#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৬.
দরজা থেকে একটু দূরেই কারো ব্যস্ত কদমের শব্দে এহতেশাম ঘাড় ঘুরায়।অভি ততক্ষণে জাহানারা বেগমের ঘরে পৌঁছে গেছে।তার হাতে ছুরি দেখতেই জাহানারা বেগম আঁতকে উঠলেন।রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে বললেন,’দাদুভাই! এসব কি দাদুভাই?ছুরি ফালাও এক্ষুনি।’
অভি ছুরি ফেলল না।তিরিক্ষি মেজাজে এগিয়ে এসে সর্বশক্তি দিয়ে তাকে প্রহার করতে চাইলো।অথচ এহতেশামের শরীরে সে একটা আঁচড়ও ফেলতে পারলো না।সৈনিকের মজবুত হাত ততক্ষণে উল্কাবেগে ছুটে এসে তার হাতের কবজি চেপে ধরল।অভি রক্তচক্ষু মেলে তাকে দেখে।অথচ অন্য পাশের চোখ জোড়া অতিশয় শান্ত।
এহতেশাম একেবারে শীতল চোখে তার দিকে তাকায়।থমথমে মুখ,মুখোভঙ্গি বোঝা দুষ্কর।একটানে অভির হাত নিচে নামিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল,’মাতলামি আমার সামনে একটু কম করিস।তোর এসব ছুরি চাপাতির ভয় অন্য কাউকে দেখাবি গিয়ে।আমি এসবে ভয় পাই না।’
অভি তার চেয়েও শীতল চোখে তাকে দেখে।থমথমে স্বরে বলে,’তুই কেন ভয় পাবি?তুই নিজেই তো একটা ক্রিমিনাল।’
এহতেশামের কেমন হাসি পেল।মনে হলো কেউ খুবই নিম্নমানের রসিকতা করেছে তার সাথে।সে মাথা তুলে বিদ্রুপের সুরে বলল,’হুম।ঠিক বলেছিস।আমি ক্রিমিনাল।দুই বছর জেল খেটেছি আমি।হয়েছে?তোর শান্তি?’
অভি তেঁতেঁ উঠল আচমকা।ক্ষুদ্ধ হয়ে বলল,’বেশ করেছি।যা করেছি বেশ করেছি।নিজের কাজের জন্য আমি একটুও অনুতপ্ত নই।’
‘গুড।তোর কাছে অনুতাপ আমি আশাও করি না।ওসব হলো মানুষের বিষয়।তুই জন্তু জানোয়ার।তুই ওসবের মানে বুঝবি?’
অভি এই কথা গায়ে মাখল না খুব একটা।উল্টো এহতেশামের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে এলো।ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,’তোর ভালোমানুষির মুখোশ যদি আমি সবার সামনে টেনে না খুলেছি,তবে আমার নামও হামাদ না।’
এহতেশাম বিনিময়ে তাকে ঝকঝকে একগাল হাসি উপহার দিলো।
‘ওকে।বেস্ট অফ লাক।আমিও চাই তুই আমার মুখোশ টেনে খুলে দে।যেই মুখোশ তুই বাদে আর কেউ দেখে না।’
অভি নাক ছিটকে আরো দুই কদম পিছিয়ে এলো।তারপরই জাহানারা কে দেখে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,’তোমার আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তাই না?রোজ রোজ একে বাড়িতে ডেকে আনো কেন?’
‘কারণ তোর মতো ক্রিমিনালের সাথে এক ছাদের নিচে থাকতে তার ভয় হয়।এজন্যই নানুমনি আমায় ডেকে আনে।আফটার অল আমার প্রফেশনই মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া।যাক বাদ দে।তুই সেসব বুঝবি না।খুন খারাবি করা মানুষ ওসবের মর্ম বুঝে না।’ জাহানারা কিছু বলার আগেই এহতেশাম গাঢ় স্বরে উত্তর দিলো।
অভি বিনিময়ে কেবল স্থির চোখে তার দিকে তাকায়।একটু পরেই কটমট করে বলল,’তোর ইউনিফর্ম নিয়ে তোর অনেক অহংকার।তাই না?’
