#কৃষ্ণপক্ষের_অন্তিম_প্রহর
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
৯.
হামাদ শিকদার ওরফে অভি সেদিন বাড়ি ফিরলো বেশ রাত করে।বিনু দাদার চায়ের দোকানে আজ সে দুই কাপ চা আর তিনটে সিগারেট খেয়েছে।জগলুর বাড়ির ছাদে সারা বিকেল ঘুড়ি উড়িয়েছিলো।তার এক ঘুড়ি দিয়ে সে ছয়টা ঘুড়ি কেটেছে।পরে অবশ্য নিজেও কাটা পড়েছে।তবে কাটা পড়ার আগে ছয় ছয়টে ঘুড়ি কাটা কি চাট্টে খানি ব্যাপার?
বাড়িতে এসেই সে কপাল কুঁচকায়।বাড়ির সব বাতি এমন জ্বালিয়ে রেখেছে কে?তার আবছা আলো ভালো লাগে।এমন ঝলমলে আলো তে তার চোখ ব্যাথা করে।সে পকেট হাতড়ে ফোন বের করল।চার্জ শেষ,অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
বাড়িতে পা রাখতেই সবার প্রথমে হুমায়রা তাকে দেখলেন।দেখা মাত্র উঁচু গলায় ডাকলেন,’অভি! এ্যাই অভি।কোথায় ছিলি তুই এতোক্ষণ?’
সে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলো না।উল্টো দুই চোখ সরু করে বলল,’তোমরা কখন এলে?’
হুমায়রা এগিয়ে আসলেন।কোমরে হাত রেখে বললেন,’অনেক সকালে এসেছি।তুই কোথায় ছিলি?পুরো দিনে একবারও বাড়ি আসার কথা মনে পড়েনি?’
অভি তার কথা শুনলো।তারপর কোনো উত্তর না দিয়েই তাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করলো।হুমায়রা দ্রুত তার কাঁধ চেপে ধরলেন।কড়া গলায় বললেন,’এগুলো কেমন কথা অভি?কথা কি কানে যায় না?এতো লাপরোয়া কেন তুই?’
অভি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।সামনে হেঁটে যেতে যেতে দায়সারা ভঙ্গিতে বলল,’আমি এমনই।’
হুমায়রা পেছন থেকে বললেন,’সামির সৃজনী তিয়াশা তুরান সবাই এসেছে।ছাদে আছে তারা।’
অভি একদফা হাসলো।ঠেস মেরে বলল,’আরেকজনের নাম বাদ দিলে কেন?সেও নিশ্চয়ই এসেছে।’
হুমায়রা থতমত খেয়ে বললেন,’ঐ আরকি।জোর করেছি আমরা সবাই মিলে।তাই সে এসেছে।’
‘ভালো,খুব ভালো।’
সুঠামদেহী মানব টি সামনে এগিয়ে যায়।হুমায়রা আবার নিজ থেকে ডাকলেন,’অভি!’
সে বিরক্ত হয়ে বলল,’কি?’
