কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-২৩

0
40

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

২৩.
[প্রথম অংশ]

বাড়ির সামনের অশ্বত্থ গাছটার ডালে বসে দু’টো পাখি অনর্গল কিচিরমিচির করে যাচ্ছিলো।সেই শব্দ স্পষ্ট কানে বাজছিলো।গাছটার বয়স অনেক বেশি।দেখলেই ভয় হয়,গা ছমছম করে।অরুনিমা যতোবার গাছটা দেখে,ততোবার সে আনমনে শিউরে ওঠে।

জাহানারা বেগম পান চিবুতে চিবুতে বললেন,’নতুন বউ।এখানে আইসা বসো।’

অরুনিমা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল।খাটের পাশে যে টুলটা রাখা ছিলো,তার উপর গিয়ে বসলো।জাহানারা তাকে আগাগোড়া পরোখ করে জহুরি চোখে বললেন,’অভি দাদুভাই কি এখনো বাইরে বাইরে থাকে?’

অরু উপরনিচ মাথা নাড়লো।বলল,’তবে আগের চেয়ে কম।গতকাল বাড়িতেই ছিলো।’

জাহানারা বেগম কিছু একটা বুঝে ফেলার মতো করে মাথা নাড়লেন।পান চিবুতে টিবুতে তার সমস্ত ঠোঁট লাল হয়ে গেছে।অরুনিমা তটস্থ হয়ে বসে রইল।হৃদি তাকে এখানে নিয়ে এসেছে।বলল,দাদিজানের নাকি তার সাথে কথা আছে।অরু ভীষণ চিন্তিত হয়ে বসে রইল।জাহানারা বললেন,

‘তোহ্।বিয়ের তো অনেকদিন হলো।খবর শুনাইবা কবে?’

অরু চট করে মাথা তুলল।বোকা বোকা হয়ে জানতে চাইলো,’কিসের খবর?’

জাহানারা থমথমে মুখে বললেন,’এতো গুলো দিন হলো বিয়ের।এখনও কোনো সুখবর দিলে না।আমারও বড় দাদি হইতে মন চায়।’

অরু বিষম খেল।বার কয়েক এদিক সেদিক দেখে তারপর মাথা নামিয়ে নিলো।জাহানারা তার দুই হাত দেখতে দেখতে বললেন,’কি হলো?কিছু বলো না কেন?অভির সাথে বাচ্চা নিয়ে কোনো কথা হলো?’

অরুনিমা ডানে বায়ে মাথা নাড়লো।বেশ চাপা স্বরে বলল,’জ্বী না।আমাদের মধ্যে ওসব নিয়ে কোনো কথা হয় না।আর না কোনোদিন ওসব হয়েছে।’

জাহানারা চোখ কপালে তুললেন।
‘কও কি?এখন পর্যন্ত তোমরা কিছুই করো নাই?’

অরু নির্বিকার হয়ে বলল,’না।’

জাহানারা আর্তনাদের মতো করে বললেন,’কেন?’

অরুনিমা অবাক হলো।মাথা তুলে বলল,’হামাদ তো কখনো সেভাবে কিছু বলে নি আমায়।’

‘সে না বলুক।তুমি আগ বাড়িয়ে যাও কি কেন?’
জাহানারা থেমে থেমে বললেন,’বিবিদের কাজ কি?বর কে মুগ্ধ করতে না পারলে আর মেয়ে হয়ে কি লাভ?’

অরুনিমা প্রতিউত্তর করে না।ঐসব করার সাথে মুগ্ধতার সম্পর্ক কোথায়?

জাহানারা বললেন,’অভি নিজ থেকে কখনো তোমার কাছে আসেনি?’

‘না।’

‘স্বামী কখন নিজ থেকে স্ত্রীর কাছে আসে না জানো?’

অরু ভীতু স্বরে শুধালো,’কখন?’

‘যখন সে তার স্ত্রীর প্রতি কোনো আকর্ষন কিংবা টান অনুভব করে না।তোমার বরের তোমার প্রতি কোনো টানই কাজ করে না।তার কোনো মায়া নাই তোমার জন্য।এটা তোমার এক জনমের ব্যর্থতা।’

অরুনিমা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।জাহানারা গম্ভীর হয়ে বললেন,’আল্লাহ এতো সুন্দর রূপ দিসে।অথচ এই রূপ দিয়া বরের মন জয় করতে পারলা না।কেমন মেয়ে তুমি?’

অরুনিমা মাথা চুলকে বলল,’বরের মন জয় করতে কি করতে হয়?’

‘থাক।তোমার দ্বারা কিছুই হবে না।এতোদিনে নাকি বাসর টাও হয়নি।’

জাহানারার কন্ঠে প্রচন্ড বিরক্তি।অরু লজ্জা পেল।মিনমিন করে বলল,’ওসব আমার লজ্জা লাগে।’

‘বসে থাকো তুমি তোমার লজ্জা নিয়ে।’

জাহানারা গজ গজ করে বললেন,’ব্যাডা মানুষ খামোখা পরকীয়া করে না।তোমার মতো কিছু বেকুব সেই সুযোগ করে দেয় বলেই তারা ওসব করার সাহস পায়।’

অরুনিমা আঁতকে উঠল।শঙ্কিত হয়ে বলল,’হামাদ তাই বলে পরকীয়া করবে?’

‘করতেই পারে।আমি তো তার দোষ দেখছি না কোথাও।’

অরু মাথা নামিয়ে বলল,’হামাদ ওমন ছেলে না।সে এসব করবে না।’

জাহানারা কটমট করে বললেন,’তুমি এমন চুড়ি পরে বসে থাকো।এরপর দেখো কি কি হয়।পুরুষ মানুষ কে কতোটুকু চেনো তুমি?’

অরুনিমা আর উত্তর দিতে পারে না।উত্তর তার জানা নেই আসলে।অভিকে সে যেমন করে চিনে এসেছে,তাতে তার কখনোই মনে হয় নি অভি মেয়ে সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে আগ্রহী।তবে হ্যাঁ।তার একটা পার্বতী আছে।অরুনিমার জন্য এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু নেই।’

অরুর হঠাৎ মনে হলো,যদি কখনো ঐ মেয়েটা তার জীবনে ফিরে আসে,তখন?তখন কি অভি তাকে ছেড়ে দিবে?এরপর?অরু তখন কোথায় যাবে?এই বাড়িতে তো সে ছাড়া অরুর আর কেউ নেই।

তার মন খারাপ হলো সহসা।ম্লান মুখে জাহানারার কাছে জানতে চাইলো,’হামাদের মন জয় করতে কি করতে হবে আমায়?’

