কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম প্রহর পর্ব-৩২ এবং শেষ পর্ব

0
28

#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

৩২.
[রাতে রিচেক দিবো]

জীবন,জীবনের পরিক্রমায় ডেস্ক ক্যালেন্ডার থেকে পাক্কা দু’মাস গায়েব।নিরুপমার রাঙামাটি থেকে ফিরে আসার তিন মাস কেটে গেছে।সুচিস্মিতার বিয়ের বয়স হয়েছে তিন মাস।জীবন একটা নির্দিষ্ট গতিতে আপন স্রোতে এগিয়ে যাচ্ছিল।সেই স্রোতে অরুনিমার ছোট্ট সংসারটাও কোনোরকমে ভেসে থাকার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলো।

____

গোধূলির আলোতে ঢাকা পড়েছে সমস্ত শহর।ঢাকার রাস্তায় তখনও যানবাহনের কোলাহল,বাতাসে কালো ধোঁয়ার দূষণ।অরুনিমা মাত্র নামাজ পড়ে বারান্দায় পা রাখলো।গতকাল তার শরীরে একটু জ্বর ছিলো।তার প্রভাবে আজকেও শরীর কিছুটা খারাপ।মাথা ঝিমঝিম করছিল।

বাগানে কয়েকটা সুন্দর চারাগাছ আছে।হামাদ তাকে সেগুলো কিনে দিয়েছিল।অরুনিমা মনে করে গাছগুলোতে পানি দেয়।পানি দিতে দিতে বিরাট বড়ো বাড়ির বাগানের দিকটা দেখে।সেই সাথে দেখে প্রকান্ড সেই অশ্বত্থ গাছ।গাছের ডালপালা ঝুঁকতে ঝুঁকতে মাটি ছুঁয়েছে।এমন ভুতুড়ে গাছ অরুনিমার কেমন যেন লাগে।সে দ্রুত পর্দা টেনে ঘরে এলো।

___

সেই সন্ধ্যায় অরুর মন খারাপ করার মতো একটা ব্যাপার ঘটে গেল।সাতটা নাগাদ জগলুর কন্ঠে সে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে দোতালার খোলা করিডোরে এসে দাঁড়ালো।রেলিংয়ে হাত রেখে বেশ ব্যস্ত হয়ে নিচের দিকে তাকাতেই তার সমস্ত শরীর ঝংকার তুলে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল।

অভির এক্সিডেন্ট হয়েছে।দ্রুত গামী ট্রাকের সাথে মুখোমুখি ধাক্কায় অভি বাইক থেকে ছিঁটকে রাস্তার এক মাথায় গিয়ে পড়েছে।কিন্তু স্বস্তির ব্যাপার,হেলমেট থাকায় মাথায় কিছু হয়নি।কিন্তু পড়ে গিয়ে হাত পা সব কেটে ছিঁড়ে একাকার হয়েছে।তার সমস্ত শরীরে ব্যান্ডেজ বাদে অরু আর কিছুই দেখলো না।

সে হতবিহ্বল হয়ে নিচে নেমে এলো।কথা বলতে গিয়ে সে টের পেল তার কন্ঠরোধ হয়ে আসছে।কোনো কথাই আর কন্ঠনালি ভেদ করে বের হতে পারলো না।তাকে দেখে জগলু সামান্য স্বাভাবিক হয়ে বলল,’বাইক এক্সিডেন্ট করেছে।মাথায় কোনো ব্যথা পায় নি।তবে পুরো শরীর ছিঁলে গেছে।’

অরুনিমার দুই চোখ তখন ব্যথায় ছলছল।অভি একবার চোখ তুলে তার দিকে তাকালো।অভির দু’চোখে কোনো তাড়াহুড়া কিংবা যন্ত্রনার লেশমাত্র নেই।সে চেষ্টা করছিল জগলু কে ছেড়ে নিজ থেকে হাঁটার।জগলু তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সামান্য ধমকের সুরে বলল,’সবকিছুতে বাড়াবাড়ি করিস না তো।তুই একা একা পারবি না অভি।’

সে তাকালো অরুনিমার দিকে।বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,’ডাক্তার বলেছিলো দু’টো দিন হসপিটালে থেকে যেতে।সে জেদ করে থাকেনি।কোনোরকমে ড্রেসিং করিয়েই চলে এলো।দু’টো দিন হাসপাতালে থাকলে তার কোন ক্ষতি হতো শুনি?’

অরু উত্তর দিলো না।নরম চোখে সে অভির শরীরের সমস্ত ক্ষত দেখে নিল।অরুনিমার মতো দুরন্ত আর মিষ্টি স্বভাবের মেয়েটা হঠাৎই কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।শম্বুক গতিতে সামনে এগিয়ে এসে একটা হাত অভির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,’হাত ধরো হামাদ।তুমি একা একা পারবে না।’

অভি সেই কন্ঠ শুনেই সাথে সাথে মাথা তুলে তার দিকে তাকালো।এই শান্ত,মোলায়েম আর শ্রুতিমধুর কন্ঠ এতোদিন বাচ্চামো আর উচ্ছাসের নিচে চাপা পড়েছিল।ঐ দু’টো চোখে সেদিন অভি শুধু মলিনতাই দেখলো।অভি আস্তে করে তার হাতটা অরুনিমার হাতের উপর রাখলো।আজকাল মেয়েটা কেমন যে অদ্ভুত আচরণ করে।অরু আস্তে করে বলল,’চলো।ঘরে চলো হামাদ।’

একটি মেয়ে।যার স্বভাব প্রতিটা কথায় প্রশ্ন করা,যার স্বভাব সবকিছুতে আবেগ দেখানো।সেই মেয়েটা এতো বড়ো ঘটনায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না?চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলল না?অভির বিধ্বস্ত শরীর দেখে হু হু করে কেঁদে উঠল না?অভি তো সেই অরুনিমাকে চিনতেই পারলো না ঠিক মতো।মেয়েটা কেমন যে শান্ত হয়ে গেল হুট করেই।

অভি খাটে বসেই গম্ভীর গলায় বলল,’জগলু বাড়িয়ে বলেছে অরুনিমা।আমি অতোটাও আঘাত পাইনি।’

অরু একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,’বুঝেছি।’

‘তুমি এমন চুপ হয়ে গেলে কেন?’

‘এভাবেই।’

অরুনিমা একটা বালিশ টেনে তার পিঠের পেছনে দিলো।ঘরের সমস্ত জানালা বন্ধ করে পাখা ছেড়ে সে অভির সামনে এসে বসলো।জানতে চাইলো,’কেমন করে এক্সিডেন্ট করলে হামাদ?’

