#চায়ের_কাপেই_জমুক_প্রেম (পর্ব ১৯)
সায়লা সুলতানা লাকী
সারারাত আর দুজনের ঘুম হয়নি । ভোরের দিকে মৃদুল ঘুমিয়ে পড়ায় আর সকালে এলার্ম শুনে উঠতে পারেনি। নাস্তার সময় ওর আম্মু যখন ওকে ডাকতে এল তখনই ও ওর আম্মুকে টেনে পাশে বসিয়ে বেশ আহ্লাদী স্বরে জিজ্ঞেস করল
— আজকে যাচ্ছো তো বিয়ে বাড়িতে?
— হুমম যাবো তো। অর্নির আম্মু এত করে রিকোয়েস্ট করলেন এরপর না গিয়ে কী আর উপায় আছে?
— গতকাল তো দেখলাম খুব জমিয়ে গল্প করছিলে অন্যদের সাথে। আন্টির সাথে তো তোমাকে দেখলামই না।
— ওনার মেয়ের বিয়ে, ওনার ফুরসৎ কোথায় আমাকে সময় দেওয়ার। তার উপর তার আত্মীয় স্বজনগুলোকেও সুবিধার বলে মনে হল না।
— মানে? তুমি এত অল্প সময়ের মধ্যে এতকিছু বুঝে গেলে?
— হাড়ির একটা ভাত টিপলে হাড়ির সব ভাতের খবর জানা যায়, বুঝলি? অর্নির বড় ফুপু আগা গোড়া পুরোটাই একজন সাইকো। নিজের মেয়ের প্রশংসা করতে গিয়ে অর্নির বদনাম করলেন কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই। তারপর ফয়সালের মায়ের নামে আজেবাজে কথা তুললেন। বিরক্তিকর এক মহিলা। কথায় যা বুঝলাম উনি অর্নির মা’কে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না।
— এ রকম টক্সিক মহিলা থেকে তুমি দূরেই থেকো।
— সে কথা আর বলতে, গতকাল বৌমার সামনে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। ও তো বাচ্চা মানুষ, সাংসারিক এত অস্থিরতা ওরা দেখুক, জানুক শিখুক তার কোনোটাই আমার কাম্য না।
— তাহলে এক কাজ করো, তুমি আজ বরযাত্রার সাথে আসো। আমরা তো ওই পক্ষেরও দাওয়াত প্রাপ্ত।
— সে কী কথা! অর্নির আম্মু কষ্ট পাবেন।
— আরে নাহ, আন্টি সেই রকম মানুষই না। তুমি উপস্থিত আছো তা জানলেই উনি খুশি হবেন।
— বাবারে কন্যাকে বিদায় দেওয়া যে একজন মায়ের জন্য কতটা কষ্টের তা তুই বুঝবি কী? আমি তো ভাবছি আজ পুরোটা সময় তার পাশে পাশেই থাকবো।
— ইন্না-লিল্লাহ
— কেন সমস্যা কী তোর?
— না মানে সমস্যা… হ্যা সমস্যা তো একটা আছেই। ধরো তুমি যদি তার আশেপাশে থাকো তবে তিনি তার চারপাশের আত্মীয়রূপী শত্রুদের চিনতে পারবেন না। তিনি ওই শত্রুদের দ্বারা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ঠিক এই সময়তে তুমি তার পাশে না-ই থাকো। তাহলে তিনি আপনজনের শয়তানিটা বুঝতে পারবেন।
— কি যা তা বলছিস?
