Home "ধারাবাহিক গল্প চায়ের কাপেই জমুক প্রেম চায়ের কাপেই জমুক প্রেম পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

চায়ের কাপেই জমুক প্রেম পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

0
চায়ের কাপেই জমুক প্রেম পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

#চায়ের_কাপেই_জমুক_প্রেম (পর্ব ২০)
সায়লা সুলতানা লাকী

বাসায় ফিরে মৃদুল নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকালো। এই মুহুর্তে ওর মেজাজ খানিকটা বিক্ষিপ্ত। এইভাবে লজ্জায় না ফেলে উর্মি অন্য কোনো ইস্যু খাঁড়া করতে পারতো। উপস্থিত মেহমানদের সামনে ও বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল। মৌমি কেমন করে যেন হাসছিল ওর দিকে তাকিয়ে, মনে হল ওর অবস্থা বেগতিক দেখে খুব মজা পাচ্ছিলো মেয়েটা । শুধু তাই নয়, সারা রাস্তায় ওর ভাবি খুব খেপাচ্ছিল এসব নিয়ে, দুবার বলেও ছিল “মৃদুল বাসায় যেতে পারবে তো ঠিকঠাক মতো, নাকি গাড়ি নষ্ট করে ফেলবে! সমস্যা হলে বলো আমরা গাড়ি থামিয়ে তোমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দিবো।”
ভাবির কথাগুলোকে মনে হয়েছে সে ওর কাটা গায়ে ভালোমতো নুন ছিটিয়ে দিচ্ছে।

বিছানায় শুয়ে মোবাইলটা হাতে নিতেই মনে হল ফয়সাল ভাই তো ওকে খাবারের সময় খুঁজবে। যদিও ও বলেছিল যে ও খেয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে তারপরও ফয়সাল রিকোয়েস্ট করেছিল ওর সাথে আবার বসতে। কথাটা মনে হতেই ফয়সালকে কল দিল। কিন্তু ও ধরল না। দুবার কল দেওয়ার পর আর বিরক্ত করতে চাইল না। মোবাইলটা পাশে নামিয়ে রাখতেই উর্মি কল দিল।
একবার ভাবলো ধরবে না পরে আবার কী মনে করে রিসিভ করল কলটা।
— হ্যালো
— ভাইয়াকে কল দিয়েছিলেন?
— হুমম,
—- ভাইয়া খেতে বসেছেন। তাই কল রিসিভ করতে পারেননি।
— ও।
— ভাইয়া আপনাকে খুঁজে ছিল, আমি পরে কাহিনি বলে দিয়েছি তাকে।
— আর কোনো মিথ্যা স্টকে ছিলো না?
— ছিলো না তো! থাকলে কি আর এই পথে নামি? ছি! কি…
— একদম ফাইজলামি করবেন না।
— ও মাই গড, খুব চটেছেন মনে হচ্ছে?
— না চটবো না। আপনাকে কোলে বসিয়ে সোহাগ করব।
— ইয়ে মানে… থাক… বুঝেছি…এখন রাখছি।
বলে কলটা কেটে দিল উর্মি, আর বিরবির করে বলল, “এর পেট খারাপ না বলে মাথা খারাপ বলা উচিৎ ছিল, কি সব কথা বলছেরে বাবা! আল্লাহ রহম কর, তুমি তো জানো আমার আর কোনো পথ ছিল না সামনে। সে নিজে তো কিছুই করতে পারেনি। আবার রাগ দেখায়, বদ লোক একটা!”

