#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৮.
সকাল আটটা দশ।সামিরদের হালকা হলুদ গাড়ি টা এহতেশামের বাড়ির সামনে এসে থামলো।গাড়ি থামতেই প্রবল উৎসাহে ভেতরের মানুষজন একে একে গাড়ি থেকে নেমে এলো।তারা আজ ভীষণ আনন্দিত।আজ অনেক গুলো দিন পর তারা নানুবাড়ি যাচ্ছে।
এহতেশাম তখন তার রুটিনমাফিক অনুশীলনে ব্যস্ত।তার ছুটি শেষ হতে আর মাত্র তিনদিন বাকি।তারপর সে তাদের রাঙামাটির ক্যাম্পে ফিরে যাবে।তারপর আর কবে বাড়ি ফিরবে সে জানে না।তবে জানুয়ারির আগে আর ফেরা সম্ভব না সেই ব্যাপারে সে নিশ্চিত।
তিয়াশা তার দরজায় পর পর দুইবার ধাক্কা দিলো।এহতেশাম কন্ঠস্বর চওড়া করে বলল,’কে?’
‘ভাইজান আমি তিয়াশা।’
‘তোরা সবাই এসেছিস?’
এহতেশাম উঠে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে।কয়েক ঢোক পানি খেয়ে একটা টি-শার্ট গায়ে চাপিয়ে আস্তে করে দরজা খুলে।তিয়াশা গালভর্তি হেসে বলল,’চলো।এবার তাহলে যাই।’
এহতেশাম পুনরায় খাটে গিয়ে বসলো।মাথা নামিয়ে টাইলস বেছানো ফ্লোর দেখতে দেখতে বলল,’আমি এমন ড্রেসে যেতে পারব না।একটু অপেক্ষা কর।শার্ট আর প্যান্ট পরে আসছি।’
তার তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগলো না।লাগেজ সে আগেই গুছিয়ে রেখেছে।সেটা সে রাঙামাটি যাওয়ার সময় সাথে নিবে।আপাতত সে সাথে রেখেছে একটা ট্রাভেল ব্যাগ।সেখানে দুইদিন পরার মতো পর্যাপ্ত জামাকাপড় আছে।
সামির তাকে দেখেই মিষ্টি করে হাসলো।সৃজনী বলল,’ভাইজান! তুমি কতোদিন পর ঐ বাড়ি যাচ্ছো।আমাদের সেই ছোট বেলার মতো আনন্দ হচ্ছে।’
এহতেশাম জবাবে কেবল সৌজন্যের খাতিরে হাসলো।তার ভেতর নানুবাড়ি যাওয়া নিয়ে কোনো উৎসাহ কাজ করে না।সে ঐদিকে না গেলেই বাঁচে।ছুটির শেষ দিনগুলো কোনো অবস্থাতে খারাপ কাটাতে সে ইচ্ছুক না।তবুও সামিরের কথা সে ফেলতে পারেনি।নানুবাড়িতে তার অনেক স্মৃতি।সামির ভুল কিছু বলেনি।অনেক গুলো বছর তারা ছুটির দিনগুলোতে নানুবাড়ি বেড়াতে যায় নি।এইবার যখন সব এক হয়েছে,তখন দু’টো দিন সেখানে কাটালে আহামরি কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে না।
সে চুল সেট করে বলল,’এখানে নাস্তা করে যাবি?নাকি নানুবাড়িতে গিয়ে করবি?’
তুরান বলল,’নানুবাড়িতে করবো ভাইজান।শুনেছি মামানি নাকি অনেক রকমের রান্না করছে আজ।’
এহতেশাম কিছুটা বিরক্ত হলো।কপাল কুঁচকে বলল,’কেন ওদের জানিয়ে দিলি সবটা?আমি চেয়েছিলাম তাদের একেবারে সামনাসামনি গিয়ে চমকে দিতে।’
তিয়াশা দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল,’না ভাইজান।আমরা তাকে কিছুই বলিনি।আজ ভাবির বাসার মানুষদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে তো।তাই মামানি এতো রান্নার আয়োজন করছে।’
এহতেশাম একটু স্থির হলো।নিরেট স্বরে বলল,’অরুনিমার বাড়ির লোকজন আসছে আজ?’
