#কোন_কাননে_ফুটিবে_ফুল🌸
#Part_19
#Writer_NOVA
‘শুভ ভাই, দাঁড়াও।’
‘কিছু কবি?’
ফুল হাত দিয়ে থামতে বললো। এতটুকু জায়গা দৌড়ে এসে সে হায়রান হয়ে গেছে। অনেকটা হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপাচ্ছে। শ্বাসের তালে তালে শরীর দুলছে। শুভ সন্দিহান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘যা কওয়ার জলদী ক। আমার কাম আছে।’
ফুল একটা গেরুয়া রঙের খাম সামনে বাড়িয়ে দিয়ে আকুতি ভরা কন্ঠে বললো,
‘এটা একটু ডাকবাক্সে ফেলে দিতে পারবে?’
‘কার চিঠি এইডা?’
‘আমার।’
সরু চোখে ভ্রু নাচিয়ে শুভ জিজ্ঞেস করলো,
‘কোন নাগররে লিখছোত।’
‘ছি! মুখের ভাষার কি ছিরি।’
‘হাচা কতা হুনতে তিতাই লাগে।’
‘আসছে আমার সত্যবাদীর মূর্ত প্রতীক। তা সত্যবাদী মানুষ বলেন তো গতকাল কয়টা সিগারেট ফুঁকেছেন।’
শুভ বিষম খেলো। এভাবে যে তাকে প্যাচে ফেলে দিবে ফুল তা সে বুঝতে পারেনি৷ করুন চোখে ফুলের দিকে তাকাতেই ফুল ভাব নিয়ে বললো,
‘বলেন, বলেন।’
শুভ ধমকে উঠলো। এই ধমকই তার এখন সম্বল।
‘বেশি ক্যাচক্যাচ করিস না। যা কইতে আইছোত তা ক। নইলে আমি গেলাম।’
শুভ পিছন দিকে ঘুরতে নিলেই ফুল ওর হাত ধরে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কৌতুকের সুরে বললো,
‘এখন পালাচ্ছো কেনো ছোট সর্দার? সত্যি বলার সাহস নেই তো। আমি জানতাম নেই। থাকবেও না। তুমি ঐ ধমকি-ধামকি দিতে পারবে। নিজের বেলায় ঠনঠনা ঠন ঘন্টা।’
‘শুভ কাউরে ডরায় না।’
ফুল তাচ্ছিল্যের গলায় বললো,
‘হাহ, তাতো দেখতেই পেলাম।’
‘বেশি খাই নাই। ছোট এক প্যাকেট শেষ করছিলাম।’
‘এক প্যাকেটে কয়টা থাকে?’
‘বারোডা।’
ফুল চোখ গোল গোল করে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
‘বারোটা! আবার বলছে বেশি খায়নি। তোমাকে এখন আমার নানীর মতো করে বকতে ইচ্ছে করছে।’
‘বকতে থাক, মানা করলো কে?’
‘ওরে গোলামের পুত! ঠিকমতো দুই বেলাভাত খাও না। তুমি সিগারেট মা’রাও।’
শুভ চোখ রাঙিয়ে বললো,
‘কি কইলি?’
ফুল ব্যাঙের মতো লাফ দিয়ে দুই কদম পিছিয়ে বললো,
‘আরে আরে রাগো কেন? আমি আমার নানীর মতো করে তোমাকে বকলাম।’
‘বেশি কথা শিইখা গেছোত।’
ফুল দাত কেলালো। শুভ আড়চোখে তাকিয়ে ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। অন্য কেউ হলে সত্যি এতক্ষণে বা হাত দিয়ে তিনশো ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে একটা চটকনা মা’রতো। শুধু ফুল বলে রক্ষা। এই মেয়েটার কাছে শুভ যেনো একটা মাটির পুতুল। যেমন আদল দিবে তেমনি থাকবে। যেখানে কোন কঠিন আস্তর নেই। ফুলের কাছে এলেই শুভ নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। শুভর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে ফুল হাসফাস আরম্ভ করলো। এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি লাগে। মৃদুস্বরে ডাকলো,
‘শুভ ভাই!’
‘হু!’
‘আমার চিঠিটা।’
‘দে।’
‘মনে করে ডাকবাক্সে ফেলে দিও।’
‘ফালামু না। আমার কাছে রাইখা দিমু। কিছু করতে পারবি তুই?’