‘সেটা তো আমি জানি না।’
জাহানারা হাই তুলতে তুলতে বললেন,’সবার আগে জামাইয়ের মনে জায়গা করতে হয়।তাকে মুগ্ধ করতে হয়।সেজন্য সুন্দর শাড়ি পরে একটু সাজগোছ করতে হয়।তুমি তো সাজোও না ঠিক মতো।চোখে কাজল নাই,পরনে শাড়ি নাই।তোমাকে দেখে তো কোনো মানুষেরই কাছে আসতে ইচ্ছে হবে না।’

তার শেষ কথাটা শুনতেই অরুনিমার দুই চোখ ছলছল করে উঠলো।সে কোনো জবাব দিলো না।কেবল আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’আমি এখন আসি।’

‘হ্যাঁ।যাও।’

অরু ঘরে এসেই থম মেরে চুপচাপ খাটে গিয়ে বসলো।হৃদি তার ঘরে এসে বলল,’কি হয়েছে?দাদিজান ডাকলো কেন?’

অরু মুখ লটকে বলল,’অপমান করতে।’

‘সেকি! আবার কি বললো?’

‘বললো যে আমি নাকি খুব বাজে দেখতে।সংসারে মনোযোগী না।হামাদ কয়দিন পর পরকীয়া করবে আমায় ফেলে।’

হৃদি ঠোঁট চেপে হাসলো।
‘কথাটা একদম ভুল বলেছে দাদিজান।অভি ভাইজান কখনোই এই কাজ করবে না।ভাইজান ঐসব প্রেম পরকীয়ার মানুষ না।’

‘এহহ্! তুমি কতো জেনে বসে আছো।’
অরু হঠাৎই কেমন উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো,’আচ্ছা হৃদি! আমার সাথে বিয়ের আগে কি তোমার ভাইজানের কোনো প্রেমসেম ছিলো নাকি?’

হৃদি ভাবুক হয়ে জবাব দিলো,’নাহ।তেমন কিছু তো কখনো শুনি নি।’

‘উহু।মনে করে দেখো।’

‘না।মনে পড়ছে না।’

অরুনিমা গালের নিচে হাত রেখে বাইরে তাকালো।বলল,’থাকলেও তো তুমি কিছু জানবে না।সে কি এসব জনে জনে বলে বেড়ানোর মানুষ?’

‘তা বুঝলাম।তবে তুমি আজকাল তাকে নিয়ে এতো উদ্বিগ্ন হচ্ছো কেন?’

‘জানি না।’
বলেই অরু এক লাফে উঠে দাঁড়ালো।এক প্রকার ঘোষনা করে বলল,’শোনো হৃদি! আজ আমি শাড়ি পরব।তুমি পরিয়ে দিবে।তারপর কাজল দিবো।সুন্দর করে সাজবো।তুমি আমায় সাজিয়ে দিবে বুঝেছো?’

‘তোমার হঠাৎ সাজতে মন চাচ্ছে কেন?বাইরে যাবে নাকি?’

‘উহু।এতো কথা বলো না তো।’

অরুনিমা আলমারি থেকে গাঢ় লাল জামদানি শাড়ি বের করলো।সেটা গায়ের উপর মেলে ধরে বলল,’আজ আমি এই শাড়িটা পরব।তুমি আমার পরিয়ে দিবে কেমন?’
.
.
.
.

‘থাক থাক নিজ মনে দূরেতে,
আমি শুধু বাসরীর সুরেতে।’
‘থাক থাক নিজ মনে দূরেতে,
আমি শুধু বাসরীর সুরেতে।’

পরশ করিব ওর প্রাণমন- অকারণ
মায়াবন বিহারীনি||
মায়াবন বিহারীনি হরিনী
গহন স্বপন সঞ্চারীনি||
কেন তারে ধরিবারে করি পণ- অকারণ
মায়াবন বিহারীনি||’

আজকের আবহাওয়া হিমশীতল।উত্তরের খোলা জানালা থেকে সকাল হতেই ঘরের ভেতর ঠান্ডা পবন প্রবেশ করছে।নিরুপমা অনেক আগেই জানালা চাপিয়ে দিয়েছে।নিহাদের অল্পতেই ঠান্ডা বেঁধে যায়।শীতকালে তাকে একটু যত্ন করে রাখতে হয়।

নিরুপমা গান থামালো।এখন সময় বিকেল চারটা।নিহাদ খাটের উপর বসে খেলা করছে।নিরু জানালার ধার থেকে সরে তার পাশে গিয়ে বসলো।একহাতে তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,’তুতুন! দেখি মার কাছে আসো তো।কতোদিন আদর করি না তোমায়!’

তুতুন খেলনা ফেলে মায়ের দিকে তাকালো।নিরুপমা খুব মন দিয়ে তার চোখ দু’টো দেখে।কি মায়াভরা একটা মুখ।নিরুপমা কি শুধুমাত্র তাকে দেখেই এক জীবন কাটিয়ে দিতে পারে না?

তালাকের পর বহু সম্বন্ধ এসেছিল নিরুপমার জন্য।সবাই পাত্রী পছন্দ করে।অথচ পাত্রীর যে একটা সন্তান আছে,সেটা মোটেই পছন্দ করে না।একবার একটা সম্পর্ক প্রায় পাকাপাকি হয়েই গেল।লোকটার নাম ছিলো আমিন।শুরুতে বলা হলো,নিহাদ কে মেনে নিতে কোনো আপত্তি নেই।হঠাৎই একদিন বলল,নিহাদ তার নানু বাসায় থাকবে।

নিরুপমা হতবাক হয়ে বলল,’কেন?আমার ছেলে নানু বাড়ি কেন থাকবে?’

‘আপনার নতুন সংসারে কি আপনার আগের সংসারের ছেলের থাকা খুব প্রয়োজন?’

‘আপনি বলেছিলেন আমার ছেলেকে আপনি মেনে নিবেন।’

‘মানলাম তো।তার ভরণপোষণ সব আমার।কিন্তু সে থাকবে নানু বাসায়।’

নিরুপমা ফ্যালফ্যাল চোখে তার কথা শুনলো।সেদিন কেমন যেন অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে।নিজের চেয়েও বেশি অসহায় মনে হচ্ছিল তুতুনকে।নিরুপমার সুযোগ আছে নতুন জীবনে পা বাড়ানোর।অথচ তুতুনের নেই।তাকে মানুষ ঘরে নিতে চায়।কিন্তু তুতুনকে আর কেউ নিতে চায় না।কি অদ্ভুত!তুতুন বাদে নিরুপমার আর আছে টা কি?

