#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
২৪.
ক্যামোফ্লাজ ট্রেইনিং।শরীরের সর্বত্র কালো রং মেখে সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।ক্যামোফ্লাজ ট্রেইনিং যে কোনো সামরিক প্রশিক্ষণের অবশ্য পালনীয় একটি প্রশিক্ষণ।
ট্রেইনিংরত সৈন্যদের মুখে কালো কিংবা গাঢ় সবুজ রং মাখিয়ে সবার প্রথমে এক কাতারে দাঁড় করানো কয়।কখনো শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া,কখনো আবার প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার লক্ষ্যে পুরো শরীরকে আবৃত করা হয় কুচকুচে কালো রঙে।সেই রং গায়ে মাখানোর পরেই সৈন্যরা অবাক হয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে।আর সেই সাথে আশ্চর্য হয়ে নিজেদের পেশাজীবনের বৈচিত্র্য আবিষ্কার করে।
এহতেশাম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সামনে তাকালো।আশিক এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে।ক্যাম্পে আজ সদস্য সংখ্যা অন্যান্য দিনের তুলনায় কম।কর্ণেল আহাদ জরুরি কাজে চট্টগ্রাম গিয়েছেন।বিগ্রেডিয়ার মুশফিক দু’দিন আগেই পারিবারিক প্রয়োজনে ক্যাম্প ছেড়েছেন।সাথে আবার কয়েকজনের ছুটির অনুমতি ছিলো।তারা সবাই যার যার বাড়িতে গিয়েছে।সব মিলিয়ে মিলিটারি ক্যাম্পের আবহাওয়া আজ শান্ত।
এহতেশাম সামনে দেখতেই সামান্য হাসলো।সেই হাসিতে তার মুখের ভাব পরিবর্তন হলো না।বাইরে থেকে সেই হাসি দেখাও গেল না ঠিকঠাক।সে চায়ের কাপে আরো একটা চুমুক দিয়ে বলল,’বাহ!বেশ লাগছে তো তোমাদের।’
ইয়াকুব ম্লান মুখে বলল,’মিথ্যে বলবেন না স্যার।একদম চোরের মতো লাগছে সবাইকে।আমি আয়নায় দেখেছি।’
পাশ থেকে অয়ন বলল,’সেটা তো তোকে কালি মাখার আগেও লাগতো।’
ইয়াকুব অগ্নিচোখে তার দিকে তাকালো।এহতেশাম বলল,’এই কাজ সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য করে না।শত্রুর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য করে।স্বাভাবিক অবস্থায় তোমাদের যতোখানি দেখা যেত,এখন দেখা যাচ্ছে এর চেয়ে কম।’
সাতজন এক সাথে মাথা নাড়লো।এহতেশাম বলল,’গতকাল স্নাইপার ট্রেইনিংয়ে সবচেয়ে ভালো করেছিল কে?’
রাফিদ উত্তর দিলো,’সাদাফ।’
‘ভেরি গুড সাদাফ।আজকে তুমি নিরপেক্ষ।তিন জন তিন জন করে দু’টো টিম হবে।তুমি দর্শক হয়ে দুই টিমের পারফরম্যান্স দেখবে।’
সাদাফ অল্প করে হাসলো।এহতেশাম বলল,’টিম তোমরা নিজেরাই বানাতে পারো।তোমাদের কাজ হচ্ছে অপোনেন্ট কে ধরাশায়ী করা।যেই টিম বিজয়ী হবে,কালকে তারা প্রশিক্ষণ থেকে ছুটি পাবে।আর বাকি তিনজন কালকেও ট্রেইনিং নিবে।’
সাতজনই প্রায় একইসঙ্গে তপ্তশ্বাস ছাড়ল।এই জীবনে আর শান্তি পাওয়া হলো না।সারাদিন হয় রাইফেল নিয়ে ছুটো।নয়তো কুমিরের মতো ক্রলিং করতে করতে দু’কিলোমিটার পথ পাড়ি দাও।এতেও যদি স্যারদের মন না ভরে,তাহলে তারা ভর দুপুরে রোদের মধ্যে প্যারেড করতে দাঁড় করিয়ে দিবে।কখনো আবার রং মাখিয়ে ঘন জঙ্গলের ভেতর ছেড়ে দেয়।এই জীবনে তাদের একান্ত অনুগত সঙ্গী হলো ঐ জংলি ছাপের ইউনিফর্মটা।এই এক ইউনিফর্মের ভারে তাদের এই নিরন্তর ছুটে চলা।
এহতেশাম ঘড়ি দেখে বলল,’তোমাদের সময় শুরু হচ্ছে এখন।চার ঘন্টা সময় দেওয়া হলো।মেজর হানিফ আর ক্যাপ্টেন তৈমুর তোমাদের সুপারভাইজ করবে।বেস্ট অব লাক বয়েজ।নাও গো।’
আশিক টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে সবার মুখের দিকে তাকালো।হুকুম পেতেই সবাই মিলিত স্বরে ইয়েস স্যার বলেই পাহাড়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো।তার আগে অবশ্য দুই মিনিটের আলোচনায় দলও বানিয়ে নিলো।ক্যাপ্টেন তৈমুর বুট জুতার খুট খুট শব্দ ফেলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।তারপর তাদের জন্য নির্ধারিত অস্ত্র তাদের হাতে তুলে দিলেন।সাথে দিলেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ।
আশিক বলল,’এরা একেকটা একেক রকমের নমুনা।কি যে করবে,আল্লাহ ভালো জানে।’
এহতেশাম হাসল না।উল্টো তার মুখটা আগের চেয়েও গম্ভীর দেখালো।সে ভারি ভারি দু’টো শ্বাস ফেলে গম্ভীর হয়ে বলল,’দে আর মাই সানশাইনস।আমি জানি,একসময় তারা খুব ভালো করবে।
আমি তাদের চোখে একটা স্পার্ক দেখতে পাই আশিক।তারা পারবেই।শুরুতেই যদি তারা তোমার আর আমার মতো হয়ে যায়,তাহলে কেমন করে হবে?দে হ্যাভ টু গো থ্রু আ লং লং ওয়ে।এরপর দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।’
.
.
.
.
সৃজনী ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,’ভেতরে আসবো?’
অভি ঘুম ঘুম চোখে একবার দরজার দিকে তাকালো।তারপর আবার খাটের উপর মাথা ফেলে নির্ভার হয়ে শুয়ে গেল।অরুনিমা সহাস্যমুখে বলল,’আরে সৃজনী! এসো না।কতোদিন পর এলে! ‘
সৃজনী ঘরে এসেই এদিক সেদিক তাকালো।তাকে কেমন যেন অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল।অদ্ভুত রকম মলিনতা আর অসহায়ত্ব এসে ভীড় জমিয়েছিল তার চোখে।সে একহাত দিয়ে অন্যহাতের তালু ক্রমাগত পিঁষে যাচ্ছিল।অরুনিমা বলল,’কি সৃজনী?কিছু বলবে?’
‘নাহ্।মানে ঐ আরকি।’
সৃজনী ছোট ছোট পায়ে আরেকটু সামনে এগোয়।চোখটা আপনাআপনি তার অভির দিকে গেল।অভি উপুড় হয়ে শুয়েছিল।নিঃশ্বাসের সাথে সাথে উন্মুক্ত পিঠ উঠানামা করছিলো।সৃজনী লাজুক চোখে সেদিকে তাকালো।অরুনিমা তাকালো তার চোখের দিকে।
‘কি দেখছ সৃজনী?’
সৃজনী ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।দ্রুত চোখ সরিয়ে বলল,’না না।কিছু না।’
সে অভির শিঁয়রে গিয়ে দাঁড়াল।নিচু কন্ঠে ডাকলো,’অভি ভাইজান! ‘
অভি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে জবাব দেয়,’হুম।’
‘তুমি নাকি হাত কেটেছো?’
‘হুম।’
‘এখন কি অবস্থা?’
‘ভালো।’
‘দেখি তো।’
অভি চট করে চোখ খুলল।পাশ ফিরে শুয়ে সৃজনীর দিকে দৃষ্টি এনে বলল,’সৃজু! তোকে এতো মাতব্বরি করতে হবে না আমাকে নিয়ে।যা নিজের চরকায় তেল দে।আমার হাতের যত্ন আমি করতে জানি।’
অভি শোয়া থেকে উঠে বসল।তারপর একবার অরুনিমার দিকে তাকালো।নিজের কথার সাথে আরেকটু যোগ করে বলল,’অরুনিমা আমার হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে।তোর এতো ভাবতে হবে না আমায় নিয়ে।যা ঘর থেকে।’
সৃজনীর দুই চোখ ভরে এলো।বহু কষ্টে কান্না থামিয়ে সে প্রশ্ন করল,’অরুনিমা আসার আগে কি কোনোদিন আমি তোমার হাতে মলম লাগাই নি?’
‘লাগিয়েছিস।অস্বীকার করি নি।কিন্তু আমি তোকে ডাকি নি।’
‘আমি কি একবারও জানতে পারি না তোমার হাতের অবস্থা?’
‘অবশ্যই পারিস।জানালাম তো।হাত ভালো আছে আমার।যা এবার এখান থেকে।’
সৃজনীর দুই চোখ ছাপিয়ে সত্যিই কান্না এলো।সেই কান্না হুট করেই দমন করা সম্ভব হলো না তার পক্ষে।সে সদ্য কৈশোরে পা ফেলা কিশোরীদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল।অভি নির্বিকার হয়ে বসে থাকলো।আর অরুনিমা?সে ভীষণ তাজ্জব হয়ে দু’জনের দিকে তাকালো।সৃজনী এভাবে কাঁদছে কেন?আর অভিও বা এমন থম মেরে বসে আছে কেন?
সৃজনী কান্নার দমকে শ্বাস টেনে টেনে বলল,’এই প্রথম তোমার কোনো আঘাতে আমি মলম দেই নি।নয়তো মনে করে দেখো,কতো কতো রাত তুমি এমন হাত পা ছিঁলে র’ক্তাক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিলে।সেই সময় সৃজনী বাদে কেউ তোমার ঘরে আসে নি।’
‘ফালতু কথা বাদ দে সৃজু।ভালো লাগছে না আমার।যা,নিচে যা।’
অরুনিমা ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে চেয়ে থাকে।তার কেমন বোকা বোকা লাগছে।সৃজনীর ক্রন্দনরত সুর তার বুকে হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ করছে।সৃজনী কেন তার বরের কাছে এসে এভাবে কাঁদবে?এটা ভালো না।অরুর এই দৃশ্য ভালো লাগছে না।এটা খুব অসুন্দর একটা দৃশ্য।
অভি তার দিকে তাকালো।অনুনাদী স্বরে বলল,’অরুনিমা! এক গ্লাস পানি নিয়ে আসো তো আমার জন্য।’
অরুনিমা চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতো উঠে দাঁড়ালো।ঐ যে বুকে একটা চিনচিন ব্যথা হচ্ছিল,সেটার তোয়াজ করলো না।হেঁটে গেল দরজার দিকে।
কিন্তু অবুধ,দুঃখী আর অশান্ত মন তো সবটা সহজভাবে দেখতে পারলো না।কোথায় যেন একটা কিন্তু রয়ে গেল।অরুনিমা ঘর ছাড়ল।কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো না।দরজা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সে দেয়ালে কান চেপে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
সে যেতেই অভি মাথা তুলে সৃজনী কে দেখল।খুবই রুক্ষ স্বরে বলল,’তোর সমস্যা কি?কথা কি কানে যায় না তোর?’
