কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-৩১

0
24

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

৩১.

সায়দাবাদে গেলে কিছু বাস পাওয়া যায়।তাদের গন্তব্য রাঙামাটি।নিরুপমার ঐ অব্দি যেতে ভীষণ কষ্ট হলো।যখন সে সেখানে গিয়ে পৌঁছুলো,তখন দুপুর গড়িয়েছে।তুতুন ঘুমিয়ে গেছে তার কাঁধে মাথা রেখে।রোদের তাপে নিরুপমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম এসে জমেছিল।সে দ্রুত আঁচলের এক প্রান্ত দিয়ে সেটা মুছে নিল।

টিকিট কাটার পর সে ভয়ে ভয়ে একটা সিট বেছে নিল।হৃদপিন্ডের ধুকপুকানি তখন তার কানে এসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।নিরুপমা বার কয়েক দুরুদ পড়ে নিহাদের ছোট্ট শরীরটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।

কোনোদিনও একা একা অন্য শহরে না যাওয়া নিরুপমা রহমান সেদিন সাহসিকতার চরম পর্যায়ে গিয়ে রাঙামাটির মতো পাহাড়ি এবং বিরান জনপদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।এটি ছিল এমন একটি পদক্ষেপ,যেখানে নিরুপমা তার পরিণতি কিংবা ফলাফল নিয়ে অবগত ছিলো না।সে কেবল একজন ব্যক্তির খোঁজ চাইছিলো।তাকে না পাওয়া অব্দি নিরুপমার কাছে ভয় ভীতি জড়তা কিংবা সমাজ-কোনোকিছুই আর মুখ্য না।

বাস টা রাঙামাটি গিয়ে পৌঁছুলো সন্ধ্যার একটু পর।নিরুপমার তখন সারা শরীর ঘেমে একাকার।সকালে যতটা সাহস পাচ্ছিল ভেতর থেকে,সূর্য ডুবতেই সে সাহস গায়েব হয়ে গেল।তখন নিরুপমা অতি অবলা এক নারী।যার দুই কদম চলতেও ভীষণ ভয়।

নিরুপমা বাস থেকে নেমেই এদিক সেদিক তাকালো।রাঙামাটি কোনো ছোট জেলা না।এখানে পাহাড়েরও অভাব নেই।নিরুপমা আরো একবার হাতে থাকা চিঠিটা খুলে পড়ে নিল।একটা চিঠিতে মুস্তাফা একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করেছিল।বলেছিল তার ক্যাম্প থেকে প্রায়ই সেই গ্রামে যাওয়া হয়।

নিরুপমা সামনে দাঁড়ানো টেম্পুর ড্রাইভার কে জায়গার নাম বলতেই লোকটা আঙুল দিয়ে সামনে দেখালেন।বললেন,’ঐ যে ঐদিকে।সামনে গিয়ে একটু বামে।সেখানে গাড়ি দাঁড় করানো থাকে আপা,ঐ দিকেই যায়।আপনি গেলেই পাবেন।’

নিরুপমা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সামান্য হাসল।এই গাড়ির খোঁজ পেতে পেতে তার আরো আধঘন্টা নষ্ট হয়েছ।চারদিক তখন অন্ধকার।এতো রাতে নিরুপমা বিয়ের পরও কখনো বের হয় নি।গাড়িতে উঠার পর পুরো রাস্তা সে মনে মনে দুরুদ পড়েছে।তার সৌভাগ্য যে পুরো গাড়িতে সে বাদেও আরেকটা মেয়ে ছিল।একেবারে মিতা আপার মতো।চাকরিজীবী মেয়ে মানুষ।নিরুপমা যেতে যেতে একবার তার দিকে তাকালো।

ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক দশের ঘরে।নিরুপমার গাড়িটা নির্দিষ্ট স্থানে আসতেই ড্রাইভার ইঞ্জিন বন্ধ করলো।নিরু বিস্ময়ভরা চোখে গাড়ি থেকে নেমে এলো।চারদিকের অন্ধকার আরো গাঢ় হয়েছে।মিটমিট করে আকাশে তারা জ্বলছে।নিরুপমা চোখ উপরে তুলতেই আশ্চর্য হলো।এতো সুন্দর আকাশ!

জীবনের প্রথম রাঙামাটি ভ্রমণ নিরুপমার কাছে রোমাঞ্চকর এবং একই সাথে হৃদয়স্পর্শী মনে হলো।চারপাশের এই নিস্তব্ধ বিরান প্রকৃতি তার নিকট কিছু সময়ের জন্য মনে হলো অপার্থিব।এই ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার তাকে সময়ে সময়ে ভীত করে তুলছিল।কিন্তু তবুও নিরুপমার মনে হলো,এই যাত্রায় সে ব্যর্থ হবে না।

অন্য পাশ থেকে একটা মাঝবয়সী লোক হেঁটে আসছিলেন।হয়তো কাজ শেষে বাড়ি ফিরছেন।বড় বড় কদমে পথটুকু অতিক্রম করতে চাইছিলেন তাড়াহুড়ায়।আশেপাশের কোনো কিছুতেই তার মনোযোগ নেই।নিরুপমা এগিয়ে এসে বিনীত স্বরে বলল,’একটু শুনবেন?’

লোকটা থামল।খানিকটা বিরক্তিতে তার দিকে তাকালো।নিরু কোমল গলায় বলল,’আপনি কি আমায় এখানের আর্মি ক্যাম্পের খোঁজ দিতে পারবেন?’

লোকটা সরু চোখে তার দিকে তাকালো।তারপর গোমড়া মুখ করে বলল,’না।এখানে কোনো আর্মি ক্যাম্প নাই।’

বলে সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না।আগের মতোই দ্রুত কদমে সে নিরুপমাকে ছাড়িয়ে গেল।নিরুপমা কিছুক্ষণ অসহায় হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলো।রাত বাড়তেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে।তুতুনের ঠান্ডা লাগতে পারে।একটা আশ্রয়ের খুব দরকার।তার কাছে টাকা আছে।সেটা চিন্তার বিষয় না।চিন্তার বিষয় হলো নিরাপত্তার।এই শহরে তো সে কিছুই চেনে না।হুট করে কোথাও আশ্রয় নেওয়াটা আদৌ কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে নাকি সে জানে না।

একটু দূরে একটা টং দোকান।দু’টো লোক বসে চা খাচ্ছিল।নিরুপমা শাড়ির আঁচল টা ঘুরিয়ে এনে অন্য পাশের কাঁধে তুলে তাদের দিকে এগিয়ে গেল।লোক দু’টো কে বেশ শিক্ষিত মনে হচ্ছে।উনারা হয়তো তাকে সাহায্য করতে পারেন।সে ছোট ছোট কদমে তাদের সামনে গেল।লোক দু’টো চা খাওয়ার ফাঁকে তার দিকে তাকাতেই নিরুপমা সামান্য হেসে বলল,’আসসালামু আলাইকুম।’

দু’জনের ভেতর একজন সহজ গলায় সালামের জবাব দিলো।নিরুপমা বলল,’আপনারা কি আমাকে এখানকার আর্মি ক্যাম্পের খোঁজ দিতে পারবেন?’

প্রশ্ন শুনেই লোক দু’টো কেমন অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকালো।তারপর একবার সেকেন্ডের ব্যবধানে নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে নিল।হয়তো ইশারায় কিছু একটা বোঝাল।কিন্তু নিরুপমার সেটা বোধগম্য হলো না।একজন কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,’আর্মি ক্যাম্প?’

‘জ্বী।আমি মেজর মুস্তাফার সাথে দেখা করতে চাই।’

দু’জনই কেমন নড়ে চড়ে বসল।নিরুপমা উদগ্রীব হয়ে আবারো জানতে চাইলো,’আপনারা জানেন আর্মি ক্যাম্প কোথায় আছে?আমি সেখানে যেতে চাই।’

তাদের মাঝে একজন,যার গায়ে কুচকুচে কালো শার্ট ছিলো,সে চায়ের কাপটা তার পাশে থাকা বেঞ্চে রেখে নিরেট স্বরে বলল,’আমরা কোনো আর্মি ক্যাম্পের খোঁজ জানি না। ‘

নিরুপমার মুখটা চুপসে গেল তৎক্ষনাৎ।সে আশা করেছিল তারা তাকে মিলিটারি ক্যাম্পের খোঁজ দিবে।অথচ লোক দু’টো মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলো তারা মিলিটারি ক্যাম্পের ব্যাপারে কিছুই জানে না।