মেয়েরা সন্তানের ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর প্রকৃতির হয়।ক্ষ্যাপা বাঘিনীর মতো।নিরুপমাও তার ব্যতিক্রম না।সেই সম্বন্ধ সে শেষমেশ ফিরিয়ে দিয়েছিলো।সন্তান জিনিসটা খুব দামি।পুরো দুনিয়া থেকে নিরুপমা তাকে নয়মাস বেশি চিনে।তাকে ছাড়া নিরুপমা নতুন জীবনের চিন্তাও করতে পারে না।এরপর সে স্পষ্ট করে জানালো,তুতুন কে না নিয়ে সে কোথাও সংসার করবে না।এই নিষ্পাপ মাসুম বাচ্চাটা তার নিজের।এই ছোট্ট প্রাণের মাঝেই নিরুপমার হৃদস্পন্দন মিশে আছে।সে মা।এই এক শব্দেই নিরুপমার দায়িত্ব আর অনুভুতিটুকু স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সন্ধ্যার দিকে মনোয়ারা তাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন।সে গিয়ে খুব বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়ালো।মনোয়ারা কোমল স্বরে বললেন,’তোর সাথে একটা কথা আছে নিরু।’

‘বলো মা।’

‘তোর জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে।’

নিরুপমা দুই হাতে শাড়ির কুচি খাঁমচে ধরলো।একটা ঢোক গিলে বলল,’ওহহ আচ্ছা।’

‘এবারের সম্বন্ধ বেশ ভালো।ছেলের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে।তাও নিজের।বিশাল বড়ো বাড়ি আছে জিগাতলায়।অরুর দাদি শ্বাশুড়িকে চিনিস?’

‘জ্বী।চিনি।’

‘উনিই পাঠালো সম্বন্ধ টা।’

নিরুপমা আস্তে করে বলল,’ওহ।বুঝেছি।’

‘বুঝলি নিরু।মানুষ কে প্রথম দেখেই বিচার করা উচিত না।শুরুতে ভেবেছিলাম,মহিলা মনে হয় খুব নাক উঁচু আর অহংকারী হবে।অথচ দেখ,কতো ভালো মনের মানুষ।তোর জন্য কতো সুন্দর একটা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে!’

‘জ্বী।’

‘আমাকে আজ ফোন দিলো।বলল একবার তোর সাথে কথা বলে দেখতে।তারপর ছেলের ব্যাপারে সব খুলে বলল।’

নিরুপমা চাপা স্বরে বলল,’ওহহ আচ্ছা।’

‘তোর আপত্তি নেই তো নিরু?’

কান্নাটুকু গিলে নিয়ে সে উত্তর দিলো,’নাহ।আপত্তি নেই।ছেলের পরিবারে কে কে আছে?’

‘ঐ তো ছেলের দুই মেয়ে আর এক ছেলে।চিন্তা করিস না।তুতুন কেও নিবে সাথে।’

নিরুপমা হতবিহ্বল হয়ে মাথা তুলল।চোখের দৃষ্টিতে শুধু বিস্ময় আর বিস্ময়।অসহায় হয়ে একবার মায়ের মুখটা দেখল।সে পণ করেছিলো,সে আর কোনো কিছুতেই কাঁদবে না।অথচ তবুও তার ভেতরটা জমে এলো অকস্মাৎ।নিচের ঠোঁট টা কামড়ে ধরে সে বহু কষ্টে প্রশ্ন করলো,’উনার বয়স কতো?’

মনোয়ারা নির্লিপ্ত হয়ে বললেন,’আটচল্লিশ হবে হয়তো।বড় ছেলে এবার অনার্সে ভর্তি হয়েছে।অরুর কাছাকাছি বয়সী।’

নিরুপমা তপ্তশ্বাস ছাড়লো।বলল,’আচ্ছা।বুঝেছি।’

মনোয়ারা ভীষণ খুশি।বললেন,’কতো প্রভাবশালী লোক একবার ভাব! টাকা পয়সার অভাব নেই।আমি তো বলি,আমার দুই মেয়েরই কপাল ভালো।’

নিরুপমা খুব সাবধানে তার সামনে থেকে সরে এলো।তারপর শম্বুক গতিতে নিজের ঘরে গেল।শরীরটা হঠাৎই খারাপ খারাপ লাগছে।

আটচল্লিশ! বয়সে নিরুপমার দ্বিগুন।কিংবা তারো বেশি।তার সন্তান অরুনিমার বয়সী।এমন একটি লোকের সাথে নিরুর বিয়ের কথা ভাবছে মা।বয়সের ব্যবধানে বিয়ে করা খারাপ কিছু না।কিন্তু তাই বলে এতো ব্যবধান? নিরুপমা কি মা কে খুব বেশি জ্বালাচ্ছে?

নিরু দরজা বন্ধ করলো।নিহাদ তাকে দেখতেই ছুটে এলো তার কাছে।শাড়ির কুঁচি টেনে ডাকলো,’মা! মা! আমি একটা পাখি এঁকেছি মা।’

নিরু ধপ করে মাটিতে বসল।এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে ছেলের দিকে তাকালো।তারপর আচমকাই তাকে একটানে নিজের কাছে এনে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।মনে হলো সে কোনো চোরাবালি।যার গহীনে তুতুনের ছোট্ট শরীরটা গ্রাস হচ্ছে একটি একটু করে।

নিরুর গাল তখন নোনাজলে ভেজা।এতোক্ষণ কান্না চেপে রেখেছিল।এখন আর কান্না চাপতে ইচ্ছে করছে না।তুতুন কিছু বুঝলো না।অথচ সে নড়লও না সামান্য।মায়ের কান্না,কিংবা সেই কান্নার গভীরতা কি সন্তানরা বোঝে?হয়তো বোঝে।

নিরুপমা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,’তুতুন! আমার জান।চলো সোনা।আমরা খুব দূরে কোথাও চলে যাই।খুব দূরে।যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না।শুধু মা আর তুতুন।মাঝে মাঝে অরু আর খালু কে দাওয়াত দিবো।তারা এসে বেড়াবে।আর….’

