#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
২৬.[প্রথম অংশ]
অশ্বত্থ গাছের ডালে বসা দু’টো শালিক ডানা ঝাপটে দূরে কোথাও উড়ে গেল।শিকদার বাড়ির দক্ষিণ দিকের ঘরটায় তখন পিনপতন নিরবতা।সৃজনী ফ্যালফ্যাল চোখে সামনে তাকায়।তারপর অবাক হয়ে একটা হাত গালে ছোঁয়ায়।অরুনিমা খপ করে তার হাতের কবজি চেপে ধরে বলল,’বারবার কেন তুমি আমার ঘরে আসো?খেয়ে দেয়ে কোনো কাজ নেই তোমার?’
বলেই সে পাশে তাকায়।অভি তখন তার দিকেই তাকানো।দৃষ্টিতে কেমন থমথমে ভাব।অরুনিমার সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই অরু অভিমানী সুরে বলল,’কেন তুমি ওর এতো যত্ন করো?কেনো তুমি বারবার ওকে তোমার ঘরে আনো?’
সৃজনী কোনো জবাব দিলো না।তার অবিশ্বাস্য দৃষ্টি তখনো অরুনিমার দিকে।অরুনিমার কাছ থেকে এমন আচরণ সে আশা করে নি।সে ভাঙা সুরে বলল,’অরু! আমি আ-মি…’
কেন যেন মুখের কথা শেষ হলো না।সৃজনী তার আগেই থেমে গেল।কন্ঠস্বর নিজ থেকে জমে গেল।হৃদিতা হন্তদন্ত হয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালো।বড় বড় চোখে সামনে তাকাতেই সে দেখলো সৃজনীর পায়ের র’ক্তে খাটের চাদর ভেসে যাচ্ছে।অভি ভাইজান চুপ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।ইতিবাচক নেতিবাচক কোন প্রতিক্রিয়াই দিলেন না।তাকে দেখালো খুবই ভাবলেশহীন।
সৃজনী অসহায় চোখে অভির দিকে তাকালো।সেই চোখের ভাষা দুর্বোধ্য ছিল না।একবার তাকালেই সেই চোখ পড়ে নেওয়া যেতো।কিন্তু অভি সেদিকে তাকালো না।উল্টো খুব দায়সারা হয়ে হেঁটে গেল।যেতে যেতে হৃদিতাকে দেখে বলল,’হৃদি।দিদানের ঘর থেকে তুলো আন তো।’
অরুনিমা তাকালো সৃজনীর পায়ের দিকে।তাকাতেই কিছুটা শান্ত হয়ে এলো।ছলছল চোখে দুই পা সরে এলো।সৃজনী তার দিকে দেখে বলল,’আমি পানি নিয়ে এসেছিলাম।তুমি রাগ হলে?’
অরুনিমা উত্তর দিলো না।চুপ হয়ে একবার পুরো ঘরে চোখ বুলালো।সৃজনী কে সে মা’রতো না।এমন ভাবে গায়ে হাত তোলার স্বভাব তার নেই।কিন্তু আজ কি হলো সে জানে না।তার প্রচন্ড কষ্ট হলো।সে ঘরের বাইরে আসতেই দেখলো সৃজনী খাটে বসে আছে।তার পা টা খাটের উপর তোলা।অভির একটা হাত তার পায়ে।
এই দৃশ্যটা দেখামাত্র ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠল।অরুনিমার মনে হলো,এটা খুব কষ্টের দৃশ্য।এই দৃশ্যটা একান্তই তার আর হামাদের হওয়ার ছিলো।জগলুদের বাড়িতে সেদিন তাকে এমন করেই নূপুর পরিয়েছিল হামাদ।তার কাছে বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি বলতে সেটাই আছে।সেই স্মৃতি হামাদ অন্য কারো সাথে ভাগাভাগি করবে?এটাও কি হতে পারে?তাহলে অরুনিমার নিজের বলতে কি রইল?কিছু না,কিছুই না।
বিয়ের পরেও একবার এমন হয়েছিল।হামাদের হাত পা কেটেছিল।আর সৃজনী এসে সেটাতে মলম মেখেছিল।অরুনিমা কি সেদিন রাগ হয়েছিল?সে তো রাগ হয় নি।ভাইয়ের প্রতি বোনের স্বচ্ছ আবেগ ভেবেই সে সেটা গ্রহণ করেছিল।কিন্তু আজকাল আর সেটা হয়ে উঠে না।অরুনিমা এখন আর সেই চোখে কোনো বৈধ কিংবা স্বচ্ছ আবেগের দেখা পায় না।সে যেটা দেখে,সেটা বোধ করি কোনো বিবাহিত নারীই হাসিমুখে সয়ে নিতে পারবে না।
হৃদিতা তুলো হাতে ঘরে এলো।অভি গা ছাড়া ভঙ্গিতে সৃজনীর সামনে এসে দাঁড়ালো।তারপর হাঁটু গেড়ে বসে এক হ্যাঁচকা টানে তার পা থেকে কাঁচের টুকরো টা বের করে আনল।হৃদিতা তার পাশে এসে দাঁড়ালো।অভি বলল,’হৃদি! ব্যান্ডেজ করে দে তো।আশা করি ভেতরে আর কাঁচ ভাঙা নেই।কিরে?তোর কি মনে হচ্ছে ভেতরে কিছু আছে?’
সৃজনী শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।ফ্যাকাশে মুখে বলল,’না।নেই।’
‘হৃদি!’
‘জ্বী ভাইজান।’
‘ব্যান্ডেজ করে দে।’
হৃদিতা উপরনিচ মাথা নাড়লো।অভি পকেটে একটা হাত গুজে নির্বিকার চিত্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।এর মাঝে একবারও অরুনিমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলো না।এরবারও জানতে চাইলো না কেন সে এমনটা করেছে।এমনকি ন্যুনতম কোনো প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখালো না।অরুনিমা লক্ষ্য করল অভি তার দিকে একবারও তাকায় নি।একটিবারও না।যেন এই ঘরে অরুনিমার অস্তিত্ব সে টেরই পায় নি।অরুনিমার সেই মুহূর্তে একবার চোখ ভিজলো।একটা মানুষের উপস্থিতি কখনো এভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়?একটাবার,একটাবারের জন্যও কি পিছু ফেরা যেতো না?জিজ্ঞেস করা যেত না যে ‘কেন তুমি এমনটা করলে অরুনিমা?’
____
প্রায় দু’ঘন্টা পর অভি ঘরে এলো।খাটের কাছাকাছি আসতেই সিগারেটের উগ্র গন্ধ অরুনিমার নাকে এসে দম বন্ধ করা অনুভূতি জাগালো।অরুনিমা পেছন ফিরে তার দিকে তাকায়।অভি তখনো তার দিকে তাকায় নি।ঘরে এসেই গায়ে থাকা চেক প্রিন্টের শার্ট টা খুলে উদাম হয়ে খাটে শুলো।তার চোখে গভীর নিন্দ্রা।শোয়ামাত্র দু’চোখ বুজল।
অরুনিমা নাক টানতে টানতে ডাকলো,’হামাদ! ও হামাদ!’
অন্যপাশ টা ভীষণ শান্ত।যেন ঝড়ের পূর্বে প্রকৃতি যেমন শান্ত থাকে,অনেকটা ওমন।অরু পুনরায় ডাকে,’একটু শুনো হামাদ।’
অভি উত্তর দিলো না।ক্রমাগত শ্বাস প্রশ্বাসে তার শরীর উঠানামা করছিল।অরুনিমা তার একটা হাত স্পর্শ করলো।বলল,’তুমি আমার সাথে কেন এমন করছো?তুমি কথা বলা বন্ধ করলে আমি কোথায় যাবো?তুমি ছাড়া এই বাড়িতে আমার আর আছে কে?’
‘অরুনিমা আমার ঘুম পেয়েছে।সকালে সব কথা বলবে।’
‘মিথ্যা কথা।তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো।’
অভি প্রতিউত্তর করে না।শুধু দুইবার খুকখুক করে কাশে।অরু নাক টেনে কান্না থামিয়ে বলল,’জগলুর বাড়িতে তুমি আমার পায়ে নূপুর পরিয়েছো।বলো পরাও নি?তুমি কতো সুন্দর করে আমার পা টা নিজের কাছে নিয়ে নূপুর পরিয়েছিলে।তোমার ঐ যত্নটা তো আমার ছিলো হামাদ।সেটা তুমি সৃজনী কে কেন দিলে?’
অভি চোখের সামনে থেকে হাত সরালো।আশ্চর্য হয়ে বলল,’তোমার মাথায় সমস্যা অরুনিমা? সৃজনীর পায়ের অবস্থা তুমি দেখো নি?’
‘কাঁচ কি নিজে থেকে তার পায়ে এসে বিঁধেছিল?সে কেন এলো এখানে?’
