#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৪.
সময় তখন সকাল দশটা একচল্লিশ।শিকদারের বাড়িতে তখন কোলাহল পূর্ণ অবস্থা।আজ বাড়ির বড়ো ছেলে হামাদের বিয়ে।যদিও তেমন আড়ম্বরের সাথে বিয়ের অনুষ্ঠান করা হচ্ছে না।তবুও এ নিয়ে হুসেইন শিকদার আর তার স্ত্রী ভীষণ উৎসাহিত।হামাদ অবশেষে বিয়ে করছে।এটা অবশ্যই আনন্দ করার মতোই বিষয়।রিজোয়ানার ধারণা বিয়ের পর হামাদের বাউন্ডুলে স্বভাবে পরিবর্তন আসবে।সব ছেলেরই পরিবর্তন হয়।হামাদের বেলায় নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম হবে না।
তিনি সকাল থেকেই পরিচারিকাদের এটা সেটা আদেশ করছিলেন।হামাদের ঘরটা সুন্দর করে গোছাতে হবে।সে ঘরের যা অবস্থা করে রেখেছে! মেয়েটা যে একটু বসবে সেই অবস্থাও তো নেই।
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনি শোয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে যান।বাড়ির বড়ো বড়ো দু’টো গাড়ি সকাল থেকেই মূল দরজার সামনে দাঁড় করানো।তারা সবাই ঘন্টা খানেকের ভেতরই বেরিয়ে যাবেন।
বাড়ির পরিধির তুলনায় বাড়ির মানুষ সংখ্যা খুবই কম।হুসেইন সাহেব,তার স্ত্রী রিজোয়ানা,তাদের ছেলে হাশিম,আর তাদের মেয়ে হৃদিতা।এর বাইরে হামাদ,হুসেইন সাহেবের মা আর বাড়ির অন্যান্য পরিচারিকা।এতো বড়ো বাড়িতে মোট মিলিয়ে এই ক’জন মানুষই থাকে।
হামাদের বিয়ের পর আরো একজন এসে যোগ দিবে তাদের সাথে।রিজোয়ানা শুনেছিলেন মেয়ের নাম অরুনিমা।নাম শুনেই তিনি অনুমান করেছেন মেয়েটা দেখতে চমৎকারই হবে।অরুনিমা নামের ভেতরই কেমন আলো আলো ভাব আছে একটা।
হৃদিতা উদাস মুখে মায়ের ঘরে এলো।ধপ করে পালঙ্কে বসে বলল,’মা! ফুফুমণি কি আজকেও আসবে না?’
রিজোয়ানা সবে গোসল সেরেছেন।তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে মেয়ের দিকে ফিরে বললেন,’আসবে তো।সৃজনী একটু আগে ফোন দিলো।বললো আধঘন্টা আগেই নাকি বেরিয়েছে।’
হৃদিতা মুখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল,’ছোট ফুফু না,বড়ো ফুফুর কথা বলছিলাম।’
রিজোয়ানা ঘাড় ঘুরিয়ে একেবারে শান্ত চোখে হৃদিতার মুখখানা পরোখ করলেন।পরক্ষণেই আবার চুলের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে দৃঢ় স্বরে বললেন,’আশা না রাখাই ভালো।হাবিবা আপা ইদানিং আর ফোনও দেয় না।’
হৃদিতা চট করে মুখ তুলে বলল,’আর এহতেশাম ভাইজান?ভাইজান কি আর কখনোই এই বাড়িতে আসবেন না?’