নিরুপমা আশাহত হয়ে ঘুরে দাঁড়ালো।ডানে বায়ে দেখে এক কদম সামনে যেতেই সে আচমকা থেমে গেল।মাথার পেছনে কি একটা এসে যেন ঠেকলো।অল্প একটু খোঁচা লাগতেই নিরুপমা চট করে ঘুরে দাঁড়ালো।আর ঠিক তখনই বেয়নেটের সরু প্রান্ত তার কপাল স্পর্শ করলো।ফর্মাল পোশাকে থাকা লোকটা চোখ মুখ শক্ত করে বলল,’একদম নড়বে না।নয়তো আমি শ্যুট করতে বাধ্য হবো।’

____

এহতেশাম কে ক্যাম্পে আনা হয়েছে দুই দিন আগে।এখন সে হাঁটাচলা করতে পারে।তবে সব কাজই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে করতে পারে না।একটু সমস্যা হয় কাঁধ নাড়াতে।আশিক মাঝে মাঝে তার তাবুতে আসে।দু’জন কিছু সময় কথা বলে।এহতেশাম এই ঘটনার পর আর বাড়িতে ফোন দেয়নি।তার কেমন যে অনিহা হচ্ছিল।আগ্রহ কাজ করছিলো না কোনো।

সেদিন রাত এগারোটার পর একজন ফৌজি ছুটে এসে খবর দিলো সে আর তৈমুর একটা গুপ্তচর ধরে এনেছে।আশিক তখন এহতেশামের তাবুতেই ছিলো।কথাটা কানে যেতেই সে অবাক হয়ে বলল,’কি বলো?এই রাতে গুপ্তচর?’
তার বিস্ময়ের পারদ আকাশ ছুলো,যখন সে শুনতে পেল গুপ্তচর একটা মেয়ে।

এহতেশাম এক হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।চোখ সরু করে বলল,’সত্যি?মেয়েরাও এখন এসব করছে?’

‘জ্বী স্যার।আমি আর তৈমুর স্যার তাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে করে এখানে নিয়ে এসেছি।আরেকটা কথা স্যার।সে আপনার নামও জানে।’

এহতেশাম থতমত খেল।
‘কি?আমার নাম জানে?’

‘জ্বী স্যার।’

‘আর কারো নাম জানে না?’

‘না শুধু আপনার কথাই বলল।’

‘অদ্ভুত! এই এতো বড়ো মিলিটারি ক্যাম্পে সে শুধু আমাকেই চেনে?

‘জ্বী স্যার।ক্যাপ্টেন তৈমুর আপনাকে ডাকছেন।আপনি একবার সেখানে যান।’

_____

‘স্যার! পুরা আগুন সুন্দরী মেয়ে মানুষ।দেখলে বুঝাই যায় না যে এমন মেয়েও এজেন্ট হতে পারে।’

এহতেশাম হাঁটছিল খুব ধীর গতিতে।কপাল কুঁচকে বলল,’সে কি জানতে চাইছিলো তৈমুর?’

‘জানতে চাইছিলো মেজর মুস্তাফার ক্যাম্প কোথায়?চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছিল,সে মেজরের বউ হয়।এমন মলিন আর বিধ্বস্ত চোখ!’

এহতেশামের খটকা লাগল।
‘শুধু আমাকেই খুঁজছিল?’

‘জ্বী স্যার।রাঙামাটির ক্যাম্পে মেজর মুস্তাফা আছে।সে মেজর মুস্তাফার সাথে দেখা করতে চায়।এই কথাই বলল।আমি এরপর চোখ মুখ বেঁধে নিয়ে এলাম।আমি নিশ্চিত সে কোনো এজেন্ট।নয়তো সে কেমন করে জানলো যে রাঙামাটিতে আমাদের ক্যাম্প আছে?এখন দেখেন আপনি এর কি করবেন।’

এহতেশাম দরজার সামনে দাঁড়িয়েও দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেল।কে হতে পারে মেয়েটা?সে যাকে চাইছে,সে তো আর হবে না।দুই কিলোমিটার পথ একা পাড়ি দিতেই যার এতো ভয়,সে থোড়াই এতো কিলো পাড়ি দিয়ে মুস্তাফার কাছে আসবে!

খটখট করে দরজা টা খুলে গেল।এহতেশাম কৌতূহলী হয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।ভেতরে প্রবেশ করতেই তার দুই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।প্রচন্ড আশ্চর্যে তার চোয়াল ঝুলে গেল।সামনেই একটা চেয়ারে।সেখানে একটা মেয়ে আতঙ্কিত হয়ে বসে আছে।তার হাত বাঁধা,চোখ বাঁধা।তার পরনে গাঢ় নীল শাড়ি।

এহতেশামের মনে হলো পৃথিবীটা ঐ জায়গায় এসে কিছু সময়ের জন্য থেমে গেল।পুরো মাথা চক্কর দিয়ে উঠল হুট করেই।আপনাআপনি একটা হাত বুকে গিয়ে ঠেকল।শ্বাস চলছে,স্বাভাবিকের চেয়েও দ্রুত গতিতে।সে অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করল,’নীলা! আপনি?’
.
.
.
.
নিরুপমা কে আর্মি ক্যাম্পে আনা হয়েছিল চোখ আর হাত বেঁধে।চোখ বাঁধার কারণ,সে যেন পথ চিনতে না পারে।আর হাত বাঁধার কারণ,সে যেন কাউকে প্রহার না করতে পারে।

শুরুতেই নিহাদ কে তার থেকে কেড়ে নেওয়া হলো।নিরুপমা আঁতকে উঠে বলল,’আমার ছেলে।আমার ছেলে কে নিবেন না প্লিজ।তাকে কিছু করবেন না।’

তৈমুর গম্ভীর হয়ে বলল,’কি হবে না হবে,সেটা ক্যাম্পে গিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।আপনাকে ভাবতে হবে না এসব নিয়ে।’

তারপর তারা নিরুপমাকে জিপে করে এখানে নিয়ে এলো।নিরুপমার চোখ বন্ধ।হাত বাঁধা।এসবের মাঝেও সে টের পেল,তাকে একটা কংক্রিটের ঘরে রাখা হয়েছে।নিরুপমা শুনতে পেল ঝিঁঝিঁ পোকার সেই ডাক।যে ডাক সে প্রায়ই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে শুনতো।এটাই কি তবে মিলিটারি ক্যাম্প?এখানেই মেজর মুস্তাফার বাস?নিরুপমা কি অবশেষে সঠিক ঠিকানায় এসেছে?

তার নিজেকে নিয়ে চিন্তা হয় না।তার চিন্তা তুতুনকে নিয়ে।অনেকক্ষণ ধরে তার কন্ঠ শুনতে পাচ্ছে না নিরুপমা।নিরু আকুল হয়ে বলল,’হাত না খুলেন,আমার ছেলেটাকে অন্তত এখানে আনুন।তার বয়স অনেক কম।সে ভয় পায় আমাকে ছাড়া থাকতে।’

এহতেশাম প্রশ্নাত্মক চোখে তৈমুরের দিকে তাকালো।তৈমুর বলল,’জ্বী স্যার।সাথে একটা বাচ্চাও ছিলো।যেন কেউ সন্দেহ করতে না পারে।’

এহতেশাম চাপা স্বরে বলল,’বাচ্চা টাকে নিয়ে আসো।’

তৈমুর কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।শেষে বাধ্য সৈনিকের মতো মাথা নামিয়ে বলল,’জ্বী স্যার।আনছি।’

***

এহতেশাম কতোক্ষণ বাচ্চাটার দিকে তাকালো।একটা গোলগাল মিষ্টি মুখ।কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতে গিয়ে সে টের পেল তার হাত কাঁপছে,গলা শুকিয়ে এসেছে।তবুও সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত বাড়ালো।ইশারায় বাচ্চাটাকে তার কাছে ডাকলো।বাচ্চাটা এক ঝাপে তার কোলে এলো।মনে হলো,এহতেশাম তার কতো চেনা।

তাকে কোলে পেতেই এহতেশাম দরজা বন্ধ করল।নিরুপমা সেই শব্দতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বলল,’কে?কে?’

এহতেশাম জবাব দিলো না।একহাতে তুতুন কে ধরে কয়েক পা এগিয়ে চেয়ার টেনে বসল।নিরুপমা শুধু মেঝেতে চেয়ার টানার চ্যার চ্যার শব্দই পেল।এহতেশাম লক্ষ্য করলো,নিরুপমা তার শাড়ির কুঁচি খাঁমচে ধরেছে শক্ত করে।সে বসেই গলা খাকারি দিলো।তুতুন মা কে দেখে ডাকল,’মা! তুমার কি হয়েচে?তুমি কি কানামাচি খেচচো?’

এতো অস্বস্তির মাঝেও নিরুপমা কিঞ্চিৎ হাসল।বলল,’বাবা,তুমি কোথায়?’

‘কুলে।’

‘কার কোলে?’