‘ইউটার্ন নিতে গিয়ে।’

‘ওহ।’

অরুনিমা খুব নির্বিকার হয়ে কথাটা বলল।কিভাবে ইউটার্ন নিতে গিয়ে এতো বড়ো ঘটনা ঘটলো,কোন গাড়ি তাকে ধাক্কা দিলো,এমন কোনো প্রশ্ন করে সে অভিকে বিরক্ত করে তুলল না।উল্টো চুপচাপ হেঁটে খাটের অন্য মাথায় বসল।অভি মনোযোগ দিয়ে তার দু’চোখ দেখল।দু’চোখে স্বচ্ছ চকচকে পানি।অথচ অরুনিমা একবারো শব্দ করে কাঁদলো না?অভি বলল,’অরুনিমা! তুমি কি ভয় পেয়েছো?’

‘খুব।বেশি ভয় পেলে আমার কথা বন্ধ হয়ে যায় হামাদ।’

অরুনিমা পিঠের পেছনে একটা বালিশ রেখে তার উপর ঠেস দিলো।কাত হয়ে অভির দিকে দেখে তার ব্যান্ডেজ মোড়ানো হাতের উপর নিজের রুগ্ন হাত টা রেখে ধরে আসা কন্ঠে বলল,’আমার বাবার মৃ’ত্যু হয়েছিল এক্সিডেন্টে।তখন আমার বয়স খুব অল্প।ঝাপসা ঝাপসা কিছু মনে আছে।বাবার লা শ এনে রাখলো বাড়ির দুয়ারে।কেমন র ক্তে মাখা একটা শরীর।এখনো কিছু কিছু জিনিস মনে পড়ে।

বাবা কে ধোয়ানোর সময় একটা সমস্যা হলো।বাবার রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না।দুই তিনবার গোসল করানোর পরেও বাবার শরীরটা বার বার রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।নিরু আপা খুব কান্না করছিলো,মা জ্ঞান হারাচ্ছিল বারবার।আর আমি পাচ্ছিলাম ভয়।যেই মানুষের কোলে চট করে উঠে পড়া যেত,সেই মানুষটার শরীর চটচটে লাল রঙে ঢাকা।আমি খুব ভয় পেলাম জানো?ভয়ে আমি বাবার কাছে যেতেও পারছিলাম না ঠিক মতো।

সেই থেকে এই এক্সিডেন্ট শব্দটা আমি নিতে পারি না।আমার খুব ভয় হয়।তুমি ওমন করে আমার সামনে এলে,আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম হামাদ।আসলে আমরা যতোই আনন্দ উল্লাসে থাকি না কেন,দিন শেষে আমাদের সবারই কোনো না কোনো দুঃখ থাকে তাই না?’

অভি একটা ঢোক গিলে বলল,’তুমি এভাবে কথা বলছো কেন অরুনিমা?’

‘কিভাবে বলছি?’

‘এই যে কেমন কঠিন কঠিন কথা।’

‘ভয় পেলে আমি একটু কঠিন কথাই বলি।’

অভি আস্তে করে বলল,’তুমি আমার উপর রাগ অরুনিমা?’

‘না তো।তোমার উপর কেন রাগ হবো?’

‘তুমি আজকাল কেমন যে করো?’

‘কেমন করি?’

‘খুব চুপ হয়ে থাকো।দেখলে মনে হয় তুমি কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশি হতাশ।নিজ থেকে কথাও বলো কম।’

‘এমন অরুকেই কি তুমি চাওনি?’

কথাটা কেমন যে তীরের ফলার মতো বুকে গিয়ে বিঁধলো।অভি বলতে গিয়েও থেমে গেল।কথা সব বুকেই আঁটকে গেল।দগদগে ঘাঁ হয়ে ছড়িয়ে যেতে চাইলো সর্বাঙ্গে।

অরু রাত নয়টার দিকে খাবারের প্লেট হাতে ঘরে এলো।অভি একবার তার পরনের শাড়িটা দেখলো।ইদানিং সে শাড়িই পরে।সে শুধু শাড়ি পরছে ব্যাপারটা এমন না।সে রিজোয়ানার সাথে কাজ করছে,সময় মতো পড়াশোনা করছে,কথা বলছে খুবই নিচু স্বরে,নিজের মতো করে ঘুমাচ্ছে,নিজের যত্ন নিজেই নিচ্ছে।এই সবকিছুতে অভি যেন নিজেকে তার জীবনের কোনো ভূমিকাতেই দেখতে পেল না।অথচ তিন মাস আগে অরুনিমার জীবনে অভি বাদে আর কোনোকিছুর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না।অথচ তিন মাসের ব্যবধানে অরুনিমা রহমান কেমন যে শক্ত খোলসে নিজেকে ঢেকে নিল।সেই মেয়েটা আর অভির কাছে বায়না নিয়ে এলো না,তার কাঁধে নাক ঘঁষলো না,এতো গুলো দিনেও সে কোনো সিনেমা দেখার ইচ্ছে পোষণ করল না।একটা স্বত্তার এই আচানক পরিবর্তন অভিকে উন্মনা করল।অভি বহুবার চেষ্টা করেও বেড়াল ছানার মতোন আদুরে অরুনিমা কে আর খুঁজে পেল না।

অরুনিমা ভাত মেখে একটা লোকমা তুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিলো।আস্তে করে বলল,’নাও খাও।’

অভি মুখ খুলল।লোকমা মুখে নিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো,’তুমি খেয়েছো?’

‘খাবো।আগে তুমি খাও।’

অভি আর কোনো কথা বলল না।অরুনিমা তাকে খাওয়ানো শেষে তার সামনে এসে বসল।কপালে হাত রেখে বলল,’শরীরটা গরম লাগে কেন বলো তো?জ্বর টর আসবে নাকি?ঔষধ খাবে?’

‘নাহ্।প্রয়োজন নেই।’

অরুনিমা বলল,’আচ্ছা।তুমি শুয়ে পড়ো।শরীরে তো ভালোই ব্যাথা।একটু ঘুমালে ভালো লাগবে।’

অভির মন চাইলো অরুর হাতখানা চেপে ধরে বলতে,’তুমি শরীরের ব্যাথা দেখলে।অথচ মনের ব্যথা দেখলে না?’

