#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৫.
দক্ষিনের বড়ো ঘরটা হামাদ শিকদারের।আজ থেকে সেই ঘরে আরো একটা মেয়ে থাকবে।তার নাম অরুনিমা।সাজানো গোছানো ঘরটাতে যখন তাকে বসানো হলো,তখন সে ক্লান্ত চোখে একবার পুরো ঘরটা দেখে নিলো।ঘরটা গোছানো হলেও কেমন আবছা।খুবই লো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে।
হামাদ বেরিয়ে গেছে আরো অনেক আগে।আসার পর হাত মুখ ধুয়েই সে লাপাত্তা। তার আর কোনো হদিস নেই।রিজোয়ানা তার এহেন কান্ডে বেশ হতাশ।বিয়ের দিন তো অন্তত তার বাড়ি থাকা উচিত।হুসেইন সাহেব অতোটাও বিচলিত না।ভাস্তের এতোদিনের স্বভাব।এক বিয়েতেই পাল্টে যাবে বলে মনে হয় না।তিনি অল্প হেসে বললেন,’আরো ক’টা দিন যাক না।তারপর দেখবে পরিবর্তন হয় নাকি।’
রিজোয়ানা আশাহত হয়ে বললেন,’যে লোক বিয়ের দিনই বউ ফেলে চলে যায়,তার আর কি পরিবর্তন হবে?’
তিনি শাড়ির কুচি সামলে রসাইঘরে চলে গেলেন।আজ রাতে বাড়িতে মজুমদার বাড়ির মেহমানরা আসবে।তাদের জন্য এখনো তেমন কিছু রান্না করা হয়নি।মুঠোফোনে রিজোয়ানা খবর পেয়েছে,তারা গাড়িতে উঠেছে।তিনি ব্যস্ত গিন্নিদের মতো আপ্যায়নের আয়োজনে লেগে পড়লেন।মাঝটায় একবার হৃদিতা আর সৃজনীকে ডেকে বললেন,’যা তো হৃদি।একবার তোর ভাবির ঘর হয়ে আয়।মেয়েটা একা একা ভয় পাচ্ছে নাকি কে জানে।’
হৃদিতা আর সৃজনী ঐ ঘরে গেল আরো দশ মিনিট পর।অরুনিমা তখন খাটের এক কোণায় মাথা নামিয়ে বসেছিল।তার কিছুই ভালো লাগছে না।তুতুনের মুখটা বার বার মনে পড়ছে।অরুর ধারণা ছিলো,এতো বড়ো বাড়ির বউ হওয়ার পর খুশিতে সে সারাক্ষণ খিলখিল করে হাসবে।অথচ কবুল বলার পর সে কেমন পাথর হয়ে গেল।তার মনে হলো,তার সাজানো গোছানো জীবনটা কোনো সর্বনাশা কালবৈশাখীর দাপটে একেবারে তছনছ হয়ে গেল।এই বাড়িটা সুন্দর।কিন্তু বাড়ির মানুষ গুলো তার অচেনা।এই বাড়িটা তার কেমন ভয় ভয় লাগে।
হৃদি গালের নিচে হাত রেখে বলল,’তুমি ভয় পাচ্ছো?’
অরুনিমা জবাব দেয় না।জবাব দেওয়ার চেয়ে নিরুত্তর থাকাই তার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে।হৃদি নিজ থেকেই বলল,’তুমি কিসে পড়ো অরুনিমা?’
‘অনার্স প্রথম বর্ষ।’ অরু উত্তর দিলো একেবারে নিরাসক্ত কন্ঠে।
সৃজনী খাটের সাথে হেলান দিয়ে তাকে দেখে।তার মুখজুড়ে ক্লান্তিভাব বিরাজ করছে।সে বলল,’তুমি কি হাত মুখ ধুবে অরুনিমা?’
অরুনিমা মাথা নেড়ে উত্তর দিলো,’না।সমস্যা নেই।পরে ধুয়ে নিবো।’
হৃদিতা পা দোলাতে দোলাতে জানতে চায়,’মা তোমায় এভাবে বসে থাকতে বলেছে?’
