#চায়ের_কাপেই_জমুক_প্রেম (পর্ব ১৭)
সায়লা সুলতানা লাকী
উর্মির দাদি ফায়সালের কপালে হলুদ ছুঁয়ায়ে হাতে লাগা বাকি হলুদটুকু মৃদুলের কপালেও ছোঁয়ালেন আর পানখাওয়া দাঁত ক্যালিয়ে হেসে বললেন
— নাও তোমারেও একটু ছুঁয়ায় দিলাম। এতে তোমার বিয়েটাও জলদি জলদি হয়ে যাবে।
— ইশশশশ কোন মেয়ের যেন কপাল পোঁড়ার গন্ধ পাচ্ছি ? প্লিজ দাদি এই দোয়া তুমি ফিরিয়ে নাও। নারী হয়ে কীভাবে পারো আরেক নারীর জীবনকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিতে.. এ তুমি কী করলে… বলো দাদি তুমি বলো? তুমি….
উর্মি বেশ ঢং করে কথাটা বলে আড় চোখে মৃদুলের দিকে তাকালো।
— চুপ শয়তান, ও একটা সোনার টুকরা ছেলে। যে পাবে সে সৌভাগ্যবতী বলে জানবে নিজেকে। তুই বুঝবি কী?
—- আহা! এতই যখন চেনো তখন তুমিই… বাই দা ওয়ে তোমার সাথে কিন্তু মিলবে বেশ।
— তওবা তওবা, বদমায়েশ একটা। মুখে লাগাম দে শয়তান।
দাদি ঝামটা দিয়ে বিরবির করতে করতে চলে যেতেই পাশ থেকে মৌমি হিহিহি করে হেসে বলল
— মানে? এই উর্মি এই লোক কী এত ডেঞ্জারাস?
— উফফ আপু তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। উনি কতটা…
— দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটিও উলটে খেতে পারেন না।
— সব কী আর বাহির থেকে দেখে বোঝা যায়?
— একজেক্টলি, সবাইকে কী আর বোঝানো উচিৎ….. আসলে বিষয়টা হল কী রতনে রতন চেনে।
— মানে? মানে কী? আপনি কী মিন করে কথাটা বললেন? আমিও আপনার মতো ডেঞ্জারাস?
— এক সাথে এত প্রশ্ন? এত হাইপার হলে কী চলে? কাম ডাউন, কা…ম ডা..উন।
— আমার সাথে একদম ফাইজলামি করবেন না বলে দিচ্ছি।
— উফফ ভয় পেয়েছি।
— আবার?
— উফফ উর্মি তুই ওনার উপর এত রেগে যাচ্ছিস কেন? আগে বল ওনার সাথে যেই মেয়ের বিয়ে হবে তার কপাল পুড়বে কেন?
— আরে এই লোক ভালো নাকি? সারাক্ষণ ছুঁতো খুঁজে ঝগড়া করার জন্য। পাঁচ মিনিট ওনার সামনে কেউ..
— এক মিনিট, এক মিনিট। আপনি আন্দাজের উপর একটা কথা ছুঁড়ে দিলেই তা আমি কেন মেনে নিবো? আপনার মতো হট টেম্পার মেয়ে মনগড়া কিছু বলে দিলেই লোকজন তা মেনে নিবে?
— আমি মোটেও মনগড়া কথা বলি না। যে লোক সামান্য এক কাপ চায়ের….
— এই সাবধান, আমার চা নিয়ে কথা বলবেন না। আমার চা যেই সেই চা না। একে সামান্য বললে আমি তা কোনোদিনও মেনে নিবো না।
— ইশশশ আসছে বড় একজন চা খোর। পুরানো পাগলে ভাত পায় না নতুন পাগলের আমদানি।
— ইশশশ চা নিয়ে এখন দেখছি ঝগড়া শুরু হল? আচ্ছা চলতে থাকুক, আমি আসছি। বলে মৌমি সামনে এগোতেই মৃদুল গলা চড়িয়ে বলে উঠল
— পাগল আমি না, পাগল আপনি। আমার অর্ডার করা চা আমার পারমিশন ছাড়া আপনিই খেয়েছিলেন।
— তো? সেই সময়ে চায়ের দামটা নিয়ে নিলেই হত। অহেতুক সেই চা’কে ইস্যু করে এমন ছ্যাচড়িমি যে করে সেই রকম এক ছ্যাচড়া লোকের সাথে সারা জীবন কেউ কাটাবে কীভাবে? এই যাত্রাপথ তো কল্পনাতেও বেশিক্ষণ এগোয় না। মুহুর্তেই কল্পনা ভঙ্গ হয় এর আউল ফাউল আচরণের জন্য । যেই সঙ্গ কল্পনাতেই টেকে না তা বাস্তবে কীভাবে টিকবে? ওই মেয়ের কপাল তো পুড়বেই এর পাল্লায় পড়লে।
—- এত কনফিডেন্সের সাথে বলছেন মনে হচ্ছে আপনি বহু দিন আমাকে নিয়ে কল্পনায় ভেসেছেন? অনেক অভিজ্ঞতা আপনার?
