Home "ধারাবাহিক গল্প "খাঁন বাড়ির ছেলে খাঁন বাড়ির ছেলে পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

খাঁন বাড়ির ছেলে পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

0
খাঁন বাড়ির ছেলে পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

খাঁন বাড়ির ছেলে,
শেষ অংশ

সকাল থেকে মহসিন নিজেও অনেক ছোটাছুটি করেছে, সে মরার মত ঘুমাচ্ছিল ।মিনুর ধাক্কা খেয়ে কোলবালিশটা আরও শক্ত করে ধরে, পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো মহসিন। সাথে বিড়বিড় করে কি একটা বলল, মিনু বুঝতেও পারল না।

মিনুর সারাটা দিন এত ধকল গেল, তার উপর মেজাজটা সন্ধ্যা থেকে চরম খারাপ ছিল।
মিতুলের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সামনে,মহসিন খুব হাসির পাত্র বানিয়েছে মিনুকে। এখনো যাদের সাথে আত্মীয়তা হয়নি ,তাদের সামনে এধরনের মজা মোটেই মানতে পারছেনা মিনু। সবাই এত হাসাহাসি করল… ভাবলেই, অপমানে মিনুর চোখে পানি চলে আসে। কোন্ আক্কেলে যে সে,মহসিনের সামনে গান গাইতে গেলো!

ঘটনা হলো…আজকে সন্ধ্যার দিকে, মিতুলের শ্বশুরবাড়ির লোকজন সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষে, ছাদে চা খাচ্ছিল আর গল্প করছিল। গল্প করতে করতে, কেউ কেউ গানও করছিল। শেষে ওরা সবাই মিনুকে অনুরোধ করল, একটা গান শোনানোর জন্য।মিতুল‌ও খুব করে বলছিল, একটা গান শোনাতে।

মিনু সরল মনে…খুব দরদ দিয়ে, মন থেকে একটা গান ধরেছিল।

“কত যে তোমারে বেসেছি ভালো, সেকথা তুমি যদি জানতে…”
মিনুর গলার সুর ততটা হয়তো ভালো নয়… কিন্তু তবু, গান শেষ হবার পর সবাই তালি দিল।এটাই তো ভদ্রতা। তখনই মহসিন সবার সামনে বললো,

“আচ্ছা মিনু, তুমি রেডিও বা টিভিতে গান করো না কেন?”

মিনু তো ভীষণ খুশি … ভেবেছিল, এই প্রথম মহসিন সবার সামনে বউয়ের প্রশংসা করল। কিন্তু মিনুর খুশিতে পানি ঢেলে দিয়ে, মহসিন বললো… রেডিও বা টিভিতে গাইলে তো অফ করে দিতে পারতাম, তোমাকে তো থামানো যাচ্ছিল না। গেয়েই যাচ্ছো… গেয়েই যাচ্ছো …”

মহসিনের কথায়…ছাদ শুদ্ধ লোক, হো হো করে হেসে উঠলো। কেউ খেয়ালও করলো না, অন্ধকারে মিনুর চোখে পানি চলে এসেছিল।

মহসিন এসেছে চল্লিশ দিন হয়েছে, আরো বিশ দিন থাকবে সে। মিনুর মনে হচ্ছিল, বাকি বিশদিন… সে মহসিনের সাথে আর কোন কথাই বলবে না।

কিন্তু এখন বাড়িতে চোর ঢুকেছে, মান অভিমানের সময় নয় এটা।

মিনু মহসিনের কানের কাছে গিয়ে, সামান্য জোরে বললো… “চোর এসেছে মনে হয় বাড়িতে, ওঠেন না একটু।”

“চোর” শব্দটা কানে যাওয়ার সাথে সাথে, মহসিন লাফ দিয়ে উঠেই, “চোর চোর” বলে চিৎকার শুরু করে দিল।

সাথে সাথে সাত আটজন লোক ওদের ঘরে ঢুকে, লাইট জ্বালিয়ে, ঘিরে ধরল। সবার মুখে গামছা বাঁধা, হাতে ধারালো ছুরি।

চোর নয়…ডাকাত!

