুলোর রং হালকা খয়েরি।

অরুনিমা উৎসুক চোখে দোকানটা দেখে।একেবারে ছোট একটা দোকান।কাউন্টারের কাছে কতোগুলো সিগারেটের প্যাকেট রাখা।তিনটা বেঞ্চের দুইটা বেঞ্চ মানুষে ভর্তি।তারা কেউ কেউ চা খাচ্ছে,কেউ আবার সিগারেট ফুকছে।

তার হাত তখনও অভির হাতের মুঠোয়।অভি দোকানের সামনে এসেই ডাকলো,’বদি! জগলু কোথায়?বাড়িতে?’

বদি নামের লোকটা কেতলি থেকে চা ঢালতে ঢালতে এক পলক তার দিকে তাকায়।তারপর তাকায় তার পাশে থাকা ছিমছাম গড়নের মেয়েটির দিকে।এরপর আস্তে করে মাথা নেড়ে জানায়,’হ্যাঁ।বাড়িতেই আছে।তুমি বসো।চা খাবে না?’

অভি দুই দিকে মাথা নাড়ে।গম্ভীর মুখে বলে,’আপাতত না।’
___

জামশেদ ঘরে ঢুকেই বলল,’জগলু! তোর বন্ধু তার বিবিকে নিয়ে এসেছে।যা দেখা করে আয়।’

জগলু তখন খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়েছিলো।জামশেদের কথা কানে যেতেই সে মাথা তুলে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,’কে এসেছে?বিনু?’

‘আরে না।অভি এসেছে।সাথে তার বউ।’

জগলু ধড়ফড়িয়ে উঠল।চোখ ডলতে ডলতে সামনে দেখে বলল,’কি?সাথে বউকেও এনেছে নাকি?’

‘হু।তুই দেখে যা।’

___

জগলুদের বাড়িটা অনেকটা অরুনিমাদের বাড়ির মতোই।অরু বাড়ির ভেতর এসেই চঞ্চল চোখে চারপাশ দেখে।বাড়িটা তাদের বাড়ির মতো হলেও এখানে সরঞ্জাম অনেক বেশি।বসার ঘরে একটা টেলিভিশন আছে।সাথে একটা রেডিও আছে।সোফা গুলো অভিদের বাড়ির সোফার মতো দামি নয়,তবে খুব একটা খারাপও না।অরু চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ দেখে।

জগলু এলো মিনিট দুয়েক পরে।অরুনিমা তাকে দেখতেই হোঁচট খেলো।একেবারে পাতলা চিতলা শরীরের লম্বা মতোন দেখতে একজন মানুষ।অথচ তার নাম শুনে অরু আন্দাজ করেছিলো সে দেখতে অনেকটা মাস্তানদের মতো হবে।অথচ তাকে দেখাচ্ছে একেবারেই সাধারণ।শ্যামরাঙা মুখ,গালভর্তি দাড়ি,ঠোঁটে সামান্য হাসি আর ভীষণ ভীষণ স্নেহের দৃষ্টি নিয়ে জগলু অরুনিমার সামনে এসে দাঁড়ালো।অরুনিমা সেদিন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সান্নিধ্য পেল,অথচ বিষয়টা বুঝলো সে আরো অনেকদিন পর।

অভি তাকে সোফাতে বসিয়েই বাড়ির ভেতর যেতে যেতে বলল,’সে এখন থেকে তোর বাড়িতে এসে টিভি দেখবে।জিজ্ঞেস কর তো সে কোন চ্যানেল দেখে।চালু করে দে।’

জগলু তার পেছন পেছন এসে বলল,’এইটা তোর বউ?’

অভি তার ঘরে গেল।হাত পা ছড়িয়ে তার খাটে শুয়ে বলল,’হু।এটাই।’

‘মেয়ে তো পরীর মতো সুন্দর।এই চেহারা নিয়ে অমন সুন্দর বউ পেলি কি করে?’

অভি ঘাড় মালিশ করতে করতে নির্বিকার হয়ে বলল,’জানি না।’

জগলু বলল,’তোদের বাড়িতে এত্তো বড় টিভি থাকতে এখানে নিয়ে এলি কেন?’