‘হ্যাঁ।বলেছে হামাদ আসা পর্যন্ত এভাবেই বসে থাকতে।’
বলতে বলতে সে হাই তুলে।তার প্রচন্ড ঘুম ধরছে।দুই চোখ সে একটু পর পর টেনে ধরে খোলা রেখেছে।তার মন চাইছে এখনই ঘুমিয়ে যেতে।হৃদিতা অবাক হয়ে বলল,’তুমি ভাইজানকে নাম ধরে ডাকছো?’
অরুনিমা তার চেয়েও বেশি অবাক হলো।
‘তবে কিভাবে ডাকবো?’
‘উনি বলে ডাকবে।’
অরু খানিকটা বিরক্ত হয়।কপাল কুঁচকে বলে,’উনার একটা নাম আছে।তবুও কেন উনি উনি করবো?’
সে কুঁচকানো মুখেই মাথা নামিয়ে নিল।সৃজনী তখনও মুখ খুলেনি।সে মাথা নামাতেই আনত স্বরে বলল,’অভি ভাইজান আজ আর আসবেন না।তুমি হাত মুখ ধুয়ে নিতে পারো।’
অরুনিমা অবাক হয়।জানতে চায়,’এই অভি টা আবার কে?’
তার বচনভঙ্গিতেই হৃদিতা ফিক করে হেসে দিলো।পুনরায় পা দোলাতে দোলাতে বলল,’অভি ভাইজানই হামাদ।বাইরে সবাই তাকে হামাদ বলেই চিনে।আমরা বাড়ির মানুষ আর পাড়া প্রতিবেশী সবাই তাকে অভি বলে ডাকি।’
অরু সংক্ষেপে বলল,’ওহহ।’
সৃজনী পুনরায় বলল,’তুমি কাপড় পাল্টে নাও অরুনিমা।অভি ভাইজানের জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই।’
অরু মাথা তুলে না।কেবল মিলিয়ে যাওয়া কন্ঠে জানতে চায়,’উনি কি রাতভর বাইরেই থাকবে?’
‘এমনই তো করে।ধীরে ধীরে দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে যাবে।’
অরু আগের মতো করেই বলল,’ওহহ।’
সৃজনী আর হৃদিতা আরো আধঘন্টার মতো তার সাথে কথা বলল।তাদের সাথে কথা বলতে গিয়েই অরু টের পেল,সে একটা নতুন মানুষ।নিরু আপা আর মা এই অরুকে চেনে না।অরু নিজেও নিজের এই স্বরূপ চেনে না।সবকিছুই তার আবছা আবছা লাগে।মনে হয় জগতের কোনো কিছুতেই আর তার জন্য আনন্দ অবশিষ্ট নেই।
হৃদিতা আর সৃজনী চলে গেল আধঘন্টা পর।অরুনিমা জড় পদার্থের মতো খাটের এক কোণে বসে থাকল ঘন্টার পর ঘন্টা।তার হাত ঠান্ডায় জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে।সে খুব করে চাইছে সৃজনীর কথা যেন সত্যি হয়।হামাদ যেন আজ কিছুতেই বাড়ি না আসে।
অরুনিমা প্রাপ্তবয়স্ক।বিবাহিত জীবন সম্পর্কে তার ধারনা আছে।হামাদ শিকদারের সাথে বিবাহিত জীবন শুরু করতে সে আগ্রহী না।সে চায় হামাদ যেন সবসময় এমন বাইরে বাইরেই ঘুরে বেড়ায়।এতেই তার শান্তি।
বাইরে মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে।তার মানুষ পছন্দ।অথচ এই বাড়ির এতো অতিথিদের কারো সামনে যেতেই তার ইচ্ছে হচ্ছে না।অরু পেছনে ঠেস দিয়ে মাথাটা দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।শাড়ি পাল্টাতে তার ইচ্ছে হচ্ছে না।যেভাবে আছে,সেভাবে রাত টা চলে গেলেই হলো।বাড়ির কথা মনে পড়ছে।আপার মুখটা আরো বেশি মনে পড়ছে।
হঠাৎই তার মনে হলো,সে দুপুর থেকে কিছু খায়নি।আপা থাকলে এতোক্ষণ থালাভর্তি ভাত এনে মেখে খাইয়ে দিতো।এদিকে যেহেতু আপা নেই,তাই অরু খেল কি না খেল সেটা নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই।অরু আধশোয়া হয়ে চোখ বুঝল।নাহ,কান্না দমন করা আর সম্ভব হচ্ছে না।সেই রাতে অরুনিমা ঘন্টার পর ঘন্টা কাঁদলো।কেন কেঁদেছে সে নিজেও জানে না।
সেদিন রাতে হামাদ শিকদার ঘরে ফিরেনি।তার স্বভাব তিন কবুল বলার সাথে সাথেই পাল্টে যায় নি।তার এই ছন্নছাড়া স্বভাবে যেই মানুষটা সবচেয়ে বেশি খুশি হলো,সে তার স্ত্রী অরুনিমা।সে চায় হামাদ চিরকাল এমন বনে বাঁদড়ে ঘুরে বেড়াক।কেবল তার কাছে না আসলেই হলো।
অরুর ঘুম ভেঙেছে খুব সকালে।ঘুম ভাঙতেই সে দেখলো তার ঘরের দরজা খোলা।সে লাগেজ থেকে একটা আকাশি রঙের সালোয়ার কামিজ বের করল।গোসলে যাওয়ার আগেই হৃদি তার ঘরে এলো।তার হাতের দিকে দেখে বলল,’তুমি আজ এটা পরবে?’