ডাকাতগুলোর মধ্য থেকে একজন বলল, “ভালোয় ভালোয় সিন্দুকের চাবিটা দিয়ে দে… তাহলে কারো কোন ক্ষতি হবে না। কোন রকমের চালাকি করলে, এখানে কিন্তু আজকে লাশ পড়বে।”

ওদের কথা শুনে, মহসিন হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল।

মিনু বেশ সাহসী মেয়ে।সে বুঝে গেল, সিন্দুকের খবর যেহেতু ওদের কাছে আছে, তার মানে ওরা বেশি দূরের লোক নয়।

মিনু বললো, “চাবি আমার শাশুড়ির কাছে, আমি চাবি এনে দিচ্ছি। আপনারা যা নেয়ার নিয়ে যান, কিন্তু আমার শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরে আসবেন না। ওরা অনেক অসুস্থ… ওরা এসব সহ্য করতে পারবে না। কান্নাকাটি করবে। আমি এক্ষুনি চাবি এনে দিচ্ছি,… এক্ষুনি এনে দিচ্ছি…”

মিনু দৌড়ে গিয়ে চাবি নিয়ে এলো।

ওরা যখন সিন্দুক থেকে গয়নার ব্যাগটা বের করলো ,আর টাকা বের করলো …মহসিন কাঁদতে কাঁদতে, খাট থেকে লাফ দিয়ে নেমে এলো।

“ভাই… আমার বোনের বিয়ে ভাই। আমার একমাত্র বোন, ওর গয়না গুলা নিবেন না ভাই… দয়া করেন, ভাই।”

মহসিন ,ওদের হাতে থাকা গয়নার ব্যাগটা ছুঁতে চাইলো।

যে ডাকাতের হাতে গয়নার ব্যাগ, সে খুব রেগে গেল। মহসিনকে একটা ধাক্কা দিয়ে, মাটিতে ফেলে দিল সে।

অন্য একটা ডাকাত ,হাতের ছুরি নিয়ে মহসিনের কাছে এলো…
“আর একটা শব্দ করলে, একদম শরীর থেকে মাথা আলাদা করে দিব”

মহসিনের ভীত, আতংকিত , অসহায় চেহারা দেখে… মিনু সহ্য করতে পারলো না।ছুটে ওদের সামনে এসে, ছুরিটা ধরলো, মিনু…

ডাকাতের সামনে হঠাৎ এসে পড়ায়,ছুরির আঘাতে মিনুর শরীরে বেশ খানিকটা জখম হলো, প্রচুর রক্ত বের হচ্ছিলো…

ডাকাতগুলোর মধ্যে সম্ভবত নেতা সে … সে বলল, “জিনিস পেয়ে গেছি, আর ঝামেলা করিস না… চল বের হয়ে যাই।”

বলতে না বলতে, কিছু গালি দিতে দিতে,ঝড়ের বেগে লোকগুলো গয়নার ব্যাগ আর টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল।

চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়ির লোক সবাই উঠে গেছিল আগেই,কিন্তু ভয়ে কেউ ভিতরে আসার সাহস পাচ্ছিল না।
ডাকাতগুলো বের হয়ে যেতেই ,বাড়ির লোকজন সবাই দৌড়ে এলো…

মিনু মাটিতে পড়ে আছে, জ্ঞান নেই ওর।

বাড়ির লোকদের দেখে, মহসিন এবার আরো জোরে কেঁদে উঠলো…

“টাকা পয়সা, গয়নাগাটি সব গেসে আম্মা, আমার দুঃখ নাই। কিন্তু আমার মিনুরে তো আর পাবো না গো আম্মা।আমার মিনু আমার মিনু… মিনুরে ছাড়া আমি বাঁচবো না… আমার মিনু, ও আমার মিনু। ”

হুড়াহুড়ি করে সবাই মিনুকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটল।

বাড়ি থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত, সারা রাস্তা মহসিনের একই বিলাপ।

“মিনুরে ছাড়া আমি বাঁচবোনা, ওরে… আমার মিনুরে ছাড়া আমি বাঁচবো না।”

বাড়ির লোক, আশেপাশের লোক, নার্স… কেউ মহসিনকে থামাতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত, ডাক্তার সাহেব এসে, মহসিনকে জোরে একটা ধমক দিলেন।

ডাক্তারের ধমক খেয়ে মহসিনের চিৎকার থামলো, কিন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে, মিনু মিনু ডেকেই যাচ্ছিল।

এরমধ্যে পুলিশও চলে এসেছে। মিনুর জ্ঞানও ফিরেছে।
মিনু চোখ খোলার পর মহসিনের কান্নাও থেমেছে।

পুলিশ এলো, বাড়ির লোকের স্টেটমেন্ট নিতে।

মহসিন বললো,” আমার সব শেষ হয়ে গেছে, স্যার। কয় কোটি টাকার গয়না, আমার জানা নাই, স্যার। সব গয়না নিয়ে গেছে। দুইদিন পর আমার বোনের বিয়ে, স্যার।”