এহতেশাম ফিচেল হেসে বলল,’অহংকার করার মতো বিষয় না বলছিস?আই ওউন্ড ইট ম্যান।কতো কতো সংগ্রামের পর এই ব্যাচ অর্জন করেছি তুই জানিস?অবশ্য জানার কথাও না।ওসব বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরলে এসবের মর্ম কোথা থেকে বুঝবি?’
সে উঠে দাঁড়ালো।এগিয়ে এসে অভির কলার নামিয়ে সেটা গলার কাছে ভাঁজ করে হাস্কি গলায় বলল,’সবে তো ছাড়া পেলি অভি।একটু ভালো হয়ে চলিস কেমন?এমন কিছু করিস না যাতে আমি তোকে আবার ঐ চৌদ্দ শিকের ভেতর ঢুকাতে বাধ্য হই।’
সে তাকে ছেড়ে দিলো।একটা দম ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে নিচু স্বরে বলল,’বাস্টার্ড একটা!’
অভি ছুরির হাতল টা শক্ত করে দুই হাতে চেপে ধরল।এহতেশামের প্রস্থান দেখতে দেখতেই চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,’আমি যদি আবার জেলে যাই,তবে তোকে মে’রে তবেই যাবো।স্কাউনড্রেল কোথাকার! এসেছে আমায় গালি দিতে।’
***
রিজোয়ানা ঘাড় বাঁকা করে বললেন,’রান্না করতে জানো?’
অরুনিমা মাথা নামিয়ে বলল,’জ্বী।অল্প অল্প।’
ডাহা মিথ্যে কথা।চিনি আর লবন মরিচ ছাড়া অরু কিছুই চেনে না।
এই মুহূর্তে সে আছে শিকদার বাড়ির রসাইঘরে।তাকে ঘিরে ধরেছে রিজোয়ানা,হৃদি,সৃজনী সহ বাড়ির অন্যান্য পরিচারিকা রা।আজ বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান।অনেকটা বউ ভাতের মতো করেই আয়োজন করা হয়েছে।একটু পরেই মেহমান রা সব বাড়ি আসতে শুরু করবে।
শিকদার বাড়ির নিয়ম নতুন বউ বাড়িতে আসার পর মেহমানদের জন্য কিছু না কিছু রান্না করে।অরুনিমা যেহেতু বাড়ির সদ্য বিবাহিতা নতুন বউ,তাই তার উপরও সেই রান্নার দায়িত্ব বর্তানো হলো।অরুর মনে হলো একবার বলে দিতে যে সে রাঁধতে জানে না।পরে আবার কিছু একটা ভেবে সে কিছুই বলল না।
রিজোয়ানা বললেন,’থাক।তোমার বয়স অল্প।অতো কিছু করতে হবে না।তুমি শুধু পায়েসটাই করো।’
অরুনিমা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল।চোখ নামিয়ে বলল,’আচ্ছা ঠিক আছে।’
রিজোয়ানা অন্য কাজে মন দিলেন।মনসুরা কে বলে গেলেন সে যেনো দুধ জ্বাল করে অরুকে দেয়।হৃদি আর সৃজনী বসার ঘর গোছাতে চলে গেছে।কেবল অরু শাড়ি গয়না পরে সং সেজে দাঁড়িয়ে থাকলো রান্নাঘরের মাঝামাঝি।
পায়েস তার পছন্দের খাবার।জীবনে বহুবার খেয়েছে।কিন্তু সেগুলো সব মা আর আপার হাতে বানানো।তার কোনোদিন রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়নি যে পায়েস কিভাবে রান্না করতে হয়।রান্নার প্রতি অরুনিমার ঝোঁক নেই।আপা আর মা তো আছেই রান্না করার জন্য।সে রান্না শিখে কি করবে?
অরু কোমরে আঁচল গুজে কাচুমাচু মুখে চারদিকে দেখে।এই মুহূর্তে রসাই ঘরে কেউ নেই।আপাকে একটা ফোন দিলে কেমন হয়?তার সাথে কথা বললে অরু একটা ধারণা তো পাবে অন্তত।সে চোরা চোখে চারপাশ দেখে নিরুপমাকে ফোন দিলো।নিরুপমা সেটা ধরতেই সে রসাইঘরের এক কোণায় এসে ফিসফিস করে বলল,’আপা! পায়েস কিভাবে রান্না করতে হয়?’