রিজোয়ানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছোট করে জবাব দিলেন,’জানি না মা।কিছুই জানি না।’
হৃদির মন খারাপ হয়।বাড়িটা কেমন খালি খালি হয়ে গেছে হুট করে।আগে ডিসেম্বর মাসে সবার পরীক্ষা শেষ হলে সবাই বাড়িতে আসতো।এখন আর দুই বছর যাবত কেউ আসে না।এহতেশাম ভাই তো ছুটি পেতেন হাতে গোনা কয়দিন।এর মাঝে বন্ধ পড়লেই এক দুইদিন এখানে এসে থেকে যেতেন।অথচ এখন বছর গড়ালেও এহতেশাম ভাই আর ফোন দেয় না।জীবনটা আচমকাই কেমন যেন হয়ে গেছে।হৃদির ভালো লাগে না এই জীবন।অভি ভাইকে দেখলেই ভয়ে তার হাত পা জমে যায়।অথচ একজন আছে যে কি না অভি ভাইয়ের নাম শুনলেই আহ্লাদে গদো গদো হয়।একমাত্র সে ই আছে,যার হামাদের জন্য মায়া হয়।নয়তো এমন গুন্ডা মাস্তানের জন্য মানুষের মনে কেমন করে মায়া আসে হৃদির জানা নেই।
টয়োটার হালকা হলুদ রঙের গাড়িতে চড়ে সৃজনীরা নানুবাড়ি পৌঁছুলো বারোটা চল্লিশের দিকে।হামাদ তখন হুন্ডার চাবি একহাতে ঘোরাতে ঘোরাতে বসার ঘরে হাঁটাহাঁটি করছিলো।হাফসা বাড়িতে পা রেখেই তার উষ্কখুষ্ক মুখ দেখে বললেন,’সেকি অভি! তোর না আজ বিয়ে?’
অভি মাথা তুলে একনজর তাকে দেখে।তারপর আবার চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।হাফসা বড় বড় পা ফেলে তার সামনে দাঁড়ালেন।চোখ পাকিয়ে বললেন,’সমস্যা কি তোর?বিয়ের দিন কেউ এমন চেহারায় থাকে?’
অভি গম্ভীর হয়ে বলল,’কেমন চেহারা করেছি আমি?’
‘এই যে চুল দাড়ির কি বিচ্ছিরি অবস্থা! একটু ছেটে আসলেও তো পারিস।’
অভি কোনো জবাব না দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনে হেঁটে গেল।এদের ঘ্যান ঘ্যান শুনতে আগ্রহী না।হাফসা কোমরে হাত রেখে কড়া গলায় বললেন,’যা অভি।এখনই গিয়ে চুল দাড়ি সব ছেটে আয়।’
অভি পিছু না ফিরেই গমগমে স্বরে উত্তর দিলো,’পারবো না।অতো সময় নেই আমার।’
সৃজনী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল।এখানে আসার পর সে আড়চোখে দুইবার বড়ো ভাইজানকে দেখেছে।এরপর আর চোখ তুলেনি।ভাইজান এই দুই বছরে আরো বেশি কর্কশ আর কাঠখোট্টা স্বভাবের হয়েছে।সৃজনীর কেন যেন তার উপর মায়া হয়।
সে গুটি গুটি পায়ে তার ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।হামাদ তখন তার ঘরে উপুড় হয়ে শুয়েছিল।সৃজনী ঘরের দরজায় গিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়।পুরো ঘর সে পর্দা টেনে আবছা করে রেখেছে।এটা তার পুরোনো স্বভাব।সে আলো পছন্দ করে না।না নিজের ঘরে,না নিজের জীবনে।সে মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখে।তারপরই নিঃশব্দে অন্য দিকে পা বাড়ায়।
‘সৃজনী!’
কদম থমকায় তরুণীর।কেমন আঁতকে উঠে সামনে তাকায় সে।দেখে নিলো নাকি?
হামাদ শোয়া থেকে উঠল না।উল্টো আগের মতো শুয়ে থেকেই বলল,’কিছু লাগবে তোর?এখানে কি?’
সৃজনী দুই দিকে মাথা নাড়লো।ছোট ছোট পায়ে পুনরায় দরজার সামনে এসে বলল,’না।আমার কিছু লাগবে না।’
হামাদ আর জবাব দেয় না।মাথা নামিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে।সৃজনী কিছুটা ইতস্তত করে বলল,’সবাই তো নিচে।একটু পরেই গাড়িতে উঠবে।তুমি যাবে না সবার সাথে?নাকি অন্য গাড়িতে যাবে?’