‘তুমি আমার সাথে আজকাল ওমন করে কথা বলো কেন?’
‘কেমন করে কথা বলি?’
‘এই যে রেগে রেগে।’
‘তুই আমার রাগ হওয়ার মতো কাজ করছিস কেন?’
‘কি করেছি আমি?তোমার ঘরে আসা যাবে না এখন থেকে?খুব বড় মাপের মানুষ তুমি?’
অভির চোখ মুখ নিজ থেকে শক্ত হয়ে এলো।কপালের শিরা গুলো আপনাআপনি ফুলেফেঁপে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো।চোয়াল শক্ত করে দাঁত চেপে রাখায় তাকে দেখালো আগের চেয়েও কঠোর।সে দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত মুখে বলল,’অরুনিমার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার।বউ সে আমার।বউ মানে বুঝিস?’
‘তো?আমার ঘরে আসার সাথে তোমার বিয়ের কি সম্পর্ক?’
অভি সোজা হয়ে বসল।মুষ্টিবদ্ধ হাত সহসা শিথিল হয়ে এলো।দৃষ্টিজুড়ে নেমে এলো শীতল ভাব।এক পর্যায়ে তুষারখন্ডের মতো শীতল হয়ে বলল,’আমার ঘরে আমি আর অরুনিমা ছাড়া কেউ আসুক,সেটা আমার পছন্দ না।তুই যা এখান থেকে।আর শোন,অরুনিমার সামনে আর কখনো এমন ছ্যাচড়া আচরণ করবি না।আমি কিন্তু এখনো সেই আগের মতোই চড় মারতে জানি।আমাকে ক্ষেপাস না।যাহ্,সর।’
সৃজনী ব্যাকুল হয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।একটানে তার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হু হু করে উঠে বলল,’তুমি ইচ্ছে করে আমায় শাস্তি দিচ্ছো।কেন তুমি সবসময় আমার সাথে এমন করো?’
অভি এক ঝাড়ায় হাত ছাড়িয়ে নিল।দাঁত কিড়মিড় করে অগ্নিচোখে সৃজনীর মুখটা দেখে প্রচন্ড তিরিক্ষি স্বরে বলল,’তোর সাথে কি করবো আমি?তুই কে?তুই আমার কেউ না।’
‘মিথ্যে কথা।’
‘তোর যা ভাবার ভাব।’
‘তুমি কি বাড়ি ফিরে আমায় খুঁজতে না?’
‘ভুল হয়েছে আমার।বোন ভাবতাম।ভাবতাম,তুই আমার কথা ভাবিস।’
‘তুমি আমাকে শাস্তি দিতে অরুনিমাকে বিয়ে করেছো।’
সৃজনীর কন্ঠ জমে এলো।অরুনিমা টের পেল না,এক ফোঁটা অশ্রু অনেক আগেই তার গাল বেয়ে নেমে এসেছে।সে মুখে হাত চেপে নিঃশব্দে এক পা এগোলো।কতোদিন পর আজ তার বুক ভাঙছে!
অভি অতিশয় ঠান্ডা সুরে বলল,’তোকে কেন শাস্তি দিব?তুই কে?’
‘আমি তোমার কেউ না?’
‘নাহ্।’
অভি মাথা তুলল।প্রচন্ড বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,’তোকে এর আগেও বলেছি,এখনও বলছি।আমার আশেপাশে কম আসবি।আমার বিয়ে হয়েছে।পুতুল পুতুল বিয়ে না।সত্যিকারের বিয়ে।তুই কি বুঝিস না কিছুই?’
‘বুঝি তো।’
‘তাহলে?
যা সৃজনী।আমার ভালো লাগছে না।’
কথা শেষ হতেই সে পুনরায় মাথার উপর বালিশ চেপে উপুড় হয়ে শুয়ে গেল।সৃজনী কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে শেষে ভঙ্গুর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো।অরুনিমা আরো আগেই সরে গিয়েছিল।সে আড়াল থেকে সৃজনীর প্রস্থান দেখল।হামাদের আসলে পানির প্রয়োজন ছিল না।হামাদের প্রয়োজন ছিলো সৃজনীর সাথে একা একা কথা বলার।এজন্যই সে অরুকে ঘর থেকে বের করেছে।
অরুনিমার আজ হঠাৎ ছোটো বেলার মতো কান্না পেল।একটু আগে সৃজনী যেমন করে কাঁদলো,ঠিক ঐভাবে।সে নাক টানতে টানতে নিচতলায় নেমে এলো।মন চাইছে নিরু আপাকে ফোন দিয়ে সবটা খুলে বলতে।কিন্তু বলতে গেলেও সে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদেই যাবে।কতো বাজে দেখাবে তখন!
সৃজনী বলল,হামাদ নাকি সৃজনী কে কষ্ট দিতে অরু কে বিয়ে করেছে।অথচ সেই বিবাহিত জীবন কে অরুনিমা গ্রহণ করেছে হাসিমুখে।হামাদ কে সে কোনো ‘কিন্তুর’ ভেতর ফেলে পছন্দ করেনি।অথচ হামাদ তাকে বিয়ে করেছে সৃজনীকে কষ্ট দিতে।এই পুরো ঘটনায় অরুনিমা কোথায়?
অরুনিমা বসার ঘরের এক কোণায় হাঁটু গেড়ে বসল।মাথাটা হাঁটুতে গুজে সে সত্যিই ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলল আচমকা।সেই কান্না শব্দহীন।সেই যন্ত্রনা বর্ণনাহীন।উপলব্ধি করা যায়,কিন্তু মেপে দেখানো যায় না।
.
.
.
.
এহতেশাম সেদিন দুপুরের দিকে ডাক থেকে চিঠি তুলল।অন্যান্য দিন সে চিঠি পড়তো রাতে,অথবা দুই একদিন পরে।আজ অবসর থাকায় হাতে পাওয়ামাত্র সেটা পড়ে নিল।পড়তে গিয়ে কখনো তার চোয়াল শক্ত হয়েছে,কখনো তার রাগ উঠেছে।কখনো সহানুভূতি জেগেছে,কখনো বা সে মনের অগোচরে হেসে ফেলেছে।
আশিক ছিলো তার থেকে একটু দূরে।তারা তার জিপ গাড়ি দিয়ে কিছু সময়ের জন্য ক্যাম্প থেকে বেরিয়েছে।তাদের পরনে সিভিল ড্রেস।
আশিক একটু দূরে গিয়ে ফোনে কথা বলছিল।কেয়ার সাথে আজ অনেকদিন পর তার ফোনালাপ।ফোনটা হাতে পেতেই কানে চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,’কেয়া! কেমন আছো?’
এহতেশাম পুরো চিঠি পড়া শেষ করল।তারপর আস্তেধীরে সেটা ভাঁজ করে খামে পুরল।পকেটে থাকা সেলফোনটা বের করে তৎক্ষনাৎ ডায়াল করলো একটি নম্বরে।
জাহানারা বেগম আধশোয়া হয়ে তাসবিহ পড়ছিলেন।ক্রিং ক্রিং শব্দে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই তিনি সতর্ক ভঙ্গিতে এদিকে সেদিক তাকালেন।ফোনটা তার নাগালের বাইরে,আলমারির পাশে থাকা দুই তাকের আসবাবের উপর রাখা।তিনি গলা ছেড়ে ডাকলেন,’হৃদি! এ্যাই হৃদি! এখানে আয়।’
হৃদিতা ঘরে এসেই কপাল কুঁচকালো।
‘কি হয়েছে?’
‘এদিকে আয়।’
হৃদিতা ভেতরে এলো।জাহানারা বললেন,’দেখ তো কার ফোন।’
হৃদিতা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে ভাসা নম্বরটা দেখতেই চোখ বড় বড় করে তাকালো।ভীষণ উৎফুল্ল স্বরে বলল,’দাদুমণি! এহতেশাম ভাইজানের ফোন।’
জাহানারা নিজেও খুব চমকালেন।অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে বললেন,’দে তো।তাড়াতাড়ি দে।’
হৃদি ফোন তুলে দাদির কান বরাবর চেপে ধরলো।জাহানারা ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে আদুরে স্বরে বললেন,’নানুমণি! কেমন আছো তুমি?’
‘আসসালামু আলাইকুম নানুমণি।’
‘ওয়ালাইকুমুস সালাম।’
‘আমি ভালো আছি।তোমরা কেমন আছো?’
‘আমি ভালো আছি।কিন্তু কাল থেকে কোমরে ব্যথা।উঠতে পারি না,বইতে পারি না।সৃজু এলো সকাল সকাল।সে আর হৃদি মিলেই ধইরে ধইরে নামায়।মাঝে মাঝে অভির বউটাও আসে।’
‘ওহ্।’
এহতেশাম কথায় কথায় বলল,’শুনলাম তুমি নাকি আজকাল ঘটকালি শুরু করেছো?’
জাহানারা থতমত খেলেন।চমকে গিয়ে বললেন,’কি করছি?’
‘ঘটকালি।মানুষ চাওয়ার আগেই নাকি তার জন্য পাত্র এনে হাজির করছো?’
জাহানারা অবাক হয়ে বললেন,’এই কাজ কখন করলাম?’
এহতেশাম জবাব দিলো না।জাহানারা নিজ থেকেই মনে করার চেষ্টা করলেন।কিছু একটা মনে পড়তেই দ্রুত মাথা নেড়ে বললেন,’ওহহ হ্যাঁ।মনে পড়ছে।ঐ অরুনিমার বড় বোন আছে না?নিরুপমা নাম।তোর আহাম্মক মামু যার সাথে আমার অভির বিয়ে দিতে চেয়েছিল।তার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছিলাম।তুমি তো মনে হয় ভালো মতো দেখো নি তাকে।দেখতে মেলা সুন্দর।যদিও আমার দাদুভাইয়ের বিবি হিসেবে আমি তাকে জীবনেও মেনে নিতাম না।ঐ বিয়ে….’
‘ঐ লোকের বয়স কতো?’
জাহানারা কে মাঝ পথে থামিয়েই প্রশ্ন করলো এহতেশাম।জাহানারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন,’কোন লোক?’
