#কোন_কাননে_ফুটিবে_ফুল🌸
#Part_23
#Writer_NOVA
দুপুরের কাঠফাটা রোদে ছাতা মাথায় এক আগন্তুকের দেখা মিললো। ঝুমুর তখন উঠোন ঝাঁট দিয়ে কলপাড়ের বালতিতে পানি ভরছে। সে এসেই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
‘চেয়ারম্যান সাহেব বাড়ি আছেন?’
ঝুমুর ওড়নার গিট খুলতে খুলতে লোকটার সামনে এসে দাঁড়ালো। কচ্ছপের মতো মাথা বের করে উত্তর দিলো,
‘না, চাচায় বাড়িত না। একটু পর আইয়া পরবো।’
‘ওহ, আমাকে একটু পানি দিতে পারবেন মা? তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।’
জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো লোকটা। মা ডাক শুনে ঝুমুর আবেগে আপ্লূত হয়ে গেলো। চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠলো। ভেজা গলায় উত্তর দিলো,
‘খাড়ান দিতাছি। ভেতরে আইয়া বহেন।’
‘না মা, আমি এখানেই ঠিক আছি।’
ফের মা ডাক শুনে চোখের কোণ মুছে ভালো করে তাকালো। চেহারাটা কেমন চেনা চেনা লাগছে। কার সাথে যেনো মিল। কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। এরপর দৌড়ে পানি আনতে চলে গেলো।
পানির মগ হাতে ফেরার পথে ফুলের সাথে দেখা। ফুল সদ্য গোসল সেরে জামা-কাপড়ে ধুয়ে গোসলখানা থেকে বেরিয়েছে।
‘পানি নিয়ে কোথায় যাও ঝুমুর আপা?’
‘ওহ ফুল তুমি! আমি তোমারেই খুজতেছিলাম।’
‘কেন?’
‘বাইরে একটা লোক আইয়া খাড়ায়া রইছে। চাচারে খুজতাছে।’
‘কত মানুষ তো খুঁজে।’
‘হো, তয় হের চেহারা না আমি কার লগে জানি মিল পাই। তুমি একটু আহো তো দেহো কে।’
‘চলো।’
ঠোঁট দুটো বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই আরেকবার জিহ্বা দিয়ে চেটে ভিজিয়ে নিলো। ততক্ষণে ঝুমুর মগ হাতো হাজির।
‘পানি এনেছো মা?’
‘এই যে নেন।’
এক নিঃশ্বাসে মগের সবটুকু পানি শেষ করে দিলো। আড়াল থেকে ফুল সবটাই লক্ষ্য করছিলো। ঝুমুর সামনে থেকে সরতেই লোকটার মুখমণ্ডল ফুলের চোখে পরলো। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে অভিমানি গলায় বললো,
‘আব্বাজান তুমি আসছো?’
বসার ঘরে মনোয়ার সর্দারকে নিয়ে ছোটখাটো জটলা বেঁধে গেছে। সুফিয়া বিবি এখনো ছেলেকে ধরে গুনগুন করে কাঁদছে। ফুল বাবার সাথে অনেকটা লেপ্টে আছে। সোহেলী বেগমের মুখ ভার। অভি, আনোয়ার সর্দারের ভাবভঙ্গি বোঝা যাচ্ছে না। নীরবতা প্রথমে আনোয়ার সর্দার ভাঙলেন।
‘একা আসছোত কেন? ফুলের মা রে ছোট ভাতিজী দুইডারে লইয়া আইতি। কয়েকদিন বেড়ায় যাইতো নে। ওরা তো জন্মের পর একবারও আহে নাই।’
সোহেলী বেগম উত্তর দেওয়ার আগেই সুফিয়া বিবি তেতিয়ে উঠলেন।
‘ঐ ছেমরি এই বাড়িতে ঢুকতে পারবো না। আমি ওরে মাইনা নিমু না। গত তেইশটা বছর আমার পোলারে আমার থিকা আলাদা কইরা রাখছে। ওর এই বাড়িতে কোন জায়গা নেই।’
শাশুড়ীর উত্তরে মনে মনে খুশি হলেন সোহেলী বেগম। তবে বেশিখন সেই খুশি স্থায়ী হলো না। আনোয়ার সর্দার বললেন,
‘তোমার পোলাও তো সমান দোষ করছে৷ তারে জড়ায় ধইরা বইয়া রইছো কেন? পরের মাইয়ার ওপর সব দোষ দিতে পারলেই বাইচা যাও।’
অভি বাপের কথার পিঠে বললো,
‘এসব কথা এখন না তুললে কি হতো না?’