হামাদ ভারি গলায় বলল,’সবাই আগে গিয়ে বসুক।তারপর আমি বসবো।তুই যা।গিয়ে গাড়িতে বোস।’
‘তুমি এই জামা পরেই বিয়ে করবে?’ সৃজনী অবাক হয়ে জানতে চাইলো।
হামাদ সোজাসাপটা উত্তর দেয়,’হুম।’
সৃজনী আর কথা বাড়ায় না।যেতে যেতে একবার হামাদের পুরো ঘর এক নজর চোখ বুলিয়ে যায়।মামানি নিশ্চয়ই সুন্দর করে পুরো ঘর গুছিয়েছে।আজ অভি ভাইজানের বিয়ে।সে শুনেছে পাত্রী নাকি খুব মিষ্টি।
সৃজনী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।যাক,পাত্রী ভালো হলেই হলো।অভি ভাইজান ভালো থাকুক।তার তো এর বেশি কিছু চাই না।সে চায় অভি ভালো থাকুক।অথচ অভির বিয়ের খবর কানে যাওয়ার পর থেকে সে ভালো নেই।সৃজনী টের পায়,একটা ভয়াবহ রোগ তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গ্রাস করছে।একটা অসম্ভবের নেশায় জড়িয়ে সৃজনী রোজ রোজ অদৃশ্য অনলে জ্বলছে।তার যন্ত্রণা হয় ভীষণ,বুক ফেটে কান্না আসে।অথচ সবকিছুর আড়ালে তার নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে হচ্ছে।
সে চুপচাপ তাদের গাড়িতে উঠে বসলো।হৃদিতা বসলো তার পাশে।পরনের ওড়না ঠিক করতে করতে বলল,’কিরে?কথা হয়েছে ভাইজানের সাথে?’
সৃজনী সংক্ষেপে জবাব দেয়,’হুম।’
শিকদার বাড়ি থেকে অভিদের দু’টো গাড়ি সহ সৃজনীদের গাড়ি মিলে মোট তিনটে গাড়ি বেলা দেড়টা নাগাদ সাঁই সাঁই করে রওয়ানা দেয় সমতট লেনের দিকে।আজ তাদের বাড়ির বড় ছেলে হামাদ শিকদারের বিয়ে।
***
অরু দুই চোখ রসগোল্লার মতো করে বলল,’এতো সুন্দর সুন্দর কাপড় তারা আমার জন্য পাঠিয়েছে?’
নিরুপমা দুই চোখ সরু করে বলল,’হুম।তোর জন্যই সব পাঠিয়েছে।’
অরু ব্যথিত চোখে কাপড় গুলোতে হাত বুলায়।কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,’পাত্রটা একটু জাতের হলে আমি নাচতে নাচতে এই বিয়েটা করে নিতাম।এতো দামি জামা তো জীবনে চোখেও দেখিনি আপা।’
সে পুরো খাটে কাপড় ছড়িয়ে তার উপর শুয়ে পড়ল।শাড়ির আঁচল টা বুকের উপর ফেলে উৎফুল্ল সুরে বলল,’কি মজাটাই না হতো আপা,যদি ঐ হামাদের বাচ্চাটা বিয়ের দিন রাতেই ম’রে যেত।আমি দোয়া করি ঐ জন্তুটা যেন কবুল বলার পরেই অক্কা পায়।শালা একটা খু’নী।চোর বাটপার হলেও তো একটা কথা ছিলো।তাই না আপা?’
নিরুপমা দুই হাত ভাঁজ করে তার কথা শুনে।সে থামতেই হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলে,’তুই কি সত্যিই সংসার করতে পারবি অরু?আমার তো মনে হচ্ছে না।’
অরুনিমা ভাঙা গলায় বলল,’আমি তো চাই না সংসার করতে আপা।কিন্তু আর তো কোনো উপায় নেই হাতে।কি করবো বলো?’
নিরুপমা চিন্তিত ভঙ্গিতে খাটের এক মাথায় গিয়ে বসলো।অরুর বয়স অল্প।সে বিয়ে,সংসার এসবের জটিলতা এখনো আঁচ করতে পারছে না।তার কাছে এখনো বিয়ে শব্দের তাৎপর্য পরিষ্কার না।তাই সে এতো বেশি নির্বিকার।অথচ নিরু জানে,বিয়ে শব্দটা কতো ভারি।সে জানে এর ওজন কতো বেশি।অরু বিয়ের পর কিভাবে সব সামলাবে এটা ভাবলেই তার হাত পা জমে আসে।সে অনেক চেষ্টা করেছে বিয়ে টা ভাঙার।কিন্তু মায়ের কারণে সে আর বেশি কিছু করতে পারেনি।মা এসব খুব ভয় পায়।তার একটাই ভয়-যদি তারা কিছু করে বসে?