অভি তার কিছুই বলে নি।সে শুয়ে গেল চুপচাপ।শুরুতে শরীরের ব্যথা প্রকট হয়নি।কিন্তু রাত বাড়তেই যখন চেতনানাশক ঔষধের কার্যকারিতা কমে এলো,তখন প্রচন্ড ব্যথায় অভির সমস্ত শরীর বিবশ হয়ে উঠছিলো।

সে চোখ খুলতেই অরুনিমা কে দেখল।অরু তার শিয়রে বসা।তার একহাত অভির মাথায়।সে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,’বেশি খারাপ লাগে হামাদ?মাথায় পানি দিবো?’

অভি বাকহারা হয়ে তাকে দেখে।মুখের কথা মুখেই থেকে গেল তার।প্রতিউত্তরে অরুনিমাকে কিছুই বলা হয় নি।বাচ্চা অরুনিমাকে অনেক কিছুই বলা যেত।কিন্তু এই পরিপূর্ণ নারী অরুনিমা কে কিছু বলা সম্ভব না।হামাদ শিকদার তো তার সামনে মুখই খুলতে পারে না।

সকালের ঘুম ভাঙতেই অভি তাজ্জব হয়ে আবিষ্কার করল,অরুনিমা আগের মতো করেই তার শিয়রে বসা।সে ঝিমুচ্ছিলো বসে বসে,অথচ পুরোপুরি ঘুমাচ্ছিল না।অভি হকচকিয়ে উঠে ডাকল,’অরুনিমা! এ্যাই মেয়ে।’

অরু ধড়ফড়িয়ে উঠল।তাড়াহুড়ো করে বলল,’কি?কিছু লাগবে?’

‘তুমি এখনো ঘুমাও নি অরুনিমা?’

‘না।’

অভি কিছুটা ধমকের সুরে বলল,’কেন?’

‘কারণ তোমার যদি রাতে কিছু লাগে?তাই।’

‘অরুনিমা!’

‘হুম।’

‘তুমি পাগল হয়ে গেছো।’

অরু কেমন যে আশাহত হলো।মলিন চোখে অভির দিকে চেয়ে বলল,’এখনও কি আমি তোমার পছন্দের মেয়ে হতে পারি নি?আফসোস!’

অভি কেমন হতবুদ্ধি হয়ে যায়।অরুনিমার এই নির্লিপ্ততা অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারের চেয়েও ভয়ংকর।অভি এই মেয়ে কে চেনে না।এই মেয়েকে দেখতেই তার কন্ঠনালিতে অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হয়।

অরুনিমা বলল,’তুমি মিথ্যা বলেছো।তোমার ক্ষত আসলে অনেক গভীর।হাসপাতালে না গেলে আরো বাড়বে।’

অভি পুনরায় বালিশে মাথা রাখল।পায়ের কাছে পড়ে থাকা চাদরটা সামান্য টেনে তুলে দু’টো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,’আমি ঠিক আছি।হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’

অরুনিমা দুই মিনিট অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।কোনো শব্দ নাই,আওয়াজ নাই,মুখ ফুটে কোনো অভিব্যক্তি নাই।তাকে দেখালো একেবারেই শান্ত।কিছুক্ষণ বসে থেকে সে বিনা শব্দে উঠে বারান্দায় চলে গেল।বারান্দার গাছ গুলোতে আজ পানি দেওয়া হয়নি।
.
.
.
.
সকালের মিঠে রোদ পর্দা ঠেলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে চাইছিলো।কিন্তু পর্দার ভার বেশি হওয়ায় সেটা ভেদ করে খুব কম আলোই ঘরের ভেতর এলো।তবুও যেটুকু এলো,তাতে ছোট্ট ঘরটা কমলা বর্ণ ধারণ করলো।

জগলু বালিশের উপর উপুড় হয়ে শুয়েছিল।চুলগুলো কপালের উপর অবিন্যস্ত হয়ে পড়েছিল।উদাম শরীরে সূর্যের আলো পড়তেই সেটা ঝকঝক করে উঠল।তার টানা ঘুম ভাঙলো চায়ের কাপের ক্যাচ ক্যাচ শব্দে।সে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকালো,মাথার নিচে থাকা বালিশটা মাথার উপর চাপিয়ে দিয়ে মহাবিরক্ত হয়ে বলল,’মিতা প্লিজ! এখনই ঘুম থেকে তোলো না।আমি এতো আগে উঠি না ঘুম থেকে।’

সুচিস্মিতা হেঁটে গিয়ে খাটের পাশে থাকা সাইডবক্সের উপর বসল।তার মুখে এক টুকরো কোমল হাসি।সে দুই হাতে দু’টো কাপ ধরে ডাকল,’জুহায়ের!’

‘মিতা! প্লিজ।’

‘তুমি উঠবে জুহায়ের?’

‘না।’

‘ঠিক আছে।আমার অফিস একটু পর।আমি ফিরবো সন্ধ্যার দিকে।তুমি ঘুমাও।’

জগলু নড়ে উঠল।মুখের সামনে থেকে বালিশ সরিয়ে চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসলো।তার চোখে ঘুম।বার বার ঢুলে পড়ছিল।সুচিস্মিতা চুপ হয়ে তার ঢুলতে থাকা শরীরটা দেখে।

জগলু চোখ মুখ ঘঁষে পুরোপুরি চোখ খুলে তারপর মিতার দিকে তাকালো।চোখাচোখি হতেই সে গাঢ় করে হাসল।আড়মোড়া ভেঙে বলল,’শুভ সকাল।’

‘শুভ সকাল।’

‘আচ্ছা মিতা! তুমি রোজ এমন সময় করে কিভাবে উঠো?’

সুচিস্মিতা হেসে বলল,’আমার অভ্যাস আছে।’

‘আমি খুব অলস।ঘুম ভাঙতে চায় না আমার।’

‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’

জুহায়ের একটু লজ্জায় পড়ে বলল,’তুমি কি আমার উপর বিরক্ত হও না?এই যে তোমার মতো গুণী মেয়ে কিনা আমার মতো বর পেল?’

‘নাহ্।আমি অবাক হই।আমার মতো ছন্নছাড়া মেয়ে কি করে তোমার মতো মিষ্টি মানুষ পেল,তা ভেবে অবাক হই।’

মিতা চায়ের কাপ টা তার দিকে বাড়িয়ে দিলো।গালের নিচে হাত রেখে বলল,’জুহায়ের!’

‘জ্বী।’

‘তুমি আজ বিকেলে আমার অফিসের বাইরে আসবে।’

‘তারপর?’

