চায়ের কাপেই জমুক প্রেম পর্ব-১১

0
135

#চায়ের_কাপেই_জমুক_প্রেম (পর্ব ১১)
সায়লা সুলতানা লাকী

আজ যখন উর্মিকে দেখল মৃদুল তখনই চোখ সরিয়ে নিল। মনে মনে ঠিক এমনভাবেই ও আশা করেছিল দেখবে বলে। ভালোবাসার উপর ওর বিশ্বাস আরও বেশি পাকাপোক্ত হল। ওর ভালোলাগা, আনন্দ, উচ্ছ্বাস আপাতত মনের সিন্দুকে আটকে রাখল। নিজের আচরণের উপর বিন্দুমাত্র তার প্রভাব পড়তে দিল না। বাড়তি কোনো কথা না বলেই ওকে বাইকে উঠিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটে চলল।

উর্মি ভেবেছিল মৃদুল ওকে দেখে খুব খুশি হয়ে যাবে কিন্তু তাতো হলোই না এমন কী ওর দিকে ভালো করে চেয়েও দেখল না। অন্যসময় সরাসরি না হলেও আড়ে আড়ে দেখতো কিন্তু আজ তাও করল না। সকাল থেকে এত পরিশ্রম করল মৃদুলকে খুশি করতে কিন্তু তা যখন ব্যর্থ হল তখন মন এমনি এমনি ভেঙে গেল। সারাটা পথ আর কোনো কথাই বলল না মৃদুলের সাথে। অন্য দিন হলে অন্তত জিজ্ঞেস করত “আজ কোথায় যাচ্ছি তার সাথে দেখা করতে?” আজ সেই প্রশ্নটাও করল না।

একটা সুন্দর ক্যাফেটেরিয়ায় এসে ঢুকল ওরা দুজন। গাছ গাছালি দিয়ে বেশ সুন্দর করে সাজানো এটা। পুরো পরিবেশটা দেখে হুট করেই মনে হবে মানুষগুলো কোনো জঙ্গলের ভেতর চেয়ার টেবিল পেতে বসে আছ।

উর্মি কোনো প্রশ্ন না করেই মৃদুলের পেছন পেছন এগিয়ে সামনে এসে মনে হল এক কঠিন ঝাটকা খেলো। সামনে ফয়সালের সাথে অর্নি বসে আছে। “ইয়া খোদা তুমি রহম কর!” মনে মনে দুই তিনবার বলে ঢোক গিলল সম্মুখ অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য। অর্নি এখানে থাকবে তা ও কল্পনাও করতে পারেনি, পারলে আর আজ এত বড় রিস্ক নিত না।

মৃদুলের সালাম শুনে ওদের দিকে তাকাতেই অর্নির চোখ গেল উর্মির দিকে আর তখনই ও ফিক করে হেসে ফেলল। উর্মি খেয়াল করল ফয়সাল যে অর্নিকে ইশারা করল না হাসতে। ভেতরে ভয় চেপে রেখেই পুরো বিষয়টা না দেখার ভাব করে মৃদুলের এগিয়ে দেওয়া চেয়ারটায় বসে পড়ল। মৃদুল পাশের চেয়ারটায় বসতেই ফয়সাল বলল
— আজকে কিন্তু তোমরা লেট করলে।
— স্যরি ভাইয়া, আসলে আমি লেট ছিলাম না। উর্মিই…
— হ্যা আমিই লেট করেছি। আমার কিছু সমস্যা ছিল বাসায় তাই ওসব ম্যানেজ করে আসতে সময় লেগেছে, তো! এসব প্রসঙ্গে কথা না বলে আসল প্রসঙ্গে কথা বলুন।
— এই তুই এভাবে কথা বলছিস কেন? অসভ্য হয়ে যাচ্ছিস দিনকে দিন।
অর্নির ধমকে এবার উর্মিও চুপ হয়ে গেল। ওর ভয় কখন আবার মুখ খুলে ফেলে, আর অপমান করে ওকে। ইদানীং এর হাবভাব বোঝা বড় দায়।
ফয়সাল হেসে অর্নিকে উদ্দেশ্য করে বলল
— তোমরা দুইবোন কী সবসময় লেগে থাকো? ভেবে দেখেছো ও তোমার জন্য কত কী করছে?
— আমার জন্য না ছাই, নিজের পথ পরিস্কার করছে। তলে তলে কী কী হচ্ছে তা সবই বুঝি।

