কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-০২

0
18

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

২.

মনোয়ারা গভীর মনোযোগ দিয়ে কাঁথা সেলাই করছিলেন।নকশিকাঁথা খুব যত্নের জিনিস।সুই সুতোর বুনন নিখুঁত না হলে নকশিকাঁথার সৌন্দর্য কমে যায়।সেই সাথে দামও তেমন ভালো পাওয়া যায় না।নকশিকাঁথা সেলাই করতে হয় গভীর মনোযোগ দিয়ে,ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নিয়ে।মনোয়ারা এই কাজে দক্ষ।তার বোনা নকশিকাঁথা বেশ চওড়া দামে বেচাকেনা হয়।সারাদিন কাজ শেষে যেটুকু অবসর সময় তিনি পান,ঐ সময়টা নকশিকাঁথা বুনেই শেষ করেন।

অরুরিমা ঘরের দরজায় এসে উঁকি দেয়।আহ্লাদী সুরে ডাকে,’মা! ও মা! আসি আমি?’

মনোয়ারার সমস্ত মনোযোগ তখন তার সুঁই সুতোর দিকে।তিনি চোখ না তুলেই বললেন,’আয় কিন্তু খাটে বসবি না।তুই বড্ড নড়াচড়া করিস অরু।’

অরু ধুপধাপ পায়ে ঘরে এলো।মনোয়ারা বিরক্তিতে মুখ কোঁচকান।হাঁটার সময় পায়ে পায়ে শব্দ হলে তার বিরক্তি ধরে যায়।অরু প্রায়ই এই কাজ করে।তিনি ধবধবে সাদা কাঁথায় গাঢ় লাল সুতা দিয়ে নকশা টানতে টানতে বললেন,’আস্তে হাঁটো অরু।মেয়েদের এতো চঞ্চলতা ভালো লাগে না।’

অরু অন্যদিকে মুখ সরিয়ে ভেঙচি কাটে।তারপরই ধপ করে খাটে বসে একটানে মনোয়ারার কোল থেকে কাঁথা সরায়।তারপর চোখের পলকে মনোয়ারার কোলে মাথা রেখে নিভে আসা কন্ঠে বলে,’মা! কাঁথা পরে সেলাই করবে।এখন একটু আদর দাও।অনেকদিন তোমার আদর খাই না।’

মনোয়ারা ধমক দিতে গিয়েও আর দিলেন না।উল্টো আর্দ্র চোখে তার কোলে মাথা রাখা মেয়েটার সমস্ত মুখ দেখলেন।এই সোজা সরল আর আদুরে মুখটা দেখলেই তিনি আর কড়া গলায় কিছু বলতে পারেন না।অরু তার বড়ো আদরের মেয়ে।তাকে আদর দিতে মনোয়ারা কিংবা নিরুপমা,কেউই কার্পণ্য করে না।

অরুনিমা চোখ বুজে বলল,’মা।আমার আজকে মন অনেক খারাপ।’

মনোয়ারা তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,’কেন?কি হয়েছে?’

‘তমা আর আমার ঝগড়া হয়েছে।’

‘সেকি! কেন?’

‘সে নিরু আপাকে নিয়ে বাজে কথা বলেছে মা।’

মনোয়ারা একটু চুপ মে’রে গেলেন।কিছুক্ষণ নিরব থেকে নিচু স্বরে বললেন,’তুমি তোমার আপাকে নিয়ে সবার সামনে এতো একটা কথা বলো না অরু।তাহলে দেখবে সবার সাথে তোমার সম্পর্ক ভালো থাকবে।’

অরু মাথা তুলল সাথে সাথে।ব্যথিত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,’মা! আপাকে নিয়ে কথা বলবো না কেন?আপার কি দোষ?আমার অমন কোনো বন্ধু চাই না যে বন্ধু আমার আপাকে নিয়ে মন্দ কথা বলে।’

‘তবে আর দুঃখ করছিস কেন আমার কাছে এসে?’

‘দুঃখ করছি না।জানাতে এসেছি যে তমার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।বুঝেছো তুমি?’