‘একবার উপরে যা না।একটু সবার সাথে বসে কথা বল।এহতেশাম তো একা সেখানে নেই।তুই বাকিদের সাথে কথা বলিস।’
অভি পেছন ফিরল।পকেটে হাত গুজে তাচ্ছিল্য করে বলল,’না।তার সাথে বসে কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে।সে বড়ো ক্ষমতাধর মানুষ।তার সাথে আমার যায় না কিছুতেই।’
‘তার সাথে কথা বলতে হবে না।বাকিদের সাথে বল।’
‘থাক।ইচ্ছে নেই আমার।’
অভি বাইকের রিং তর্জনী আঙুলের সাহায্যে ঘোরাতে ঘোরাতে সিঁড়ি দিয়ে দোতালা পর্যন্ত উঠে এলো।ফুফুমনি মনে কষ্ট পেয়েছে বোধ হয়।যাক গে,তার কিছু যায় আসে না এসবে।সবকিছুতে তাকে ডাকার কোনো মানে নেই।সবাই আর তার মাঝে পার্থক্য আছে।অভি সেই পার্থক্য ভুলে না কখনও।
ছাদের পাশে একটা চিলেকোঠার ঘর আছে।অভি নিঃশব্দে সেই ঘরে গিয়ে বসলো।সেখানে একটা খুপরি আকৃতির জানালা আছে।সেই জানালায় ছাদের অর্ধেকটা দেখা যায়।
অভি পকেট থেকে সিগারেট বের করল।লাইটার দিয়ে সেটা জ্বালানোর পরেই সে বড়ো করে একটা টান দিলো,তারপর জানালা গলিয়ে একবার বাইরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করলো।
ছাদের একেবারে মাঝামাঝি সবাই গোল হয়ে বসেছে।উপরে এক ফালি চিকন চাঁদ।চাঁদের নিচে ভাই বোনদের প্রাণখোলা আড্ডা।এহতেশাম অবশ্য মাটিতে বসে নি।সে একটা টুলে বসেছে।অভি সিগারেট টা মুখ থেকে বের করে সারামুখে ধোঁয়া ছাড়লো।তার দৃষ্টি গিয়ে আটকেছে অন্য জায়গায়।
অরুনিমা ছাদের এক মাথায় দাঁড়িয়ে আছে।তার হাতে একটা ট্রে।অভি সবার হাতের দিকে চোখ দেয়।সবার হাতে একটা চায়ের কাপ।সবার জন্য চা এনেছে অরুনিমা,তার বউ।
তার রাগ হলো হঠাৎ।রাগের কারন সে জানে না।শুধু এইটুক জানে এই দৃশ্য টা তার ভালো লাগছে না।অরুনিমা কেন চা নিয়ে যাবে?বাড়িতে কি চাকরের অভাব নাকি?আচ্ছা চা না হয় নিয়ে গেছে।কিন্তু এমন এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে কেন সে?হয় সবার সাথে গিয়ে বসুক।নয়তো ছাদ থেকে নেমে আসুক।এমন কোণঠাসা হয়ে আছে কেন?কোণঠাসা জিনিসটা হামাদ শিকদারের সবচেয়ে অপছন্দ।হয় সে সবার মাঝে থেকে রাজার মতো চলবে,নয়তো সে সবার থেকে আলাদা হয়ে রাজার মতো চলবে।কিন্তু পার্শ্ব চরিত্র হয়ে অভি চলতে পারবে না।
তার আজ ছাদে না যাওয়ার প্রধান কারণ এটাই।আজ অনেকদিন পর এহতেশাম বাড়ি এসেছে।আজ সবার আলোচনার মধ্যমণি সে।সুতরাং এমন জায়গায় অভির যাওয়ার কোনো মানেই নেই।এহতেশামের গুণগান শুনতে সে ইচ্ছুক না।শুনলেই কান ব্যাথা করে।
সে পুরোটা সিগারেট শেষ করে নিচে নেমে এলো।রাহেলা একটা বাটিতে বুট,পেয়াজু আর চপ নিয়ে ছাদের দিকেই যাচ্ছিলো।অভি তাকে দেখেই গলা খাকারি দিয়ে বলল,’ছাদে যাচ্ছেন আপনি?’
রাহেলা ঢোক গিলে বলল,’জ্বী বড় সাহেব।’
তার চোখে মুখে আতঙ্ক।এই দাড়ি গোঁফ আর ঝাকরা চুল ভর্তি মুখটা দেখলেই তার মুখ শুকিয়ে যায়।আর কন্ঠ শুনলে তো মনে হয় দম টা সেখানেই আটকে গেছে।
অভি বাটিতে থাকা খাবার গুলো এক নজর দেখে সামনে হেঁটে যেতে যেতে বলল,’অরুনিমাকে বলবে খাওয়া শেষে আমার ঘরে আসতে।তার সাথে আমার কথা আছে।’
রাহেলা জোরে জোরে মাথা নেড়ে চলে গেল।বড় সাহেবের বউয়ের জন্য তার বড্ড মায়া হয়।মেয়েটা কতো মিষ্টি দেখতে! একেবারে মাসুম একটা চেহারা।আর তার বর হয়েছে আস্ত বদ লোক।পুরাই একটা মাস্তান।রাহেলা দ্রুত তওবা কাটে।আল্লাহ এমন গুন্ডা জামাই আর কাউকে না দেক।
***
‘নতুন বউ।বড় সাহেব আপনেরে তার ঘরে ডাকছেন।’
অরু মাত্রই পেয়াজু তে একটা কামড় বসিয়েছিল।রাহেলার কথা শুনতেই তার কাশি উঠে গেল।সে কাশতে কাশতেই বলল,’কি?কে ডেকেছে?’