‘তার জন্য তাকে যা বলা প্রয়োজন ছিল, আমি বলেছি।’
অরুনিমা ক্রন্দনরত সুরে বলল,’তুমি সবাইকে বোঝো।শুধু আমাকেই বোঝো না।’
অভি কুঁচকানো মুখে অন্যপাশে ফিরল।তারপর সত্যি সত্যি সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।এতো বড়ো একটা ঘটনায় তার নির্বিকার,গা ছাড়া ভাব অরুনিমার হৃদয়ে দগদগে ঘা এর জন্ম দিলো।সে এমন ভাবে বিষয় গুলো এড়িয়ে গেল যেন এসব তার ইখতিয়ারে পড়ে না।অরুনিমা কিংবা সৃজনী,কেউ ই যেন তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।কারো পেছনেই সময় খরচা করতে সে আগ্রহী না।
অরুনিমা সেদিন রাতে ঘুমালো না।অভির কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে কয়েকবার ডাকলো,’হামাদ! ও হামাদ! একটু শুনো।আমি তাকে মারতাম না।কিন্তু সে তোমার কাছে এলে আমার কষ্ট হয়।তোমার মা কে নিয়ে কেউ কিছু বললে তোমার কষ্ট হয় না বলো?আমার কি তাহলে তোমাকে নিয়ে কষ্ট হতে পারে না?তুমি কেন আমায় বোঝো না।হামাদ! একটু শুনো হামাদ।’
____
সকালের আলো সেদিন অরুনিমার কাছে খুব নিষ্প্রাণ লাগলো।অভি ঘুম থেকে উঠেই গোসল সেরে বেরিয়ে গেল।না কোনো কথা বলল,না কিছু রাগ দেখালো।অরুনিমা পাথর হয়ে তার কার্যকলাপ দেখল।পরে আর সহ্য করতে না পেরে নিরুপমাকে ফোন দিলো।
‘নিরু আপা!’
নিরুপমা ফোন তুলেই হাসি মুখে বলল,’বল সোনা।’
‘আপা আমার মন খুব খারাপ।’
‘সেকি! আবার কি হলো?’
অরুনিমা একে একে সবটা খুলে বলল।বলতে গিয়ে সে কখনো ঠোঁট ভেঙে কান্না করলো,কখনো বা ডুকরে কেঁদে উঠল।নাক মুখ মুছতে মুছতে শুধু কোনোরকমে বলল,’হামাদ কাল রাত থেকে আমার সাথে কথা বলে না আর।বিয়ের পর যেমন চুপ মেরে থাকতো,তেমন করেই থাকে।আমি কি করব আপা?বলো আমাকে।আমি কি কিছু ভুল করেছি?’
নিরুপমা সাথে সাথেই জবাব দেয় না।কিছুক্ষণ মৌন থেকে শেষে বলল,’কাঁদিস না মনা।আপা দেখি কিছু করা যায় নাকি।কাঁদিস না তুই।’
‘আপা! আমি চড় মারতে চাই নি সত্যি।কিন্তু হয়ে গেল।সে কেন সবসময় হামাদের পাশে ঘুরে বলো তো?’
‘মন খারাপ করে না অরু।’
নিরুপমা নিজ থেকেই প্রশ্ন করল,’আচ্ছা অরু! হামাদ সাহেব কি এসবে সৃজনীর পক্ষ নেয়?মানে তার হয়ে সাফাই দেয়?’
‘না আপা।সে তো কারো পক্ষেই কিছু বলে না।সৃজনীকেও সবসময় দূর ছাই করে।’
‘বুঝেছি।সেজন্যই বোধহয় রাগ হলো।’
‘আমি এখন কি করব আপা?’
‘ধৈর্য ধর।আজ বাড়ি ফিরলে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলিস কেমন?’
‘আচ্ছা।’
অরুনিমা ক্লান্ত শ্বাস ছাড়ল।নিরুপমা বলল,’আমি তোমার সাথে রেগে নেই মনা।আজ একটা কথা বলি।নিজের স্বামীকে নিয়ে হওয়া কোনো ব্যাপার হালকা করে দেখবি না।কোনোদিনও দেখবি না।সেটা যতো তুচ্ছই হোক,তুই খুব মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করবি।তবে হ্যাঁ,হামাদ সাহেব যখন নিজেই তার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে ছিলেন,তাই তোরও উচিত ছিলো তার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে বিবেচনা করা।যাক,অতোসব তোকে ভাবতে হবে না।উনি বাড়ি এলে বুঝিয়ে বলবি।’
অরুনিমা ছোট করে জবাব দেয়,’ঠিক আছে আপা।’
____
সৃজনী ঘরের এক কোণায় গুটিশুটি মেরে বসেছিল।হৃদি দিয়েই তার শিয়রে বসে।তার কাঁধে হাত রেখে ডাকে,’সৃজু! এদিকে তাকা।’
সৃজনী আস্তে করে মাথা তুলল।তার রক্তিম চোখজোড়া দেখেই হৃদিতা অসহায় হয়ে মাথা নাড়লো।খুব যত্নে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,’সৃজু! ভাইজানের বিয়ে হয়ে গেছে।তুই কেন বুঝতে চাস না কিছু?’
‘বুঝতে চাই তো হৃদি।দেখ,শুরুতে তো যাই নি তার কাছে।খুব দূরে দূরে ছিলাম।এখন আর পারছি না।’
‘এটা অন্যায় সৃজু।’
‘জানি।’
‘তাহলে?’
সৃজনী পুনরায় মাথাটা পেছনে এলিয়ে দেয়।পায়ের যন্ত্রনায় একটু পর পর শরীর অবশ হয়ে আসে।সেই যন্ত্রনার সাথে যখন ভেতরের যন্ত্রনা যোগ হয়,তখন সৃজনীর কাছে সবকিছু অসহনীয় মনে হয়।
সৃজনী বলল,’বুঝ হওয়ার পর থেকে আমি শুধু তাকেই চেয়েছি।সে কোনোদিন দু’দন্ড বসে আমার সাথে কথা বলে নি।কোনোদিনও সে আমার মন জানতে চায় নি।আমি তাকে এমনিতেই যত্ন করেছি,আগলে রেখেছি।আচ্ছা হৃদি! আমাকে বল তো।এখানে তৃতীয় ব্যক্তিটা কে?আমি নাকি অরুনিমা?নাকি আমরা কেউ ই না?’
হৃদিতা অসাড় হয়ে থাকে।অনেকটা সময়।তারপর আস্তে করে কন্ঠ নামিয়ে বলে,’ভাইজানের বিয়ে হয়ে গেছে সৃজু।এর উপর আর কোনো সত্যি নাই।তুই বাকিসব ভুলে যা।সবকিছুর শেষেই তো পূর্ণতা থাকে না।তাই না?’
____
অভি সিগারেটের ধোঁয়া শূন্যে উড়িয়ে দূর আকাশে চোখ নেয়।জগলু তখন তার পাশটায় দাঁড়ানো।তারই মতো করে আকাশ দেখতে দেখতে সে বলল,’অরুনিমা সৃজনীর ব্যাপারটা নিয়ে আমার সাথেও কথা বলেছিল।আমার মনে হচ্ছে সে খুব মন খারাপ করেছে।পাশাপাশি ইনসিকিউরিটি তে ভুগছে।তুই কি তার দিকটা বুঝতে পারছিস?’
অভি সামান্য ঝুঁকে রেলিংয়ের ভর দিলো।মাথাটা নিচের দিকে ছেড়ে দিয়ে ভীষণ নির্লিপ্ত হয়ে বলল,’নাহ্।এতো কিছু বোঝার ঠেকা নাই আমার।’
‘অদ্ভুত! তুই শুধু তেজই দেখাচ্ছিস বার বার।’
অভি মাথা তুলল।এক হাতে চুল ঠিক করতে করতে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,’বিয়ের পর খুব স্বাভাবিকই ছিলাম আমি।না অরুনিমার সাথে খুব বেশি কঠোর হয়েছি,না কোনোকিছু জোর পূর্বক আরোপ করেছি।আমি আসলে কোনোদিন বিবাহিত জীবনের ঝুট ঝামেলায় আসতেই চাইনি।নিরুপমা কে সেজন্যই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।সে তার ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।আর আমি নিজেকে নিয়ে।’
‘এভাবে কি জীবন চলে?’
‘হুম চলে।’
‘অরুনিমার প্রতি তোর কোনো অনুভূতি নেই?’
অভি মুখ শক্ত করে বলল,’না।’
জগলু বলল,’অনুভূতি ছাড়াই তুই মেয়েটার এতো কিছু সহ্য করে নিচ্ছিস?’
