#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৩০.[প্রথম অংশ]
মিলিটারি ক্যাম্পে সকাল হয়েছে একটু আগে।টকটকে কমলা রঙের সূর্য উকিঁ দেওয়ার আগেই রাইফেল আর শটগান গাড়িতে ফেলার শব্দে সৈনিকদের ঘুম ভেঙে গেল।
ইয়াকুব ঘুম ভাঙতেই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে তাবুর সামনে এসে দাঁড়ালো।
বাকিরাও ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে আসছে।জিতু আড়মোড়া ভেঙে চারপাশ দেখে বলল,’আজও প্যারেড করাবে নাকি?’
তন্ময় মুখ গোমড়া করে বলল,’মনে হয় না।’
‘আমার আজ কেমন কেমন যে লাগছে।’
মাহিম ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,’সবার ঐ এক অবস্থা।’
‘যদি মরে যাই?’
রাফিদ হাসল।বলল,’ম’রে গেলে কবর দিবে।বাজে বকিস না তো।’
সবাই মৃদুস্বরে হাসলো।সাদাফ অবশ্য হাসতে পারল না।সে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলল,’তোমরা এতো নির্ভার হয়ে আছো কীভাবে বলো তো?জুমঘরের ভেতর কোনো সাধারণ মানুষ নেই।এরা সন্ত্রাস।এদের কোনো মায়া দয়া নেই।কিছু একটা যদি হয়ে যায় আমাদের?’
অয়ন প্রতিবাদ করে বলল,’তোকে কে বলেছে যে আমরা ভয় পাচ্ছি না?আমার কলিজা আমার হাতে।কিন্তু কেঁদে কি হবে?তাই হেসে হেসে একটু স্বাভাবিক হচ্ছি।মনে মনে আমি এখনো দুরুদ পড়ে যাচ্ছি।’
আশিক হাসিমুখে তাদের সামনে এলো।সটান দাঁড়িয়ে সবাইকে একনজর দেখে বলল,’বয়েজ! তোমরা প্রস্তুত?’
সবাই সমস্বরে বলল,’ইয়েস স্যার।’
‘গুড।’
‘মেজর স্যার কোথায়?’
‘স্যার মনে হয় কারো সাথে কথা বলছে।বের হওয়ার আগে তো হেড অফিস থেকে অনুমতি লাগে।সেজন্য বোধহয় একটু ব্যস্ত।’
জিতু ভীত স্বরে বলল,’আচ্ছা স্যার।এসবে কি কেউ মারা যায়?’
আশিক সামান্য হাসল।মাথা নেড়ে বলল,’মা’রা তো যায়।তবে ক্যাডেটদের তেমন ফ্রন্টলনাইনে রাখা হয় না।ফ্রন্টলাইনে থাকবো আমরা।যারা কমিশন পেয়ে গেছি,তারা।তোমরা তো বাচ্চা মানুষ।তাই তোমাদের একটু ছাড় দেওয়া হলো।’
‘এহতেশাম স্যার সবার সামনে থাকবেন?’
‘এটা সেখানে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।তোমরা ভয় পাচ্ছ নাকি?ভয়ের কিছু নেই।মনে করো তোমরা কোনো ছিচকে জুতো চোর ধরতে বেরিয়েছ।তাহলে আর ভয় লাগবে না।’
___
সব প্রস্তুতি নেওয়া সম্পন্ন হয়েছে।এহতেশাম তখন তন্ময়দের সাথে কথা বলছিলো।আশিক হঠাৎই পেছন দিকে হাঁটা দিলো।তৈমুর বলল,’সেকি! তুমি যাচ্ছো কোথায়?’
আশিক কনিষ্ঠ আঙুল তুলে ফিচেল হেসে বলল,’প্রকৃতির ডাক।’
তৈমুর আর কিছু বলল না।আশিক একপ্রকার ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের ধাঁরে গেল।তারপরই হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন বের করে তার সেই কাঙ্ক্ষিত নম্বরে ফোন দিলো।
কেয়া ফোন ধরেই সামান্য ধমক দিয়ে বলল,’সমস্যা কি?আপনি না বললেন আজ আর ফোন দিবেন না?’
আশিক শ্বাস টানতে টানতে বলল,’একটু সুযোগ পেলাম অনেক কষ্টে।’
‘সেকি! হাপাচ্ছেন কেন?’
‘দৌড়ে দৌড়ে পাহাড়ের এক মাথায় এসেছি।’
‘আয়হায়! কেন?’
‘তোমার সাথে একটু কথা বলতে।’
কেয়া কপাল চাপড়ায়।
‘আপনি পাগল?’
‘হুম।ইদানিং হয়ে যাচ্ছি।’
কেয়া হঠাৎই কেমন অন্যরকম কন্ঠে বলল,’সাবধানে থাকবেন কেমন?’
‘আচ্ছা।’
‘আপনার স্যার কি করছেন?’
‘সাত গরুকে সাহস দিচ্ছেন।’
কেয়া হাসল।অতি সন্তর্পণে চোখের পানি মুছে বলল,’বেস্ট অফ লাক সবাইকে।’
‘থ্যাংক ইউ।’
আশিক হঠাৎ ব্যস্ত সুরে বলল,’কেয়া! কেয়া! সবাই আমায় খুঁজছে।আমি যাই।পরে কথা হবে।টাটা।’
কথা শেষ করেই সে আবার ক্যাম্পের দিকে ছুটে গেল।সবাই যার যার মতো গাড়িতে উঠে বসেছে।আশিক দ্রুত এহতেশামের পাশে গিয়ে বসল।এহতেশাম আড়চোখে তার দিকে তাকালো।গম্ভীর মুখ করে বলল,’সেখানে গিয়ে তোমার ফোনটা আমায় দিবে আশিক।’
আশিক আশ্চর্য হয়ে বলল,’কেন স্যার?’
‘কারণ তোমায় ভরসা করতে পারছি না।তুমি মিশন চলাকালীনও কেয়াকে ফোন করতে পারো।তোমার ভাবসাব আজকাল সুবিধার ঠেকছে না।’
আশিক লজ্জায় হেসে ফেলল।অস্বস্তি মেশানো কন্ঠে বলল,’স্যার সরি।আর এমন হবে না।’
গাড়ি দু’টো সাঁ সাঁ করে আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে যায়।সোর্স তাদের পথ দেখিয়ে সাহায্য করছে।টার্গেট এলাকায় যেতেই গাড়ির ইঞ্চিন বন্ধ করা হবে।তারপর সাতজন ক্যাডেট প্রথমবারের মতো একটা মিশনের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।
.
.
.
অরুনিমা মাথায় হাত চেপে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,’শেষ! আমার সব শেষ!’
বলেই সে দ্রুত অভির দিকে ফিরে।সে আশা করেছিল,অভি কোনো প্রতিক্রিয়া দিবে।কিন্তু অভি কিছুই বলল না।সে জানালার ধারে আগের মতো করেই বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়েছিল।
অরুনিমা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,’তুমি এতো ভালো মানুষ! আমি চাইলাম।আর তুমি করে নিলে? আসলে তোমার মনে মনেই শয়তানি ছিলো।সুন্দরী বউ পেয়ে ওৎ পেতে বসেছিলে।যেই না সুযোগ পেলে,ওমনি ফরজ কাজ সেরে নিলে।’
অভি উত্তরে শুধু কপাল কুঁচকালো।অরুনিমা মাথায় হাত চেপে বলল,’আমার মাথা এখনও চরকির মতো ঘুরছে হামাদ।মনে হচ্ছে আরো একটু ঘুমাতে হবে।’
অভি গম্ভীর হয়ে বলল,’দশ ঘন্টা টানা ঘুমিয়েছো।বাকি ঘুম বাড়ি গিয়ে ঘুমাবে।’
অরুনিমা কেবল উপর নিচ মাথা নাড়ল।তারপর গা ছেড়ে খাটে শুয়ে বলল,’আমি তোমাকে দু’টো করে দেখছি।এতো ঘুম আসে কেন?’