‘তুমিও না! আস্ত একটা পাগল।’
সোহেলী বেগম ডাকতেই ফুল সেদিকে দৌড়ালো। শুভ কিছু সময় আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ফুল তাকে কি বললো, পাগল। হ্যাঁ, সে তো আসলেই পাগল। কাননের সবচেয়ে দামী ফুলের পাগল মালি।
মনোয়ার সর্দার দুই ভাইকে একসাথে দেখে শুকনো ঢোক গিললেন। কলি বেগমকে তাড়া দিয়ে বললো,
‘নাস্তা-পানির ব্যবস্থা করো।’
আমিন চেয়ার টেনে বসতে বসতে চাপা হুংকার দিয়ে বললো,
‘নাস্তা-পানির কোন দরকার নাই শাশুড়ী আম্মা। চুপচাপ এইহানে বহেন।’
মারুফ ছোট ভাইয়ের পাশাপাশি কাঠের চেয়ারে বসলো। আশেপাশে নজর দিতেই দেখলো দুই জোড়া পা দরজার আড়ালে চলে গেলো। একটার ছিলো পাপড়ি, আরোকটা বৃন্ত।
‘ছোট বুবু, ওরা কেডায়?’
বৃন্তের মুখ চেপে ধরে হিসহিসিয়ে পাপড়ি বললো,
‘চুপ কথা বলিস না। ওরা রাক্ষস। আমাদের কথা শুনলে হামলে পরবে।’
‘রূপকথার রাক্ষস?’
‘হ্যাঁ, কথা বলিস না ভাই। এতে বিপদে পরবো আমরা।’
বৃন্ত চুপ হয়ে গেলো। পাপড়ি এবার আর দরজা দিয়ে উঁকি দিলো না। টিনের ফুটো দিয়ে ভেতরের দিকে নজর দিতে লাগলো।
‘বাবা, হঠাৎ তোমরা কি মনে করে আসলে?’
মারুফ হাত দুটো উপরে উঠিয়ে হাই তুলতে তুলতে বললো,
‘কেন আইছি তা আপনে ভালো কইরাই জানেন। ভং ধইরেন না। আমি সোজা মানুষ। বেশি কথা পছন্দ করি না। যা কই সামনাসামনি কই। আমগো বংশ মর্যাদার কথা আপনেগো কইতে হইবো না। বহুত বছর ধইরা আমগো গেরামে আছেন। ভালো-মন্দ সব জানেন। দশ গেরাম খুঁজলে আমগো মতো বংশ পাইবেন না। আমার ভাই পোলা ভালা আছে। শুধু আমরা অশিক্ষিত। পড়াশোনা করতে আমগো ভালো লাগে না। এডা দোষের কিছু না। দোষ যদি ধরেন তো মুখের থিকা হাত বেশি চলে। ঐ একটু-আধটু কোপাকুপি, দা নিয়া মারামারি করি। এডা আমগো বংশ পরম্পরায়। লোকে আমগো বহুত সম্মান করে। আপনের বড় মাইয়াডা আমার ভাইয়ের বউ করলে অনেক সুখে থাকবো। আপনে তো বিষয়টা বুঝতাছেনই না। এমন পোলা লাখে একটা।’
মারুফ থামলো। কতশত বীরত্বের ঘটনা বলে সে হাঁপিয়ে গেছে। মুখে থাকা পানের চিপটি দূরে ছুঁড়ে মারলো। মনোয়ার সর্দার হাত মুঠ করে বিষয়টা হজম করে নিলেন। বেয়াদবদের আদবকায়দা শিখাতে যাওয়া পুকুরে জাহাজ চালানোর চেষ্টা করে একিরকম। দুটোই চরম বোকামী। আমিন এদিক সেদিক চোখ বুলিয়ে বললো,
‘আমার শালা-শালী দুইটারে দেখতাছি না। ওদের কি গায়েব কইরা দিছেন নাকি?’
আমিনের কথা শুনে আরেকটু জড়োসড়ো হয়ে বৃন্তকে নিজের দিকে চেপে ধরলো পাপড়ি। এদের থেকে শত হাত দূরে থাকতে বলে গেছে ফুল।
আমিন নাকের কাছটা চুলকে বললো,
‘দেখেন শ্বশুর আব্বা। হুদাই আমগো হয়রান কইরেন না। আপনের মাইয়া যেই জায়গায় আছে সেইখান থিকা আইনা চুপচাপ আমার হাতে তুইল্লা দেন। এতে আপনেরো মঙ্গল আমগোও। যদি আমগো হয়রান করান তাইলে মাইয়াও যাইবো। লগে আপনের মান-সম্মান। এহন কি করবেন তা আপনের হাতে। মাস আট অন্য জায়গায় গেছি ওমনি মাইয়া হাওয়া কইরা দিলেন? এডি কোন কথা? আমার বউডারে আমি এহন কই খুজমু?’