অভি তেঁতেঁ উঠল খানিকটা।বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,
‘আর বলিস না।বালের কথা।বলতে গেলেও মেজাজ খারাপ হয়।ঐ বাড়িতে টিভি দেখতে গেলে রিজোয়ানার যতো সমস্যা।তার মেয়ের সামনে পরীক্ষা।টিভি ছাড়লে নাকি তার মেয়ের পড়ার সমস্যা হয়।শালা!যত্তোসব ফালতু কথা!হৃদি কতো পড়াশোনা করে বিশ্ব উদ্ধার করবে আমার জানা আছে।ভালো করে সিলেবাস জানে নাকি তাও সন্দেহ।কিন্তু সে অরুনিমা কে টিভি দেখতে দিবে না এই হলো কথা।ঐ মহিলা মানসিক বিকারগ্রস্থ।এটাই আসল কথা।’

অভি মাথার উপর বালিশ চাপা দিলো।জগলু মাথা চুলকে বলল,’ঐ বাড়িতে টিভি দেখতে পায় না বলে তুই তাকে এখানে নিয়ে এসেছিস টিভি দেখানোর জন্য?’

‘হু।’

‘বাপরে! লক্ষ্মণ তো সুবিধার না।’
জগলু কথাটা শেষ করে সাথে সাথে নিজেকে শুধরে নিলো।মাথা নেড়ে বলল,’না না।লক্ষ্মণ আসলে সুবিধারই।কিন্তু তোর বাউন্ডুলে চালচলনের জন্য কিছুটা হুমকি স্বরূপ।’

অভির মাথার উপর থেকে বালিশ সরায়।তীক্ষ্ণ চোখে জগলু কে দেখে বলে,’তোর মাথার এন্টেনা ঠিক আছে?কতোদূর ভাবছিস তুই?ঐ অরুনিমার প্রতি আমার কোনো মায়া দয়া,অনুভূতি,ভালোবাসা কিচ্ছু নেই।সামান্য অপরাধবোধ আছে।আমার একটা আচরণের জন্য রিজোয়ানা তার সাথে এমন করে।সেই অপরাধবোধ থেকেই আমি তার জন্য সহমর্মিতা দেখাই।ব্যাস এইটুকুই।’

জগলু মাথা নামিয়ে বিড়বিড় করে,’এইটুকুই বা তুই ক’জনের জন্য করিস!’

সে আর কথা বাড়ালো না।চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এলো।অরুনিমা তখন একটা সোফায় আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল।জগলু সামনে আসাতেই সে জোরপূর্বক সামান্য হাসল।

জগলু গিয়ে বসলো তার মুখোমুখি অন্য একটা সোফায়।স্নেহাশিস কন্ঠে জানতে চাইলো,’তোমার নাম কি মেয়ে?’

অরুনিমা চাপা স্বরে উত্তর দেয়,’অরুনিমা।অরুনিমা রহমান।’

‘বাহ! কি সুন্দর নাম।অরুনিমা অর্থ কি?’

‘ভোরের আলো।’

‘আরে কি মিষ্টি অর্থ।নামটা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে।’

অরু হাসে।লোকটা মন্দ না।ভালোই।কন্ঠস্বরে একটা নমনীয়তা আর আপন আপন ভাব আছে।কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ হয়।

জগলু বলল,’তুমি কি টেলিভিশন দেখতে ভালোবাসো অরুনিমা?’

অরুনিমা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে।উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জবাব দেয়,’হ্যাঁ।অনেক বেশি।’

‘সিনেমা দেখতে ভালোবাসো?’

‘খুব।’

‘পছন্দের সিনেমা কি?’

মেয়েটা লাজুক হাসল।নখ খুটতে খুটতে বলল,’দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে।’

জগলু নিজেও হাসল।রিমোট হাতে নিতে নিতে বলল,’গুড চয়েজ।রোমান্টিক মুভি দেখা ভালো।যারা এসব দেখে,তাদের মন খুব নরম হয়।কিন্তু ব্যাপার হলো,তোমার জীবনে রাজ কোথায়?’

অরুকে এবার কিছুটা আশাহত দেখালো।সে ঠোঁট উল্টে বলল,’আমার জীবনে রাজ আসে নাই ভাইজান।তার বদলে আমরিশ পুরি চলে এসেছে।’

জগলু তার উত্তর শুনে উচ্চস্বরে হেসে ফেলল।পেটে হাত চেপে বলল,’যা বললে! ভালো কথা বলেছো।তবে তার সামনে বলো না আবার।’

অরুনিমা সতর্ক ভঙ্গিতে বলল,’পাগল নাকি?এর সামনে এসব কথা আমি মুখেও তুলি না।’

জগলু কৌতুহলী হয়ে জানতে চায়,’আমার বন্ধু কে তোমার কেমন লাগে অরুনিমা?’