নিরুপমা ভড়কে গেল।থতমত খেয়ে বলল,’কি?’
‘পায়েস,,পায়েস।কিভাবে রান্না করতে হয় পায়েস?’
নিরুপমা চাপা কন্ঠে বলল,’অনেক কিছুই তো করতে হয়।তোকে একে একে বললে তুই মনে রাখতে পারবি?’
অরুনিমা তাড়াহুড়ো করে বলল,’আরে পারব পারব।তুমি বলো না আপা।’
নিরুপমা একে একে গুছিয়ে বলতে শুরু করলো।অর্ধেকের মতো বলতেই অরু অন্যপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল,’রাখো আপা রাখো।আর কথা বলতে পারবো না।বুড়ি এসে গেছে।’
নিরুপমা ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,’কি?কে এসেছে?’
অরুনিমা উত্তর দেয় না।দ্রুত ফোন কেটে সামনে তাকায়।জাহানারা বেগম সৃজনী আর হৃদির হাত ধরে রান্নাঘরে এলেন।অরুনিমা তাকে দেখেই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকায়।এই বুড়ি নির্ঘাত কোনো না কোনো ঝামেলা পাকাবে।
জাহানারা তাকে দেখেই চোখ পাকিয়ে বললেন,’কি বউমা?কাজ কতদূর?’
অরু লটকানো মুখে বলল,’এখনো শুরু করি নি।’
‘সেকি কথা! মেহমান সব আইসা পড়তাছে।আর কখন শুরু করবা?’
অরু বিক্ষিপ্ত মেজাজে সামনে এগিয়ে যায়।রান্নাঘরের এক কোণায় একটা পাতিলে জ্বাল করা দুধ ছিলো।সে সেটা মেঝে থেকে তুলে চুলার পাশের খালি জায়গায় রাখলো।রাখতে রাখতে একবার কটমট চোখে জাহানারা কে দেখে নিল।বুড়ির সমস্যা কি?আরাম করে খাটে না শুয়ে অরুর কাজের তদারকি করছে কেন?
জাহানারা বললেন,’রাঁধতে জানো তুমি?চেহারা দেখে তো মনে হয় না।’
অরু চোয়াল শক্ত করে তাকে কয়েক পল দেখে।মন চাইছে উত্তর দিতে,’তোমাকেও তো চেহারা দেখে মনে হয় না তোমার যে পেটে পেটে এতো শয়তানি।’
অথচ মুখে সে কিছুই বলল না।উল্টো মেকি হেসে বলল,’ঐ তো।একটু একটু পারি।’
জাহানারা চোখ পাকিয়ে তার কাজকর্ম দেখে।অরুনিমা পড়েছে অথৈ সাগরে।আশপাশ থেকে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার উপায় নেই।তার মনে হলো সে কোনো পরীক্ষার হলে আছে।আর জাহানারা হলেন তার গার্ড টিচার।কাজের ফাঁকেই সে কতোক্ষণ আড়চোখে তাকে দেখলো।যেভাবে আরাম করে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছেন,দেখে মনে হচ্ছে না আজ আর এখান থেকে সরবেন।
অরু কি রান্না করেছে সে নিজেও জানে না।আপা অর্ধেক প্রক্রিয়া বলেছেন।বাকি অর্ধেক অরু নিজের মতো করেছে।হয়েছে নাকি হয়নি সেটা সে জানে না।কিন্তু পায়েসটার চেহারা হয়েছে খুবই বাজে।চালগুলো সব দলা পাকিয়ে গেছে।পায়েসের এই করুণ চেহারা দেখে অরুনিমা রহমানের ভীষণ কান্না পেল।
জাহানারা বেগমের ঔষধের সময় হয়েছে।তিনি চলে গেলেন তার ঘরে,ঔষধ খেতে।অরুনিমা একবার সাহস করে এক চামচ পায়েস মুখে তুলল।মুখে নিতেই তার সমস্ত মুখ কুঁচকে গেল।কিছু একটার অভাব পায়েসে।কিন্তু সেটা কি সে বুঝতে পারছে না।কতোক্ষণ একদৃষ্টিতে পায়েসের পাতিল টা দেখার পর সে মাথা নেড়ে তার ঘরে চলে গেল।তার গায়ে জড়ানো শাড়িটা রান্না করতে গিয়ে ভরে গেছে।এই শাড়ি পরে সে নিশ্চয়ই মেহমান দের সামনে যাবে না।
****
মনোয়ারা বললেন,’নিরু তুই সত্যি সত্যি আজ ঐ বাড়িতে যাবি?’