— প্লিজ আম্মু তুমি আজ আন্টি বা ওই ফুপুর আশেপাশেও যেয়ো না। আর তাছাড়া ফয়সাল ভাইয়ের আম্মুও অনেক খুশি হবেন যদি তুমি…
— দূর বোকা, ওই আপা এতদিন পর তার পরিবারকে কাছে পেয়েছেন। ওনাকে তাদের সাথেই মিশে থাকতে দে। ওর মধ্যে বাহিরের কাউকে জড়ানো ঠিক হবে না। তুই আমাকে নিয়ে অতশত ভাবিস না। এখন উঠে নাস্তা কর। আমি গেলাম আমার আরো কাজ আছে।
বলে উনি মৃদুলকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মৃদুল ওর আম্মুকে পুরো বিষয়টা বোঝাতে অক্ষম হয়ে আরো হতাশ হয়ে পড়ল। বালিশে মাথা গুঁজে আর কোনো পথ আছে কি না আজকের এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার তা ভাবতে লাগল।
এদিকে উর্মি সকাল থেকেই মেজাজ সপ্তম আসমানে চড়িয়ে বসে আছে। রাতে ঘুম হয়নি তাতে সমস্যা না, সমস্যা হল মৃদুল ওর আম্মুকে ম্যানেজ করতে পারল কি না সেখানে! মৃদুলের আম্মুর সাথে যদি ওর ফুপু কিংবা ওর আম্মুর কারোরই দেখা না হয় তবে আর বিয়ের কথাটা তার কান পর্যন্ত যাবে না। সকালে কয়েকবার চেয়েছিল মৃদুলকে কল করে কনফার্ম করবে ও পেরেছে কি না কিন্তু একবারও সুবিধা করতে পারেনি। বিয়ে বাড়ি বলে কথা, হলুদের অনুষ্ঠানে আসা খুব কাছের আত্মীয় স্বজন অনেকেই রাতে এই বাসাতেই উঠেছে। রাতে মানুষের চাপ বোঝা যায়নি কিন্তু ভোর হতেই সেই চাপ টের পাচ্ছে।
এরই মধ্যে অর্নি ওর লাগেজ গোছানোর সময় আলমারি থেকে সাদা ড্রেসটা বের করে উর্মির হাতে দিতেই ও ফুঁসে উঠে বলল
— এটা আমাকে দিচ্ছো কেন? যারা আজ তোমার পরামর্শে সাদা পরছে তাদেরকে দাও। আমার চেয়ে বরং তাদেরই কাজে লাগবে এই সাদা ড্রেস। কি দরকার ছিল আগ বাড়িয়ে সবাইকে বলতে যে আমি হয়তো সাদা পরব?
— আমার উপর রাগ দেখাচ্ছিস কেন? সাদা যে কেউ পরতে পারে। কারো উপর আস্থা রাখতে শিখেনে স্টুপিড।
উর্মি হয়তো পাল্টা আরও কিছু বলতো কিন্তু ওর দাদি এসে চা খেতে চাইতেই উর্মিকে চলে যেত হল চা বানাতে। এই বাসায় ও আর ওর দাদির চা অন্য কেউ বানিয়ে কুলাতে পারে না। এটা কম হয়েছে, ওটা মনমতো হয়নি, নানান কথা শুনতে হয় তাদের। তাই কেউ বানাতে সাহস করে না। বাধ্য হয়েই এই চা উর্মিকেই বানাতে হয়।
চা নিয়ে ডাইনিং – এ এসে দাঁড়াতেই উর্মি মুখামুখি হল মৌমির। হঠাৎ কী মনে করে ওর জন্য বানানো চায়ের কাপটা মৌমির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
— নাও আপু, এটা তুমি খাও। এখন থেকে এই চায়ে অভ্যস্থ হও। নইলে বিয়ের পর চরম বিপদে পড়তে হবে। ওই ছ্যাচড়াটা এই চায়ের পাগল। তোমাকে প্রতিনিয়ত এই চা বানিয়ে খাওয়াতে হবে তার মন পেতে হলে।
কাপটা কোনো মতে মৌমির হাতে দিয়ে ও ফিরে এল নিজের রুমে। কেন যেনো ওর খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছিল তাই সবার আড়ালে শান্তিতে কাঁদতে ও ওয়াসরুমে ঢুকে গেল।
এদিকে মৌমি এমনিতেই চা তেমন একটা খায় না। যদিওবা খায় তাহলে চিনি ছাড়া রং চা খায় বা মসলা চা খায়। এমন মালাই ভাসানো ঘন দুধের কড়া লিকারের তেতো গন্ধের চিনি মেশানো চায়ের উপর চোখ পড়তেই মনে হল এ যেন এক কাপ বিষ দিয়ে গেল উর্মি ওকে। ইয়াক বলে কাপটা রাখতে গিয়েও রাখতে পারল না ওর মায়ের কারণে। ওর মা বেশ আহ্লাদী হয়ে চেয়ে আছে মেয়ের দিকে, তিনি এই মুহুর্তে ভাতিজির কাজে বেশ সন্তুষ্ট বলেই মনে হল।
মৌমিকে মনে হল এই মুহুর্তে ফুপু ভাতিজির মাঝখানে নিজে একটা বলির পাঠা। চোখ বন্ধ করে কাপটা একবার ঠোঁট পর্যন্ত উঠালো। এরপর নামিয়ে দ্রুত সরে এল ওর মায়ের সামনে থেকে। উর্মিকে খুঁজতে খুঁজতে ওদের রুমেই ঢুকল। অর্নি তখনো গোছাচ্ছিল। ওকে দেখেই জিজ্ঞেস করল
— মৌমি কিছু কি বলবি?