‘যার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে।’
‘বেশি না।আটচল্লিশ উনপঞ্চাশ এমন।’
এহতেশাম দাঁত কটমট করে বলল,’আর নিরুপমার বয়স কতো?’
জাহানারা কপাল চুলকালেন।
‘সেটা তো জানি না।হবে আরকি তেইশ চব্বিশ।’
‘তেইশ বছরের একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে তুমি আটচল্লিশ বছরের আধবুড়োর বিয়ের প্রস্তাব এনেছো নানুমণি?তোমার কি মতিভ্রম হয়েছে?’
জাহানারা তাজ্জব হলেন।চোখ গোল গোল করে বললেন,’এতো কই ব্যবধান?তোর নানার সাথে আমার বিশ বছরের ব্যবধান ছিলো।’
‘তোমার যুগ চলে গেছে।সেই কথা ছাড়ো।’
জাহানারা আফসোস করে বললেন,’ছাড়তেই তো হবে।বিয়েটা আর হলো কোথায়?ঐ লোকের ছেলে মেয়েরা মেয়ের বয়স শুনেই নাক ছিটকে সরে এলো।বলে,অতো ছোট মেয়ের সাথে নাকি বিয়ে দিবে না বাপের।কি যুগ আইলো! ছেলে মেয়েই বাপের জন্য বউ খোঁজে।ছেলেমেয়েই আবার প্রস্তাব ফিরায় দেয়।’
এহতেশাম গম্ভীর হয়ে দু’টো শ্বাস ফেলল।এরপর সোজা হয়ে বলল,’বয়স তো কম হয়নি নানু।দয়া করে যেচে পড়ে মানুষের বদদোয়া নিও না।কবরে কীভাবে থাকবা ঐ হিসেব করো।’
জাহানারা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন,’তুমি এখনই আমারে কবরে পাঠায় দিবা?’
এহতেশাম হাসল।
‘আমি তোমাকে কবরে পাঠানোর কে?কিন্তু শোনো,মানুষের জীবন নিয়ে মাথা কম ঘামাবে।দেখবে,গালি কয়েকটা কম খাবে।নিজেকে নিয়ে ভাবো।’
‘আমি কি কোনো অন্যায় করছি?একটা ডিভোর্সি মাইয়ার বিয়ে দিতে চাইছি।এটা অন্যায়?’
‘ডিভোর্সি মেয়ে কি তোমাকে বলেছে যে তার বিয়ে খুঁজে দিতে?আগ বাড়িয়ে এতো উপকার করতে যাও কেন?যদি কেউ উপকারের জন্য বলে না থাকে,তাহলে যেচে পড়ে উপকার করতে চাওয়া একটা অন্যায়।এতো লাইফলেস কেন তোমরা?নিজের চরকায় তেল দাও না।দুনিয়ার সব ডিভোর্সি মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব তুমি নিয়েছো নাকি?’
‘এমন করে বলছিস! নিয়ত তো আমার ভালোই ছিলো।মেয়েটা পরীর মতোন সুন্দর।আমার ঘরে পা রাখতেই ঘরটা আলো হয়ে গেছে।দুই বোনই আগুন সুন্দর।ভাবলাম মেয়েটার জীবন গুছিয়ে দেই।বিনিময়ে পরকালে উত্তম প্রতিদান পাবো।’
এহতেশাম হাসল।বিদ্রুপের সুরে বলল,’বাহ! কতো পূণ্যের কাজ করছো তুমি! বাচ্চা একটা মেয়ের সাথে তার মতামত না নিয়েই একটা আধবুড়োর বিয়ে ঠিক করে দিয়েছো।এরপর থেকে পূণ্য একটু কম করো কেমন?’
জাহানারা মন খারাপ করলেন।হঠাৎই আবার কিছু মনে পড়তে বললেন,’তুমি কেমন করে জানলে আমি যে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এনেছি?’
এহতেশাম আবারো হাসল।বলল,’দূরে থাকি বলে ভেবো না যে কিছু জানি না।বহুত কিছুই জানি।তোমার আদরের নাতির খোঁজও রাখি।স্ক্রাউন্ড্রেল একটা!’
জাহানারা চুপ হয়ে গেলেন।এহতেশাম বলল,’রাখছি।ক্যাম্পে ফিরতে হবে।একটু বেরিয়েছিলাম।তাই ফোন দিলাম।ভালো থেকো।’
ফোন কেটেই সে পুনরায় অন্য কোথাও ডায়াল করল।কলটা রিসিভ হতেই পুরু স্বরে বলল,’কি অবস্থা গিয়াস?ঐ বেকারটার আপডেট কি?এখনো বউ নিয়ে সিনেমা দেখে নাকি?জবলেস বাউন্ডুলে!’
‘নাহ্ উস্তাদ।সাথে সমান তালে মারপিটও করে।সেদিনই দেখলাম দিঘির পাড়ের রফিককে পিটিয়ে মাথা মুন্ডু ফাটিয়ে দিয়েছে।’
এহতেশাম মৃদু হেসে বলল,’গ্রেট! তার ব্যাপারে ঐসব শুনতেই ভালো লাগে। বিয়ে করে সে সংসারী হয়ে যাবে,এটা আমার এমনিতেও বিশ্বাস হয় না।খামোখা বাচ্চা মেয়েটার জীবন নষ্ট।’
গিয়াস বলল,’উস্তাদ! মেয়েটা তো বর বলতে অন্ধ।বর যদি ডানে যায়,সেও ডানে।বর বামে গেলে সেও বামে।’
‘স্বাভাবিক।বাচ্চা মেয়ে।অতো বুঝ আছে নাকি?’
এহতেশাম থামলো।ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,’একটু চোখে চোখে রাখিস তো গিয়াস।এর উপর আমার ভরসা কম।তার মুখের চেয়ে বেশি হাত চলে।’
.
.
.
.
অভি বাড়ি ফিরল রাত করে।আকাশে তখন দু’টো তারা বাদে আর কোনো নক্ষত্র দেখা যাচ্ছিল না।সে বেরিয়েছিল সন্ধ্যার দিকে।অরুনিমার সাথে তার সকালের পর আর দেখা হয় নি।
সে ঘরে আসতেই দেখল পুরো ঘর অন্ধকার।বাতি নিভিয়ে ঘরের ঘুটঘুটে ভাব আরো বাড়ানো হয়েছে।অভি অনুমানে বাতি জ্বালায়।দেখে অরুনিমা একপাশ হয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে।অভি একবার তার দিকে তাকালো।সে বালিশের সাথে মুখ চেপে স্থবির হয়ে শুয়েছিল।মনে হলো অভির আগমন টের পেতেই সে নিজেকে আরো কিছুটা গুটিয়ে নিল।
অভি গিয়ে খাটের এক মাথায় বসল।ভারি গলায় বলল,’রাতে খেয়েছো অরুনিমা?’
সে কোনো উত্তর দিলো না।অভি ঘাড়ের পেছনে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,’জেগে আছো বুঝতে পারছি।এখন বলো ঘটনা কি?’
অরুনিমা মাথা তুলে না।মিনমিন করে ভাঙা গলায় কিছু একটা বলে।অভি শুনতে পেলেও কথার মানে কিছু বুঝল না।উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’ছাদে যাচ্ছি।বলতে চাইলে এখন বলতে পারো।না বললে নাই।’
অরুনিমা দ্রুত চোখ মেলে।ঘাড় ঘুরিয়ে অভিকে দেখে জড়ানো স্বরে বলে,’আমার আজকে মন খারাপ।’
‘সে তো সাতদিনে চারদিনই তোমার মন খারাপ থাকে।’
‘আজ একটু বেশি খারাপ।’
অরু উঠে বসল।চোখ মুছে বলল,’তুমি আমাকে একটুও পছন্দ করো না?’
‘জানি না।’
‘আর সৃজনীকে?’
অভি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালো।কপাল কুঁচকে বলল,’মানে?’
‘সৃজনীকে তুমি পছন্দ করো না?’
‘করি তো।আমার বোন সে।অপছন্দ কেন করবো?’
অরুনিমা নাক টানতে টানতে বলল,’বোন বলে না।অন্য হিসেবে।’
‘অন্য হিসেব টা কি?’
অরু হুট করেই অভির হাতটা তার মাথায় তুলে বলল,’আমার কসম দিয়ে বলো,তোমাদের দু’জনের ভেতর কিছু নেই।’
অভি এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল।বিরক্ত হয়ে বলল,’সিরিয়াল দেখে তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।আল্লাহ ছাড়া কারো কসম কাটা যায় না।’
‘তাহলে আল্লাহর কসম কাটো।’
‘সেটাও প্রয়োজনে কাটতে হয়।তোমার এই ফালতু কাজে আমি কসম কাটতে পারবো না।’
‘তোমার এটা ফালতু মনে হচ্ছে?আমি কষ্টে মরে যাচ্ছি।আর তোমার সেটা ফালতু মনে হয়?’
অভি দু’চোখ সরু করে বলল,’তুমি কষ্টে মরে যাচ্ছো?’
‘হুম।’
‘কেন?’
অরুনিমা দুই হাতে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে নাক ডলতে ডলতে বলল,’আমি আজ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তোমাদের কথা শুনেছি।’
‘এখন তো তোমায় চড় দেওয়া ফরজ হয়ে গেল দেখছি।’
অরুনিমা হেঁচকি তুলে বলল,’সৃজনীই তোমার পারু।তাই না?’
অভি উত্তর করল না।অরু নিজ থেকেই বলল,’সে তোমায় পছন্দ করে?’
‘জানি না।আমি তার মনে ঢুকি নি।’
‘তুমি তাকে পছন্দ করো?’
অভি একবার গলা খাকারি দিলো।জলদগম্ভীর স্বরে জবাব দিলো,’বোন হিসেবে প্রশ্ন করলে বলব,হুম করি।অন্যথায় না।’
‘কসম তো?’
‘আবার এক কথা।’
অরু মাথা তুলে বলল,’আর আমাকে?আমাকে পছন্দ করো না তুমি?’
‘নাহ্।’
‘অরুনিমা ঠোঁট ভেঙে বলল,’কেন?’