নিরুপমা আঁচলের দিকটা সেফটিপিন দিয়ে ব্লাউজের সাথে আটকাতে আটকাতে বলল,’হ্যাঁ যাবো।আজ তো আমাদেরও দাওয়াত আছে।বিনে দাওয়াতে তো যাচ্ছি না।’
‘সে যাই হোক।সবে মাত্র বিয়ে হয়েছে।কুটুম বাড়িতে এতো ঘন ঘন গেলে লোকে কি বলবে?’
নিরুপমা কপাল কুঁচকে বলল,’ঘন ঘন কোথায়?আমি তো অরুর বিয়ের পর একবারও সেখানে যাই নি।’
সে কথা শেষ করেই আলমারি থেকে তার ব্যাগ বের করল।আজ সে আর নিহাদ যাচ্ছে শিকদার বাড়িতে।সেখানে আজ বউভাতের অনুষ্ঠান।মোটামুটি সবাইকেই দাওয়াত করা হয়েছে।নিরুমার সেখানে যাওয়ার আদতে কোনো ইচ্ছে নেই।মায়ের মতো সেও এই মর্মে বিশ্বাসী যে কুটুম বাড়িতে ঘন ঘন যেতে নেই।কিন্তু সে যাচ্ছে শুধুমাত্র অরুর জন্য।অরু আজ ফোনে অর্ধেক কথা বলেই কেটে দিয়েছে।তারপর থেকে নিরুর অস্বস্তি হচ্ছে।বারবার মনে হচ্ছে অরু কোনো সমস্যায় পড়েছে।সে যাচ্ছে মূলত তার সাথে দেখা করার জন্য।
মনোয়ারা কাজের ফাঁকে আড়চোখে একবার তাকে দেখলেন।সে আজ গাঢ় নীল আর ধূসর পারের শাড়ি পরেছে।চুলে বেণি করবে না খোপা বাঁধবে,এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে শেষে সিদ্ধান্ত নিলো সে বেণিই করবে।সে প্রসাধনী ব্যবহার করে না বহুদিন হয়েছে।মন চাইলে মাঝে মাঝে কাজল দেয়।আজ দেওয়া হয় নি।
মনোয়ারা এগিয়ে এলেন।একটু ইতস্তত করে বললেন,’শাড়ির রং টা একটু বেশি গাঢ় হয়ে গেল না নিরু?’
নিরুপমা নিজেই বোধহয় অপ্রস্তুত হলো খানিকটা।একবার মাথা নামিয়ে শাড়ির রং দেখে চাপা স্বরে বলল,’বেশি বাজে দেখাচ্ছে মা?’
মনোয়ারা হেঁটে যেতে যেতে বললেন,’বাজে দেখাচ্ছে না।বয়স কম মনে হচ্ছে।তোর যে একটা বাচ্চা আছে,সেটা বোঝা যাচ্ছে না।’
নিরু কিছুটা লজ্জা পেল।মাথা নামিয়ে বিড়বিড় করল,’আমি তাহলে পাল্টে আসি শাড়ি।’
‘থাক।তার দরকার নেই।অতোটাও খারাপ লাগছে না।ঘোমটা দিয়ে যাস।’
নিরুপমা দ্রুত মাথায় কাপড় দিলো।মাথা নামিয়ে বলল,’জ্বী মা।দিয়েছি।’
নিহাদ বেতের সোফার উপর উঠে লাফালাফি করছিলো।নিরু গিয়ে তাকে ধমক দিয়ে বলল,’এসব কি তুতুন?নেমে আসো তাড়াতাড়ি।আমাদের বের হতে হবে।’
বাইরে যাওয়ার কথা শুনেই নিহাদের মুখে হাসি ফুটল।সে নিরুপমার একটা হাত ধরে সোফা থেকে নামলো।অন্য হাতের আঙুল খেতে খেতে বলল,’মা! আমলা কি অলুর কাছে যাচ্ছি?’