মনোয়ারা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।মৃদু স্বরে বললেন,’হুম,বুঝেছি।’

অরু দীর্ঘসময় চুপচাপ শুয়ে থাকতে পারে না।মায়ের কোলে কিছুক্ষণ মাথা রেখেও সে শেষে অধৈর্য্য হয়ে উঠে এলো।তার দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হতে এখনো বেশ কিছুদিন বাকি।এখন তার পুরোপুরি অবসর সময়।অরু ঘরময় পায়চারি করে।গভীর চিন্তায় মশগুল হয়ে ভাবে ঠিক কোন কাজ করলে তার অবসর সময় ভালো কাটবে।শেষটায় ধৈর্যহারা হয়ে নিরুপমার ঘরে ছুটে যায়।তুতুনকে আদর দেওয়া ছাড়া আপাতত তার আর কোনো কাজ নেই।

সে ঘরে যেতেই দেখল নিহাদ বল হাতে খেলা করছে।তার বলের রং নীল।নীল অরুর প্রিয় রং।সে মাথা দোলাতে দোলাতে তার কাছে গেল।গিয়েই একটানে বলটা নিজের হাতে নিলো।নিহাদের ফোলা ফোলা গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,’আমিও তোর সাথে খেলবো তুতুন।আমাকেও খেলায় নে।’

তুতুন তাকে দেখতেই গালভর্তি হাসলো।এই মুখ তার খুব প্রিয়।সে এক মুহূর্ত দেরি না করে তার কোল দখল করে নেয়।অরু তাকে জাপটে ধরে বলল,’তুতুন তুই এতো নরম কেন?আমি তোকে চা’পতে চা’পতে ভর্তা করে দিবো কিন্তু।’

নিরুপমা মাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে।সে চুল মুছতে মুছতে ঠান্ডা স্বরে বলল,’তুই কাল আমার ছেলেকে চাপতে চাপতে তার দ’ম আটকে দিচ্ছিলি।যা একটু দূরে গিয়ে বোস।এতো কাছাকাছি বসবি না আমার ছেলের।আমার ভয় হয়।’

অরু সরলো না।উল্টো নিহাদকে আরো বেশি শক্ত করে চেপে ধরে বলল,’যাবো না দূরে।আরো বেশি চাপবো।তুমি ইদানিং বড্ড পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছো আপা।আমি তাকে একটু জোরে চেপে ধরলেই বকাঝকা করো।অথচ তুতুন যে সেদিন এক টানে আমার নয়টা চুল ছিঁড়ে ফেলেছিলো,তখন তো তাকে কিছু বলো নি।’

নিরুপমা কপালে হাত চেপে বলল,’কি সর্বনাশ! এইটুকু বাচ্চারও বিচার করবো এখন?’

অরুনিমা গম্ভীর হয়ে গেল হঠাৎ।আচমকাই নিরুপমার দিকে ফিরে বলল,’আপা! ও আপা! শোয়েব চাচা নাকি তোমার জন্য কিসব বিয়ের প্রস্তাব এনেছে?’

নিরুপমা দায়সারা হয়ে বলল,’হুম।এমনই কিছু শুনলাম।’

অরু আঁতকে উঠে বলল,’প্লিজ আপা।তুমি বিয়ে করো না।তুমি বিয়ে করলে আমি আর মা আবার একা হয়ে যাবো।তোমাকে আর তুতুনকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে?’

নিরুপমা ম্লান হাসলো।চুল মুছতে মুছতে উত্তর দিলো,’চিন্তা করিস না।এমনিতেও আমাকে কেউ বিয়ে করবে না।আমি চিরকাল এখানেই আছি সোনা।’

অরুনিমার ভীষণ রাগ হলো হুট করে।একটু সময় যেতেই সে বুঝল সে কারো উপর রেগে নেই।উল্টো তার অভিমান হচ্ছে,কষ্ট হচ্ছে বুকে।আপা সবসময় এভাবে কথা বলে কেন?সে চোখ মুখ শক্ত করে বলল,’তোমাকে কেউ বিয়ে করবে না কেন?এতো সুন্দর মেয়ে এই শহরে দু’টো আছে?’