‘তারপর আমরা একটু রিকশায় করে ঘুরবো।’

জুহায়ের হাসে।মাথা নেড়ে বাধ্য ছেলের মতো বলে,’আচ্ছা আসবো।’

‘আমরা রিকশা দিয়ে ঘুরবো।শহর দেখবো,শহরের মানুষ দেখবো।’

‘আচ্ছা দেখবো।’

‘আর এখন আমরা চা খেতে খেতে কথা বলবো।’

জুহায়ের খাটের সাথে ঠেস দিয়ে বসলো।বলল,’আচ্ছা।কিন্তু কেমন কথা?’

‘এমনিই।যা মাথায় আসে তা।রাজনীতি,পৌরনীতি,সমাজনীতি সবকিছু।’

‘বাবাহ্! অতো কঠিন জিনিস বুঝি না।’

‘তাহলে বলো আমাকে কেমন লাগে?’

জুহায়ের হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকালো।গভীর স্বরে বলল,’তোমাকে?তোমাকে আমার নীল অপরাজিতা ফুলের মতো লাগে।’

‘নীল অপরাজিতা?’ মিতার ভ্রু দ্বয় আপনাআপনি অবস্থানচ্যুত হলো।

‘হুম।নীল অপরাজিতা।ঐ ফুলটা আমার অনেক পছন্দের।নাম টা এর চেয়েও বেশি পছন্দের।অপরাজিতা।তুমিও আমার কাছে তাই মিতা।তোমাকে কখনো কোনো পরাজয় ছুঁতে না পারুক।এটাই চাই।’

মিতা তার কথা শুনে।খুব মন দিয়ে শোনে।শুনতে শুনতেই যে কখন তার চোখ ভিজে যায়,সে টেরও পায় না।
.
.
.
.
নীলা,
কাঠগোলাপের ভালোবাসা নিবে।কতোকাল তোমায় দেখি না!সেই স্নিগ্ধ মুখটার কথা খুব মনে পড়ে।তুতুনের ঐ গোলগাল মায়াভরা মুখটার কথা ভীষণ মনে পড়ে।তাকে আদল দেওয়ার অভিপ্রায়ে ভেতর টা ছটফট করে।

সেদিন বিকেলে তুমি অভিমান নিয়ে চলে গেলে।আমি পুরো রাত অস্বস্তিতে ছটফট করে কাটিয়েছি।তুমি না নিজেকে বুদ্ধিমতি বলেছো?তাহলে এমন বোকার মতো কাজ কেন করতে চেয়েছিলে?

রাঙামাটির মতো জেলায় একটা মেয়ের একা একা থাকা কতোটা ভয়ংকর তুমি জানো?এই জনপদে মানুষ অনেক কম।কোনো একটা বিপদ হলে মানুষের কাছে ছুটে যেতে যেতেও তো অনেকটা সময় লেগে যাবে।রাঙামাটি কি ঢাকার মতো জনবহুল বলো?তুমি যে আর দু’টো দিন থাকতে চাইলে,সে ইচ্ছে আমি কিভাবে পূরণ করি বলো?

তুতুন কতো ছোট! এখানে তো প্রতিদিন শিশু অপহরণের খবর ছাপে।তুমিই বলো,এমন একটা জায়গায় তোমাদের ফেলে আমি ক্যাম্পে থাকতে পারতাম?আমি তো চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যেতাম।তাই দিনের আলো থাকতেই তোমাদের পাঠিয়ে দিলাম।

নীলা!
একটা কথা শোনো।কাছাকাছি থাকার চেয়েও নিরাপদে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তোমরা নিশ্চয়ই ঐ এলাকা সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানো না?

কিন্তু এসব বলে আর কি ই বা হবে?তুমি তো রাগ করে নিলে বাচ্চাদের মতো।আমি তোমার সেই অভিমানি চোখ দু’টোর কথা মনে করলেই আর ঘুমুতে পারি না।

আমি তোমায় পেয়ে অতি সুখে দিশেহারা হয়ে একটা জিনিস বেমালুম ভুলে গেছি।তোমার জন্য অনেক আগে একটা ব্রেসলেট কিনেছিলাম।কিন্তু সেটা তোমায় দিতে মনে নেই।ক্যাম্পে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করার সময় এটা দেখে আমার এতো মেজাজ খারাপ হলো! কতো সুন্দর লাগতো তোমায়! আফসোস! আমি দেখলাম না।

নীলা,
মন খারাপ করে থেকো না।তিনটা মাসই তো।দেখবে চোখের পলকেই কেটে গেছে।তোমাদের বাসটা যে সাঁই সাঁই করে চলে গেল আমায় ফেলে,সেই দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে।আমি তো বুঝতেই পারছি না,মানুষ এতো সুন্দর একটা পরিবার ফেলে ক্যাম্পে থাকে কেমন করে?

এই ঝিঁঝিঁ ডাকা নিস্তব্ধ রাতে,চারপাশের কৃষ্ণকালো অন্ধকার কে দূরে ঠেলে আমি মুস্তাফা তোমায় একটি কথা বলতে চাই।
তোমার মতো কেউ আর আমার জীবনে আসেনি।তুমি এক মুঠো কাঠগোলাপ হয়েই জীবনে এলে নীলা।বহুবার ভেবেছি,কি এমন আছে তোমার মাঝে?কোনো উত্তর পাই নি।তবে এইটুকু জানি,যা তোমার মাঝে ছিলো,তা এই পুরো জগতের কারো মাঝে ছিলো না।অথবা বলতে পারো,স্রষ্টা এমন করে আমার জীবনে তোমায় আনলেন,যে তুমি বাদে পৃথিবীর কিছুই আর আমার চোখে সুন্দর হয়ে ধরা দিলো না।

একটা কথা তোমায় বলা হয়নি।
তোমার একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি আমার কাছে আছে।আমি রোজ সেটা দেখি।তোমার চোখ,তোমার হাসি সবকিছু দেখি।তোমার মতো বিষন্ন সুন্দর মেয়ে এই ব্রহ্মান্ডে আর একটিও নেই।

নীলা,সব অভিমানের শেষে তুমি কি আমার ভালোবাসা নিবে?ভালোবাসা বাদে আমি আর কি ই বা দিতে পারি তোমায়?’