অভি স্থির চোখে তার দিকে তাকালো।নিরেট স্বরে ডাকলো,’অরুনিমা!’
‘কি?’
‘একটা কাজ করতে পারবে?’
‘কি কাজ?’
অভি একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,’তোমার মিতা আপার ঐ ঔষধটা আমায় এনে দিতে পারবে?’
‘কেন?তুমিও খাবে নাকি?’
অরু চোখ বড় বড় করে জানতে চাইলো।
অভি আস্তে করে বলল,’হুম।’
পর পরই আবার বলল,’দয়া করে সুচিস্মিতা কে দেখিয়ে আনবে না।’
‘কেন?’
‘এমনিই।’
অরু ঠোঁট গোল করে বলল,’অদ্ভুত!’
‘আমি অদ্ভুতই।’
অরুনিমা খাট থেকে নেমে মাথায় হাত চেপে বলল,’আচ্ছা।আনছি।’
অভি সেভাবেই তার অপেক্ষা করলো।অরুনিমা পাঁচ মিনিটের ভেতর ঘরে এলো।এসেই অভির দিকে ঔষধের পাতা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,’এই নাও হামাদ।’
অভি হাত বাড়িয়ে সেটা নেয়।একবার নেড়ে চেড়ে মন দিয়ে দেখে।তারপর পুনরায় ঔষধের পাতা টা ফিরিয়ে দিয়ে বলে,’আচ্ছা যাও।রেখে আসো এটা।’
‘ওমা তুমি খাবে না?’
অভি খানিকটা অপ্রস্তুত হলো।দ্রুত প্যাকেট থেকে একটা ঔষধ বের করে বলল,’নাও।রেখে আসো এবার।’
অরুনিমা ঢুলতে ঢুলতে বলল,’উফফ! এখনো মাথা ঘুরে।’
অভি নিজ থেকে জানতে চাইলো,’সুচিস্মিতা তোমায় দেখেছে?’
‘না বাপ,দেখে নাই।’
‘আচ্ছা।’
অরুনিমা ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।সে যেতেই অভি জানালা দিয়ে ঔষধটা বাড়ির পেছনের দিকে ছুঁড়ে মারল।জানালা দিয়ে তাকাতেই সে দেখল,মিতা ঘাটে বসা।অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন দেখছে।আশেপাশে কেউ নেই।মিতার হাতে একটা চায়ের কাপ।
.
.
.
.
‘এ্যাই মেয়ে!তুমি ড্রাগ এডিক্টেড?’
কথাটা কানে যেতেই চমকের পিলে পেছন ফিরে সুচিস্মিতা।অভি তার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়ানো।সে এমন সময়ে অভিকে এখানে আশা করে নি।
প্রশ্নটা শুনেই সে আশ্চর্য হলো।বলল,’কি বললে তুমি?’
অভি বসলো তার পাশে,তার থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে।বসেই গম্ভীর স্বরে বলল,’এতো হাই পাওয়ারের ড্রাগ কোনো সাধারণ মানুষ নেয় না।তুমি নেশা করো নাকি মেয়ে?’
মিতা একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,’না তো।এমন কিছু তো না।’
‘তুমি যে ঔষধটা খাও,সেটা বাংলাদেশে অবৈধ।’
মিতা মাথা নামিয়ে বলল,’জানি।’
‘হয় তুমি ড্রাগ এডিক্টেড।অথবা তুমি মানসিক ব্যাথিতে আক্রান্ত।কোনটা?’
সুচিস্মিতা কন্ঠ নামিয়ে বলল,’দ্বিতীয়টা।’
অভি আর কিছু বলল না।তার ধারণা,বাকি উত্তর মিতাই দিবে।
সুচিস্মিতা পর পর কয়েকটা শ্বাস ছাড়ে।ধীর কন্ঠে বলে,’আমি আসলে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ না।কিন্তু আমার অসুস্থতা ধরে ফেলা প্রথম মানুষ যে তুমি হবে,সেটা আমি ভাবিনি।আমি আসলে নিজের রোগ লুকানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করি।কিন্তু দিন শেষে মনে হয় ব্যর্থই হই।’
মিতা মাথা নামিয়ে একহাত মুখে চেপে বলল,’বাবা আর মায়ের সেপারেশন আমি মানতে পারি নি।এখনো পারি না।ঐরকম একাকীত্বে বড়ো হওয়া খুব যন্ত্রনার।দেখা গেল,মা আর বাবা দু’জনই মুভ অন করাতে আমার আর কোনো নানুবাড়ি দাদুবাড়ি কিছুই থাকলো না।মায়ের একটা সংসার হলো।সেই সংসারের বাচ্চারা নানুবাড়ি পেল।বাবারও বিয়ে হলো।তার সন্তানরা দাদাবাড়ি পেল।কিন্তু আমি কিছুই পাই নি।আমি বড়ো হয়েছি বোর্ডিং স্কুলে।সেখানেও আমার সাথে সপ্তাহে একবার দেখা করার সময় মা বাবার হতো না।সবার বাবা আসতো।আমার বাবা আসতো না।আমি দিনে দিনে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম।দশম শ্রেণিতে উঠার পর আমার আচরণে আরো বেশি পরিবর্তন এলো।আমি আমার আশেপাশে থাকা সবাইকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম।আমার মন চাইতো সবাইকে মে’রে ফেলতে।আমি আসলে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম ঐ একাকীত্বের যন্ত্রনা সহ্য না করতে পেরে।
পরে কয়েক মাস কাউন্সিলিংয়ে থাকার পর একটু স্বাভাবিক হয়েছিলাম।বাবা তখন সময় করে যা একটু আসতো।কিন্তু মায়ের আর সময় কোথায়?মা আসেনি আর।’
মিতা থামল।একটু শ্বাস টেনে ধাতস্থ হয়ে বলল,’আমি কিছুটা গায়ে পড়া স্বভাবের,তাই না? কিন্তু আমি তো নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারি না অভি।আমি অসুস্থ।আমি ভীষণ অসুস্থ।আমি একটু মানুষ চাই।আমি বেহায়ার মতো মানুষের পেছন পেছন ঘুরি।
ঐ ঔষধগুলো অবৈধ।আমি জানি।কিন্তু আমার সুস্থ থাকতে সেগুলো প্রয়োজন।আমি খুব একা।আমার কেউ নেই।এই ধরো কতো বড়ো একটা পৃথিবী।কিন্তু আমার তো কেউ নেই অভি।’
অভি শান্ত চোখে তার দিকে তাকালো।গলা খাকারি দিয়ে বলল,’আমাদের কারোই দিন শেষে কিছু থাকে না সুচিস্মিতা।আমরা সবাই একা।আমাদের সমাপ্তিও একাই হয়।’
মিতা দুই হাতে মুখ চেপে বলল,’আই অ্যাম সরি।’
অভি কপাল কুঁচকায়।
‘কেন?’
‘আমি তোমাকে প্রথম দেখায় খুব খারাপ ভেবেছিলাম।’
‘এতে আমি একবিন্দুও বিচলিত নই।’
অভি একটু বিরতি নিয়ে বলল,’তোমার কাছে কেন এলাম জানো?’
‘কেন?’
‘কারণ এক সময় এই ঔষধটা আমিও খেতাম।ইচ্ছে করে না,বাধ্য হয়ে।নয়তো সারা শরীর কাঁপতো।’
সুচিস্মিতা মাথা তুলল।চোখ বড় বড় করে বলল,’তুমি এই ড্রাগ নিতে?’
‘হুম।’
‘কেন?বাবা মার কথা মনে পড়ত?’
অভি হাসল।বলল,’হুম।’
সুচিস্মিতার মাথা তখনও ভার।সে ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,’আমি যে গোপনে একটা ইনভেস্টিগেট করছি,তুমি জানো?’
‘উমম।কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম।কিন্তু আমার উপর করছিলে নাকি আমার বাবার উপর করেছিলে,সেটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’
‘তোমার বাবার উপর।’
মিতার কন্ঠ স্বাভাবিক।খুব নির্লিপ্ত হয়ে বলল,’একটা সার্ভে করছিলাম গোপনে।’
‘কিসের উপর?’