মনোয়ার সর্দার মাটির মেঝের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভালো-খারাপ কিছু বলছে না। কলি বেগম হাত জোর করে বললো,
‘বাবা, আমার মাইয়াডারে ছাইড়া দাও। ও তোমারে পছন্দ করে না। হুদাই কেন ওর পিছনে পইরা রইছো?’
মারুফ উঠে চেয়ারে লাথি মেরে হুংকার দিয়ে উঠলো। হুংকারে কেঁপে উঠলো কলি বেগম।
‘সোজা কথা কি বুঝেন না? আমার ভাই আপনের মাইয়ারে ভালবাসে। ওর লিগা আমার ভাই মরতে গেছিলো। ফুলরে ওর লাগবো মানে লাগবোই। ফুল শুধু আমিনের বউ হইবো। সাত দিনের টাইম দিলাম। এর মধ্যে ফুলরে না পাইলে আপনেগো আরেক মাইয়া আছে না কি জানি নাম আমিন?’
‘পাপড়ি!’
‘হো পাপড়ি। পাপড়িরে সারা জীবনের লিগা হারাইবেন। এহন কি করবেন তা আপনেরাই ভাবেন।’
মারুফ, আমিন হনহনিয়ে বের হয়ে গেলো। কলি বেগম স্বামীর হাঁটুর কাছে আছড়ে পরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। কিন্তু মনোয়ার সর্দার তখন আটল হয়ে বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘আব্বা, আমি ফুলকে বিয়ে করতে চাই।’
অভির কথায় কপাল কুঁচকে তাকালো আনোয়ার সর্দার। বইয়ের পাতা উল্টে সামনের শক্তপোক্ত টি-টেবিলের ওপর রেখে ছেলের দিকে তাকালেন।
‘তুই কি কইতাছোত তার কি ধারণা আছে তোর?’
‘হ্যাঁ, আমি সব ভেবেচিন্তে বলছি।’
‘আমি এই বিষয় তোর লগে কোন কথা কইতে চাই না।’
‘কিন্তু আমি বলতে চাই। দাদী আমার জন্য মেয়ে দেখছে। তুমি তাকে মানা করে দাও।’
‘আমি দেখতে বলেছি।’
অভি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘কিন্তু কেনো?’
‘কারণ তোরে বিয়া দেওয়া আমার কর্তব্য।’
‘আমি ফুলকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।’
‘আমি দুঃখীত! যে পোলা ফুলের রূপের মোহে পরবো তার হাতে আমার ফুল মা রে তুইল্লা দিমু না।’
‘আমি রূপের মোহে পরিনি আব্বা।’
আনোয়ার সর্দার জোর দিয়ে বললেন,
‘তুই রূপের মোহেই পরছোত। আগে কত হাত-পায়ে ধরছি তোর। কিন্তু তুই আমার কথা হুনোস নাই। তাই এহন তোর কথাও আমি হুনমু না।’
‘আপনি ভুল করছেন আব্বা। এর পরিণাম ভয়ানক হবে।’
‘তুই ভুইল্লা যাইস না তুই কার লগে কথা কইতাছোত।’
অভি টি-টেবিলের পায়ায় লাথি ছুঁড়ে দুমদাম পায়ে চলে গেলো। আনোয়ার সর্দার দীর্ঘ শ্বাস টেনে চোখ বুজলেন। তার মন নতুন এক ঝড়ের আভাস পাচ্ছে। এখন দেখার বিষয় ঝড়ে কে টিকে।
‘কইতরির মা!’
‘আমার নাম ফুল। কোন কইতরির মা-টা নয়।’
‘আমি তো এই নামেই ডাকমু। যতবার খুশি ততবার।’
‘তুমি বেশি কথা বলো শুভ ভাই। এতো বেশি কথা বলা স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর।’
‘তোর লগে কথা কইতে কইতে মরণ আইলেও আমি সদরে গ্রহণ করমু রে কইতরির মা।’
‘কেন?’