‘তোর দাদীরে জিগা।’
রাগত্ব স্বরে উত্তর দিলো আনোয়ার সর্দার। মনোয়ার সর্দার একদম চুপচাপ। বহুদিন পর বাচ্চা ছেলে মায়ের সন্নিধি পেলে যেমন চুপ করে মায়ের গায়ের উষ্ণতা নেয়। সে তেমন নিচ্ছে। এসব ঝামেলায় কথা বাড়িয়ে কোন লাভ নেই।
‘হুহ, ঢং দেইখা বাঁচি না। আম্মা আপনেও পারেন। এহন তো ঠিকই পেলারে কাছে টাইনা নিলেন। অন্য সময় তো আমার ছোড পোলার লগে লাইগা থাকেন। বুঝলেন তো পোলার অভাবটা।’
সোহেলী বেগম আক্রোশের সহিত বললো। আনোয়ার সর্দার ধমক দিয়ে বললেন,
‘চুপ করো। আগুন নিভতাছে নিভতে দাও। আর ঘি ঢাইলো না।’
‘মা, দয়া করে মুখটা বন্ধ রাখো।’
‘আমি তো বন্ধই রাখছি অভি। তয় মাঝে মাঝে কিছু কথা মুখ ফসকে বাইর হইয়া যায়।’
‘আহ, থাক না সেসব কথা।’
‘তোর মা কে বলেও লাভ নেই।’
চোখ লাল করে উত্তর দিলো আনোয়ার সর্দার। এতোকিছুর মধ্যে ভাবান্তর নেই শুধু ফুলের মধ্যে। সে পা দিয়ে মনোযোগ সহকারে মেঝে খুটছে। সুফিয়া বিবি তাড়া দিয়ে বললেন,
‘ঝুমুর কই? ওরে ডাইকা ভাত দিতে ক। আমার পোলাডা কতদূর থিকা আইছে। নিশ্চয়ই খিদা লাগছে।’
সোহেলী বেগম গলা উঁচিয়ে ডাকলেন,
‘ঝুমুর খাওন বাড়।’
আনোয়ার সর্দার এগিয়ে এসে ফুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
‘এই হানে বইয়া থাকলে হইবো? বাপে আইছে তার খাওন দাওনের বেবস্থা করতে হইবো না?’
ফুল মাথা ঝাকালো। এরপর দ্রুত উঠে খাবারের কামরার দিকে ছুটলো। কত কাজ তার বাকি। সবার খাবার বেড়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো তারই।
বিকেলে মনোয়ার সর্দার চলে যেতে চাইলেও যেতে পারলো না। সুফিয়া বিবি কিছুতেই ছেলেকে যেতে দিবে না। রাতটুকু থাকতেই হবে৷ মা কে নারাজ করতে মন চাইলো না মনোয়ার সর্দারের। তাছাড়া বড় ভাইয়ের সাথে কথার দরকার আছে। তাই জোড়াজুড়িতে রয়ে গেলো। ছেলের জন্য পিঠে তৈরি করবেন সুফিয়া বিবি নিজের হাতে৷ তাই রমিজ মিয়াকে গোয়ালাদের থেকে তাজা দুধ আনালেন। তা দেখে সোহেলী বেগম জিজ্ঞেস করলো,
‘দুধ দিয়া কি করবেন আম্মা?’