— হুমম, উর্মি কোথায়? ওকে খুঁজছিলাম।
— কেনরে?
— আর বলিস না, ও ওর চায়ের কাপ আমাকে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। বল আমি কি এই চা খাই?
— খাস না তো কী হয়েছে? এখন থেকে খাবি?
— মাত্থা খারাপ? সবারই নিজস্ব কিছু টেস্ট আছে।
— তাই না কি?
— হুমম,
— তাহলে উর্মিরটা উর্মির জন্যই রাখ। ও ওয়াসরুমে গেছে। বেরিয়ে গরম করে খাবে যদি মুড ভালো থাকে।
— কেন ওর মুডের কী হল?
— ওর কথা বাদ দে, তোর কথা বল। শুনলাম ফুপু তোর বিয়ের জন্য উতলা হয়ে গেছেন।
— হুমম, এসবের জন্য তুইই দায়ি। তোর বিয়ের কথা শোনার পর থেকেই বেশি অস্থির হয়ে আছেন।
— তুই আর আমি মানুষ ভিন্ন। তোর আর আমার জীবন নিয়ে জীবনের টেস্টও ভিন্ন। মানে তোর কথাটাই বলি সবারই নিজস্ব কিছু টেস্ট আছে ভিন্ন ভিন্ন। তাই আমার যেটা হবে তোরও কি তাই হতে হবে না কি?
— তা হবে কেন? আমি তো তোর মতো না। তোর হল লাভ মেরেজ আর আমার হবে এরেঞ্জ মেরেজ টেস্টতো ভিন্নই।
— হুমম, তা ঠিক। মৃদুলকে ভালোমতো চিনিস?
— নাহ, এরেঞ্জ মেরেজে বর কনে অপরিচিত অজানা, অচেনাই থাকে।
— অচেনা কারো সাথে নিজেকে মিলিয়ে চলতে পারবি?
— সবাই পারে আমিও পারব?
— যারা পারে তারা কেউ নিজস্ব টেস্ট নিয়ে ভাবে না। সাংসারিক সুখ বজায় রাখতে সব ভুলে যায়। এক সময় নিজেকেই ভুলে যায়। তুই তাহলে এখন থেকেই ভুলতে শিখ। নে এই চা তুই খা। যার সাথে তোর বিয়ের কথা হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখে এক কাপ চা নিয়ে তারা দুজন খোলা আকাশের নিচে বসে জোসনা দেখছে আর চা শেয়ার করছে। তুই নিজের টেস্ট না ভুললে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে কী করে? নে মজা করে চা খা। আজ সারাদিন অন্য কিছু খাস না শুধু কাপের পর কাপ চা নিয়ে ট্রাই কর অভ্যস্ত হতে। আমি ফুপুকে বলে দিব তোর চা দাদিকে দিয়ে যেন বানিয়ে রাখে। বলতে বলতেই কাপটা পাশ থাকে নিয়ে মৌমির হাতে চাপিয়ে দিল। মৌমি হা করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল ওর এমন আচরণ দেখে। মৌমির অবস্থা দেখে অর্নি একগাল হেসে আবার বলল
— এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার আম্মুকে দেখিস না, নিজের নামও ভুলেগেছে সংসারের সুখের ভারে। তুই তো শুধু নিজের টেস্ট ভুলবি, এটা এমন কোনো কঠিন কাজ না। পারবি। আমরা মেয়েরা মেনে নিতে ও মানিয়ে নিতে ওস্তাদ। এমনটা অন্য কোনো প্রানী পারে বলে আমার জানা নেই।
অর্নি ওর কথা শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল নাস্তা করতে। ওর তাড়া আছে আবার পার্লারে যেতে হবে টাইম মতো। অযথা বকবক করে সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই ওর হাতে।
আজ আর উর্মি পার্লারে যায়নি। বিয়ের জন্য কেনা লেহেঙ্গাটাই ওর কাছে অসহ্য লাগছে গায়ে চড়াতে। কিন্তু না পরে কোনো উপায় নেই, তাই নিজেই এর সাথে মিলিয়ে হালকা একটু সাজল। বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসেই মৃদুলকে টেক্সট পাঠালো “আন্টিকে বলেছেন তো আজ যেন আম্মু বা ফুপুর আশেপাশে না যান তিনি!”