**

নিরুপমা চিঠি পড়া শেষেই চিঠির উপর ছোটো করে একটা চুমু খেল।এই চিঠিটা সে প্রায় রোজই পড়ে।চিঠিটা সে হাতে পেয়েছিল তিন মাস আগে,রাঙামাটি থেকে আসার পর।এহতেশাম লিখেছিল তাকে।কতো আদরভরা একটা চিঠি!নিরুপমা কি ঐ চিঠিখানা নিয়েই একটা জীবন পার করে দিতে পারে না?

এহতেশাম আজকাল তেমন ফোন দিতো পারে না।দিলেও কোনোরকমে দুই মিনিট কথা বলেই কেটে দিতে হয়।কখনো আবার লাইন পায় না ঠিকঠাক।নিরুপমা রোজ ফোন হাতে তার অপেক্ষা করে।কখনো ফোন আসে।কখনো আসে না।

আজ ফোন এলো মিতা আপার।সে ধরতেই অন্য পাশ থেকে সুচিস্মিতা বলল,’নিরু! তুতুনের প্রিয় রং কি বলো তো?’

‘তুতুনের?তার তো সব রং ই ভালো লাগে।লাল,নীল,হলুদ,সবুজ সব।কিন্তু কেন?’

‘আর বলো না।আমি আর জুহায়ের রিকশা দিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম।নিউ মার্কেট আসতেই একটা ভ্যানের দিকে চোখ গেল।বাচ্চাদের জুতার ভ্যান।কিসের রিকশা ভ্রমণ! কিসের কি! আমি লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে এলাম।জুতাগুলো এতো সুন্দর! আফসোস! আমার কোনো বাচ্চা নাই।’

নিরুপমা ফিক করে হেসে দিলো।
‘নাই তো কি হয়েছে?থাকতে কতোক্ষণ?’

‘উহু।ছাড়ো তো এসব।আমার তো এই ভ্যান থেকেই জুতো কিনতে হবে।কিন্তু সমস্যা হলো,চার জোড়া পছন্দ হয়ে গেছে।হাতে টাকা থাকলে চার জোড়াই নিতাম।কিন্তু অতো টাকা নেই।’

‘মিতা আপা!’

‘কি?’

‘একটাও নেওয়ার দরকার নেই।খামোখা টাকা নষ্ট।’

মিতা বিরক্ত হলো।
‘চুপ করো তো তুমি।
শোনো,তুতুন কে বলো সে কি স্পাইডার ম্যান পছন্দ করে?একটা স্পাইডার ম্যানের জুতাও ভালো লেগেছে।’

নিরুপমা মাথায় হাত চেপে ক্লান্ত হয়ে বলল,’মিতা আপা,তুতুন একদম ছোট বাচ্চা।এসবের কোনো দরকার নেই।তুমি তাড়াতাড়ি রিকশায় উঠো তো।’

‘ধ্যাত! তোমার সাথে কথা বলাই বৃথা।আমার অরু সোনাই সেরা।যা জানতে চাই,সব বলে দেয়।কোনো রাগ ঢাক নাই।তোমার যতো রাগ ঢাক।রাখো তো ফোন।আর বিরক্ত করো না আমাকে।’

মিতা মুখের উপর ফোন টা কেটে দিলো।নিরুপমা বোকা হয়ে কতোক্ষণ স্কিনের দিকে চেয়ে থাকলো।মিতা আপা এক অদ্ভুত প্রজাতির মানুষ।জুহায়েরের সাথে তার বিয়ে হয়েছে তিন মাস আগে।বিয়েতে নিরুপমা ছিলো না।সে তখন রাঙামাটির পথে।মিতা আপা খুব রাগ হলো সে এলো না বলে।নিরুপমা বান্ধবীর বিয়ের দোহাই দিয়ে কোনোরকমে তার মান ভাঙিয়েছে।

আপা মাঝে মাঝেই ফোন দেয়।তুতুনের জন্য এটা সেটা কিনে।নিরুর জন্যও কিনে।শুধু যে তাদের জন্য কিনে এমন না।সে অরু,জুহায়ের,ফারহানা,ফরিদা,জামশেদ,সায়মা সবার জন্যই কেনাকাটা করে।
আচ্ছা,মিতা আপা কি মানুষ হারাতে ভয় পায়?সেজন্য উপঢৌকন দিয়ে সে আশেপাশের মানুষদের প্রিয় হয়ে থাকতে চায়?একটু স্নেহ,একটু সঙ্গ,একটু ভালোবাসা কি কখনো এতো মূল্যবান হতে পারে?
.
.
.
.
তিন দিন পর অভি একটু হাঁটাচলা করতে পারল স্বাভাবিক হয়ে।অরুনিমা বলল,’তুমি কিছু খাবে?’

‘নাহ্।আমার খিদে নেই।’

‘কিন্তু তুমি তো কিছু খাও নি।’

অভি চোখ তুলে বলল,’তুমিও তো কিছু খাও নি।’

‘খেয়েছি।ভার্সিটি থেকে এসেই খেয়েছি।’

অভি তার ডান হাতের কবজি চেপে ধরে বলল,’অরুনিমা! একটু বসো তো আমার পাশে এসে।’

অরু পুতুলের মতো হেঁটে তার পাশে এসে বসলো।ঠোঁট গোল করে বলল,’কি?’

‘তোমার কি হয়েছে অরুনিমা?’

‘কি হবে আমার?আমার কি কখনো কিছু হতে পারে?’

শেষের কথাটা কি অরু ঠেস মেরে বলল?অভি একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,’কি হয়েছে অরুনিমা?আমায় বলো।’

‘আমার কিছু হয় নি।আমি ভালো বউ হতে চাইছি।’

‘সেটার কোনো প্রয়োজন নেই।তুমি যেমন আছো এমনই থাকো।’

‘না।এমন হলে তো জায়গায় জায়গায় আমার ধমক খেতে হবে।’

‘অরুনিমা! কি যা তা বলো তুমি।’

‘এই যে।এখনো ধমকাচ্ছো।’

বলতে বলতেই অরুনিমার কন্ঠ জড়িয়ে এলো।সে টেনে টেনে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।অভি সটান হয়ে বসে তার দিকে তাকাল।অরুনিমা কন্ঠ নামিয়ে বলল,’তুমি কোনোদিন আমার কষ্ট শুনতে চেয়েছো হামাদ?কোনোদিন আমার কষ্ট জানতে চেয়েছো?নাকি সারাদিন খিলখিল করি বলে ভেবেই নিয়েছো এই মেয়ের শরীরে কোনো রাগ,দুঃখ,কষ্ট,হতাশা কিচ্ছু নেই?যদি এমন ভেবে থাকো,তাহলে তুমি ভুল।আমাদেরও কষ্ট আছে হামাদ।আফসোস! তুমি কখনো শুনতে চাও নি।’

অভি ফ্যালফ্যাল চোখে তার দিকে তাকালো।বলল,’তুমি এতো কঠিন কঠিন কথা কেন বলছো অরুনিমা?’