‘একাত্তর পরবর্তী যেই সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীরা নিঁখোজ হয়েছে,কিংবা যাদের হ’ত্যা করা হয়েছে,তাদের উপর।’
অভি হাসল।শব্দ করেই হাসলো।মিতা অবাক হয়ে বলল,’তুমি এভাবে হাসছো কেন?’
‘তোমার অদূরদর্শীতা নিয়ে হাসছি।চাকরি হারাতে চাও নাকি সুচিস্মিতা?’
‘এটা করলে আমার চাকরি হারাবে?’
‘সম্ভাবনা আছে।’
অভি দুই হাতের উপর ভর দিয়ে পেছনের দিকে পিঠ এলিয়ে দিলো।তারপর খুবই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,’চাকরি যাবে নাকি জানি না।তবে তোমার প্রতিবেদন কখনোই ছাপানো হবে না।এই দেশের রাজনীতি কিংবা প্রেস নিয়ে তোমার কোনো নলেজই নেই।তোমাকে বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম।তুমি দেখছি খুব বোকা।’
সুচিস্মিতা গালের নিচে হাত রেখে বলল,’আমাদের দেশে তো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে।’
‘কচু আছে।শোনো সুচিস্মিতা! নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।এই উপমহাদেশে কোনো আইন,কোনো সংবিধান কিছুই নেই।এখানে ক্ষমতা যার,সংবিধানও তার,আর আদালতের রায়ও তার।’
সুচিস্মিতা মনঃক্ষুন্ন হলো।বলল,’আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখতে এসব নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করেছিলাম।আমি জহির রায়হান কে নিয়ে একুশটা আর্টিকেল লিখেছি।’
‘এবং অতি দুঃখের সাথে জানাচ্ছি তোমায়,একটা আর্টিকেলও প্রকাশ পাবে না।’
মিতা অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়।মুখের বিস্ময়ভাব একটুও না কমিয়ে বলল,’কিন্তু কেন?এটা অন্যায়।একটা স্বাধীন দেশে হুটহাট বুদ্ধিজীবীরা গুম হবে।নয়তো তাদের মেরে ফেলবে।এটার উপর একটা ইনভেস্টিগেশন হওয়া ভীষণ প্রয়োজন।’
‘কে করবে এসব?এরা নিজেরাই তো কালপ্রিট।শোনো সুচিস্মিতা! তোমার উপকার করে আমার কোনো লাভ নাই।আমি আগ বাড়িয়ে মানুষের উপকার করতে চাইও না।তবুও কেন যে তোমায় বলতে ইচ্ছে হচ্ছে,এসব করো না।পরিনতি তুমি নিতে পারবে না।এরপর শেষটায় অ্যাসাইলামে গিয়ে কাটাতে হবে।এই দেশের সিস্টেম দিন দিন পঁচে যাচ্ছে।কোনো পলিটিক্যাল পার্টিই নিজেদের সমালোচনা নিতে পারে না।’
সুচিস্মিতা আবারো দুই হাতে মাথা চেপে ধরল।আস্তে করে বলল,’অরুনিমা কাল সেই ঔষধটা খেয়েছিল?’
‘হুম।’
‘সরি।’
‘ব্যাপার না।’
কিছু সময় কেউ কোনো কথা বলল না।অভি তারপর ধীর কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,’জুহায়ের কে তুমি পছন্দ করো সুচিস্মিতা?’
সে বিস্ফারিত চোখে সামনে থাকায়।এই লোক এসবও খেয়াল করে?তাকে তো খুব দায়সারা প্রকৃতির মানুষ মনে হয়।সে কেমন করে জানলো,মিতার মনের কথা?
পর পর কয়েকটা নিঃশ্বাস ছেড়ে সুচিস্মিতা নিখাঁদ গলায় বলল,’অনেকটা।সে খুব অমায়িক।’
অভি বলল,’জুহায়েরের বাড়ির মানুষ বেশ ভালো।তুমি চাইলে তোমার অসুখের চিকিৎসা ঐ বাড়িতেই হতে পারে।তারা খুব পরিষ্কার হৃদয়ের মানুষ।’
মিতা সংকোচে পড়ে বলল,’অতোদূর তো ভাবিনি।আমার তো এসব সম্পর্ক খুব ভয় লাগে।যদি সেও আমাকে ছেড়ে চলে যায়?’
‘সেটা তোমার বিষয়।আমি একটা উপায় বললাম।জীবন তোমার।সিদ্ধান্তও তোমার।’
অভি উঠে দাঁড়ালো।মিতা আচমকা তাকে পিছু ডেকে বলল,’অভি।’
‘হুম।’
‘তুমি জুহায়েরকে একবার জিজ্ঞেস করবে,তার আমাকে কেমন লাগে?’
অভি পেছন ফিরল না।সামনে হেঁটে যেতে যেতে জোর গলায় বলল,’জিজ্ঞেস করতে হবে না।আমি তাকে চিনি।চিনি বলেই তোমার সামনে এই উপায় রেখেছি।বাকিটা তুমি ভেবে দেখো।’
অভি চলে গেল নিজের মতো করে হেঁটে।মিতা শুধু চুপচাপ ঘাটে বসে থাকে।কখনো গাছ দেখে,কখনো আবার আকাশ দেখে।এই যে পৃথিবীটা এতো বড়ো।কিন্তু এই অতো বড়ো পৃথিবীতে আমরা কেন আমাদের একটা মানুষ খুঁজে পাই না?
কেন এমন কেউ থাকে না,যাকে দেখেই আমরা বলতে পারি,আরেহ্! সে তো আমার মানুষ।যাকে আমরা মন খুলে সব বলতে পারবো।যে আমাদের বিচার করবে না।যে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে আমাদের সঠিক বেঠিক মাপতে বসবে না।যে শুধু আমাদের পাশে বসবে,আমাদের মাথায় হাত রাখবে।আর বলবে,কি হয়েছে তোমার?এতো কিসের কষ্ট শুনি?
.
.
.
.