‘দুধের পুরের পাটিসাপটা পিঠে মনোয়ার অনেক পছন্দ। তাই ভাবলাম ওরে দুইডা পাটিসাপটা বানায় দেই। আবার কবে না কবে দেহা হয়। তহন বাইচা থাকি কিনা তাও সন্দেহ।’
শাশুড়ীর কথা শুনে বিস্ময়ে সোহেলী বেগমের মুখ হা হয়ে গেলো। যেই মানুষ কখনও চুলোর সামনে ভিড়ে না। সে আজ নিজের হাতে পিঠে বানাবে। এই বুঝি মায়ের ভালোবাসা। পৃথিবীর সবাই রাগ করে থাকতে পারলেও মা কখনো সন্তানের ওপর রাগ করে থাকতে পারে না। ঝুমুর অদূরে বসে আতপ চাল পাটায় বাটছে। ফুল বসে বসে দুধ জ্বাল দিচ্ছিলো। খুন্তি দিয়ে বারবার নেড়ে দিচ্ছে। যাতে নিচে লেগে না যায়। দাদির কথা শুনে এই প্রথম ফুলের মনে হলো দাদীকে সে যতটা খারাপ মনে করে ততটা খারাপ সে নয়। সুফিয়া বিবি আজ খোশ মেজাজে আছেন। নাতনিকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হালকা শাসনের সুরে বললেন,
‘এমনে চাইয়ানা থাইকা চটি (খুন্তি) চালা। নয়তো দুধ উতলায় পইরা যাইবো।’
ফুল মুচকি হেসে মাথা নাড়ালো। অন্য দিকে ঝুমুর তো বিস্ময়ে হতভম্ব। আজ যেনো নতুন কোন মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখছে। মুখ ফসকে বলেই ফেললো,
‘তুমি আসলেই আমগো দাদী তো?’
সুফিয়া বিবি কপট রাগ দেখিয়ে বললো,
‘চুপচাপ হাত চালা। বেশি কথা কয়।’
বসার কামরায় বসে গল্প করছিলো অভি, মনোয়ার সর্দার। ঠিক গল্প নয়। ভাব জমানোর প্রচেষ্টা আরকি। আনোয়ার সর্দার ভেতরে এসে অভিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘তুই একটু বাইরে যা তো।’
‘কেন আব্বা?’
‘তোর চাচার লগে আমার কথা আছে।’
‘যা বলা আমার সামনে বলো।’
‘তোর সামনে কইলে কি তোরে বাইরে যাইতে কই।’
‘কি এমন কথা যা আমার সামনে বলা যায় না?’
‘অভি!’
ধমকে উঠলেন আনোয়ার সর্দার। অভি মুখ কালো করে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো। অভি বের হতেই মুখ খুললো মনোয়ার সর্দার।
‘আমি এসেছিলাম ফুলের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে।’
‘অন্য কোনহানে বিয়া ঠিক করছোত নাকি।’
‘না, তবে সম্বন্ধ দেখতেছি। ভালো ছেলে পেলে চুপিসারে বিয়েটা সেরে ফেলবো।’
‘আমিন জানলে কি করবো তার ধারণা আছে তোর?’
‘হুম আছে। কিন্তু আমি আমার মেয়েটার জীবন ঐ নরপশুর হাতে তুলে দিতে পারি না।’
‘ফুল কোনহানে যাইবো না। ওরে আমার বাড়ির বউ কইরা রাইখা দিমু।’
চকিতে তাকালো মনোয়ার সর্দার। অবাক জিজ্ঞেস করলো,
‘কিন্তু কিভাবে? আমি তো অভির হাতে ওকে তুলে দিবো না। একবার আমার মেয়েকে অসম্মান করেছে। দ্বিতীয়বার একই কাজ হোক আমি চাই না।’
অভির লিগা ওরে নিমুও না। আমি ভাবতেছি শুভর লিগা ফুল মারে বউ করমু। বিশ্বাস কর তোর মেয়ে আমার কাছে অনেক ভালো থাকবো। আমার ছোড পোলায় একটু উগ্র স্বভাবের। কিন্তু মনডা পরিষ্কার। মনে যা থাকে মুখে তাই বইলা ফেলে। তুই জাইনা অবাক হবি। শুভ ফুলের কথা ছাড়া আর কারো কথা হুনে না। ওরে যদি কেউ মানুষ করতে পারে হেইডা একমাত্র ফুল মা।’
‘কিন্তু আমি তো…..’