‘এমনি, তোর বুঝতে হইবো না। কল চাপ দিয়া দে। গোসল করমু।’
পুরনো কথা মনে পরতেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। ফুলকে ধাক্কা মেরে ময়না বললো,
‘কিরে ফুল কি হইছে তোর? একলা একলা মিটমিট কইরা হাসতাছোত কেন?’
ফুল ধ্যান ভেঙে নিজেকে সামলে নিলো। দৃষ্টি নত করে মুচকি হেসে বললো,
‘কই কিছু না তো।’
‘কিছু তো আছিলো সখী। নয়তো তুমি মিটমিট কইরা হাসতা না।’
‘ধূর, তোর ভুল ধারণা। বেশি দেখছিস তুই।’
‘উহু, আমি ভুল দেহি নাই। ভুল দেখলে তোর মুখে এহনো হাসি লাইগা থাকতো না।’
ফুল লজ্জায় পরে গেলো। শুভর কথা মনে পরে সে যে এরকম হুটহাট হেসে উঠবে বুঝতেই পারেনি। করবে বা কি? শুভ যে সকল দুঃখের মাঝে এক চিলতে সুখের নাম। এই তো আমিনের কথা ভেবে সারারাত ঘুমাতে পারেনি। ভয়ে বারবার আৎকে উঠেছে। তাই মধ্যে রাতে উঠে বাবাকে চিঠি লিখলো। সকালে শুভর মুখটা দেখে সারারাতের ভয়ভীতি দূর হয়ে গেলো। ফুলের মাঝে মধ্যে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, ‘কি জাদু করছো শুভ ভাই?’ কিন্তু নিজেকে সামলে নেয়।
‘আবার কই হারালি?’
‘কোথাও না।’
‘তোর মতিগতি ভালো ঠেকতাছে না আমার কাছে। আমার থিকা কি জানি লুকাইতাছোত।’
ফুল উত্তর দিলো না। কারণ দক্ষিণের রাস্তায় মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়েছে। কান পেতে তা শুনলো। ময়না বিরক্ত হয়ে ফুলের বাহু ধরে ঝাঁকি মেরে বললো,
‘কিরো কথা কস না কেন?’
ফুল দৃষ্টি না সরিয়ে বললো,
‘কি কমু?’
‘এই তুই দেহি আমগো মতো কথা কস।’
ফুলের হুশ ছিলো না। সে যে সবার মতো আঞ্চলিক ভাষায় টান দিয়ে ফেলেছে সেদিকে খেয়াল নেই। তার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো শুভকে খুঁজতে ব্যস্ত।
‘দেখতো কেমনডা লাগে।’
‘হুম বল, আমি শুনছি।’
‘ধ্যাত, তোর লগে কথাই কমু না।’
ময়না অভিমানে গাল ফুলালো। ফুল বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘রাগ করে না বান্ধবী। তুই বল আমি শুনছি।’
ময়না কথা বলার আগেই ফুলের কানে ভেসে এলো শুভর বিখ্যাত “কইতরির মা” ডাক। ফুল দেরী করলো না। ময়নাকে ‘আসছি’ বলে দৌড় দিলো বাড়ির দিকে। এই ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা যে ফুলের নেই।
#চলবে
#কোন_কাননে_ফুটিবে_ফুল🌸
#Part_20
#Writer_NOVA
‘কোন কাম কাইজে মন নাই। হারাক্ষণ ধ্যান মা’ইরা বইয়া থাকে। কহন থিকা ডাকতাছি হেই দিকে খেয়াল আছে? পুকুর থিকা কলস ভইরা পানি আনতে কইছিলাম। আমি গোসল করমু। কিচ্ছু করোস নাই।’
দাদীর ভৎসনায় চোখ তুলে তাকালো ফুল। চোখ দুটো টলমল করছে তার। আড়ালে চোখ মুছে মিনমিনে গলায় বললো,
‘মনে ছিলো না দাদী।’
‘মনডা কোন নাগরের কাছে থাকে? যেই কিছুই মন থাকে না। কি হইছে তোর? এতো কুয়ারা (ঢং) করোস কেন? বাপের মান-সম্মান খাইয়া কি হয় নাই? এহন চাচারডা খাইতে উইঠা পইরা লাগছোত?’