‘হ্যাঁ।সেদিন তো কেবল নিরুপমা আপু এলো।আন্টি তো আসেনি।এবার মামা আন্টিকে সহ আসতে বলেছেন।’
সামির ঘাড় নেড়ে বলল,’কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না?উনার মেয়ে কয়েকদিন সংসারও করে ফেলেছে।কিন্তু উনি এখনো মেয়ের শ্বশুড়বাড়িও দেখেন নি।’
এহতেশাম অবশ্য সেই কথায় কান দিলো না।অরুর পরিবার সেখানে আসছে শোনার পরেই তার কেমন অন্যরকম অনুভূতি হলো।মনে হলো সমস্ত শরীরে তড়িৎ খেলা করছে।একটা অদ্ভুত উৎসাহ উদ্দীপনা তাকে জেঁকে ধরল,ঠোঁটে ফুটে উঠল অস্পস্ট হাসি।সেই হাসি মিলিয়ে গেল ক্ষণিকের ব্যবধানেই।
সে কলার ঠিক করে ঠান্ডা স্বরে বলল,’আচ্ছা চল।দেরি হচ্ছে আমাদের।’
***
অভির ঘুম ভেঙেছে আরো পাঁচ মিনিট আগে।ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ খাটে শুয়ে থাকলো।মনে হলো চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ পড়ে থাকলে সে আবারো ঘুমিয়ে যাবে।এখনো পুরোপুরি সকাল হয়নি।তার ঘুম সচরাচর আরেকটু পরে ভাঙে।আজ ভেঙেছে বেশ আগে।সে আড়মোড়া ভেঙে জানালার দিকে তাকায়।
হঠাৎই তার মনে পড়লো সে বিবাহিত।আর এই ঘরে সে ছাড়াও আরেকটা মেয়ে আছে।মুহূর্তেই মস্তিষ্ক সচেতন হয় তার।সে এক লাফে উঠে বসে মেঝের দিকে তাকায়।
মেঝে ফাঁকা।সেখানে কেউ নেই।কেবল কাল রাতে ছুড়ে মারা চাদরটা এক কোণায় পড়ে আছে।অভি কপাল ভাঁজ করে এদিক সেদিক তাকায়।মনে হচ্ছে বারান্দায় কেউ আছে।সে ঘুম ঘুম চোখে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়।
অরুনিমা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিলো।বারান্দাটা খুব সুন্দর।একদম রাজকীয় ধরণের।অরুর মনে হলো তাদের শোয়ার ঘরটাও এই বারান্দার চেয়ে ছোট।বারান্দা থেকে বাড়ির সামনের বাগান দেখা যায়।অরুনিমার এই দৃশ্য চমৎকার লাগে।বাড়িটা একটু সুনশান,কিন্তু ভীষণ চোখ ধাঁধানো।কেমন একটা মুঘল যুগের ভাব আছে।অরুনিমার টাকা থাকলে সে একটা ভালো ক্যামেরা কিনে এই বাড়ির অনেক গুলো ছবি তুলতো।
অভি বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ালো।ভেতরে গেল না।বারান্দার এক পাশে ছোট ছোট দুইটা ফুলের টব রাখা।অরুনিমা সামান্য ঝুঁকে দু’টো গাছে পানি দিলো।অভি সে নিয়ে ভ্রুক্ষেপ করল না।সে জানে এই কাজ সৃজনীর।তার ঘরে আলতু ফালতু জিনিস রাখাই সৃজনীর প্রিয় কাজ।সে ধমক দেওয়াতে এখন ঘর ছেড়ে বারান্দায় হাত দিয়েছে।সে ঠিক করলো একে সে আর ঘরেই ঢুকতে দিবে না।
সে জামার হাতা গুটিয়ে হাত মুখ ধুতে চলে গেল।পাড়ার মোড়ে আজ সবাই মিলে ঘুড়ি উড়াবে।ঐদিকে জগলু,বিনয়,পার্থ সবাই আড্ডা দেয়।অভি আজ সারাদিন তাদের সাথেই থাকবে।বাড়ির মানুষের সাথে তার কোনোরকম সখ্যতা নেই।কিন্তু পাড়া মহল্লায় তার খুব নাম।যেকোনো উৎসবে আমেজে লোকে তাকেই সবার প্রথমে তালাশ করে।
অভি জন্মগতভাবে গম্ভীর প্রকৃতির।সে সবসময়ই ভবঘুরে,গন্তব্যহীন।তার এই বাউন্ডুলে স্বভাব বাড়িতে কারো পছন্দ না।এতে তার কি?মানুষের মন জোগানোর চেষ্টা অভি কবেই বা করেছে?