নিরুপমা শব্দ করে হাসলো।জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল,’হ্যাঁ বাবা।আমরা অলুর কাছেই যাচ্ছি।’
***
এহতেশাম বসেছিল বাড়ির লিভিং রুমে,পায়ের উপর পা তুলে।অভি তখন ছাদে।কালকের কেনা বেনসনের প্যাকেটে আর মাত্র দু’টো সিগারেট অবশিষ্ট আছে।সে প্যাকেট খালি করে তবেই নিচে নামবে।
নিরুপমা বাড়িতে আসলো বিকেলের দিকে।বসার ঘরটায় সে আগেও এসেছে।তাই সেটা চিনতে তার অসুবিধে হয়নি।বসার ঘরে তখন কেবল এহতেশাম আর হাশিম ছিলো।হাশিম টেলিভিশনে খেলা দেখছিলো।আর এহতেশাম টেবিলের উপর থাকা ম্যাগাজিনে নজর বুলাচ্ছিলো।
নিরুপমা এসেই দ্রুত আঁচল টানলো।তাকে সবার প্রথমে দেখল হাশিম।ঘাড় বাঁকা করে তাকে দেখতেই চোখ খাঁড়া করে বলল,’আপনি অরুনিমা ভাবির বোন না?’
এহতেশাম ম্যাগাজিন থেকে চোখ তুলল।দেখল দরজার মাথায় একটি মেয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।তার পাশে তার হাত ধরে আরেকটা ছোট বাচ্চাও দাঁড়িয়ে আছে।এহতেশাম অনুমান করল বাচ্চাটার বয়স তিনের বেশি হবে না।
নিরুপমা অল্প হেসে জবাব দিলো,’জ্বী।আমি অরুর বোন।নিরুপমা।অরুর সাথে কি একটু দেখা করা যাবে?’
হাশিম উঠে দাঁড়ালো।উপরনিচ মাথা নেড়ে বলল,’অবশ্যই।আসুন আপনি আমার সাথে।’
নিরুপমা নিহাদের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল।সোফার কাছাকাছি আসতেই এহতেশামের সাথে তার দেখা হলো।এর আগে সে তাকে খেয়াল করেনি।নিরুর মনে হলো ভদ্রলোককে সে আগেও কোথাও দেখেছে।অথচ কোথায় দেখেছে সেটা এখন মনে পড়ছে না।
সে মাথা নামিয়ে ক্ষীণ গলায় বলল,’আসসালামু আলাইকুম।’
এহতেশাম স্থির চোখে তার দিকে তাকালো।গম্ভীর মুখে বলল,’ওয়ালাইকুমুস সালাম।’
নিহাদের হাত তখনও নিরুপমার শক্ত হাতের মুঠিতে বন্দি।এহতেশাম বলল,’আপনার ছেলে?’
মেয়েটি জবাবে কেবল উপরনিচ মাথা নাড়ল।এহতেশাম হাত বাড়িয়ে বলল,’তোমার নাম কি বাচ্চা?’
নিহাদ দুই দিকে শরীর দুলিয়ে বলল,’তুতুন।’
এহতেশামের কপালে ভাঁজ পড়লো।বিড়বিড় করে বলল,’তুতুন?’
নিরুপমা সঙ্গে সঙ্গে দিরুক্তি করল।ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বলল,’না না।ওর নাম নিহাদ।আমরা বাড়িতে তুতুন বলে ডাকি তো।তাই সেও তার নাম তুতুনই বলে।’
এহতেশাম আগের চেয়েও গম্ভীর হয়ে বলল,’ওহ।’
নিরুর মাথায় সুন্দর করে ঘোমটা দেওয়া।তবুও কিছু চুল বেণি থেকে খুলে বেরিয়ে আসছে।নিরুপমা মহাবিরক্ত হয়ে সেগুলো কানের পেছনে গুজে দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।এহতেশাম তার শাড়ির আঁচলটা একনজর দেখেই চোখ সরিয়ে নিল।টেবিলের উপর রাখা ম্যাগাজিনটাই এখন মেজর এহতেশামের সঙ্গী।
****
অরুনিমা তার ঘরেই ছিল।লাল শাড়ি পরে একদম নতুন বউ সেজে সে মুখ কালো করে রেখেছিল।নিরুপমা ঘরে আসতেই সে একলাফে উঠে দাঁড়ালো।ছুটে গিয়ে তাকে জাপটে ধরে বলল,’আপা! তুমি এসেছো?’