অভি আরেকবার সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল,’আমি সম্পর্কের মূল্য দিতে জানি।বিয়েটা আর দশটা সুস্থ স্বাভাবিক বিয়ে না হলেও তথাকথিত অসুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই নি আমি তার সাথে।আমার ধারণা,বহুবার আমি নিজেকে সংযত করেছি,রাগ দমন করেছি,তার সাথে নরম আচরণ করেছি।এখন সে যেটা করে,সেটা হলো সন্দেহ আর হঠকারিতা।তার এসব আচরণ আমার চোখে তার গ্রহণযোগ্যতা কমায়।’
‘বড়ো কঠিন কঠিন কথা বলছিস! অরুর সাথে এতো কঠিন শব্দ যায় না।সে মেয়েটা খুব প্যাঁচমুক্ত।’
অভি হাসলো।
‘সৃজনীর পায়ে কাঁচ আটকেছিল।আমি সেটা বের করার চেষ্টা করেছি শুধু।অরুনিমার এই আচরণ আমি ‘প্যাঁচমুক্ত’,’সহজসরল’,’বোকামি’-এমন কোনো শব্দ দিয়েই ওভারকোট করতে চাইছি না।আসলে আমি অরুনিমার ও দোষ দেখি না।সংসার আসলে আমার জন্য না।বিয়ের সিদ্ধান্ত টা পুরাই ভুল ছিলো।’
জগলু বলল,’অরু যে তোকে পছন্দ করে,সেটা বুঝিস তুই?’
‘হুম বুঝি।’
‘পছন্দের জিনিস নিয়ে মানুষ খুব পজেসিভ হয়।জানিস?’
‘হুম।সেজন্যই কারো পক্ষ টানিনি।না সৃজুর,না অরুনিমার।’
অভি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফ্লোরে ছুড়ে মারলো।তার মুখে স্পষ্ট করে কোনো অভিব্যক্তি নেই।এমনিই অন্যমনস্ক হয়ে বলল,’সৃজুর প্রতি আমার কোনোদিনই কোনো অনুভূতি ছিলো না।তবে কৃতজ্ঞতা আছে।বাড়িভর্তি মানুষ দিনের ঝলমলে আলোতে যা দেখতে পেতো না,সৃজনী সেটা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারেও দেখে নিত,বুঝে যেত।সেজন্য আমার কৃতজ্ঞতা আছে তার প্রতি।তার পায়ে কাঁচ লাগলে আমি সেটা বের করব না?বের করার আগে আমার ভাবতে হবে যে এইরকম একটা মুহূর্ত আমার অরুনিমার সাথে ছিলো?সুতরাং এটা আর কারো সাথে করা যাবে না।অদ্ভুত ছেলেমানুষি কথাবার্তা!’
‘অরু তো একটু ছেলেমানুষই।’
‘চুপ কর তো জগলু।সব কিছুতে অরুর পক্ষ টানিস না।তুই কি তার বেতনভুক্ত কর্মচারী?অদ্ভুত!’
অভি বড় বড় পায়ে ছাদ থেকে নেমে এলো।জগলু ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকায়।তারপর বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও ছাদ থেকে নেমে আসে।অরুনিমা মেয়েটার জন্য তার মন ভার হচ্ছে।নিশ্চয়ই সে মন খারাপ করে এক কোণায় বসে আছে।সে তাকে কেমন করে বোঝাবে যে অভি একটু এমনই?
____
অভি বাড়ি ফিরেই রোজকার মতো খাটের এক পাশে গিয়ে শোয়।অরুনিমা এখন ঘরে নেই।এটাই উপযুক্ত সময় ঘুমিয়ে পড়ার।অরুনিমা এলেই কানের কাছে এক নগাড়ে রেকর্ডার বেজে যাবে।অভি দু’টো দিন এসব মেয়েলি ঝামেলা থেকে মুক্তি চায়।
অরুনিমা এলো দশ মিনিট পরে।এসেই উঁকি দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখে।তার মুখে চাপা হাসি।সে পা টিপে টিপে ভেতরে এলো।একবার অভির সামনে গিয়ে তার মুখের উপর ঝুঁকল।অভির দুই চোখ বন্ধ।অরু কপাল কুঁচকালো।ঘুমিয়ে গেল নাকি?
সে একহাতে তার কাঁধে ধাক্কা দিলো।ফিসফিস করে ডাকলো,’হামাদ! শুনছো?’
অভি মুখ কুঁচকে বিরক্তিতে কিছু একটা বিড়বিড় করল।অরু বলল,’সারাদিন এতো ঘুমাও কেন?স্ত্রীকে সময় না দিলে যে গুনাহ হয় তুমি জানো না?’
অভি চোখ খুলল।বিরক্তি জড়ানো দু’টো চোখ।অরুর কথা শুনেই একপাশ থেকে অন্যপাশে ফিরতে ফিরতে চাপা স্বরে বলল,’পাগল!’
অরুনিমা চঞ্চল পায়ে খাটের উপর উঠে বসল।গালের নিচে হাত রেখে বলল,’স্ত্রী কে সময় না দিলে,স্ত্রীয়ের কথা মন দিয়ে না শুনলে,তাকে অবহেলা করলে কতো গুনাহ হয় তুমি জানো?’
অভি চোখ খোলে না।তার মুখে কোনো রাগের চিহ্নও নেই।তাকে দেখে মনে হলো,কোনোকিছুতেই তার ভ্রুক্ষেপ নেই।অরুনিমা মন খারাপ করে তার দিকে তাকায়।
তারপর চট করে খাটে শুয়ে একহাতে তাকে জাপ্টে ধরে।বরাবরের মতোই তার কাঁধে নাক মুখ ঘঁষে বলে,’হামাদ! ও হামাদ! একবার চোখ খোলো।একবার একটু তাকাও।দেখো।সরি বললে তো মানুষ কে মাফ করতে হয়।তুমি আমাকে মাফ করবে না?’
অভি অনেকটা সময় পর চোখ খোলে।অরু খুব উদগ্রীব হয়ে তার মুখের দিকে তাকায়।তার চোখে এক রাজ্যের প্রত্যাশা।এই হয়তো অভি গোমড়া মুখ করে বলবে,’গা ছাড়ো।ভালো লাগছে না।দূরে গিয়ে ঘুমাও।’
তারপর অরু তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে।তার কাঁধে মুখ গুজে আহ্লাদ করে বলবে,’না না।আমার এভাবেই ঘুম আসে।দূরে যাবো না।’
অথচ এমন কিছুই হলো না।অভি চোখ খুলেই জলদগম্ভীর হাস্কি স্বরে বলল,’তোমাকে কাল তোমার মায়ের কাছে রেখে আসবো।কিছুদিন সেখানেই থাকো তুমি।’
______
তখন ফাল্গুন মাস চলছিল।প্রকৃতির আনাচে কানাচে নব প্রাণের সূচনা।ঘুম থেকে উঠতেই পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যায়।প্রকৃতি সেজেছে সবুজের সমাহারে।যেখানে পুরো শহর ঢাকা পড়েছে একটা প্রাণবন্ত সবুজ চাদরে।গাছে গাছে নতুন পাতা,ফুলের উপর মৌমাছির উড়ে বেড়ানো।সব মিলিয়ে বসন্তের প্রকৃতি ছিলো মনোমুগ্ধকর।
অরুনিমা সকাল থেকেই জানালার ধারে বসা।তুতুন তার পাশে বসে খেলা করছিল।অরু একবার তার দিকে তাকালো,তারপর আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।গত সাত দিন ধরে সে এই বাড়িতে।হামাদ সেদিন এসে তাকে এখানে রেখে গেল।বলল দশ বারো দিন যেন সে বেড়ায় এখানে।তারপর সে এসে নিয়ে যাবে।অরু কি বোকা?অরু জানে,সে আসলে অরু থেকে কয়দিন দূরে থাকতে চেয়েছে।সেজন্যই তাকে এখানে রেখে গেছে।
নিরুপমা ঘরে এসে শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছে বলল,’অরু! আজও ভার্সিটি যাবি না?’
অরুনিমা জানালার শিকে মাথা ঠেকায়।আস্তে করে বলে,’না আপা।যাবো না।’
নিরুপমা তার পাশে এসে বসলো।তার কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলো,’কি হয়েছে মনা?আপাকে বল।’
অরুনিমা তার বুকে মাথা রাখলো।তারপর পাখির ছানার মতো হাত পা গুটিয়ে নিরুপমার ধাঁর ঘেঁষে বলল,’কিছু ভালো লাগে না আপা।হামাদের কথা মনে পড়ে।তুমি একটু কথা বলো না তার সাথে।’
‘বলেছি তো।সে তো বার বার বলছে,তার কোনো রাগ নাই।সে ইদানিং ব্যস্ত থাকবে।তাই তোকে রেখে গেছে।ব্যস্ততা কমলে আবার তোকে নিয়ে যাবে।’
‘সে মিথ্যে বলেছে।সে আসলে আমাকে চায় না।সে সৃজনীকে চায়।’
‘অরু! এসব কথা বলতে নেই।’
‘বলব।একশোবার বলবো।সে আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।আমি জীবনেও তাকে মাফ করবো না।জীবনেও কথা বলব না তার সাথে।’
নিরুপমা তার মাথায় হাত বুলায়।আদুরে স্বরে বলে,’এমন একটু আধটু হয় সোনা।আমি আবার ফোন দিবো।সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।’
___
দু’দিন যাবত অরুনিমা জ্বরে ভুগছিলো।শরীর গরম,ঠান্ডা- কাশি,আর সাথে সারাক্ষণের মন খারাপ।সে এবার বেড়াতে এসে মনোয়ারা কে জ্বালাতন করল না,নিরু আপার কাছে বায়না ধরলো না,তুতুনের সাথে মন ভরে খেলা করলো না।
সেই রাতে অরুনিমার জ্বর প্রকট হলো।গা কাঁপনো জ্বর যাকে বলে।তারপর সেটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়ে তার খিঁচুনি এলো।নিরুপমা তার কপালে হাত চেপেই আঁতকে উঠল।ব্যস্ত হয়ে তার কাঁধ চেপে বলল,’অরু রে! আপার দিকে তাকা।এই এদিকে দেখ।’
অরুনিমার শরীর তখন অল্প অল্প কাঁপছিলো।দাঁতে দাঁতে সংঘর্ষ হয়ে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছিল।নিরু ভয় পেয়ে গেল।মনোয়ারা মেয়ের শিয়রে বসে তার হাত ডলতে ডলতে আকুল কন্ঠে বললেন,’জামাই কে একটা ফোন দে না নিরু।মেয়েটার শরীর তো দিনে দিনে আরো খারাপ হচ্ছে।’
নিরুপমা ব্যস্ত হয়ে তাকে ফোন করলো।কলটা প্রথমবারে রিসিভ না হলেও পরের বারে রিসিভ হয়েছিল।অন্য পাশ থেকে ঘুম জড়ানো পুরুষালি স্বরটা তন্দ্রাচ্ছন্ন কন্ঠে বলল,’কে?’