— হ্যা, ভেসেছি তো! অভিজ্ঞতা একেবারে কম তো না? প্রতিবারই ঝগড়া লেগে থেমে গেছে।
— সত্যি? ঝগড়া প্রথম কে লাগায় আপনার ভাবনায়? আমি না আপনি?
— কে আবার আপনি? আপনিই প্রতিবার…
— অসম্ভব! আমার ভাবনায় তো আপনি লাগান। প্রতিবারই রেগে গিয়ে কাপটাও ভেঙে ফেলেন।
— ছি! কি মিথ্যুক। আমার উপর দোষ চাপাচ্ছে কায়দা করে।
— উফফ, খুব জানতে ইচ্ছে করছে,প্লিজ একটু বলেন না সেখানে যখন আমরা চা নিয়ে কোনো এক জোছনারাতে বারান্দায় বসি তখন আপনি কী শাড়ি পরেন না কি..
— আজব! অসহ্য একটা মানুষ আপনি। আমি শাড়ি পরতে যাবো কেন?
—কেন শাড়ি পরলে কি সমস্যা? শাড়িতে তো আপনাকে বেশ সুন্দর লাগে…
— কোথায়, সেদিন যে শাড়ি পরলাম তখনতো বললেন না, শাড়িতে….
— ও আচ্ছা এখন তবে চা ছেড়ে শাড়িতে আছিস? কিসের শাড়ি? কার শাড়ি? কোন শাড়ি?
মৌমি আবার ফিরে আসতেই উর্মির ধ্যান হল এতক্ষণ ও কী বলে যাচ্ছিল মৃদুলের তালে পড়ে। হঠাৎ করেই একরাশ লজ্জা এসে ভর করল ওর চোখেমুখে। মনের গোপন ভাবনার কথাগুলো অবলীলায় কীভাবে যে ও বলে ফেলল মৃদুলকে তা টেরই পায়নি। মুহুর্তেই মৃদুলের কাছে ধরাপড়ার ভয়ে উর্মি আর দাঁড়াতে পারল না। মনে হল ছুটে পালিয়ে গেল ওর সামনে থেকে।
— কী হলো, উর্মি কোথায় গেল ? আপনাদের দুজনের ঝগড়া অবশেষে শেষ হল?
বাব্বাহ আপনি তো মেয়েদেরকেও ঝগড়ায় হার মানান দেখছি। একটা মেয়ে ঝগড়ার ময়দান থেকে ছুটে পালালো মানে…
— হা হা হা, উর্মি পালিয়েছে? আপনি..
— আমি মৌমিতা, অর্নির কাজিন। আগেই সাবধান করি, আমাকে কিন্তু আপু বলবেন না। আমার এতটা বয়স হয়নি যে আপনার মতো একজন আমাকে আপু বলে ডাকবে।
— হা হা হা, আপনাদের সবার কথা বলার স্টাইল এক।
— না মানে, শুনলাম আপনি অর্নিকে আপু ডাকেন। বিষয়টা আজব না, যাকে বিয়ে করতে এসেছিলেন তাকে হুট করেই সিনিয়র পজিশনে বসিয়ে দিলেন।
— কিছু সম্পর্ক বয়সে নির্ধারণ করে হয় না…
— থাক, আমাকে আর জ্ঞান দিয়েন না। শুনেছি মানুষকে ম্যানুপুলেট করার দারুন ক্ষমতা আপনার।
— ভুল শুনেছেন। তেমন হলে অর্নি আপুকেই ম্যনুপুলেট করে বিয়ে করতাম। কিন্তু তা করিনি, কারণ আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। আর অর্নি আপু ও ফয়সাল ভাইয়ের জুড়ি ভাগ্যবিধাতা সয়ং জুড়েছেন। দেখেন দুজনের চোখে মুখে কী আনন্দ খেলছে। এটা পুরোটাই স্বর্গীয়।
— তবে মানতে হবে আপনি কথা বলেন বেশ সুন্দর করে।
— সে-তো যে শুনছে তিনিই বলতে পারবেন ভালো। আমি তো একটু আগে খেতাব পেলাম প্রচন্ড ঝগড়াটে বলে।
— নানি কিন্তু প্রচন্ড আহত, আপনার মতো একটা সোনার টুকরা ছেলে হাত ছাড়া হওয়াতে।
— হা হা হা, দাদি মানুষটা চমৎকার..