নিরুপমার কন্ঠ থেমে এলো।আড়চোখে একবার পড়ার টেবিলের নিচের তাকে তাকালো।সেখানে মোটা বইয়ের ভাঁজে একটা খাম আছে।খামের ভেতর চিঠি।সন্ধ্যার একটু আগে রাশেদ এসে দিয়ে গেছে।নিরুপমা এখনো সেটা খুলে দেখেনি।চিঠির দিকে চোখ পড়তেই তার কান্না থামলো।একটু পর পর শুধু হেঁচকি তোলার শব্দই হচ্ছিল।নিরুপমা তুতুনকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে কিশোরীদের মতো করে বলল,’আমরা রাঙামাটি যাবো নিহাদ।আমরা মেজরের কাছে যাবো।মেজর ছাড়া আর কেউ আমাদের বোঝে না।’

চলবে-

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

২৩.
[দ্বিতীয় অংশ]

অভি সেদিন বাড়ি প্রবেশ করল খিটখিটে মেজাজ নিয়ে।মোড়ের দোকানে রফিকের সাথে তার একটা ঝামেলা হয়েছে।কথা কাটাকাটি স্বাভাবিক ব্যাপার।অভি ব্যাপারটা স্বাভাবিক হিসেবেই নিলো।কিন্তু ঘটনার এক পর্যায়ে যখন রফিক তাকে ধাক্কা দিয়ে মা বাপ তুলে গালি দিলো,তখনই সে খেই হারালো।রাগ উঠলে তার মাথা কাজ করে না।মা বাবা তার তীক্ষ্ণ অনুভূতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।তাদের নামে নোংরা কথা অভি কস্মিনকালেও সহ্য করতে পারে না।

মেজাজ টা এত্তো গরম হলো যে ব্রহ্মতালু অব্দি ছ্যান ছ্যান করে জ্বলে উঠলো।অভির জন্য মারামারি বিষয়টা খুব বেশি জটিল কিছু না।সে এতো ভেবে চিন্তে কাউকে আঘাত করে না।যখনই কেউ সীমা লঙ্ঘন করে,তখনই সে পিটিয়ে তার হাড় ভেঙে দেয়।রফিক কে সে যদিও বা তার গায়ে ধাক্কা দেওয়ার জন্য ক্ষমা করে দিতো।কিন্তু রফিক সেখানেই থামেনি।সে তাদের তুচ্ছ কথা কাটাকাটির মাঝে তার মা বাপ তুলে গালি দিয়েছে।মা আর বাবার বিষয়ে অভি নাজুক,প্রচন্ড রকমের অনুভূতিপ্রবণ।রফিকের যা পরিনতি হলো তার জন্য কেবল রফিক ই দায়ী।

বাড়ির সিঁড়ি অব্দি পৌঁছুতেই জগলু তাকে ফোন দিলো।অভি সেটা তুলেই কানের সাথে চেপে ধরল।অত্যাধিক ভারি গলায় বলল,’কিহ্?ম’রে গেছে?’

‘তুই পাগল অভি?এভাবে কেউ কাউকে মারে?’

‘শুরুটা ঐ হারামিই করেছে।’

‘যাই হোক।তাই বলে তুই এমন মাথা ফা’টিয়ে দিবি তার?’

‘আর কিছুক্ষণ সামনে পেলে হাড়গোড় সব ক’টা ভেঙে দিতাম।এখনো চেনে নি আমায়।’

জগলু ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,’এতো মেজাজ ভালো না অভি।কতোখানি রক্ত বের হলো ছেলেটার!’

‘মরুক গিয়ে।আমার কি?সে আমার মা কে কি বলেছে জানিস?’

‘তোর মা কে উদ্দেশ্য করে বলেনি।সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে গায়ে মাখিস কেন?’

‘জ্ঞান দিস না।ভালো লাগছে না।’

অভি ফেন কাটলো।জগলুর উপদেশ কিংবা বিচক্ষণ কথাবার্তা এই মুহূর্তে তার কাছে বিষের মতো মনে হচ্ছে।সে খিঁচে রাখা মুখে দোতালার সেই দক্ষিণের ঘরটিতে প্রবেশ করলো।

প্রবেশ করেই অন্যমনস্ক হয়ে সে সামনে তাকালো।তাকাতেই কি যেন একটা ঘটে গেল তার সাথে।সে স্থির হলো,শান্ত হলো।থেমে গেল বুকের ভেতরের সমস্ত চঞ্চলতা।চোখের পলক পড়বে বলেও আর পড়ল না।কেবল অদৃশ্য অলৌকিক শক্তিতে হামাদ শিকদার জমে গেল।একটা হিম ঠান্ডা প্রবাহ তার সমস্ত শরীর ছুঁয়ে দিলো।এক পর্যায়ে শীতল রক্তের ধারা নেমে এলো মেরুদণ্ড বেয়ে।অভি এতো কিছুর পরেও ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।

অরুনিমা প্রচন্ড উদগ্রীব হয়ে তার অপেক্ষা করছিলো।পরনে গাঢ় লাল শাড়ি।হাতে চুড়ি,চোখের নিচে কাজল,আর ঠোঁটে মেলা থেকে কিনে আনা লিপস্টিক।সাজার পর আয়নাতে যেই প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল,সেটা বেশ মনঃপুত হলো তার।তার মনে হলো তাকে খুব মিষ্টি দেখাচ্ছে।কিন্তু সমস্যা হলো,আয়নাতে সবাইকে মিষ্টিই দেখায়।বাস্তবে কেমন দেখাচ্ছে,সেটা বোঝার জন্য অন্য মানুষের মতামত নিতে হয়।হৃদি যদিও বলেছে যে তাকে খুব সুন্দর লাগছে।কিন্তু অরুনিমা বিশ্বাস করে নি।হৃদির স্বভাব সবার প্রশংসা করা।সে তো প্রশংসা করবেই।অরু বড্ড জড়োসড়ো হয়ে অভির অপেক্ষা করছিলো।

সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ হলো।অরুনিমার মনে হলো সেই একই শব্দ তার হৃদযন্ত্রেও হলো।সেখানেও হাঁতুড়ি পেটার মতো কিছু একটা ঘটে গেল।ধড়ফড় করতে করতে হৃদপিন্ডটা ফেটে যাওয়ার জোগাড়।সে উঠে দাঁড়ালো।নিজেকে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দরজার দিকে তাকালো।

অভি ঘরে প্রবেশ করলো খুবই তিতিবিরক্ত মেজাজে।তাকে এক ঝলক দেখতেই অরুনিমার শরীর জমে গেল।পা দু’টো সহসা এটে গেল শক্ত মেঝের সাথে।অরু দেখলো অভির সমস্ত হাত র’ক্তে মাখামাখি।শার্টে র’ক্ত,শার্টের হাতায় র’ক্ত,কলারের কাছটায় র’ক্ত,ঘাড়ে কপালে সর্বত্র শুধু র’ক্ত আর র’ক্ত।কাপড়ে লেগে থাকা র’ক্ত ততক্ষণে শুকিয়ে রং পাল্টেছে।অরু তার আগাগোড়া দেখতেই হতভম্ব হলো।নিঃশ্বাসটা ঠিক গলা পর্যন্ত এসে আটকে গেল। বিবাহিত জীবনের বহুদিন পর অরুনিমা প্রথমবারের মতো তার বর কে প্রচন্ড রকম ভয় পেল।