‘জ্বী আমি নিরুপমা।’
অন্য পাশ থেকে কোনো জবাব এলো না।নিরুপমা জড়ানো সুরে বলল,’হামাদ সাহেব! অরুর শরীরটা ইদানিং খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।আজ সন্ধ্যা থেকে তার প্রচন্ড জ্বর।এখন খিঁচুনি এসে গেছে।আপনি কি একবার আসবেন দয়া করে?’
অপর প্রান্তের কন্ঠটা কিছুক্ষণ মৌন থাকল।শেষে নিরেট স্বরে বলল,’আমি আসছি।’
____
অভি বাড়ি এলো রাত একটার পরে।তখন আকাশ কাপিয়ে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে।ফাগুন মাসে এমন বৃষ্টি সহসা হয় না।আজ হলো।সেই বৃষ্টির শব্দ চারিপাশে কালবৈশাখীর ভয়াল তান্ডবের মতোই শোনালো।
নিরুপমা যখন দরজা খুলল,তখন দেখলো অভি কাকভেজা হয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।নিজের একহাত দিয়ে সে সমস্ত মুখের উপর পড়া পানির ফোঁটা ঝেড়ে নিল।তারপরেও চুলের উপর জমে থাকা পানি টুপটুপ করে তার গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছিল।
সে ভেতরে প্রবেশ করল কোনো শব্দ ছাড়া।তারপরই বসার ঘর পেরিয়ে ডান দিকের ঘরটায় গেল।মনোয়ারার তখন চোখ লেগে এসেছিল।অভি এক পলক তাকে দেখেই তারপর খাটে শুয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালো।আজ সাতদিন বাদে তাদের দেখা হচ্ছে।
অভি হেঁটে গিয়ে তার পাশে বসে।ভরাট পুরুষালি স্বরে ডাকে,’অরুনিমা! অরুনিমা!’
অরু কিছু বলল না।অভি নিজ থেকেই তার কপালে হাত রাখলো।তারপর পর্যায়ক্রমে গাল,গলা এবং গলার নিম্নাংশ।আচমকাই তার দু’চোখ সতর্ক ভঙ্গিতে জ্বলে উঠল।সে এক লহমায় অরুর হাতের কবজি চেপে ধরে কিছু একটা অনুমান করার চেষ্টা করলো।
সেই রাতে অরুনিমা আর কোনো কথা বলে নি।তার শীতল,অসাড় হাতটা স্পর্শ করতেই একটা ঢোক মনের অজান্তে অভির কন্ঠনালি বেয়ে নেমে এলো।অভি আবার ডাকে,’অরুনিমা! এদিকে তাকাও।তুমি আমার সাথে কথা বলবে না অরুনিমা?’
বৃষ্টির দাপট কমে এলো।বৃষ্টি শেষে ঝড়ো হাওয়া সাঁই সাঁই করে দখিনের খোলা জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করছিল।অভি তখনো পাথর হয়ে অরুনিমার হাতটা ধরে বসেছিল।যেই হাতটা শীতল রক্তের সরীসৃপদের মতোই নিষ্প্রাণ আর ঠান্ডা হয়েছিল।যেই অরুনিমা অভির এক ডাকে তার কাছে ছুটে যেত,সেদিন অনেকবার ডাকা স্বত্তেও সে কোনো জবাব দিলো না।এমনকি অভি মোটা চাদরে মুড়িয়ে তাকে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরার পরেও না।
চলবে-
#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
২৬.[দ্বিতীয় অংশ]
[একটু ব্যস্ত।রিচেক পরে দিবো।]
আজ ছুটির দিন।রোজ সকালে যেই নিয়ম মাফিক প্যারেড টা হতো,সেটা আজ আর হয়নি।দেখা গেল মিলিটারি ক্যাম্পের মানুষরাও আজ দিন পার করছিলো চরম আলসেমিতে।
এহতেশাম অবশ্য সকাল সকালই উঠেছে।সে বেশি বেলা করে ঘুমুতে পারে না।রাতে যতই দেরিতে ঘুমানো হোক না কেন,সকাল সাতটায় পাহাড়ের উপর এক চক্কর খাওয়া যেন তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এহতেশাম আজ সকালের নাস্তা নিজেই তৈরি করল।যেই লোকটা সবসময় রান্না করে,তাকে এখনো দেখা যাচ্ছে না কোথাও।তাবুর সামনে এসেই সে দুই দিকে তাকালো।তার ধারণা,আর কাউকে না পেলেও আশিককে ঠিকই পাওয়া যাবে।আশিক ছুটির দিনে সারাক্ষণ কানের সাথে ফোন চেপে রাখে।কেয়ার সাথে তখন তার কথপোকথন দীর্ঘ হয়।এহতেশাম তখন তাকে ডাকে না।দূর থেকে শুধু তার মুখের হাসি পর্যবেক্ষণ করে।একমাত্র কেয়ার সাথে কথা বলতে গেলেই সে ওমন করে হাসে।
আশিককে পাওয়া গেল পাহাড়ের এক মাথায়।পকেটে হাত গুজে এলোমেলো পায়চারি করছিল।এহতেশাম তার কাছে এগিয়ে এলো।গভীর স্বরে বলল,’কি করছো আশিক?’
আশিক চমকের পিলে তার দিকে তাকালো।স্যার যে কখন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে,সেটা আশিক টের পায়নি।মুখোমুখি হতেই সে অপ্রস্তুত হয়ে বলল,’এমনিই স্যার।হাঁটাহাঁটি করছিলাম।’
বলেই সে মাথা নামালো।তারপর আনত স্বরে বলল,’কেয়ার আজ শরীর ভালো নেই।তাই ঘুমুচ্ছে।’
এহতেশাম উত্তরে শুধু মাথা নাড়ে।আশিক ফোনটা পকেটে রেখে মাথা তুলে বলল,’স্যার! আজ পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরতে ইচ্ছে হচ্ছে।চলুন,আপনার জিপে করে এক পাক দিয়ে আসি।’
এহতেশাম তীর্যক চাহনিতে তার দিকে তাকায়।দুই চোখ সরু করে জানতে চায়,’সত্যিই যেতে চাইছো?’
‘জ্বী স্যার।একটু দূরেই চাকমাদের একটা গ্রাম আছে।সেখানে যাবো।’
‘গিয়ে?’