নিরু হাসল।তার কথার পিঠে তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো,’হু,আছে।তুই নিজে।’

অরুর বিরক্তি আরো বাড়লো।সে উঠে গিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুট লাগায়।মা থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী,এমনকি নিরু আপা,সবার ঐ এক কথা।নিরু আপার কেন সহজে বিয়ে হবে না?আপার মতোন মিষ্টি মেয়েকে যে পাবে,তার তো জীবন এমনিতেই খুশির জোয়ারে ভেসে যাবে।আপার মতো এতো নরম মনের মানুষ অরুনিমা আর দু’টো দেখেনি।আপার জায়গায় সে হলে ঐ বজ্জাত কে কবেই দু’টো লা’থি মে’রে চলে আসতো।কিন্তু আপা ধৈর্য ধরে এতোটা সময় ঐ অমানুষের ঘর করেছে।ঐ হারামি তো ঠিকই আবার বিয়ে করে নিয়েছে।তবে আপার বিয়ে হবে না কেন?এই সমাজের বাছ বিচার সব মেয়েদের ক্ষেত্রেই হয় নাকি?

অরু বালিশে মাথা রাখে।তার চোখ ভিজে উঠল সহসা।আপা সারাদিন মন ম’রা হয়ে পড়ে থাকে।এই নিষ্প্রাণ মুখটা দেখলেই অরুর কান্না পায়।জীবন এতো কষ্টের কেন?স্রষ্টা বড্ড নির্দয়! যাদেরকে দেয়,তাদের একেবারে হাত খুলে দেয়।আর যাদের দেয় না,তাদের বেলায় দরকারি জিনিসটা দিতেও কার্পন্য করে।

এই যেমন অরুনিমার জীবন।স্রষ্টা তো চাইলেই তাকে দু’হাত ভরে দিতো পারতো।কিন্তু তিনি দেয়নি।জন্মের পর পরই বাবাকে তুলে নিয়েছেন।কি এমন হয়ে যেতো যদি অরু আর কয়দিন বাবার আদর পেত?কিছুই হতো না।জগতের কোনো নিয়মই পাল্টাতো না।অথচ স্রষ্টা তাকে ইচ্ছে করে বাবার আদর পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে।
কি এমন ক্ষতি হতো যদি অরু একটা সুন্দর বাড়িতে জন্ম নিত?কিছুই তো হতো না।কতো জনেই তো এমন সুন্দর সুন্দর বাড়িতে জন্মায়।কতো আরামে আয়েসে বড়ো হয় তারা! অথচ অরু জন্মেছে একেবারে শেওলা ধরা একটা বাড়িতে।সেই বাড়ির সিলিং আবার কিছুদিন পর পর খসে খসে পড়ে।বৃষ্টির দিনে দেয়াল বেয়ে পানি নামে।তার বড্ড অভিমান হয়।সে বালিশ থেকে মাথা তুলে জানালার দিকে এগিয়ে যায়।গলির মাথায় ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে।সে গ্রীলে কপাল ঠেকিয়ে আকাশ দেখে।দেখতে দেখতেই একসময় প্রচন্ড অভিমানী হয়ে বলে,’তুমি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শুধু আমাদের কেই পাও।ঐ বড়লোকের বাচ্চা গুলোকে তোমার চোখে পড়ে না।তুমি নিজে সবাইকে বানিয়ে একেক জনকে একেক রকম রেখেছো।তুমি আমাদের একটুও ভালোবাসো না।’
.
.
.
.
নিরুপমা গায়ে একটা সুতির শাড়ি জড়িয়ে খাঁটের এক কোণায় গিয়ে বসলো।কোমর সমান চুল সে সুন্দর করে খোঁপায় বেঁধেছে।তার চোখ মুখ কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।তার কেমন যেন অস্থির অনুভূতি হচ্ছে।মন খারাপ হচ্ছে অকারণে।

মনোয়ারা ঘরে এসে তার উদাস মুখখানা দেখেই অবাক হয়ে বললেন,’কিরে নিরু?এমন করুণ মুখ করে রেখেছিস কেন?দেখে তো মনে হচ্ছে এখনই কেঁদে ফেলবি।’

নিরুপমা দ্রুত ডানে বায়ে মাথা নাড়ে।চাপা স্বরে উত্তর দেয়,’কিছু না মা।এমনিই।’

মনোয়ারা তার মুখোমুখি বসলেন।একটা হাত তার গালে রেখে ব্যস্ত হয়ে বললেন,’হ্যাঁ রে নিরু,তোর কি ঐ ছেলেকে ভালো লাগে নি?’