অভির চাই একটা মুক্ত স্বাধীন জীবন।ওসব পড়াশোনা,ক্যারিয়ার তাকে টানে না।পাড়ার মোড়ের আড্ডা আর বেনসনের এক প্যাকেট সিগারেট বাদে তার কাছে ভালো লাগার আর কোনো সংজ্ঞা নেই।লোকে তাকে অযোগ্য বলার বলুক,অভি অযোগ্যই ভালো।এহতেশামের মতো যোগ্যতা তার কোনোদিন না হোক।যেই যোগ্যতায় মানুষ ধরা কে সরা জ্ঞান করে,ঐ যোগ্যতায় অভি থুথু দেয়।
অভি এমনটাই বেশ আছে।এই পিছুটান বিহীন জীবন দারুণ উপভোগ্য।সে তো বেশ উপভোগ করছে সবটা।
****
শিকদার বাড়িতে আজ বিয়ে বাড়ির আমেজ।অথচ বিয়ে শেষ হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে।এতো উৎসাহ উদ্দীপনার কারণ আজ বাড়িতে জাহানারা বেগমের নাতি নাতনিরা সব ফিরে এসেছে।তিনি সেই খুশিতে পুরো বাড়ি হৈচৈ করে বেড়াচ্ছেন।সবাই যখন তার ঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ালো,তখন জাহানারার খুশি দেখে কে?তারপর থেকেই তিনি নিচে এসে অতি আনন্দে চিৎকার চেঁচামেচি করেই যাচ্ছেন।কি আনন্দ! তার বাড়ি আজ এতো গুলো দিন পর মানুষে মানুষে ভরে গেছে।
তার তিন মেয়ে।হাবিবা,হাফসা আর হুমায়রা।এহতেশাম হাবিবার ছেলে,সামির-সৃজনী হাফসার সস্তান,আর তিয়াশা-তুরান হুমায়রার সন্তান।আজ হাবিবা ছাড়া বাকি দুইজনও বাড়িতে এসেছে।
রিজোয়ানা তখন রসাইঘরের আয়োজনে ব্যস্ত।অরুনিমা ভয়ে ভয়ে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো।রিজোয়ানা তাকে ডেকে পাঠিয়েছে।হয়তো কিছু রান্না করতে বলবে।কিন্তু অরুনিমা তো রান্না পারে না।সে কি করবে খামোখা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?
রিজোয়ানা তাকে দেখামাত্র ডাক দিলেন।বললেন,’অরুনিমা! একটু এসো তো ভেতরে।’
অরু জড়োসড়ো হয়ে ভেতরে এলো।মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ড টা গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে।সে ভেতরে যেতেই রিজোয়ানা বললেন,’বসার ঘরে গিয়েছিলে?’
অরু দুই দিকে মাথা নাড়লো।রিজোয়ানা কয়েকটা কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন,’আমার ননদ আর ননাশ্ রা সবাই বাড়ি এসেছে।তুমি গিয়ে তাদের সাথে দেখা করে আসো।’
রিজোয়ানা চায়ের ট্রে টা তার হাতে তুলে দিলেন।অরুর শুকনো মুখটা চোখে পড়তেই বললেন,’কি ব্যাপার অরু?কোনো সমস্যা?’