মৃদুল রুমেই শুয়েছিল, ইচ্ছে করছিল না আর বেরোতে। আজকে কতই না ইচ্ছে ছিল উর্মির পাশে থাকার। গতরাতে উর্মির উত্তেজনা যে ওর মনকে আরো বেশি বশ করে নিয়েছে। উর্মিকে ছাড়া যে এখন আর অন্য কিছু ভাবতেই পারছে না। মেয়েটা ওর আশেপাশে থাকলেই যেন ওর মনে সুখ সুখ আবেশ খেলে যায়।
কিন্তু আজ কী হতে কী হয়ে গেল, ভালো মতো একবার দেখতেও পারল না উর্মিকে। আজও পার্লারে যায়নি। গতদিনের কথাতেই মেয়েটা পার্লারে যায়নি এমনটাই ভাবতে ভালো লাগছে ওর। যে সাজ নিজেকে লুকায় তাতে কী আনন্দ থাকতে পারে তা মৃদুলের বোধগম্য না, তাই তো উর্মির সাজ নিয়ে খোঁচা দিয়েছিল। আর সেই খোঁচায় মেয়েটা আজ নিজেকে লুকায়নি মেকাপের ভাজে, ও যেমন তেমনই থেকে ছিল। এই উর্মিতেই যে মৃদুল ঘায়েল তা কী তাহলে উর্মি বুঝতে পেরেছে? এমন সব ভাবনায় যখন ও ডুবেছিল ঠিক তখনই ওর আম্মুর কথা মনে হল। আজ উর্মি সারাটাক্ষন ওর মায়ের পাশে ছিল। চারপাশে সব মেয়েরা ভারী মেকআপে ঝকমক করলেও ওদের পাশে উর্মিকে ম্লান লাগেনি বরং অন্য রকম ভালো লাগা ছেয়ে ছিল ওর মধ্যে কিন্তু সেই ভালোটা কী ওর মায়ের চোখে পড়েছিল? ভালো না লাগলে ওর আম্মু উর্মিকে ছেলের বৌ করতে চাইবেন না। উর্মির রাফটাফ চলনবলনও ওর আম্মু ঠিক কীভাবে নিবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। এই মুহুর্তে ওর আম্মুর মন পড়তে পারলে ভালো লাগত । গভীর চিন্তায় যখন ও আচ্ছন্ন ঠিক তখনই ওর আম্মু এসে দরজায় নক করল। ছেলে বর্তমান শারীরিক অবস্থা কেমন সেই বিষয়টা জানতেই মূলত তার আসা।
মৃদুল উঠে দরজা খুলতেই তিনি ভেতরে ঢুকে বিছানায় বসে জিজ্ঞেস করলেন
— কিরে এখন কী অবস্থা তোর ? ঔষধ খেয়েছিস?
— হুমম খেয়েছি। এখন তেমন কোনো সমস্যা বোধ করছি না আম্মু, তুমি অহেতুক এত টেনশন করো না।
— করব না মানে? তোর অবস্থা বিবেচনা করেই তো এত গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ফেলে স্বার্থপরের মতো বাসায় চলে এলাম।
— স্বার্থপর বলছো কেন আম্মু?
— আর নয়তো কী বলব? অর্নির আম্মু মোবাইলেই কেঁদে ফেললেন মেয়ের বিদায়ের কথা বলতে গিয়ে।
— এখনকার দিনে কী আর সেভাবে বিদায় হয়? এখানে কান্নাকাটি করার কী আছে?
— জন্মেছিস তো ছেলে হয়ে, মেয়েদের কষ্ট বুঝবি কী? দেখেছিস কখোনো আমাকে আমার বাবার বাড়ি যেটাকে আগে বলতাম আমাদের বাড়ি ওখানে গিয়ে দু’রাত একা সেই আগের মতো করে থাকতে? পেরেছি কখনো নিজের সংসার রেখে মায়ের কাছে গিয়ে আগের মতো আহ্লাদ করতে?
— কী করে পারবে? এরই মধ্যে যে নিজের একটা সংসার জুড়ে দিয়েছো। ওটা না থাকলে তো কোনো সমস্যাই হত না। ওই যে কিছু ছেড়ে কিছু পেলে সেটাইবা কম কী?
— কম তো বলিনি? বলেছি নিজের শেকড়ে তো আর ফিরতে পারিনি। কোনো মেয়েই পারে না।
— এটাই তো স্বাভাবিক, এটাকে কেন রং লাগিয়ে মেয়েরা সিমপ্যাথি পেতে চায়, সেটা মাথায় ঢুকছে না..
— মেয়েরা সিমপ্যাথি নিতে চায়? এমনটাই বুঝলি? অপদার্থ একটা?
— দেখো আম্মু, মেয়েরা হল একটা ঘরের রানী। তার কিন্তু সেই মর্যাদাটাই শো করা উচিৎ। কই মেয়েরা সম্মানের জন্য লড়বে, নিজের অধিকার, নিজের অবস্থান পোক্ত করবে তা না করে তারা সিমপ্যাথি পাওয়াটাকেই প্রাধান্য দিয়ে বসে থাকে।