অরুনিমা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবলো।শেষে গালের নিচে হাত রেখে বলল,’আছে।ভালোই।কিন্তু খুবই রুক্ষ স্বভাবের।যখনই মনে হয় দুই দুইটা খুন করেছে,তখনই আর ভালো লাগে না।’

জগলু বিরক্তিসূচক শব্দ করে।
‘আহা! সেই কথা ভুলে যাও।ধরো যে সে কোনো খুনই করে নি।তারপর সেই চোখে কিছুদিন তাকে দেখবে।’

‘এরপর?’

‘এরপর আমাকে জানাবে তাকে কেমন লাগে।’

অরু ঠোঁট উল্টে বাচ্চা বাচ্চা স্বরে বলল,’আচ্ছা ঠিক আছে।’

‘এবার বলো কি দেখবে?সিনেমা নাকি ধারাবাহিক নাটক?’

‘একটা দিলেই হলো।আর তুমি আমায় চ্যানেলের নম্বর বলে দিও।নয়তো রোজ রোজ তোমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।’

জগলু বলল,’তুমি রোজ রোজ এখানে আসতে চাও?’

অরুনিমা দুই পা তুলে আরাম করে সোফায় বসে।খুবই আন্তরিক স্বরে বলে,’হ্যাঁ।তোমার বাড়িটা খুব সুন্দর।আমাদের বাড়ির মতোই।আমার এখানে খুব ভালো লাগছে।এখন আমি বুঝতে পারছি হামাদ কেন নিজের বাড়ি ছেড়ে সারাক্ষণ এখানে পড়ে থাকে।

_________________________________________

নীলা,
আপনি কি বোকা?আপনি কেমন করে ভাবছেন আমি ভুল ঠিকানায় চিঠি দিচ্ছি?দুই দুইবার ভুল ঠিকানায় চিঠি দেওয়া কি সম্ভব?আমি জেনেবুঝেই নিরুপমা রহমান কে চিঠি দিচ্ছি।আচ্ছা খোলাসা করে বলি।আপনার নাম নিরুপমা রহমান।আপনার মায়ের নাম মনোয়ারা বেগম।আপনার বাবার নাম সিদ্দিক রহমান।আর আপনার বোনের নাম অরুনিমা রহমান।এইবার বলুন,সব ঠিকঠাক হলো তো?আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন,আমি সজ্ঞানে আপনাকেই পত্র পাঠাচ্ছি।

যাই হোক।নীলা নামের পেছনে একটা ছোটখাটো পটভূমি আছে।আপনাকে যেদিন আমি প্রথমবারের মতো মনোযোগ সহকারে দেখেছি,সেদিন আপনি একটা গাঢ় নীল শাড়ি পরেছিলেন।আপনার পরনে গাঢ় রঙের শাড়ি অনেকটা অমাবস্যার চাঁদের মতো,খুব বেশি সৌভাগ্যবান হলে দেখতে পাওয়া যায়।কারণ নীলা সর্বদা সাদামাটা আর ছাইরাঙা শাড়ি পরতেই পছন্দ করে।এবং নীলার এই পছন্দ আমার ভীষণ রকমের অপছন্দ।আপনি কি জানেন,ঐ ছাই রঙে আপনাকে একদমই মানায় না?কেমন যে ফ্যাকাসে ফ্যাকাসে লাগে।আমার তো সেই গাঢ় নীল নীলাকেই ভালো লেগেছে।আপনি দয়া করে আপনার সেই ছাই রঙের বিদঘুটে শাড়ি গুলো ফেলে গাঢ় রঙের শাড়ি কিনবেন।আপনার বয়স কতো নীলা?এতো অল্প বয়সে এমন মাঝবয়সী রমণীদের রূপ ধরে রাখেন কেন?বাপারটা আমার ভালো লাগে না নীলা।

আপনি সম্ভব হলে দু’টো কাজ করবেন।
**দৈনিক পাঁচ মিনিট সময় করে হাসবেন।
**কড়া রঙের শাড়ি কিনে আলমারি ভর্তি করবেন।

হাসি আর নীলা,এ দু’টোর সম্পর্ক সমানুপাতিক হতে হবে।নয়তো ব্যাপারটা জমবে না।ওহহ হ্যাঁ,সাথে কয়েকটা কাঠগোলাপ সংগ্রহ করে মাথায় গুজতে পারেন।আপনার বেণীর ভাঁজে কাঠগোলাপকে মন্দ লাগে না।