অরু মিনমিন করে বলল,’ভয় লাগছে চাচি।’
রিজোয়ানা তার কাঁধে হাত রেখে অভয় দিলেন,’কোনো ভয় নেই অরু।হাফসা আর হুমায়রা আপা খুবই ভালো মানুষ।কিছুই বলবে না তোমায়।’
অরু চায়ের ট্রে হাতে আতঙ্কিত নয়ন মেলে এলোমেলো পায়ে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।আজ সে শাড়ি পরেনি।একটা সাধারণ সালোয়ার কামিজ পরেছে।ওড়না টা মাথার উপর চাপিয়ে সে বসার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো।সৃজনী তাকে দেখতেই বলল,’আরে অরু! এসো না।’
অরুনিমা অপ্রস্তুত হেসে ভেতরে গেল।মাটিতে চোখ নামিয়ে বলল,’আপনাদের চা।’
জাহানারা বেগম তখন বহাল তবিয়তে বসে ছিলেন।অরুর মনে হলো বুড়ি আজ আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।সে মাথা নামিয়ে মুখ ভেঙচায়।বিরক্ত লাগে তার এই মহিলাকে।সে চায়ের ট্রে হাতে একে একে সবার কাছে এগিয়ে গেল।
জাহানারা পান চিবুতে চিবুতে বললেন,’এর নাম অরুনিমা।অভি দাদুভাইয়ের বউ।’
তিনি থামলেন।অরু মনে মনে ধমক দিলো,’এখানেই থেমে যা বুড়ি।আর গাড়ি টানিস না।’
কিন্তু তিনি থামলেন না।খানিকটা অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন,’প্রথমে তো বিয়া ঠিক হইছিল এর বোনের সাথে।হাশিমের তো কোনো বিবেক বোধ নেই।বিয়াত্তা মাইয়ার লগে আমার দাদুভাইয়ের বিয়া ঠিক করছে।পরে দাদুভাই ই এই মাইয়ারে বিয়া করছে।আমি মেলা খুশি হইছি।আমারে ক,আমার দাদুভাইয়ের মতো আবিয়াত্তা পোলা ওমন এক বাচ্চার মা রে কেন নিকা করবো?’
অরু চোখ মুখ খিঁচে ধরল।তার হাত কাঁপছে।চোখ আরো আগেই ঝাপসা হয়ে এসেছে।মনে হলো জাহানারা বেগম মুখ দিয়ে তীরের ফলা ছুড়ে তার বুকে এসে আঘাত করছেন।সে শুধু পুরোটা সময় নিজেকে শান্ত রেখে সবার হাতে চায়ের কাপ দিলো।ঘর জুড়ে এতো মানুষ।অথচ অরুর উদ্ভ্রান্ত অসহায় চোখ,ফ্যাকাশে মুখ আর কেউ খেয়াল করল না।কেবল একজন ছাড়া।
এহতেশাম গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই দৃষ্টি পরোখ করে।বোনকে নিয়ে হওয়া কটু কথায় তার চোখ ভিজে উঠেছে।সে এই আলোচনায় কষ্ট পাচ্ছে।অথচ অদ্ভুত ব্যাপার,কেউ এই যন্ত্রনাটুকু অনুধাবন করল না।এহতেশামের হাসি পেল।কেউ যেটা অনুভব করতে পারছে না,সে কিভাবে সেটা অনুভব করছে?
জাহানারা বেগম আরো কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।এহতেশাম তার আগেই থাকে থামিয়ে দিলো।হাত তুলে খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল,’আহ নানুমণি! তুমি থামবে?আরেকজনের জীবন নিয়ে এতো কিসের কথা তোমার?বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো,তারপর হয়নি।শেষ।আর এতো ব্যাখ্যায় যাচ্ছো কেন?বিরক্ত লাগে এসব আলাপ।’
জাহানারা থেমে গেলেন সাথে সাথে।আমতা আমতা করে বললেন,’ঐতো।ঐ আরকি।আচ্ছা থাক।গোসসা কইরো না।অন্য কথাই কমু এখন থেক্কা।’
অরু কোনোরকমে সবার সাথে পরিচিত হয়ে বাড়ির সামনের খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।তার দুই চোখ এতোক্ষণ বহু কষ্টে কান্না আটকে রেখেছিল।এখন সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না।সে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলো।আওয়াজ যেন বাইরে না যায়,তাই শক্ত করে সে তার মুখ চেপে ধরল।
‘অরুনিমা!’
এহতেশামের গম্ভীর কন্ঠস্বর।অরু পর্যন্ত পৌঁছুতেই সে পেছন ফিরল।তার চোখ জোড়া দেখে এহতেশামের মন ভার হলো।মেয়েটার বয়স খুব একটা বেশি না।এই অল্প বয়সে এসব বিয়ে-সংসার সামলানো তার জন্য কঠিন।কিছু মানুষের মুখের উপর স্রষ্টা অদ্ভুত মায়ার চাদর বিছিয়ে দেন।দেখলেই কেমন মায়া হয়।অরুনিমা খুব সম্ভবত তাদেরই একজন।
এহতেশাম এগিয়ে এলো।ভারি গলায় বলল,’নানুমণির বয়স হয়েছে।কোথায় কোন কথা বলতে হয়,এই জ্ঞান তার নেই।জাস্ট টেইক ইট লাইটলি।উনি যা বলে সেটা চুপ করে শুনবে,কিন্তু গায়ে মাখবে না।বুঝেছো?’