‘বড় সাহেব।মানে অভি বাবু আরকি।’
অরুনিমা আর মুখের খাওয়া শেষ করতে পারল না।উল্টো হাতে থাকা পেয়াজুর অবশিষ্ট অংশও মাটিতে খসে পড়লো।তিয়াশা তার পিঠ ডলতে ডলতে বলল,’আহারে! করছো কি অরু! আস্তে খাও।গলায় আটকে যাবে খাবার।’
অরু গোল গোল চোখে আবার রাহেলার দিকে তাকায়।ঐ বাঁদর বাঁদরামি শেষে বাড়ি ফিরেছে তার মানে।বাড়ি ফিরেছে ভালো কথা,অরুনিমাকে ডাকছে কেন?সে গিয়ে কি করবে?সে তো তার কাছে যেতে চায় না।
সামির বলল,’যাও গিয়ে শুনে আসো ভাইজান কেন তোমায় ডাকছে।আর যদি পারো,তাহলে তাকে সহ নিয়ে এসো এখানে।’
অরুর কানে সেসবের কিছু গেল না।সে তার নিজের চিন্তায় মশগুল।হামাদ কি কারণে তাকে ডাকতে পারে এটা ভাবতে ভাবতে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে চিন্তায়।অরু মলিন মুখে এখানে সেখানে তাকায়।কপালে তার কি আছে আল্লাহই ভালো জানে।
***
“লা ইলাহা ইল্লা আংতা, সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।’
লা ইলাহা ইল্লা আংতা, সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।’
লা ইলাহা ইল্লা আংতা, সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।”
……………………………………..
……………………………………..
চল্লিশ বার।ছাদ থেকে নেমে অভির দরজা পর্যন্ত আসতে আসতে অরুনিমা মোট চল্লিশ বার দোয়া ইউনুস পড়লো।এই দোয়া পড়ে যদি মাছের পেট থেকে উদ্ধার হওয়া যায়,তাহলে হামাদ শিকদারের ডেরা থেকেও নিশ্চয়ই উদ্ধার হওয়া যাবে।
দরজার সামনে এসেই সে বড়ো করে শ্বাস নেয়।মনে হচ্ছে সে কোনো মুরগির বাচ্চা।আর ঐ ঘরটা একটা বাঘের গুহা।সে কিভাবে ঐ জায়গা থেকে অক্ষত ফিরে আসবে?তার তো মাথায় আসে না।
অরু আস্তে করে দরজায় টোকা দেয়।মিনমিনে স্বরে বলে,’আসি?’
বলতে গিয়ে সে টের পেল নিজের কথা সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে না।সে আরেকটু উঁচু স্বরে বলার চেষ্টা করলো,’আসি?’