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করালো না মৃদুল। একটু পরই রিপ্লাই করল “পারিনি”, “আম্মুতো আরও আন্টির সাথেই থাকবে বলে জানালো।”
পরপর দুটো মেসেজই ওর গায়ে আগুন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। ঠিক এই মুহুর্তে কী করবে? কীভাবে মৃদুলের আম্মুকে সবার চোখের আড়ালে রাখবে সেই টেনশনে মাথায় জ্যাম লেগে গেল।
মৃদুলও বাসায় নানান অযুহাতে সময় ক্ষেপণ করে অনুষ্ঠানের জন্য বেরোলো একটু লেট করে। ওর ধারনা হল দেরিতে গেলে মেহমানে ঠাসা থাকবে চারপাশ এর মধ্যে কে সময় পাবে এক বিয়ে রেখে আরেক বিয়ের আলাপ তুলতে। বিশেষ করে অর্নির আম্মুতো ভীষণ ব্যস্ত থাকবেন অর্নির শ্বশুর বাড়ির মেহমান নিয়ে। এর মধ্যে উনি কীভাবে সময় বের করবেন ওর আম্মুর সাথে বিয়ের আলাপ করতে।
প্রথম দিকে সত্যি সত্যিই তাই হল। মৃদুলরা যখন ঢুকল তখন মনে হল তিল ফেলানোর জায়গা নেই। উর্মি প্রবেশ পথেই দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হল ও ওদের অপেক্ষাতেই ছিলো বুঝি। মৃদুলের পরিবারকে ভেতরের কোথাও বসতে দিল না, সরাসরি কোনার একটা খালি টেবিলে নিয়ে খেতে বসিয়ে দিল জোর করে। মৃদুল কিছুটা আপত্তি করতে চেয়েছিল। একবার বলেছিল ফয়সালের সাথে দেখা করে আসবে খেতে বসার আগে। কিন্তু উর্মির চাহনির তাপে পুড়ে চুপচাপ বসে গেল আম্মু আব্বুর পাশে খেতে। ওকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওর আম্মুকে ম্যানেজ করতে, তা পারেনি। এই মুহুর্তে তাই চুপচাপ উর্মির কথা মেনে চলাটাই সেইফজোন বলে মনে হল।
উর্মি পাশে দাঁড়িয়েই সবার খাবার তদারকি করল যদিও তার কোনো দরকারই ছিলো না। কিন্তু কেন যেনো উর্মি ওদের ছেড়ে যেতে সাহস পেল না।
খাওয়া শেষে যখন একেকজন হাত ধোয়ার জন্য ওয়াসরুমে গেল ঠিক তখনই উর্মি ওর তাল হারালো। ঠিক কার সাথে যাবে আর কাকে একা রাখবে এই ভেবে অস্থির হয়ে গেল। একটা সময় মৃদুলের মা’কেই বেছে নিল চোখে চোখে রাখতে। মৃদুল খাওয়া শেষে বিন্দাস ঘুরে বেড়ানো শুরু করল। প্রথমেই ফয়সালের সাথে দেখা করতে গেল। সেখানেই মৌমির সাথে দেখা হয়ে গেল। ওদের পরনে সাদা লেহেঙ্গা দেখে আনমনে হেসে ফেলল। মৌমি “হাই” বলতেই ও শুধু “হ্যালো” বলে সাইড কেটে মিথিলার দিকে চলে গেল।
এদিকে উর্মি মৃদুলের আম্মু যেখানে বসেছেন তার আশেপাশেই ঘুরঘুর করতে লাগল। যখনই ওর বড়ফুপুকে এদিকে আসতে দেখে তখনই মৃদুলের মায়ের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় যাতে উনি দেখতে না পারেন। এমন দুই একবার সামাল দিলেও একটা সময় হাল ছেড়ে দিতে হল। কারণ ওর ফুপু নিজেই ওকে ডেকে জানতে চাইলেন মৃদুলের পরিবার কোথায় বসেছেন। উর্মি যখন ভাব ধরল ও জানেই না তারা এসেছেন কি না বলে তখন তিনি কনফার্ম করলেন যে তারা এসেছেন বহু আগেই কিন্তু তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। মৌমি তাকে বলেছে যে তারা এসেছে। মৃদুলের সাথে মৌমির দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে। তখন আর উর্মির আসেনি বলার বাহানা টিকল না। এরপর বলল ও খুঁজে দেখে জানাবে ফুপুকে।
ফুপু চলে গেলেন অর্নির আম্মুকে খবরটা দিতে যে তারা এসেছে। উর্মির সব রাগ গিয়ে পড়ল মৃদুলের উপর। একে তো নিজে কিছুই করতে পারেনি তার উপর এখন নিজেই ঢোল পিটিয়ে জানান দিয়ে এসেছেন শত্রুপক্ষকে। এই অবস্থায় কী করবে? ভাবতে ভাবতে পেছন ফিরতেই দেখল যে জায়গায় মৃদুলের আম্মু বসা ছিলেন উনি সেখানটায় নেই। ওর মাথাটা হঠাৎ করেই ঘুরতে শুরু করল। একটা সময় মনে হল ও পড়ে যাবে শরীরের তাল হারিয়ে। আর তখনই মনে হল লেট হলেই বিপদ। উনি কোথায় আছেন তা আগে জানা জরুরি। অমনি দৌড়ে চলে গেল অর্নির স্টেজের সামনে। প্রথম ধারনায় এই জায়গাটার কথাই ওর মনে হয়েছিল। বরকনেকে দেখতে সবাই একবার হলেও এখানে আসছেন। ভীড় ঠেলে সামনে আসতেই দেখল মৃদুল ওর পরিবার সহ অর্নির পাশে বসে ছবি তোলায় ব্যস্ত। এরই মধ্যে চোখ গেল সামনের সারিতেই বসা মৌমির দিকে। আর তখনই চট জলদি বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। দৌড়ে গিয়ে মৃদুলকে বলল
— এই আপনার শরীর এখন কেমন? আমি কী স্যালাইন গুলিয়ে আনবো?