গাড়ি থামানোর পর রেইডার্স টিম কে পাড়ি দিতে হয়েছিল দীর্ঘপথ।যেই এলাকায় তারা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে,সেখানে গাড়ি চলবে না।খুবই সংকীর্ণ আর ছিমছাম পথ।
পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির পানি খুব সহজেই জমতে পারে।গত পরশুদিন হওয়া বৃষ্টিতে এখানে সেখানে পানি জমেছিল।সেই কাঁদা জমা মাটিতে হাঁটতে বেগ পেতে হচ্ছিল বেশ।এহতেশাম ওয়্যারলেসে তৈমুরের নিকট খবর পাঠালো,’তোমরা আরো এগিয়ে এসো।টিম রেডি রেখো।যেকোনো সময় ডাক পড়তে পারে।’
প্রায় এক ঘন্টা হেঁটে তারা টার্গেট এলাকায় এসে থামল।সোর্স তাদের নিশ্চিত করল,এটাই সে জায়গা।
এহতেশাম দূরবীনের সাহায্যে একবার জুমঘরটা দেখার চেষ্টা করল।একটু একটু দেখা যাচ্ছে।কিন্তু মনে হচ্ছে পরিত্যক্ত।কোনো মানুষ নেই।
সিপাহিরা খুব সাবধানে নল আর বাটে লেগে থাকা কাঁদামাটি পরিষ্কার করে নিল।এহতেশাম বলল,’সবাই পাহাড়ে উঠার প্রয়োজন নেই।কয়জন এখানে থাকো।পাহারা দাও।তৈমুরের দলকে বলেছি অন্য পাশটায় থাকতে।গোলাগুলি যদি বেশি হয়,তাহলে আমিই ইশারা দিবো।’
চারজন কে নিচে রেখে বাকিরা সবাই পাহাড়ে উঠার সিদ্ধান্ত নিল।আজ হঠাৎ আকাশ ঘোলা হয়ে মেঘ জমতে শুরু করেছে।এহতেশাম সময়ের আন্দাজ করে শ্বাস ছাড়ল।আজ বৃষ্টি হলে ভালো হবে।তাহলে প্রতিপক্ষ কে ধরাশায়ী করা সহজ হবে।
একটা নির্দিষ্ট দুরত্ব অতিক্রম করার পর জুমঘরটা খালি চোখেই দৃশ্যমান হলো তাদের কাছে।যেহেতু তারা জুমঘর দেখতে পারছে,সেহেতু জুমঘরে থাকা মানুষও তাদের দেখতে পাবে।অসম্ভব কিছু না।এহতেশাম মৃদুস্বরে বলল,’ক্রল করে বাকিটা এগোতে হবে।কেউ তাড়াহুড়ো করবে না।ভয় পাবে না।’
সবাই ঝুঁকল।মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে তারপর বুকে ভর দিয়ে এগোতে থাকল।ক্রলিং করতে করতে এক পর্যারে তারা একেবারে কাছাকাছি এসে পৌঁছুলো।ইশারা পেতেই সবাই সচেতন ভঙ্গিতে নিজেদের বেয়নেট চেক করে নিল।আকাশে মৃদু গর্জন করে মেঘ ডাকতে শুরু করল।সেই ডাকের সাথে সাথেই একটা বুলেট তীব্র বেগে তাদের দিকে ছুটে এলো।কিন্তু আশিক ঝুঁকে যাওয়ায় সেটা একটা গাছে গিয়ে আটকালো।
সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো তুমুল গোলাবর্ষণ।আকাশে বিদ্যুৎের ঝলকানি শুরু হওয়ার আগেই শটগান এবং রাইফেলের ঝলকানিতে পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে উঠল।একে একে গোলাবারুদের শব্দে আশেপাশের গাছে থাকা পাখিরা সব উড়ে গেল ডানা ঝাপ্টে।প্রতিপক্ষ তাদের দেখে নিয়েছে।কিন্তু প্রস্তুত হওয়ার মতো সময় পায় নি।তার আগেই মিলিটারি টিমের একের পর এক গোলাবর্ষণে অস্থির হয়ে উঠল জুম ঘরে থাকা লোকজন।নিজেদের হাতের কাছে যা পেল,তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সবকিছু রেইডার্স টিমের অনুকূলেই যাচ্ছিল।অদূরেই চারটা মরদেহ লুটিয়ে পড়ে আছে।বাকিরাও নাগালের মধ্যে।কিন্তু হঠাৎই একটা অঘটন ঘটলো।অয়নের হাতে থাকা রাইফেলটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।সে এক দৌড়ে গেল সেটা হাতে তুলে নিতে।এহতেশামের মনোযোগ তখন শুধুই জুমঘরের দিকে।পাশ থেকে কেউ ছুটে যেতেই তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটল।এহতেশাম অবাক চোখে আবিষ্কার করল অয়ন পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেছে।দেখামাত্র সে চিৎকার ছুঁড়ে,’অয়ন! বেন্ড ডাউন!’
সেই কথাটা অয়ন পর্যন্ত গেল নাকি বোঝা গেল না।তার আগেই অন্যদিক থেকে ছুটে আসা একটা বুলেটের প্রভাবে অয়ন তাল হারিয়ে একেবারে উপত্যকার দিকে ছিটকে গেল।পড়ার আগে শুধু আকুল অস্থির কন্ঠে ডাকরো,’মেজর স্যার! বাঁচান।’
এহতেশাম রুদ্ধশ্বাস হয়ে তাকে দেখে।তারপরই কোনো কিছু না ভেবে,কোনো নিয়মের পরোয়া না করে,নিজের হাতে থাকা অস্ত্র ফেলে দিয়ে ছুটে গেল অয়নের দিকে।গিয়েই এক হ্যাচকা টানে তাকে তার দিকে আনার চেষ্টা করল।কিন্তু ততক্ষণে আরেকটি বুলেট এসে আটকে গেল এহতেশামের বুক থেকে একটু উপরে,কাঁধের সামান্য নিচে।বুলেটবিদ্ধ হওয়ার পরেও উর্দি পরা লোকটা কোনো শব্দ করল না।শুধু দাঁতে দাঁত চেপে কষ্টটা গিলে নিল কোনোরকমে।তারপর নিজেই নিজের ক্ষতস্থানে হাত চেপে ধরল।
ওয়্যাললেসে ইশারা করতেই পাহাড়ের অন্য প্রান্ত হতে পাল্টা আক্রমণ শুরু হলো।দুই দিকের গোলাবর্ষণে অবশেষে প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি পরাস্ত করা সম্ভব হলো।
অয়ন হতবিহ্বল হয়ে তার সামনে থাকা মানুষ টার দিকে তাকায়।যে ইতোমধ্যে পাথরের গায়ের নিজে ভর ছেড়ে দিয়েছে।এটা কে?মেজর এহতেশাম মুস্তাফা?যে সবসময় বলতো,বি প্র্যাকটিক্যাল।একজন বাঁচাতে গিয়ে অন্যজন মরতে যাবে না।একজন গেলে যাক।ফোকাস অন ইউর টার্গেট।
স্যারই তো এই কথা বলতো সবসময়।সবাই কে শেখাতো,কিভাবে শুধু নিজের আত্মরক্ষার নিশ্চিত করতে হয় সবার আগে।তাহলে স্যার কেন আজ ছুটে এলো এভাবে?অয়ন যদি উপত্যকায় পড়ে মরেও যেত,তাহলে স্যারের কি হতো?
নিজের বাহু ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া বুলেট আর তখন অয়ন কে বিচলিত করল না।সে করুণ চোখে স্যার কে দেখে বলল,’স্যার।আপনার তো প্রচুর র’ক্ত বের হচ্ছে।’
এহতেশাম জবাব দিলো না।একবার শুধু মাথা নামিয়ে ফিনকি দিয়ে বেরুতে থাকা রক্তের স্রোত দেখল।অবাধ্য তরল,তার হাত গড়িয়ে সমস্ত শরীরে গড়িয়ে যাচ্ছে।
আশিক ছুটে এলো তার কাছে।এসেই হাঁটুগেড়ে বসে সবার আগে তাকে জাপ্টে ধরল।বলল,’স্যার! এসব কিভাবে হলো স্যার?ও স্যার।এদিকে তাকান।’
এহতেশাম আস্তে করে চোখ খুলল।কোনোরকমে আশিকের হাতটা টেনে এনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে অস্ফুটস্বরে বলল,’আশিক! আমি দুই বছর আগে এখানে গু লি খেয়েছিলাম।ঠিক এখানে।আজ আবারো।তুমি একটু শক্ত করে ধরে রাখো তো।আমি শরীরে জোর পাচ্ছি না একদমই।’
আশিক হতবিহ্বল হয়ে তার ক্ষতস্থানে হাত রাখে।এহতেশাম চোখ বুজে বলল,’আমি ঠিক আছি।এসবে কিছু হয় না।তুমি শুধু দেখো,আর যেন ব্লিডিং না হয়।’
আশিক খুব শক্ত হাতে বুলেটবিদ্ধ স্থানটা চেপে ধরল।অথচ এতে রক্তপাত কমলো না একটুও।আশিকের ভয় আরো বেশি বাড়ল যখন এহতেশামের শরীর ক্রমশ নীল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করলো।
একটা শকুন এসে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল সহসা।রাঙামাটি থেকে বহু দূরে সিদ্দিকের রহমানের বাড়িতেও সেদিন কেমন বিষন্নতা নেমে এলো।তার বড় মেয়ে নিরুপমার ঐদিন কিছুই ভালো লাগছিলো না।
চলবে-
#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৩০.[দ্বিতীয় অংশ]
[রিচেক দিবো পরে]
জাহানারা বেগম আগের মতো করেই পান চিবুতে চিবুতে বললেন,’শোনো বড় বউ! বহুত দিন তো হইল বিয়ার।এবার সংসারটারে আঁচলে বাইন্ধা নাও।’
অরুনিমা গোল গোল চোখ করে তার দিকে তাকায়।কিছুটা অবাক সুরে বলে,’এতো বড়ো সংসার আমি এইটুকু আঁচলে কেমনে বাঁধবো?’