‘কঠিন কথা না।এগুলো আমার জমানো কথা।তুমি শুনোনি,শুনতে চাও নি।’

অরুনিমা মুখের সামনে থেকে চুল সরালো।আরেকটু এগিয়ে এসে মলিন মুখে বলল,’তোমার জীবনের তো অনেক কষ্ট।অথচ আমাদের জীবনও যে কোনো ফুলের বাগান না,সেটা কোনোদিন তোমার মাথায়ই আসেনি।’

একটা কথা জানো হামাদ?আমাদের বাসাটা না খুব ছোট ছিলো।দেয়ালের রং খসে পড়তো,বর্ষার দিনে বৃষ্টির পানি পড়তো।এখন অবশ্য মেরামত হয়েছে।কিন্তু আগে এমনই হতো।সে বাসায় আমরা থাকতাম।মন খারাপ করার সময় কোথায়? নিজের প্রয়োজনটুকু মেটাতেই তো আমাদের জান যায় অবস্থা।আচ্চা হামাদ,তোমার কাছে সুপাত্রের সংজ্ঞা কি বলো তো?

আমাদের কাছে সুপাত্রের সংজ্ঞা হলো এমন একটা লোক,যে আমাদের তিন বেলা খাওয়াতে পারবে,আর বিনিময়ে কোনো যৌতুক নিবে না।ব্যাস।সেটাই আমাদের জন্য সুপাত্র।একবার ভাবতে পারো?মিতা আপার মতো মনের মানুষ বেছে নেওয়ার সুযোগ আমরা কখনোই পাই না।বিয়ের পরে স্বামীকেই মনের মানুষ বানানোর চেষ্টা করি।সেই চেষ্টায় কেউ সফল হই,কেউ ব্যর্থ।’

অরুনিমা চোখ মুছল।মাথা তুলে বলল,’আমার বিয়ের সময় কেউ আমার অনুমতি নেয় নি।পাত্র রাজি,এটাই বড়ো কথা।আমার মতামতের কোনো গুরুত্ব সমাজে নাই।যাক মেনে নিলাম সব।নিরু আপার মতো প্রাণপণ দিয়ে সংসার করতে চাইলাম।’

অরুনিমা দু’হাতে মুখ চেপে কান্না থামানোর চেষ্টা করে বলল,’নিরু আপার ঐ ঘটনার পর আমাদের জীবন কেমন হয়েছিল,তার খোঁজ তুমি নিয়েছিলে?আশেপাশের লোকজন আমার আপাকে নোংরা কীটের চোখে দেখতো।তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষের সাথে যদি এমন কিছু হতো,তবে তোমার কেমন লাগতো বলো?আমাকে যদি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালো কেউ বেসে থাকে,সেটা নিরু আপা।আপা না খেয়ে আমায় খাওয়াতো।ঐ ভালোবাসা তুমি বুঝবে না।কিন্তু আপার মতো হাসিখুশি মানুষটা হঠাৎই কেমন হয়ে গেল।তুমি কোনোদিন সেই কষ্ট বুঝবে?নাহ্।বুঝবে না।দুঃখের পৃষ্ঠা আমাদেরও কম না হামাদ।কিন্তু আমাদের কাছে এসে কেউ আমাদের দুঃখ জানতে চায় না।কেউ জানতে চায় না,কতোখানি কষ্টের পর মানুষ নতুন করে কষ্ট পেতেই ভুলে যায়।কেউ না।’

একটা ঢোক আনমনে অভির কন্ঠনালি বেয়ে নেমে এলো।অনুতাপে,অনুশোচনায় শরীর হিম হয়ে এলো বোধহয়।অরুনিমা ঝরঝর করে কেঁদে উঠে বলল,’তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম হামাদ।ভালোবেসে কতোবার তোমার কাছে এসেছি তার কোনো হিসেব আছে?তোমাকে কতোগুলো ফুল দিয়েছি,তুমি কোনোদিন গুনেছো?নাকি পাওয়ার পরেই জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছো?
তোমার একটু মন পাওয়ার জন্য আমি কি না করেছি হামাদ?
একদম পোষা প্রাণীর মতো তোমার পেছন পেছন ঘুরতাম।তুমি তো বেড়াল পালতে তাই না?বেড়ালের বাচ্চারা যেমন করে তার মুনিবের শরীরের সাথে মিশে থেকে আদর খুঁজতো,আমি এমন করেই তোমার কাছে আদর খুঁজেছি।তুমি বলতে পারবে যে কোনোদিন একটিবারের জন্য হলেও তুমি নিজ থেকে আমার কাছে এসেছো?বলতে পারবা না।কারণ তুমি আসো নি।

সেদিন রাতে আমি ঔষধের ঘোরে তোমার কাছে চাইলাম,তুমি আমার চাওয়া পূরণ করে দায়মুক্ত হয়ে গেলে।এরপর এমন করে সবটা এড়িয়ে গেলে,যেন আমি তোমার কতো অচেনা।আমার ভালোবাসা,অনুভূতি সব তুমি পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছো হামাদ।একেবারে পিঁষে দিয়েছো।কতো বড়ো দুর্ভাগা হলে বিয়ের এতো গুলো মাসেও স্মৃতি হিসেবে আমার কাছে ঐ এক জোড়া নূপুরই থাকে?আর কিচ্ছু না।আমার সংসার বন্দি হয়েছে ঐ এক জোড়া নূপুরে।ওহহ হ্যাঁ।সাথে তোমার ধমক পেয়েছি বিনামূল্যে।উঠতে ধমক,বসতে ধমক।সবেতে কেবল তোমার ধমক।’

অরুনিমা হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,’তুমি যদি আমায় বাড়িতে এই ঘরের মধ্যে দু’টো চড়ও মারতে,তবুও বোধহয় আমি সব মেনে নিতাম।কিন্তু তুমি মিতা আপার বিয়ের দিন সায়মার সামনে আমায় ধমক দিয়েছো।আমি জীবনেও সেটা ভুলবো না।সায়মা আমার দিকে দেখে মিট মিট করে হাসছিলো।আমি প্রচন্ড অপমানিত বোধ করেছি।’