এবার একটুখানি আওয়াজ বের হলো।অথচ ভেতর থেকে কোনো জবাব এলো না।সে কাঁপা হাতে দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দেয়।
ঘরের ভেতর একটা খুবই লো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে।সেই বাল্বের আলো অন্ধকার কমায়নি।উল্টো ঘরের আবছা ভাবটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
অরুনিমা সেই আবছা আলোতেই দেখলো অভি টানটান হয়ে খাটের উপর শুয়ে আছে।সে একটা ঢোক গিলে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল।শেষবারের মতো দোয়া ইউনুস পাঠ করে সে গায়ে ফু দেয়।
অভির চোখ বন্ধ।দুই হাত স্থিরভাবে পেটের উপর রাখা।অরু পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে তার পাশাপাশি দাঁড়ায়।এই পুরোটা সময় লোকটা একটুও নড়লো না।অরুর খটকা লাগে।ম’রে টরে গেল নাকি?তার মন চাইলো একটা গুতা দিয়ে দেখতে।কিন্তু কি ভেবে সে আর শেষ পর্যন্ত কিছু করলো না।
সে সাইডবক্সের উপর হাত রেখে সামান্য ঝুকলো।গভীর মনোযোগ দিয়ে তার মুখ দেখার চেষ্টা করল।ঝুকতে ঝুকতে সে বেশ খানিকটা নিচু হলো।অভি আর তার দুরত্ব তখন একহাতের মতো।
আচমকাই কুপি বাতির শিখার মতো দ্বপ করে অভি দুই চোখ খুললো।অরু হকচকিয়ে উঠে মাটিতে গিয়ে আছড়ে পড়লো।বুকে হাত রেখে কেবল বড় বড় চোখে তার দিকে তাকালো।এভাবে কেউ চোখ মেলে?আরেকটু হলে অরুর দম বন্ধ হয়ে যেতো।সে বুকে হাত চেপে একটু মালিশ করলো।বিড়বিড় করে নিজেকে সাহস দিলো,’কিছু হয় নি অরু।সব ঠিকই আছে।’
অভি বাঁকা চোখে তার দিকে তাকালো।জলদগম্ভীর স্বরে বলল,’সমস্যা কি তোমার?এমন মুখের উপর এসে পড়ছিলে কেন?’
অরুনিমা উত্তর দিলো না।অভি ঘাড় মালিশ করতে করতে উঠে বসলো।গম্ভীর গলায় বলল,’দরজা বন্ধ করে এসো।’
অরুর অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল।সে ফ্যাকাশে মুখে বলল,’কি?কি করব?’
আবারো ভারি স্বরে উত্তর এলো,’দরজা বন্ধ করে এসো।’
অরু মনে মনে আরো কয়েক দফা দুরুদ পড়লো।এই বিপদ থেকে সে বাঁচবে কিভাবে?কোনোরকমে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সে ভঙ্গুর পায়ে দরজা পর্যন্ত গেল।কাঁপা হাতে দরজা বন্ধ করে সে অভির দিকে ফিরল।অভি বলল,’সামনা সামনি এসে বসো।’
ভীষণ কাটকাট স্বর।অরুনিমা ঢোক দিলে ধীর পায়ে তার সামনে যায়।অভি চোখ তুলে বলল,’হাশিমের মায়ের নাম কি?’
অরু ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।বলল,’কি?’
‘হাশিম।আমার ভাই।তার মায়ের নাম কি?’
অরু হতবুদ্ধি হয়ে উত্তর দেয়,’রিজোয়ানা।’
‘গুড।এবার বলো সৃজনী আর সামিরের মায়ের নাম কি?’
অরু বোকা বোকা স্বরে জবাব দিলো,’হাফসা।’
‘আচ্ছা।আর তিয়াশা তুরানের মায়ের নাম?’
অরুর মাথায় সব ঘুরপাক খায়।সে চুপচাপ উত্তর দেয়,’হুমায়রা।’
অভি মন দিয়ে তার কথা শুনলো।তারপর খাটের সাথে হেলান দিয়ে বলল,’এহতেশামের মায়ের নাম কি?’
অরুনিমা চট করে উত্তর দিলো,’হাবিবা।’
উত্তর দিয়েই সে দাঁত কেলিয়ে হাসলো।এক আঙুল উপরে তুলে খুশি খুশি মেজাজে বলল,’তুমি কি ভেবেছো?আমি তাকে দেখিনি।তাই বলে তার নাম জানবো না?সব জানি আমি।’
বলেই সে আরেক দফা গর্ব করে হাসলো।অভি সূচালো চোখে তাকে একনজর দেখে নিল।তারপর গুরুগম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,’আর আমার মায়ের নাম কি?’
অরু ভড়কে গেল।তাজ্জব হয়ে বলল ‘কি?’