জাহানারা কপাল চাপড়ালেন।আফসোস করে বললেন,’ধুর বেকুব।কথার কথাও বোঝে না।বলেছি যে সংসার টারে নিজের নখের মধ্যে রাখা শিখতে হইবো।’
‘নখ?সেটা তো আঁচলের চেয়েও ছোট।’
জাহানারা থমথমে মুখ করে তার দিকে তাকালেন।মুখ বিকৃত করে বললেন,’তোমারে দিয়া কিচ্ছু হইতো না।মানুষ তোমার তে সব লইয়া যাইবো।আর তুমি বেকুব টেরও পাইতা না।’
অরু কপাল কুঁচকে বলল,’মানে?’
‘মানে তোমার মাথা।যাও ঘর থেক্কা বাইর হও।’
অরু বোধহয় এই কথার অপেক্ষা তেই ছিলো।জাহানারা বেগম বলা মাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো।বড় করে সালাম দিয়ে চটপট কেটে পড়ল সেখান থেকে।জাহানারা মুখটাকে তেতো করে বললেন,’পুরাই বেকুব একটা।ভেটকানো ছাড়া কিছুই পারে না।’
.
.
.
.
অরুনিমা মাত্রই বই খুলে বসেছিল।অভি ঘরে আসতেই সে ঠাস করে বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো।অভি ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,’কি হলো?বই বন্ধ করলে কেন?’
‘তোমাকে দেখে।’
‘কেন?আমি জোকার?’
‘উহু।’
অরুনিমা গালের নিচে হাত রেখে বলল,’তোমাকে দেখতে ভালো লাগে।কিন্তু চুল দাড়ি….’
‘কিন্তু চুল দাড়ি ছাটলে আমাকে নায়কের মতো দেখাবে।মনে হবে দিল্লি থেকে কোনো হিরো বাংলাদেশে উড়ে এসেছে।’
অরুনিমা শেষ করার আগেই অভি শান্ত মুখে বাকি কথাটা বলে দিল।অরু ভেঙচি কেটে বলল,’শুধু তো আমার কথার মজা উড়াও।একদিন শুনেই দেখো না কেমন লাগে।’
‘থাক।আমার কোনো ইচ্ছে নেই।’
অভি হাত মুখ ধুয়ে এসে বলল,’চুল গুলোর এমন পাগল পাগল অবস্থা করে রাখো কেন সবসময়?দেখো কেমন এলোমেলো লাগে দেখতে!’
অরু মন খারাপ করে বলল,’বাড়িতে তো আপা সুন্দর করে তেল দিয়ে দিতো।তোমরা কেউ তো আমাকে তেলও দিয়ে দাও না।’
‘তোমার নিজের হাত নেই?’
‘না।নেই।’
অভি তেলের শিশি হাতে নিয়ে সামনে এলো।খাটে বসে পায়ের কাছে একটা মাদুর টেনে বলল,’এদিকে বসো চুপচাপ।’
অরু বলামাত্র সেখানে গিয়ে বসল।মাথা চুলকে বলল,’বেশি দিবে না কিন্তু।বেশি তেল দিলে আমার মাথা ঘুরায়।’
‘এমনিই তো জট বাঁধিয়ে রেখেছো।দেখেই কেটে দিতে মন চাইছে।’
‘আমার টা না কেটে নিজের টা কাটো।’
অরুনিমা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,’একটা কথা বলি?’
‘কি?’
‘তোমার দিদানের মাথায় সমস্যা।’
‘জানি।’
‘ঘুরে ফিরে এক কথা বলে।’
‘জানি।’
‘আমার না এ বাড়িতে কাউকে ভালো লাগে না।তোমাকে ছাড়া।’
‘আমাকেও লাগা উচিত না।আমার মধ্যে বিশেষ কিছু নাই।’
‘তুমি আমার জামাই।এটাই বিশেষ।’
অভি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,’তোমার বন্ধু যে বিয়ে করছে,সেটা জানো?’
অরু চট করে পেছন ফিরে।অবাক হয়ে বলে,’কে?’
‘সেকি! তোমার এতো ভালো বন্ধু! তোমায় জানায় নি?’
‘হেয়ালি করো না তো।বলো কে?’
অভি নির্বিকার হয়ে বলল,’জগলু।’
‘কিহ্!’
অরুনিমা ড্যাবড্যাব চোখে তার দিকে তাকায়।অভি বলল,’দেখেছ?কেউ তোমায় বলে নি।শুধু আমি বলেছি।এখন বুঝো তোমার সবচেয়ে আপন কে।’
অরুনিমা মুখ কালো করে বলল,’বিয়ে হচ্ছে সেটা সমস্যা না।দাওয়াত তো দিবেই।কিন্তু জগলুর জন্য আমি একজন কে পছন্দ করেছিলাম।’
‘কে?’
অরু মুখ নামিয়ে বলল,’মিতা আপা।’
অভি হাসল সামান্য।অরুনিমা মুখ খিঁচে বলল,’এটা হাসার কথা না।এটা কষ্টের কথা।আমি তাদের বিয়ে,সংসার সব ভেবে নিয়েছি মনে মনে।’
‘খুব ভালো।’
অভি তেল দেয়া শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালো।অরুনিমা হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বলল,’মিতা আপা যদি জগলুর বউ হতো,তাহলে কতো ভালো হতো।প্রতিদিন আপার সাথে দেখা হতো।আপা কতোকিছু কিনে দেয় আমায়!’
অভি পেছন ফিরে মুখ কুঁচকে বলল,’যে দিতে পারে,সেই ভালো তাই না?সারাদিন শুধু খাই খাই চিন্তা।যাও পড়তে বসো।নাদান একটা!’
.
.
.
.
এহতেশামের চিকিৎসা মিলিটারি ক্যাম্পে হয় নি।সেদিনই রাতারাতি তাকে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম এনে দুইদিন আইসিইউ তে রাখা হলো।তারপর যখন সে পুরোপুরি আশংকা মুক্ত হলো,তখন তাকে রাঙামাটির একটা হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো।তৃতীয় দিন থেকেই এহতেশাম অল্প অল্প কথা বলতে পারছিলো।
রাঙামাটি তে জ্ঞান ফেরার পরেই সে যাকে প্রথম দেখল,তার নাম অয়ন।রোগা পাতলা গড়নের একটা উজ্জ্বল শ্যাম তরুণ।দৃষ্টিতে নিদারুণ মলিনতা।এহতেশাম আস্তে করে ডাকে,’অয়ন!’
অয়ন চকিত ভঙ্গিতে চোখ তুলে।আশ্চর্য হয়ে বলে,’স্যার! আপনার জ্ঞান ফিরেছে!’
মুহুর্তেই একটা হুলস্থূল বেঁধে গেল।এহতেশাম আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করল,তৈমুর,আশিকসহ তার সাত ক্যাডেটই হাসপাতালে উপস্থিত।সে অবাক হয়ে বলল,’তোমরা সব এখানে কেন?ক্যাম্পে কে?’
‘অন্য টিম কে ক্যাম্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্যার।’
‘অদ্ভুত তো! এমন ভেড়ার পালের মতো দল বেঁধে সব এলে কেন?’
রাফিদ আতঙ্কিত সুরে বলল,’আসবো না স্যার?আপনি বাদে ঐ ক্যাম্পে আমাদের আছে টা কি?’
সে হয়তো কথাটা এমনিই বলল।কিন্তু এহতেশাম কেমন যে বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকালো।এই ছেলে গুলো তাকে এতো ভরসা করে?
সে ভ্রু কুঞ্চন করে জানতে চায়,’সবাইকে বের হওয়ার অনুমতি দিলো?’
