#চায়ের_কাপেই_জমুক_প্রেম (পর্ব ১২)
সায়লা সুলতানা লাকী
আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল মৃদুল আর উর্মির সাথে যোগাযোগ করেনি। আসলে যোগাযোগ করেনি একটু অভিমান করেই। উর্মিও যে মৃদুলের প্রতি দুর্বল তা তো মৃদুল বহু আগেই টের পেয়েছে তার উপর আরো বিশ্বাস জমেছে শেষ দিন ওর পছন্দ জেনেই ও যখন সাদা ড্রেস পরে এসেছিল। কপালে ছোট্ট একটা স্টনের সাদা টিপও ছিল যা উর্মির সাজসজ্জায় আগে কখনো খেয়াল করেনি। আসলে উর্মি সবসময় রাফ এন্ড টাফ বেশে চলাফেরা করে। অতটুকু ও যে শুধু মৃদুলের জন্য করেছে তা ও বুঝতে পারে। কিন্তু এসবের পরও উর্মি সেদিন কীভাবে যে মুখের উপর বলে দিল “মনে হয় আপুর বিয়েতে আর কোনো ঝামেলা হবে না। আপনি যতটুকু করেছেন তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ, বাকিটা ফয়সাল ভাই নিজেই গুছিয়ে নিতে পারবে। এবং আমি নিশ্চিত ফয়সাল ভাইয়েরও আর আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। আর আমিও আমার তরফ থেকে বলতে পারি আমাদেরও আর আপনার সাহায্যের দরকার নেই । সোওওও, এখন বাকি থাকে চায়ের ঋন, ওটা মিটে গেলে আপনার আর আমার ঝামেলাও শেষ। তো চলেন আজই ঋনটা মিটিয়ে ফেলি।”
উর্মির কথা শেষ হতেই মৃদুল বেশ কিছুক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে থেকে, এরপর আস্তে করে বলেছিল “মনে হচ্ছে আপনি আমার উপস্থিতিটা পছন্দ করছেন না। লেনদেন চুকিয়ে আমার অধ্যায় এখানেই শেষ করতে চাচ্ছেন?”
“হুমম, অনেকটা তেমননি। আপনার সাথে আমার তো আর দেখা করার প্রয়োজন নেই। আপুর জন্যই তো যখনই ডাকতেন তখনই ছুটে আসতাম।”
অকপটভাবে জানিয়েছিল উর্মি সেদিন।
” শুধু কি আপুর জন্যই ছুটে আসতেন?” মৃদুল চায়ের কাপের দিকে তাকিয়েই প্রশ্নটা করেছিল।
“হুমম, তা নয়তো আর কী? বিশাল এক টেনশন ছিল আপুর বিয়েটা নিয়ে, আল্লাহ বাঁচিয়েছেন ঝামেলাটা মিটিয়ে।”
উর্মি চায়ে চুমুক দিয়েছিল কথাটা শেষ করে।
“ও কে, আপনাকে ঋন থেকে মুক্তি দেওয়া হল। আপনাকে আর ডাকব না। আর কখনো কল করেও বিরক্ত করব না। ঠিক আছে আর কোনো লেনদেনের বোঝা মনে রাখবেন না। বাই, আজ উঠব। ভালো থাকবেন।”
বলে মৃদুল আর দাঁড়ায়নি বাইকে চড়ে ওখান থেকে পালিয়ে এসেছে নিজের মনের ক্ষোভ লুকাতে।
পেছন ফিরে আর উর্মিকেও একবার দেখেনি।
হুট করেই ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল যা উর্মি ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারেনি আসলেই কী ঘটে গেল এক মুহুর্তের মধ্যে ।
হতভম্ব হয়ে বেশ কিছু ক্ষণ বসে থেকে পরে বিল পরিশোধ করে বাসায় ফিরে এসে ছিল। এরপর শুধু অপেক্ষা করে গেছে এই বুঝি মৃদুল ওকে কল দেয় বলে। কিন্তু না এই এক সপ্তাহের মধ্যে মৃদুল ভুল করেও ওকে একটিবারের জন্যও কল করেনি। আর ও নিজেও সাহস করে উঠতে পারেনি নিজ থেকে কল করার। ওর ধারনা ওর নাম্বার দেখলে মৃদুল জীবনেও কল রিসিভ করবে না। যে মানুষ হুট করে এতটা রাগ দেখিয়ে চলে যেতে পারে সে এত সহজেই যে নরম হয়ে কল রিসিভ করবে না তেমনটা ও নিজেকে দিয়ে বিচার করে বুঝে নিয়েছে। কিন্তু যতই ওকে নিয়ে ভেবেছে ততই অবাক হয়েছে, ওর ওই ফাজলামো করে বলা কথাটাকে ও এত সিরিয়াস ভাবে নিয়ে এমন ভয়ংকর রিয়েক্ট করবে তা যেন কখনোই ওর বিশ্বাস হতে চায়নি।
রাত তখন এগারোটা বাজে ঘড়ির কাঁটায়, যখন মৃদুলের মোবাইলটায় রিং বেজে উঠল। আননোন নাম্বার দেখে একটু দ্বিধায় পড়ে রিসিভ করল।
— হ্যালো।
— হ্যালো মৃদুল বলছো?