অভি চোখ মুখ শক্ত করে বলল,’ঐ সায়মা একটা ফাজিল।ইচ্ছে করে এমন করে।’

‘চুপ করো তুমি।তোমার জন্য সব হয়েছে।আমি সায়মা কে মিথ্যে বলেছিলাম।বলেছিলাম আমার বর আমাকে খুব ভালোবাসে,আমার সব কথা মেনে চলে।তুমি এক ধমকে তাকে বুঝিয়ে দিলে আমি যে একটা মিথ্যুক।আমার কতো শখ ছিলো মিতা আপার বিয়ে নিয়ে।কিন্তু তোমার এক ধমকে আমার সব শখ মাটি হয়ে গেছে।

তুমি আসলে আমায় কোনোদিন ভালো ই বাসো নাই।ভালোবেসেছিল জগলু,মিতা আপাকে।দু’জন কি সুন্দর রিকশা করে ঘুরে।আপার অফিসের বাইরে কতোটা সময় অপেক্ষা করে! আর আমি তোমায় কতোবার বলেছি,আমার ভার্সিটির সামনে একবার আসতে।তুমি এলে না।কারণ তুমি আমায় ভালোই বাসো না।’

অরুনিমার কান্না তখন বাঁধনছাড়া,তবে শব্দ হচ্ছিল না তেমন।সে ফুঁপিয়ে উঠছিলো একটু পর পর।

‘আসলে তোমাকে ভালোবাসাই বোকামি হামাদ।ভালো তাকে বাসতে হয়,যে বিনিময়ে ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়।নিরু আপাকে ভালোবাসা যায়,মিতা আপাকে ভালোবাসা যায়।জগলু,ফারহানা আপা,হৃদি এমনকি সৃজনীকে পর্যন্ত ভালোবাসা যায়।তারা ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা দিতে জানে।কিন্তু তোমার মতো লোককে ভালোবাসা যায় না।
এক সৃজনী মরেছে তোমায় ভালোবেসে।আর তারপর আমি মরছি।তুমি কেন আমাদের জীবনে এলে?’

অরুনিমা কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছিল।অভি অনুভূতিশুন্য চোখে কাট কাট হয়ে তাকে দেখছিল।মাঝে একবার তাচ্ছিল্য করে হাসল।বলল,’এই কথাটা ঠিকই বললে।আমায় ভালোবাসা যায় না।’

অরুনিমা বালিশের সাথে শক্ত করে মুখটা চেপে ধরল।তার কান্না এক সময়ে গিয়ে গোঙানির মতো শোনালো।অনেকটা সময় পর শান্ত হয়ে অরুনিমা বলল,’এই তিন মাস অনেক ভেবেছি জানো? তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি,আমি খুব ভালো বউ হবো।তোমার মনের মতো বউ।তবে যদি একটু সম্মান পাই।ভালোবাসার আশা আমি এমনিতেও করি না।সেটা আমার জন্য স্বপ্ন।তুমি কি আমাকে সারাটা জীবন সহ্য করে নিবে হামাদ?
দয়া করে ছেঁড়ে যেও না।নিরু আপা যেই কষ্ট সহ্য করেছে,সেটা আমি সহ্য করতে পারবো না।আমি মরেই যাবো সত্যি সত্যি।তুমি কি চিরকাল আমাকে তোমার বউ করে রাখবে?দেখো আমি কতো ভালো হয়ে গেছি! আর তোমার কাছে আজেবাজে কিছু চাই না।তুমি আমায় ছেড়ে যেও না কেমন? আমি তোমার সব কথা শুনবো।
আরেকটা কথা বলি?
তুমি যে সে’বার আমায় বাড়ি রেখে এলে?আমি তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম।ভেবেছি তুমি আমায় ছেড়ে দিবে।সেই ভয়ে আমার হাড় কাঁপানো জ্বর এলো।এ কাজ করো না হামাদ।আমাকে ঐ ম র ণ যন্ত্রনা তুমি দিও না।আমি তোমায় আর জ্বালাবো না।আর কিছু চাইবো না তোমার কাছে।তুমি আমায় তাড়িয়ে দিও না।যা খুশি করো,শুধু মানুষের সামনে ধমক দিও না।তাহলেই হবে।’

অরুনিমা বালিশে মুখ চেপে আরো কিছুক্ষণ আর্তনাদের মতো শব্দ করল।সেই শব্দ হাতুড়ি পেটার মতো করে অভির ভেতরে দ্রিম দ্রিম আওয়াজ তুলে আবার শান্ত হয়ে এলো।অভি ঢোক গিলল।একবার অরুনিমার মাথায় হাত বুলাতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলো।কেমন একটা জড়তায় পড়ে নিজেকে সংকুচিত করে নিল।

অরু বোধহয় রাতের মাঝামাঝি সময়েই ঘুমিয়ে গেল।অথচ অভির চোখে কোনো তন্দ্রা নেই।সে চাদর ফেলে উঠে গেল।আলমারির একটা তাকে কাগজ আর কলম রাখা ছিল।সে সেটা হাতে নিয়ে পুনরায় খাটে গিয়ে বসলো।তারপর কোলের উপর সেটা রেখে পর পর কয়েকটা তপ্তশ্বাস ছাড়লো।সে এমন কাগজে লিখালিখির অভ্যাস ছেড়েছে আরো কয়েক বছর আগে।১৯৯৮ সাল অব্দি সে এমন করে নিজের দিনলিপি লিখতো,তারপর সেগুলো ছিঁড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিতো।আজ অনেক দিন পর সে কলম হাতে নিল।লিখতে গিয়ে তার কিছু ভাবতে হলো না।সে একনাগাড়ে লিখে গেল-

প্রিয়,
নাম লিখি নি।কারণ এ জগতে আমার ‘প্রিয়’ সম্বোধন পাওয়ার মতো একজন মানুষই আছে।সেটা তুমি।আমার অরুনিমা।আমি তোমায় অর্জন করেছি।করে আবার হারিয়েও ফেলেছি বোধহয়।তুমি এই লিখা কোনোদিন পাবে না অরুনিমা।আমি লিখা শেষেই এটা ছিঁড়ে ফেলবো।তবুও নিজেকে হালকা করার জন্য কলম চালাচ্ছি।