অভির চোয়াল শক্ত হলো।থমথমে মুখে সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,’সবার নাম তো জানো।এবার বলো আমার মায়ের নাম কি?’
অরুনিমা করুণ চোখে তার দিকে তাকালো।তার মায়ের নাম সে জানে না।যে মানুষ বেঁচে নেই তার কথা অরু জানবে কেমন করে?’
‘কি হলো?বলো আমার মায়ের নাম কি?’
অরুনিমা সম্বিৎ ফিরে পেল।দ্রুত মাথা নামিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,’আমি জানি না।’
অভির মেজাজ গরম হলো।সে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,’জানো না মানে?দুনিয়ার সবার নাম জানো,যাকে দেখোনি তার নামও জানো।আর যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার মায়ের নাম জানো না?’
অরুনিমা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে বলল,’তাহলে তুমি বলো আমার মায়ের নাম কি?’
এই প্রথম অভি তব্দা খেল।আহাম্মকের মতো মুখ করে বলল,’কি?’
অরু হাসি চেপে বলল,’তোমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে,তার মায়ের নাম তুমি জানো না?’
অভি কতোক্ষণ ভ্যাবলার মতো তার দিকে তাকিয়ে রইল।শেষে গমগমে স্বরে বলল,’ফালতু কথা কম বলো।’
অরুনিমার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।সে লটকানো মুখে খাটের এক কোণায় এসে বসলো।একটু আগে যেই একটা ভয় হচ্ছিল,সেটা এখন কমে গেছে।
অভি গলা খাকারি দিয়ে বলল,’আমার মায়ের নাম রেখা।আর বাবার নাম হাতেম।মনে থাকবে?’
অরু উপরনিচ মাথা নেড়ে জানান দিলো তার মনে থাকবে।অভি কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষে ধমকে উঠে বলল,’এবার বলো আমার বাবা-মার নাম কি?’
অরু চমকে উঠল।উপরনিচ মাথা নেড়ে বলল,’রেখা।’
‘আর বাবা?’
অরু মিন মিন করল,’হাতেম তাই।’
‘তাই টা আবার কোথা থেকে এলো?’
অভি কটমট চোখে তার দিকে তাকায়।অরু ঠোঁট চেপে বলল,’হাতেম নামটা একা একা শুনতে ভালো লাগে না।তাই সাথে তাই যোগ করেছি।’
অভি কিছুক্ষণ মৌন থেকে শেষে চাপা কন্ঠে বলল,’তোমার মাথায় সমস্যা আছে।’
আচমকাই তার চোখ গেল অরুনিমার হাতে।সেদিকে দেখতেই সে খপ করে তার একহাতের কবজি চেপে ধরল।অরু ধড়ফড়িয়ে উঠে তার দিকে তাকায়।তার অবাক চোখ জোড়া সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অভি বলল,’তোমার হাতের এই বালা দু’টো কার?’
অরু জবাব দেয় না।কেবল ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অভির দিকে চেয়ে থাকে।অভি হাস্কি গলায় বলল,’এটা আমার মায়ের বালা।তুমি পরেছো কেন?’
এবার একটু উত্তর দিলো অরু।বলল,’রিজোয়ানা চাচি দিয়েছে।’
‘আমার মায়ের বালা রিজোয়ানা দেওয়ার কে?’
তার কন্ঠস্বর হঠাৎই একটু বেড়ে গেল।অরু ভয়ার্ত চোখে কেবল তার মতিগতি দেখে।অভি এক টানে তার দুই হাত থেকে বালা দু’টো খুলে নেয়।খুলে সেটা খুব যত্ন করে শার্টের সাথে মোছে।শেষে আবার হাত বাড়িয়ে বলে,’দাও,তোমার হাত দেও।’
অরুনিমার মনে হলো তার সামনে বসে থাকা লোকটা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ না।তাদের পাড়ার নিমাই পাগলের কিছু বৈশিষ্ট্য এই লোকের ভেতর বিদ্যমান।সে দুরু দুরু বুকে একটা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিলো।অভি সেই হাত খুব যত্ন করে ধরল।যতখানি যত্নে অরুনিমার চোখে বিস্ময়ভাব খেলা করে,ঠিক অতোখানি যত্নে।তারপর দু’টো বালা অতি সন্তর্পণে অরুর হাতে পরিয়ে দিলো।এরপর তার হাত ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,’আমার মায়ের বালা শুধু আমিই আরেকজন কে দিতে পারি।রিজোয়ানা না।’
অরুর দুই চোখের আশ্চর্য ভাব তখনও বিরাজমান।সে আস্তে করে নিজের হাত গুটিয়ে নিল।অভি পুনরায় খাটে হেলান দিয়ে বলল,’এহতেশাম কে তোমার কেমন লাগে অরুনিমা?’