অরু এবার চোখ তুলল।চাপা আনন্দে তার দুই চোখ ভরে উঠেছে।সে কান্না আটকে রেখে বলল,’ভাইজান! আপনি খুব ভালো।এই বাড়ির সবচেয়ে ভালো মানুষ আপনি।’
এহতেশামের হাসি পেল।মাথা নামিয়ে সে বোধ হয় হাসলোও খানিকটা।তারপর চোখ মুখ স্বাভাবিক করে বলল,’ওসব ভালো মানুষ হওয়ার বিষয় না।বাকিরা আমার চেয়ে ছোট।তারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না,এই যা।এমনিতে আমার সব ভাই বোনই চমৎকার।’
বলতে গিয়েই সে একটু হোঁচট খায়।একটা কথা যদিও গলা পর্যন্ত এসেছিল,তবুও সে সেটা বের করল না।মেয়েটা এমনিতেই দুঃখ কষ্টে জর্জরিত।এহতেশাম মুস্তাফা তার দুঃখ বাড়াতে ইচ্ছুক না।
****
দুপুর দুইটার দিকে একটা সিএনজি তে করে নিরুপমা,নিহাদ আর মনোয়ারা এলেন তাদের কুটুম বাড়িতে।লোহার গেটের সামনে তাদের সিএনজি থামতেই দারোয়ান গেইট খুলে দিলেন।
নিরুপমা নামার পর সবার আগে ভাড়া মিটিয়ে দিলো।সে আজ ছাই রঙের শাড়ি পরেছে।দুই হাত খালি,গলাতে একটা চিকন চেইন।মা বলেছিলো খোঁপা বাঁধতে।কিন্তু নিরুর আজ সকাল থেকেই মাথা ব্যাথা।খোঁপা করলেই সেটা আরো বাড়তো।তাই সে কোনোরকমে একটা বেণী করেছে।নিহাদ সিএনজি থেকে নেমেই তার হাত ধরে বলল,’মা।শিস পেয়েছে।’
নিরুপমা হকচকিয়ে গেল।দুই দিক দেখে বলল,’কি সাংঘাতিক কথা! মাত্র তো আসলাম।অরুর ঘরে যেতে তো আরো সময় লাগবে বাবা।’
নিহাদ বলল,’তাত্তারি যাও মা।’
নিরু অস্থির হয়ে এদিক সেদিক দেখে বলল,’একটু চেপে রাখো বাবা।মা এখনই তোমায় নিয়ে যাচ্ছি।’
এহতেশাম রা সবাই তখন বাগানেই ছিলো।হাশিম গেইটের দিকে দেখতেই আন্তরিক হেসে বলল,’আরে! অরুনিমার বাড়ির লোকজন এসেছে।কেউ মা কে একটু জানাও গিয়ে।’
এহতেশাম ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে।প্রথমেই চোখ যায় ছাই রঙের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নিজেকে বিষন্নতার চাদরে মুড়িয়ে নেওয়া মেয়ে মানুষটির দিকে।তার শরীরে কোনো অলংকার নেই,পোশাকে কোনো চাকচিক্য নেই।বয়স অল্প,তবে মুখে কোনো প্রসাধনীর ছোঁয়া নেই।তার হাত ধরে রাখা বাচ্চাটাকে আজ বড়ো অস্থির দেখাচ্ছে।সে একটু পর পর মায়ের আঁচল টেনে ধরে কিছু একটা বলছে।মা তার কথা শুনতেই তারই মতো অস্থির হয়ে চারপাশ দেখছে।
সৃজনী আর হৃদিতা তাকে দেখতে পেয়েই ছুটে গেল।সৃজনী তার গালে হাত রেখে বলল,’তুতুন সোনা! কেমন আছো তুমি?’
সে মলিন মুখে জবাব দেয়,’ভালু না।’
হৃদি অবাক হয়।
‘সেকি! কেন?মা বকা দিয়েছে?’