‘আজ শুক্রবার স্যার।আজ আমাদের ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার অনুমতি আছে।’
এহতেশাম আস্তে করে বলল,’আচ্ছা।’
অয়ন নিচু স্বরে ডাকে,’মেজর স্যার!’
‘কি?’
‘থ্যাংক ইউ।’
সে এমন করে বলল,যে মনে হলো সে কোনো বাচ্চা।যাকে এহতেশাম চকলেট দিয়েছে খেতে।
এহতেশাম গম্ভীর হয়ে বলল,’থ্যাংকস না অয়ন।তোমার উচিত সরি বলে নিজেই নিজ থেকে দুইশো পুশআপ দেওয়া।এমন পরিস্থিতিতে কেউ উঠে দাঁড়ায় রাইফেল আনার জন্য?’
তারা আরো কিছুক্ষণ সেখানে উপস্থিত ছিল।শেষে সন্ধ্যার আলো পড়তেই তৈমুর সবাইকে নিয়ে ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।শুধু আশিক ছিলো কেবিনে।তার বের হওয়ার উপর তেমন নিষেধাজ্ঞা নেই বিধায় সে প্রায়ই এখানে আসতে পারে।
সবাই চলে যেতেই আশিক বুকে হাত চেপে বলল,’আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম স্যার।আপনি যখন অমন করে গা ছেড়ে দিলেন,আমার বুক ধড়ফড় করে উঠল।’
এহতেশাম সামান্য হাসার চেষ্টা করল।একহাতে ভর দিয়ে উঠে বসতে বসতে একবার নিজের ক্ষতস্থানটা দেখে বলল,’আগে একবার এই জায়গায় বুলেট লেগেছিল আশিক।তখন থেকেই এই ব্যাপার গুলো তে সামান্য দুর্বল হয়ে যাই।সেদিন আবারো একই জায়গায় গু লি খাওয়াতে অনেকটা প্যানিক অ্যাটাকের মতো হলো।সেজন্য বোধহয় বেশি নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম।’
আশিক চুপচাপ তার সামনে থাকা চেয়ারে গিয়ে বসল।এহতেশাম হসপিটাল বেডে হেলান দিয়ে বলল,’একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে ইদানিং আমার সাথে।’
‘কি ব্যাপার স্যার?’
‘আমার ইদানিং মরে যেতে ভয় হয়।এক সময় মনে হতো,এই জীবনে আর পাওয়ার কিছু নেই।কিন্তু এখন মনে হয়,জীবনে আমার অনেক কিছুই পাওয়ার আছে,জানার আছে।একজনের কাছে ক্ষমা চাওয়া আমার এখনও বাকি আছে।’
আশিক প্রশ্নটা করতে গিয়েও করল না।কিছু বিষয় একান্ত ব্যক্তিগত হয়।সেসব জানতে চাইলে অপর দিকের মানুষটা অপ্রস্তুত বোধ করে।সে কিছু বলল না।কেবল সামান্য হেসে সুর মেলালো,’আমাদের সবার জীবনেই তো কতোকিছু বাকি স্যার।আমার তো মনে হয়,আমাদের পুরো জীবনটাই বাকি।দিন যায়,মাস যায়,বছর ঘুরে।আমরা নামমাত্র কয়েক দিনের বন্ধে বাড়িতে যাই।সেখানে কিছুদিন আদর যত্নে থাকি।তারপর আবার সেই শক্ত রুটি আর ডালের জীবন।
ভাই বোনরা হুট করে বড়ো হয়ে যায়।অথচ আমাদের সাথে তাদের নতুন করে কোনো স্মৃতি তৈরি হয় না।’
এহতেশাম অন্যমনস্ক হয়ে বলল,’তুমি তো আমাকে আমার ভাই বোনদের কথা মনে করিয়ে দিলে।আগে বন্ধের দিনে নানুবাড়ি যেতাম জানো?শীতলপাটি বিছিয়ে নানুবাড়ির ছাদে গিয়ে বসতাম।চাঁদ দেখতাম,আকাশ দেখতাম,তারা দেখতাম।মামানি কতোরকমের খাবার বানাতো।বাড়িতে অনেকগুলো ঘর থাকা স্বত্তেও আমরা হলরুমে তোষক বিছিয়ে ঘুমাতাম।আহা! এখন কতো দূরে আমরা!’
এহতেশাম বড় বড় দু’টো শ্বাস ছাড়ল।নিরেট স্বরে বলল,’আমার একটা ভাই আছে জানো?ভীষণ আলাদা প্রকৃতির।আমি তাকে পছন্দ করি না একদমই।সেও করে না।পারতে আমরা কেউ কারো ছায়াও মারাই না।সে কোনোদিন আমাদের সাথে মিশতো না।কিন্তু একটা অদ্ভুত কাজ সে প্রায়ই করতো।আমরা ঘুমিয়ে গেলে সে দরজায় এসে দাঁড়াতো।অনেকক্ষণ আমাদের দেখতো।তারপর আস্তে হেঁটে চলে যেত।আমি কোনোদিন সেটা নিয়ে ভাবি নি।তবে আজকাল মনে হয়,কাজটা ঠিক হয়নি।ইদানিং ইচ্ছে করে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে।মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে হয়,পুরোটা সময় দূরে দূরে থেকে শুধু ঘুমানোর পরেই কেন সে আমাদের কাছে আসতো?আজকাল কেমন যেন লাগে আশিক।মনে হয়,কোথায় যেন আমাদের তাল কেটে গেছে,কোথায় যেন আমরা খৈই হারিয়ে ফেলেছি।কোথায় গিয়ে যেন আমরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছি।’
.
.
.
.
সুচিস্মিতার আজকের দিনটা শুধু ছুটোছুটির উপরই গেল।এক ডেস্ক থেকে অন্য ডেস্কে যেতে যেতে রীতিমতো তার পা ধরে এলো।একটু পর পর কপালের ঘাম মুছে সে নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছিলো।
সব কাজ গুছিয়ে সে যখন অফিস থেকে বেরিয়ে এলো,তখন সময় বিকেল চারটা একান্ন।অথচ আজ তার হাফডে ছিলো।
দু’টো ক্লান্তির শ্বাস ছেড়ে সে সামনে তাকালো।রাস্তার অন্যপাশ দেখতেই তার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।মিতা স্নিগ্ধ হেসে সামনে এগোয়।জুহায়ের দাঁড়িয়ে ছিলো রাস্তার অন্য পাশে।সে কাছে আসতেই জুহায়ের স্বভাবসুলভ হেসে বলল,’এই আপনার প্রেসটা খুবই বাজে।’
‘কেন?’
‘কথা কাজে কোনো মিলন নেই।তিনটায় ছুটি দিবে বলে সাড়ে চারটার পরে ছুটি দিলো।’
সুচিস্মিতা মাথা নামিয়ে হাসল।ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,’ঠিক বলেছেন জুহায়ের।আজকাল খুব জ্বালাচ্ছে তারা।ওভার টাইম করাচ্ছে।অথচ বেতন বাড়াচ্ছে না।’
মিতা জানতে চাইলো,’কখন এলেন আপনি?’
‘ঠিক দু’টো ত্রিশে।’
‘সর্বনাশ! এতো আগে!’