‘কারণ তুমি খুব জ্বালাও আমাকে।’
অরু তার কান্না থামালো।হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,’আমি আর কখনো তোমার সাথে কথা বলবো না।’
‘আচ্ছা বলো না।’
অরু আচমকা অভির একটা হাত নিজের হাতে নিল।তারপর সেই হাতটা তার বুকের বা পাশে একটু খানি উপরে চেপে ধরে বলল,’দেখো।কি জোরে ধুকধুক করছে দেখেছো?তুমি যদি এই মুহূর্তে না বলো যে তুমি আমায় পছন্দ করো,তাহলে কিন্তু আমি এখানেই মরে যাবো।’
অভি তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালো।হঠাৎই তার মুখে বক্র হাসি ফুটে উঠল।সে ঝুকল।অরুর কানের কাছে এসে চাপা স্বরে বলল,
‘ঠিক আছে যাও।প্রাণ ভিক্ষা দিলাম তোমাকে।
-আমি তোমায় পছন্দ করি অরুনিমা।যতোখানি পছন্দে তোমার সামান্যতম মনঃকষ্টও আমার সহ্য হয় না,ঠিক অতোখানি পছন্দ।আরেকটা কথা,সৃজনীর সাথে আমার কোনোকালেই কিছু ছিলো না।আমি ওসব কিছুমিছুর মানুষ না।হৃদি আর হাশিম তার প্রমাণ।প্রয়োজনে জিজ্ঞেস করে নিও।’
চলবে-
#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
২৫.[প্রথম অংশ]
‘স্টুডেন্ট নেইম?’
‘অরুনিমা রহমান।’
‘ইন ইংলিশ?’
‘Arunima Rahman.’
‘কোন ডিপার্টমেন্ট?’
অভি পেছন ফিরল।জানতে চাইলো,’এ্যাই তোমার বিভাগ কি?’
অরুনিমা বাধ্য মেয়ে হয়ে জবাব দিলো,’সমাজবিজ্ঞান।’
অভি সামনে ফিরে বলল,’সমাজবিজ্ঞান।’
‘রোল?’
‘অরুনিমা! রোল বলো।’
অরু গালের নিচে হাত রেখে রোল ভাবছিল।অভি চোখ মুখ শক্ত করে বলল,’দরজা ধরে দাঁড়িয়ে না থেকে এদিকে এসে বসো।’
অরুনিমা গুটি গুটি পায়ে সামনে এলো।আজ তারা তার ভার্সিটি এসেছে।আজ অরুনিমার দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির দিন।গত কয়েকদিন ধরে নিরুপমা অভিকে ফোন দিয়ে বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে।আজ সকালেই তারা দু’জন ভার্সিটির অফিসে এসেছে নতুন বর্ষে ভর্তির জন্য।
অরু মাথা চুলকে বলল,’তোমার ফোনটা একটু দাও হামাদ।’
অভি ভ্রুকুটি করল।
‘কেন?’
‘উহু।দাও না।’
অভির ফোন টা হাতে পেতেই অরুনিমা দ্রুত নিরুপমা কে ফোন দিলো।নিরুপমা ফোন ধরতেই অরু তাড়াহুড়ো করে বলল,’আপা! আমার রোলটা জানি কতো?উনিশ আঠারো নব্বই নাকি উনিশ নব্বই আঠারো?’
নিরুপমা সহজ গলায় বলল,’উনিশ আঠারো নব্বই।’
‘ওহহ থ্যাঙ্কু।’
‘তোরা কি গিয়েছিস ভর্তি হতে?’
‘হ্যাঁ।হামাদ নিয়ে এলো।’
‘আচ্ছা।কাজ শেষে আপাকে একটা ফোন দিয়ে জানাস।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
অরুনিমা ফোন কাটলো।অভির দিকে ফিরে বলল,’উনিশ আঠারো নব্বই।’
অভি অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকালো।তারপর কোনো কথা না বলে ফর্মটা হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলালো।অরুনিমা চেয়ারে বসে হালকা হালকা পা দোলাচ্ছিল।অভি ফর্ম থেকে চোখ না তুলেই গম্ভীর মুখে বলল,’অরুনিমা!’
‘হুম।’
‘চুপ হয়ে বসো।এতো নড়ছ কেন?’
অরু কিছু সময়ের জন্য পা দোলানো বন্ধ করলো।টেবিলের অন্য পাশে বসা অফিস সহকারী কয়েকবার আড়চোখে তার দিকে তাকালো।অভি ফর্মটা পূরণ করে তার নিকট এগিয়ে দিতেই তিনি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে জিজ্ঞেস করলেন,’আপনি অরুনিমার কি হন?’
অভির কষ্ট করে জবাব দিতে হয় নি।তার আগেই অরুনিমা নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে জবাব দিলো,’হাসবেন্ড।সে আমার বর।’
‘ওহ সরি।টাইটেল দেখে বুঝতে পারি নি।আপনার বাবার নাম তো সিদ্দিক রহমান।’
অরু উপরনিচ মাথা নাড়ল।পাশ ফিরে অভিকে দেখিয়ে বলল,
ওর নাম হামাদ।হামাদ শিকদার।সেই হিসেবে বিয়ের পর আমার হওয়ার কথা ছিলো অরুনিমা শিকদার।কিন্তু সে বলল,মেয়েরা নাকি স্বামীর উপাধি নিতে পারে না।তাহলে হাশরের ময়দানে সে তার বরের বউ না হয়ে বরের মেয়ে হয়ে যাবে।হিহিহি।’
অভি কটমট চোখে তার দিকে তাকাল।একহাতে তার হাতের কবজি চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,’মুখটা এবার বন্ধ করো অরুনিমা।যা জানতে চেয়েছে,শুধু সেটাই বলো।’
অরুনিমা জিভ কাটে।হড়বড় করে বলে,’আচ্ছা আচ্ছা।সরি।’
দু’জন সব কাজ শেষ করে আধঘন্টার মধ্যে বেরিয়ে এলো।অরুনিমা অভির সাথে পা মেলাতে পারছিল না।অভি হাঁটে রিকশার গতিতে।তার পাশাপাশি হাঁটার জন্য অরুনিমাকে রীতিমতো দৌড়াতে হয়।সে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,’হামাদ! এ্যাই হামাদ!’
‘কি?’
‘অফিসের ঐ মহিলা টা কিন্তু খুব বদ।’
‘ওহ্।’
‘তোমায় দেখে অনেক ভালো ব্যবহার করলো।’
‘কেন?’
‘ঐ যে।শিকদারদের ছেলে।তার উপর তোমার যা চেহারা! বাপরে বাপ! ‘
অভি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো।অতিশয় শান্ত চাহনি।অরুনিমা সাথে সাথে নিজেকে শুধরে নিল।বলল,’আরে! চেহারা সুন্দর তো।কিন্তু কেমন যে বানিয়ে রেখেছো নিজেকে!’
‘আমি এমনই।’
‘এমনই ভালো।’
অরুনিমা বলল,’আমি মনে মনে কল্পনা করেছি।এই চুল আর দাড়ি ছাটলে তোমাকে ভীষণ সুন্দর দেখাবে।তুমি তো আমার কথা শুনো না।একবার এই কাজ করে দেখো।দেখবে সব হা করে তোমায় দেখছে।’
‘আমি চাইছি না সব হা করে আমায় দেখুক।’
অভি বাইকে বসেই হেলমেট টা অরুর দিকে বাড়িয়ে দিলো।অরু বলল,’তুমি বেঁধে দাও।আমি পারি না।’
‘পারবো না।হেলমেট না পরেই থাকো।’
‘উহু।এমন করো কেন?’
অভি পেছন ফিরল।বিরক্ত মেজাজে তাকে হেলমেট পড়াতে পড়াতে বলল,’তোমাকে মাঝে মাঝে আমার অসহ্য লাগে।’
অরুনিমা সে কথা পাত্তা দিলো না।বলল,’হামাদ! শুনো না।তুমি আমাকে একটা টাচ মোবাইল কিনে দিতে পারবে?বাটন না কিন্তু।টাচ মোবাইল কিনে দিতে হবে।’
‘কেন?তোমার কি কাজ টাচ মোবাইলে?’
‘সবাই কি সুন্দর হাতে নিয়ে নিয়ে ঘুরে! আমারও তো ইচ্ছে করে বলো।’
অভি হেন্ডেলবারে হাত চেপে বলল,’তোমার সিনেমার নায়ক গুলো কে বলো কিনে দিতে।’
অরু ফিক করে হেসে দিলো।বাইক স্টার্ট হতেই পেছন থেকে দুই হাতে শক্ত করে অভিকে জড়িয়ে ধরল।অভি গা ঝাড়া দিয়ে বলল,’এক হাতে ধরো।রাস্তাঘাটে এমন করে ধরো কেন?বিরক্ত লাগে।’
অরু বলল,’এভাবে ধরতে ভালো লাগে।নয়তো হাত পায়ে শীত লাগে।’
অভি মুখ খিঁচে বাইক চালানো তে মন দিলো।মাথায় আবার সেই মাইগ্রেনের যন্ত্রনা প্রকট হচ্ছে।বাড়ি গিয়ে কিছুক্ষণ হাত পা ছেড়ে শুয়ে থাকতে হবে।
অরুনিমা হঠাৎই ভীষণ চঞ্চল হলো।মাথা তুলে সামনে কোথাও দেখতে দেখতে চঞ্চল হয়ে বলল,’হামাদ! হামাদ! ঐ দেখো।জগলু আর একটা মেয়ে।দেখো,দেখো।’
.
.
.
.
জগলু গিয়েছিল নিউমার্কেট।টুকটাক সদাইয়ের জন্য।কিন্তু তেমন কিছুই পছন্দ হয় নি।পরশু আবার আসতে হবে।সেখান থেকে বেরিয়ে সে একটা দোকানে গিয়ে চা খেলো।তারপর কিছুক্ষণ ভবঘুরে হয়ে হাঁটাহাঁটি করলো।শীতের এই ঠান্ডা আমাজে হাঁটাহাঁটি করতে বেশ লাগে।তার হাতে আজ অফুরন্ত সময়।
হঠাৎই মানুষের কোলাহলে তার ধ্যান ভাঙল।সে দুই দিকে মাথা নেড়ে আওয়াজের উৎস খোঁজার চেষ্টা করল।আওয়াজের উৎস রাস্তার অন্য পাশ।সেখানে অনেকগুলো মানুষ জট পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জগলু কৌতূহলী হয়ে রাস্তা পার হলো।একটু তাক ঝাক দিয়ে জটলার রহস্য বের করার চেষ্টা করল।শেষে একজন কি জিজ্ঞেস করল,’ভাই! ঘটনা কি?’
‘ছিনতাই কেস ভাই।এই আফার ব্যাগ টান দিয়ে আফারে ধাক্কা দিয়ে ফালায় দিসে।’
জগলু অবাক হলো।
‘ব্যাগ টানলো বুঝলাম।কিন্তু ধাক্কা দিলো কেন?’
‘আফা তো একটানে ব্যাগ দেয় নাই।উল্টা ছিনতাইকারী রে ধইরা চড় দিসে।’
‘সাংঘাতিক! এরপর?’