নিহাদ দুই দিকে মাথা নাড়ে।মলিন মুখে জানায়,’বকা দেয় নি।শিস ধচ্চে।মা বুলচে চেপে লাখতে।’
হৃদি খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল।দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল,’না না।কাজ টা মা একদমই ঠিক করে নাই।শিস কোনো চেপে রাখার জিনিস হলো?আসো তুমি খালামণির সাথে।খালামণি তোমায় বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছি।’
নিরুপমা খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো।প্রশস্ত হেসে বলল,’অনেক উপকার হবে হৃদি।তোমরা ওকে একটু কষ্ট করে নিয়ে যাও।’
হৃদি আর সৃজনী তাকে নিয়ে বাড়ির একেবারে ভেতরে চলে গেল।নিরুপমা আর মনোয়ারা গিয়ে দাঁড়ালো বাড়ির খোলা বারান্দার সামনে।মনোয়ারা এই প্রথম মেয়ের কুটুমবাড়িতে এসেছেন।এসেই তো হুট করে ঢুকে যাওয়া যায় না।সবকিছুরই একটা সহবত আছে।মনোয়রা অপেক্ষা করছিলেন হুসেইন সাহেব আর তার স্ত্রী রিজোয়ানার আসার।তারা এলেই তিনি ভেতরে যাবেন।
এহতেশাম বগলদাবা করে বারান্দার দৃশ্য দেখে।কতোক্ষণ সে স্থির চোখে মেয়েটাকে দেখেছে সে জানে না,জানতে চায়ও না।মেয়েটার শাড়িতে মোট আটটা কুচি।উচ্চতা মাঝামাঝি।এহতেশামের সাথে দাঁড়ালে তার কাঁধের কাছে এসে পড়বে।রোগা পাতলা শরীর।ওজন পঞ্চাশ থেকে বায়ান্নর মাঝামাঝি হবে বলেই এহতেশামের ধারণা।কানের পেছনে একটা তিলও আছে অবশ্য।এহতেশামকে পাশ কাটানোর সময়ই বিষয়টা লক্ষ্য করেছে সে।
দীর্ঘসময় একনাগাড়ে সামনে দেখার পর এহতেশাম চোখ সরিয়ে নিলো।একটু গা ঝাড়া দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে সে বড় বড় পায়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।কর্ণেল ইফতেখার গনির সাথে তার একটা বিষয় নিয়ে কথা ছিলো।ফোন দিবে দিবে করেও আর দেওয়া হয়নি।আজ ফোন দিলে ব্যাপারটা মন্দ হয় না।
****
নিরুপমা বলল,’তোর সংসার কেমন চলে অরু?’
অরু মুখ শুকিয়ে উত্তর দেয়,’আমার তো কোনো সংসারই নেই আপা।চলবে কেমন করে?’
নিরুপমা ভড়কে গিয়ে বলল,’মানে?’
‘মানে ঐ লোক ঘরেই থাকে না।’
‘বলিস কি?সারাদিন বাইরে বাইরে?’
‘হু।আজও সে বাড়ি নেই।বেড়িয়ে গেছে সকাল সকাল।’
নিরুপমা বিড়বিড় করল,’ওহহ আচ্ছা।’
পরে আবার মাথা তুলে বলল,’কোনো কথা হয় না তোদের?’
অরু পা দুলিয়ে উত্তর দেয়,’না।’
‘কোনো স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই তোদের মধ্যে?’
‘না।’
‘অদ্ভুত! তবে এতো মরিয়া হয়ে বিয়ে করলো কেন?’
‘কে জানে?’
‘তুই খুশি অরু?’