নিরুপমা আবারো মাথা নাড়ল।একটা হাতে মনোয়ারার পাঁচ আঙুল চেপে ধরে অস্থির হয়ে বলল,’না না মা।এমন কিছু না।আমার কোনো আপত্তি নেই।আমার এখন সেই অবস্থা নেই যে আমি নিজে থেকে ভালো লাগা আর মন্দ লাগার সিদ্ধান্ত নিব।আমাকে যে ই মহানুভবতা দেখিয়ে বাড়ির বউ করে তুলবে,আমি তার প্রতিই কৃতজ্ঞ থাকবো।নিজ থেকে পাত্র বাছাই করার মতো দুঃসাহস আমি এমনিতেও দেখাই না।আমাকে যে বিয়ে করবে,তার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।আমি আবার পাত্রের দোষ গুণ বাছতে যাবো কেন?’

মনোয়ারা মাথা নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।জমে আসা কন্ঠে ধীরে ধীরে বললেন,’তোর প্রথম বিয়েটা একটা মস্ত বড়ো ভুল ছিলো নিরু।আমার একটা হঠকারিতায় তোর জীবনটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল।’

নিরুপমা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকায়।
‘বাজে কথা বলো না মা।বিয়ে পুরোপুরি মানুষের ভাগ্য।তুমি কি জেনে বুঝে ওমন লোকের সাথে আমার বিয়ে দিয়েছিলে?দাও নি তো।সে ওমন হলে তোমার কি দোষ?তাছাড়া ভাগ্য নিয়ে আমি এমনিতেও দোষারোপ করি না।স্রষ্টা আমায় যা দিয়েছেন,আমি তাতেই খুশি।’

মনোয়ারা মোহাবিষ্ট চোখে তার সামনে থাকা মেয়েটি কে দেখেন।জীবনের এতো চড়াই উতরাই পার হওয়ার পরেও নিরুর কোনো অভিযোগ নেই।সে যেন ধলেশ্বরী নদীর শান্ত ধারা।জীবনের প্রতি নিরুর কোনো অভিযোগ নেই।কোনোকিছুতেই নিরুর কোনো অভিমান জন্মায় না।কারো দেওয়া কষ্টে নিরুর চোখ ভিজে না।নিরু মাটির মতো মুখ বুজে জীবনের সবটা সহ্য করে নিচ্ছে।তার কোনো অভিমান অভিযোগ নেই।সে কৃতজ্ঞ।সবকিছুর পরিশেষে সে বেঁচে আছে,এজন্য সে কৃতজ্ঞ।

আজ তাকে দেখতে পাত্র পক্ষ আসবে।নিরুপমা আশা করেনি যে নিহাদের কথা শোনার পরেও কেউ তাকে বিয়ে করতে চাইবে।কিন্তু অবাক করা বিষয়,বেশ অভিজাত বংশ থেকে তার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে।কিন্তু যেই জিনিসটা নিরুপমাকে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য করেছে তা হলো এই যে পাত্র অবিবাহিত।এর আগে সে কোনো বিবাহ বন্ধনে জড়ায়নি।এমনকি মেয়ে ঘটিত কোনো ব্যাপারেও তার কোনো বাজে অতীত নেই।

তার অবশ্য মস্ত বড় একটা ত্রুটি আছে।সে অতীতে দুই দুইটা খু’ন করেছে।নিরুপমা সেই খু’নের পেছনের রহস্য জানে না।জানতে চায়ও না।আজকাল সে কোনো কিছুতেই কোনো উৎসাহ পায় না।ঐ লোক কয়টা খু’ন করেছে,সেটা নিরুপমার জানার বিষয় না।সে কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাটতে চায় না।নিরু চায় একটু শান্তি।একটু খানি ঠান্ডা বাতাস।আর কিচ্ছু না।নিরু কেবল স্বস্তির সাথে বাঁচতে চায়।

তার অবসন্ন শরীর একটু পর পর ক্লান্ত হয়ে আসে।নিহাদের কিছুদিন যাবত জ্বর।সকালটা কোনোরকমে যায়,বিকেলে একেবারে স্বাভাবিক হয় তাপমাত্রা।যেই না রাত বাড়তে শুরু করে,অমনি সেটা থার্মোমিটারের একশো দুই ছুঁয়ে ফেলে।গত দুই রাত নিরুপমা ঘুমুতে পারেনি।নিহাদ অসুস্থ হলে তার ঘুম আসে না।কিছুক্ষণ আগে অরু তাকে নিয়ে গলির মাথায় হাঁটতে গিয়েছে।নিরুর এখন সমস্ত শরীর ভেঙে ঘুম আসছে।