অভি একদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে ছিল।সেই চাহনি তে অরু আরো বেশি গুটিয়ে নিল নিজেকে।কেবল একবার চোখ মেলে তার র’ক্তমাখা হাত টা দেখল।তার মনে হলো,এই ছেলেটাকে সে চেনে না।সে অন্য কেউ।অরু যার অপেক্ষা করছিল,সে খুব সাধাসিধে মানুষ ছিলো।অথচ এই ছেলেটা সাধাসিধে না।তাকে দেখেই অরুর ভয় হচ্ছে,ভেতরটা ধুক ধুক করছে।

অভি তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখল।খুবই মনোযোগ দিয়ে।তার শাড়ি,শাড়ির কুচি,পাড়ের রং,কানের দুলের কুন্দন,চোখের কাজল,ঠোঁটের লিপস্টিক,মসৃণ চুলের সিঁথি-সবকিছু।তারপর আনমনে একটা ঢোক তার কন্ঠনালি বেয়ে নিচে নেমে এলো।অরু মলিন চোখে তার দিকে তাকালো।অভির হম্বিতম্বি থেমে গেল চট করে,একদম চোখের পলকে।

সে ধীর পায়ে দুই কদম এগিয়ে এসে বলল,’কোথায় যাবে তুমি?’

ভারি,গম্ভীর আর চাপা পুরুষালি কন্ঠ।অরুনিমা সেই কন্ঠের গভীরতা মাপতে গিয়ে ব্যর্থ হলো।মিনমিনে স্বরে বলল,’কোথাও না।’

‘তবে সাজলে যে?’

অরুনিমা থমকানো সুরে বলল,’এমনিই।’

অভি কথা বাড়ালো না।হেঁটে এসে খাটে গিয়ে বসলো।অরুনিমা একটু সাহস সঞ্চার করে শুধালো,’এমন করে হাত কাটলে কেমন করে?’

অভি পেছন ফিরল।অতিশয় শান্ত চোখে একবার অরুনিমার দিকে তাকালো।অরুনিমা দমে গিয়ে দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,’এমনিই।এমনিই জানতে চাইলাম।’

অভি প্রতিক্রিয়া দেখালো না।একেবারে শীতল কন্ঠে বলল,’মারামারি করেছি।’

‘কেন?’

‘অনেক বড়ো কাহিনি।বলতে পারবো না।’

অরুনিমা দু’হাত এক করে যন্ত্রের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।শেষে একবার দুই ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলে,’হামাদ! শুনছো?’

‘হুম।’

‘আমি একটু তোমার পাশে বসি?’

‘হুম।’

অরুনিমা শাড়ির আঁচল টা ঘুরিয়ে এনে হাতের মুঠোয় নিলো।তারপর খুব শান্ত পায়ে হেঁটে অভির পাশাপাশি বসলো।হাত বাড়িয়ে সহজ হওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,’দেখি দাও তো হাত টা।কতোখানি কাটলে দেখি।’

অভি নির্বিকার হয়ে হাত বাড়ালো।মাঝে আবার এক দফা অরুনিমাকে আগাগোড়া দেখে নিল।তারপর চুপচাপ অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল।অরু দুই হাতে তার হাত টা চেপে ধরল।ব্যথাতুর স্বরে বলল,’ইশশ! কতোখানি কাটলো! ব্যথা হচ্ছে না?’

‘নাহ্।’

‘আমি জানি।হচ্ছে।’

অভি চুপ থাকে।অরু নিজ থেকেই আবার বলল,’যেই অসভ্য তোমায় মেরেছে,তার হাত দু’টো ভে’ঙে যাক দোয়া করি।’

অভি জলদগম্ভীর স্বরে বলল,’সে মা’রে নি।আমি মে’রেছি।মে’রে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি তার।মা’থা ফাটাতে গিয়ে নিজেরও হাত কেটেছি।’

অরুনিমা আঁতকে উঠে বলল,’এতো ভয়ংকর তুমি!’

অভি বাঁকা হাসে,’কোনো সন্দেহ?’

অরু মুরুব্বি দের মতো করে বলল,’মারপিট ভালো না।ক্ষমা একটি মহৎ গুন।’

অভির হাসি পেল।তবুও মুখ শক্ত রেখে বলল,’হুম।বুঝেছি।’

অরুনিমা বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকালো।অভি বলল,’ভয় পাচ্ছো নাকি আমাকে?’

‘একটু একটু।’

‘আগেই বলেছি।আমি ভয়ংকর।’

‘যখন দূরে ছিলে,তখন ভয় পাচ্ছিলাম।কিন্তু এখন ভয় পাচ্ছি না।’

অভি ভ্রুকুটি করে বলল,’কেন?এখন কেন পাচ্ছো না?’

‘কারণ তোমার গায়ের ঘ্রাণ পেলে আমার আর তোমাকে ভয় লাগে না।খুব আপন আপন লাগে।’

অভির কপালের রগ,যেগুলো কিছু মুহূর্ত আগেও দপ দপ করে লাফাচ্ছিল,সেটা হঠাৎই এক লহমায় শিথিল হয়ে এলো।বন্ধ হয়ে গেল হৃদয়ের সমস্ত তোলপাড়।জীবনের সমস্ত তিক্ততার মিশ্রণে হৃদ গহীনে উঠা বালিঝড় যেন আশ্বিনের ঠান্ডা পবনের ছোঁয়ায় আচমকাই থেমে এলো।অদ্ভুত রকমের প্রশান্তিতে ভেতরের সবকিছু নিরব,নিশ্চল আর শান্ত হয়ে এলো।সবকিছু ছাপিয়ে প্রকট হলো একটি অনুভূতি।সেই অনুভূতি কোনো দগদগে ঘা এর চেয়ে কম কিছু না।সেই অনুভূতিতেও ভেতরটা চিনচিন করে উঠে,মনে হয় কি যেন সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে ভেতরে ভেতরে।

‘আমার কোনো ঘ্রাণ আছে?’

একটু আগের কঠিন আর নিরাসক্ত কন্ঠটা এই মুহূর্তে এসে বেশ সাবলীল আর কৌতূহলী শোনাল।অরু একগাল হেসে উত্তর দিলো,’আছে তো।আমার হামাদের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ।’
বলেই সে আবারো হাসলো।কিন্তু অভি আর হাসতে পারলো না।উল্টো পুরোপুরি থেমে গিয়ে সে অরুনিমার মুখের দিকে তাকালো।”আমার হামাদ”।এই একটি শব্দের জোর কতোখানি?কতোকাল গেল,কতো মানুষ এলো।কেউ তো কোনোদিন বলেনি আমার হামাদ।কেউ তো র’ক্তাক্ত হাত দু’টো লুফে নেয়নি।কেউ না।এই উত্তপ্ত,গা ঝলসে নেওয়া মরুর বুকে হঠাৎই এমন বর্ষণ নামলো কেন?অভি তো স্বপ্নেও সেই বর্ষণের অপেক্ষা করেনি।

অরু বলল,’দাঁড়াও।ব্যান্ডেজের কাপড় খুঁজে আনছি।স্যাভলন কোথায় আছে,সেটা জানি।ব্যান্ডেজের কাপড় খুঁজতে হবে।’

সে পাক্কা গৃহিণীদের মতো উঠে দাঁড়ালো।অভি চুপ হয়ে তার কার্যকলাপ দেখল।ব্যান্ডেজ খুঁজে পেতেই সে কি সুন্দর করে অভির হাতটা জীবানুমুক্ত করে ব্যান্ডেজে মুড়িয়ে দিলো! কাজ শেষ হতেই একগাল হেসে বলল,’এখন দেখবে কতো তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাও তুমি।’

‘অরুনিমা!’