অরুনিমা খানিকটা ভাবলো।মাথা চুলকে বিভ্রান্তি জড়ানো গলায় বলল,’ভালোই।ঐ বুড়িটা যতো সমস্যার গোড়া।নয়তো সব ভালোই।’
নিরুপমা খানিকটক ধমকের সুরে বলল,’এভাবে বলতে নেই অরু।বয়স বাড়লে মানুষ একটু এমন কাঠখোট্টা প্রকৃতির হয়ে যায়।মনে কষ্ট নিস না।ভালোভাবে কথা বলিস।দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।’
অরু মুখ বাঁকা করে বলল,’আমার কোনো ইচ্ছে নেই ঐ বুড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো করার।যেভাবে আছি ঐভাবেই ভালো আছি।’
নিরু আর কিছু বলতে পারলো না।নিচ থেকে খাওয়ার জন্য ডাকছে।সে বসে আছে অরুর ঘরে।তুতুন তার দৃষ্টিসীমার বাইরে।এই বাড়িতে এলে সে হৃদি আর সৃজনীর কাছেই বেশি থাকে।
নিরুপমা আর অরুনিমা দু’জন একসাথেই নিচে এলো।জাহানারা তাকে দেখতেই নাক ছিটকে নিলেন।নিরু সেই দৃষ্টি গ্রাহ্য করলো না।কেবল সবচেয়ে কোণার দিকে থাকা চেয়ারটা টেনে বসলো।
এহতেশাম খাওয়ার ফাঁকে একবার চোখ তুলল।তারপর আবার সেকেন্ডের ব্যবধানে চোখ নামিয়ে নিল।তার কেমন অশান্তি লাগছে।এই অশান্তির কারণ সে বোঝে।বোঝে বলেই অশান্তি আরো বাড়ছে।
হুমায়রা বললেন,’আমাদের অভি কোথায়?এখনো আসছে না কেন?’
হাশিম খেতে খেতেই জবাব দেয়,’ভাইজান আজ ঘুড়ি উড়াবে।সারাদিন জগলুদের পাড়াতেই থাকবে।রাতে আসলেও আসতে পারে।’
‘এ কেমন কথা?বিয়ে করেছে।বাড়িতে বউ আছে।আর সে এমন বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়াবে?’
হুমায়রার কন্ঠে বিরক্তি।জাহানারা বললেন,’পোলা মানুষ।সংসারে আটকানের লেগ্গা তো ঐরকম বউ লাগে।আমগো অভি দাদুভাইয়ের তো কপাল পোড়া।বউ ওমন যত্ন করলে তো আর বাইরে বাইরে ঘুইরা বেড়াইতো না।’
মনোয়ারা কিছুটা অপমানিত বোধ করলেন।অরুনিমা কটমট করে একবার জাহানারার মুখ দেখে মাথা নামিয়ে নিল।মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে জবাব দিলো,’ঐ বদমাইশের আমি কি যত্ন করবো?কপাল তো আমার পোড়া যে দেশে এতো ছেলে থাকতে আমার বিয়ে ঐ বনমানুষের মতো চেহারার লোকের সাথে হয়েছে।বাপরে বাপ!কি ভয়ংকর দেখতে!’
নিরুর কাছাকাছি পানির জগ রাখা ছিলো।হুমায়রা বললেন,’নিরুপমা! আমাকে একটু পানি দাও তো।’
নিরুপমা স্মিত হেসে একটা গ্লাসে পানি ঢেলে তার দিকে এগিয়ে দিলো।জাহানারা বেগমের দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই তিনি নাক ছেটকালেন।মুখ কুঁচকে বললেন,’আমি এই পানি খামু না।তুমি জগটা আমার দিকে আগায় দেও।’
নিরুপমা ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকায়।বহু কষ্টে আবেগ নিয়ন্ত্রন করে সবটা হজম করে নেয়।তারপর পিতলের জগটা কাঁপা হাতে জাহানারার দিকে বাড়িয়ে দেয়।সেই কাঁপা হাতের দিকে কারো চোখ পড়লো না।কেবল মেজর এহতেশাম তার সবটুকু মনোযোগ সেই কম্পমান হাতের দিকে ঢেলে দিলেন।মানুষের হাত তিন কারণে কাঁপতে পারে।
-অতিরিক্ত ঠান্ডায়
-অসম্ভব রাগে
-অসম্ভব কষ্টে
নিরুপমা নিঃসন্দেহে তিন নম্বর কারণের স্বীকার।সে গলা খাঁকারি দিলো।দৃঢ় স্বরে বলল,’মিস নিরুপমা! আমাকে কষ্ট করে এক গ্লাস পানি দিন।’
নিরুপমা নড়েচড়ে উঠলো।দ্রুত মাথা নেড়ে এক গ্লাস পানি তার সম্মুখে বাড়িয়ে দিলো।এহতেশামের মন চায় একদফা সেই রুগ্ন হাত খানা ছুয়ে দিতে।পরমুহূর্তেই আবার নিজের সীমা সম্পর্কে সচেতন হয়ে সে তার ইচ্ছা গুলোর জলাঞ্জলি দেয়।
কোনোরকমে গ্লাস টা হাতে নিয়েই সে গাঢ় স্বরে বলল,’ধন্যবাদ নি রু প মা।’
নিরুপমা আহাম্মকের মতো সেই সম্বোধন শুনে।লোকটা এমন অদ্ভুত করে তার নাম উচ্চারণ করে কেন?শুনতে কেমন আজব লাগে।
***
খাবার শেষে সবাই আবার বাগানে গিয়ে কতোক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল।নিরুপমাদের যাওয়ার সময় হয়েছে।তুতুন সবার থেকে বিদায় নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ালো।নিরু মিষ্টি করে হেসে বলল,’কি বাবা?কেমন লেগেছে?’