শুভ রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। সুফিয়া বিবির চেচামেচি শুনে উল্টো ঘুরে সেদিকে এলো। দরজায় দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
‘কি হইছে বুড়ি? এতো চিল্লাও কেন?’
শুভর কথায় বুড়ি সত্যি চিল্লিয়ে উঠলো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
‘আইয়া পরছে ছেমরির চামচা। জীবনে আমগো লিগা একটা কথা কয় নাই। এই ছেমরিরে কিছু কইলে দৌড় পাইরা আহে। ঐ ছেমরা কে বুড়ি হ্যাঁ?’
‘কেডায় আবার তুমি? সত্তর বছরের মহিলারে বুড়ি কমু না তো কচি খুকি কমু নাকি?’
‘তোর থিকা এহনো ভালা শক্তি আছে আমার। বাপের ঘাড়ে বইয়া বইয়া খায়। আবার মুখে চটাং চটাং কতা।’
‘খবরদার, কথাবার্তা সাবধানে কইয়ো। আমি কারো ঘাড়ে বইয়া খাই না। দুইডা ক্লাব চালাই আমি। আমগো ক্লাব থিকা প্রতিদিন কাবাডি, কেরাম বোর্ড, ক্রিকেট, ফুটবল খেলা হয়। ঐডা থিকা আমি বইয়া বইয়া যা আয় করি তোমার বড় পোলা হারা মাস দৌড়ায় তা আয় করতে পারে না।’
সুফিয়া বিবি চুপ হয়ে গেলো। শুভর কথা মিথ্যে নয়। তার আময় রোজগারের প্রধান উৎস ক্লাব। তাদের ক্লাবের খ্যাতি দশ গ্রামে আছে। থাকতেই হবে। দায়িত্ব যে শুভর হাতে৷ শুভ যেই দায়িত্ব নেয় তার যথাযথ মর্যাদা রাখে। গ্রামের মানুষের কাছে বাউণ্ডুলে পরিচিতি পেলেও এলাকার ছোকরাদের কাছে খেলার বিষয় শুভ আদর্শ।
‘কি কইলাম হুনোস নাই? কলস ভইরা পানি আইনা রাখিস আমি গোসল করুম।’
সুফিয়া বিবির কথায় শুভর ললাট কুঞ্চিত হয়ে এলো। এক পলক ফুলের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বললো,
‘ও পানি আনবো কেন? তুমি গোসল করবা তুমি পানি আনবা। আনতে না পারলে পুকুর থিকা গোসল কইরা আইবা। না পারলে বুড়ি রংতামাশা করবা না। কলসে দড়ি বাইন্ধা পুকুরে ডুইবো। আমরা বাঁইচা যাই তাইলে। ঢং এর পেচাল লইয়া আইছে। এতোদিন কলের পানি দিয়া গোসল করছে। এহন ঢং কইরা আবার পুকুরের পানি লাগবো। বুড়া বয়সে কলা করে।’
সুফিয়া বিবি হুংকার দিয়ে উঠতে চেয়েছিলো। তার আগেই অভির আগমন।
‘কি হচ্ছে এখানে?’
‘তোরে কমু কেন?’
শুভর ত্যাড়া উত্তর।
‘তোরে কিছু জিজ্ঞেস করিনি আমি। দাদী তুমি বলো কি হয়েছে?’
সুফিয়া বিবি সমর্থন পাওয়ার মানুষ পেয়ে মিছে কান্না শুরু করলো। সব শুনে অভি বললো,
‘তুই কাজটা ঠিক করিসনি। ক্ষমা চা, দাদীর কাছে।’
‘ঠিক ভুলের হিসাব আমি তোর থিকা নিমু না। তোর যদি দরদ উথলায় পরে তুই নিজেই ক্ষমা চা।’
ফুলের হাত টেনে বেরিয়ে গেলো শুভ। অভি, সুফিয়া বিবি রাগে গজগজ করতে লাগলো। সেদিকে তোয়াক্কা করলো না শুভ।
‘দেখছোত, দেখছোত! কি বেদ্দব। আমার মনে হয় এডা তোর ভাই না।’
‘আমারো তাই মনে হয় দাদী।’
শুভ ফুলের হাত ছাড়লো নিজের রুমে এসে। ফুলের মন খারাপ থাকায় কোন কিছু বলেনি। তার বলতে ইচ্ছে করেনি।
‘এরপরের থিকা হুদাহুদি চোখে পানি দেখলে আছাড় দিয়া পেটি গাইল্লা ফালামু। চুপ কইরা হেনে বয়। আমি আইতাছি।’
শুভ বেরিয়ে গেলো। ফুল বিস্মিত হয়ে শুভর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। শুভ কি করে বুঝলো সে কাদছিলো? একেই কি বলে ভালোবাসার মানুষের যত্ন? দ্বিধা দ্বন্দের দেয়ালে আবারো আটকে পরলো ফুল।
‘তুই আজকাল বড়সড় মানবি না?’