তুতুন জিজ্ঞাসু হয়ে সামনে তাকালো।এহতেশাম তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করল,’মেজরের।’

‘মেজুলেল কুলে।’

তুতুন আঙুল খেতে খেতে উত্তর দিলো।জবাব শুনতেই নিরুপমা বড় বড় শ্বাস টেনে সোজা হয়ে বসলো,আনমনে দু’টো ঢোক গিলে অস্থিরতা নিবারণের বৃথা চেষ্টা চালালো।অথচ এহতেশাম স্পষ্ট দেখল,নিরুপমার কাঁপছে।বার বার ঢোক গিলে নিরুপমা কন্ঠ স্বাভাবিক করতে করতে আবারো বলল,’কার কোলে?’

এবার আর তুতুন উত্তর দিলো না।নিরব নিস্তব্ধ কক্ষের সমস্ত নিরবতা এফোঁড় ওফোঁড় করে একটা রাশভারি কন্ঠ নিরুপমার কর্ণকুহর পর্যন্ত ভেসে এলো।
‘মেজর।মেজর মুস্তাফা।’

নিরুপমার সময় থমকে গেল হুট করে।শাড়ির কুচি ধরে রাখা হাত দু’টোর বন্ধন আরো শক্তিশালী হলো।নিরুপমা নিচের ঠোঁট কা ম ড়ে ধরে সবটা নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা করল।তার কম্পমান কন্ঠনালি দেখেই এহতেশাম মৃদু হাসল।কন্ঠে বেশ গাম্ভীর্য এনে শুধালো,’শুনলাম আপনি নাকি গুপ্তচর হয়ে মিলিটারি কাম্পের গোপন খবর বের করতে চাইছিলেন?এ কথা কি সত্যি,,নি রু প মা?’

নিরুপমা বোধহয় অনেকটা সময় পর একটু হাসল।স্বল্প পরিচিত সেই কন্ঠস্বর কানে যেতেই নির্ভার হয়ে বলল,’সত্যি,তবে আংশিক।আমি ক্যাম্পের খবর বের করতে আসি নি।আমি কেবল মেজর মুস্তাফার খবর বের করতে এসেছি।’

এহতেশাম চেয়ারে পিঠ এলিয়ে স্মিত হাসে।মাথা নামিয়ে বলে,’যদি বলি মেজর নেই।তখন?’

ক্ষণিকের নিরবতা।পরে নিরুপমা শ্বাস ছেড়ে বলল,’অতি আশ্চর্যের বিষয়,আমি আপনার দীর্ঘশ্বাসেই আপনার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি।মনে হচ্ছে,আপনি আমার অনেক চেনা।’

‘আমরা কি অনেক দিনের চেনা নই নীলা?’

‘অবশ্যই।’

‘নীলা!’

নিরুপমা চাপা স্বরে বলল,’জ্বী।’

‘কিভাবে এলেন?’

‘মায়ের সাথে ঝগড়া করে।’

‘কেন?’

‘কারণ…’

নিরুপমা থেমে গেল।একটু স্থির হয়ে পুনরায় বলল,’কথা ছিল,মিশনের পর একটা ফোন দিবেন।আপনি দেন নি।আপনি জানেন,এই দিনগুলো আমার কেমন কেটেছে?’

এহতেশাম গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।কয়েক মুহূর্ত বাদে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,’নীলা! আমি বুকের কিছুটা উপরে গুলি খেয়েছি।’

নিরুপমা আঁতকে উঠল।চঞ্চল হয়ে বলল,’কি!! গু লি!’

‘হুম।দুই দিন আইসিইউ তে ছিলাম।’

নিরু বলল,’দেখি।চোখ দু’টো একটু খুলুন না।’

‘নাহ্।অনুমতি নেই ম্যাম।দুঃখিত।সাসপিশিয়াস সিভিলিয়ানদের চোখ খোলার অনুমতি নেই এখানে।দেখার হলে পরে দেখবেন।’

‘আপনি এতো কঠোর!’

এহতেশাম একটু শব্দ করে হাসল।
‘কঠোর না।দায়িত্ব পালনে তৎপর,নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য।’

‘আমাকে আপনার গুপ্তচর মনে হয়?’

‘হতেও পারেন।অস্বাভাবিক কিছু না।’

নিরুপমা মন খারাপ করে বলল,’ঠিক আছে।খুলতে হবে না চোখ।’

এহতেশাম আবারো তার সমস্ত মুখে চোখ বুলায়।ঠোঁট দু’টো তখনও ঈষৎ কাঁপছিল।হাত বাঁধার কারণে হাতের এক জায়গায় র ক্ত এসে জমাট বেঁধেছিল।
এহতেশাম তার থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকালো।একগাল হেসে সহজ গলায় বলল,’তুতুন! ব্রেভ বয়।কেমন আছো তুমি?’

‘ভালু।’

‘আমি কি তোমাকে একটা আদর দিতে পারি চ্যাম্প?’

তুতুন তাকে দেখল।একবার হাত দিয়ে তার ক্লিনসেভ করা গাল স্পর্শ করল।তারপর আস্তে করে নিজের গাল টা তার দিকে এগিয়ে দিলো।মাথা নেড়ে ইশারায় তাকে চুমু খাওয়ার অনুমতি দিলো।

এহতেশাম ছোট করে তার গালে একটা চুমু খেল।তুতুন দু’হাতে মুখ চেপে খিলখিল করে হেসে উঠল খুশিতে।নিরুপমা বলল,’কি হয়েছে বাবা?’

‘মা! মা! ও আমাকে আদল দিয়েচে মা।’

বলে সে আবার তার দিকে নিজের গাল বাড়িয়ে দিলো।বলল,’আলো আদল।’

এহতেশাম তাকে পর পর দশটা চুমু খেল।কখনো শব্দ করে,কখনো নিঃশব্দে।তুতুন তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,’তুমি কে?’

‘আমি?আমি তোমার বাড্ডি।’

‘মানে?’

‘মানে তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।’

নিরুপমা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাদের কথা শুনে।তার মনে হলো এতো শ্রুতিমধুর কথা সে এর আগে শুনে নি।শুনতে শুনতেই তার বুক ভারি হয়ে দুই চোখ ভরে উঠল।
.
.
.
.
অরুনিমা দুই পা ঝুলিয়ে ছাদের এক কোণায় বসেছিল।সৃজনী অনেকক্ষণ ধরে ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।সংকোচে,দ্বিধায় সে ভেতরে আসতে পারছিল না।শেষে সমস্ত জড়তা একপাশে সরিয়ে সৃজনী ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো।

নিজের পাশে কারো অস্তিত্ব টের পেতেই অরুনিমা ঘুরে তাকালো।সৃজনী বসেছে তার থেকে কিছুটা দূরত্ব নিয়ে।অরু হাসল সামান্য।আন্তরিক হয়ে বলল,’তুমি কেমন আছো সৃজনী?’

‘ভালো।তুমি কেমন আছো অরু?’

‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।’

সৃজনী অস্বস্তিতে দু’হাত কচলে যাচ্ছিল।অরুনিমা আড়চোখে একবার তাকে দেখে সহজ গলায় বলল,’এ্যাই সৃজনী! তুমি কিছু বলবে?’

সৃজনীর ঘোর কাটে।দ্রুত উপরনিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়।অরুনিমা বলল,’বলে ফেলো।’

‘আমি আসলে তোমাকে সরি বলতে চাই অরুনিমা।’

‘কেন?’

সৃজনী চুলগুলো কানের পেছনে গুজে নিল।সোজা হয়ে বসে বলল,’আমি জানি আমি ভুল।এখন বলছি মানে এই না যে আমি এখনই সেটা টের পেয়েছি।টের আরো আগেই পেয়েছি।কিন্তু দূরে সরতে পারছিলাম না।কিছুতেই পারছিলাম না।আমি ভুলই করেছি অরু।তাই তোমার রাগ,কিংবা প্রহার কোনোটাতেই আমি দুঃখ পাই নি।দোষটা আমার।তুমি তোমার জায়গায় একদম ঠিক অরু।তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও পারলে।’

অরুনিমা মলিন মুখে তার দিকে তাকালো।একটা হাত তার কাঁধে রেখে বলল,’তোমার খুব কষ্ট হয়।তাই না সৃজনী?’

সৃজনী ম্লান হাসল।পরিবেশ হালকা করার জন্য একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করল।অথচ তার শরীর ভেঙে কান্না আসছিলো একটু পর পর।

‘অরুনিমা!
আমি তোমাদের বিয়ের সময় থেকে অভি ভাইজানের দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করছিলাম।তোমার মনে আছে,ভাইজানের যে পা কাটলো,আমি তোমাকেও সাথে নিয়ে ঘরে যেতে চাইছিলাম?আমি কোনোদিন তোমাদের ভেতরে ঢুকতে চাই নি।কিন্তু এতো বোঝার পরেও দিনশেষে আমি ঢুকে পড়েছি।আমি সেই অনুতাপে এখন আর এই বাড়িতে আসতে চাই না।কিন্তু মা নিয়ে আসে।আমি অভি ভাইজান থেকে পালিয়ে থাকতে চাই।কিন্তু তবুও মাঝেমাঝে মুখোমুখি হয়ে যাই।’

বলতে বলতে সৃজনীর কন্ঠ ভেঙে এলো।একটা সময় পর সে দু’হাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল।অরু ফ্যাকাসে চোখে তার দিকে তাকালো।অদ্ভুত! মেয়েটা অভির জন্য কাঁদছে? একটা মানুষ,যার কিছুতেই কোনো বিকার নাই,তার জন্য সৃজনী এমন করে কাঁদতে জানে?

