Home "ধারাবাহিক গল্প "খাঁন বাড়ির ছেলে খাঁন বাড়ির ছেলে পর্ব-০১

খাঁন বাড়ির ছেলে পর্ব-০১

0
খাঁন বাড়ির ছেলে পর্ব-০১

প্রথম পর্ব
খাঁন বাড়ির ছেলে,
রুচিরা সুলতানা

আম্মার জন্য নরম শাড়ি নেন, শক্ত কাপড়ের শাড়ি আম্মা গায়ে রাখতে পারেনা… সামলাতেও পারে না ।

মিনুর কথা শেষ হওয়ার আগেই, ধমকে উঠলো মহসিন,

“আমার মার জন্য কি শাড়ি নিব, সেই বুদ্ধি তোমার কাছ থেকে নিতে হবে না। বিদেশ থেকে এসে আমি সুতি শাড়ি কিনব, আমার মার জন্য ?তোমাকে কতবার বলছি, কথা কম বলতে।মহিলাদের বেশি কথা বলা,আমি একদম পছন্দ করি না। আমি খাঁন বাড়ির ছেলে… খাঁন বাড়ির ছেলেরা কখনো মহিলাদের কথায় চলে না ।”

এরপর শাড়ি বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে মহসিন বললো,

“একে তো ঈদ, তার উপরে বিয়ে… আমার মার জন্য নাকি আমি সুতি শাড়ি নিব, হাহ্”

মিনু মৃদু স্বরে বললো,

“সুতি শাড়ি নিতে হবে কেন ?নরম কাপড়ের মধ্যেও দামি শাড়ি আছে।”

“আবার কথা বলতেছ, চুপ করে থাকো তুমি।”

দোকানের লোকজন সবাই মিনুর দিকে তাকিয়ে আছে। মিনু চোখের পানি লুকিয়ে মুছবে, সে উপায় নেই ।

বুঝছেন ভাই, বিদেশ থেকে আসছি দুই বছর পরে। টাকা পয়সার আলহামদুলিল্লাহ কোন অভাব নাই। আমার ছোট বোনের বিয়ে, তার উপরে ঈদ… এমন শাড়ি কিনব, যে এলাকায় খবর হয়ে যাবে। মহসিন বেশ শক্ত, জরির কাজ করা কিছু ঝলমলে শাড়ি নিলো… নিজের মায়ের জন্য।

দোকানের লোকজনও সবাই মহসিন এর কথায় সায় দিচ্ছে। কেউ কেউ মিনুর দিকে আড়চোখে দেখছে ।

মিনু জানেনা, এত কম বুদ্ধি নিয়ে মহসিন কিভাবে চলে।

এই পৃথিবীতে, মহসিন সবার কথা শুনে।শুধুমাত্র মিনুর কথা ছাড়া। মিনু যদি বলে, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে … মহসিন বলবে, সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে।

মিনু যদি মহসিন এর পাতে মাছের মুড়ো দেয়, মহসিন বলবে আমি লেজ খাব… যদি লেজ দেয়, তাহলে বলবে আমি পেটি খাব।

সবকিছু করা যাবে, কিন্তু ব‌উয়ের কথামতো মহসিনের চলা যাবেনা।

একে বিয়ে বাড়ি, তার উপরে ছেলে বিদেশ থেকে এসেছে। চারপাশে যা অবস্থা,এই কথা জানাজানি হলে চোর ডাকাতের একটা ভয় আছে।নিজেকে তো সাবধান থাকতে হবে।

সেজন্য মিনু মহসিনকে বলেছিল,
সে যে বিদেশে থাকে বা টাকা পয়সার কোন আলাপ, যেন বাইরের কারো সাথে না করে। কিন্তু আজকে সারাদিনে যত জায়গায় গিয়েছে মহসিন, সবাইকে বলেছে যে, সে বিদেশ থেকে এসেছে। টাকা পয়সার কোন অভাব নেই তার। বোনের বিয়ে ঈদের পরে।

মহসিনের এই স্বভাবের জন্য, মিনু সচরাচর ওর সাথে কোথাও বের হয় না।

কিন্তু ঈদের পর ননদ মিতুলের বিয়ে।ঈদের এবং বিয়ের কেনাকাটা অনেক। মিনুর শাশুড়ি অনেক অনুরোধ করলো,তাই বাধ্য হয়েই আজ মহসিনের সাথে বের হয়েছিল।