ঘর তখন খালি।হৃদি আর সৃজনী বসার ঘরে গিয়েছে একটু আগে।অভি তখনো ছাদে।বাড়ি আসার পর অরুর সাথে তার একবার দেখা হয়েছে অবশ্য।অরুকে সে এমনভাবে এড়িয়ে গেল যে অরুর মনে হলো সে বাড়ির আয়া,আর অভি তার মালিক।সে ঘর থেকে বের হতেই অরু দাঁতে দাঁত ঘষে গা’লি দিলো,’যেমন দাদি,ওমন নাতি।দু’টোই এক।’
নিরুপমার কথায় তার ভ্যান ভাঙলো।নিরুপমা বলল,’পায়েস রান্না করতে পেরেছিলি অরু?’
অরুনিমা কাচুমাচু মুখে বলল,’করেছি।কিন্তু খেতে খুব বাজে হয়েছে।’
নিরুপমা চোরা চোখে চারপাশ দেখে।তারপর নিরুর কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,’আমি বাড়ি থেকে দুধ জ্বাল করে এনেছি।আমার ব্যাগে আছে।আধঘন্টা সময় দিলে আমি আবার নতুন করে রান্না করে দিতে পারবো।’
অরুনিমার চোখে তড়িৎ খেলা করে।সে অতি উৎসাহিত হয়ে বলল,’আপা সত্যি?তুমি পারবে?’
‘যদি তুই আধঘন্টার জন্য আমাকে রান্নাঘরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারিস,তবে।’
আধঘন্টার জন্য রান্নাঘর খালি করা টা একটু কষ্টসাধ্য কাজ।অরু রসাইঘরে এসেই দরজা বন্ধ করে দিলো।বুকে হাত বেঁধে বলল,’এবার কেউ আসলেও ঢুকতে দেব না।’
নিরুপমা একটু ভেবে বলল,’কেউ এলে বলিস যে মিষ্টি কম হয়েছে,তাই গুড় দিয়ে আবার জ্বাল দিচ্ছিস।’
অরুনিমা দুই হাত ঘষতে ঘষতে বলল,’আচ্ছা ঠিক আছে।’
তারপরই পেছন ফিরে বলল,’তুতুন কি হৃদি আর সৃজনীর কাছে?’
নিরু চাল ধুতে ধুতে জবাব দেয়,’হ্যাঁ।তারাই দেখা হতে তুতুনকে নিয়ে নিল।মেয়ে দু’টো বড্ড আদর করে তুতুনকে!’
****
নিরুর রান্না প্রায় শেষ।তার ভাগ্য ভালো যে এই আধঘন্টায় কেউ রান্না ঘরে আসেনি।অরু একটু আগে তার ঘরে গিয়েছে চুল বাঁধার জন্য।নিরু একটুখানি পায়েস চামচে নিয়ে খেয়ে দেখল।নাহ,বেশ ভালোই হয়েছে।আগের পায়েসটা সে আর অরুনিমা সিংক দিয়ে আরো আগেই ফেলে দিয়েছে।
নিরু সবকিছু ঢেকে,চারপাশ গুছিয়ে বড়ো করে একটা শ্বাস ছাড়লো।তার মাথায় আপাতত ঘোমটা নেই,শাড়ির আঁচল সে একদিকে ঘুরিয়ে কোমরে এনে গুজেছে।চুলার গরম আঁচে সে কিছুটা ঘেমে গেছে।
রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার আগেই আচমকা পুরো ঘরের বাতি নিভে গেল।নিরুপমা চমকে উঠে একটু পিছিয়ে গেল।চোখ মেলে আবছা আলোয় চারপাশ দেখল,অনুমানে হেঁটে রান্নাঘর থেকে কোনোরকমে বের হওয়ার চেষ্টা করল।
তার হঠাৎই মনে হলো রসাই ঘরের দরজায় কেউ আছে।সে আঁতকে উঠে বলল,’কে?কে ওখানে?’