উর্মি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ওকে চুপ থাকতে ইশারা করে মৃদুল কথা বলতে শুরু করল–

— ভাই, আজ আমি আপনাকে একটা ছোট্ট ভিডিয়ো দেখাবো বলে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু…
— কিন্তু কী?
— না মানে, অর্নি আপু…
— ভিডিয়ো দেখবে ফয়সাল, আমিতে আপনার কি সমস্যা বলেন তো দাদির খাটি সোনা?
— এক্সকিউজ মি!
— উফফ আপু, এসব কী? আমি কিন্তু বাসায় বলে দিব…
— তুই কিছুই বলবি না, আমার নাম করে তুই কী করে বেড়াস তা আমি…
—- ইশশশশ, এটা পাবলিক প্লেস।
এবার দুইবোনই নড়েচড়ে চুপ করে বসল। মৃদুল নিজের মোবাইলটা বের করে ওখান থেকে একটা ভিডিয়ো ফয়সালের হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড করে দিল। এরপর বলল
— ভাই খুব মনোযোগ দিয়ে না টেনে ভিডিয়োটা পুরোপুরি দেখবেন বলে আশা করি। রেগে গিয়ে রেখে দিয়েন না প্লিজ। ইচ্ছে হলে এখনই দেখতে পারেন কিংবা বাসায় গিয়ে ধীরেসুস্থে দেখবেন। প্লিজ ভাইয়া এটা একটা বিনীত অনুরোধ অবশ্যই পুরোটা দেখবেন। একটা কথা না বললেই নয়—
আমি চলার পথে বহুবার সামনে বিশাল দেয়াল পেয়েছি। যদি প্রথম দেয়ালটা দেখে থেমে যেতাম তবে হয়তো আমার জীবন ওখানেই থেমে যেত। ওই সীমার মধ্যে কাটিয়ে দিতাম এতটা বছর। কিন্তু না, আমি তা করিনি। আমি দেয়ালটা টপকে সামনে এসেছি। নতুন এক পৃথিবী দেখেছি। মনে হয়েছে নতুন করে আবার নিজেকে আবিস্কার করেছি। আমরা দেয়াল দেখে থমকে যাই। ওখানেই আমাদের সীমানা নির্ধারণ করে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেই। কিন্তু একবার যদি ওই দেয়াল ভাঙতে পারি তবে জীবন আরো সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
— কে বলেছে আপনাকে যে, সবসময় দেয়ালের ওপারে ভালো কিছুই থাকবে জীবনের জন্য? খারাপও তো থাকতে পারে?
— সেটা জানতে হলেও অন্তত আপু আপনাকে দেয়ালটা ভাঙতে হবে, ওটা টপকে ওপারে যেতে হবে।
— যদি খারাপই থাকে তবে কষ্ট করে টপকে যাওয়ার দরকার কী? অযথা সময় নষ্ট। এসব বোকাদের কাজ..
— উঁহু আপু, এগুলো অলস মস্তিষ্কের ভাবনা…
— আচ্ছা আমি ভিডিয়োটা দেখছি, তোমরা এসব যুক্তি, পালটা যুক্তি দেওয়ার খেলা বন্ধ কর। বলেই ফয়সাল ভিডিয়ো টা অন করল।
মৃদুল সাথে সাথে বলল “ভাইয়া ইয়ারফোনটা ইউজ করুন প্লিজ।”
ফয়সাল তাই করল–
প্রথমই একটা মেয়েকে দেখে ও চমকে উঠল। মোবাইল স্ক্রীন থেকে মাথাটা তুলে একবার মৃদুলের দিকে তাকালো। মৃদুল হাতের ইশারায় ওকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত করল। এরপর ফয়সাল আবার মোবাইল স্ক্রীনের উপর ফোকাস দিল– মেয়েটার চোখ মুখ ফোলা, মনে হল ও খুব কেঁদেছে একটু আগে। মেয়েটা বেশ আদুরে গলায় বলছে—
” আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, আমি জানি না আপনি কে? তবে আপনার রিকোয়েস্টের মধ্যে ইউজ করা ছোট্ট একটা শব্দের কারণে আমি আগ্রহী হয়েছি আপনার সাথে কথা বলতে। দেখতেই পাচ্ছেন আমি একটু অসুস্থ, আপাতত বেড রেস্টে আছি। এরপরও আমি ওই শব্দটার টানে মানে কী বলব? কী বলে বোঝাবো, নিজেই বুঝতেছি না— আমার জীবনের একটা অনেক বড় দুর্বলতা ওই একটা শব্দে লুকানো। ঠিক কেমন দুর্বলাতা — মেয়েটা আর কিছু বলতে পারল না, এবার কেঁদে ফেলল। দুই হাত তুলে চোখ মুখ দেখে কিছুক্ষণ কাঁদল।
(এত মিল কীভাবে হয়? মেয়েটা কাঁদলেও শরীর কাঁপে। ফয়সাল অবাক হয়ে দেখছিলো মেয়েটাকে।)
মৃদুল— প্লিজ আপনি কাঁদবেন না, আমি আসলে কী শব্দ ইউজ করেছি তা বুঝতে পারছি না। আমার কথায় কষ্ট পেয়েছেন দেখে নিজেই লজ্জিত হচ্ছি…
মেয়ে— প্লিজ না, আপনি লজ্জিত হবেন না। প্লিজ..
মৃদুল– আমি আসলে আপনার ভাই ফয়সাল সাহেব….
মেয়ে— আমার ভাই… বলেই মেয়েটা আবার কেঁদে উঠল। জি পৃথিবীতে আমার একটা ভাই আছেন, ওনার নাম ফয়সাল। আমার আম্মুর বুকের মানিক, আমার আম্মুর প্রথম আদর, প্রথম সন্তান। জানেন, আমার আম্মুর প্রতিটা মুহূর্তের কষ্ট ঠিক এখন আমি অনুভব করতে পারছি। ইউ নো, আমার একটা ছেলে হয়েছে কিছুদিন আগে। ওর মুখটা দেখার পর থেকে আমি আম্মুর বিগত বিশ বছরের প্রতিটা মুহূর্তে ফিলিংস নিজে ফিল করতে পেরেছি। বিশ্বাস করেন মিস্টার মৃদুল আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে, প্রতি ঈদে আম্মুর মুখ লোকানো চাপা আর্তনাদ খুব কাছ থেকে আমি দেখেছি। তখন বলতাম আম্মু শুধু শুধু ওই মানুষটার জন্য এত কষ্ট পায়। অযথা তাকে এত মিস করে। কিন্তু এখন বুঝি একটা সন্তান তার মায়ের কাছে কী? আম্মু সবসময় আমাকে সাহস দিতেন আমার যে কোনো বিপদে আপদে এই বলে যে আমার একটা বড় ভাই আছেন তিনি যে কোনো সময় আমার পাশে এসে দাঁড়াবেন। আম্মু শুধু আমাকে স্বপ্নই দেখিয়েছেন বাস্তবে তা কখনোই সম্ভব হয়নি। আমি আজও ভাই পাইনি। তিনি আমার স্বপ্নজগতেরই বড় ভাই হয়ে আছেন বাস্তবে…