ভারি পুরুষালি স্বরটা আচমকা ঘর কাপিয়ে ডেকে উঠলো।অরু বোকা বোকা হয়ে বলল,’জ্বী?’

‘শাড়ি কেন পরেছো?’

অরু লজ্জা পেল।মাথা নামিয়ে বলল,’তোমার জন্য।’

‘কেন?’

অরুনিমা মিনমিনে সুরে কোনোরকমে বলল,’এভাবেই।’

‘ওহহ্।’

‘আমায় কেমন লাগছে?’

অভি চোখ তুলল,স্বীয় স্ত্রীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো।অরু আকুল হয়ে তার জবাবের অপেক্ষা করছিল।অভি গাঢ় স্বরে বলল,’খারাপ না।ভালোই।’

‘কে বেশি সুন্দর?আমি না তোমার পারু?’

অভি থতমত খেল।শুরুতেই ঘটনা ধরতে পারল না। পরে অবশ্য বুঝলো।বুঝে বেশ গম্ভীর হয়ে বলল,’আমি তো ওমন করে সৌন্দর্য মাপি নি তার।সে তো এমনিই সুন্দর।’

অরুনিমার চোখ ছলছল করে উঠল।হাতে থাকা শক্ত খড়খড়ে কড়পড়া হাতটা ছেড়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো।তারপর খাটের একপাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে অভিমানী গলায় বলল,’আমি আর জীবনেও তোমার সাথে কথা বলবো না।’

অভি পেছন ফিরলো না। একবারের জন্যও না।যেমন করে বসেছিল,ঠিক তেমন ভাবেই বসে থাকলো।যদি সে পেছন ফিরতো,তবে অরু দেখতো,তার ঠোঁটে সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি।অরুনিমার অভিমানী সুর যেন সেই হাসিতে প্রাণ এনে দিয়েছিল।

অভি পেছন ফিরলো আরো অনেক পরে।যখন অরুনিমার দুই চোখ লেগে এসেছে।সে পেছন ফিরেই খুব মন দিয়ে অরুনিমার মুখটা দেখলো।নাকের ডগা অভিমানে লাল হয়ে আছে।চোখের পাতা বন্ধ করায় কুচকুচে কালো কাজল আরো বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।এক ফালি চুল আজও নিয়ম করে তার মুখের উপর এসে পড়েছে।এরা আসলে চুক্তি করেছে,অভিকে ডোবানোর।কোনো কিছুই কাকতালীয় না।এরা সন্ধি করেছে সবাই মিলে।অভি কে এলোমেলো করা সন্ধি।

তারা তাদের সন্ধিতে সফল হলো।অভি এগিয়ে এসে অরুর মুখের সামনে থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিলো।সরাতে গিয়েই একবার ইচ্ছেকৃত ভাবে তার গাল স্পর্শ করলো।গালটা ঠান্ডা হয়ে আছে খুব।অভি চাদর টেনে দিলো।উঠে দিয়ে বারান্দার দরজা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিলো।

তার হঠাৎ মনে পড়ল,তার কাছে একটা ক্যামেরা আছে।তিন চার বছর আগে খুব শখ করে কিনেছিলো।সে দ্রুত আলমারির নিচের তাক থেকে ক্যামেরা বের করার সিদ্ধান্ত নিল।এই স্নিগ্ধ সুন্দর রমণীর এতো কষ্টের সাজ যদি তার ক্যামেরায় বন্দিই না হয়,তবে এই ক্যামেরা কেনার সমস্ত টাকা জলে যাবে।
.
.
.
.

“আমরা ভাবি,জীবন টা হয়তো কোনো শান্ত প্রবাহের বহমান নদী।যেখানে কলকল করে জলের স্রোত বয়ে যাবে।পাথরের গা ঘেঁষে পানি নেমে আসবে।নদীর ধাঁরেই একটা চমৎকার জারুল ফুলের গাছ থাকবে।গাছের ডালে থাকবে খুব সুন্দর একটা রঙিন ডানার পাখি।ফুলে ফুলে মৌমাছি উড়ে বেড়াবে।পাখির কুহুতানে মুখরিত হবে চারপাশ।ঠিক এমন জীবনই তো আমরা চাই।তাই না মুস্তাফা?কিন্তু কয়জন এমন জীবন পায় বলুন তো?

জীবনের পথে চলতে চলতে আমরা টের পাই,জীবন একটা ঘন কালো জঙ্গল।যেখানে কলকল করে নদী বয় না।উল্টো সমুদ্রের ভয়ংকর গর্জন তীব্র বেগে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে।গাছের ডালে পাখিরা ডাকে না।শুকনো পাতার মর মর শব্দ কানে বাজে না।উল্টো সেখানে গাছের পাতার রং হয় কালো,একেবারে কুচকুচে কালো।সেখানে সূর্য উঠে না,জোৎসনা নামে না,শুকতারার দেখা পাওয়া যায় না।সে কৃষ্ণগহ্বরের মতো গভীর জীবনই আমাদের বয়ে বেড়াতে হয়।সবাই কে না।তবে বেশ কিছু মানুষ কে।

আমার জীবন ঠিক ওমনই।আপনি ভাববেন না যে আমি স্রষ্টার উপর নারাজ।এমনটা একদমই না।আমি সবটাই মেনে নিয়েছি।ধরে নিয়েছি সবটাই একটা পরীক্ষা।এখন আর এসব আমাকে খুব বেশি পীড়া দেয় না।তবে মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা খুব আঘাত করে জানেন?