এই ভয়ে তিনি সর্বদা তটস্থ।অথচ নিরুর ভয় অন্য জায়গায়।অরু তার বড়ো আদরের।অরুর বয়স খুব একটা কম না।বিশ।সে প্রাপ্তবয়স্ক।অথচ নিরু জানে,আচরণের দিক থেকে অরু এখনো বাচ্চা।সে এখনো সংসারের জটিলতা বুঝে না।নিরুপমা সংসার করেছে।তার মতো বুঝজ্ঞান থাকা স্বত্বেও সে তার সংসার টিকাতে পারে নি।অরুর মতো বাচ্চা মেয়ে কি পারবে সবকিছু গুছিয়ে নিতে?
নিরুপমার সময় কাটে উৎকন্ঠায়।অরু যখন গাঢ় লাল শাড়িটা গায়ে জড়ালো,তখন নিরু উঠোনে গিয়ে কতোক্ষণ মুখ চেপে কাঁদলো।মা খুব শান্ত।অথচ নিরুর কান্না সব গলা পর্যন্ত উঠে আছে।অরু আর নিহাদকে একসাথে নিয়ে সে ঘুমুতো।মেয়েটা যদি আজ চলে যায়,তবে নিরু ঘুমাবে কাকে নিয়ে?
অরুনিমা আয়নায় নিজেকে দেখেই উৎফুল্ল হয়ে বলল,’কি সুন্দর এই শাড়িটা!’
মনোয়ারা তখন তার ঘরেই।অরুর জন্য ঐ বাড়ি থেকে কাপড় চোপড় সহ একটা বড়ো লাগেজও পাঠিয়েছে।তিনি ব্যস্ত হাতে লাগেজে তার কাপড় গুলো ভাঁজ করে করে রাখছিলেন।এক ফাঁকে অবশ্য আর্দ্র চোখে অরুর মায়াভরা মুখটা দেখলেন।এলাকার মুরুব্বিরা বললো শিকদারদের সাথে কোনোরকম ঝামেলায় না যেতে।তারা বড়ো বাড়ির লোক।অর্থ বিত্ত,নাক ডাক,বংশমর্যাদায় তাদের চেয়ে অনেক উপরে।তাদের বাড়ি থেকে আসা প্রস্তাব যদি মনোয়ারা ফিরিয়ে দেন,তবে ব্যাপারটা বেশ দৃষ্টিকটু দেখাবে।মনোয়ারা সেই প্রস্তাব ফেরালেন না।কিন্তু ভেতরে ভেতরে মেয়ের চিন্তায় অস্থির হলেন ঠিকই।ঐটুকু বাচ্চা মেয়ে।সবাইকে ফেলে একা একা থাকবে কেমন করে?
বর পক্ষের তিনটে গাড়ি সমতট লেনের সরু গলি দিয়ে প্রবেশ করার সময় মহল্লার লোকেরা সব জানালা দিয়ে মাথা বের করে উৎসুক চোখে সবটা দেখল।সিদ্দিক রহমানের বাড়িতে আজ বেশ তোড়জোড় করে রান্নার আয়োজন চলছে।আজ তাদের ছোট মেয়ে অরুর সাথে শিকদারদের বড়ো ছেলে হামাদের বিয়ে।পাড়া প্রতিবেশীরা কানাঘুষা করলো,’মনোয়ারার ছোট মেয়ের কি রাজকপাল! নয়তো এমন ভাঙা বাড়িতে থেকে অমন পাত্র ক’জন পায়?’
অরুনিমা যদিও বা শুরুতে একদমই স্বাভাবিক ছিলো,কিন্তু ঐ বাড়ি থেকে তিন তিনটে গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামতেই সে নড়েচড়ে বসলো।ভয়াতুর চোখে চারপাশ দেখে নিরুর একটা হাত খাঁমচে ধরে বলল,’আপা।আমার অনেক ভয় করছে।’
নিরুপমা তার মাথায় হাত বুলায়।তাকে আশ্বস্ত করে,’কোনো ভয় নেই অরু।আপার দোয়া সবসময় তোর সাথে আছে।তোর কিচ্ছু হবে না।আপা আছি তো।কিসের এতো ভয়?’
সৃজনী আর হৃদিতা গুটি গুটি পায়ে তাদের ঘরের সামনে এলো।নিরুপমা তাদের দেখতেই হাত বাড়িয়ে ডাকলো।বলল,’আরে তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন?এসো বসবে।’
হৃদিতা সবার আগে এসে খাটের এক কোণায় বসলো।অরুনিমা তখন আয়নার সামনে,ঘুরেফিরে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিলো।সৃজনী আগাগোড়া লাল শাড়ি পরিহিতা মেয়েটিকে দেখে।মেয়েটা স্নিগ্ধ।বয়স যে অতি অল্প সেটা প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়।সে এগিয়ে যায় তার কাছে।নিচু স্বরে জানতে চায়,’তোমার নাম যেন কি?’