মৃদুল— বাস্তবে কখনো চেয়েছেন ভাই আসুক আপনার জীবনে?
মেয়ে– প্রতি মুহূর্তে, আমাকে দেখে তো বুঝতেই পারছেন আমি দেখতে কেমন? স্কুল কলেজে পড়ার সময় বহুবার ইভটিজিংএর শিকার হয়েছি। বাসায় এসে কেঁদেছি। আম্মু বলত তোর বড় ভাইটা পাশে থাকলে দেখতি কেউ কোনোদিন তোকে কিছু বলত না। তখন প্রায় কল্পনা করতাম ভাইয়া বীরের বেশে এসে আমাকে ছায়া দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্য একটা ফিলিংস কাজ করত তখন মনে। কোত্থেকে যে এত সাহস এসে ভর করত মনে তা জানি না। তবে পরেরদিন আবার পথে নামতে সাহস পেতাম শুধু এইটুকু ভেবেই যে আমার একজন বড় ভাই আছেন।
মৃদুল– তাহলে আপনার আর আপনার ভাইয়ের মাঝের দেয়ালটা ভাঙেন নাই কেন?
মেয়ে— সাধ্য ছিলো না। ভাইয়া তার চারপাশে বিশাল এক দূর্গ গড়ে তুলেছিলেন ততদিনে। আম্মুকে পর্যন্ত অস্বীকার করতেন তিনি। আম্মু তাকে একবার দেখার জন্য কতবার যে গিয়েছিলেন ওই বাসায় কিন্তু তিনি দেখা করেননি, ওই বাসায় পর্যন্ত ঢুকতে দেননি কেউ। আম্মু নিরাশ হয়ে ফিরে আসতেন প্রতিবার। ঘরের দরজা আটকে ভেউভেউ করে কাঁদতেন। আমি আর আব্বুও দরজার বাহির থেকে তখন আম্মুর সাথে কাঁদতাম। আব্বু বলত আব্বু মারা গেলে আম্মুর কী হবে? আব্বু কখনোই আমাকে নিয়ে ভাবত না, শুধু বলত “তোর আম্মুর কী হবে? ওর তো দুনিয়ায় সব থেকেও নাই।”
আমি তখন থেকে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আম্মুকে কখনো কষ্ট পেতে দিব না। এতে যদি আমার কষ্ট হয় হোক।
মৃদুল— আন্টি কেমন আছেন?
মেয়ে— ভালো আছেন। নাতি পেয়ে খুব খুশি। তবে জানেন, আম্মু এবার এসে শুধু ভাইয়ার গল্প করে। বলে ভাই আগের মতো নেই। অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগের মতো দরদ মাখিয়ে আম্মু বলে ডাকে না। খাবার নিয়ে আবদার করে না।
আমি বোঝাই যে ভাইয়া এখন বড় হয়েছে, পরিবর্তন তো হবেই। আসলে সমস্যা হল আম্মু ঠিক যেখানটায় ভাইয়াকে ছেড়ে এসেছিল আম্মুর মনে ভাইয়া এখনো ঠিক সেই জায়গাটাতেই আছে। সময়ের সাথে সাথে যে জায়গার পরিবর্তন হয়েছে তা আম্মুর বেলায় হয়নি। আম্মু এখনো আশা করে ভাইয়া বাহির থেকে এসে আম্মু বলে ঝাপিয়ে পড়বে তার বুকে। খেতে বসে এখনো বায়না করবে “খাওয়ায় দাও” বলে।
সবচেয়ে ভয়ংকর কথা কী জানেন—
আম্মু বলেন ভাইয়া আম্মুকে তার কাছে নিয়ে গেলেও মন থেকে এখনো আম্মুকে ভালোবাসতে পারেনি। পারবে কেনো, আম্মু যে তার ছেলেবেলাকে এলোমেলো করে দিয়েছিল। আম্মু এখনো কাঁদে আর বলে আমার সেই এক সীদ্ধান্তে আমি আমার ছেলের ছেলেবেলাটা নষ্ট করে দিয়ে এসেছি। ও কোনোদিনও আমাকে ক্ষমা করবে না। আমি ওর কাছে পাপী, বড় জঘন্য পাপী। ওর এই অবহেলা আমার প্রাপ্য। কাছে থেকেও ছেলে আমার থেকে অনেক দূরে, এটাই আমার শাস্তি।
আম্মু যখন এভাবে বলে তখন আমি পালটা বলি “এমন হলে আর তার কাছে তোমার যাওয়ার দরকার কী? থাকো তুমি এখানেই থাকো আমার কাছে থাকো।”
আম্মু বলেন নারে মা, ওর ওই অভিমানেও আমি আমার জন্য ভালোবাসা খুঁজে বেড়াই। এতদিনের খড়াপড়া চোখ এত অল্পতেই কী আর সিক্ত হবে? বাকি জীবন ওর ওই মুখ দেখে কাটিয়ে দিলেও তো এই তিয়াস মিটবে না।
আমার ছেলে যখন খেতে বসে জিজ্ঞেস করে “তুমি ঔষধ খেয়েছো? ডাক্তারের কাছে গিয়েছো?”
তখন মনে হয় এই তো আমার ফয়সাল, এইতো আমার ছেলে। ও আমাকে ভালো না বাসলে কী আর আমার খোঁজ নিত? তখন মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখী মা।
মৃদুল– ফয়সাল ভাই অবশ্যই আন্টিকে ভালোবাসেন হয়তো তার প্রকাশ ভঙ্গি ভিন্ন। তিনি বিয়ে করতে চাচ্ছেন, আই মিন তিনি একটা রিলেশনে আছেন। এবং সিচুয়েশন এমন যে যত দ্রুত সম্ভব বিয়েটা হওয়া উচিত, মেয়ের বাড়ি থেকে চাপ এসেছে। অথচ ফয়সাল ভাই তার মায়ের ফেরার অপেক্ষায় সেই বিয়ে নিয়ে কোনো কথাই বলছেন না। তিনি চাইলে আন্টিকে ছাড়াও বিয়ে করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করছেন না। বুঝতে পারছেন তার জীবনে তার মায়ের জায়গাটা কতখানি? তিনি আন্টিকে প্রচন্ড ভালোবাসেন হয়তো তার অভিমান তাকে এগোতে দেয় না।