সৃজনী শ্বাস টেনে টেনে বলল,’তুমি আমায় জঘন্য খারাপ ভাবছো,তাই না?বিশ্বাস করো,আমি এতো খারাপ নই।আমি আসলে নিজের আবেগের উপর নিয়ন্ত্রন আনতে পারি নি।তুমি প্লিজ আমায় ভুল বুঝো না।প্লিজ।’

অরুনিমা অল্প হাসল।একটা হাত সৃজনীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,’আমি রেগে নেই সৃজনী।না তোমাকে ভুল বুঝছি।না তোমাকে নিয়ে খারাপ কথা ভাবছি।আমিও সরি।তোমার গায়ে হাত তুলতে চাই নি আমি।তখন তোমার উপর রেগে ছিলাম।কিন্তু এখন রেগে নেই।’

সৃজনী একবার অরুনিমার হাতটা দেখলো।তারপর আচমকাই তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।অরু একটু পেছন দিকে হেলে একহাতে রেলিং খাঁমচে ধরল।সৃজনী চোখ মুছে করুণ কন্ঠে বলল,’আমি আর অভি ভাইজানের সামনে যেতে চাই না।আমি মুক্তি চাই।সবকিছু থেকে আমি মুক্তি চাই।কিন্তু মুক্তি পাচ্ছি না একদমই।কিভাবে মুক্তি পাবো বলো তো?’
.
.
.
.
আজ সুচিস্মিতার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন গুলোর একটি।আজ মিতার বিয়ে।পাত্রের নাম জুহায়ের ইবনে আশফাক।বিয়ের ঘটক হামাদ শিকদার।সবার প্রথমে জুহায়েরের বাড়িতে প্রস্তাব সে ই দিয়েছে।

মিতা বিয়ের আগেই একবার শ্বশুড়বাড়িতে গিয়েছিল।সে যেহেতু হোস্টেলে থাকে,তাই সেখানে সবাইকে আনা সম্ভব না।তাই সিদ্ধান্ত হলো প্রথম সাক্ষাৎ জুহায়েরের বাড়িতেই হবে।

মিতা যখন সেখানে পা রাখলো,তখন অবাক চোখে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখল।খুব বেশি বড় বাড়ি না।কিন্তু ভীষণ স্নিগ্ধ।বিশেষ করে ছাদ আর ছাদের সিঁড়িটা।মিতা শুধু মুগ্ধ হয়ে বাড়ির মানুষ দের দেখল।এরা এতো অমায়িক,এতো মিশুক।কখনো আগ বাড়িয়ে মিতার জীবন নিয়ে কিছু জানতে চায় নি।কোনো অযোচিত প্রশ্ন করে মিতার মেজাজ বিগড়ে দেয় নি।অথচ এতো সুন্দর ভাবে তার সাথে মিশলো,যেন সে তাদের কতো বেশি পরিচিত।

সুচিস্মিতা দু’টো মানুষের কাছে জীবনভর কৃতজ্ঞ থাকবে।প্রথমে জুহায়ের।যে দুনিয়া ভর্তি এতো এতো লাস্যময়ী আর ঘরকুনো মেয়ের ভীড়ে মিতার মতো ছন্নছাড়া আর বাউন্ডুলে এক ঘুড়ি কে নিজের জীবনে স্থান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।সেদিন বিকেলে তার প্রেম নিবেদনের জবাবে মিতা তার নিকট নিজের সবটা নিবেদন করেছিল।নিজের সুখ দুঃখ আনন্দ ভালোবাসা সবকিছু।এই জীবনে মিতা প্রথম কোনো মানুষ পেল।একটা ভরসার হাত,একটা সুপুরুষ ব্যক্তিত্ব।সুচিস্মিতার আর চাইবার কি ছিলো?

দ্বিতীয় মানুষটা ছিলো অভি।যে সবার প্রথমে জুহায়ের কে গিয়ে মিতার ব্যাপারে জানিয়েছিল।জুহায়েরের বাড়িতে মিতার নামও সেই প্রথমে তুলেছিল।সুচিস্মিতা জানে না এই ছেলে কোন ধাতুতে তৈরি।এতো নির্বিকার,নির্লিপ্ত,অথচ কোনো কিছু তার নজর এড়ায় না।কি সুন্দর ছেলেটা তার অনুভূতি পড়ে নিল! কি সুন্দর সে মিতার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিলো! মিতা যেই মানসিক যন্ত্রনায় দগ্ধ হচ্ছিল,সেখান থেকে সে চিরতরে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল।আচ্ছা,এতো সুন্দর একটা বাড়ি আর এতো সুন্দর কিছু মানুষের সাথে থাকার পর সুচিস্মিতা কি কখনো খারাপ থাকতে পারে?

বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে সুচিস্মিতা বেশ দ্বিধায় পড়েছিল।সে আর জুহায়ের মিলে তিনদিনে সব কেটাকাটা করল।মিতার হাতে তেমন টাকা ছিলো না।তবে বেতনের টাকা আর জমানো কিছু টাকা ছিলো।সেটা দিয়ে সে অরুকে একটা সুন্দর শাড়ি কিনে দিলো।ফারহানা কে দিলো একটা সুন্দর ব্যাগ।জুহায়েরকে দিলো একটা ঘড়ি।আর অভিকে দিলো একটা পারফিউম।ফরিদার জন্য অনেক খুঁজে সে একটা জামদানি কিনেছিল।এই এতো এতো কেনাকাটায় মিতার নিজের জন্য কিছু কেনা হয় নি।জুহায়ের মন খারাপ করে বলল,’আমি এতোটাও খারাপ নই মিতা।তুমি যে নিজের জন্য কিছু কেনো নি,সেটা আমি দেখতে পেয়েছি।এবার বলো নিজে কি কিনবে?’

সুচিস্মিতা বলল,’আমার একটা শাড়ি আছে।কখনো পরা হয় নি।আমি সেটা পড়েই বিয়ে করব।’

‘অসম্ভব! আমি পুরান শাড়ি পরা মেয়ে মানুষকে বিয়ে করবো না।’

মিতা কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল।জুহায়ের তাকে বেনারসি পল্লীতে নিয়ে টকটকে লাল একটা শাড়ি কিনে দিলো।সুচিস্মিতার বিয়ের শাড়ি।এই জীবনে মিতার পাওয়া সবচেয়ে দামি উপহার।শাড়িটা গায়ে জড়ানোর পরই মিতা বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলল।কোনোরকমে ঠোঁট কা ম ড়ে ধরে বলল,’ধন্যবাদ জুহায়ের।এতো সুন্দর উপহার আমাকে কেউ কখনো দেয় নি।’

তারপর এক বিকেলে অতি সাদামাটা ভাবে সুচিস্মিতার সাথে জুহায়েরের বিয়ে হয়ে গেল।অরুনিমা পুরোটা সময় মিতার হাত ধরে তার পাশে বসেছিল।মিতার খুব আফসোস ছিল।তার কোনো বোন নেই।অথচ বিয়ের এই পুরোটা সময় মিতার একবারো মনে হয় নি তার কোনো বোন নেই।অরুনিমা ছায়া হয়ে পুরোটা সময় তার পাশে ছিলো।তাদের বিয়ে হতেই অরু তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,’মিতা আপা! তোমার সংসার অনেক সুখের হবে আমি জানি।আমি এখন থেকে রোজ রোজ ভার্সিটি শেষ করে এখানে আসবো।তুমি রাগ করলেও আসবো।’

মিতা হাসলো।অরুকে সুন্দর করে আগলে নিয়ে বলল,’না রে ময়না।তুমি না এলে তো আমারই ভালো লাগবে না।তোমার মতো মিষ্টি ফুলগুলো যদি আমার জীবনে না থাকে,তবে আমি বাগান সাজাবো কি দিয়ে?’

অরুনিমা হাসে।হাসতে হাসতেই তার চোখ ভিজে উঠে।
.
.
.
.
‘মেজর এহতেশাম! সত্যি করে বলুন তো মেয়েটা আপনার কি হয়?’