‘মানছিলাম কবে?’
‘শুভ, আমি তোর মা। আমার লগে ত্যাড়া উত্তর দিবি না।’
‘আমি ত্যাড়া উত্তর দেই না। আমার কথার ধরণ এমন। উচিত কথা কারো ভালো লাগবো না এডাই স্বাভাবিক।’
ছেলের গালে কষিয়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো সোহেলী বেগম। এতে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো সুফিয়া বিবি ও অভি। ঝুমুর চমকে উঠলো। সুফিয়া বিবি গলা ঝেড়ে চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
‘আরো দুইটা দে। ছোড বেলা থিকা যদি এমনি মারতি তাইলে আজকে আমগো মুখে মুখে কথা কওনের সাহস পাইতো না।’
‘বড়-ছোট কাউকে মানে না। আমি যে ওর বড় ভাই জীবনে স্বীকার করছে? মুখে যা আসে তাই বলবো।’
অভি আক্রোশ নিয়ে বললো। শুভ চোখ লাল করে সুফিয়া বিবি, অভির দিকে তাকালো। কপালের রগ রাগে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। দাঁত দাঁত চেপে রাগ সংবরনের বৃথা চেষ্টা অবহ্যত রেখেছে। এই মুহুর্তে তার মা না থাকলে খুনাখুনি হয়ে যেতো। সোহেলী বেগম আবারো রাগী গলায় বললেন,
‘অপয়া মাইয়ার লিগা দরদ বাইয়া চাইয়া পরে। নিজের দাদী, ভাইয়েরে অপমান করতে পিছপা হয় না। মায়ের মুখে মুখে কথা কয়। ঐ মুখপুড়ি এডিই শিখাইতাছে। মা আছিলো কামের বেডির মাইয়া। এগুলি ছাড়া কি শিখাইবো?’
‘মা, মানা করছি ওর মা কে নিয়ে আজেবাজে কথা কইবা না। ওর বাপ কিন্তু এই বংশের পোলা। ও এই বংশের মাইয়া। ওর মা কি আছিলো ঐডা নিয়া ওরে কথা হুনাও কেন?’
‘আবারো দরদ দেহাস? কি জাদু করছে তোরে? নাকি মন্ত্র পরা জল খাওয়াইছে। সারাদিন ফুল, ফুল কইয়া নাম জপোছ।’
শুভ হাত মুঠ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো। এরপর আঙুল উঠিয়ে শাসিয়ে বললো,
‘ওর নামে যে উল্টাপাল্টা কথা কইবো কাউরে আমি ছাইড়া কথা কমু না। হোক সে আমার বাপ, মা, দাদী কিংবা ভাই।’
হনহন করে বেরিয়ে গেলো বসার ঘর থেকে। যাওয়ার আগে কাঠের দু পাটের দরজাটাকে জোরে লাথি মারতে ভুললো না। সোহেলী বেগম হা করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো। এমন কিছু আশা করেনি সে।
ঝুমুর চুপিসারে ওপরের তলায় উঠে গেলো। ফুল তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। পা টিপে ভেতরে ঢুকে দরজা ভিড়িয়ে ফেললো। ফুলের কাছে গিয়ে গা ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগলো।
‘ফুল, ফুল উডো। এদিকে বহুত কাহিনি হইয়া গেছে।’
‘হু!’
ঘুমন্ত অবস্থায় ফুলের উত্তর শুনে নিরাশ হলো ঝুমুর। পূর্বের তুলনায় আরো বেশি জোরে ধাক্কা মারলো। আচানক এমন হওয়ায় ফুল হকচকিয়ে উঠে বসলো। সামনে ঝুমুরকে দেখে বুকে ফুঁ দিয়ে বললো,
‘কি হয়েছে ঝুমুর আপা?’