সে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।হৃদিতা বলল,’শাড়ি পরবে না তুমি?মা যদি কিছু বলে আবার?’
অরু নিচু গলায় বলল,’আমি শাড়ি পরতে জানি না হৃদিতা।’
‘কোনো সমস্যা নেই।আমরা দু’জন মিলে পরিয়ে দিবো।’ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সৃজনী উত্তর দিলো।
অরুনিমা কথা বাড়ায় না।বিশ মিনিটে গোসল সেরে বেরিয়ে আসে।সৃজনী আর হৃদি মিলে তাকে একটা জলপাই রঙের শাড়ি পরালো।অরু কেবল একগাল হেসে বলল,’তোমরা খুব ভালো শাড়ি পরাতে জানো।’
হৃদিতা দিরুক্তি করে বলল,’উহু।তুমি খুব ভালো দেখতে।তাই সব রঙেই তোমাকে ভালো দেখায়।’
সৃজনী আর সেখানে দাঁড়ালো না।চুপচাপ হেঁটে খাটের এক কোণায় বসলো।তারপর শূন্য চোখে একবার পুরো ঘরে নজর বুলালো।এই ঘরটা এখন আর শুধুই অভি ভাইজানের না।এই ঘর এখন থেকে অরুনিমা রহমানের।এই ঘরে তাদের একটা সুখের সংসার হবে।ঘরের আনাচে কানাচে সেই সংসারের স্মৃতি জড়িয়ে থাকবে।সৃজনী প্রার্থনা করে তাই যেন হয়।সে চায় অভি ভাইজান খুব ভালো থাকুক।
শাড়ি পরার পর বড় করে একটা ঘোমটা টেনে অরুনিমা ঘর থেকে বের হলো।তার দুই হাতে দু’টো বালা ঝুলছে।একটু আগে রিজোয়ানা তাকে এগুলো পরিয়ে গেছে।গলায় পরার সীতাহার এখনো তার আলমারিতে।রিজোয়ানা বললেন,’সন্ধ্যায় যখন মেহমান রা আসবে,তখন সেগুলো পরবে।’
দোতালার খালি জায়গায় হাঁটতে গিয়েই অরুনিমার চোখ একটা কামরার দরজায় গিয়ে আটকায়।তার ঘর পূর্ব পাশে,আর ঐ ঘরটা পশ্চিম পাশে।হৃদিতা তখন সৃজনীর সাথে কিছু একটা নিয়ে কথা বলছিলো।অরু সেই ঘর টার সামনে যেতেই ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধা বাজখাঁই গলায় চেঁচালেন,’কে রে দরজার সামনে?হৃদি?নাকি সৃজু?’