কর্ণেল নিয়াজ কলমের অগ্র প্রান্ত টেবিলের সাথে চেপে ধরে সামনে তাকালেন।এহতেশাম তখন সটান হয়ে তার সামনে দাঁড়ানো।হাত দু’টো পেছনে আড়াআড়ি করে রাখা।নিয়াজের কথার প্রেক্ষিতে সে মাথা তুলে দাঁড়ালো।

তাকে কাল ক্রস চেকিংয়ের জন্য নিরুপমার কাছে পাঠানো হয়েছিল।সব শেষে আজ সকালে সে রিপোর্ট করল,নিরুপমা কখনোই কোনো ট্রিয়াসনাস এক্টিভিটিজ এর সাথে যুক্ত ছিলো না।সে কোনো দেশদ্রোহী কিংবা গুপ্তচর না।সে অতি সাদামাটা একটা মেয়ে মানুষ।

নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে বললেন,’তাহলে সে এই ক্যাম্পের খোঁজ পেল কেমন করে?তোমার কথাও বা জানলো কিভাবে?’

এহতেশাম কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করলো।ইতস্তত করে সে নিয়াজের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।নিয়াজ ভ্রু খাঁড়া করে বললেন,’সত্যি করে বলো তো এহতেশাম,তুমি তাকে কিভাবে চেনো?’

এহতেশাম একবার ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিল।এই জীবনে যতবার উর্ধতন অফিসারদের সাথে কথা বলেছে,ততবারই প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলেছে।এই প্রথমবার এহতেশাম কিছুটা জড়তা অনুভব করল নিজের কন্ঠস্বরে।সে মিন মিন করে বলল,’সে আমার বাগদত্তা স্যার।পারিবারিক ভাবে আমাদের বিয়ের আলোচনা চলছে।’

ভ্রুদ্বয় আপন ভঙ্গিমায় নেচে উঠল নিয়াজের।তিনি সতর্কভঙ্গিতে উঠে বসে ব্যস্ত সুরে বললেন,’আরে বলো কি! এই কথা তুমি আগে বলবে না?’

‘আসলে স্যার।সে আমার খোঁজ নিতেই এখানে এসেছে।তার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।সে এখানের কিছুই চেনে না।আমরা যে আমাদের ক্যাম্পের লোকেশান শেয়ার করি না,এটা সে জানতো না।’

কথা শেষ করে এহতেশাম মাথা নিচু করে বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়ালো।নিয়াজ একবার আদ্যোপান্ত তাকে দেখে একটা শ্বাস ফেলে বললেন,’বুঝেছি।এনি ওয়েজ।তুমি তাকে নিয়ে যেতে পারো।কিন্তু ক্যাম্পের ভেতরে চোখ খুলো না।ইট উড বি আ ভায়োলেশন অব আওয়ার রুলস।’

‘ইয়েস স্যার।ডেফিনেটলি।’

এহতেশাম অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।আশিক তখন তাবুর বাইরে দাঁড়িয়েছিল।স্যারের হাবভাব সে গতকাল রাত থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।তার কেন যেন মনে হচ্ছে,মেয়েটার পরিচয় সে ধরে ফেলেছে।কাল রাতে ক্রস চেকিংয়ে তথ্য বের করতে গিয়ে সে দেখেছে মেয়েটার বাড়ি সমতট লেনে।সমতট লেন।স্যারের নিকট আগত চিঠিদের ঠিকানা।স্যার পাঠানো পত্রদের গন্তব্য।তার ধারণা এটিই সেই মেয়ে যাকে স্যার চিঠি লিখতো।

নিরুপমার চোখ অবশ্য খোলা হয় নি,তবে হাতের বাঁধন খোলা হয়েছে।তাকে গাড়ির সামনে আনতেই এহতেশাম মৃদুস্বরে বলল,’এক পা উঁচু করুন।সামনে উঠার জায়গা আছে।’

তন্ময়দের পুরো দল তখন ক্যাম্পের মাঝামাঝি কোনো স্থানে দাঁড়ানো।এহতেশাম কে দেখেই সাদাফ অবাক হয়ে বলল,’স্যার উনাকে ড্রপ করবেন?’

আশিক হাসলো।
‘হুম।’
সাথে একটু যোগ করল,’দেখো তো কেমন লাগে?ইনি আমাদের ম্যাম হলেও হতে পারে।’

সাতজনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।ইয়াকুব মুখ হা করে বলল,’কি সুন্দর! নায়িকার মতো।’

রাদিফ বলল,’বাবুটা কার স্যার?’

‘উনারই সম্ভবত।নিশ্চিত জানি না।’

অয়ন বলল,’কি সুন্দর বাচ্চা! বিদেশিদের মতো একদম।’

এহতেশামের নিজস্ব জিপ টা ধুলো উড়িয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে গেল।ক্যাম্পের মানুষজন গাড়িটা পুরোপুরি অদৃশ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত সেদিকেই চেয়ে থাকলো।
.
.
.
.
‘আমার ছেলে কোথায়?’
নিরুপমা বেশ উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করল।

এহতেশাম স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,’আপনার ছেলে আমার বুকে।স্টিয়ারিং দেখে।’

‘এবার তো চোখ খুলে দেন।’

‘দাঁড়ান।গাড়ি সাইড করতে হবে।’

এহতেশাম গাড়ি থামাল।সিটবেল্ট খুলে সামান্য ঝুঁকে নিরুপমার দিকে এগিয়ে গেল।তার কম্পমান হাত সামনে বাড়িয়ে খুব যত্নে সে নিরুপমার চোখের বাঁধন খুললো।

চোখের বাঁধন নিরু নিজেও খুলতে পারতো।তার হাত খোলা ছিলো।চাইলেই সে নিজ থেকে খুলে নিয়ে পাশে থাকা মানুষটাকে দেখে নিতে পারতো।কিন্তু নিরুপমা অপেক্ষা করছিল একটা বিশেষ সময়ের,এমন এক মুহূর্ত যখন মেজর মুস্তাফা নিজে এসে তার চোখের বাঁধন খুলবে।নিরুপমা রহমান তখন প্রথমবার তার পত্রমিত্রের মুখদর্শন করবে।যার সাথে নিরুর পরিচয় অতি সাদামাটা এক পত্রের মাধ্যমে।যার কাছে নিরুপমা এক নতুন নাম পেয়েছিল।নীলা।নীল শাড়ি গায়ে জড়ানো নীলা।নীলা তাই তার আর মেজরের সাক্ষাৎ নীল শাড়িতেই রেখেছে।

চোখ খোলার পরেও কিছুক্ষণ নিরুপমা চুপ করে বসে রইল।পাশে তাকাতে তার কেমন যেন লাগছিল।এহতেশাম ঝুঁকতে ঝুঁকতে স্টিয়ারিং পর্যন্ত এসে ক্লান্ত স্বরে বলল,’এবার অন্তত তাকান নীলা।একবার দেখে বলুন আমি চলনসই,নাকি অনেক বেশি বয়স্ক।’

নিরুপমা তার কথা শুনতেই হেসে ফেলল।আর্দ্র চোখে সে পাশ ফিরল।মুহূর্তেই শরীরজুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি খেলে গেল।পুরো শরীর মৃদু করে কেঁপে উঠে আবার শান্ত হয়ে গেল।নিরুপমার বিস্মিত চোখজোড়া অবলোকন করেই এহতেশাম চাপা স্বরে বলল,’এহতেশাম মুস্তাফা।আমার পুরো নাম।এহতেশাম কে আপনি আগেই চিনতেন।মুস্তাফা কে চিনলেন পরে।’

নিরুপমা এক মিনিট কোনো কথা না বলে তার দিকে চেয়ে থাকল।স্থির,অপলক,মোলায়েম দৃষ্টি।কখনো আবার সেই দৃষ্টিতে আবেগের আভাস মিলল।নিরুপমা ছলছল চোখে সে আবেগ দমন করে নিল।তারপরই বড়ো করে শ্বাস টেনে এহতেশামের দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলো।কাগজটা তার কালো ব্যাগে ছিলো।এহতেশাম বিস্মিত হলো।জানতে চাইলো,’এটা আমার?’

‘হুম।’

সে সংকিত হয়ে কাগজটা হাতে নেয়।আস্তে করে খুলে দেখে ভেতরের লিখা।
নিরুপমার হাতে লিখা পত্র।এই হাতের লিখা এহতেশামের চেনা।কিন্তু সম্বোধন টা বড্ড অচেনা।এই নামে নীলা তাকে কখনো ডাকেনি।

‘মেজর এহতেশাম,
সম্বোধন দেখে পিলে চমকানোর কিছু নেই।আমি এতোটাও বোকা নই।আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।মুস্তাফা ওরফে মেজর এহতেশাম কে আমার খুব ভালো করে চেনা আছে।আর কতো লুকোচুরি খেলবেন বলুন তো?