মনোয়ারা রান্নার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত।তারা বোধহয় একটু পরেই চলে আসবে।নিরু আস্তে করে মাথাটা পেছনে এলিয়ে দেয়।সে ঠিক করেছে তারা আসার আগ পর্যন্ত সে বসে বসে ঘুমাবে।

***

এহতেশামের হাতে একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি।ছবিতে একটা হাস্যোজ্জ্বল কিশোরী মেয়েকে দেখা যাচ্ছে।তার পরনে কলেজ ড্রেস।দুই দিকে দুই বেণি ঝুলছে।তার মুখ জুড়ে প্রশস্ত হাসি।ছবির মান অতো ভালো না।তবে এইটুকু তেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা যথেষ্ট রূপবতী।

এহতেশাম ছবিটা চোখের সামনে তুলে ধরে চোখ বড় করে বলল,’এর সাথে ঐ ক্রিমিনাল টার বিয়ে ঠিক হয়েছে?’

গিয়াস মাথা নামিয়ে বলল,’জ্বী ওস্তাদ।এর নাম নিরুপমা।সমতট লেনে থাকে।’

সে মুখ কুঁচকে বলল,’মেয়ে তো ভারি সুন্দর।এমন একটা জন্তু জানোয়ারকে বিয়ে করতে রাজি হলো কেন?’

‘জানি না ওস্তাদ।রাকিবের এলাকায় থাকে।তার থেকেই সব জানতে হবে।তবে যতদূর শুনেছি,এই মেয়ের নাকি আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো।তারপর কয়েক বছরেই তালাক হয়ে গেছে।’

এহতেশাম গম্ভীর হয়ে বলল,’ওহ,বুঝেছি।’

বলেই সে আবার ছবিটা দেখলো।দেখতেই তার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।এই মেয়ের সাথে ঐ বদমাইশটা বিয়ে করে সুখে সংসার করবে?এতো কিছুর পরিশেষে ঐ জানোয়ারের কিছুই হবে না?এহতেশাম থাকতে এও কি সম্ভব?সে ঐ হামাদকে একটা দিনের জন্যও শান্তি দিবে না।বিয়ে করে সংসার তো দূরের কথা।

সে ছবিটা ফেললো না।উল্টো যত্ন করে পকেটে রেখে দিলো।এই ছবি তার আরো কাজে লাগবে।এখনো মুখটা মুখস্থ হয়নি।কয়েকবার সামনাসামনি তার সাথে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত সে এই ছবিটা নিজের কাছেই রাখবে।এহতেশাম কপালে আঙুল ঠেকিয়ে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করল।শেষে ব্যর্থ হয়ে গিয়াসকে প্রশ্ন করল,’নাম টা জানি কি বললি মেয়েটার?’

গিয়াস উত্তর দেওয়ার আগেই এহতেশাম তাড়াহুড়ো করে বলল,’ওহহ আচ্ছা মনে পড়েছে।নিরুপমা।নি রু প মা।নাইস নেইম।’

***

নিরুপমা বসেছে একদম দুই হাত গুটিয়ে।সময় গড়াতেই সে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নিলো।মাথার উপর সিলিং ফ্যান ঘটঘট শব্দ করে ঘুরছে।তবুও সে কেমন দরদর করে ঘামছে।

কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে থেকে সে আড়চোখে একবার তার সামনে বসে থাকা লোকটা কে দেখার চেষ্টা করলো।তারপরই আবার দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।তার বুক দুর দুর করছে।যদি সত্যি সত্যি এই লোকের সাথে বিয়ে হয় তাহলে নিহাদের কি হবে?এই লোকের চুল আর দাড়ি দেখলেই তো সে ভয়ে কেঁদে ফেলবে।নিরুর বলতে ইচ্ছে হলো,’আপনি দেখতে যথেষ্ট সুদর্শন।দয়া করে এই চুল আর দাড়ি গুলো একটু ছেটে নিন।’
অথচ সে কিছুই বলল না।যেভাবে ছিল,সেভাবেই বসে রইল।