দুপুর থেকে এই রাত পর্যন্ত… রিক্সাওয়ালা, সিএনজিওয়ালা,শাড়ি কাপড়ের দোকানী, ফলওয়ালা, ইফতারের জন্য যে হোটেলে ঢুকেছিল সেই হোটেল বয়… সবার সামনে, মিনু মহসিনের ধমক খেয়েছে ।

এই ঘটনা যদিও আজকে নতুন কিছু নয়। তবু এতদিন পর স্বামী বিদেশ থেকে এসেছে, মনে মনে একটু হলেও আশা ছিল মিনুর,যে মহসিন হয়তো একটু হলেও পাল্টেছে । কিন্তু আজকে বের হবার পর মিনুর মনে হচ্ছে, মহসিন এই জীবনে কখনো বদলাবে না।

বিয়ের পর থেকেই , আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বাইরের লোকজন, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, দেবর, সবার সামনে সে বউকে ধমকাতে খুব পছন্দ করে।

সে বউয়ের কথা মতো চলে না, এটা প্রমাণ করার জন্য কেমন একটা অস্থির হয়ে থাকে। যেন বউ সবসময় শুধু খারাপ বুদ্ধি দেয়।

মহসিনের ধারণা, যারা বউয়ের কথা শুনে চলে তারা সত্যিকারের পুরুষ না কিংবা তারা মানুষ হিসেবে খুব একটা বুদ্ধিমান না।

মিনুকে সবার সামনে ধমক দেয়ার অভ্যাস ছাড়া, মহসিনের আর কোন খারাপ স্বভাব নেই ।যদি থাকতো, তাহলে মিনু হয়তোবা সংসারটা করতে পারতো না।

দুনিয়ার সব মানুষের সাথে, মহসিন অত্যন্ত হাসিমুখে কথা বলে। পরিবারের সব সদস্যদের প্রতিও যথেষ্ট দায়িত্বশীল। এমনকি নিজের বেডরুমে ঢোকার পর, মিনুর সাথেও যথেষ্ট দায়িত্বশীল আচরণ করে।
কিন্তু সারাদিন এর ওর সামনে খারাপ ব্যবহার করার পর, যখন একা ঘরে মিনুকে ভালোবাসা দেয়ার চেষ্টা করে… তখন মিনুর কেমন যেন অসহ্য লাগতে থাকে।

মহসিন বিয়ের পর থেকেই বিদেশে থাকে। ছুটি পেলে দেশে এসে মাস দুয়েক থেকে যায়। এখনো ওদের ছেলে মেয়ে হয়নি। ওর শ্বশুর-শাশুড়ির ধারণা ছেলে মেয়ে হয়ে গেলে, মহসিন হয়তোবা আর মিনুর সাথে এরকম আচরণ করবে না।মিনুও সেই আশাতে আছে।


ঈদের পরপরই বাড়িতে বিয়ে, অনেক আত্মীয় স্বজন আসবে… প্রচুর কাজ ঘরে। তাছাড়া আজকে ঈদের দুপুরে, মিতুলের হবু শ্বশুর বাড়ির লোকজন এসেছিল।মিতুলের শাড়ি গহনা এসব দিয়ে গেছে। সারাদিন তাই মিনুর উপর বেশ ধকল গেছে।

শুধু মিনু নয়, বাড়ির বাকি সদস্যরাও খুব ক্লান্ত। রোজা শেষ হলে ,সবার খাওয়া দাওয়ার টাইম এদিক ওদিক হয়, প্রথম কয়দিন মিনুর শ্বশুর শাশুড়ি একটু অসুস্থ বোধ করে। ওরা তাই একটু জলদি শুয়ে পড়েছে।

আগামীকাল থেকে বাবুর্চি সব রান্না করবে, তখন ঘরে আর এতো ঝামেলা থাকবে না। মিনু কোনরকমে রাতের খাবারের পর্ব চুকিয়ে, বিছানায় এসে পড়েছে।
কখন যে ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায়নি। হঠাৎ কি একটা শব্দ শুনে মিনুর ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘরের মধ্যে অন্ধকারে কেউ হাঁটছে।ঘরে কি চোর ঢুকলো?

মহসিন পাশেই গভীর ঘুমে, মিনু মহসিনকে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিলো।
“এই, উঠেন তো, ঘরে কেউ ঢুকেছে মনে হচ্ছে…চোর এসেছে মনে হচ্ছে ”

চলবে…
(পরের পর্বে শেষ হয়ে যাবে)