ভাইকে থামিয়ে দিয়ে আনোয়ার সর্দার বললেন,
‘তুই কোন চিন্তা করিস না। আমি গেরান্টি দিতাছি। তোর মাইয়া শুভর সাথে ভালো থাকবো৷ আর আমিনের লগে মোকাবিলা একমাত্র শুভই করতে পারবো৷ তুই অমত করিস না। তুই মত দিলে এই মাসেই ওগো বিয়াডা দিয়া দিমু। আমি বেশি দেরী করতে চাইতাছি না।’
‘দেখি তাহলে। আমি একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। ফুলের মা কে সব বলে তার মতামত নেওয়া উচিত।’
‘যা মত নেওয়ার তাড়াতাড়ি নিস। দেরী হইলে সর্বনাশ হইয়া যাইতে পারে।’
আড়াল থেকে সব শুনে বুক ধ্বক করে উঠলো ফুলের। সে এসেছিলো বাপ-চাচাকে পাটিসাপটা পিঠে দিতে। এখন লজ্জায় সে সামনে এগুতে পারছে না।
‘কিরে কইতরির মা, হেনে কি করোস?’
শুভর গলা শুনে ফুল চমকে উঠলো। লজ্জায় ওড়নাটা দাঁত দিয়ে কামড়ে সেখান থেকে পালালো। ফুলের লাজুক ভঙ্গি দেখে শুভ আহাম্মক বনে গেলো। বিড়বিড় করে বললো,
‘এই কইতরির মায়ের আবার কি হলো?’
বসার রুমের ভেতরে ঢুকে বাপকে উদ্দেশ্য করে শুভ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।
‘শুনলাম, ছোট কাকায় আইছে।’
‘তুই কি করে জানলি?’
‘সারা গেরামের খবর আমার কাছে থাকে। আর নিজের বাড়ির খবর থাকবো না? শুভ সব খবর রাখে। কাকায় যে দুপুরবেলা আইছে আর রাইতে থাকবো এডাও আমার অজানা নয়।’
মনোয়ার সর্দার প্রশংসার গলায় বললো,
‘ভালো খবর রাখছিস দেখছি।’
‘আসসালামু আলাইকুম কাকা। কেমন আছেন?’
এগিয়ে গিয়ে মনোয়ার সর্দারকে জড়িয়ে ধরলো শুভ। মনোয়ার সর্দার সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আছি আলহামদুলিল্লাহ ভালোই। তুই কেমন আছিস? ওমা! কতবড় হয়ে গেছিস। সেই ছোট দেখেছিলাম।’
চাচার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে শুভ উত্তর দিলো।
‘এহন কি আর ছোড আছি কাকা? দুদিন পর আপনের মাইয়ারে বিয়া করমু।’
মনোয়ার সর্দার অবাক হয়ে আনোয়ার সর্দারের দিকে তাকালো। আনোয়ার সর্দার মাথা নাড়ালেন। যার অর্থ সে কিছু জানে না। শুভ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হেসে বললো,
‘যা কওনের আমি সামনাসামনি কই। আগে-পিছে আমার কোন কথা নেই। আপনের মাইডারে আমার ভীষণ পছন্দ হইছে কাকা। বিয়ে করলে ওরেই করমু। এহন আপনের মাইডারে কি সসম্মানে আমার হাতে তুইল্লা দিবেন কিনা সেটা আপনের ইচ্ছা। তা না হইলে আপনের মতো আপনের মাইডারে নিয়া আমি পালামু। এহন কি করবেন আপনেই সিদ্ধান্ত নেন।’
আনোয়ার সর্দার ধমকে উঠলেন,
‘লজ্জা শরমের মাথা কি খাইছোত নাকি?’