‘আমি জানতাম আপনার অফিস তিনটা বাজে শেষ।’
‘সে হিসেবে আপনার আসার কথা ছিল তিনটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে।’
‘আমার অপেক্ষা করতে ভালো লাগে ম্যাডাম।’
সুচিস্মিতা পুরোপুরি থেমে গেল।দ্রুত গতিতে চলতে থাকা পা জোড়া থমকে গেল মুহুর্তেই।কেমন ড্যাবড্যাব করে কিছুক্ষণ জুহায়েরের দিকে চেয়ে শেষে একগাল হেসে সামনে তাকালো।সে এমন এক মুহূর্ত যখন মিতার মনে হলো,ঢাকার এই দূষিত-কোলাহলপূর্ণ শহর একটা বিরান ভূমিতে রূপ নিয়েছে।প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে।বাতাসে কি মিষ্টি গন্ধ! অথচ ঢাকার রাস্তায় তো বাস ট্রামের কালো ধোঁয়ার উৎকট গন্ধ বাদে অন্য কোনো গন্ধের অস্তিত্ব নেই।
তারা হেঁটে গেল রমনা পর্যন্ত।কি একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে আবিষ্ট হয়ে দু’জনের কেউই আর কোনো কথা বলতে পারে নি।কখনো কখনো অনুভূতিরা হয় শব্দহীন।ভেতরে ভেতরে তোলপাড় বয়ে যায়,কিন্তু আমরা কিছুই বলতে পারি না।সেই ঝড়ে খুব দূরে কোথাও ভেসে যাওয়ার পরেও আমরা টের পাই না কিচ্ছুটি।মিতাও কি সেরকম ভাবেই বিলীন হচ্ছে না?কতো অদ্ভুত এই অনুভূতি! কতো স্পর্শকাতর এই পদচারণা!
সেই বিকেলটা সুচিস্মিতার কাছে এক অপার্থিব সৌন্দর্য হয়ে ধরা দিলো।যখন জুহারের মাটিতে ঝুঁকে একটা ঘাসফুল ছিঁড়ে তার কান্ডের অংশটি আঙুলে পেঁচিয়ে আংটির আকার দিয়ে সেটাকে মিতার সম্মুখে বাড়িয়ে দিলো।তার মুখে লাজুক হাসি।যেন কথাটা বলতে তার খুব বেশি সংকোচ।মিতারও তখন দম বন্ধকর অবস্থা।শ্বাস ফেলছিল ঘন ঘন।
জুহায়ের মাথা নামিয়ে আনত স্বরে বলল,
‘মিতা!
আজকাল আমার একটা অদ্ভুত ইচ্ছে হয়।
মন চায়,আপনাকে তুমি করে ডাকতে।অথচ তুমি বলার মতো বিশেষ কিছু আমাদের মাঝে নেই।কিন্তু তবুও আমার ডাকতে ইচ্ছে হয়।
আজকাল মন চায়,আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা প্রথম মানুষটা আপনি হন।আপনাকে দেখেই আমার ঘুম ভাঙুক,এমন একটা ইচ্ছা আমায় কুড়ে কুড়ে খায়।
এই যে ইদানিং হুটহাট আমার মন খারাপ হয়,মনে হয় আমার বাড়িতে কি যেন একটা নেই।তখন আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করি,আমার বাড়িতে একটা মিতা নেই।কি অদ্ভুত তাই না?মিতা কবে আমার বাড়িতে ছিলো শুনি?
মিতা! এই যে হুটহাট একটা ইচ্ছে জাগছে মনে।মন চাইছে আপনাকে বাসায় নিয়ে আসি।আপনি কি সেই ইচ্ছের কদর করবেন?আপনি কি হবেন আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা সেই প্রথম মানুষ?মাঝরাতে যখন আমার ঘুম ভাঙবে,তখন পাশ ফিরে আমি যেই মেয়েটিকে দেখবো,সেই মেয়েটা কি মিতা হবে?’
.
.
.
.
জাহানারা খাবার টেবিলে বসেই বললেন,’হ্যাঁ গো বউমা।আজ এতো চিল্লাফাল্লা শুনলাম পাশের বাড়িতে।হইলো ডা কি?’
রিজোয়ানা সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন।জাহানারার কথা কানে যেতেই খানিকটা আফসোস করে বললেন,’আর বলবেন না মা।ঘটনা তো অনেক কিছু।টিপু আছে না?’
‘হ।রফিকের মেঝ পোলা।’
‘জ্বী।টিপু কাল আরেক বিয়ে করে বউ সমেত বাড়ি এসেছে।’
জাহানারা খেতে খেতেই বিষম খেলেন।অরুনিমা দ্রুত তার দিকে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিলো।জাহানারা ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি গিলে বললেন,’কও কি! তার না একটা বউ আছে?ঐদিনই তো দেখলাম।মেলা সুন্দর দেখতে।’
‘বউ আছে।কিন্তু কি যেন ঝামেলা।তাই কাউকে না বলেই আরেক বিয়ে করে নিল।’
‘এরপর?’
‘এরপর আর কি?মেয়েটা কেঁদে কেটে চিৎকার চেঁচামেচি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলল।ভেবেছিল শ্বশুরবাড়ির লোক তার পক্ষে কথা বলবে।কিন্তু কিসের কি?ঘুরে ফিরে ইনিয়ে বিনিয়ে সব দোষ পড়ল তার উপর।সে নাকি বর কে সন্তুষ্ট রাখতে পারে নি,হ্যান ত্যান কতোকিছু।মেয়েটা পরের দিন সকালে বিষ খেয়ে নিল।সেটা নিয়েই চিৎকার চেঁচামেচি।’
‘ইন্নালিল্লাহ! বাইচ্চা আছে তো?’
‘সেটা জানি না মা।হাসপাতালে নেওয়া পর্যন্তই শুনেছি।আর কিছু জানি না।’
জাহানারা কিছুটা রেগে গিয়ে বললেন,’বেডা মানুষের জাতই এমন।আমি তো বলি,কু’ত্তাও তাদের চেয়ে ভালো।তাগো আছে খালি শরীলের মোহ।আমি তো জানি।শরীল পাইলেই তারা ঠিক থাকে।নয়তো সব বেঠিক।’
অরুনিমা খুব মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনছিল।জাহানারা তাকে দেখতেই তার হাতে বারি মেরে বললেন’দেখছো নি বেডা মানুষ কেমন?আগেই সতর্ক কইরা দিলাম।পরে আবার বিষ খাইয়ো না কইলাম।’
.
.
অভি ঘরে পা রাখতেই তাজ্জব হলো।অরুনিমা আয়নার সামনে বসে ঠোঁটে লিপস্টিক দিচ্ছিলো।অভিকে দেখতেই পেছন ফিরে তাকালো।
গাঢ় সবুজ জামদানি।কানে একটা ঝুমকা।চুলগুলো দুই পাশ থেকে কিছুটা এনে ক্লিপ দিয়ে বাঁধা।কয়েকবার টিকলি পরার চেষ্টা করে শেষে ব্যর্থ হয়ে সেটা খুলে একপাশে ছুড়ে মেরেছে।টিকলি পরতে গিয়ে নিজের চুলের সামনের অংশ এলোমেলো করে রেখেছে।
অভি আসামাত্র সে এক লাফে উঠে দাঁড়ালো।অভি তাকে অপাদমস্তক দেখল।কপাল কুঁচকে বলল,’এসব কি?’
‘আমি সেজেছি।’
‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি।উপলক্ষ কি?’
‘তুমিই তো বড় উপলক্ষ।’
বলতে বলতেই অরু লাজুক হাসলো।
অভি তীক্ষ্ণ চোখে তার মতিগতি দেখে।অরুনিমা এক দৌড়ে ঘরে পরার জুতোখানা তার পায়ের কাছে রেখে বলল,’নেও নেও জুতা পরো।নয়তো তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।’
জুতোটা পায়ের কাছে রেখে সে দ্রুত তার আঁচল দিয়ে অভির কপালের ঘাম মুছে দিলো।উৎকন্ঠা মেশানো স্বরে বলল,’আরে আমার বরটা! কতো কষ্ট করে সারাদিন! কতো পরিশ্রম করে আমার ভাত মাছের ব্যবস্থা করে! একদম শন্টু মন্টু বর আমার!’
অভি ঝাড়া মেরে তার হাতটা সরিয়ে দিলো।মুখটাকে অত্যাধিক মাত্রায় কুঁচকে রেখে বলল,’সরো তো।রাত বিরেতে পাগলামি ভালো লাগে না।’
অরুনিমা দমলো না।পুনরায় হেঁটে গিয়ে অভির সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল টা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে মাথা নত করে বলল,’হামাদ! ও হামাদ! আমায় কেমন লাগছে বলো তো?’