শুনুন নীলা,
আমি কখনোই চাইনি আপনাকে চিঠি দিতে।বাধ্য হয়ে দিয়েছি।আপনি আমায় চিঠি দিবেন,সেটাও আমি চাই নি।কিন্তু যেই আপনার চিঠি হাতে পেলাম,ওমনি আমার লোভ হলো।ইচ্ছে হলো রোজ রোজ আপনার কাছ থেকে চিঠি পেতে।আপনি নিয়ম করে আমায় চিঠি দিবেন নীলা।এই আর্মি ক্যাম্পের খড়খড়ে আর শুকনো জীবনে এই পত্র গুলো এক পশলা বৃষ্টির মতো মনে হয়।আপনি মন খুলে লিখবেন।আমার ঠিকানা জানতে হবে না।ডাকে চিঠি জমা দিবেন।অবশ্যই রাশেদের কাছে জমা দিবেন।সেটা কোনো না কোনোভাবে আমার কাছে পৌঁছে যাবে।

যাই হোক।আজ আপাতত এইটুকই লিখছি।রাত বেড়েছে।কুয়াশা জমছে ঘাসের উপর।পুরো ক্যাম্প রুটিনমাফিক ঘুমে তলিয়ে আছে।এই বাঁধাধরা জীবনের জিঞ্জির ভেঙে আমি আপনাকে পত্র দিচ্ছি।তবে এখন ঘুমানো জরুরি।কারণ কাল আমাকে সাতটা আনাড়ির প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে।এরা নতুন নতুন জয়েন হয়েছে।না আছে বুদ্ধি,না আছে চিন্তাশক্তির প্রখরতা।এদের আপাতত আমার কাছে গর্দভই মনে হচ্ছে।

ভালো থাকবেন।আশপাশের সবাই কে ভালো রাখবেন।শুকনো কাঠগোলাপের স্পর্শে আমায় মনে রাখবেন।

ইতি,
নাম জানানোর ইচ্ছে নেই।আপনি পারলে খুঁজে নিন।

**

নিরুপমা চিঠি পড়া শেষ করল।আজ বিকেলে আবার তার জন্য চিঠি এসেছে।চিঠিটা পড়েই তার অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।সে বিরক্ত,সেই সাথে অনেক বেশি ভীত।মা এখনো বিষয়টা টের পায় নি।টের পেলে সেটা নিরুর জন্য ভালো হবে না।মা তাকে প্রচন্ড বকুনি দিবে।নিরুপমা দোষ না করেও কথা শুনতে চায় না।কে তাকে এমন লাগাতার চিঠি পাঠাচ্ছে,সে জানে না।তবে চিঠির কথা পড়ে মনে হলো সেনাবাহিনীর কেউ।নিরুপমার মাথায় আসে না তার মতো তুচ্ছ,নগণ্য মেয়েকে কেউ কেন চিঠি পাঠাবে?

নিরুপমা নেড়েচেড়ে চিঠিটা দেখে।তার ভয় লাগছে,শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি অকারণেই বাড়ছে।মা যদি জানতে পারে,তবে খুব রাগ করবে।কিন্তু নিরুর কোনো দোষ নেই।সে সত্যিই জানে এসব কেন হচ্ছে,কিভাবে হচ্ছে।

দরজায় কেউ এসে দাঁড়াতেই সে তাড়াহুড়ো করে চিঠি লুকায়।তার ছটফটে রূপ দেখেই মনোয়ারা কপাল কুঁচকে শুধালেন,’কি হলো নিরু?কি করছিস?’

নিরুপমা দুই দিকে মাথা নাড়ে।অপ্রস্তুত হয়ে বলে,’কিছু হয়নি।এমনিতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।’

মনোয়ারা আর কথা বাড়ালেন না।ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,’চুলায় সবজি বসানো।একটু পর পর গিয়ে দেখো।লেগে যেন না যায়।আমি তুতুনকে নিয়ে শ্যামলিদের বাড়ি যাচ্ছি।’

নিরুপমা উপরনিচ মাথা নাড়ল,বাধ্য মেয়েদের মতো বলল,’জ্বী মা।আমি দেখবো।তুমি যাও।’