শুভ একটু ভাবার ভঙ্গি করে বললো,
‘আমার লজ্জা শরম আছিলো কবে? যাইহোক, কাকা যাকইলাম মনে রাইখেন। খাওনের সময় আবার দেহা হইবো।’
বসার রুম ছেড়ে “কইতরির মা” বলে ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো শুভ। তার এখন ফুলকে প্রয়োজন। দুই ভাই হতবিহ্বল হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। মনোয়ার সর্দার চোখ গোল গোল করে বললো,
‘প্রস্তাব দিলো নাকি হুমকি দিলো বুঝলাম না।’
‘দুটোই দিছে। একেবারে তোর পদ হইছে। তুই তো এমনি করতি।’
আনোয়ার সর্দারের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো মনোয়ার সর্দার। ভাইয়ের চোখ পাকানো দেখে হো হো করে হেসে উঠলেন চেয়ারম্যান।
#চলবে
#কোন_কাননে_ফুটিবে_ফুল🌸
#Part_24
#Writer_NOVA
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে আরো চার ঘন্টা আগে। বিকেল থেকে ঝুম বৃষ্টি। রাত বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টির তোড়জোড় বাড়ছে। সারা বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা৷ বিদ্যুৎ নেই দুপুর থেকে। কুপির আলো ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। তবে বাইরে ঝড়ের তান্ডবলীলা অবিরাম নৃত্য করে চেলছে।
সকলের চোখে ঘুম। ঘুম নেই শুধু একটা প্রাণীর চোখে। সে আর কেউ নয়, ফুল। এখনো সে স্থির চাহনিতে কুপির অগ্নিশিখার দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ যে এখনো বাড়ি ফিরেনি। ঝুমুর অনেক সময় জেগে ছিলো। হাই তুলতে তুলতে বেচারীর অবস্থা খারাপ। ফুল তাকে ঘুমাতে বলছিলো কিন্তু সে ফুলকে ছেড়ে যেতে রাজী হচ্ছিলো না৷ ফুল জোর করে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। ফুল চাইলেও সকালে দেরী করে উঠতে পারবে। কিন্তু ঝুমুরের ঠিক সময় ওঠা চাই। নয়তো সোহেলী বেগম আস্ত রাখবে না। ফুলের জন্য চিন্তা করার মানুষই তো তিনজন। এক শুভ, দুই ঝুমুর, তিন চেয়ারম্যান।
অভি মাঝে একবার ঘুরতে এলো। কখন থেকে দেখেছে ফুল শীতল পাটি বিছিয়ে থ মেরে বসে আছে। এখনও সেভাবেই আছে। শুধু পা দুটো মেলে রাখা।
‘ঘুমাবে না?’
‘আমি যে এখন ঘুমাবো না তা আপনি ভালো করে জানেন অভি ভাই।’
‘এর জন্য কি জিজ্ঞেস করতে পারবো না?’
‘প্রয়োজন দেখছি না।’
‘তুমি আমার সাথে এমন ত্যাড়া বাঁকা উত্তর দাও কেনো?’
ফুলের উত্তর দিতে মন চেয়েছিলো, “আপনি বেশি ভালো যে তাই”। কিন্তু মুখের কথা মুখেই আটকে রাখলো। অভি বেশি সময় দাঁড়িয়ে ভাব জমাতে পারলো না। আরো কিছু প্রশ্ন করলে ফুল হু হা তে উত্তর দিলো। অভি বাধ্য হয়ে চলেই গেলো।
বাইরে ভারী বর্ষণ। সাথে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অদূরেই বিকট শব্দ করে একটা বাজ পরলো। ফুল চকিতে তাকালো। কখন যে শীতল পাটিতে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলো টের পায়নি। দরজায় ঠুকঠুক শব্দ হলো। ফুল ভালো করে কান পাতলো। হ্যাঁ, আবারো হচ্ছে শব্দটা। কুপি হাতে সাবধানে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। বাতাসের ঝাপটায় নাকি সত্যি কেউ এসেছে তা বুঝতে দরজার সামনে আবারো কান পাতলো। এবার বেশ শব্দ করে দরজায় বারি পরলো।
‘কে?’