আপনি যদি চিঠিটা পড়ে থাকেন,তাহলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়,যে আপনি বেঁচে আছেন এবং আমার সাথে আপনার দেখা হয়ে গেছে।যদি এই মুহূর্তে আমি আপনার কাছাকাছি থাকি,তবে জেনে নিবেন,আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।আপনি অরুর বড় ভাসুর এহতেশাম।যার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল রাস্তায়।একটা হুন্ডা আমায় ধাক্কা মেরে চলে গেল।আর তখন আপনি এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন।তারপর দেখা হলো অরুর শ্বশুড়বাড়িতে।
আপনি ধবধবে সাদা শার্ট পরে বসেছিলেন বসার ঘরের একটা সোফায়।তুতুন কে দেখে তার নাম জিজ্ঞেস করলেন।এক ফাঁকে আড়চোখে তাকালেন আমার দিকে।একটি কথা আপনার মনে নেই।অথবা আপনি জানেন না।সেটা হলো এই যে,আপনি যতোই বুদ্ধিমান আর চৌকস হন না কেন,আপনার বারবার আড়চোখে তাকানো ঠিকই সেই ব্যক্তির চোখে ধরা পড়ে যায়।আমি আপনাকে দুই বার আমার দিকে তাকাতে দেখেছি।প্রথমে খাবার টেবিলে,আর তারপর বাগানে।অরু তখন আমার বেণিতে ফুল গুজে দিচ্ছিলো।

একটা কথা বলুন তো।নিজে এতো সুদর্শন হয়ে আপনি আমার ভেতর এমন কি খুঁজে পেলেন?আপনাকে প্রথমবার দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছি।সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নাকি ভীষণ সুদর্শন হয়?আমার ধারণা,আপনি তাদের চেয়েও কিছুটা বেশি সুন্দর।মিথ্যা বলবো না,আপনি আমার দেখা সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ।এর আগে শুধু টেলিভিশনেই দেখেছি এমন মানুষ।কিন্তু সরাসরি আপনাকেই প্রথম দেখেছি।

অরুর ভাসুর সেনাবাহিনীতে কাজ করে।সেটা আগেই জানতাম।আমাকে পত্র পাঠানো মুস্তাফাও সেনাবাহিনীর সদস্য।নীল শাড়িতেই তার আর আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল।দু’য়ে দু’য়ে চার মিলল খুব সহজে।তার উপর আমাকে একশো ভাগ নিশ্চিত করার জন্য আপনার সেই নি রু প মা ডাক তো ছিলোই।শুনুন মুস্তাফা! মানছি আমি বোকা।তাই বলে এতোটাও না।আবার ভাববেন না,আপনাকে চিনে গেছি বলে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ আমাকে অভিভূত করবে না।আপনার সাথে আমার প্রতিটা সাক্ষাৎই রোমাঞ্চকর মুস্তাফা।আপনাকে দেখে আমি চিরকালই অভিভূত হই।আমাদের প্রতিটা সাক্ষাৎই অমলিন,অক্ষয়।

ভালো থাকবেন।
ইতি,
নীলা(আজকাল এই নামের সামনে নিজের নামটা আর ভালো লাগে না)

এহতেশাম জড় পদার্থের মতো জমে গিয়ে পুরোটা চিঠি পড়লো।মাঝে একবার ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিল।এতো মোহাবিষ্ট হয়ে সে আগে কোনো লিখা পড়েনি।তার ধারণা,নীলার সবচেয়ে সুন্দর চিঠি এটাই।এতো সুন্দর করে নীলা এর আগে কখনো লিখেনি।

সে চোখ তুলে নিরুপমার দিকে তাকালো।নিরুপমা গালের নিচে হাত রেখে তাকে দেখছিলো।সে তাকাতেই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।লজ্জা পেয়ে বলল,’পড়েছেন?এবার চলুন।’

এহতেশাম যন্ত্রের মতো করে বলল,’কোথায় যাবো?’

‘আমি জানি না।তবুও এদিকে না দেখে গাড়ি চালান।’

এহতেশাম হাসলো।গুরুগম্ভীর গলায় শুধালো,’অস্বস্তি হয় নীলা?’

নিরুপমা আরেকটু জড়োসড়ো হয়ে বসলো।লজ্জায় মাথা নোয়াতে নোয়াতে বলল,’প্লিজ।চলুন।’

এহতেশাম অস্পষ্ট হেসে স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখল।তুতুনের মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,’চলো তুতুন সোনা,ফরজ কাজটা সেরে আসি আগে।এরপর বাকি কথা হবে।’

চলবে-

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

৩১.[বর্ধিতাংশ]

নিরুপমা হাত পা শক্ত করে বসেছিল।মাঝে একবার ঢোক গিলে তেষ্টা নিবারণের চেষ্টা করল।তুতুন এহতেশামের কোলে হাত পা ছড়িয়ে বসেছিল।এহতেশাম আশেপাশে দেখতে দেখতে খানিকটা বিরক্তির সুরে বলল,’কি অদ্ভুত! এখানে কোনো কাজি অফিস নাই নাকি?এখানকার মানুষ কি বিয়ে করে না?’

নিরুপমা একবার চোখ তুলল।তারপর পাশ ফিরে করুণ চোখে এহতেশামের দিকে তাকালো।তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিলো।তার শাড়ির আঁচলের একপ্রান্ত সে একবার আঙুলে পেঁচাচ্ছিলো,আবার কখনো সেটা খুলে নিয়ে কি যেন ভাবছিলো।বেশ কিছু সময় নিরব থাকার পর নিরুপমা স্বাভাবিক হতে হতে বলল,’মুস্তাফা! আপনি সত্যিই বিয়ে করবেন?’

এহতেশাম গাড়ি চালানোর ফাঁকে একবার তার দিকে তাকালো।তারপর পুনরায় সামনে দেখতে দেখতে বলল,’হ্যাঁ,কোনো সমস্যা?’

‘না,মানে—‘

নিরুপমা একটু থামল।তারপর সামান্য কেশে বলল,’আমার ভয় লাগছে।কাউকে না জানিয়ে এভাবে।’

এহতেশাম আচমকা ব্রেক কষলো।নিরুপমা ঝাকুনি খেয়ে সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে গেল।এহতেশাম স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে তুতুনের পিঠে হাত রাখল।পাশ ফিরে বরফ ঠান্ডা গলায় বলল,’নীলা!’

‘জ্বী।’

‘আপনি কি আমায় বিয়ে করতে চান না?’

নিরুপমা অপ্রস্তুত হয়ে সামান্য নড়ে উঠল।জড়তা থাকা স্বত্তেও নিজের সাফাই টানার জন্য বলল,’না না।আপনি ভুল বুঝছেন মুস্তাফা।আমি সেটা বলিনি।কিন্তু এভাবে কাউকে না জানিয়ে,,,’

বলতে বলতে নিরুপমা থেমে গেল।বাকিটুকু বোঝার মতো বুঝ মেজর এহতেশামের আছে।নিরুপমা বলল,’বাড়িতে জানাজানি হলে ব্যাপারটা খুবই খারাপ দেখাবে।আমরা তো পরিবারের বাইরে গিয়ে এতো বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না মুস্তাফা।’

‘জানাজানি হবে না নীলা।’
এহতেশাম খুব ধীর গলায় উত্তর দিলো।তুতুনের পেটের দুই পাশ থেকে হাত এনে আঙুলগুলো আড়াআড়ি করে বলল,’আমরা আমাদের বিয়ের কথা জানাচ্ছি না কাউকে নীলা।আপাতত বিয়েটা করি।তারপর বাড়িতে জানিয়ে আবার বিয়ে করবো।’

নিরুপমা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকালো।তার বোকা বোকা চাহনি দেখেই এহতেশামের হাসি পেল।নিরুপমা চোখ গোল গোল করে বলল,’দুই বার বিয়ে?’

‘জ্বী।দুই বার বিয়ে।’

‘অদ্ভুত! নাটকের মতো ব্যাপার।’

‘আপনার এমন মিলিটারি ক্যাম্পে আসা এর চেয়েও নাটকীয় ছিলো।আমি হজম করে নিলাম না?’

নিরুপমা বলল,’কিন্তু আমার ভয় লাগছে।’

‘রাঙামাটি আসতে ভয় হয় নি?যদি হারিয়ে যেতেন?যদি একটা কিছু হয়ে যেত,তখন?’

নিরুপমা মাথা নামিয়ে বলল,’সেটা আর এটা এক নয়।বিয়ে অনেক বড়ো ব্যাপার।’

এহতেশাম স্থির চোখে তার দিকে তাকালো।ঠান্ডা গলায় বলল,’তার মানে আপনি আমায় বিয়ে করতে চান না।এটাই তো?’