আজ অরুর শ্বশুর বাড়ি থেকে তার দাদি শ্বাশুড়ি আমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।মা আমাকে ডেকে নিয়ে সেটা জানালো।আপনাকে হয়তো আগে জানানো হয় নি।আজ জানাচ্ছি।আমার জন্য প্রায়ই এমন সম্বন্ধ আসে।আবার ভাববেন না,আমি খুব নামিদামি কেউ।আমি যে কতো তুচ্ছ সেটা আপনি আমার জন্য আসা সম্বন্ধের নমুনা দেখলেই বুঝবেন।

যেমন ধরুন আজকের ব্যাপারটা।ভদ্রলোকের বয়স আটচল্লিশ।তার ছেলে আমার ছোট বোনের সমান।তার সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে।এই হলো আমার জীবনের অবস্থা।
এই জীবনটাও আমি সয়ে নিচ্ছি ধীরে ধীরে।হাহাহা।আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

রাহাতের সাথে তালাক হওয়ার পর আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম জানেন?সেই ভঙ্গুর স্বত্তাটা কোনো এক জায়গায় এখনো সেই আগের অবস্থানেই আছে,উঠে দাঁড়াতে পারে নি ঠিকঠাক।সমাজ,সমাজের কটুক্তি,কোনো কিছুকেই পুরোপুরি উপেক্ষা করার মতো সাহসী আমি হয়ে উঠতে পারি নি।

আপনার চিঠি আমাকে খুব ভাবায় মুস্তাফা।সব জেনেও মনে হয় আরো একবার জিজ্ঞেস করি,আপনি কি সত্যিই আমায় চেনেন মুস্তাফা?আপনি কি সত্যিই সিদ্দিক রহমান আর মনোয়ারা বেগমের সন্তান নিরুপমা কেই চিঠি দিচ্ছেন?নিরুপমা তো খাকি আর জলপাই রঙা উর্দি পরিহিত কোনো ব্যক্তির পত্র পাওয়ার মতো বিশেষ কেউ না।নিরুপমা খুব সাধারণ।

আপনি কেন বার বার আমায় পত্র দিয়ে দুর্বল করছেন মুস্তাফা?আপনি কি জানেন,এসবের পরিনতি কি?আপনি কি আমায় আরো একবার মারতে চান?চান যে আমি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাই?

মুস্তাফা,
একটা কথা বলি?বললে কি আপনি রাগ হবেন?
যদি কোনোদিন আমাদের সত্যিই দেখা হয়,তবে আপনি একবার,শুধু মাত্র একবারের জন্য আমার মাথায় হাত রাখবেন।রেখে বলবেন,’ভয় নেই নীলা।আমি আছি।’

ঐটুক।ব্যাস ঐটুকই চাই আমার।আর কিচ্ছু না।আপনি কি শুধু একটি বারের জন্য এই কাজটা করবেন?যদি আপনার অন্য কোথাও বিয়েও হয়,তাহলেও এটা করবেন।এটা আমার অনুরোধ।আবার বলতে পারেন অন্যায় আবদার।আপনি কি আমার এই আবদার টুকু পূরণ করবেন মুস্তাফা?

আরেকটা কথা বলি?
মা যখন আজ বিয়ের কথা বলল,তখন আমার সমস্ত শরীর ভেঙে চুড়ে কান্না এলো।আমার মনে হলো আমি কোনো উন্মুক্ত প্রান্তরে ছুটে যাই।গিয়ে চিৎকার করে কিছুক্ষণ কাঁদি।তারপর কেউ এসে আমার পাশে দাঁড়াক।দাঁড়িয়ে বলুক,’ভয় নেই নিরুপমা।এই যে আমি আছি।আমি আছি তো।’

ঠিক তখনই আমার আপনার কথা মনে পড়লো।আপনি কি আমার এই ইচ্ছাটাও পূরণ করবেন?আমি একটা প্রশস্ত উন্মুক্ত প্রান্তরে দিগবিদিক হারিয়ে ছুটে যাবো।খুব আয়োজন করে কাঁদবো।আপনি তারপর পাশে এসে দাঁড়াবেন।খুব নরম করে বলবেন,’কাঁদে না নীলা।কাঁদছো কেন?আমি আছি তো।তুমি তো হীরে।হীরেদের কি ওমন করে কাঁদতে আছে বলো?’

আপনি কি একটিবারের জন্য হলেও আমায় ওমন করে বলবেন?

বারবার কেন মিশনের কথা তুলে ভয় দেখান?আমি জানি ঐ মিশনে আপনার কিচ্ছু হবে না।আমার সাথে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনার কিছুই হবে না।নীলার পক্ষ থেকে আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা।
আপনি বিনিময়ে একটু আমার ধৈর্যের প্রার্থনা করবেন কেমন?স্রষ্টা কেন আমাকে এতো কম ধৈর্য দিয়ে বানিয়েছেন?আমি আরো বেশি ধৈর্যশীল হয়ে উঠতে চাই।

আজকের মতোন বিদায়।আপনাদেন জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।আল্লাহ আপনাদের সবাইকে নেক হায়াত দারাজ করুক।আমিন।

ইতি,
নিরুপমা রহমান
সমতট লেন,ঢাকা।

নিরুপমা চিঠিখানা লিখা শেষ করেও কিছুক্ষণ সেটা বুকের সাথে চেপে ধরে রাখলো।মনে হলো ভেতরের যন্ত্রনা কিছুটা উপশম হচ্ছে।নিহাদ অনেক আগেই ঘুমিয়ে গেছে।অথচ নিরুপমার চোখে নিদ্রা নামে না।ভেতরে অদৃশ্য বাষ্প জমে ভেতরটা কেমন ভারি হয়ে উঠে।মনে হয় সেই ভারি বাষ্পে তার দম বন্ধ হয়ে আসবে,আর কখনো শ্বাস চলবে না।

কিন্তু নিরুপমা তো মরতে চায় না।সে মরলে নিহাদের কি হবে?এই কয়েক বছরে নিরুপমা জগত চিনেছে।জগত চিনতে গিয়েই মানুষ চিনেছে।এই জগতের মানুষ খুব অদ্ভুত।নিরুপমা জানে,তার মৃ’ত্যুতে কেবল নিহাদই হারাবে।সবচেয়ে বেশি অবহেলা,সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হবে ঐ ছোট বাচ্চাটাই।নিরু তো মরতে চায় না।নিরু খুব সুন্দর করে বাঁচতে চায়।স্রষ্টা বুঝি চিরকাল তার কপালে দুঃখই লিখে রাখবেন?সুদিন বুঝি কখনোই আর আসবে না?
.
.
.
.

অরু দু’হাত মেলে বললো,’আমি এখন এখান থেকে নিচে পড়বো,আর তুমি আমায় ধরে নিবে কেমন?’