‘এরপর আর কি?ছিনতাইকারী ছিলো বাইকে।দিসে এক ধাক্কা।পুরা ঘটনা চোখের পাতা ফেলার আগেই ঘটে গেছে।’
জগলু চোখ বড় বড় করে বলল,’বাপরে! পুরাই মারকাটারি মেয়ে মানুষ দেখছি।’
সে আরো বেশি আগ্রহ নিয়ে ভেতরে উঁকি দিলো।মেয়েটা রাস্তায় বসেছিল।হাত পা কেটে গেছে সামান্য।একটা মাঝবয়সী মহিলা তার গা ঝেড়ে দিচ্ছিল।সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,’কতো বড়ো সাহস! কতো বড়ো বোয়াদব! দিনে দুপুরে ছিনতাই করে।থাপ্পড় মেরে সব ক’টাকে সোজা করে দিব।চেনে না আমায়।’
পাশ থেকে এক লোক বলল,’আগে আপনি উঠে বসেন আপা।তারপর যা করার করবেন।’
সে অগ্নিচোখে মাথা তুলল।সেই চোখে শুধু রাগ আর তেজ।অথচ পথচারীদের ভীড়ে মিশে থাকা একজন কে দেখে আপনাআপনি তার মুখ শিথিল হয়ে এলো।
জগলু আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘মিতা! আপনি?’
একজন প্রশ্ন করল,’আপনি তাকে চিনেন?’
জগলু মাথা নাড়ে।ছোট করে বলে,’জ্বী।’
সুচিস্মিতা তাকে দেখেই হাঁফ ছাড়ল।হাত বাড়িয়ে বলল,’জুহায়ের! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন কি?টেনে তুলুন আমায়।’
জুহায়ের হাত বাড়ায়।সুচিস্মিতা সেই হাত চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালো।স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলল,’যাক।কাউকে তো পেলাম।’
সে চারদিক দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,’আপনারা যান তো।আমরা নিজেরাই বাড়ি যেতে পারব।আপনাদের সময় নষ্ট করার জন্য দুঃখিত।’
ভীড়টা ধীরে ধীরে কমে এলো।জগলু এক হাত বুকে চেপে বলল,’সাংঘাতিক ব্যাপার! সাংবাদিক ম্যাডামকে ছিনতাই করে নিল।’
সুচিস্মিতা শব্দ করে হাসে।
‘এখনো বড় সাংবাদিক হইনি তো।একবার হয়ে নিতে দিন।এরপর টিভিতে নিউজ করে হলেও খুঁজে বের করব।এরা আমায় চিনে নি এখনো।’
‘বাপরে! তো এখন?এখন কি হবে?’
সুচিস্মিতার হাতটা তখনও তার হাতের মুঠোয়।সুচিস্মিতা খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটু এগিয়ে এসে বলল,’জুহায়ের! আপনার কাছে টাকা আছে?’
‘জ্বী কিছুটা।’
‘আমায় হোস্টেল অব্দি পৌঁছে দিতে পারবেন?’
জগলু আন্তরিক হয়ে বলল,’জ্বী।অবশ্যই।’
জগলু একটা রিকশা ডাকলো।সুচিস্মিতা নরম গলায় বলল,’আমার কিন্তু উঠতে সময় লাগবে।’
‘সমস্যা নেই।আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত আছি।’
সে চোখ বাঁকা করে পাশে তাকায়।ভ্রু কুঁচকে বলে,’এই মিষ্টি আচরণ কি আপনি সবার সাথেই করেন?’
‘আসতাগফিরুল্লাহ।এই আপনার হাত ধরার আগে আমি কোনো মেয়ে মানুষের হাত ধরি নাই।’
সুচিস্মিতা চোখা চোখে বলল,’বাবাহ্! তাই নাকি?তো মিস্টার জুহায়ের! মেয়েদের হাত কেমন?’
জগলু হেসে ফেলল।
‘ভালোই।মন্দ না।’
রিকশা চালক প্যাডেল চাপতেই জগলু প্রশ্ন করল,’চাকরির কি হলো মিতা?পাকা হলো?’
‘উমম।ধরে নিন ৯৭ শতাংশ নিশ্চিত।বাকি তিন শতাংশ একদম লিখিতভাবে নোটিশ হাতে পেলে তবেই হবে।কিন্তু আপাতত বলা যায়,চাকরি টা হয়ে গেছে।’
‘সাবাশ! আপনার বাবা মা নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছে শুনে!’
সুচিস্মিতার হাসি মিলিয়ে গেল সহসা।অন্যমনস্ক হয়ে সামনে দেখে খুব নিচু স্বরে সে উত্তর দেয়,’জানি না।’
‘মানে?’
সুচিস্মিতা জোরপূর্বক মুখে হাসি টানলো।খুব স্বাভাবিক হয়ে বলল,’আমার মা বাবার সাথে আমার তেমন যোগাযোগ নেই জুহায়ের।’
‘সেকি! কেন?’
‘এগারো বছর আগেই তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে।তারা এখন সেপারেটেড।দু’জনই আবার বিয়ে করে নিয়েছে।তারা তাদের জীবনে ব্যস্ত।’
জগলু আঁতকে উঠা স্বরে বলল,’ডিভোর্স!’
‘হুম।’
সে আর নিজ থেকে কিছু বলে না।সুচিস্মিতা নিজেই বলল,’বাবা আর মা ডিভোর্সের পর থেকেই আলাদা।আর আমি বোর্ডিং স্কুলে।খরচ দু’জনই দিতো।অর্থের অভাব আমি তেমন একটা অনুভব করি নি কখনো।আমার মা কিন্তু একজন চিকিৎসক।আর বাবা আইনজীবী।খুব শিক্ষিত মানুষ।জীবনের সব শিক্ষাই এদের পূরণ হয়েছে।শুধু একসাথে থাকার আর মানিয়ে নেওয়ার গুন টা অর্জন হয়নি আরকি।’
বলেই সে আবারো এলোমেলো হাসল।সে সি সত্যিই হাসল?জগলু তো কেবল তার চোখের মলিনতা টুকুই দেখল।
সে বলল,’আপনি এখন হোস্টেলেই থাকেন?’
‘হুম।গার্লস হোস্টেল।ইদানিং নিজের টাকায় চলার চেষ্টা করি।বাবা তবুও মাস শেষে নিয়ম করে একটা টাকা পাঠায়।’
একটা প্রশ্ন করার জন্য মন আকুপাকু করছিল।কিন্তু জুহায়ের সেই ইচ্ছে দমন করল।কিছু বিষয়ে জানার জন্য ভেতরকার সম্পর্ক অনেক মজবুত হতে হয়।তার আর মিতার সম্পর্ক এখনো ঐ অব্দি যায় নি।সে কেবল তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,’বুঝেছি।’
মিতা বলল,’আপনার বাড়িতে কে কে আছে জুহায়ের?’
‘আমি,আমার মা,আমার ভাই আর ভাবি।’
‘বাহ! চমৎকার।ছোট পরিবার,সুখী পরিবার।’
বলেই সুচিস্মিতা হাসল।জগলু নিজেও একইভাবে হাসে।রিকশা টা নীলক্ষেতে আসতেই কিছু একটা দেখে জগলুর চোখ আটকায়।তাকে দেখামাত্র অনেকটা দূরে বাইকের পেছনে বসে থাকা মেয়েটা হাত নাড়ে।জগলুর তাকে চিনতে দুই সেকেন্ডের মতো লাগলো।চেনা মাত্রই তার আত্মা শুকিয়ে এলো।এই পাগল এখানে কি করে?
___
অরুনিমার কথা শুনতেই অভি বাইক থামাল।তারপর তার আঙুল অনুসরণ করে সামনে তাকালো।দেখল অনেক দূরের একটা রিকশায় দু’জন মানুষ বসে আছে।তাদেরকে ঝাপসা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে।অরু কেমন করে অতো দূর থেকে তাদের চিনে নিল সে জানে না।
সে বাইক থামালো।রিকশা টা তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে আসতেই সে দু’জন কে স্পষ্ট করে চিনল।মেয়েটার মুখ তার চেনা।সেদিনও দেখেছে।অরু হাত নেড়ে ডাকল,’জগলু! এই যে আমি এখানে!’
সুচিস্মিতা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।জানতে চাইলো,’সে কে?’
জুহায়ের ম্লান মুখে বলল,’সে আমার বন্ধুর বউ।আমারো বন্ধু।’
‘ভারি মিষ্টি তো কন্ঠটা!’
অরুনিমা একটানে হেলমেট খুলল।তার মুখে দুষ্টুমি ভরা হাসি।জগলু তাকে ইশারায় চোখ পাকিয়ে শাসন করল।অরু থোড়াই সে শাসন গায়ে মাখলো! সে বারকয়েক জগলু আর তার পাশের সিটে বসা মেয়েটিকে দেখলো।তারপর তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল এক করে বলল,’খুব ভালো হয়েছে মামা।জিও!!’
অভি পেছন ফিরে তাকে দেখল।তার মুখ থমথমে।কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল,’তুমি কি রাস্তার বখাটে?’
‘নাহ্।কিন্তু ছেলে হলে আমি খুব বখাটে হতাম।রাস্তায় শিষ বাজাতাম।মেয়েদের কোচিংয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম।’
বলে সে আবার রাস্তার অন্যপাশে তাকায়।জগলুদের রিকশা তাদের অতিক্রম করে একটু দূর এগিয়েছে।জগলু দ্রুত পেছন ফিরে দুই হাত এক করে কিছু একটা মিনতি করল।বিড়বিড় করে কি যেনো বললো সাথে।যার অর্থ,’প্লিজ অরু।আর কিছু বোলো না।’
অরু খিলখিলিয়ে হাসে।জবাবে কেবল দুই দিকে মাথা নাড়ে।দুই হাতের বৃদ্ধাঙুল তুলে হিশহিশিয়ে বলে,’বেস্ট অফ লাক।ভাবি পছন্দ হয়েছে খুব।’
জগলু করুণ মুখে পাশ ফিরল।তার ধারণা মিতা রেগে যাবে ভীষণ।জগলু কে খুব খারাপ ছেলে ভাববে।তারপর আর পুরো রাস্তা তার সাথে কথা বলবে না।কিন্তু এমন কিছুই হলো না।সুচিস্মিতা উল্টো শব্দ করে হাসলো।একদম প্রাণখোলা উদাম হাসি।জগলুর দিকে চোখ পড়তেই বলল,’খুব মিষ্টি তো মেয়েটা! নাম কি তার?’
‘অরুনিমা।আমরা শুধু অরু বলেই ডাকি।’
‘বাহ।নামটাও তো মিষ্টি।দেখতে এর চেয়েও মিষ্টি।’
জগলু বলল,’আপনি তার সাথে কথা বললে বুঝবেন সে আসলে কতো মিষ্টি।তখন বলবেন,আসল মিষ্টতা তার মুখে না,বরং তার কথায়।সে বাড়ি না আসলে আম্মা খুব মন খারাপ করে।এখন আর তাকে ছাড়া আমরা সিনেমা দেখি না।’
‘কি মিষ্টি!’