সে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে সব দাঁত দেখিয়ে বলল,’খুব ভালু লেগেছে মা।’
নিরুপমা হাসলো।সৃজনী বলল,’সামনের সপ্তাহে আবার আসবে কিন্তু তুতুন।’
তুতুন মাথা নাড়ে।একবার মায়ের দিকে তাকায়।ইশায়ার বোঝানোর চেষ্টা করে এসবে তার কোনো হাত নেই।সে যাবে নাকি যাবে না সব মা ই ঠিক করবে।
****
বাগানের এক মাথায় কাঠ গোলাপের গাছ।সেখান থেকে দু’টো কাঠ গোলাপ মাটিতে ঝরে পড়লো।অরুনিমা সেই দৃশ্য দেখতেই বড় বড় পায়ে সেদিকে ছুটে গেল।কাঠগোলাপ দু’টো হাতের মুঠোয় পুরে সে গেইটের দিকে আরেক দফা ছুট লাগায়।
‘আপা! নিরু আপা।’
নিরুপমা থামলো।উদ্বিগ্ন হয়ে পেছন ফিরল।অরু ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,’একটু দাঁড়াও আপা।’
নিরু ব্যস্ত হয়ে তার কাঁধে হাত রাখে।বিচলিত কন্ঠে বলে,’কি হয়েছে তোর?সব ঠিক আছে অরু?’
অরুনিমা ধাতস্থ হলো।তারপরই হাতের মুঠোয় থাকা কাঠগোলাপ দু’টো নিরুপমার বেণীর ভাঁজে গুজে দিলো।নিরু ঘটনার আকস্মিকতায় কেবল তব্দা খেয়ে তাকিয়ে রইল।
অরু গাল ভর্তি হেসে বলল,’তোমার জন্য দুই দুইটা কাঠগোলাপ আপা।’
হৃদি জানতে চাইলো,’কাঠ গোলাপ তোমার এতো ভালো লাগে?’
অরু মুখের হাসি ধরে রেখেই জবাব দেয়,’উহু আমার না।কাঠগোলাপ আপার প্রিয় ফুল।’
নিরুপমা চোরা চোখে একবার মায়ের দিকে তাকায়।মনোয়ারার মুখ থমথমে।নিরু আঁচল দিয়ে ফুলগুলো ঢেকে নিচু গলায় বলল,’তুই এতো হম্বিতম্বি করিস কেন অরু?পছন্দ করি বলে কি যেখানে সেখানে চুলে ফুল গুজে দিবি?’
সে তার শাড়ির আঁচল টা ঘুরিয়ে এনে অন্য কাঁধের উপর রাখল।তার আবৃত করে রাখা শরীরটা আঁচল দিয়ে পেঁচিয়ে ধরার পর আরো বেশি ঢাকা পড়ে গেল।কেবল গলায় থাকা চিকন চেইনটা তখনও কিছুটা দৃশ্যমান।মেজরের বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনো তার সমস্ত মুখমণ্ডলের উপর নিবদ্ধ।
নিরুদের সিএনজি ভট ভট শব্দ করে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।অথচ বাড়ির বিশালার অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষালি অবয়ব টি বিন্দু পরিমান নড়লো না।তার চোখের সামনে সে ঘোর অমানিশা দেখতে পাচ্ছে,অনুভব করছে এই অমানিশায় ডুব দিতে সে ভীষণ মরিয়া।
চলবে-