এবারও মেয়েটা কেঁদে উঠল, কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলল
— ভাইয়া বিয়ে করবে এটা তো বিরাট আনন্দের খবর। আম্মু শুনলে অনেক খুশি হবেন। কী আজব কথা আম্মুর জন্য বিয়ে আটকে আছে জানলে আম্মু আজই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ছুটবেন দেশে তার ছেলের কাছে।
মৃদুল– আপনি কষ্ট পাবেন না আপনার আম্মু আপনাকে বিপদে ফেলে তার ছেলের কাছে চলে এলে?
মেয়ে— “আম্মুর ছেলে” আসলে সেভাবে ভাবতে শিখিনি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে তাকে ভাই বলেই জেনেছি। ভাইয়ার বিয়েতে আম্মু যাবে তাতে কষ্ট পাবো কেন? হ্যা কষ্ট পাবো এই কারণে যে, আমি যেতে পারব না তাই। আমার আব্বু মারা যাওয়ার পর আমার বিয়ে হয়। আম্মু আর আমার দু’জনেরই বিশ্বাস ছিল আমার কন্যাদান আমার বড়ভাই এসে করবে। আমার হাতটা তুলে আমার বরের হাতে দিয়ে বলবে “আমার বোনকে দেখে রেখো।”
কিন্তু তা হয়নি। ভাইয়া আমার বিয়ের সময় আসেনি। আসলে উনি তো আমাকে বোন বলে স্বীকৃতি দেন না তাই হয়তো আসেননি। কিন্তু আমি ভাইয়াকে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ভাইয়া বলেই জেনেছি। আর খারাপ লাগার তো প্রশ্নই আসে না। আমি তো এর মধ্যেই বড় হয়েছি। আমি আম্মুর ছোট সন্তান তার পাশে থেকেও আম্মুর বেশি আদর জমা থাকত ভাইয়ার জন্য। আমাকে খাওয়াতে বসে গল্প করত ফয়সাল এটা খেতো না ওটাতে ওর এলার্জি, এমন করে রান্না হলে ঘ্যানঘ্যান করত, ওটা খুব পছন্দ করে খেতো। আর যেটা পছন্দ সেটা চোখ বন্ধ করে দুইপ্লেট ভাত খেয়ে ফেলতো।
জানেন আমার তখনো ভাইয়ার জন্য হিংসা হত না বরং মায়া লাগত। মনে হত আমি পাচ্ছি আর ভাইয়া পাচ্ছে না আম্মুর আদর, আম্মুর ছোঁয়া ।