ওর কথা শুনে মৃদুল আহম্মক বনে গেল। কথাটা এত জোরে বলল যে আশেপাশের সবাই মোটামুটি শুনতে পেল।
ও উর্মির দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল
— ইয়ে মানে… বুঝিনি।
— আরে আপনি এ পর্যন্ত কতবার গেলেন…সমস্যা তো বেশ গুরুতর..
— আরে…সমস্যা… একটু এগিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এই মিথ্যাটা না বললে কী হত না?” আর অমনি উর্মি দাঁতে দাঁত চেপে মিনমিন করে বলল “তাহলে ঘটনা সত্য হোক, কী বলেন? এক বোতল রেডি আছে এনে দিবো? খেলে সবটা সত্য হয়ে যাবে সাথে সাথে।”
—ইয়ে মানে…. না থাক…
— আরে এতে লজ্জা পেলে চলবে? অসুখ তো যে কারো যে কোনো সময়ই হতে পারে, পারে না?
— অসুখ মানে.. হ্যা… মানে..
— উফফ এত মানে মানে করতে হবে না। আগে বলেন স্যালাইন কী আনবো? নাকি আপনি এখান থেকে সরাসরি মহাখালী যাবেন?
— কী হয়েছেরে বাবু তোর?
— ইয়ে আন্টি আপনি কিছু জানেন না? ইয়া আল্লাহ আপনি একটা মানুষও বটে! আন্টিকে আপনার সমস্যার কথা বলেননি? আজব!
— না কিছু তো বলেনি মা, কি হয়েছে ওর।
— গতরাত থেকেই পেট বুরবুর করছিল বলেছিলেন তিনি। সকালে বমিও হয়েছে দু তিনবার। এখন এই অবস্থায় রীচ ফুড খেয়ে একেবারে বেগতিক অবস্থা ….
— ও মাই গড! তুই তো এসব কিছুই বলিসনি আসার আগে।
— সেটাইতো! সমস্যা নিয়ে লজ্জার কী আছে বলেন তো মিস্টার?
এবার মৃদুল ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশ একবার দেখে উর্মি র দিকে করুণ এক চাহনি দিল। কিন্তু তাতে উর্মি দমে যাওয়ার মানুষ না। ও আরো গলা চড়িয়ে বলল।
— আজব! আপনার সমস্যা আপনি চিকিৎসা নিন, বাসায় গিয়ে, আরাম করুণ। এখানে কে কী বলল, কে তাকিয়ে হাসল এসব দেখে পরিস্থিতি আরো জটিল করার নাম নির্বুদ্ধিতা, বুঝলেন। যান বাসায় গিয়ে একটু আরাম করুণ। কড়া ডোজের মেডিসিন খান। ইন শাহ আল্লাহ আগামীকাল দেখা হবে।
— হ্যা হ্যা, তুমি ঠিক বলেছো। চল চল বাসায় যাই। রাস্তায় একজন ডাক্তার দেখিয়ে নিবো কি তোকে?
— না আম্মু তার আর দরকার হবে না, চলো বাসাতেই যাই। এখানে থাকলে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। বলে উর্মির দিকে আবার তাকালো।
উর্মি এবার একটু মুচকি হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল “কি কেমন হল?”
চলবে