অরুনিমা তব্দা খায়।থতমত হয়ে এদিক সেদিক তাকায়।হৃদিতা তার দিকে এগিয়ে এলো।তার একটা হাত ধরে গলা উঁচিয়ে বলল,’দাদিজান! আমি হৃদি।অভি ভাইজানের বউকে নিয়ে নিচে যাচ্ছিলাম।’
ভেতর থেকে কর্কশ গলায় উত্তর এলো,’এখানে আন তো।দেখি আমাদের নতুন বউয়ের মুখটা দেখি।’
হৃদিতা কথা শুনতেই অরুনিমাকে নিয়ে ভেতরে যেতে চাইল।অথচ হাত ধরে টানার পরেও মেয়েটা নড়ল না।অরুর পা দু’টো মেঝের সাথে গেঁথে গেল।সে ভীতু চোখে হৃদির দিকে তাকালো।ভয়াতুর কন্ঠে বলল,’আমার খুব ভয় করছে হৃদি।’
‘কোনো ভয় নেই।তুমি আসো আমার সাথে।দাদিজান খুবই ভালো মানুষ।গলা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
অরু লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিল।মেয়েটা তার মনের কথা বুঝে গেছে।সে শক্ত করে তার হাতটা আঁকড়ে ধরে বলল,’তুমি পুরোটা সময় আমার সাথে থেকো কেমন?’
____
জাহানারা বেগম জলপাই শাড়িতে নিজেকে আবৃত করে রাখা মেয়ে লোকটি কে দেখলেন,একেবারে আগাগোড়া।প্রসন্ন হেসে বললেন,’দাদুভাইয়ের বউ তো খুব সুন্দরী।বসো বসো।এখানে বসো।’
অরু বসলো,কিন্তু হৃদির হাত ছাড়লো না।জাহানারা পান চিবুতে চিবুতে বললেন,’হুসেইন নাকি তোমার বোনের জন্য এই বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল?’
অরুনিমা মাথা নামিয়ে রাখল।তার এখানে ভালো লাগছে না।একই সাথে বিরক্ত আর ভয় দু’টোই কাজ করছে।জাহানারা বললেন,’আমার কথা তো কেউ শুনে না।হুসেইন যখন বলল মেয়ের আগেও বিয়ে হয়েছে,আবার ঐ ঘরে নাকি একটা বাচ্চাও আছে,এটা শুনেই তো আমার মাথা ঘুরে গেল।ওসব তালাক হওয়া মেয়ে নাকি আমার ঘরের বউ হবে! তা আমার দাদুভাই কি কোনো ফেলনা যে তার সাথে ওমন বিয়াত্তা মেয়ের বিয়ে হবে?’
অরুর চোখে পানি এসে গেল।সে একহাতে বিছানার চাদর খাঁমচে ধরে বড়ো করে শ্বাস নিলো।জাহানারা পুনরায় বললেন,’আমি খুব করে চাইছিলাম অভি যেন বিয়ে টা ভেঙে দেয়।হলোও তাই।হুসেইন না হয় পাগলের মতো যা তা সম্বন্ধ এনেছে।কিন্তু আমার দাদুভাই তো আর পাগল না।আমি জানতাম ওমন মেয়েকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না।’
‘কেমন মেয়ে আমার আপা?’ অরু আচমকাই তেঁতেঁ উঠল।উঁচু আওয়াজে বলল,’কি করেছে আমার আপা যে তাকে কিছুতেই বিয়ে করা যাবে না?আপনার নাতি তো দুই দুইটা খু’ন করেছে।আমার আপা কি করেছে?আপনার নাতির কোনো যোগ্যতা আছে আমার আপাকে পাওয়ার?’
অরুনিমার শ্বাস উঠে গেল।বলতে বলতেই তার কন্ঠ ভেঙে এলো।আপাকে নিয়ে কটু কথা তার সহ্য হয় না।মানুষ এভাবে কেন কথা বলে?কেন সবাই আপার বিয়ের কথা শুনলেই চোখ কপালে তুলে?অরু তো এই পৃথিবীতে আপার মতো ধৈর্যশীল মেয়ে মানুষ আর দু’টো দেখেনি।
সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।যাওয়ার আগে আর হৃদির হাত ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না।তার ভয় কেটে গেছে।জাহানারা নামের ঐ গোয়ার বুড়িকে সে আর ভয় পাবে না।তার অপমান অরুর বুকে লেগেছে।আপাকে কেউ মন্দ কিছু বললে অরুর বুকে চিনচিন ব্যাথা হয়।অরুনিমা জানে তার আপা সেরা,তার আপা অনন্যা।
জাহানারার চোয়াল ঝুলে গেল।অরুনিমা বেরিয়ে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ তিনি সেভাবেই বসে থাকলেন।তার ঘোর কাটলো আরো কিছুক্ষণ পর।সম্বিৎ ফিরতেই তিনি হকচকিয়ে উঠলেন।ফ্যালফ্যাল চোখে দরজার দিকে দেখে তিনি থমকে যাওয়া কন্ঠে বললেন,’হুসেইন।এ্যাই হুসেইন!এটা তুই কোন বাড়ির মেয়ে ধরে এনেছিস?মেয়ে তো পুরো ধানি লঙ্কা! আমার অভি দাদুভাই তো দুই দিনও তার সাথে ঘর করতে পারবে না।’
অরুনিমা বিক্ষিপ্ত মেজাজে ঘরে এলো।ঐ বুড়িকে আরো দু’টো জবাব দিতে পারলে ভালো হতো।এমন মরার বয়সে এসেও অন্য মানুষকে নিয়ে এতো বিচার বিশ্লেষণ কে করে?এমন একটা ভাব যেন তারা চাইলেই সে নিরু আপাকে ঐ হামাদ লোকটার সাথে বিয়ে দিতো! হামাদের কোনো যোগ্যতা আছে নিরু আপাকে বিয়ে করার?অরু গজরাতে গজরাতে বলল,’নিরু আপার নখের যোগ্যও তো না ঐ হামাদের বাচ্চা।আমি যে তাকে বিয়ে করেছি,সেটাই তার সাত পুরুষের ভাগ্য।শা’লা খু’নী একটা!’