— জি, কে বলছেন প্লিজ…
— মৃদুল আমি অর্নি, উর্মির আম্মু…
মৃদুল বিছানায় শুয়ে বুকের উপর ল্যাপটপ নিয়ে মুভি দেখতে শুরু করেছিল এই রাতে। ওই অবস্থাতেই কলটা রিসিভ করেছিল। এখন যখন জানলো কলের অপর প্রান্তের মানুষটি উর্মির আম্মু অমনিই ধরমার করে উঠে বসে বলল
— ওওও স্যরি আন্টি, আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
— ওয়ালাইকুমুস সালাম, বাবা তুমি কেমন আছো?
— জি, জি, আমি ভালো আছি। আন্টি আপনি কেমন আছেন?
— আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ভালো রেখেছেন। তোমার মতো পরোপকারী মানুষ যার সাহায্যে পাশে দাঁড়ায় সে কি কখনো খারাপ থাকতে পারে বাবা?
— জি আন্টি, মানে.. আসলে। ইয়ে আমি তো কিছু করিনি। তবে হ্যা মিস উর্মির যেখানে হেল্প লেগেছে সেখানে তাকে একটু..
— বাবা তুমি কী করেছো তা নিয়ে আর নতুন করে কোনো কথার দরকার নেই। আমি জানি আমি তোমার কাছে বড় ঋনী হয়ে আছি। এখন আসল কথায় আসি, শোনো মৃদুল–
— জি আন্টি বলেন–
— বাবা, ফয়সালরা সামনের সপ্তাহে মানে সামনে শুক্রবার আমাদের বাসায় আসতে চাচ্ছে। তুমি কিন্তু বাবা সেদিন অবশ্যই আমার পাশে থাকবে।
— আন্টি এখানে আমি থেকে কী করব? এটা আপনাদের দুই পরিবারের অভ্যন্তরীন একটা বিষয়, সেখানে নানান ধরনের কথা হবে সেখানে আমি বড়ই বেমানান।
— কে বলে তুমি বেমানান? তুমি জানো না তুমি আমার কী? তুমি ছাড়া তো আমি সেদিন কিছুই ভাবতে পারি না। তুমি আসবে মানে আসবে।
— আসলে আন্টি–
— দেখো বাবা, আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে কথা হয়েছে যেদিন সেদিন থেকে উর্মিকে বলছি তোমাকে কল দিতে, কিন্তু আমার এই বোকা মেয়ে বলে কী না তুমি নাকি ওর নাম্বার দেখলে কলই রিসিভ করবে না। দুদিন যাবৎ আমাকে ঘোরাচ্ছে। আজ বলে কি না তোমাকে কল দিলে তুমি আসবে তো না-ই উলটো ওকে দু চার কথা শুনিয়ে দিবে।
কিন্তু বাবা আমি তো আমার বিশ্বাসে অনড়, আমি জানি, আমি বললে তুমি ফেলবে না, তুমি আসবে। এখন যদি—
— জি আন্টি আমি আসব। অবশ্যই আসব। আপনি ডাকলে আমি অবশ্যই আসব।
— এই তো বাবা তুমি আমার মুখ রাখলে। ঠিক আছে বাবা আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। বাসায় অনেক কাজ, তুমি আসো পরে তোমার সাথে কথা বলব। আজ তবে রাখি।
অর্নির আম্মু কল কাটার পর মৃদুল খেয়াল করল ওর মন বেশ ভালো হয়ে গেল। উর্মি যে ওর রাগ করে চলে আসাটা বুঝতে পেরেছে এটা যেনো ওর কাছে অনেক বড় ব্যাপার। শুধু তা-ই না মৃদুলের রাগে যে ও ভয় পেয়েছে সে বিষয়টা মনে হতেই ওর ঠোঁটের কোনো হাসি ফুটে উঠলো। এখন শুধু আরও এক সপ্তাহ অপেক্ষা কাছ থেকে উর্মিকে দেখার।
এর মাঝে একদিন ফয়সাল কল দিয়ে অনুরোধ করল ওদের সাথে অর্নিদের বাসায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু মৃদুল মানা করে দিল। আসলে ও নিজেও ফয়সালের এমন গুম হয়ে যাওয়াটা সহজ ভাবে নিতে পারেনি। সেদিন ভিডিয়ো দেখিয়ে চলে আসার পর আর একটি বারের জন্যও ফয়সাল ওকে কল করেনি। বিষয়টা ওর কাছে বড় আজব লেগেছে, পরে ভেবেছে হয়তো ফয়সাল খুব রেগে আছে মৃদুলের উপর। কারণ মৃদুল ওর মা এবং মায়ের মেয়ের সাথে যোগাযোগ করেছে ওর পারমিশন না নিয়েই। মৃদুল যখন ওর মায়ের ফেইসবুক আইডি ই মেইল আইডি চেয়েছিল তখন অবশ্য ফয়সাল জিজ্ঞেস করেছিল কারণটা কী? তখন অবশ্য মৃদুল কারণ বলেনি। হয়তো সেই ক্ষোভের কারণেই আর যোগাযোগ করেনি, এমনটাই ভেবে মনকে স্বান্তনা দিয়েছিল।