অরুনিমা তার দিকে ফিরে ফ্যাকাশে মুখে জবাব দেয়,’অরুনিমা।’
সৃজনী ম্লান হাসলো।হেঁটে গিয়ে হৃদির পাশাপাশি বসলো।জানালার একটা শিকে দু’টো চড়ুই পাখি বসে কিচিরমিচির করছিলো।সৃজনী সেদিকে দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত চোখ মুছে।ভেতরটা কেমন খাঁ খাঁ করছে।সে সিদ্ধান্ত নিলো বিয়ে পড়ানোর সময় সে বসার ঘরে যাবে না।পৃথিবীতে সব দৃশ্য দেখতে নেই।কিছু দৃশ্য বাদ গেলেও আহামরি কোনো সমস্যা হয় না।
অরুনিমা কে বসার ঘরে ডাকা হলো আরো ঘন্টা খানেক পরে।যখন সে টের পেল,যে বিয়ের পর তাকে আটঘাট বেঁধে অন্য বাড়িতে পাড়ি জমাতে হবে,তখনই সে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলো।নিরুপমা তার লাল হয়ে উঠা মুখটা দেখেই উৎকন্ঠিত হয়ে বলল,’কি হয়েছে অরু?বল না আপাকে?কষ্ট হচ্ছে?’
অরুনিমা তাকে কিছু বলল না।দৌড়ে গিয়ে মনোয়ারার হাত ধরে বলল,’মা।তুমি এই বিয়েটা ভেঙে দাও মা।আমি পারবো না এই বিয়ে করতে।’
মনোয়ারার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।তিনি চমকে উঠে বললেন,’এটা কেমন কথা?বরযাত্রী চলে এসেছে।আর তুমি বলছো বিয়ে করবে না?’
অরুর তখন দুই চোখ পানিতে টইটম্বুর।দুই দিন ধরে সে স্বাভাবিক ছিলো।কিন্তু এখন তার সবকিছু অস্বাভাবিক লাগছে।পাগল পাগল লাগছে সবটা।মা আর আপাকে ছাড়া তার থাকার অভ্যাস নেই।হামাদকে সে সাংঘাতিক ভয় পায়।ঐ বাড়ির কাউকে সে চেনে না।সবগুলো বিষয় একসাথে চিন্তা করলেই তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠে।
অরুনিমা নামের মেয়েটি অজানা আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে বিয়ের আসরে বসল।তার হৃদস্পন্দন অত্যাধিক মাত্রায় বেড়ে উঠেছে সময়ের সাথে।সে একহাতে বোনের রুগ্ন হাতটা জাপ্টে ধরল।নিরুপমা তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলল,’ভয় নেই সোনা।আপা আছি।সবাই তোর সাথেই আছে।’
সেই বছর অগ্রহায়ণ মাসের কোনো এক বিকেলে অরুনিমা রহমানের সাথে শিকদার বাড়ির বড় ছেলে হামাদ শিকদারের বেশ সাদামাটা ভাবে বিয়ে হয়ে গেল।অরু কবুল বলার সময়ও জানলো না বিয়ে শব্দের তাৎপর্য কি।জানার আগেই সে হামাদের সাথে বিবাহবন্ধনে বাঁধা পড়লো।আপার হাতটা আঁকড়ে ধরে সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,’কবুল।’
ব্যাস,তারপরই অরুর জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু।খাওয়া দাওয়ার পর অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলো,তখন অরু ছোট বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।মনোয়ারার তখন বুক ধড়ফড় অবস্থা।কোনোরকমে মাথায় হাত ছুঁয়িয়ে বললেন,’কাঁদে না অরু।সব মেয়ের জীবনেই এমনটা হয়।’
নিরুপমা তার কপালে পর পর কয়েকটা চুমু খায়।আদর দিয়ে বলে,’কাঁদে না সোনা।আপা আছি তো।কোনো সমস্যা হলেই আপাকে বলবি।’