‘দরজা খুল। আমি গোসল কইরা ফালাইলাম।’
‘কে আপনি?’
‘কইতরির মা, আমি।’
শুভর গলা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ফুল। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতেই, হুরমুর করে ভেতরে ঢুকলো শুভ। সারা শরীর জবজবে ভেজা৷ চুল থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পরে শ্যাম বর্ণের মুখশ্রী ভিজিয়ে দিচ্ছে। ঠান্ডায় কাঁপছে।
‘সারাদিন কোথায় ছিলে?’
‘সামনে খেলা, কত কাম। আজাইরা বইয়া থাকার সময় আছে আমার?’
শুভর পাল্টা প্রশ্ন শুনে ফুল চুপসে গেলো। আলনা থেকে একটা গামছা এনে এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘তুমি আর এমুখো হয়ো না। তাহলে সারা ঘর তোমার শরীরের পানি দিয়ে ভেজা ভেজা হয়ে যাবে। জলদী শরীর মুছে জামা-কাপড় পাল্টে ফেলো।’
শুভ হাত বাড়িয়ে গামছা নিয়ে শরীর মুছতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। ফুল শাসনের সুরে বললো,
‘কে বলেছিলো বৃষ্টি মাথায় করে ফিরতে। না আসলেও পারতে। কোন বন্ধুর বাড়িতে রাতটা কাটিয়ে আসলে কি এমন ক্ষতি হতো? এখন তো বৃষ্টিতে ভিজে সর্দি-জ্বরকে নিমন্ত্রণ পাঠালে।’
শুভ মুচকি হাসলো। অন্য কেউ এমন করে বললে ঢেঢ় বিরক্ত হতো। অথচ ফুলের মিষ্টি কন্ঠের শাসন তার বড় ভালো লাগে। আর বাড়িতে ফেরা তো এই মেয়ের কারণেই। ফুলকে এক পলক না দেখলে যে শুভর চোখে ঘুম আসে না।
‘তুমি হাসছো শুভ ভাই?’
‘তাইলে কি কানমু?’
‘তুমি না এলেও পারতে।’
‘হো পারতাম। কিন্তু চিন্তা করলাম আমার লিগা একজন সারা রাইত জাইগা থাকবো। বিষয়টা ভালো দেহায় না। হের লিগা আইয়া পরলাম।’
ফুল মুখ লুকিয়ে ফেললো। আসলেই তো! শুভ না আসলে সে সারারাত জেগে শুভর আসার অপেক্ষার প্রহর গুনতো। এই ছেলেটা সব আগে আগে টের পেয়ে যায় কি করে? একেই কি বলে মনের টান?
আরেকটি রৌদ্রজ্বল দিনের সূত্রপাত। সকালের সূর্য দেখে বোঝার উপায় নেই যে গতকাল রাতে কি প্রলয় হয়েছে। ধরণী আজ স্নিগ্ধতায় ছেয়ে গেছে।
আড়মোড়া ভেঙে উঠতেই রোদ মুখে পরলো শুভর। বালিশের থেকে অল্প একটু মাথা উঠিয়ে ধপ করে আবার বালিশে মাথা ঠেকিয়ে ফেললো। মাথাডা প্রচন্ড ভার হয়ে রয়েছে। সাথে নাকটা সুরসুর করছে। গতকাল রাতে বৃষ্টিতে ভেজার ফল এটা। হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে চোখ, মুখ কুচকে ফেললো শুভ। রোদটা চোখে লাগছে। এটা নির্ঘাত ফুলের কাজ। ওকে উঠিয়ে দিতে পূর্বের জানালার সব কপাট খুলে রেখেছে। পায়ের কাছে নরম কিছুর অস্তিত্ব বুঝতে পেরে লাফ দিয়ে উঠলো। পুষিকে দেখে বুকে হাত দিয়ে বললো,
‘আমারে ভয় পাওয়ায় দিছিলি। হুটহাট কই থিকা আহোস?’