‘তুমি পইরা পইরা ঘুমাইতাছো? ঐদিকে বহুত ঘটনা ঘইটা গেছে।’
ফুলের চোখের ঘুম উবে গেছে। নড়েচড়ে বসে চোখ দুটো বড় করে বললো,
‘কি ঘটনা?’
ঝুমুর একে একে সব খুলে বললো। সব শুনে ফুল থুম মেরে বসে রইলো। শুভ থাপ্পড় খেয়েছে শুনে তার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। ঝুমুর আশেপাশে চোরা দৃষ্টি দিয়ে সাবধানী গলায় বললো,
‘তুমি আইজ ঘরের থিকা বাইর হইয়ো না। তোমারে দেখলে চাচী আরো চেতবো। তহন রাগে মারতেও পারে। আমি তোমার সব কাম কইরা দিমুনে।’
ঝুমুর এক বিন্দুও ভুল বলেনি। সোহেলী বেগম আসলেই ফুলের ওপর সকল ঝাঁঝ উঠাবে।কৃতজ্ঞতায় ফুলের চোখ ভিজে উঠলো। হাসি দিয়ে ঝুমুরের হাত দুটো নিজের হাতে মুঠোয় নিয়ে ফেললো।
“একদিন তোমায় না দেখিলে,
তোমার মুখের কথায় না শুনিলে
পরাণ আমার রয় না পরাণে।”
পড়ন্ত বিকেল। মিষ্টি রোদের লুকোচুরি খেলা। রেডিওতে গান বাজছে। আনোয়ার সর্দার চেয়ারে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। কোলের ওপর উপন্যাসের বই। অবসর সময়ে বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসেন। রেডিও এর যুগ যদিও চলে যাওয়ার পথে। বাজারে সাদা কালো টিভিকে ছাড়িয়ে রঙিন টিভি জায়গা করে নিয়েছে। তবুও পুরনো রেডিও এর মায়া ছাড়তে পারেননি তিনি।
সোহেলী বেগম একবার উঁকি দিয়ে গিয়েছিলেন। স্বামী চোখ বন্ধ করে আছে দেখে ঘুমিয়ে রয়েছে ভেবেছেন। তাই এমুখো হোননি। হলে ফুলের নাম কালারিং করে যেতেন। শুভ ফুলের নাম নেয় দেখে ফুলের প্রতি আরো বেশি ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে তার। সেই ক্ষোভ সবাইকে জানাতে উঠেপড়ে লেগেছে।
সোহেলি বেগম যেতেই চোখ খুললেন আনোয়ার সর্দার। স্ত্রীর হাঁটার গতি চিনেন। সে যে কোন বাহানায় ফুলের নামে যা-তা বলতে এসেছিলো তাও টের পেয়েছেন। চেয়ারম্যান তো এমনি এমনি হননি। কার মতিগতি কেমন চোখ, মুখ দেখে বলে দিতে পারেন। স্ত্রীর সাথে চালাকিতে জিততে পেরে মুচকি হেসে আবারো চোখ বুজলেন আনোয়ার সর্দার। এবার মৌনতায় ব্যাঘাত ঘটালো রমিজ মিয়া। দরজা দিয়ে ঢুকে মাথা নিচু করে বললো,
‘চেয়ারম্যান সাব কি ঘুমাইছেন?’
নীরবতায় ঘাটা পরায় চোখ কুঁচকে এলো বিরক্তিতে। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক করে চোখ মেললেন।
‘কিছু কবি?’
‘হো চেয়ারম্যান সাব।’
হাত দিয়ে রেডিও বন্ধ করে উত্তর দিলো,
‘যা কওনের কইয়া ফালা।’
‘আপনের লগে একজন দেহা করতে আইছে।’
‘কে?’
‘কইতে পারতাছি না। বাড়িত আইলো না। বাইরে দাঁড়ায় রইছে। কইলো অনেক দরকার। এহনোই যাইতে।’
‘আমগো গেরামের কেউ হইলে পরে আইতে ক। আজকে কোন কাম করতে মন চাইতাছে না।’
‘আমগো গেরামের না। আগেও দেহিও নাই। কইলো অন্য হেরাম থিকা আইছে।’
চিন্তায় কপাল কুঁচকে গেলো আনোয়ার সর্দারের। কে হতে পারে? অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আরামের চেয়ার থেকে উঠে পরলেন। রমিজ মিয়াকে যেতে বলে ধীরেসুস্থে বাইরের পথ ধরলেন।
#চলবে