____
জাহানারা বেগমের মন দুই দিন ধরে ভীষণ খারাপ।বাড়িতে একটা বিয়ে হচ্ছে।অথচ হাবিবা তার ফোনটাও ধরছে না।তার এতো কিসের রাগ জাহানারার বুঝে আসে না।রাগ না হয় অভির উপর আছে।তাই বলে জাহানারার সাথে সে কথা বন্ধ করেছে কেন?মায়ের সাথে কেউ এমন মুখ ফুলায়?
তিনি হুসেইন সাহেবকে তার ঘরে ডেকে আনলেন।অসহায় মুখ করে বললেন,’তুই একবার হাবিবাকে একটা ফোন দে না হুসেইন।আবার একটু বলে দেখ না।কতো দিন হলো আমার এহতেশাম কে আমি ছুঁয়ে দেখি না।তার তো ছুটিও শেষ হয়ে যাবে।একটু বল না হুসেইন।একবার অন্তত আসুক।’
হুসেইন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,’এহতেশামের সাথে কথা হয়েছিল আমার।’
জাহানারা বেগম চঞ্চল হয়ে বললেন,’কি বলল সে?’
‘কিছু বলে নি।আমি বলার পরেই ফোনটা কেটে দিলো।’
জাহানারা বেগম আরো এক দফা হা হুতাশ করেন।শ্বাস টেনে টেনে বলেন,’বাড়িটা একটা ম’রা বাড়ি হয়ে গেছে।ছেলেমেয়ে গুলো আর আমাকে দেখতে আসে না।বুড়িয়ে গেছি তো।তাই আর আমার খোঁজ নেয় না।ঐদিকে অভি দাদুভাই বিয়ে করে এনেছে এক ধানি লঙ্কাকে।ঐ মেয়ে তো মুখ দিয়েই বাড়িটা জ্বালিয়ে দিবে।’
হুসেইন সাহেব বিরক্ত হলেন খানিকটা।যেতে যেতে কাঠখোট্টা স্বরে বললেন,’রাখো তো আম্মা এসব খবর।রোজ রোজ ঘ্যানঘ্যান শুনতে ভালো লাগে না।’
তিনি চলে গেলেন হনহনিয়ে।জাহানারার হতাশ ভাব কাটে না।এই নিঃসঙ্গ,একাকী জীবন তার ভালো লাগে না।নাতি নাতনি রা এখন আর ডিসেম্বরের ছুটিতেও বাড়ি আসে না।এতো বড়ো বাড়িটা কেমন খাঁ খাঁ করে।জাহানারা এই শূন্য বাড়িতে নিদারুণ একাকীত্বে দিন কাটায়।মনে হয় ছেলে মেয়ে গুলো বাড়িতে এলেই নিস্তব্ধ বাড়িটা তারাবাজির আলোর মতো ঝলমল করে উঠতো।অথচ তারা আসে না,শিকদার বাড়িও আর আলোর দেখা পায় না।
সেদিন বিকেলে বড় রাস্তার মোড়ে ধুলো উড়িয়ে,স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি বেগে সাঁই সাঁই করে জলপাই রঙের জিপটা শিকদার বাড়ির সামনে এসে থামলো।সেখান থেকে ফর্মাল শার্ট প্যান্ট পরা ভদ্রলোক এক লাফে নিচে নেমে এলো।তার শার্টের গলার দিকটায় একটা রোদচশমা ঝুলছে।সে নেমেই ধাঁরালো চোখে একবার এদিক সেদিক দেখল।পেটের কাছটায় হাত দিয়ে একদফা নিশ্চিত হয়ে নিলো রিভলভারের অবস্থান সম্পর্কে।তারপরই বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল।
বাড়িতে ঢোকার পর সবার প্রথমে তাকে দেখলো হৃদিতা।দেখামাত্রই সে ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠল,’মা।ও মা।দেখো এহতেশাম ভাইজান এসেছে।’
সে ছুটে গেল তার কাছে।উৎফুল্ল হয়ে জানতে চাইল,’কেমন আছো ভাইজান?’