অন্যপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।নিরু ঢোক গিলে কাঁপা স্বরে বলল,’কে?দয়া করে আলো জ্বালান।আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’
ক্ষণকাল নিরবতা।তারপর দ্বপ দ্বপ করে লাইটার জ্বলে উঠল।নিরু সেই আবছা আলোতে প্রথমে কেবল সামনে থাকা মানুষ টার অবয়ব দেখল।পুরুষালি অবয়ব।নিরু ক্ষীণ কন্ঠে বলল,’কে আপনি?’
লাইটার টা উঁচু করে ধরে নিজের মুখের সামনে এনে নিজের পরিচয় স্পষ্ট করল লোকটা।নিরু বিভ্রান্ত চোখে সেই নেত্রযুগল দেখে।একেবারে স্বল্প পরিচিত একটা মুখ।তার কিছু বলার আগেই লোকটা অতিমাত্রায় গম্ভীর স্বরে বলল,’নিরুপমা! আমি এহতেশাম।’
নিরুপমা এবার তাকে চিনল।কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলল,’ওহহ আপনি।’
এহতেশাম অবশ্য স্বাভাবিক হলো না।চোখ খাঁড়া করে আগাগোড়া নিরুপমাকে পর্যবেক্ষণ করে ভারি গলায় বলল,’আপনি এখানে কি করছেন নিরুপমা?আমি যতোদূর জানি বাড়ির অতিথিরা রসাইঘরে আসে না।’
নিরুপমা বেড়াল ছানার মতো মিইয়ে গেল।আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না।
শেষে কেবল ভীত চোখে সামনে তাকালো।
সৈনিকের জহুরি চোখ জোড়া তখন তার সমস্ত গাত্রে ঘুরপাক খাচ্ছিল।তার ইতস্তত আচরণ,নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া,কোনো কিছু গোপনের চেষ্টা-কোনোকিছুই মেজর এহতেশামের চোখ এড়ায়নি।
তার শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুজে রাখা।তার বেণি করা চুল অতি অবহেলায় একপাশে পড়ে আসে।তার কোমরের দিকে চোখ যেতেই এহতেশাম দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
হঠাৎই কিছু একটা সশব্দে মাটিতে গড়িয়ে পড়লো।নিরুর মনে হলো পিতলের কোনো ধাতব বস্তু মাটিতে পড়েছে।সে ব্যস্ত হয়ে সেটা তোলার জন্য মাটিতে বসলো।কিন্তু তার আগেই এহতেশাম তড়িৎ-গতিতে মাটিতে ঝুঁকে খপ করে সেই বস্তুটা চেপে ধরল।নিরু তাজ্জব হয়ে বলল,’কি পড়লো?’
পুরো ঘরের বিদ্যুৎ ততক্ষণে ফিরে এসেছে।রান্নাঘরের বাতিও জ্বলে উঠল সেকেন্ডের মাথায়।লাইটারে আবছা লাল আলো কেটে পুরো রসাইঘরে ছেয়ে গেল ফকফকে সাদা এলইডি লাইটের আলো।
নিরুপমা প্রথমে চোখ মেলে চারপাশ দেখল।তারপরই মেঝের দিকে ঝুঁকে এহতেশামের হাত দেখল।দেখতেই তার চোখ কপালে উঠল।সে আঁতকে উঠে বলল,’ছুরি!!’
এহতেশাম নিজের হাত দেখল,তারপর দেখল হাতের মুঠোয় চেপে রাখা ধাঁরালো ধাতব বস্তুটি।অকস্মাৎ চেপে ধরায় তার তর্জনী কিছুটা কেটে গেছে।
সে সেসবের তোয়াক্কা না করে উঠে দাঁড়ালো।পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে হাতের র’ক্ত টুকু মুছতে মুছতে ভাবলেশহীন হয়ে বলল,’মামানি পাঠিয়েছে আমায়।ফল কাটার জন্য ছুরির দরকার ছিলো।আপনি কিন্তু আমার কথার জবাব দেননি।কেন এসেছেন আপনি এখানে?’
চলবে-