পুষি মনিবের কথার প্রতিত্তোরে ম্যাও করে উঠলো। এরপর আবার আরাম করে পায়ের কাছে শুয়ে পরলো। শুভ বিরবির করে বললো,
‘নবাবজাদা, এক্কেরে আমার মতো।’
হাত-পা মেলে চিৎ হয়ে শুয়ে ঘুম জড়ানো কন্ঠেই চেচিয়ে উঠলো শুভ।
‘কইতরির মা!’
শুভর ডাক কর্ণ গহ্বরে প্রবেশ করতেই মুখের নকশা বদলে গেলো সোহেলী বেগমের। কটমট করে তাকালো তার পাশে বসে থাকা ফুলের দিকে। ফুল মিটমিট করে হাসতে হাসতে কুমড়ো ভাজি কুটছে। সোহেলী বেগমের সাথে চোখে চোখ পরতেই মুখের আদল পাল্টে ফেললো। সোহেলী বেগম বিরবির করে উঠলেন।
‘সারাদিন, সারা রাইত হুদাই কইতরির মা, কইতরির মা। আর কোন নাম মুখে নাই। আমারেও জীবনে এমনে ডাকলো না। পোড়ামুখীর লিগা নিজের পোলাডাও আমারে এহন দূর কইরা দেয়।’
সুফিয়া বিবি এক হাত দূরে বসে মগ থেকে পানি নিয়ে কুলকুচি করছিলো৷ সোহেলী বেগমের কথা পুরপুরি না শুনতে পেলেও কিছুটা আন্দাজ করে ফেললো।
‘ওরে বইকা লাভ নাই। তোর পোলারও দোষ আছে।’
‘এই কথাডা আপনে স্বীকার করেন না কেন আম্মা? আপনেও পোলাও তো ফুলের মারে লইয়া ভাগছে। হুদা ওর মারে দোষ দেন কেন? নিজের পোলারে নিয়া তো কিছু কইতে দেহি না।’
কোঁৎ করে উঠলো সোহেলী বেগম। একেবারে মোক্ষম জায়গায় ঢিলটা মেরেছে। সুফিয়া বিবি রেগেমেগে আগুন। আজ একদফা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়ে যাবে।
‘তোর পোলার যেমন সাত খুন মাফ হইয়া যায়। তেমনি আমার পোলারও সাত খুন মাফ। মা তুইও, আমিও।’
‘এই বেলায় কেন আম্মা? নিজের বেলায় সবাই সেয়ানা।’
‘ঐ তুই সেয়ানা কইয়া কি বুঝাইতে চাস?’
সুফিয়া বিবি তেড়ে এলো। সোহেলী বেগম কম যান না। শত হোক দুজনেই সর্দার বাড়ির বউ। আজ যেনো বউ শাশুড়ীর যুদ্ধ লাগবে। ফুল দীর্ঘ শ্বাস টানলো। তার এসব ঝামেলা ভালো লাগে না। বাড়িতে যাই হোক সেই তার বাবা-মায়ের পুরনো কেচ্ছা কাহিনি এই মহিলা দুজন টেনে আনবেই।
নিঝুম রাত। বাইরে জোনাকি পোকারা দলে দলে উড়ে বেড়াচ্ছে। হালকা সবুজ আলো একটু জ্বলছে তো একটু নিভছে। উজ্জ্বল পূর্ণিমার আলোয় পা টিপে টিপে কেউ একজন ফুলের কামারার সামনে এসে দাঁড়ালো। এই হেমন্তের দিনেও সে কালো রঙের চাদরে নিজেকে মুড়ে রেখেছে। চোরা দৃষ্টি দিয়ে আশেপাশে নজর দিলো। নাহ, কেউ দেখছে না। ভেতরে ঢুকে দেখলো ফুল এক হাতে পাশ বালিশ জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। এক হাত দূরে আরেকটা বালিশ। এগুলো শিমুল তুলোর। গতবছর শিমুল তুলোর বালিশ দুটো ফুল নিজ হাতে বানিয়েছে। বালিশটা তুলে নিলো। দুই হাতে সেটা ধীরে ধীরে ফুলের মুখের ওপর এনে সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরলো। ফুল গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে লাগলো।
‘ফুল!’