হামাদ বিরক্ত হয়ে একবার চারপাশে চোখ বুলায়।তারা কিছুক্ষণ আগেই এখানে এসেছে।বিয়ের আগে এখানে আসার কি দরকার হামাদ জানে না।সে চেয়েছিল একেবারে বিয়ের দিনই আসতে।মেয়ে দেখার কি আছে?মেয়ে দেখলেও বা কি আর না দেখলেও বা কি?সে তো বলেই দিয়েছে মেয়ে একটা হলেই হলো।সে কি আর বিয়ের পর আটঘাট বেঁধে সংসার করবে নাকি?এসব সংসার টংসার তার দ্বারা করা সম্ভব না।

কক্ষ জুড়ে বিরাজমান পিনপতন নীরবতা সবার আগে হামাদই ভাঙলো।গলা খাকারি দিয়ে বলল,’শোনো নিরুপমা।এসব বিয়ে শাদি সংসার-এসবে আমার কোনো আগ্রহ নেই।আমি বিয়ে করতেও চাই না।চাচাজান চায় বলে করছি।আমার সাথে বিয়ের পর তুমি খুব একটা খারাপ থাকবে না।সব মেয়েই বিয়ের পর স্বামীর নাম চায়।তুমিও স্বামীর নাম পাবে।বড়ো বাড়িতে থাকবে।বড়ো বাড়ির বউ বলে পরিচয় পাবে।তবে একটা জিনিস মাথায় রেখো।’

নিরুপমা মাথা তুলল না।এই লোক মুখ খোলার পর তার নিজেরই কেমন ভয় ভয় হচ্ছে।অরু আর তুতুন একে দেখলে নির্ঘাত ভয়ে চুপসে যেত।এর কন্ঠস্বর বেশ ভারি,সেই সাথে মাত্রাতিরিক্ত গাম্ভীর্যে ঠাসা।কথা বললে মনে হয় সমস্ত ঘর কেঁপে উঠে।

হামাদ পুনরায় হাস্কি গলায় বলল,’আমার একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে।বিয়ের পর দয়া করে সেই জীবনে তাকাঝাকি করবে না।এটা আমার বড্ড অপছন্দ।আমার জীবন আমার,তোমারটা তোমার।মনে থাকবে নিরুপমা?’

নিরুপমা জোরে জোরে মাথা নাড়ল।সব মনে থাকবে তার।আপাতত এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে সে মুক্তি চায়।হামাদের নিজেরও এখানে বসে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই।সে একবার টিপয়ের দিকে চোখ নেয়।সেখানে নানারকমের পিঠা,চায়ের কেতলী আর বিস্কুট রাখা।তার এখন খিদে নেই।তবুও সৌজন্যের খাতিরে সে একটা পিঠা খেল।তারপর খানিকটা ঠান্ডা স্বরে বলল,’ওয়াশরুম কোথায়?’

নিরুপমা আঙুল তুলে রুমের এক কোণায় থাকা ওয়াশরুমের দরজা দেখায়।অভি কথা খরচা করল না আর।দ্রুত বসা থেকে উঠে সামনে এগিয়ে গেল।যেতে যেতে একবার ঘরের দেয়ালের দিকে চোখ বুলিয়ে নিলো।দেয়ালের রং সব উঠে উঠে আসছে।দেখেই সে সামান্য হাসল।আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না বোঝাই যাচ্ছে।এজন্যই বোধহয় তার মতো মানুষের সাথে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে।

তার চোখ গেল দেয়ালের একপাশে থাকা একটা লেখার দিকে।বলপয়েন্ট কলমে লিখা-অরু+নিহাদ+নিরুপমা+মনোয়ারা=হ্যাপি ফ্যামিলি।
হামাদ তীক্ষ্ণ নজরে একবার সেটি দেখে নিল।অরু কে?তার কথা তো আগে কখনো শুনেনি।

***

‘আপা! নিরু আপা!’

অরুনিমার চিৎকার কানে যেতেই নিরুপমা ধড়ফড়িয়ে উঠল।অরু ঘরে এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে আবার ডাকলো,’আপা!’

নিরু উঠে দাঁড়ালো।তার কাঁধে হাত রেখে বলল,’কি হয়েছে রে অরু?আমার নিহাদ ঠিক আছে তো?’