—তোর ভাবনা দেখছি ভয়ংকর, লোক তোকে নারীবাদী পুরুষ বলবে।
— বলুক যে যার ইচ্ছে, এখন বলো তুমি আন্টিকে কল দিয়েছিলে কেন? আমি না বললাম আজ আর আন্টির সাথে কথা বলো না!
— তোর কথা শুনলে আমার হবে? আজ আপার সাথে দেখাটুকুও করতে পারলাম না। খেয়েদেয়ে চলে এলাম।
— আন্টি কী বললেন ?
— উনি তো খুব লজ্জিত হলেন, উলটো বললেন আমাদের দেখাশোনা করতে পারেননি, খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো করেছি কী না তার খোঁজ নিলেন। পরে আমি বললাম ওনার জায়গায় ওনার কাজটা খুব সুন্দর করে সম্পন্ন করেছে ওনার ছোট মেয়ে। জানিস আমি আজ খুব অবাক হয়েছি উর্মিকে দেখে। ওর বোনের বিয়ে অথচ মেয়েটা কী সিম্পল ছিল। খুব স্নিগ্ধ লাগছিল মেয়েটাকে। খুবই মায়াবতী হয়েছে , আপার এই মেয়েটা। কতটা আন্তরিকভাবে খাওয়ার সবটা সময় পাশে ছিল। উর্মি একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে। মাশা আল্লাহ মেয়েটা দেখতেও কী সুন্দর!
— আম্মু একটু বেশিই বলছো! মায়াবতী ঠিক..
— উঁহু, একটুও বেশি না। তুই অসুস্থ, আর এই মেয়ে এত ভীড়ের মধ্যে ও তোর জন্য স্যালাইনের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল। ও প্রচন্ড বুদ্ধিমতি মেয়ে।কখন কী করা উচিৎ তা বোঝে।
— আম্মু তুমি যা বলছো তা কী তুমি মিন করছো?
— হুমম, কেন তোর সন্দেহ হচ্ছে?
— আরে নাহ কী যে বলো! সন্দেহ হবে কেন? তবে
আরো শোনো আম্মু, অবাক হবে জেনে যে, পৃথিবীতে আমি কেবল ওর সাথেই চা শেয়ার করতে পারি একেবারে বিনা ডাউটে।
— মানে?
— মানে, ওর আর আমার চায়ের টেস্ট এক রকম। ধর চায়ের দোকানে ঢুকে ও যদি চায়ের অর্ডার দেয় তবে আমি সেই চায়ে চোখ বন্ধ করে চুমুক দিতে পারি।
— খেয়েছিস কখনো ওর অর্ডার করা চা?
— হুমম, বহুবার, ওর ইউনিভার্সিটি আর আমার অফিস তো একই এলাকা। আমরা একই দোকানে চা খাই।
—- ওকে তোর ভালো লাগে?
— ইয়ে মানে আম্মু, আসলে… ইয়ে..
— তোরা কী রিলেশনে আছিস?…
—- নাউজুবিল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ। এসব কী বলছো? বিলিভ মি, এমন কিছুই না।
— তাহলে…
— হয়েছে কী আম্মু, ফয়সাল ভাই যখন অর্নি আপুর পরিবারকে মানানোর জন্য রিকোয়েস্ট করলেন তখন ওই পরিবার থেকে আমাকে হেল্প করত উর্মি। এই কাজের উসিলায় কয়েকবার চা খেয়েছি একসাথে। তখন ওকে জেনেছি। জানো! উর্মি অর্নি আপুর মতো না। অর্নি আপু যেমন নিজের অধিকারের জন্য পরিবারকে লজ্জায় ফেলতে দ্বিধা করেননি, উর্মি তেমন না। ও দরকার হলে নিজেকে বলি দিবে পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে। অর্নি আপুর জন্য ও অনেক খেটেছে যাতে অর্নি আপুর সাথে ফয়সাল ভাইয়ের বিয়ে হয়। উর্মি অসম্ভব একটা ভালো মেয়ে।
— হয়েছে হয়েছে, আর কিছু বলতে হবে না। যা বোঝার তা বুঝে গিয়েছি। বাব্বাহ আমার ছেলের মুখে যেন খই ফুটছে।
বলেই তিনি হিহিহি করে হেসে উঠে দাঁড়ালেন।
— আরে তুমি যাচ্ছো কোথায়? বাকিটা শোনো..
— আর শোনানোর দরকার নেই। এতটুকুতেই হবে। এবার যাই তোর আব্বুকে বলি তার ছেলে চা শেয়ার করার জন্য একজনকে পেয়েছে। কথাটা বলে আবার হিহিহি করে হেসে বেরিয়ে এলেন।