মিনু আস্তে আস্তে বলল,” আমি একটু বলি, স্যার? আমাদের আসলে সেরকম কোন ক্ষতি হয়নি। সিন্দুকে যা গয়না ডাকাত নিয়েছে, সেগুলো সব ইমিটেশনের। সোনার গয়না আমি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রেখেছিলাম।চারপাশে এত অঘটন ঘটছে, আর আমাদের বাড়িতে বিয়ে…এই খবর অনেক জায়গায় ছড়িয়ে গিয়েছিল। তাই আমার শাশুড়ির সাথে পরামর্শ করে, আমি একটু সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম।
টাকাও সামান্য কিছু সিন্দুকে রেখে বাকিগুলো সরিয়ে রেখেছিলাম।”

মিনুর কথা শুনে, পুলিশের লোকজন সব তাজ্জব হয়ে গেল।
আপনি কি আগে থেকেই জানতেন,যে আপনাদের বাড়িতে ডাকাতি হবে?কি ভেবে আপনি ডুপ্লিকেট গয়না সিন্দুকে রেখেছেন?

মিনুর দিকে পুলিশের সন্দেহজনক দৃষ্টি দেখে, মিনুর শ্বশুর উঠে এলেন।

“কি বলবো, স্যার? আমার ছেলেটা বিদেশ থেকে বোনের বিয়ে দিতে এসেছে…অতি আনন্দে চেনা অচেনা বহু মানুষের কাছে সে এই কথা বলেছে যে,বিয়ে উপলক্ষে আমরা অনেক খরচ করবো।সে বিদেশ থেকে সেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।ছেলের মুখ তো বন্ধ করতে পারিনি,তাই বৌমা আমার গিন্নীকে বলে এই কাজ করেছে। বৌমার কথা যদি না শুনতাম, আজকে কি যে হতো!

পুলিশের লোকজন বিষয়টা বুঝতে পেরে বললো,

“ম্যাডাম, আপনার বুদ্ধি তো মারাত্মক! সোনার গয়না সরিয়েও রেখেছেন… আবার ডাকাত যেন বুঝতে না পারে, সেজন্য ইমিটেশনের গয়নাও সিন্দুকে রেখে দিয়েছেন! এরকম সচেতন বউ সবার ঘরে থাকলে, আমাদের কাজ কতো সহজ হয় বলেন তো।”

মহসিন পাশেই একেবারে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো, যেনো সে ই ডাকাতি করেছে…

পাশ থেকে মিতুল এসে, মিনুর কানে কানে বলল… “ভাবি তোমার জন্য, যা বিলাপ করল আজকে ভাইয়া! বউ পাগলা এমন মানুষ এই পাড়ায় আর একটাও নাই। আমার ভাইয়ের উপর তুমি যদি আর কখনো রাগ করো, তোমার খবর আছে।”

মিনুরও মনে হলো ,মহসিন তাকে সত্যি ভীষণ ভালোবাসে। হয়তো একটু বেশিই ভালোবাসে। তাই সেটা আড়াল করতে গিয়ে,সারাক্ষণ উল্টা চোটপাট করে‌। বোকা মানুষের ভালবাসা মনে হয় এমনই হয়।

ঠিক এই সময়ে ডাক্তার সাহেব এলেন,

মহসিনের কান্নাকাটি ডাক্তার আগেই দেখেছিলেন। তিনি মহসিনের কাছে না গিয়ে মিনুর শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে এসে বললেন,

“পেশেন্টের শরীর থেকে বেশ অনেক রক্ত বের হয়ে গেছে। উনাকে ভালোমতো রেস্ট নিতে হবে কয়েকদিন ।জানেন তো… উনি প্রেগন্যান্ট ।”

মিনুর শশুর শাশুড়ি একসাথে বলে উঠলেন… “আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ, কি খুশির খবর দিলেন, ডাক্তার সাহেব।”

হঠাৎ পাশ থেকে মহসিন দৌড়ে এসে, ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরে… ডাক্তারের গালে এমন জোরে চুমু দিল! সেই চুমুর শব্দ, আশেপাশের সবাই শুনতে পেল।

ডাক্তার সাহেব বললেন,” আরে কি করছেন আপনি?”

মিনুর শ্বশুর বললেন,” এটা একটা আহাম্মক ছেলে, ডাক্তার সাহেব। খাঁন বাড়ির আস্ত একটা আহাম্মক ছেলে এইটা।”

মহসিন বলল,” মাথা ঠিক নাই, ডাক্তার সাহেব। খুশিতে আমার মাথা ঠিক নাই।”

উপস্থিত সবাই হেসে উঠলো।

মিনুর মনে হলো, আজকের ডাকাতির ঘটনাটা ওর জীবনে প্রয়োজন ছিল, নাহলে জীবনটা ভুল অভিমানেই কেটে যেতো।

মিনুর আরো মনে হল, এই বোকা লোকটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে।

সমাপ্ত
রুচিরা সুলতানা।