সুচিস্মিতা হাসল।বলল,’আপনাদের অরুর সাথে আমি দেখা করতে চাই।আমার মনে হচ্ছে তার সাথে কথা বললে আমার মন ভালো হবে।’
‘অবশ্যই দেখা করবেন।আপনি তার সাথে দেখা করতে চান,এই কথা শুনলে সে খুশিতে ভাত খাওয়া ছেড়ে দিবে।’
সুচিস্মিতা আবারো কিছুক্ষণ হাসল।সেই হাসির শব্দ মুষলধারে হওয়া বৃষ্টির ন্যায় জুহায়েরের বুকের উপর আঁছড়ে পড়লো।জুহায়েরের মন চাইল সুর তুলে গান ধরতে-
‘চমকিবে ফাগুনেরও পবণে,
বসিবে আকাশবাণী শ্রবণে।
চমকিবে ফাগুনেরও পবণে,
বসিবে আকাশবাণী শ্রবণে।
চিত্ত আকুল হবে অনুক্ষন-
অকারণ
‘দূর হতে আমি তারে সাধিব,
গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব।’
দূর হতে আমি তারে সাধিব,
গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব।’
বাঁধনবিহীন সে যে বাঁধন- অকারণ
মায়াবন বিহারীনি||
মায়াবন বিহারীনি হরিনী„
গহন স্বপন সঞ্চারীনি।
কেন তারে ধরিবারে করি পণ- অকারণ
মায়াবন বিহারীনি||
চলবে-
#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
২৫.[দ্বিতীয় অংশ]
[রিচেক নাই।অনেক ভুল আছে বানানে,টাইপিংয়ে।আপনারা নামাজে যাবেন।তাই আগেই দিলাম।]
“নীলা,
জীবন নিয়ে আপনার দর্শন খুবই আলাদা।বিশেষ করে আমার ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি আলাদা।একটা প্রশ্ন করি আপনার কাছে।আপনি বললেন,জীবন নাকি ঘোর অমানিশায় ডুবে থাকা ঘন জঙ্গল।আসলেই কি তাই?
জীবনের পাঠ একেকজনের কাছে একেক রকম।কিন্তু দিন শেষে আমাদের সমাপ্তিটা কেন যেন সুন্দরই হয়।আমার ধারণা,আপনার জীবন একটা সময় গিয়ে খুব বেশি সুন্দর হবে নীলা।সেই সুন্দর জীবনের পথে পা বাড়াতে হবে স্বয়ং আপনাকে,নিজ থেকে।আমি বড়োজোর আপনাকে সেই পথ দেখাতে পারি।চলতে হবে কিন্তু আপনাকে একা একা।
নিরুপমা রহমান,
আপনার কি মনে হয় না,আপনি প্রচন্ড দূর্বল চিত্তের একজন নারী? এখনকার মেয়েরা কি এতোটাও দূর্বল হয়?নাকি আপনি জোরপূর্বক নিজেকে অক্ষম করে রেখেছেন।কোনটা?
সম্মান জিনিসটা খুব দামি।অর্জন করে নিতে হয়।যেচে পড়ে কেউ কাউকে সম্মান করে না নীলা।আপনাকেও করবে না।সেই সম্মান আপনাকে নিজ গুণে অর্জন করতে হবে।শুধুমাত্র পৃথিবীকে দুষে আর নিজের কপালের উপর সবটা ছেড়ে দিয়ে নির্ভার হওয়া যায় না নীলা।কখনো কখনো প্রথম পদক্ষেপ টা নিজেকেই ফেলতে হয়।এরপর পর পর আরো কিছু পদক্ষেপ।এরপর দেখবেন আরো অনেকগুলো মানুষ আপনার সাথে এসে দাঁড়িয়েছে।যারা আপনারই মতো সমাজের ভয়ে ঘরে বন্দি ছিলো।কাউকে না কাউকে আগ বাড়িয়ে সামনে আসতে হয় নীলা।আপনি সেই পথিকৃৎ হয়ে উঠুন।আমি তো আছিই,আপনার প্রদীপ হয়ে।
উন্মুক্ত প্রান্তরে ছুটে গিয়ে আপনার দুঃখ বিসর্জনের দিকটি ভালো লাগলো।ছুটে যেতে পারেন।কোনো বাধা নেই।তবে আমি পাশে এসে দাঁড়ালেই আপনার দুঃখ কমে যাবে?আমি কিন্তু শুধুই পাশে দাঁড়ানোর মানুষ না।
আপনার আবদারের সাথে আমি নিজের সামান্য প্রত্যাশা যোগ করতে চাই।আমি আপনাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরতে চাই।খুব আস্তে করে।একা একা কান্না করা ভালো বিষয় না।আমি চাই আপনি আমার খুব কাছাকাছি এসে কান্না করুন।যেখান থেকে আমরা দু’জনই দু’জনের দীর্ঘশ্বাস টের পাবো।যেখান থেকে আমরা দু’জনই দু’জনের অনুভবটুকু উপলব্ধি করতে পারব।
আমি আপনার পাশে আছি নীলা।আপনি কি আপনার চারপাশে আমার অদৃশ্য অস্তিত্ব টের পাচ্ছেন না?আমি কিন্তু আপনাকে টের পাই।এই যে এই মুহূর্তে আমি লিখছি।আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার সামনে বসে আছেন।গালের নিচে হাত রেখে।তারপর খুব মন দিয়ে আমার কথা শুনছেন।তারপর একটু পর পর জড়তায়,সংকোচে মাথা নামিয়ে নিচ্ছেন।আমি কিন্তু আমার পাশে সেই সলজ্জ নীলাকে প্রায়শই টের পাই।
মিশন নিয়ে আপনাকে মোটেও ভয় দেখাচ্ছি না।আমি কেবল একটি সম্ভবনার কথা বলেছি আপনাকে।আমরা কিন্তু মিশনে যাওয়ার আগে সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে তবেই মিশনে যাই।আপনি যেহেতু আমার পত্রমিতা,তাই আপনাকে জানিয়ে গেলাম।যদি দেখেন মিশনের বহুদিন পরেও আমার আর খোঁজ নেই,তবে বুঝে নিবেন জীবন প্রদীপ নিভে গেছে।এতে আমার দুঃখ কিংবা আফসোস কিছুই নেই।আমার যাই হোক।আপনি থামবেন না।আপনার জন্য শুভকামনা।
ইতি,
মেজর মুস্তাফা
আর্মি ক্যাম্প,
রাঙামাটি।
এহতেশাম চিঠি লিখা শেষ হতেই সেটা খামে পুরল।তারপর অতি সন্তর্পণে খামের মুখ বন্ধ করল।কাল সে চিঠিটা ডাকবক্সে ফেলবে।সে উঠে দাঁড়িয়ে মুঠোফোন বের করল।আজ একটা অদ্ভুত শখ হচ্ছে।মন চাইছে একটা নম্বরে ডায়াল দিতে।নম্বরটা অনেক আগে থেকেই সংগ্রহে আছে।অথচ কখনো ফোন দেওয়া হয়নি।আজ কি আরেকটা নিয়ম ভঙ্গ করা যায় না?
এহতেশাম ঘড়িতে সময় দেখল।রাত বারোটা একান্ন।এতোক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে বোধহয়।সে পুনরায় ফোনটা পকেটে রাখলো।তারপর কিছু সময় বাদে আবার হাতে নিল।আগপাছ কিছু না ভেবে দ্রুত ডায়াল করল সেখানে।
প্রথমবার রিং হতে কেউ ধরল না।তবে দ্বিতীয়বারে কলটা রিসিভ হলো।কল রিসিভ করার পর ঐ পাশের মানুষ টা কোনো কথা বলল না।এহতেশাম নিজেও কিছু বলে নি।অনেকটা সময় পর অন্যপাশ থেকে একটা ভীতু সন্ত্রস্ত মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো।মেয়েটির উপর এহতেশামের এক জনমের মায়া।
___
চোখটা প্রায় লেগেই এসেছিল।ঠিক তখনই কর্কশ শব্দ করে মুঠোফোনটা বেজে উঠল।ঘুম ঘুম চোখে সেই শব্দ প্রচন্ড বিদঘুটে শোনালো।নিরুপমা চোখ মুখ কুঁচকে উঠে বসল।তারপর পুরোপুরি চোখ মেলে স্ক্রিনে ভাসা নম্বরটির দিকে তাকালো।
তার ঘুম পুরোপুরি উবে গেছে।সে সতর্ক চোখে নম্বরটা খেয়াল করে।পরিচিত কারো নম্বর তো মনে হচ্ছে না।অপরিচিত কেউ ই হবে।নিরুপমা আশ্চর্য হয়ে স্ক্রিন দেখে।এতো রাতে তাকে কে ফোন দিবে?রাত বারোটা একান্ন! একটা অজানা ভয় হঠাৎ তাকে জেঁকে ধরল আষ্টেপৃষ্টে।রাহাতের ফোন?
সে তো মাঝে মাঝে এই জঘন্য কাজ করে।নিরুপমা খুব ভীতু হয়ে ফোনটা রিসিভ করল।শুরুতেই কোনো কথা বলল না।যখন দেখল অন্যপাশ থেকে কোনো শব্দই কানে আসছে না,তখন ভয়ে ভয়ে বলল,’হ্যালো,আসসালামু আলাইকুম!’
ফোনের অন্যপাশ নিরব।ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে এলো।এছাড়া আর কোনো শব্দ না।নিরুপমা অনেকটা সময় ফোন কানে চেপে বসে থাকে।প্রায় পাঁচ মিনিট পর ভয়ে ভয়ে বলে,’রাহাত?’
ছয় মিনিট তেতাল্লিশ সেকেন্ড ব্যাপি চলমান কলটা চট করে কেটে গেল।নিরুপমা থতমত খেয়ে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে আনলো।এই পুরোটা সময় অন্যপাশ থেকে কোনো শব্দ আসে নি।তবুও নিরুপমার মনে হলো,ফোনটা রাগ করে কাটা হয়েছে।কিন্তু কেন?নিরু তো রাগ দেখানোর মতো কিছুই বলে নি।
এহতেশাম অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত মেজাজে ফোন কাটলো।নিরুপমার মুখে রাহাতের নাম শুনতেই মেজাজ খারাপ হলো।এই রাত বিরেতে সে তার এক্স হাসবেন্ডের নাম মুখে নিচ্ছে।অথচ একবারো তার মুস্তাফার কথা মনে হয় নি।অকারণেই রাগ আর অভিমান হলে মানুষের আর কিছুই ভালো লাগে না।এহতেশামের হলো তাই।ফোনটা কেটেই সে হনহনিয়ে নিজের তাবুর দিকে পা বাড়ালো। যেতে যেতে নীলার প্রতি তার অদৃশ্য অভিমানও প্রকট হলো।মন চাইছে এখনই আবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করতে,’এতো নাম থাকতে আপনি রাহাতের নামই কেন নিলেন?আপনি কি এখনো তার সাথে কথা বলেন?এই কথা তো আপনি কোনোদিন আমায় বলেন নি নীলা।’
.