এই মুহুর্তে মৃদুলের বুকটা অনেক হালকা লাগছে। ওর আম্মু পছন্দ করবে কি না তা নিয়ে যে সংশয় ছিল তা কেটে যেতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল।

আজ রাতে অর্নির বৌভাতের অনুষ্ঠান। মৃদুল সকালেই চলে এল অফিসে। উর্মি বেশ কয়েকবার ওকে কল দিলেও মৃদুল তা রিসিভ করতে পারেনি। অনেকটা ব্যাটে বলে মিলেনি। টানা কাজের পর যখন ফুরসৎ মিলেছে তখন কলিগদের সাথে আড্ডায় জড়িয়ে গেছে। কলিগদের মধ্যে যার বাগদান সম্পন্ন হয় সে পরেরদিন খাওয়ায়। সেই রকমই একজন ছিল আজ অফিসে। সেই খুশিতেই মেতে ছিল মৃদুল আর তাই সারাদিনেও উর্মিকে একটা রিটার্ন কল দিতে পারেনি।

রাতে সরাসরি অনুষ্ঠানেই দেখা হল উর্মির সাথে।
মৃদুলের মুখোমুখি হতেই দেখল ও গাল ফুলিয়ে আছে। কারণটা ওর অজানা নয়। এতবার কল দিয়েছে কিন্তু একবারও রিসিভ করেনি, শুধু কি তাই, মিসড কল দেখেও পাল্টা কলও দেয়নি। এই ক্ষেত্রে গাল ফুলানো জায়েজ আছে। মনে মনে রাগ ভাঙানোর প্রস্তুতি নিয়ে যেই এগোতে চাইল উর্মির দিকে তখনই ফয়সাল ডেকে নিয়ে গেল মৃদুলকে। উর্মি শুধু আড়চোখে তাকিয়ে ওর চলে যাওয়া দেখল।
মৌমি আর ওর আম্মুর কারণে উর্মি আর মৃদুলের আশেপাশে ঘেঁষতে পারেনি। মৌমি আজ বেহায়া মেয়ের মতো মৃদুলেরই চারপাশেই ঘুরঘুর করছে। ঠিক ওই সময়তে উর্মির ওর বড় ফুপুর উপর রাগ হচ্ছিল তার জন্য ও মৌমিকে কিছু বলতে পারছিল না। দূর থেকে শুধু রাগে ফুসতে থাকল।

মৃদুলের আম্মুকে আজ কাছে পেয়ে মৌমির আম্মু বেশ কয়েকবার হৃদ্যতা জমাতে চাইলেন কিন্তু ওই পক্ষের তেমন সাড়া না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে অর্নি আম্মুর উপরই ভরসা ছাড়লেন। এদিকে অর্নির আম্মু আজ আসেননি এই অনুষ্ঠানে । গতরাতে প্রেশার বেড়ে বিছানায় পড়েছিলেন তিনি। আজও ঘাড় টনটন করছিল ব্যাথায় যখন ওরা সবাই অনুষ্ঠানের জন্য রেডি হচ্ছিল। তার অবস্থা বিবেচনা করে তাকে বাসাতেই রেখে এসেছেন সবাই। এদিকে তিনিও বাসায় থাকতে পেরে খুশি ছিলেন কারণ মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে বরণ করার আয়োজন গোছাতে সময় সুযোগ পাবেন বলে।
এদিকে মৃদুলের আম্মু অর্নির আম্মুর অসুস্থতার কথা শুনেই মন খারাপ করলেন। গতরাতে উনি খুব কেঁদেছিলেন মোবাইল কলে কথা বলার সময়,তখনই তিনি আন্দাজ করেছিলেন উনি অসুস্থ হবেন বলে।
মৃদুলের আম্মুকে মনমরা অবস্থায় দেখেই অর্নির দাদি খুব করে রিকোয়েস্ট করলেন যাওয়ার পথে যেনো বাসা হয়ে অর্নির আম্মুকে দেখে যান। মায়ের অনুরোধ শুনেই মৌমির আম্মু বেশ জোড়াজুড়ি শুরু করলেন যেনো তারা আজ তাদের সাথেই অর্নিদের বাসায় আসে। মৌমির আম্মুর প্ল্যান হল, তারা এলে অর্নির আম্মুকে দিয়ে যে করেই হোক আজ বিয়ের কথাটা তুলবেনই তুলবেন।