অরু খানিকটা চমকায়।প্রশ্ন বুঝতেই তার মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।সেই হাসি হামাদ শিকদারের নজর এড়ায়নি।অরু গালভর্তি হেসে বলল,’এহতেশাম ভাইজানকে আমার খুব ভালো লাগে।তোমার সবগুলো ভাইয়ের মধ্যে এহতেশাম ভাইজানই সেরা।’
অভির মুখ থমথমে।উত্তর শোনার পর চোখ মুখ শক্ত হতে বেশি একটা সময় লাগলো না।সে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত ঘঁষে বলল,’কতটুকু চেনো তুমি এহতেশাম কে?’
অরুনিমা গোল গোল চোখ করে সেদিকে তাকায়।এহতেশামের সাথে অভির সম্পর্ক নিয়ে তার আগে থেকে কিছু জানা ছিলো না।তবে তার ধারণা ছিল এহতেশাম ভাইজানের মতো লোককে কেউ অপছন্দ করতেই পারে না।
অভি আচানক খেকিয়ে উঠল,’সে কেমন লোক একটু শুনি?’
অরুনিমা একহাতে মুখ চেপে ধরে দুই দিকে মাথা নাড়ল।তাড়াহুড়ো করে বলল,’না না।এমন কিছু না। আমি তার ব্যাপারে কিছু জানি না।’
অভি আর তাকে ঘাটালো না।কেবল মেঘের মতোন গমগম করা স্বরে সাবধানী বাণী ছুড়ল,’এহতেশাম থেকে দূরে দূরে থাকবে।তাকে আমার অসহ্য লাগে।’
অরু বিড়বিড় করল,’ভালো মানুষ তো তোর এমনিতেও ভালো লাগবে না।’
‘এই তুমি কি বললে?’.
অরু জিভ কাটলো।কাচুমাচু হয়ে বলল,’না তো।কিছু বলিনি তো।’
অভি কথা না বাড়িয়ে বলল,’আচ্ছা।এখন সামনে থেকে সরো।’
অরুনিমা প্রাণ ফিরে পেল।সরতে বলার সাথে সাথে সে লাফিয়ে লাফিয়ে বারান্দায় চলে গেল।তারপর এক পলক নিজের হাতের দিকে দেখল।এই লোক কি পাগল নাকি?কি ভয়ংকর চাহনি! কি মোটা কন্ঠ! কেমন গায়ে কাঁটা দেওয়া চেহারা!
অভি খাট থেকে নামলো।নেমে আলমারির কাছে গিয়ে কপাট খুলল।আলমারিতে বেশ কিছু সুতির শাড়ি ছিলো।সে সেগুলো বের করে খাটের উপর এনে ফেলল।
শাড়িগুলো খাটের উপর বিছিয়ে সে নরম হাতে সেগুলোতে হাত ছোঁয়ায়।তারপর একটা শাড়ি হাতে নিয়ে টেনে টেনে ঘ্রাণ নেয়।অরু বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখে।দেখামাত্রই সে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো।কপাল চাপড়ে বলল,’অরু রে! বাড়ি গাড়ির লোভ দেখিয়ে তোর কপালে একটা বদ্ধ উন্মাদ জুটিয়ে দিয়েছে।নিমাই তো অর্ধেক পাগল ছিলো।এ তো পুরাই পাগল।’
চলবে-