.
.
.
অরুনিমার ক্লাস শুরু হয়েছে দুই দিন হলো।সে নিজ থেকেই যাতায়াত করে।শুধু প্রথমদিন অভি তাকে দিয়ে এসেছিল।তারপর থেকে অরু নিজেই আসা যাওয়া করে।ভার্সিটিতে একা যাওয়ার অভ্যাস তার অনেক আগে থেকেই আছে।
অভির সাথে তার সম্পর্ক ঐ এক জায়গাতেই আটকে আছে।সেখান থেকে উন্নতি কিংবা অবনতি কিছুই হয় নি।তবে একটা ব্যাপার ঘটেছে।তা হলো,অরু ইদানিং কিছুতেই সৃজনীকে সহ্য করতে পারছে না।তার ভালো খারাপ কোনো কিছুই না।সৃজনী সামনে এলেই তার রাগ উঠে।সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়।এতো রাগ অরুর জাহানারা বেগমকে দেখেও হয় না।মন চায় সৃজনীর গলা টি’পে ধরতে।হামাদের সাথে তার এতো কিসের কথা?
বিয়ের পর প্রথম প্রথম সে খুব নির্বিকার ছিলো।সে নিজেই সৃজনীকে ঠেলে ঠেলে অভির কাছাকাছি পাঠিয়েছে।কিন্তু বিয়ের দুই তিন মাস গড়াতেই অরুনিমা কেমন যেন পাল্টে গেল।তখন সে ব্যতীত অভির সান্নিধ্য পাওয়া সমস্ত মেয়ের উপর তার রাগ হতো।প্রচন্ড রকমের রাগ।সৃজনীকে পারতে সে নিজের ঘরে ঢুকতে দেয় না।মাঝে মাঝে মুখের উপর ধাম করে দরজা বন্ধ করে দেয়।অভি চুপচাপ তার কার্যকলাপ দেখে।কখনো টু শব্দ করে না।মাঝে মাঝে তাড়াহুড়ো করে অন্য দিকে ফিরে যায়।ফলস্বরূপ তার চাপা হাসি অরুনিমার আর দেখা হয় না।
সেদিন ভার্সিটি শেষে ফেরার পথে ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি নেমে এলো।এখনো বৈশাখ মাস আসে নি।শীতের শেষ সময় চলছে।এসময়ে খুব সচরাচর বৃষ্টি হয় না।শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই অরুনিমা আশ্চর্য হয়ে আকাশের দিকে তাকালো।তার কাছে ছাতা নেই।সে দ্রুত ডানে বায়ে তাকায়।আশেপাশে কোনো ছাউনি নেই।
বিনুদার দোকান আরো বিশ ত্রিশ কদম পরে।অরুনিমা হাত দু’টো মাথার উপর রেখে সেদিকে ছুটলো।সে ভেবেছিল অভিকে সেখানে পাওয়া যেতে পারে।কিন্তু অভি ছিলো না।তবে জগলু ছিলো।তাকে দেখতেই সে হাসিমুখে বলল,’কি ব্যাপার অরু?পুরোই তো ভিজে গেলে।’
অরুনিমা গা ঝেড়ে বলল,’এই অসময়ে জীবনে বৃষ্টি হতে দেখেছো?পুরাই ভিজিয়ে দিয়েছে।’
‘তোমার বর কোথায়?’
‘সেকি! আজ আসে নি তোমার এদিকে?’
‘সকালে একবার এসেছিল।তারপর আর আসে নি।আমি ভাবলাম,তোমায় হয়তো আনতে গেল।’
অরুনিমা মুখ বাঁকা করে বলল,’সে আমায় আনবে?অতো ভালো সে কবে হলো?’
সে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল।জগলু বলল,’চা খাবে?’
‘নাহ্।ইচ্ছে হচ্ছে না।’
অরুনিমা মুখভার করে বলল,’তুমি কি জানো একটা কথা?’
জগলু দু’চোখ সরু করে।
‘কি কথা?’
অরুনিমা ভারি নিঃশ্বাস ছাড়ে।ক্লান্ত হয়ে বলে,’সৃজনী সেদিন আমাদের ঘরে এলো।তারপর হামাদের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ কেঁদে দিলো।’
‘সাংঘাতিক! কান্না করলো কেন?’
‘সে বোধহয় হামাদকে পছন্দ করে।’
জগলু মনোযোগী শ্রোতার মতো তার কথা শুনে।অরু বলল,’হামাদকে সে এটাও বলেছে যে হামাদ নাকি তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমায় বিয়ে করেছে।’
‘এমনটা বলল?’
‘হুম।আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।’
জগলু সোজা হয়ে বসল।গম্ভীর গলায় বলল,’সে মিথ্যা বলেছে।সে অভিকে পছন্দ করতো।অভি কোনোদিনই তাকে ওমন চোখে দেখেনি।’
অরু মাথা নামিয়ে বলল,’আমি সেদিন রাতে খুব কেঁদেছি।তারপর গিয়ে মন হালকা হয়েছে।ইদানিং সারাদিন বাড়িতে পুলিশের মতো থাকতে হয়।সৃজনীকে কিছুতেই আমার ঘরের আশপাশ ঘেঁষতে দেই না।ভালো করেছি না বলো?’
‘খুব।এই প্রথম একটা বৃদ্ধিমানের কাজ করেছো।’
অরুনিমা হাসল।জগলু আনমনা হয়ে সামনে তাকাতেই কিছু একটা দেখল।তারপর অস্ফুটস্বরে বলল,’মিতা না?’
অরুনিমা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছন ফিরে।দেখে রাস্তার অন্যপাশে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।পরনে সাদা কুর্তি আর ডেনিম ব্লু জিনস।গলার কাছে স্কার্ফ প্যাচানো।মেয়েটাকে দেখতেই সে হাসল।বলল,’তোমার বান্ধবী এসেছে।’
জগলু তার দিকে ফিরে।হঠাৎই কিছু মনে পড়তে চোখ মুখ শক্ত করে বলল,’মেয়েটার নাম সুচিস্মিতা।আর আমার নাম জুহায়ের।ভুলেও যদি তুমি তার সামনে আমার নাম জগলু বলেছো,তাহলে এই চায়ের কাপ দিয়ে আমি তোমার মাথা ফাটাবো।’
অরু ঠোঁট টিপে হাসল।বলল,’বাবাহ্! জগলু সাহেবের কতো ডিমান্ড!’
‘চুপ।জুহায়ের বলো।জগলু না।’
সুচিস্মিতা রাস্তা পেরিয়ে তাদের সামনে এলো।অরুনিমা কে দেখামাত্রই হাসি দিয়ে বলল,’আরে! তোমার নাম অরুনিমা না?’
অরু অবাক হলো।
‘তুমি চেনো আমায়?’
‘হ্যাঁ।জুহায়ের সেদিন বলল তো।’
বলেই সে পাশে তাকায়।জগলু বলল,’অফিস থেকে এলেন?’
‘জ্বী।আজ আগে আগে কাজ শেষ।’
সুচিস্মিতা বলল,’আমি আজ চা খাবো।বৃষ্টিতে চা খেতে আমার দারুণ লাগে।’
অরু বলল,’তুমি চা খেলে আমিও খাবো।এ্যাই জগ…’
অরু থামলো।নিজেকে সংশোধন করে বলল,’জুহায়ের ভাই! আমাদের দু’জনের জন্য দু’কাপ চা দিতে বলো তো বিনু দা কে।’
সুচিস্মিতা তার পাশে এসে বসল।অরুনিমা তাকে আগাগোড়া দেখে বলল,’তুমি খুব সুন্দর আপা।’
‘তাই?’
‘হুম।’
‘তুমি এর চেয়েও বেশি সুন্দর।’
অরুনিমা তাকে আরো একবার ভালো করে দেখে।তার চুলে বেণী।চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা।গলায় আইডি কার্ড ঝুলছে।কানে সাদা পাথরের একটা কানের দুল,জ্বল জ্বল করে জ্বলছে।এক কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলছে।একহাতে ঘড়ি,অন্য হাত ফাঁকা।পরনে সাদা হিল জুতো।অরুনিমা বলল,’তোমার জামাটা সুন্দর।কিন্তু তুমি আমার পাড়ায় থাকলে এই জামা পরে বের হতে পারতে না।’
সুচিস্মিতা কপাল কুঁচকে বলল,’কেন?পাড়ার চাচি সমাজ কানাঘুঁষা করতো?’
‘হুম।ট্যারা চোখ করে তাকাতো।’
মিতা হাসল।গভীর স্বরে বলল,’তাতে আমার কিছুই হতো না।আমি এসব গায়ে মাখি না।’
সে নিজ থেকেই জানতে চাইলো,’তোমার বাড়িতে কে কে আছে অরুনিমা?’
‘আমার বাড়িতে?আমি,মা,নিরু আপা,আর তুতুন।’
‘তুতুন কে?’
অরু মুখ নামিয়ে বলল,’নিরু আপার ছেলে।’
‘বাহ্! খুব সুন্দর নাম।শুনেই আদর আদর পাচ্ছে।’
‘না,না।তুতুন তার ডাকনাম।তার ভালো নাম নিহাদ।’
‘এটা আরো সুন্দর।’
সুচিস্মিতা হাতের উপর ভর দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো।অরু তাকালো তার দিকে।জীবনে এই প্রথম সে এমন একজন মানুষের দেখা পেয়েছে যে নিরু আপার কথা শোনার পরেও আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় নি।আগ্রহ করে তার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি থাকার কারণ জানতে চায় নি।যেন এসবে তার কোনো বিশেষ আগ্রহ নেই।অরুনিমার তাকে সত্যিই খুব পছন্দ হলো।সে ছটফটে গলায় বলল,’সুচিস্মিতা আপা! তোমার কন্ঠ ভীষণ সুন্দর।’
‘তাই? তোমার কন্ঠও ভীষণ মিষ্টি।’
জগলু দুই কাপ চা হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো।সুচিস্মিতা একটা কাপ নিজের হাতে নিয়ে জগলুর দিকে তাকালো।বলল,’পরশুই পুরোপুরি ভাবে জয়েন করেছি সেখানে।এখন মাঝেমধ্যে সুযোগ পেলেই আপনাদের এই টংয়ে আসা হবে।’
জগলু মাথা নামিয়ে বলল,’জ্বী।আসবেন।’
অরুনিমা বলল,’তুমি চাকরি করো?’