হামাদ এই পারিবারিক কেচ্ছায় বেশিক্ষণ ছিলো না।বিয়ের পরই সে ধুপ ধাপ পায়ে গাড়িতে উঠে বসলো।তার মাথা ঝিমঝিম করছে।কথা ছিলো বিকেলের মধ্যে তারা বাড়ি ফিরবে।কিন্তু এখন সন্ধ্যা ঘনালেও কারো বাড়ি ফেরার নাম নেই।
অরুনিমার বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভাটা পড়লো,যখন রিজোয়ানা এসে তার দুই বাহু চেপে ধরলেন।অরু কেবল ফ্যালফ্যাল চোখে তাকে দেখল।বুঝতে পারল,মা আর আপা বাদেও তার জীবনে এখন নতুন মানুষদের আগমন হয়েছে।যাদের ক্ষমতা আছে অরুকে তার মা-বোন থেকে আলাদা করার।
মুহূর্তেই অরুর কি হয়ে গেল কে জানে,সে ধীর পায়ে হেঁটে গাড়িতে গিয়ে বসলো।নিরুপমা সদর দুয়ারের দিকে ছুটে যায়।ঘরের চৌকাঠে হাত রেখে ভেজা চোখে হামাদের বাড়ির গাড়িগুলো দেখে।মনোয়ারা আর সেখানে গেলেন না।তুতুনের বোধহয় ঘুম ভেঙে গেছে।তার কাছে এখন না গেলে সে কেঁদে কেঁদে ঘর ভাসাবে।
কালো রঙের গাড়িটা সবার প্রথমে চলতে শুরু করলো।এর পেছনে একটা সাদা গাড়ি,আর তারপর সৃজনীদের গাড়ি।নিরুপমা নিশ্বাস বন্ধ করে গাড়ি গুলোর প্রস্থান দেখে।তারপরই ধপ করে চৌকাঠের উপর বসে পড়ে।সে কি আরো একটু চেষ্টা করতে পারতো না অরুর বিয়ে থামানোর?অরু কি আদৌ মানসিকভাবে সবকিছুর জন্য প্রস্তুত?
বেলা গড়ায়।অথচ নিরুপমা ঘন্টার পর ঘন্টা সেখানেই বসে থাকে।তার ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না।ঘরে গিয়ে সে কি করবে?যেই চঞ্চল মেয়েটি পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতো,সে নিজেই তো বাড়িটাকে আঁধার করে চলে গেল।নিরুপমা এখন কার বাচ্চামো দেখে হাসবে?
কালো গাড়িটা ঘন্টা দেড়েক সময় নিয়ে শিকদার বাড়িতে পৌছায়।অরুনিমা পুরোটা সময় মূর্তির মতো বসে থাকে।তার পাশেই হামাদ বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো।অরুর দিকে তার কোনো মনোযোগ নেই।তার পাশে কে বসেছে,সেটা সে একবার চোখ তুলে দেখে পর্যন্ত নাই।দেখার কি আছে?এতো আহ্লাদ হামাদ করতে জানে না।
বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে উঠোনের একটু সামনে গাড়িটা থামতেই হামাদ এক লাফে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো।তারপর বড় বড় পা ফেলে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।রিজোয়ানা তব্দা খেয়ে বললেন,’এটা কেমন আচরণ?বউ নিয়ে এসে সে এমন হনহন করে একা একা চলে গেল কেন?’
সৃজনী সামান্য ঝুকে গাড়ির ভেতর হাত বাড়িয়ে বলল,’এসো অরুনিমা! জলদি নেমে এসো।’
অরু উদ্ভ্রান্তের ন্যায় তার দিকে তাকায়।যন্ত্রের মতো একহাত বাড়িয়ে সৃজনী কে ধরে গাড়ি থেকে নেমে আসে।তার এলোমেলো উদাসীন দৃষ্টি ছুটে যায় এই মাথা থেকে ঐ মাথা।সেই দৃষ্টিতে সে আবিষ্কার করে,শিকদারদের বাড়িটা বেশ পুরোনো।শেওলা ধরা দেয়ালগুলো দেখলেই কেমন গা ছমছম করে।বাড়ির পাশেই একটা বড়ো অশ্বত্থ গাছ।ডাল পালা ঝুলে আরো ভয়ংকর দেখাচ্ছে।শিকদার বাড়ির বাহ্যিক রূপ অরুনিমা রহমানের পছন্দ হলো না।ভুতুরে গোছের প্রকান্ড বাড়িতে অরুনিমা প্রবেশ করলো এক রাশ আতঙ্ক নিয়ে।
চলবে-