অরু দম ফেলতে ফেলতে বলল,’নিহাদ ঠিক আছে।কিন্তু তুমি ঠিক নেই।’

নিরুপমা চমকে উঠল।অবাক হয়ে বলল,’আমি কি করেছি?’

অরুনিমার তখনও শ্বাস উঠানামা করছিলো।সে গলির মাথা থেকে দৌড়ে দৌড়ে এ পর্যন্ত এসেছে।একটা হাত বুকে চেপে সে গলা উঁচু করে বলল,’তুমি নাকি একটা খু’নী,জেল ফেরত আসামীর সাথে বিয়ে করছো?এটা কি সত্যি?’

নিরু আঁতকে উঠে সহসা।ছটফট করতে করতে একবার ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকায়।সে কিছু বলার আগেই অরু চিৎকার করে উঠল,’আপা! আমরা এতোটাও পচে যাইনি যে ঐ জেল ফেরত গু’ন্ডার সাথে বিয়ে করব।গুন্ডা তো না,একেবারে আস্ত একটা খু’নী।এসবের সাথে সংসার হয় নাকি?দেখবে কথা কাটাকাটি হলে তোমাকেই মে’রে ফেলবে।’

নিরুপমা দ্রুত তার মুখ চেপে ধরে।তার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে,’অরু চুপ হয়ে যা।উনি ঘরেই আছেন।’

অরুনিমা খিলখিল করে হেসে উঠল।নিরুপমা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পুরো ঘর পায়চারি করতে করতে বলল,’তাই নাকি?তো তোর হবু জামাই কি অদৃশ্য নাকি?দেখতে পাচ্ছি না কেন?’

নিরুপমা মাথায় হাত চেপে করুণ স্বরে বলল,’দয়া করে আর কথা বলিস না অরু।আর নিজের বিপদ ডেকে আনিস না।’

অরু সে কথা গায়ে মাখল না।হঠাৎই কেমন ক্ষেপাটে সুরে চেঁচিয়ে উঠল,’তুমি ঐ খু’নীকে বিয়ে করবে না আপা।এটাই আমার শেষ কথা।আরে ঐ খুনীর সাথে তো আমি আমার জুতারও বিয়ে দেই না।আর তুমি তো আমার বোন।তুমি কি করে ঐ লোকের সাথে বিয়ে করো শুনি?আসুক সে একবার আমার সামনে।জুতোপেটা করে যদি ঠ্যাং না ভেঙেছি,তবে আমার নামও অরুনিমা না।’

আচমকাই কেউ ওয়াশরুমের ছিটকিনি টান দিলো।অরু সেই শব্দে দ্রুত সেখানে তাকায়।দেখে সুঠাম দেহী এক যুবক একেবারে ধীর গতিতে সেখান থেকে বেরিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।তার চোয়াল শক্ত,দুই চোখ স্থির।দুই চোখের ধাঁরালো দৃষ্টি অরুনিমার দিকেই নিবদ্ধ।

অরুনিমার দম বন্ধ হয়ে এলো।তার সমস্ত শরীর মুহূর্তেই অজানা আতঙ্কে জমে গেল।সে দৌড়ে গিয়ে নিরুপমার পেছনে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ায়।কান্না মিশ্রিত কন্ঠে মিনমিন করে বলে,’নিরু আপা! আমাকে বাঁচাও।’

অভি অবশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।সে এমনভাবে অরুনিমাকে এড়িয়ে গেল যেন সে তার কথা কিছুই শুনতে পায় নি।সে ট্রাউজারের পকেটে হাত গুজে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।যাওয়ার আগে কি মনে করে একবার পেছনে ফিরে নিরুপমার কাঁধের কাছটায় উঁকি দেওয়া মেয়েটার মুখ দেখে নিল।নাহ,হামাদের স্ত্রী হিসেবে মেয়েটা অতিমাত্রায় লাবন্যময়ী।এতো চমৎকার সুন্দর মেয়ে নিয়ে হামাদ করবে টা কি?

সে একপেশে হেসে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল,’তোমার জুতাকে কষ্ট করে আমার সাথে বিয়ে দিতে হবে না মেয়ে।জুতোর বদলে তুমি হলেও আমার চলবে।’

চলবে-