‘হুম।আমি একজন জার্নালিস্ট।’
অরু ঠোঁট গোল করে বলল,’ওহ্।’
বলে আবার সে তার দিকে তাকালো।মেয়েটাকে দেখেই তার অদ্ভুত অনুভূতি হয়।মনে হয় সে বাংলাদেশে নেই।বাংলাদেশের একজন মেয়ে এমন দাপিয়ে চাকরি করে বেড়াচ্ছে,বিষয়টা খুব দুর্লভ।আজকাল শিক্ষকতা বাদে অন্যান্য পেশায় মেয়েদের খুব একটা দেখা যায় না।সাংবাদিকতায় তো আরো আগে না।
অরুনিমা বলল,’একটা কথা বলি?’
সুচিস্মিতা বড় করে একটা চুমুক দিলো চায়ের কাপে।তারপর আন্তরিক হয়ে বলল,’আরে বলো না।এতো ভয় পাচ্ছো কেন?’
‘তোমার বয়স কতো?’
‘ছাব্বিশ।’
অরু তাজ্জব হয়ে বলল,’ছাব্বিশ!
তোমার মা বাবা এখনো তোমায় বিয়ের জন্য জোরাজুরি করে না?’
সুচিস্মিতা ফিক করে হাসল।বলল,’নাহ্।তারা আমায় জোর করে না।তারা নিজেরাও দেরিতে বিয়ে করেছে।’
অরু বলল,’তোমাদের বাড়িতে কে কে আছে?’
‘আমার বাড়িতে কেউ নেই।আমি হোস্টেলে থাকি।আমার মা বাবাও আলাদা আলাদা থাকেন।তাদের অনেক আগে ডিভোর্স হয়ে গেছে।এখন তারা যার যার সংসারে ব্যস্ত।’
অরুনিমা চুপ হয়ে গেল।আর নিজ থেকে কিছু বলল না।মেয়েটা কতো অবলীলায় সবটা বলে দিলো।অথচ কথাগুলো কি এক নিঃশ্বাসে বলার মতো এতোটাই সহজ ছিলো?
সুচিস্মিতা চায়ের কাপে চুমুক দিলো।সরাসরি জগলুর দিকে দৃষ্টিপাত করে গম্ভীর হয়ে বলল,’জুহায়ের! একটু পর আমি নীলক্ষেত যাবো।বই কিনতে।আপনি কি আমার সাথে যাবেন?সেদিনের রিকশা ভ্রমণ তোলা ছিলো।আজ আপনি চাইলে আপনাকে সাথে নিতে পারি।’
জুহায়েরের মনে হলো তার পাশ দিয়ে অনেক গুলো রঙিন ডানার প্রজাপতি ডানা ঝাপ্টে উড়ে এলো।পাশে কোথাও সুন্দর করে ভায়োলিন বেজে উঠল।সেই ভায়োলিনের শব্দ দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার তার কানেই ফিরে এলো।সে অপ্রস্তুত হয়ে জবাব দিলো,’জ্বী।আমার সমস্যা নেই।’
‘তাহলে তৈরি থাকুন।আমরা বৃষ্টি পুরোপুরি থামতেই বেরিয়ে যাবো।’
.
.
.
বাড়ি এসেই অরুনিমা হাত পা ছড়িয়ে ধপ করে খাটে গিয়ে পড়লো।অভির সাথে আজ সারাদিন দেখা হয় নি।বাড়ি আসার পরই অরুনিমার তার মুখটা মনে পড়ল।সে ভাবলো,আজ অভি বাড়ি ফিরলে সে একটু মন ভরে কথা বলবে তার সাথে।
হৃদি দরজায় উঁকি দিয়ে বলল,’ময়না পাখি! আসি?’
অরুনিমা পেছন ফিরে।একগাল হেসে জবাব দেয়,’আসো আসো।তোমাকেই ভাবছিরাম।’
‘মিথ্যে কথা।তুমি শুধু অভি ভাইজানকে নিয়েই ভাবো।’
‘উহু।হামাদের পরে সবচেয়ে বেশি তোমাকে নিয়েই ভাবি।’
হৃদি বলল,’ছাদে যাবে অরু?’
‘কেন?ছাদে কি?’
‘রংধনু উঠেছে আকাশে।খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আকাশ।আমার একা যেতে ইচ্ছে করছে না।তুমি সহ চলো।’
অরু দ্রুত উঠে বসল।শরীরটা একপ্রকার টেনে তুলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’আচ্ছা।চলো।’
বাড়ির ছাদটা খুব সুন্দর।কিন্তু দেয়ালে শেওলা পড়া।বৃস্টি হলে সেই গাঢ় সবুজ শেওলা চুঁয়ে চুঁয়ে পানি পড়ে।অরুনিমা খুব সাবধানে পা ফেলে।বৃস্টির পানিতে পুরো ছাদ পিচ্ছিল হয়ে আছে।
আকাশে সত্যিই আজ রংধনু দেখা যাচ্ছে।কিন্তু মজার বাপার,অরু জীবনেও রংধনুতে সাতটা রং পায় না।হয় সাতের বেশি পায়,নয়তো সাতের কম।বেশিরভাগই পায় পাঁচটা রং।আজকেও মোট পাঁচটা রংই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
সে আকাশ দেখতে দেখতে বলল,’তোমায় একটা প্রশ্ন করবো হৃদি?’
‘হ্যাঁ।করো না।’
‘সৃজনী কি হামাদ কে নিয়ে ছোট থেকেই এমন?’
হৃদি কপাল কুঁচকে বলল,’কেমন মানে?বুঝি নি।’
‘এই যেমন হামাদের একটা কিছু হলেই সে ব্যস্ত হয়ে উঠে।সব কাজ ছেড়ে হামাদের পেছনে পড়ে থাকে।ভাব এমন যেন হামাদের যন্ত্রনায় মলম দেওয়ার দায়িত্ব শুধুমাত্র তার।’
হৃদি হাসল।ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বলল,’একদম।সৃজু ছোট থেকেই এমন।অভি ভাইজান সবসময়ই একটু চাপা স্বভাবের।ভীড়ভাট্টা এড়িয়ে চলেন।নিজের মতো থাকতে পছন্দ করেন।
আর সৃজু সবসময় তার সাথে সাথে থাকতো।সৃজুর প্রিয় ভাইজান হলো অভি ভাইজান।ভাইজানের একটু হাত কেটে গেলেই সৃজু অস্থির হয়ে উঠতো।সেই তখন থেকেই সে ভাইজানের হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতো।ভাইজানের খু’নের ঘটনার পর আমরা কেউ তার ধাঁর ঘেঁষিনি ভয়ে।কিন্তু সৃজু সেদিনও ভাইজানের ঘরে গিয়েছিল।তার গালে যেই কাটা দাগ টা আছে,সেটাতে সবার প্রথম ঔষধ সৃজনীই দিয়েছিলো।সৃজু….’
হৃদি ঠিক মতো কথাটা শেষ করতে পারলো না।তার আগেই অরুনিমা হাত উঁচিয়ে ধরে বলল,’থামো হৃদি।প্লিজ থামো।আর শুনতে চাই না।’
‘একি! তুমি এমন রেগে গেলে কেন?’
অরুনিমা আর ছাদে দাঁড়াল না।উল্টো বড় বড় শ্বাস টেনে হনহনিয়ে ছাদ থেকে বেরিয়ে গেল।হৃদি শুধু তাজ্জব হয়ে তার কার্যকলাপ দেখে।আশ্চর্য ব্যাপার! সে রেগে গেল কেন?
____
অভি বাড়ি ফিরেছে মাত্র।ঘরে এসেই পাখা ছেড়ে খাটের উপর গিয়ে বসল।আজ বৃষ্টি হওয়া স্বত্তেও আবহাওয়া ভ্যাপসা।কেমন যে গরম গরম লাগছে।
সৃজনী পানির গ্লাস হাতে তার ঘরে এলো।তারপর আস্তে করে হাত টা তার দিকে বাড়িয়ে দিলো।অভি প্রথমে তার হাতে থাকা গ্লাসটা দেখে।তারপর দেখে তার মুখ।চোখাচোখি হতেই সে বিরক্তিতে চোখ সরাল।
‘তোকে বলেছি পানি দিতে?’
‘তুমি ঘেমে আছো।’
‘তোর কি?’
‘আমার সাথে রাগ ঝাড়ো।পানির সাথে কিসের রাগ?’
‘সৃজনী! যা এখান থেকে?’
অভি পানির গ্লাস টা ঠেলে সরালো।সৃজনী আবার সেটা তার মুখের সামনে এনে ধরল।এই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটলো আরো কয়েকবার।সৃজনী বলল,
‘আমার সাথের রাগ পানির উপর মেটাচ্ছা কেন?’
অভির ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো।সে ক্রুদ্ধ হয়ে এক ঝাড়ায় সৃজনীর হাতে থাকা পানির গ্লাসটা মাটিতে ছুড়ে মারল।সৃজনী ব্যথিত চোখে সেদিকে তাকায়।অভি দু’হাতে মাথা চেপে বলল,’তোকে মানা করেছি না এসব করতে?যা তুই।আমার সামনে আসবি না খবরদার।’
সৃজনী খটখটে শুকনো চোখে তার দিকে তাকালো।তারপর আনমনে দু’টো ঢোক গিলে দু’কদম সরে এলো।সরতে গিয়েই বিপত্তি বাঁধলো।মেঝের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচের ভগ্নাংশের এক টুকরো গিয়ে গভীর ভাবে তার পায়ে চুবল।
সৃজনী ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠল।যন্ত্রনায় সমস্ত শরীর কুঁকড়ে গেল।শরীরের ভার হারিয়ে নিচে পড়ার আগেই সে কোনোরকমে খাটে গিয়ে বসল।
অভি তার পা দেখল।তারপর আবার চোখ সরিয়ে নিল।সৃজনী ব্যথাতুর স্বরে বলল,’আমি মরে গেলেও তুমি কোনোদিন আমার যন্ত্রনা বুঝবে না।’
গাঢ় লাল রঙের চটচটে তরল তার পা গড়িয়ে টুপ টুপ করে মেঝেতে পড়ছিল।অভি বলল,’দেখি পা তোল।এক টান দিবো।কাঁচ বেরিয়ে আসবে।’
সে পা তুলল।তুলে সেটা খাটের উপর রাখলো।অভি বিরক্তিতে মুখ খিঁচে কেবলই তার পা স্পর্শ করেছে,ঠিক তখনই একটা তাজ্জব হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটে গেল।
অরুনিমা কোথা থেকে হিংস্র হায়নার মতো ছুটে এসে সপাটে সৃজনীর গালে একটা চড় বসালো।সেই শব্দ দুই দফা দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।অভি হতবিহ্বল হয়ে তার দিকে তাকায়।অরুনিমার মুখে এমন কঠোরতা সে এর আগে দেখেনি।সৃজনী অবাক চোখে তার দিকে তাকাতেই সে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠল,’তোর লজ্জা শরম নাই?সারাক্ষণ আমার ঘরে এসে আমার বরের ঘাড়ের উপর পড়ে থাকিস কেন?’
চলবে-