এহতেশাম স্মিত হেসে বলল,’ভালো।নানুমনি কোথায়?ঘরে?’
‘হ্যাঁ।ঘরেই আছে।’
জাহানারা তখন সবেই নতুন একটা পান মুখে দিয়েছেন।এহতেশাম ঘরের দরজার সামনে এসে পুরুষালি কন্ঠে ডাকলো,’নানুমনি! আসবো?’
জাহানারা বেগম ধড়ফড়িয়ে উঠলেন।দরজার দিকে দেখতেই তার দুই চোখ খুশিতে ভরে এলো।তিনি মাত্রাতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,’এহতেশাম! আমার কলিজা।আসো।নানুমনির কাছে আসো।কতোদিন দেখি না তোমায়!’
এহতেশাম গম্ভীর মুখে ভেতরে এলো।জাহানারার মুখোমুখি বসে বলল,’আমার এই বাড়ি ভালো লাগে না নানুমনি।তুমি রোজ রোজ ফোন দিবে না দয়া করে।আজ এসেছি।ভবিষ্যতে আর এভাবে ডাকবে না।’
জাহানারা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন,’কেন বাজান?একটু আসলে কি হয়?এই তোমার নানুমনি যে এক ঘরে থাকতে থাকতে মরে যাচ্ছি,সেটা কি তুমি দেখতে পাও না?’
এহতেশাম দায়সারা হয়ে বলল,’তাতে আমার কি করার আছে নানু?আমি নিজেও তো এই শহরে থাকি না।’
জাহানারা এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত ছোঁয়ালেন।তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন,’ছুটিতে আসলে নানুমনির সাথে দেখা করতে আসবে।তুমি কেন বুঝো না নানুমনি তোমাদের ছাড়া খুব একা?ডিসেম্বরের শীত আসে,ছুটি আসে।অথচ তোমরা বাড়ি আসো না।’
এহতেশাম ভ্রু কুঁচকে বলল,’সৃজু,সামির,তিয়াশা,তুরান-তারা আসে না ছুটিতে?’
জাহানারা মাথা নেড়ে বললেন,’নাহ।যেই তুমি আসা ছেড়ে দিয়েছো,ওমনি তারাও আর আসে না।’
এহতেশাম অন্যমনস্ক হয়ে কিছু একটা ভাবল।নিজ থেকে আর জবাব দিলো না।
অভি বাড়ি ফিরল আরো আধঘন্টা পর।এসেই সবার প্রথমে যেই খবরটা তার কানে গেল,তা হলো এই যে এহতেশাম মুস্তাফা তার বাড়িতে এসেছে।এই খবর শোনামাত্র তার ব্রহ্মতালু ছ্যান ছ্যান করে উঠলো।ঐ ফালতু লোক আজ আবার বাড়ি এসেছে কেন?সে দাঁতে দাঁত পিষে একটা অশ্রাব্য গালি দেয়।তারপরই খাবার টেবিলের ফলের ঝুড়ির উপর থাকা ছুরিটা একটানে নিজের হাতে নিয়ে চঞ্চল পায়ে দোতালার সবচেয়ে পশ্চিমের ঘরটির দিকে এগিয়ে যায়।তার মেজাজ গরম হচ্ছে।এহতেশাম কেন এই বাড়িতে আসবে?এটা অভির বাড়ি।এহতেশামের কোনো অধিকার নেই এখানে আসার।
চলবে-