আশিক লাজুক হাসল।
‘তারা খুব সুন্দর সুন্দর এক্সেসোরি’স বানায়।আমি একটু দেখতে চাই সেগুলো।’
এহতেশাম বুঝে ফেলার মতো করে মাথা নাড়ল।তারপর তাবুর দিকে হেঁটে যেতে যেতে বলল,’দাঁড়াও একটু।তৈমুর কে সবটা বুঝিয়ে আসি।সে ডেকে না তুললে এরা দশটা পর্যন্ত ঘুমুবে।’
আশিক হাসি হাসি মুখ করে তার কথা শোনে।স্যারকে আজকাল তার রাখালদের মতোই লাগে।পার্থক্য হলো,রাখালের গরুদের চার পা।আর স্যারের গরুদের দুই পা।উপরন্তু স্যারের গরুরা শিক্ষিত।এছাড়া বাকিসব সেম।স্যার রোজ সকালে তাদের তাবু থেকে বের করে প্রশিক্ষণ দেন।কথা না শুনলে পানিশমেন্ট।কিন্তু স্যার বাদে তাদের অন্য কেউ কটু কথা বললে স্যারের চোখ মুখের রং পাল্টে যায়।স্যারের যুক্তিতে তিনি যেহেতু তাদের গাইড,তাই তিনি বাদে কেউ তাদের শাসন করতে পারবেন না।তিনি বকবেন,মারবেন।দিন শেষে তিনিই তাদের স্নেহ করবেন।কিন্তু অন্য পক্ষ এসে তাদের ভুল ধরলেই স্যারের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।অধীনস্থ ক্যাডেটদের প্রতি একজন সেনা সদস্যের এমন স্বচ্ছ আর নির্মল ভালোবাসা মাঝে মধ্যেই আশিককে মুগ্ধ করে।মনে হয় কোনো এক ছুঁতো খুজে স্যারের আট নম্বর গরু হতে পারলে মন্দ হতো না।তখন স্যারও রোজ ঠেলতে ঠেলতে তাকে দিয়ে ফায়ারিং করাতো।উল্টাপাল্টা ফায়ারিং করলে একটা রামধমক দিয়ে কাঁধের উপর আরো কিছু পানিশমেন্টের বোঝা চাপিয়ে দিতো।
সেদিন তারা এহতেশামের কালো রঙের জিপে করে তেজী অশ্বের মতো ছুটে গেলো আঁকাবাঁকা দুর্গম পাহাড়ের কোল ঘেঁষে।পাহাড়ি রাস্তায় ড্রাইভিং বেশ বিপজ্জনক।কিন্তু স্যারের বহু বছরের প্রশিক্ষণের সুবাদে সেই দুর্গম পথ আশিক পাড়ি দিলো হাসতে হাসতে।পুরো পথে গাড়িটা কোথাও হোঁচট খেল না,অতিরিক্ত ঝাঁকুনিতে আশিকের নাড়ি ভুড়ি জট পাকালো না,এমনকি বাঁক নেওয়ার সময় প্রচন্ড ভয়ে আশিকের শ্বাস আটকে এলো না।
প্রায় দুই ঘন্টা যাবত তারা পাহাড়ের আনাচে কানাচে জিপ দিয়ে ঘুরল।তাদের পরনে ক্যাজুয়াল ড্রেস।আশিক পরেছে নীল শার্ট,আর এহতেশাম সাদা।ক্যাম্প থেকে বের হলে তারা সচরাচর ইউনিফর্ম পরে না।তাদের ক্যাম্পের ব্যাপারেও আশেপাশের লোকজন অবহিত না।লোকালয়ের শেষে একটা বিস্তীর্ণ উপত্যকা।সেই উপত্যকার একেবারে শেষ মাথায় একটা উঁচু পাহাড়।সেই পাহাড়ের একটা অংশজুড়ে মিলিটারি ক্যাম্পের অবস্থান।আশেপাশের অনেক মানুষ জানেই না যে উপত্যকার শেষেও আরো কিছু আছে।
পাহাড়ে তেমন কোনো গ্রাম পাওয়া যায় নি।তবে সমতলে নেমে আসার পর বেশ কিছু চাকমা পল্লী চোখে পড়ল।এহতেশাম স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,’কোনটাতে যেতে চাও আশিক?এসবে আমার কোনো ধারণা নেই।’
‘আমারও নেই স্যার।যেটা ভালো লাগবে,সেখানেই জিপ থামিয়ে নিব।’
এহতেশাম মৃদু স্বরে হাসলো।বলল,’ঠিক আছে।’
অবশেষে একটা পল্লী আশিকের পছন্দ হলো।সে চঞ্চল হয়ে বলল,’স্যার এখানের দোকান গুলো সুন্দর লাগছে।’
‘গাড়ি থামাবো?’
‘না স্যার।আরেকটু সামনে গিয়ে থামাবেন।’
__
কেয়ার পছন্দ কি?সে কেমন জিনিস পছন্দ করে?বিয়ের দিন সে কুন্দনের গয়না পরেছিল।সেটা তো এখানে পাওয়া যাবে না।এখানে আছে বাঁশ আর বেতের জিনিস।সাথে পাথর বসানো গয়না।
আশিক নেড়ে চেড়ে সবগুলো গয়না দেখল।একটা ব্যাগ তার খুব পছন্দ হয়েছে।সে পেছন ফিরে একবার জিপের দিকে তাকায়।স্যার জিপ থেকে নামে নি।আশিকের জন্য তিনি মূলত এখানে গাড়ি থামিয়েছেন।আশিকের সংকোচ হচ্ছিল।সে চেষ্টা করছিল তাড়াতাড়ি সব কিনে তারপর জিপে উঠতে।অথচ এক দোকানেই সে মন মতো সব পেল না।
সে একটু সামনে যেতেই এহতেশাম এক লাফে জিপ থেকে নামল।একটা হাতের ব্রেসলেট খুব দূর থেকে তার চোখে লাগছিল।আশিক দাঁড়ানো ছিলো বিধায় সে জিপ থেকে নেমে সেখানে যেতে পারছিল না।আর যাই হোক,আশিকের সামনে নিশ্চয়ই সে মেয়েলি জিনিসে হাত দিবে না।আশিক জানে সে অবিবাহিত।অধীনস্থ ফৌজিদের সামনে তার একটা আলাদা ভাবগাম্ভীর্য আছে।
সে নেমে গিয়ে ব্রেসলেটটা হাতে নিলো।একবার নেড়েচেড়ে মন দিয়ে দেখলো।দেখতে গিয়েই আরেকটা কানের দুল তার চোখে পড়ল।খুবই ছোটো একটা দুল।এহতেশামের তবুও মনঃপুত হলো।মনে হলো,যাকে উপহার দিবে,তার কানে এটা মানাবে।এহতেশাম খানিকটা ব্যস্ত সুরে বলল,’দাম কতো দু’টোর?’
‘দুইশো পাঁচ টাকা।’
এহতেশাম মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দাম মিটিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।বসেই কাগজের বাক্সটা পেছনের সিটে এক কোণায় রাখল।আশিক আজ আর আসবে বলে মনে হচ্ছে না।এহতেশাম স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে তার অপেক্ষা করে।আশিককে দেখলে তার মাঝে মাঝে বিয়ে করতে মন চায়।তখন সেও ঘন ঘন ফোন দিবে।দিয়ে কোনো কথা বলবে না।যতোক্ষণ না অন্যপাশ থেকে ঐ নির্দিষ্ট মানুষটা বলবে,’কে আপনি?মুস্তাফা?’
ঠিক তখনই সে মুখ খুলবে।এর আগে না।
.
.
.
.
ডিলিরিয়াম,প্রচন্ড জ্বরে হাত পা অবশ হয়ে চেতনা হারানো।অরুনিমার সাথে সেটাই হলো।দুই দিন যাবত জ্বরকে অবহেলা করায় তৃতীয় দিনে এসে সেটা প্রকট আকার ধারণ করল।অরুর শব্দ জড়িয়ে যাচ্ছিল।বারবার শরীরে কাঁপুনি উঠে যাচ্ছিল।সেই খিঁচুনি এক পর্যায়ে বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় গেল সে অরুনিমা জ্ঞান হারিয়ে অবচেতন হয়ে পড়ে থাকল।
অভি তার নাড়ি স্পন্দন মাপতে গিয়েই উন্মনা হলো।অস্থিরতায় বার বার সে তার গাল কপাল স্পর্শ করলো।তার শরীর ক্রমশই জমে বরফ হয়ে যাচ্ছিল।সেই হিম শীতল শরীরটা অভির বার কয়েক ঝাঁকুনিতেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।অভির কাছে সেটা অবিশ্বাস্যই মনে হলো।মনেই হচ্ছিল না যে সামনে থাকা মেয়েটা অরুনিমা।অরুনিমার স্বভাব ছিলো এক দৌড়ে তার কাছে আসা,সারাক্ষণ তার গা ঘেঁষে থাকা।মাঝে মাঝে খুব শখ করে তার কাঁধে মাথা রাখা।কোনো কিছু চাইতে হলে অভির কাঁধে নাক আর মুখ ঘঁষে মিষ্টি করে সেটার বায়না ধরা।আর সবশেষে দুই হাত ছড়িয়ে তাকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরা।এই প্রত্যেকটা কাজ সে অভির মহাবিরক্তি মুখের মহাবিরক্ত চাহনিকে উপেক্ষা করেও করতো।অথচ সেদিন অভি কতো আদর দিয়ে তাকে ডাকলো! সে তবুও চোখ খুলে নি।তার এই স্বরূপ অভির কাছে একেবারেই অচেনা ঠেকালো।
ঐ রোগা পাতলা শরীরটা চাদরে মুড়িয়েই সে একটানে তাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছিল।নিরুপমা ঘরে এসেই আঁতকে উঠে বলল,’কি হয়েছে?অরুর কি হয়েছে?’