অরুনিমা,
আমার আঁধার রাতের ঝলমলে আলোক বাতি।তোমার এই আকাশ ছোঁয়া অভিমান আমি কেমন করে ভাঙাই বলো তো?তোমার ঐ স্নিগ্ধ সুন্দর হাসি আবার কেমন করে ফিরিয়ে আনবো বলো তো?কি চাই তোমার?নূপুর,চুরি,শাড়ি,গয়না,নাকি আস্ত আমি?
এই যে বোকা মেয়ে! শেষের টা চেয়ো না কিন্তু।শেষের টা তোমার কাছে এমনিতেই আছে।উল্টো করে বলতে গেলে,তুমি বাদে আর কারো কাছেই আমি নাই।এই ফুলের মতো স্নিগ্ধ মেয়েটির ভালোবাসা ব্যতীত হামাদ শিকদার তার জীবনে আর কিছুই অর্জন করে নি।

এক মুঠো শিউলির চেয়েও স্নিগ্ধ মেয়ে,
হ্যাঁ তোমাকেই বলছি।আমি যে একটা বাচ্চা,খরগোশের মতো এইটুকু মেয়ে কে বিয়ে করেছিলাম,সেটা আজকাল ভুলেই যাই।বাচ্চা অরুকে তো আমি একটুও ভয় পেতাম না।অথচ শাড়ি পরে গম্ভীর হয়ে থাকা সেই অরুনিমাকে আমি প্রচন্ড ভয় পাই।মনে হয়,হুট করেই যদি প্রেমে পড়ে যাই?তারপর?
আমি মানুষ হারাতে ভয় পাই অরু।মানুষ হারানোর ভয়ে আমি মানুষ অর্জন করতে ভয় পাই।ঘুরেফিরে ঐ এক ভয়।তুমি আমার এই জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়।তোমার অভিমান যে আমাকে এতো বেশি তড়পাবে,সেটা কে জানতো?আমার মিষ্টি ফুল অরুনিমা! অন্তর্মুখী হওয়ার যন্ত্রনা তুমি কোনোদিনও বুঝবে না।আজ বলছি,শাড়ি পরার পর যখন তুমি সামনে এসে দাঁড়াতে,তখন বুকের গহীনে কোথাও যেন সবকিছু এসে দলা পাকিয়ে যেত।তোমায় বলা হয়নি কখনো,আমি বিরক্তিতে চোখ সরাতাম না।আমি চোখ সরাতাম আবেগ লুকানোর অভিপ্রায়ে।আমাদের চোখ যে কতো বড়ো বেঈমান সেটা কি তুমি জানো না অরুনিমা?

প্রভাতের মিষ্টি আলো অরুনিমা,
আর কেমন করে তোমায় বোঝাই বলো তো?আর কতোখানি নিজেকে ব্যক্ত করার পর শিকদার বাড়ির এই ভবঘুরে ছেলেটা তোমায় বোঝাতে পারবে,তুমি তার জন্য ঠিক কি?আর কতোটা দীর্ঘশ্বাস তোমায় জানান দিবে,যে আমার একটা তুমি চাই।এবং সব শেষে আমার একটা তুমিই চাই।

এই যে আজ এমন কাঁপা হাতে কলম চালাচ্ছি।সেটা থেকে বাঁচার জন্যই তোমায় এড়িয়ে গেছি চিরকাল।তুমি বুঝলে না।আফসোস তুমি বুঝলে না।আজ সৃজুর মতোন গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে-

তোমরা যে বলো দিবস-রজনী
‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’—
সখী, ভালোবাসা কারে কয়!
সে কি কেবলই যাতনাময়?
সে কি কেবলই চোখের জল?
সে কি কেবলই দুখের শ্বাস ?
লোকে তবে করে কী সুখেরই
তরে এমন দুখের আশ!

তোমার ধারণা,আমি তোমার দেওয়া ফুলের যত্ন করি না।অথচ কোনোদিন আলমারির তৃতীয় তাকের পেছনে থাকা বক্সটা খুললে বুঝতে,তোমার দেওয়া কোনো ফুল আমি কখনো অবহেলা করে ফেলিনি।সবটাই যত্নে আছে।তুমি দেখোনি।

আমি প্রচন্ড অন্তর্মুখী।সেই সাথে ভীষণ অসামাজিক।মানুষের সাথে মিশতে পারি না আমি।আমার ভাই বোনদের সাথে আমি অনেক মেশার চেষ্টা করতাম।কিন্তু পারতাম না।তুমি একমাত্র মানুষ,যার সাথে আমি প্রাসঙ্গিক কথার বাইরেও অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেছি।তুমি কি আমার সেই ভালোবাসা বুঝোনি?

সব সময় কেন তিনটি শব্দ দিয়েই ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয় অরু?কখনো কি আচরণে বোঝানো যায় না যে তুমি আমার কতো বেশি প্রিয়?
তুমি কি কখনো বুঝোনি আমি তোমায় কতোটা চাইতাম?

অরুনিমা,
তুমি বাদে আমি কাউকে ভালোবাসি নি।হয়তো কোনোদিন বাসতে পারবো ও না।তুমি আমার ছেড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছো?অথচ আমি ভয় পাচ্ছি তোমার ছেড়ে যাওয়ার।তুমি আমায় ছেড়ে যেও না অরুনিমা।আমি অনেক ভয় পাই মানুষ অর্জন করতে।তুমি আমার আঁধারে ডুবে থাকা জীবনের জ্বল জ্বলে প্রদীপ।তুমি আমার অমানিশায় পথ দেখানো আলোকবর্তিকা।তুমি আমার অরুনিমা।তোমার সবটা আমার।তুমি আমার চাপা স্বভাবকে আমার নির্লিপ্ততা ভেবে ভুল করলে।আমি তোমায় কতোখানি চাই,সেটা তুমি কোনোদিনও বুঝবে না।কারণ আজ এতোকিছুর পরেও আমি কোনোদিন বলতে পারবো না যে আমি তোমায় ভালোবাসি।এটাই আমার ব্যর্থতা।আমি মানুষের সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি না।তবুও কি শেষটায় মোহাম্মদ রাফি আর আশা বোসলের মতোন সুর ধরে বলতে পারি না?

“আভি না যাও ছোড় কার।
ইয়ে দিল আভি ভারা নেহি।”

এখনই কেন ছেড়ে যাবে বলো?আমার হৃদয় তো এখনও তোমার সুবাসে পুরোপুরি সতেজ হয়নি।আরো কিছুটা সময় কি থেকে যাওয়া যায় না অরুনিমা?আমার জন্য,তোমার জন্য।আমাদের জন্য?

****সমাপ্ত*****[প্রথম পরিচ্ছেদ]