— তার নাতনি গুলো কেমন?
মৃদুল আর মৌমির প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। ফয়সালের আম্মু আর মিথিলার ডাকে ওদের দিকে চলে গেল। ফয়সালের আম্মুর চোখমুখ ফোলা। বোঝায় যাচ্ছে উনি কেঁদেই চোখ মুখের অবস্থা এমন করেছেন। মৃদুলকে নিয়ে পরিচয় করাতে শুরু করলেন তার পরিবারের সাথে। মৃদুলও সেই সুযোগে ওর পরিবারের সাথে ফয়সালের মা বোনকে পরিচয় করিয়ে দিল।
এরপর যতক্ষণ ও অনুষ্ঠানে ছিল পুরোটা সময় শুধু উর্মিকেই খুঁজে বেড়ালো কিন্তু পেল না। ফয়সালের আম্মুকে পেয়ে মৃদুলের আম্মুও আর বাকিটা সময় তার সঙ্গ ছাড়েননি। আসলে তিনি মৌমির আম্মুর টক্সিক সঙ্গটা এড়াতেই আর অন্যদিকে যাননি। অবশ্য তার ভয় অন্যদিকেও ছিল, যে মহিলা অপরিচিত একজনকে নিজের মেয়ের প্রশংসা শোনাতে গিয়ে ভাতিজির বদনাম করতে পারে সে ভাতিজির শাশুড়িকে একা পেলে না জানি কী শুনিয়ে ছাড়বে? এমন চরিত্রগুলোকে কখনোই বিশ্বাস করা যায় না। এরা স্বার্থের জন্য ঠিক কতটা নীচে নামছে তা খেয়ালও রাখে না।
রাতে বাসায় ফিরতে অনেক রাত হল তারপরও মৃদুল উর্মিকে কল দিল মোবাইলে। ওর মন উর্মির আজকের কথাগুলো শোনার পর থেকে বড় বেশি অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু ওকে নিরাশ করল উর্মি। একবারও কল রিসিভ করল না। পরিশেষে আহত মন নিয়ে ঘুমোতে গেল। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্নও করল– আজকের এই কনভারসেশন থামল কেন?
দুই হাত তুলে মিনতি করল এরপর–
এই ঝগড়া সারাজীবন চলুক বিধাতা, কাপের পর কাপ শেষ হোক চায়ের। তবুও চলুক ঝগড়া…
এদিকে ঝড় উঠলো উর্মিদের বাড়িতে। ওই বাড়ির বড় মেয়ে রাতে সবার বাড়ি ফেরার পর হল রুমে বসে সবার উপস্থিতিতেই এক আবদার করে বসলেন।
তিনি যখন বললেন তার কাছে মৃদুল খুব পছন্দ হয়েছে তখনো ঝড়ের বাতাস বইতে শুরু করেনি বরং উর্মির মন নেচে উঠেছিল আনন্দে। ঠিক যখনই তিনি বললেন
— ভাবি, তোমার মুখে তো জাদু আছে, তুমিই একটু মধ্যস্থতা করো না মৌমি আর মৃদুলের বিয়ের বিষয়টা নিয়ে।
কথাটা শোনার সাথে সাথে অর্নির আম্মুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ তিনি আঁচ পেয়েছেন যে উর্মি মৃদুলকে কতটা পছন্দ করে। আর মৃদুলও যে উর্মিকে পছন্দ করে তারও আভাস পাচ্ছিলেন। কিন্তু মুখে বলার আগ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তবে এটা ঠিক করে রেখেছিলেন যে মৃদুল ও মৃদুলের পরিবার একবার বললেই তিনি রাজি হয়ে যাবেন। এমন কি এখনই বিয়ের কথা বললেও তিনি অমত করবেন না কারণ মৃদুলের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস জন্মেছে যে ও উর্মির পড়াশোনা নিশ্চয়ই চালিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
ফুপুর কথাটা শোনার পর উর্মি ফ্রিজ হয়ে গেল কিছু সময়ের জন্য। প্রথমত পুরোটা বুঝল না বলে মনে হল। তাই আরও আগ্রহ নিয়ে পুরোটা শোনার জন্য কান খাঁড়া করল
— বুঝছো মা, মৃদুলের আম্মুরও মৌমি অনেক পছন্দ হয়েছে।
— উনি এই কথা তোরে বলেছে? তুই জানলি কেমনে?