‘আহা! আপনি বারবার ভুল বুঝছেন।আমি একা এতো বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছি।’

‘সেটাই।বুঝতে পেরেছি।’

এহতেশাম পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিলো।তাড়াহুড়ো করে কিংবা রাগ দেখিয়ে দ্রুত গাড়ি চালায় নি।বরং খুবই সাবলীল হয়ে আগের মতো করে ড্রাইভ করে গেল।তাকে দেখে মনেই হলো না যে কোনো একটা ব্যাপারে তার মনঃক্ষুন্ন হয়েছে।তাকে দেখালো একেবারেই শান্ত,জড় পদার্থের মতো নির্লিপ্ত।

নিরুপমা উসখুস করে তার দিকে তাকালো।ধীর কন্ঠে বলল,’একটু বোঝার চেষ্টা করুন।এভাবে আমার ভয় হয়।’

‘বুঝতে পারছি।সেজন্যই কথা বাড়াচ্ছি না।’

এহতেশামের চোয়াল শক্ত।মন দিয়ে ড্রাইভ করছে।চোখ লুকানোর জন্য চোখের উপর একটা রোদ চশমা চাপিয়েছে।নিরুপমা অপরাধীর মতো মুখ করে তার দিকে তাকালো।সেই করুণ চাহনি এহতেশামের দৃষ্টি এড়ায় নি।সে গিয়ারে হাত রেখে বরফঠান্ডা গলায় বলল,’এতো হেজিটেট করার কিছু নেই।আপনার জীবনে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ।আমি বুঝতে পারছি।আমার সব সিদ্ধান্তের মালিক আমি।তাই আপনার দিকটা বুঝতে আমার সময় লেগেছে।দুঃখিত!’

‘আয়হায়! আপনি তো রেগে গেলেন।’

এহতেশাম তাচ্ছিল্য করে হাসলো।
‘আমি একদম ঠিক আছি।’

নিরুপমা দুই হাত কোলের উপর ফেলে তার দিকে তাকালো।
‘আপনি তো কিছুদিন বাদে ছুটিতে আসবেন।তখন বিয়ে করলে কি হয়?’

আবারো অকস্মাৎ ব্রেকে গাড়ি থামল।এহতেশাম চাপা স্বরে বলল,’কিছুদিন না।আরো তিন মাস।’

‘ঐ আরকি।’

এহতেশাম দুই মিনিট কোনো কথা বলল না।নিরুপমাও অনুশোচনায় মাথা নামিয়ে বসে থাকলো।ক্ষণিক বাদে এহতেশাম কন্ঠ নামিয়ে ডাকল,’নীলা!’

‘হুম’

‘আমি আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরতে চাই।সেটাও আজকে।বিয়ে না করে জড়িয়ে ধরলে ব্যাপারটা খুব খারাপ দেখাবে না?আপনি কি চান,আমাদের প্রথম স্পর্শ টা খুবই খারাপ কিছু হয়ে আমাদের স্মৃতিতে থাকুক?’

নিরুপমা বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকালো।একটা কনকনে ঠান্ডা রক্তের ধারা তার শিরদাঁড়া বেয়ে তরতর করে নেমে এলো।নিরুপমা সেই রক্তের প্রবাহে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল,পুরো শরীর জমে গেল কোনো কাঁচের শো পিসের মতোই।নিরু ঢোক গিলে বলল,’জ্বীহ্?’

‘নীলা! প্লিজ।’

এহতেশাম সিটে গা এলিয়ে মৃদুস্বরে বলল,’উই লিভ আ ভেরি আনসারটেইন লাইফ নীলা।আমাদের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নাই।যেখানে একটা মুহূর্তই আমাদের কাছে সৌভাগ্যের মতো,সেখানে তিন মাসের অপেক্ষা আমার কাছে গলার কাঁটা ব্যতীত আর কিছুই না।তিন মাস আমাদের যোগাযোগ হবে।আমি আপনাকে পত্র দিবো,আপনি দিবেন।আমাদের কথা হবে।তাহলে সেসবের মাঝে আপনি কেন আমার হতে পারেন না?আমি তো বললাম,আপনার এই বিয়ে কাউকে জানাতে হবে না।ফিরে গিয়ে আমরা আবার বিয়ে করবো,পরিবারের সবাইকে জানিয়ে।কিন্তু এই তিনটা মাস তো আমায় একটু শান্তি দিন নীলা।’

নিরুপমা আস্তে করে মাথা তুলল।থিতু হয়ে বলল,’আচ্ছা।আমি রাজি।’

_______

কাজির নাম মোজাম্মেল ইসলাম।দুই ঘন্টা খোঁজাখুঁজির পর এহতেশাম তার সন্ধান পেল।লোকালয়ের এক পাশে একটা টিনের ঘরে তার কাজি অফিসের অবস্থান।

এহতেশাম তার সামনে চেয়ার টেনে বসল।তার কোলে তুতুন।তার গলা জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে।নিরুপমা একবার আড়চোখে তাদের দিকে তাকালো।সে খেয়াল করেছে,তুতুন ছেলে মানুষের কোলে খুব আরাম করে ঘুমায়।ঘুমের মাঝে তার নিঃশ্বাস উঠানামা করে।নিরুপমার সেই দৃশ্য ভীষণ ভালো লাগে।

মোজাম্মেল একবার চোখ ঘুরিয়ে দু’জনকে দেখলেন।ভ্রু কুটি করে বললেন,’বিয়ে কি আপনারা দুইজন করবেন?’

এহতেশাম হাস্কি স্বরে বলল,’জ্বী।’

‘তাহলে এই বাচ্চা কার?’

নিরুপমা একটু অপ্রস্তুত বোধ করল।এহতেশাম নির্বিকার হয়ে বলল,’আমার।’

‘আপনার?বিয়ের আগেই বাচ্চা?’

কাজি লোকটা চোখ ছানাবড়া করে তার দিকে তাকালো।বিরক্তিতে এহতেশামের পুরো মুখ তেতো হয়ে এলো।সে দিরুক্তি করে বলল,’নাহ্।আগে এক জায়গায় বিয়ে হয়েছে।বউ ছেড়ে চলে গেছে।’

‘আহারে! কষ্ট পাইলাম স্যার।’

এহতেশাম দাঁতে দাঁত চেপে বলল,’আপনি দয়া করে নিজের কাজ করুন।আমার বউ গেছে,তাতে আপনার কান্দার কিছু নাই।’

‘নাই স্যার?এতো সুন্দর মানুষেরও বউ যায়?আমার তো ঐ মাইয়ার জন্যই আফসোস হইতেছে।তয় ম্যাডাম রে দেইখা আর আফসোস নাই।খুব মানাইছে দুইজনরে।’

এহতেশাম থমথমে মুখে তার দিকে তাকাল।একবার হাত ঘড়িতে সময় দেখে গম্ভীর হয়ে বলল,’একটু তাড়াতাড়ি বিয়ের কাজ শেষ করুন।আমার ক্যাম্পে ফিরতে হবে।’

‘জ্বী স্যার।অবশ্যই।’

____

‘স্যার! দেনমোহর কতো দিবো?’

এহতেশাম বিরক্ত হয়ে বলল,’আপনের যতো মন চায় দিন।’

‘টাকা তো পরিশোধ করতে হয় স্যার।’

এহতেশাম মানিব্যাগ বের করল।গুনে বলল,’ছয় হাজার আটশো টাকা আছে।’

‘এটা তো অনেক কম স্যার।’

এহতেশাম দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোয়াল শক্ত করে বলল,’আমি ক্যাম্পে থাকি।এতো টাকা কি সাথে নিয়ে ঘুরি?’

নিরুপমা তার হাবভাব বুঝেই চঞ্চল হয়ে বলল,’আমার কোনো দাবি নাই।’

কাজি লোকটা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকালো।মোটা ফ্রেমের চশমা টা জায়গা মতো ঠেলে বলল,’আপনে কোন মাযহাব মানেন আপা? ইসলামি শরিয়তের বিধান হলো- বিয়েতে সর্বনিম্ন দেনমোহর ১০ দিরহাম। অর্থাৎ ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা। ১০ দিরহামের কম পরিমাণ দেনমোহর নির্ধারণে স্ত্রী রাজি হলেও তা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে না।’

এহতেশাম দাঁত কিড়মিড় করে বলল,’আমার এই ছয় হাজার টাকায় ত্রিশ গ্রাম রূপা আসবে না?’

‘তা তো অবশ্যই আসবে।’

‘তাহলে অযথা জ্ঞান দিচ্ছেন কেন?’