হঠাৎ খেয়াল করল ফয়সালের মোবাইল স্ক্রীনের উপর টপ করে অশ্রুর ফোটা পড়ল।
ওরা দুই বোন নড়েচড়ে বসল ফয়সালের অবস্থা দেখে। অর্নি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই
মৃদুল হাতের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিল। নিজের মোবাইল আর ইয়ার ফোনটা ওদের দুই বোনকে দেওয়ার আগে ভিডিয়োটা অন করে দিল। এরপর নিজে উঠে গেল। কেন যেনো ওর ওখানে আর থাকতে ইচ্ছে করল না।

বেশ খানিকটা সময়ের পর উর্মি এল হাতে করে মোবাইল আর ইয়ারফোনটা নিয়ে। মৃদুলকে মোবাইলটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল
— চলেন, আমার ঋন বাড়াই। মালাই ভাসানো ঘন লিকারের ধোঁয়া উঠানো চায়ের জন্য মনটা আকুপাকু করছে। চা ওয়ালা মামার দোকানেই নিয়ে চলেন প্লিজ।
বলে নিজেই এগিয়ে গেল বাইকের কাছে। মৃদুলও আর কিছু বলল না, চা খেতে খেতে মুগ্ধ হয়ে উর্মিকে দেখার লোভটা ওকেও আর দাঁড়াতে দিল না ওখানে।

চলবে