অভি উপরনিচ তাকে দেখে গম্ভীর সুরে বলল,’ভালোই।’
‘ভালোই টালোই বুঝি না।এখন থেকে শুধু একটাই প্রশংসা হবে।’
অভি দু’চোখ সরু করে তার দিকে দেখে।তার কৌতূহলী দৃষ্টি দেখেই অরুনিমা মাথা নামিয়ে বলল,’এতোদিনে তো একটা কড়কড়ে আই লাভ ইউ আমারো প্রাপ্য।তাই না?
বলেই সে অভির কাঁধে শক্ত করে মুখটা চেপে ধরল।অভি কেবল মুখভর্তি বিস্ময় নিয়ে তাকে দেখেই গেল।
.
.
.
.
দশদিন ধরে নিরুপমার মন খারাপ।শুধু মন খারাপ না,ভয়ংকর মন খারাপ।একটা লোক দশদিন ধরে তার খোঁজ নেয় নি।সে বেঁচে আছে,নাকি ম’রে গেছে কিচ্ছু জানায় নি।অথচ কথা ছিলো,বেঁচে থাকলে সে অবশ্যই তাকে ফোন দিয়ে জানাবে।
নিরুর আজকাল খুব কান্না পায়।মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে নাজিয়াদের বাড়ি গিয়ে রেডিও শুনেছে,টিভি দেখেছে।কোথাও তো কোনো খারাপ খবর দেয় নি।নিরু জানে,ঐ মানুষটার কিচ্ছু হয় নি।হতেই পারে না।একটা মূলাকাতের আগে কিছুতেই তাদের বিচ্ছেদ হতে পারে না।
অথচ অবাধ্য মন একটুও সায় দেয় না।বারবার ঘুরেফিরে কুচিন্তা মাথায় আসে।নিরুর এতো কষ্ট হয় কেন?
দশটা দিন সে পাগল পাগল হয়ে ঘুরেছে।কতো কতো চিঠি লিখে ডাক বক্সে দিয়েছে,তার কোনো খবর নেই।এমনকি রোজ রাতে আসা সেই নম্বরে ফোনও দিয়েছে।নম্বরটা বন্ধ।নিরুপমা ছলছল চোখে আগের চিঠিগুলো বারবার করে পড়তো।তখন তার খুব অসহায় মনে হতো নিজেকে।
মানুষের মন খারাপের বিভিন্ন ধরন আছে।একটা হলো বিচ্ছেদের যন্ত্রনায় মন খারাপ,আরেকটা হলো বিরহের যন্ত্রনায় মন খারাপ।রাহাতের সাথে তার তালাকের পর তার যে মন খারাপ ছিলো,সেটা ছিলো বিচ্ছেদ যন্ত্রনার ফল।অথচ এই দশদিন নিরুপমা কেঁদেছে বিরহ যন্ত্রনা সইতে না পেরে।এভাবে কেউ কখনো গায়েব হয়?সে কি জানে না নিরু তার ফোনের অপেক্ষায় কতোখানি ছটফট করেছে?
দশদিন সবটা সহ্য করার পর সে আর পারল না।পরে নিজের সমস্ত অনুভূতির কাছে পরাস্ত হয়ে নিরুপমা সিদ্ধান্ত নিল সে রাঙামাটি যাবে।গিয়ে আর্মি ক্যাম্পের খোঁজ করবে।
মনোয়ারা তখন কাঁথা সেলাই করছিলেন।নিরুপমা গিয়েই মিনমিনে স্বরে ডাকে,’মা!’
মনোয়ারা চোখ তুললেন।
‘কি হয়েছে?’
‘মা আমি দুই দিনের জন্য শহরের বাইরে যেতে চাইছি।’
মনোয়ারার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।তিনি বিস্ময়ে হা হয়ে বললেন,’কিহ্?’
নিরু শুকনো ঢোক গিলে উত্তর দেয়,’আসলে আমার একটা বান্ধবীর বিয়ে।তাই তুতুনকে নিয়ে আমি সেখানে যেতে চাইছি।’
মনোয়ারা শান্ত চোখে তার দিকে তাকালেন।তার তুখোড় দৃষ্টিতেই নিরুপমা নিজেকে গুটিয়ে নিল।ভয়ে তখন তার কন্ঠ জমে গেছে।মনোয়ারা থমথমে মুখে বললেন,’বেশি সাহস ভালো না নিরু।আজকাল তুই অতিরিক্ত সাহস দেখাস।যা ঘরে যা।’
ব্যাস।নিরুপমা সেটুকু তেই দমে গেল।আর মায়ের মুখে ঝামটা মেরে কিচ্ছুটি বলতে পারলো না।যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল,মাথা নামিয়ে ঠিক সেভাবেই হেঁটে নিজের ঘরে চলে এলো।আসতে আসতে যে কখন সে বাচ্চাদের মতো কান্না করে ফেলল,সে টেরও পায় নি।
আরো দু’টো দিন নিরুপমা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে।একটা ফোনকলের অপেক্ষা,ধূসর কাগজে একটা চিঠির অপেক্ষা। অথচ নিরু কে যন্ত্রনার সাগরে ফেলে কল কিংবা চিঠি কোনোটাই আর এলো না।
শেষে নিদারুণ বিরহ যন্ত্রনা নিরুপমা রহমানকে করে দিলো ভয়ংকর রকমের সাহসী।একদিন সকালে তুতুন কে কোলে নিয়ে সে মায়ের ঘরে গিয়ে দাঁড়ালো।তার হাতে কালো রঙের একটা ব্যাগ।পরনে গাঢ় নীল শাড়ি।চুলে একটা বেণী।
মনোয়ারা তার দিকে তাকাতেই সে দৃপ্তকন্ঠে নির্ভিক হয়ে ঘোষণা দিলো,’আমি শহরের বাইরে যাচ্ছি মা।তোমার কথা রাখা সম্ভব হলো না।আমি তোমার অনুমতি নিতে আসিনি।তোমায় জানাতে এসেছি।তুমি নিজের খেয়াল রেখো।আল্লাহ হাফেজ।’
মনোয়ারা যেন পলক ফেলাও ভুলে গেলেন।ড্যাবড্যাব করে দেখলেন নিরুর কন্ঠের তেজ,তার ভেতরকার সাহস আর সাথে চোখের দৃষ্টির প্রখরতা।সে ঘর থেকে বের হলো প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে।যেন তাকে পিছু ডাকার সাধ্যি খোদ মনোয়ারার ও নেই।তুতুন কে কোলে নিয়ে নিরুপমা সত্যিই সেদিন অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল।
রাঙামাটি কি?একটা জেলা।চট্টগ্রামের কাছাকাছি সে জেলার অবস্থান।এর বেশি নিরুপমা কিছুই জানে না।বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে পড়লো মহা বিপাকে।রাঙামাটি যাবে।কিন্তু কিভাবে?নিরুপমা মাথায় হাত চেপে বলল,’কি বিপদে পড়লাম বল তো তুতুন?সব দোষ মেজরের।’
সে একটা সিএনজি দাঁড় করালো।সামান্য ঝুঁকতেই লোকটা বলল,’কোথায় যাইবেন আফা?’
নিরুপমা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,’আপনি কি আমায় রাঙামাটি নিয়ে যেতে পারবেন ভাই?’
লোকটা গোল গোল চোখে তার দিকে তাকালো।তার চাহনি দেখেই নিরুপমা লজ্জায় আড়ষ্ট হলো।কয়েকপল তাকে দেখেই লোকটা বিড়বিড় করল,’পাগল কোথাকার!’
বলে আর অপেক্ষা করে না।এক টানে গাড়িটা সামনে এগিয়ে নেয়।নিরুপমা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।তুতুন তার গালে হাত রেখে ডাকে,’মা মা! তুমি কি পাগোল?’
নিরুপমা ক্লান্ত শ্বাস ছাড়ল।তুতুনকে নিজের সাথে চেপে ধরে বিষন্ন কন্ঠে বলল,’জানি না রে সোনা।রাঙামাটি কেমন করে যায়,সেটাই তো জানি না।কপাল আমার!’
চলবে-