কলি বেগম চিৎকার করে ডেকে ঘুম থেকে উঠে গেলো। কি ভয়ানক দু:স্বপ্ন! মেয়েটার কি কোন বিপদ হলো? নয়তো এই বেলায় এতো বাজে স্বপ্ন দেখা তো ভালো লক্ষ্মণ নয়। সময় বেশি নয়। মাত্র রাত এগারোটা বেজে সতের মিনিট। পাশে তাকিয়ে দেখলো তার স্বামী নেই।
‘ফুলের বাপে গেলো কই?’
আশেপাশে নজর বুলিয়ে স্বামীকে দেখলো না। ধীর পায়ে উঠে পাশের কামরায় চলে গেলো। একবার ছেলেমেয়েদের কামরায় উঁকি দিতে ভুললো না। বৃন্ত, পাপড়ি দুজনে অঘোর ঘুমে। একবার ওদের কামরায় ঢুকে ছেলেমেয়ে দুটোর মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁথা টেনে দিলো। এরপর হাজির স্বামী যেখানে আছে সেখানে।
মনোয়ার সর্দার মনোযোগ দিয়ে হারিকেনের আলোয় দোকানের হিসাব মিলাচ্ছেন। বড় বাজারের বড় মুদির দোকানটাই তার। ভাইয়ের হোটেলে থাকতে যে ছেলে জীবনে এক গ্লাস পানি ঢেলে খায়নি সে এখন নিজে একা দোকান সামলায়। একেই বলে দায়িত্ব! দায়িত্ব, কর্তব্য কাঁধে এসে পরলে সবাই বদলে যায়। এছাড়া আরেকটা বিষয় আছে। পরিস্থিতি! হ্যাঁ, বাজে পরিস্থিতি মানুষকে যতটা শিক্ষা দিতে পারে, হাজার ভালো সময় সেই শিক্ষা দিতে পারে না।
কলি বেগম এসে নীরবে স্বামীর পেছনে দাঁড়ালো। কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
‘ঘুমাইবা না?’
‘হুম, একটু পর। হাতের কাজটা শেষ করে নেই।’
‘হারাদিন কাম, কাম করো। নিজের শরীলের দিকে কি একটু চাও? কি অবস্থা হইতাছে তোমার!’
‘আমার কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি কলি।’
‘সাত দিন কালকে শেষ হইবো। আমিন, মারুফ আইলে কি কইবা?’
কলম চালানো বন্ধ করে দিলেন মনোয়ার সর্দার। বিষাদের নি:শ্বাস ছাড়লেন। এই চিন্তা তাকেও বাজেভাবে গ্রাস করছে। আমিন, মারুফ এলে কি উত্তর দিবে কালকে? মাথা কাজ করছে না তার।
‘উত্তর দেও না কেন? কি কইবা?’
‘জানি না।’
‘আমার মাইয়াডা ভালা আছে? একটু আগে একটা খারাপ স্বপ্ন দেইখা জাইগা গেলাম। আল্লাহ জানে মাইয়াডার অবস্থা কেমন। কোন বিপদ-আপদ যেন না হয়।’
মনোয়ার সর্দার কলি বেগমের দিকে ঘুরে নিজের দুই হাতের মুঠোয় স্ত্রীর হাত পুরে নিয়ে আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘তুমি কোন চিন্তা করো না। ফুল ঐখানে ভালো আছে। এখানে থাকলে রাক্ষসের মুখে পরবে৷ ভাইজানের কাছেই ফুল নিরাপদ থাকবে।’
স্বামীর কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারলো না কলি বেগম। মায়ের মন তো খচখচ করবেই। শুনেছি, বিপদ এলে মায়ের মন আগেভাগে টের পেয়ে যায়। তেমন কিছু কি হতে চললো?
#চলবে