মনোয়ারা চলে গেলেন।নিরু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।সদর দরজা বন্ধ করেই সবার প্রথমে রান্নাঘরের দিকে ছুটলো।সবার আগে চুলার আঁচ কমালো।তারপর সরা দিয়ে ঢেকে পুনরায় তার ঘরের দিকে ছুটলো।ছুটতে গিয়েই টের পেল এতো চাঞ্চল্যে তার মাঝে অনেকদিন পর দেখা যাচ্ছে।বহুদিন সে এমন ছুটোছুটি করেনি।

নিরুপমা নিশ্বাস বন্ধ করে পুরোটা চিঠি আবার পড়লো।একবার,দুইবার,তিনবার,অনেকবার।শেষে ধপ করে চেয়ারে বসে বল পয়েন্টের ক্যাপ খুললো।

জনাব,
শুরুতেই আমার সালাম নিবেন।আর্মি ক্যাম্পের পরিবেশ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।তবে আশা করছি বহাল তবিয়তেই চিঠিখানা পড়ছেন।

আপনার পত্রে আপনি জানিয়েছেন আপনি আমার সম্পর্কে সবটা জানেন।আমি তার বিরোধিতা করছি না।আপনি সবটাই ঠিক ঠিক বলেছেন।কিন্তু একটি বিষয়ে আপনি লিখেন নি।আমার ধারণা সেই বিষয়টি আপনি জানেন না।জানেন না বলেই আমার মতো তুচ্ছ আর অপয়া মেয়ে মানুষকে চিঠি দিচ্ছেন।জানলে অবশ্যই দিতেন না।

যাক গে।কথা লুকানোর অভ্যাস আমার নেই।আমি কথা লুকাতে চাই না।আপনি চিঠিতে আমার মা বাবা বোন,সবার নাম লিখেছেন।অথচ ছেলের নাম লিখেন নি।আপনি কি জানেন আমার একটা ছেলে আছে?তার নাম নিহাদ।আপনি তার কথা লিখেন নি।কারণ আপনি আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

রাঙামাটির নির্বোধ ফৌজি,
জ্বী আপনাকেই বলছি।নির্বোধ বলেই আমার মতো মেয়ে লোকের জন্য চিঠি লিখছেন।আপনার মতো সেনা অফিসারদের জন্য রূপবতী বিশুদ্ধ মেয়েরা অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে।আর আপনি তাদের ফেলে আমার মতো মানুষকে চিঠি দিচ্ছেন?শুনুন জনাব! নিরুপমা কে আপনি কিছুই চেনেন না।নিরুপমা বিবাহিতা।যদিও সেই বিবাহ টিকেনি,তালাক হয়ে গেছে।তবুও।আমি কোনো বিশুদ্ধ সতী নই।আপনি কি সেটা জানেন?আর্মি ক্যাম্পের কঠোর অনুশীলনে আপনার নিশ্চয়ই মতিভ্রম হয়েছে।তাই এতো এতো লাস্যময়ীর ভীড়ে আপনার চোখ গিয়ে নিরুপমা তে আটকেছে।নিরুপমা হলো পুরোটাই ছাই।সে কেমন করে অন্য রঙের জামা পরবে?আমি অনেক আগেই জ্বলে গেছি সাহেব।সুতরাং এই কয়লার মতো ময়লা শরীর নিয়ে আমি এতো সুন্দর রঙের শাড়ি পড়তে পারি না।আমার জন্য ছাই রঙই যথার্থ।

আপনার পরিচয় কি আমি জানি না।অনুমানও করতে পারছি না।কারণ পুরুষ মানুষদের নিয়ে আমি কখনোই কৌতূহল দেখাই না।আশা করি আমার সবটা জানার পর আপনি আর কখনোই আমাকে চিঠি দিবেন না।তবে তাও যদি দেন,তবে দয়া করে নিজের একটা নাম বলে দিবেন।আসল নাম বলতে ইচ্ছে না হলে ছদ্মনাম বলে দিয়েন।এমন সম্বোধন বিহীন চিঠি লিখতে আমার ভীষণ সমস্যা হচ্ছে।

নিরুপমার তরফ থেকে শুভেচ্ছা আর সালাম নিবেন।আপনার দেওয়া নীলা নামটা আমার পছন্দ হয়নি।যার পুরো জীবনটাই আবর্জনার ভাগাড়,তাকে নীলা বললে নীলা শব্দের অপমান হয়।আপনি বরং আমায় ধুলা বলেই ডাকুন।আমার জন্য সেটাই ঠিক আছে।

ইতি,
নিরুপমা রহমান
বাড়ি নং ৭০১/ক,সমতট লেট,ঢাকা

চলবে