আজ যখন ফয়সাল কল করে বেশ অনুনয় করে বলছিলো ওর সাথে অর্নিদের বাসায় যেতে তখন একটু অভিমান জড়িয়েই মৃদুল জিজ্ঞেস করেছিল “ভাই এতদিনে আমার কথা মনে হল?”
উত্তরে ফয়সাল হেসে উত্তর দিয়েছিল
“তুমি কী আমাকে স্বস্তিতে ফেলে রেখে গিয়েছিলে সেদিন? জানো আমার উপর দিয়ে কী কী যাচ্ছে এখন? একটু ফুরসত পাইনি শান্তিতে দম ফেলার। আসো সাক্ষাতে সব বলব।”
“ভাই আমি আবার কী করলাম? আচ্ছা সাক্ষাতেই শুনব, তবে আপনার পক্ষ নিয়ে ও বাড়িতে যাওয়া হবে না আমার। আন্টি মানে আপনার হবু শাশুড়ি আমাকে আগে বুকড করেছেন তো, আমি সেদিন ওই পক্ষ হয়ে উপস্থিত থাকব।”
বলে মৃদুল হা হা হা করে হেসে উঠেছিলো।
“তুমি ওখানে উপস্থিত থাকলেই হল, এই পক্ষ, কিংবা ওই পক্ষ সবই তোমার। আসো দেখা হবে, কথা হবে।” বলে কল কেটে ছিল ফয়সাল।
সেদিন ফয়সালের কল পেয়ে ওর প্রতি জমানো অভিমানটুকুও ঝরে গিয়েছিল মৃদুলের। মনে মনে খুব ভালো কিছু আশা করেই আপাতত শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকল।
এদিকে মৃদুলের আম্মু হুট করেই ওকে ডেকে জানালো যে শুক্রবার তারা নতুন এক পাত্রী দেখতে যাবেন। মৃদুল তখন ওর আম্মুকে বুঝিয়ে বলে কিছু সময় চেয়ে নিল। বলে দিল এই শুক্রবার পারবে না। ওর কিছু জরুরি কাজ আছে।
ওর মা-ও বেশ চিন্তিত ইদানীং ছেলের হাবভাব দেখে। আগে পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা বললে সহজেই রাজি হয়ে যেত। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে সে এখন পাত্রী দেখার কথা শুনলেই নানান অযুহাতে পিছিয়ে দেয়। এর মাঝে দুই একটাতে গেলেও তেমন কোনো কথাই বলেনি। বাসায় এসে সাফ জানিয়ে দিয়েছে পাত্রী পছন্দ হয়নি বলে।
বিয়েশাদির ব্যাপার, তাই ছেলের মনের উপর জোরও তিনি ইচ্ছে করেই দেন না। অপেক্ষা করেন ছেলের কী সমস্যা তা ছেলে নিজ থেকেই বলুক।
অবশেষে আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এল। আজ একটা পাঞ্জাবি নামিয়েও আবার উঠিয়ে রাখল। সাহস হল না ওটা পরে বের হতে। ভাবি ঠিকই আবোলতাবোল কিছু একটা ধরে বকবক শুরু করবেন। তাই আজ একটা বোটলগ্রীন কালারের টিশার্ট ও ক্রীম কালারের গ্যাবার্ডিন এর প্যান্ট পরে বের হল। রাস্তা থেকে একটা বিশাল সাইজের বুকে কিনে নিল এবং তাতে অর্নি ও ফয়সালকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা কার্ডও লিখলো।
মৃদুল যখন উর্মিদের বাসায় ঢুকল তখন বাসা ভরা মেহমানে। বুঝল ওরই আসতে লেট হয়েছে। উর্মি সম্ভবত ওরই অপেক্ষায় ছিল। তাই ডোরবেল বাজাতেই ও খুলে দিল। প্রথম দেখাতেই মৃদুল না চাইতেই হেসে ফেলল পরে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে একটু রাগ চেহারায় ফুটিয়ে তুলে বলল
— আন্টি আছেন?