অভি আদ্যোপান্ত তাকে দেখলো।সে দাঁড়িয়ে আছে ছয় সিঁড়ি উপরে।হাত মেলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি পড়বে।আজ জগলুদের বাড়ি এসে সে একটা সিনেমা দেখেছে।তার আবার রোমান্টিক সিনেমা বাদে অন্য কিছু ভালো লাগে না।দেখার পরেই সে নিজেকে নায়িকা ভাবতে শুরু করেছে।

অভি থমথমে মুখে বলল,’সিনেমা দেখার পর এমন পাগলামি করবে জানলে জীবনেও দেখাতাম না।পড়ো তুমি নিচে।এরপর কোমর ভেঙে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদো।’

অরুনিমা হাসলো।পাখির মতো দু’হাত মেলে বলল,’আমার কোমর ভাঙবে না।কারণ তুমি আমায় ধরে ফেলবে।’

‘পাগল নাকি?জীবনেও না।’

অরু সত্যি সত্যি দু’হাত প্রসারিত করে সমস্ত শরীরের ভার নিচের দিকে ছেড়ে দিলো।কয়েক মিলি সেকেন্ডের মাথায় শক্ত পোক্ত দু’টো হাত খপ করে তাকে চেপে ধরলো।অরু চোখ বুজেই মুচকি হেসে বলল,’কি?তুমি না বললে তুমি ধরবে না?’

অভির মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।দুই হাতে অরুনিমার সমস্ত ভার তুলে নিয়ে মুখ খিঁচে বলল,’ধরে দু’টো চড় দিবো এরপর থেকে এমন পাগলামি করলে।’

‘আচ্ছা দিও।’

জগলু মাত্রই ঘর থেকে বেরিয়েছে।ছাদের সিঁড়ির সামনে দু’জনকে দেখেই সে তাজ্জব হলো।অভি তাকে দেখতেই খেঁকিয়ে উঠল,’হ্যাঁ রে জগলু।পাগলামির কোনো টিকা নাই?থাকলে বল।একে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।’

সে অরুনিমাকে কোল থেকে নামিয়ে হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেল।জগলু মাথা চুলকে বলল,’ব্যাপার কি?তোমাদের কতোখানি ভাব হলো?’

অরু মুখ লটকে বলল,’ভাব হবে কেমন করে?সারাক্ষণ মুখ টাকে কেমন প্যাঁচার মতোন করে রাখে দেখেছো?’

‘তা ঠিক।’

অরু বলল,’আমার একদমই ভালো লাগে না জানো?হামাদের জীবনে কোনো একসময় কেউ ছিলো,এটা ভাবলেই আমার কষ্ট লাগে।সে কি তাকেও এমন করে নূপুর পরাতো?’

জগলু হাসলো।অরুনিমাকে আশ্বস্ত করে বলল,’কেউ নেই তার জীবনে।সে ওসব মিথ্যে বলেছে তোমাকে।তোমাকে জ্বালাতন করার জন্য।আমি তার বন্ধু।আমি জানি সব।তুমিই বলো।তাকে দেখে কি তোমার একবারও মনে হয়েছে যে সে প্রেম ভালোবাসার মানুষ?’

অরুনিমা দুই দিকে মাথা নাড়ল।কিন্তু মুখের উদাসভাব তখনও স্পষ্ট।জগলু বলল,’অভি প্রেম ভালোবাসার মানুষ না হলেও তুমি যে আটঘাট বেঁধে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছো,তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

অরু মুখ শক্ত করে বলল,’একদমই না।সে আমায় একটুও পাত্তা দেয় না।আমি তাকে একটুও ভালোবাসি না।’

‘এহহ! বললেই হলো?’

অরুনিমা ব্যস্ত হয়ে এদিক সেদিক তাকালো।জগলু বলল,’যাও।ছাদে গিয়ে বরের সাথে চন্দ্রবিলাশ করে আসো।’

‘ছেহ্! তার মতো লোকের সাথে নাকি আবার চন্দ্রবিলাশ! সিগারেটের গন্ধে পাশ ঘেঁষা যায় না।দম বন্ধ হয়ে আসে।তার কাছে কে যায়?’

অরুনিমা কতোক্ষণ এলোমেলো হয়ে বসার ঘরে পায়চারি করল।শেষে ছাদের সিঁড়ির দিকে ছুটতে ছুটতে বলল,’ভালো লাগছে না আমার।একটু ছাদ হয়ে আসি।আবার ভাববে না যে হামাদের কাছে যাচ্ছি।আমি একটু ঠান্ডা বাতাস খেতে যাচ্ছি।’

জগলু দুই ঠোঁট চেপে তার কথা শুনল।সে ধাপধুপ ধুপধাপ শব্দে ছাদে উঠতেই জগলু সিঁড়ির মাথা থেকে সরে এলো।যেতে যেতে কেবল বিড়বিড় করে বলল,’যাও।বিশ্বাস করে নিলাম তুমি তাকে একটুও ভালোবাসো না।’

___

‘হামাদ! ও হামাদ।’

অভি পেছন ফিরল না।অরুনিমা তার পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো।বলল,’সিগারেট খেলে ক্যান্সার হয়।’

‘জানি।’

‘জানলে খাচ্ছো কেন?’

অভি বিরক্ত হয়ে কপাল কোঁচকালো।বলল,’নিচে যাও তো অরুনিমা।মাথা খেও না আমার।’

‘এমন করো কেন?একটু থাকি না এদিকে।’

‘থাকো।তবে মুখটা বন্ধ রাখো।’

অরু মুখের উপর তর্জনী চেপে ধরলো।সিগারেটের ধোঁয়ার তীব্র গন্ধে তার কাশ উঠলো,পরপর দু’বার।নিকোটিনের ঝাঁঝ এখনো তার শরীর ঠিকমতো সহ্য করতে পারে না।

অভি সিগারেট টা মেঝেতে ছুঁড়ে মেরে পায়ের সাহায্যে পিঁষে নিল।অরু আরেকটু কাছাকাছি এসে বলল,’একটা প্রশ্ন করি?’

‘হুম’

‘তোমার আমাকে কেমন লাগে।’

‘জানি না।’

‘আমি দেখতে কেমন?’

‘জানি না?’

‘তোমার আমাকে একটুও ভালো লাগে না।’

অভি আগের মতো করেই বলল,’জানি না।’

অরু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,’আমি মরে গেলে তুমি কান্না করবে না?’

অভি পাশ ফিরে তার দিকে তাকালো।গম্ভীর হয়ে বলল,’আমার পারু তোমার মতো এতো বক বক করে না সারাক্ষণ।এজন্যই তাকে আমার ভালো লাগে।’

অরুর চোখ দু’টো মুহূর্তের ব্যবধানে ভিজে এলো।প্রথমে অভিমান,তারপর তীব্র রাগ।সে দুম করে অভির কাঁধের কাছে একটা কিল বসিয়ে নাক টানতে টানতে বলল,’হামাদের বাচ্চা! তোমায় আমি মে’রে ফেলবো যদি আর কোনোদিন তুমি তার নাম মুখে নিয়েছো তো।’

চলবে-