অভির কন্ঠ নিষ্প্রাণ।আস্তে করে বলল,’কিছু না।জ্বরে সেন্সলেস হয়েছে।হাসপাতালে নিতে হবে।’
‘সেন্সলেস!’ বলতে গিয়েই নিরুপমার চিত্ত ব্যকুল হয়।
তারপর সেই রাতেই অরুনিমাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো,আনুমানিক তিনটার দিকে।অভির গায়ে থাকা শার্ট জবজবে ভেজা থেকে আবার শুকনো হয়ে উঠল তার গায়ে থাকা অবস্থাতেই।ভোরের দিকে অভির ক্লান্তি ধরেছিল।তখন সে চুপ করে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসেছিল।তার মাথা ধরেছিল খুব।অথচ বাড়ি গিয়ে ঔষধ খেয়ে একটু শুয়ে থাকতে মন সায় দিচ্ছিলো না।
নিরুপমা জড়োসড়ো হয়ে করিডোরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল।তার চোখ ভেজা।নিহাদ তার কাঁধে মাথা ফেলে শান্তিতে ঘুমুচ্ছে।তার মুখ অল্প খোলা।নিরুপমা দুই হাতে তাকে বুকের সাথে চেপে ধরেছে।
অভি মাথা তুলে বলল,’নিরুপমা! বসো।’
নিরুপমা এক কথাতেই বসল।কিছুক্ষণ উসখুস করে শেষে জানতে চাইলো,’কি বলল ডাক্তার?’
‘জ্বর।সেরে যাবে।চিন্তার কিছু নাই।’
চিন্তার কিছু নাই।কিন্তু অভি ক্রমাগত নিজের দুই হাতের তালু ঘঁষে যাচ্ছিল।সে খুব গাছাড়া প্রকৃতির মানুষ।কিন্তু নিরুপমার একটা ফোন কলেই সে কেমন করে এখানে ছুটে এলো,সেটা ভাবলেও তার অস্বস্তি লাগে।
অভি পাথর হয়ে সিটে বসে।অরুনিমার জ্ঞান না ফেরা অব্দি তার অস্বস্তি থামবে না।সে কেবল সাময়িক শান্তি চেয়েছিল।অরুনিমা কি ভাবলো?সে কি ভাবলো অভি বিচ্ছেদ চায়?এমনটা হলে সে ভুল ভাবছে।অভি কোনোদিনই বিচ্ছেদ চায় নি।
______
সুচিস্মিতা কাঁধের ভ্যানিটি ব্যাগটা কাঠের বেঞ্চের উপর ফেলে খুব ক্লান্ত হয়ে বেঞ্চে বসলো।বিনু নামের লোকটা একবার চোখ তুলে তাকে দেখতেই চিনে নিলেন।তার দোকানে মেয়েরা সচরাচর আসে না।আসলেও মাসে এক দুইবার।কিন্তু এই মেয়েটা প্রায়ই এখানে আসে।
বিনু চায়ের লিকারের রং দেখতে দেখতে বলল,’আপা! চা দিবো?’
সুচিস্মিতা মাথা তুলল।ঠান্ডা স্বরে বলল,’আপাতত না।জুহায়ের আসুক।তারপর দিবেন।’
‘জগলুর তো আসতে দেরি হবে আপা।’
‘কেন?’
‘জানি না।কিছুক্ষণ আগেই তো গেল এখান থেকে।’
‘ওহহ্।’
মিতা আবার মাথা নামিয়ে নিল।তারপর মনের অজান্তে দুইবার হাই তুলল।আজ অফিস থেকে হাফ ডে ছুটি নিয়েছে সে।নানা কারণে আজ মেজাজ বিগড়ে আছে।ভেবেছিল এদিকে এসে জুহায়েরের সাথে মিনিট দশেক কথা বলে দু’জন মিলে নীলক্ষেত যাবে।কিন্তু সেটা আর হলো কোথায়?জুহায়ের নেই এদিকে।কোথায় যেন গিয়েছে।
সুচিস্মিতা তবুও তার অপেক্ষা করে।কোনো বিরক্তি ছাড়া,কোনোরকম ললাট কুঞ্চন ছাড়া।
জগলু এলো আরো দু’ঘন্টা পরে।কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা সুচিস্মিতার অবনমিত মস্তক দেখেই আশ্চর্য হয়ে বলল,’মিতা! আপনি?’
সুচিস্মিতা মাথা তুলে।একগাল হেসে বলে,’আপনার অপেক্ষাই করছিলাম জুহায়ের।’
‘অফিস যান নি আজকে?’
‘গিয়েছি।হাফ ডে করে চলে এসেছি।ভালো লাগছিলো না আমার।’
জগলু তার মুখোমুখি বেঞ্চে বসল।দুই চোখ সরু করে জানতে চাইলো,’সমস্যা কি?অফিসে কোনো ঝামেলা?’
‘জ্বী না।ওমন কিছু না।’
‘তাহলে?’
‘এমনিই।’
‘কতোক্ষণ হলো এলেন?’
‘হবে।দুই আড়াই ঘন্টার মতো।’
জগলু হকচকিয়ে উঠে বলল,’কিহ্! আড়াই ঘন্টা!’
সুচিস্মিতার কন্ঠ স্বাভাবিক।চাপা স্বরে বলল,’জ্বী।আড়াই ঘন্টা।’
‘আপনি পা’গল?আমায় ফোন দেন নি কেন?’
‘দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল না।আপনার অপেক্ষা করতে ভালোই লাগছিলো।’
মিতা! এটা কোনো সুস্থ মানুষের কথা না।’
‘আমি সুস্থ মানুষ নই।’ সুচিস্মিতা আগের মতো করেই হাসলো।
‘আমার নম্বর তো আছেই আপনার কাছে।ফোন দিলেন না কেন?’
‘বললামই তো।ইচ্ছে হচ্ছিল না।অপেক্ষা করতে ভালো লাগছিলো।’
‘অদ্ভুত!’
সুচিস্মিতা গালের নিচে হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে বলল,’আমি নীলক্ষেত যাবো।কয়েকটা পুরান বই কিনবো,উপন্যাসের।একা একা বইয়ের দোকানে হাঁটতে বিরক্ত লাগে।তাই কিছু সময়ের জন্য আপনাকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে চাইছি।’
জুহায়ের হাসে।উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’আচ্ছা।চলুন তাহলে।’
সুচিস্মিতা বলল,’আগে চা খেয়ে নেই।বিনুদার বেঞ্চটা এতো সময় ধরে ব্যবহার করলাম।বিনিময়ে একটু তার পকেট ভারি করার ব্যবস্থা করে দেই।’
*
চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়েই জগলু বলল,’আসলে হাসপাতালে আজ অনেকটা সময় লেগে গেল।’
‘সেকি! হাসপাতালে কেন?বাড়ির সবাই ঠিক আছে?’
‘জ্বী আছে।’
‘তাহলে?’
জগলু ঘাড় নেড়ে বলল,’অরুর কথা মনে আছে?সেদিন যে আপনার সাথে বসে কথা বলল?’
‘জ্বী।আছে।’
‘অরুর শরীরটা খুব খারাপ।তাকেই দেখতে গিয়েছিলাম।’
‘আয়হায়! কি বলেন! কি হলো তার?’
‘প্রচন্ড জ্বর।জ্বরে হাত পা অবশ হয়ে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল।’
‘এরপর?’
‘এরপর হাসপাতালে আনাতে জ্বর কিছুটা কমেছে।’
সুচিস্মিতা উদগ্রীব হয়ে বলল,’আমি তাকে দেখতে চাই জুহায়ের।আপনি হাসপাতালের এড্রেস দিন।আমি গিয়ে দেখে আসবো।’
‘সেকি! আপনি তো বলছিলেন নীলক্ষেত যাবেন।’
‘সেটা পরেও যাওয়া যাবে।আগে আমি অরুনিমাকে দেখতে যাবো।আহারে! বাচ্চা একটা মেয়ে।শুনেই তো খারাপ লাগছে।’
জগলু পুরোটা চা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’তাহলে আমার সাথে চলুন।আমি আবার যাবো।’
‘কেন?মাত্রই তো এলেন।’
‘এমনিই।আমারও অকারণে হাসপাতাল যেতে ইচ্ছে করছে।’
সুচিস্মিতা ফিক করে হেসে দিল।পরমুহূর্তেই আবার হাসি থামিয়ে বলল,’আচ্ছা চলুন তাহলে।’
.
.
.
.
সব শুনে সুচিস্মিতা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,’ধরে দু’টো চ’ড় দিলে সব নাটক বেড়িয়ে যাবে।নাটকের আর জায়গা পায় না।আমায় এখনো চেনেনি সে।’
জগলু তব্দা খেয়ে তার কথা শুনে।তারপর একহাত তুলে তাকে শান্ত করার জন্য বলে,’হয়েছে হয়েছে মিতা।এবার থামুন।আপনাকে চ’ড় মা’রতে হবে না।অরুই তাকে মে’রে দিয়েছে।’
‘অনেক কম মে’রেছে।আমি হলে দু’গাল ফাটিয়ে দিতাম ধরে।কতো বড়ো সাহস! আরেকজনের বর কে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখায়।’
জগলু মাথায় হাত রেখে তার কথা শুনে।সে রিকশায় আসতে আসতে মিতাকে সব খুলে বলেছে।শোনার পর থেকেই মিতা এক নাগাড়ে সৃজনীকে গাল মন্দ করে যাচ্ছে।তার ভয়ংকর গালি থেকে সৃজনীর চৌদ্দ গোষ্ঠীর কেউই বাদ যাচ্ছে না।জগলু অসহায় হয়ে বলল,’মিতা! আপনার রাগ যথার্থ।সৃজনীর দোষ শতভাগ,এটাও যথার্থ।কিন্তু মিতা! সৃজনীর দিকটাও আপনাকে কল্পনা করতে হবে,অনুভব করতে হবে।কয়জনই বা পারে,এতো বছরের অনুভূতি এতো সহজে মিটিয়ে দিতে?’