‘না মানে এটা তো সর্বনিম্ন।’

এহতেশাম কপালে হাত চাপলো।মেজাজ ঠান্ডা রেখে সোজা হয়ে বসল।গলার স্বর স্বাভাবিক করে বলল,’আপনি প্লিজ বিয়েটা পড়ান।আমার ক্যাম্পে ফিরতে হবে।’

_______

নিরুপমার বিশ্বাস হলো না,তার সত্যিই বিয়ে হয়ে গেছে।বিয়ে।কতো ভারি একটা শব্দ।নিরুপমার জন্য আবার কিছুটা যন্ত্রনারও।কবুল বলতে গিয়েই নিরুপমা টের পেল,তার গলায় একটা কিছু আটকে আছে।সে বলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছিল বার বার।তার কেমন যে অস্বস্তি হচ্ছিল।

রাহাত।একটা নাম।নিরুপমার জন্য একটা বিভীষিকার মতো।সেই নাম নিরুপমা কে কতো রাত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে,নিরুর সেটা মনেও নেই।নিরুপমা সেই যন্ত্রনার রজনী গুনে শেষ করতে পারে না।বিয়ে শব্দটা সামনে এলেই নিরুপমার কেমন যে লাগে।

সে কপালের ঘাম মুছে এলোমেলো চোখে এদিক সেদিক তাকালো।এহতেশাম তার এক হাত শক্ত করে ধরে বলল,’চলো।বাইরে যাই।আমাদের কাজ শেষ।’

____

তুতুনের ঘুম ভাঙার পরেই সে যেই মুখটা দেখলো,সেটা তার অল্প দিনের চেনা।সে দ্রুত পাশ ফিরে নিজের কাঙ্ক্ষিত মুখটা খোঁজার চেষ্টা করল।

এহতেশাম তার পিঠে হাত রেখে বলল,’মা আছে তুতুন।ডোন্ট ও’রি।’

‘মা যাবো।’

‘উমম।এখন মা যাওয়া যাবে না।পরে যাবে।’

নিরুপমা জিপের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মেলে চারপাশ দেখছিল।জিপটা এখনো কাজি অফিসের সামনে।তুতুন গেছে শিস করতে।এহতেশাম তাকে নিয়ে গেছে।এই কাজ সে করছে ভীষণ আগ্রহের সাথে।নিরুপমা বলল,’আপনি পারবেন না।আমায় দিন।’

এহতেশাম জেদ করে বলল,’কেন পারবো না?আমার নেই দেখে কি আমি কিছুই জানি না নাকি?সরুন তো।আপনি এদিকেই থাকুন।আমি আসছি।’

এহতেশাম এলো একটু পরে।নিরুপমা একটু সরে দাঁড়ালো পাশে।এহতেশাম পাশে দাঁড়ায় নি।সে দাঁড়িয়েছে মুখোমুখি।নিরুপমা অস্বস্তিতে মিলিয়ে এলো।লজ্জায় তার মুখ টকটকে হয়ে গেছে।

এহতেশাম তুতুনকে গাড়ির উপর বসিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ালো।নিরুপমা,তার সামনে এহতেশাম,আর তাদের মাঝে তুতুন।এহতেশাম তার দুই হাত নিরুপমার দিকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,’নীলা! ক্যান আই?’

নিরুপমার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল।সে তিরতির করে কাঁপতে থাকা হাত টা এহতেশামের দিকে কোনোরকমে বাড়িয়ে দিলো।এহতেশাম সেই হাতটা আঁকড়ে ধরল।শুরুতে আলতো করে,তারপর একটু শক্ত করে।

তারপর নিরুপমাকে লজ্জার চূড়ান্ত সীমায় নেওয়ার জন্য মাথা নামিয়ে তার দু’হাতের পিঠে গাঢ় করে দু’টো চুমু খেল।নিরুপমার তখন শুধু হাতই না,মৃগী রোগীদের মতোন তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল।তুতুন অবাক হয়ে বলল,’তুমি মা কে কি কচচো?’

এহতেশাম হাসলো।
‘আমি মা কে স্বান্তনা দিচ্ছি।’

নিরুপমা দু’বার বড়ো করে শ্বাস টানলো।এহতেশাম একটু ঝুঁকে তার মুখ দেখতে দেখতে বলল,’একটা ছোট্ট আলিঙ্গন কি এই ফৌজির কপালে জুটবে?আগেই বলে দিচ্ছি।এরপর কিন্তু তিন মাস কেঁদে মরলেও আর কাজ হবে না।’

নিরুপমা কতোক্ষণ বরফ খন্ডের মতো জমে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।তার শরীরের কাঁপুনি কমেছে।নিশ্বাসের মাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে।কিন্তু হঠাৎই আবার সে ব্যাকুল হলো।সমস্ত ব্যাকুলতা আর অস্থিরতার আধিপত্যে জর্জরিত হয়ে নিরুপমা আচানক ছুটে গিয়ে এহতেশামের শক্ত-পেটানো বক্ষে সমুদ্রের নোনা জলের মতো করে আছড়ে পড়ল।এহতেশাম নড়লো না,সামান্য টললো না।উল্টো হাত বাড়িয়ে একটা হাত তার পিঠের উপর রাখলো।

নিরুপমা বোধহয় এই প্রথম ঠোঁট ভেঙে বাচ্চাদের মতো কাঁদলো।একবার এহতেশামের শার্ট খাঁমচে ধরে ক্ষণিক বাদেই তার ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো স্থানে হাত রেখে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,’আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম।অনেক বেশি।’

এহতেশাম উত্তরে কিছু বলল না।কেবল চুল সরিয়ে নিরুপমার কপালে ছোট্ট একটা চুমু খেল।তুতুন আঙুল খেতে খেতে বলল,’তুমি মা কে আদল দিচচো?’

এহতেশাম মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,’হুম।দিচ্ছি।’

তুতুন লজ্জায় মুখ লোকালো।মাথা নামিয়ে বলল,’নজ্জা! নজ্জা!’

এহতেশাম অবাক চোখে তার দিকে তাকায়।নিরুপমা কান্নার মাঝেও হেসে ফেলল।এহতেশাম হতাশ হয়ে বলল,’উহ্।আমি তো ভুলেই গিয়েছি সে অরুনিমার ভাগ্নে।’

তুতুন বলল,’মা! তুমি কাননা কচচো কেনু?আদল দিলে কেউ কাননা কয়ে?’

‘সেটাই তো।মা তো বোকা।বুঝে না।দেখি তুতুন সোনা।আমার কাছে আসো তো।’

এহতেশাম একটানে তাকে কোলে নিল।নিরুপমা তাদের ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো।এহতেশাম তুতুনের সমস্ত মুখে এতো এতো চুমু খেল।আদরে আদরে ভরে উঠতেই তুতুন খিলখিলয়ে হেসে ফেলল।কপালে হাত চেপে বলল,’এতো আদল?’

‘হুম।এতো আদল।তোমার খারাপ লাগছে?’

‘না।ভালু লাগচে।’

তুতুন হাত তুলে বলল,’এখানেও আদল দাও।মা কে যে দিয়েচো,এমুন কলে।’

এহতেশাম আর নিরুপমা দু’জনই একবার আড়চোখে নিজের দিকে তাকালো।তারপর আচমকাই দু’জন শব্দ করে হেসে ফেলল।

এহতেশাম তুতুনের হাত দু’টোতে ইচ্ছে মতোন চুমু খেল।তুতুন তার গাল ধরে বলল,’এখুন আমি তুমাকে আদল দিবে।তুমি নববে না।’

‘বাবাহ্! তুমি আদল দিবে?আচ্ছা নড়বো না।’

তুতুন এগিয়ে গেল তার দিকে।তার কপালে কপাল ঘঁষলো।গালের সাথে গাল।তারপর পর পর কয়েকটা ভেজা চুমুতে এহতেশাম কে খানিকটা সিক্ত করে দিলো।

সে কতোখানি সিক্ত হলো জানা নেই,তবে নিরুপমা রহমানের ভেতরটা পুরোপুরি বর্ষার অথৈ জলে তলিয়ে গেল।তার মনে হলো এতো সুন্দর দৃশ্য দেখার পর দুনিয়ার বাকি সব দৃশ্য তার কাছে নস্যি।

আচ্ছা।পৃথিবীটা এতো অদ্ভুত কেন?স্রষ্টা কেন শুধু রাহাতের মতো লোক দিয়েই পৃথিবী পূর্ণ করেনি?কেন এর মাঝে মাঝে এহতেশামের মতো কিছু মানুষ এনে পৃথিবীটা বৈচিত্র্যময় করে দিয়েছেন।পুরুষ হওয়ার পরেও কিভাবে দু’জন মানুষ এতো ভিন্ন হতে পারে?কেউ বৈধতার সার্টিফিকেট পেয়ে শরীর ছুঁয়ে দেয়।আর কেউ শুধুমাত্র মন ছোঁয়ার জন্যই এতোখানি সাধনা করে।
আচ্ছা,মন কি কোনো মহা মূল্যবান জিনিস?মন না ছুঁয়েও তো সংসার করা যায়,সন্তান জন্ম দেওয়া যায়।তাহলে মুস্তাফার মতোন বোকা লোকেরা কেন মন ছুঁয়ার জন্য এতো তপস্যা করে?

চলবে-