— হ্যা বলল তো, বলল আপনার মেয়ে মৌমি মাশা আল্লাহ অনেক সুন্দর, এমন সুন্দর মেয়েই আমার ছেলের জন্য খুঁজতেছি।
— মৌমি তো সুন্দরই। আর উনি বলছে মৌমির মতো, মৌমিরেতো আর বউ করবে তা বলে নাই। বলছে কি?
— না তা বলে নাই। তা বললে আর আমি তোমাদের সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতাম? এমন কথা শোনার পরপরই আমি তার হাতে মৌমিরে তুলে দিতাম।
— তা এখন কেন আমাদের অপেক্ষায় আছোস?
— বিয়ের কথাটা তো আর আমি আগ বাড়িয়ে বলতে পারি না। ভাবি তো সুন্দর করে কথা গুছায়ে বলতে পারে। তাই বলি কী ভাবি যদি একবার ওদেরকে মৌমির কথাটা বলে ওরা কেউ ফেলবে না। আমার মেয়েটার বিয়ে এবার দিয়ে দিতে পারবো। মৌমি তো আর অর্নির মতো ছেলে পটাতে পারে না। পারলে তো আরো আগেই ওর বিয়ে দিতে পারতাম।
— ওর মা পছন্দ করলেই তো আর বিয়ে হবে না। মৃদুলেরও তো পছন্দ হতে হবে..
— আরে মা, তুমি এত প্যাচাইও না। ওই ছেলেরও মৌমিরে খুব পছন্দ হইছে। আজকে কী সুন্দর করে দুইজন একসাথে গল্প করল, হাসল। দাঁড়াও তোমারে দেখাই। আমি ছবি তুলে রাখছি। এমন জুড়ি লাখে একটাও মিলে না। বলেই তিনি তার মোবাইল বের করে ছবি দেখাতে লাগলেন সবাইকে।
এবার আর উর্মি সহ্য করতে পারল না। ভেতর থেকে কান্নার দলা মনে হয় গলায় এসে আঁটকে গেল। ও দ্রুত ওর রুমে চলে গেল ওর কষ্ট ঝরাতে।
মেয়ে চলে যেতেই অর্নির আম্মুর মনটা হুহুহু করে কেঁদে উঠল। কিন্তু এখন সবার সামনে এক ফোঁটাও চোখের পানি ফেলা যাবে না। যত কষ্টই লাগুক তবুও তা সংবরণ করতে হবে। তিনি চুপ করে আছেন দেখে মৌমির আম্মু আবারও তাকে তাড়া দিলেন
— কী ভাবি তুমি চুপ করে আছো কেন? কিছু বলো? বলবা তো মৌমির কথাটা মৃদুলের মায়ের কাছে?
— জি আপা বলব। বিয়েটা যাক, এরপর…
— আরে না না না, এত দিন অপেক্ষা করো না। গরম গরমই ভালো। তুমি আগামীকালই ওরা যখন বিয়েতে আসবে তখনই বলবা।
— কালকে ওর মেয়ের বিয়ে কাল কেমনে বলে?
— উফফ মা তুমি কী চাও না মৌমির বিয়েটা মৃদুলের সাথে হোক? অর্নির বিয়ে, ভাবির তো না। ভাবির কী সমস্যা মৃদুলের মায়ের সাথে মৌমির কথা বলাতে?
— না সমস্যা নেই। আমি একটা সময় করে কথাটা বলব।
— একটা সময় করে মানে? তোমরা এই বিষয়টাকে এমন পিছলা করে দেখছো কেন? একটু গুরুত্ব দাও। সারাক্ষণতো বলো মৌমিকে নিজের মেয়ের মতো দেখো। এখন এতো পিছলাইতাছো কেন…
— আপা…
— আর আপা,আপা, করার দরকার নাই। কালকে তুমি আমার সামনেই কথাটা তুলবা। মৌমি সম্পর্কে তুমি কী বলবা তাও আমি বলে দিব তোমাকে। আমি সামনে থেকেই সবটা শুনবো, বুঝলা?
অর্নির আম্মু মাথা কাঁত করে সম্মতি জানিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন। ওখানে বসে থাকার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি যেন আর অবশিষ্ট রইল না তার।
চলবে।