‘ঐ তো।যারা পারে না,তাদের জু’তো পে’টা করে লাইনে আনতে হয়।আরেক মেয়ের সংসার,আরেক মেয়ের বর।সে কেন পানি খাওয়াতে আসবে?সে কে অন্য মেয়ের বরের হাতে মলম লাগানোর?সে কি তার কামলা খাটার দায়িত্ব নিয়েছে?এতো আবেগ কেন?আমার এসব অসহ্য লাগে।’
সে থামে।একটু পরেই আবার কটমট করে বলে,’পুরোনো আবেগ না ছাই! তোর ভাই তোকে ভালোবাসে?তুই কেন আগ বাড়িয়ে ভালোবাসবি?এটা অনেকটা এমন হলো না যে,আমি নিজেই রেললাইনের উপর গিয়ে শুয়ে আছি।তারপর ট্রেন আমার উপর দিয়ে চলে গেল,আর আমি ভিক্টিম সেজে বললাম আমি ট্রেনের নিচে কা’টা পড়েছি।যেখানে আমি নিজেই সেধে সেধে রেললাইনের উপর গিয়ে শুয়েছি।’
জুহায়ের তার জামার হাতা টেনে ধরে অনুনয়ের স্বরে বলল,’হয়েছে মিতা।এবার থামুন।আপনাকে বলে তো মহা মুশকিলে পড়লাম।আপনি তখন থেকে সেটা নিয়ে পড়ে আছেন।’
‘তো পড়ে থাকব না?’
সুচিস্মিতা ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,’সামনে পেলে এক চ’ড় মেরে আবেগ সব বের করে দিতাম।ঘরে বউ আছে জানা স্বত্তেও যেই মেয়েরা অন্যের বরের দিকে নজর দেয়,তাদের প্রতি আমার তীব্র অরুচি কাজ করে।আর তাছাড়া যাদের আমার পছন্দ,তাদের ব্যাপারে আমি কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট।’
‘অরু আপনার পছন্দের?’
‘জ্বী।অনেক বেশি।তার হাসিতে যা আছে,তা আর অন্য কিছুতে নেই।আমার তার জন্য মায়া হয়।এই বিচ্ছিরি পৃথিবীটা অরুর জন্য না।’
জগলু হাসল।মাথা নেড়ে বলল,’আমারও তাই মনে হয়।ছলনা কিংবা কপটতা বোঝার জন্য যেই বিচক্ষণ মস্তিষ্কের দরকার হয়,সেটা অরুর নেই।’
‘দোষটা মস্তিষ্কের না জুহায়ের।সে খুব নির্মল একটা চরিত্র।প্রথম যখন তাকে আপনার বন্ধুর সাথে বাইকে দেখেছি,তখনই বুঝে গেছি সে খুব মিষ্টি একটা মেয়ে।কেমন করে আপনাকে টিপ্পনী কাটলো!’
বলেই সে হালকা হাসল।জগলু বিনিময়ে কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল।অভি আপাতত এখানে নেই।বাইরে গিয়েছে কিছু ঔষধ আনার জন্য।সব ঔষধ হাসপাতালের ফার্মেসিতে নেই।
অরুনিমার ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন,’মিসেস অরুনিমার জ্ঞান ফিরেছে।আপনারা চাইলে তার সাথে দেখা করতে পারবেন।’
নিরুপমা দরজার কাছেই ছিলো।ডাক্তারের কথা শোনার পর সবার প্রথমে ভেতরে গিয়েছিল নিরুই।
অরু তখন পিটপিট চোখে পুরো ঘর দেখছিল।তার আবছা আর ঝাপসা চাহনিতে সবার প্রথমে ধরা পড়ল নিরু আপার উৎকন্ঠিত মুখ।নিরু আপা তার গালের দু’পাশে হাত রেখে বললেন,’অরু! আমার সোনা বাচ্চা।এই যে দেখ,আপা এসেছি।তুতুন এসেছে।তুই কোলে নিবি না তুতুনকে?’
অরুনিমা অল্প করে হাসল।শরীরের সমস্ত অস্থিসন্ধিতে তখনও তীব্র ব্যাথা।সে শ্বাস টেনে টেনে মৃদু স্বরে বলল,’নিরু আপা! আমার মাথায় হাত বুলাও আপা!’
নিরুপমা খুব যত্ন করে তার মাথায় হাত ছোঁয়ায়।তারপর পর পর দু’টো তার কপালে আর্দ্র চুমু খায়।
অরু বলল,’আপা! হামাদ আসে নি বাড়িতে?’
‘এসেছে তো।উনিই তোকে হাসপাতালে নিয়ে আনলেন অরু।’
‘আমি হাসপাতালে?’
বলতে বলতেই অরুনিমা বড়ো করে চোখ খোলার চেষ্টা করে।
সে পুরোপুরি হুশে এলো আরো আধঘন্টা পরে।শরীরটা তখন একটু শক্তি পেল।অরুনিমা নিজের হাতে ভর দিয়ে উঠে বসলো চুপচাপ।
ভালো মতো চোখ মেলতেই দেখল তার কেবিনে তার পায়ের দিকটায় একটা মেয়ে দাঁড়ানো।তাকে দেখতেই অরুর মুখে হাসি ফুটে।সে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে,’মিতা আপা! তুমি?’
সুচিস্মিতা এগিয়ে এলো।আলতো করে তার মাথায় হাত রেখে জানতে চাইলো,’কেমন আছো সুইটহার্ট?’
‘এখন ভালো।অনেক ভালো।তুমি অফিস যাওনি আজ?’
‘না,ছুটি নিয়েছি হাফ ডে এর পর।’
অরু কেবল উপরনিচ মাথা নাড়ল।সুচিস্মিতা তার কাছাকাছি এসে বলল,’এ্যাই যে মিষ্টি মেয়ে! এবার কিন্তু বরের সাথে একটা কঠিন রাগ করতে হবে।টানা সাতদিন কোনো কথা বলা যাবে না।সে কথা বললে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে হবে।’
অরুনিমা ছোটো ছোটো চোখে তার দিকে তাকালো।বলল,’সে তো আসবেই না আমার কাছে।’
‘আসবে না মানে?সে আসবে না,তার ঘাড় আসবে।সে অবশ্যই আসবে অরু।কিন্তু তুমি তখন মুখ লটকে রাখবে।সে যেমন করে রাখতো,ঠিক ওমন করে।বুঝেছো?’
‘জ্বী বুঝেছি।’
‘আর যদি দেখি তুমি তার দু’টো মিষ্টি কথায় গলে গিয়েছো,তবে আমি আর তোমার সাথে কথা বলবো না।’
অরু তপ্তশ্বাস ছাড়ল।একটু রয়ে সয়ে বলল,’তুমি জানো আপা,সে কখনো আমার সাথে মিষ্টি করে কথা বলে না।আমার খুব কষ্ট লাগে।সে আসলে আমাকে একটুও পছন্দ করে না।’
সুচিস্মিতা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,’এমনই হয়।ঘরে মধুর ডিব্বা ফেলে চার রাস্তার মোড়ে পড়ে থাকা গুয়ের চারপাশে ঘুর ঘুর করতে পছন্দ করে পুরুষ জাতি।’
জগলু ক্ষেপে গিয়ে বলল,’এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে।অভি মোটেও সৃজনীর চারপাশে ঘুর ঘুর করে নি।আর না ছেলেরা ওমন।’
‘এহহহ এসেছে ছেলেদের হয়ে গান গাইতে!’
অরু খিলখিলিযে হাসলো।পেটে হাত চেপে বলল,’হামাদ খুব রাগ হবে,যদি শুনে যে তুমি তার নামে এই কথা বলেছো।’
‘বাপরে! তার রাগ কে কতো আমি ভয় পাই।এমন চিনির মতো মিষ্টি একটা মেয়েকে যে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে বাপের বাড়ি রেখে আসতে পারে,তার রুচি নিয়ে আমি সন্দিহান।’
অরু আগের মতো করেই হাসল।তার জ্বর কিছুটা কমে এসেছে।আগের তুলনায় শরীরটাও ভালো লাগছে।তুতুন কে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ সে তার সাথে খেলা করলো।
অভি এসেছিল বিকেলের দিকে।সব ঔষধ জোগাড় করে।অরুনিমার জ্ঞান এসেছে শুনেই সে বড় বড় পায়ে তার কেবিনের সামনে গেল।
কেবিনের দরজায় সুচিস্মিতা দাঁড়িয়েছিল।করিডোরে অভিকে দেখেই সে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।ভাব এমন করলো যেন অভিকে সে দেখতেই পায় নি।পেছন থেকে একটা গম্ভীর স্বর অনুনাদিত হয়ে তার কানে ভেসে এলো।
‘সরে দাঁড়ান।’
সুচিস্মিতা পেছন ফিরে।চোখ মুখ শক্ত করে বলে,’না।আমি এখানেই দাঁড়াবো।’
‘কেবিনের দরজা কোনো দাঁড়ানোর জায়গা না।সরে দাঁড়ান।’
মিতা তবুও নড়লো না।গো ধরে বলল,’আমার কেবিনের দরজায় দাঁড়াতেই ভালো লাগে।’
বলেই সে আগের মতো করে পথরোধ করে দাঁড়ায়।অভি থমথমে মুখে তার কর্মকাণ্ড দেখে।তারপর এক ঝাড়ায় তার হাত সরিয়ে দিয়ে তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে দরজা থেকে দূরে ঠেলে দেয়।তারপর বড় বড় কদমে সামনে এগিয়ে যায়।সুচিস্মিতা তাজ্জব হয়ে তাকে দেখে।কি বেয়াদব লোক! ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকে গেল! না কোনো সৌজন্য,না কোনো ভদ্রতা।অরুর মতো মিষ্টি মেয়ের সাথে এই বুনো ভাল্লুকের বিয়ে দিলো কে?