— জি আছে তো, আপনি এত লেট করলেন? আম্মু সেই কখন থেকে……
উর্মি যখন নিজের উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে না পেরে বকবক করে কথা বলছিল ঠিক তখনই ওর পেছন থেকে অর্নির ভাবি এসে একগাল হেসে মৃদুলকে ভেতরে নিয়ে গেল। মৃদুলও উর্মির কথাকে পাত্তা না দিয়ে ভাবির পেছন পেছন ওদের ড্রয়িং রুমে চলে এল। এতে উর্মি যে বেশ আহত হল সেদিকে একটুও ফিরে তাকাল না।
অর্নির আম্মু মৃদুলকে দেখেই প্রান খুলে একটা হাসি দিয়ে বললেন
— এই তো মৃদুল এসে গেছে। জানো আমরা সবাই তোমার অপেক্ষায় বসে আছি! অর্নি এখানে এসেছে কিন্তু ওরা এখনো কেকটাও কাটেনি তোমার জন্য।
আন্টির কথার জবাবে তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে সামনে ঘুরতেই মৃদুল বেশ অবাক হয়ে গেল ওখানে বসে থাকা মানুষগুলোকে দেখে। তাদের উপস্থিতি ও মনে প্রানে চেয়েছিল কিন্তু তাদের আজ এখানে দেখবে তা যেন ও আশা করতে পারেনি। অদ্ভুত একটা শিহরণ খেলে গেল মনে। নিজের কেউ না তারা কিন্তু তারপরও ওর মনটা এক ঐশ্বরিক ভালোলাগায় নাড়া দিয়ে উঠল। ফয়সাল উঠে এগিয়ে এসে মৃদুলকে টেনে নিয়ে গেল ওদের সাইডে। মৃদুল প্রথমেই নিজের আবেগকে সংবরণ করে বুকেটা অর্নি আর ফয়সালের হাতে দিয়ে ওদের নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানাল। অর্নি বুকে হাতে নিতেই ফয়সাল ওকে জড়িয়ে বুকে চেপে নিয়ে আস্তে করে বলল
— থ্যাংকস, আমার জীবনের পূর্ণতার খোঁজ দেওয়ার জন্য।
মৃদুল কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই এই মুহুর্তে । ওর আনন্দে চোখ ভিজে আসছে যেন বারবার। এমন আনন্দ জীবনে কবে কখন পেয়েছে এই মুহুর্তে তা মনে করতে পারছে না।
হঠাৎ করেই পেছন থেকে মেয়েটা ডেকে উঠল
— মৃদুল ভাইয়া, আপনাকে দেখার জন্য আমরা দুজনও কিন্তু অধির অপেক্ষায় আছি।
এবার মৃদুল ফয়সালকে ছাড়িয়ে পেছন ফিরতেই মেয়েটার মুখোমুখি হল।
ফয়সালই এগিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিল
— মৃদুল, ও আমার বোন মিথিলা আর উনি আমার আম্মু, সেই তখন থেকে তোমাকে দেখবে বলে পথ চেয়ে আছে।
“আমার বোন” কথাটা শুনে এবার মৃদুল আরও বেশি আবেগী হয়ে উঠল। তখনই খেয়াল করল
ফয়সালের মা মৃদুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করছেন বিনা শব্দে। তাঁর চেপে রাখা ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু তাতে আনন্দের হাসি খেলছে অবলিলায়। আর তার চোখজোড়াও ওরই মতো ঝাপসা হচ্ছে বারবার।
চলবে