অরুনিমা আধশোয়া হয়ে কেবিনের বেডে ঠেস দিয়ে রেখেছিল।অভি গিয়ে তার সামনে বসলো।নিরুপমা আস্তে করে দরজা থেকে সরে এলো।জগলু নিজেও সুচিস্মিতাকে টানতে টানতে কেবিন থেকে বের করল।মিতা বিরক্ত হয়ে বলল,’টানলেন কেন?আমি এদের কথা শুনতাম।আপনার বন্ধু যদি আর একটা কথা বলেও অরুকে কষ্ট দিতো,তাহলে আমি তার মাথা ফা’টিয়ে দিতাম।’
‘আপনার মাথা ফা’টাতে হবে না।আমার বন্ধু যথেষ্ট বুঝদার।সে ঠিক বুঝবে যে কি করতে হবে।’
_____
অভি মোটা স্বরে বলল,’অরুনিমা! এখন কেমন আছো তুমি?’
অরু অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে বলল,’ভালো।’
অভি তার কপালে হাত ছোঁয়াল।অরুনিমা এক ঝাড়া মেরে তার হাত সরিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,’ধরবে না তুমি আমাকে।’
অভি হতবুদ্ধি হয়ে তাকে দেখে।কান্না করার পর তার কন্ঠ বাচ্চাদের মতো শোনায়।এটা একটা অস্বস্তির বিষয়।অভির তখন মনে হয় তার বিয়ে হয়েছে কোনো বারো তেরো বছরের বাচ্চা মেয়ের সাথে।সেটা মনে হলেই তার প্রচন্ড প্রচন্ড অস্বস্তি হয়।
সেদিন অরুনিমা সত্যিই অভিমান করলো।দু’টো মিষ্টি কথাতেই আর গলে গেল না।উল্টো মুখ ভার করে অনেকটা সময় অন্যদিকে মুখ সরিয়ে রেখেছিল।
অভি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বসে থাকে।আর নিজে থেকে ডাক দেয় না।এমন পরিস্থিতিতে কি করা উচিত,তার জানায় নেই।একজন নারীর অভিমান গলানোর জন্য নারী সম্পর্কে পূর্বের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।অভির সেটা নেই।অভি তার মান ভাঙবে কেমন করে?
____
সেই রাতটা অভি কেবিনেই ছিলো।অরুনিমা বারোটা নাগাদই ঘুমিয়ে কাঁদা হলো।শরীরে ক্লান্তি ছিলো।অভি তাকে ডাকল না।শুধু দেখল ঘুমন্ত অবস্থায় তার হাতটা একটু একটু কাঁপছে।সেই হাত স্পর্শ করতে গিয়ে অভি টের পেল তার নিজেরও হাত কাঁপছে।কি আশ্চর্য!
সকালে অরুনিমা একটু নড়েচড়ে উঠতেই অভি তার হাত ছেড়ে দিলো।অরুনিমার চোখের পাতা কাঁপছিলো। অভি ইতস্তত করে তার সামনে এসে বসলো।তার কন্ঠে প্রকম্পন।একটা ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে ডাকলো,’অরুনিমা!’
অরুর তখন ভীষণ জ্বর।তাপমাত্রা একটু কমেছে কিন্তু সহনীয় পর্যায়ে নামে নি।তার চোখ বুজে রাখা।প্রতিটা নিঃশ্বাসে বুক উঠানামা করছিলো।অভির কন্ঠ কানে যেতেই তার দুই ঠোঁট কেঁপে উঠল।অভি দেখলো মেয়েটার চোখের কার্ণিশ গড়িয়ে এক ফোঁটা তরল খুব ধীরে গাল বেয়ে কান পর্যন্ত এসে পৌঁছুলো।সে কি কাঁদছে?কেন কাঁদছে?অভি তো তার কেউ না।কেউ হওয়ার মতো তাৎপর্যপূর্ণ কোনো ব্যবহার অভি তার সাথে করে নি।সে বরাবরই তাকে অবহেলা করেছে।
সে আবার ডাকে,’অরুনিমা! শুনছো তুমি?’
অরু চোখ খোলে না।নাক টানতে টানতে শুধু বলে,’তুমি চলে যাও।আমি আর কখনো কথা বলবো না তোমার সাথে।’
অভি গেল না।উল্টো তার একটা হাত স্পর্শ করলো।অরুনিমা ঝাড়া মেরে সেই হাত সরিয়ে দিলো।অভি গা করলো না।উঠে গিয়ে তার গালের নিচে একহাত রেখে বলল,’অরু! শাহরুখ খানের নাকি নতুন সিনেমা বেড়িয়েছে।তুমি দেখতে যাবে না?’
অরুনিমা এবার গিয়ে চোখ খুলল।চট করে অভির দিকে ফিরে গোল গোল চোখে প্রশ্ন করল,’সত্যি?সিনেমার নাম কি?’
তার কন্ঠটা আজ বাচ্চাদের মতো শোনাল।মনে হলো,তুতুন কথা বলছে শুয়ে শুয়ে।বহুদিন পর আজ অভি হাসলো।একদম অল্প হাসি।তারপর মাথা নেড়ে বলল,’জানি না।আদৌ সিনেমা বেড়িয়েছে নাকি সেটাও জানি না।’
অরু ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকায়।তারপর ভোঁতা মুখে বলে,’তুমি বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলছ?’
‘মিথ্যা কোথায়?ছবি বের হলেও হতে পারে।এদের তো মাসে মাসে সিনেমা বের হয়।’
অভি আস্তে করে তার একটা হাত মুঠোয় নিলো।অরু চট করে সেই হাত সরিয়ে নিয়ে অন্যপাশে ফিরে বলল,’তুমি ধরবে না আমায়।কথাও বলবে না আমার সাথে।আমি রাগ হয়েছি।আর কখনো কথা বলবো না তোমার সাথে।’
অভি উত্তর দেয় না।নির্বিকার হয়ে বসে অরুনিমার মুখের দিকে তাকায়।সে মুখটা বালিশের সাথে চেপে ধরেছে।একটু পরেও যখন অভির দিক থেকে কোনো শব্দ এলো না,তখন অরু মুখের সামনে থেকে বালিশ সরিয়ে তার দিকে তাকালো।মৃদু ধমকের সুরে বলল,’যাও তুমি।’
‘কোথায় যাবো?’
‘তোমার বাড়িতে যাও।’
অভি গলা খাকারি দিয়ে বলল,’আমার কোনো বাড়ি নাই।’
আপনাআপনি কপাল কুঁচকে এলো অরুনিমার।ত্যাছড়া চোখ করে বলল,’শিকদার বাড়ি তোমার বাড়ি না?’
‘হুম।’
‘তাহলে?’
‘বাড়ি আমার।কিন্তু ঘর তো নেই।’
অরু ঠোঁট উল্টে বলল,’তুমি তাহলে কোথায় থাকো?’
অভি গম্ভীর মুখ করে বলল,’আমি থাকি অরুনিমার ঘরে।’
অরুনিমা ভ্রুকুটি করে।
‘আমার ঘর?’
‘হুম।তুমিই তো দেয়ালে পেনসিল দিয়ে লিখেছো Arunima’s Home.’
অভি বড়ো দায়সারা হয়ে কথাটা বলল।কিন্তু অরুনিমা হা হয়ে তার কথা শুনলো।তারপরই ফিক করে হেসে দিলো।হাসিখুশি মুখ টা বালিশের সাথে চেপে ধরে সে কিছুক্ষণ লজ্জা পেল।তারপর হাত পা ছুঁড়ে বলল,’তুমি ইচ্ছে করে আমায় হাসানোর জন্য এসব বলছো।যাও তুমি এখান থেকে।ভাল্লাগে না।’
অভিও জেদ করল।পুনরায় অরুনিমার হাত ধরে বলল,’নাহ্।আমি যাবো না।তুমি আগে সুস্থ হয়ে আমার সাথে বাড়ি ফিরবে।তারপর দেয়ালের লিখাটা সংশোধন করে লিখবে Abhi & Arunima’s house.তারপর আমি যাবে।এর আগে না।’
চলবে-