ফয়সাল মৃদুলকে জোর করল ওর সাথে অর্নিদের বাসায় আসতে তখনই উর্মি সুযোগ পেয়ে বলল
— আসবে না ভাইয়া, তার লেনদেন শেষ। তার এখন উড়ুউড়ু মন। চোখ এখন কী যেনো খুঁজে বেড়ায় এদিক সেদিক । তার চারপাশে এখন বসন্ত বাতাস বইছে এরমধ্যে আপনার সাথে যাওয়ার সময় কোথায়?
খোঁচাটা খেয়ে মনে মনে হাসল। উর্মির মন যে এখন অভিমানে ঠাসা, শুধু তাই না ও যে প্রচন্ড রেগে আছে ওর উপর তা ওর হাবভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে। যখনই ও মৌমির সাথে কথা বলছে তখনই উর্মির চেহারার রং উড়ে যাচ্ছে। চোখ জোড়া যেন তখন হতাশার সাগরে হাবুডুবু খায়। ওর চোখেমুখে যে আকুতি তাতে শুধু ও নিজের জন্য উর্মির ভালোবাসাটুকুই খুঁজে পেল। যে ভালোবাসার জন্য প্রতীক্ষায় ছিল এতদিন। কারো মনে ওকে হারানোর ভয় থাকবে, যেই মন সেই ভয়ে ওকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরবে, যেই মনের ভালোবাসার টানে ও সব ছেড়েছুড়ে ছুটে এসে নিজেকে সঁপে দিবে সেই ভালোবাসার বুকে। যেই ভালোবাসার চোখে চেয়ে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলবে, সেই ভালোবাসায় ডুবে ওর মন স্বর্গীয় সুখে ভাসবে প্রতিনিয়ত। সেই ভালোবাসার সন্ধান পেয়েছে এখন শুধু আপন করে নেওয়ার পালা। সারাজীবন তার রাগ, অভিমান ভাঙানোর খেলা খেলতে প্রস্তুত মৃদুল। একটু হেসে বলল
— সব ঋণ কি শোধ হয়? না মানে ঋণ মেটানোর কথা ছিল আপনাদের বিয়ের পর। কেউ একজন নিজ হাতে চা বানিয়ে আমাকে খাওয়াবে তেমনটাই কথা ছিল।
— ঋণ টিন বুঝি না। তবে সেদিন একজন অতিথি হিসেবে চা বানিয়ে দিয়েছিলাম খায়নি। তাই আর দেওয়ার ইচ্ছে নেই। তবে এখন গেলে মৌমি আপুকে বলব চা বানিয়ে দিতে। তখন যেন খায় মনের সাধ মিটিয়ে।
— এই তোমাদের মধ্যে কী ঝগড়া চলছে?
— উঁহু, ঝগড়া মানুষ তার সাথেই করে যার উপর অধিকার থাকে, লেনদেন থাকে। ওনার সাথে আমার কিছুই নেই, ঝগড়ার তো প্রশ্নই আসে না।
এবার উর্মি আরও বেশি রাগ দেখিয়ে উঠে সরে গেল এই জটলা থেকে। আর তা দেখে ফয়সাল হাহাহা করে হেসে বলল “মৃদুল এটা কী হল?”

বাসায় এসেই উর্মি দেখল মৃদুলের আম্মু ওর আম্মুর সাথেই দাঁড়িয়েছেন অর্নি আর ফয়সালকে বরণ করতে। এখান থেকে যে ও সরবে তাও করতে পারছে না। কোনোভাবেই মৃদুলকে ছেড়ে যেতে ভরসা পাচ্ছে না। আজ মনে হচ্ছে মৌমি একটু বেশিই মৃদুলের গায়ে পড়তে চাচ্ছে, আর মৃদুলও মৌমির কথার জালে ইচ্ছে করেই জড়াচ্ছে। দুটোকেই বড্ড বেশি ছ্যাচড়া বলে মনে হচ্ছে। একটু পর পর মৃদুলের সাথে চোখা চোখি হচ্ছে আর মৃদুল মুচকি একটু হাসি দিয়ে আবারো মৌমির সাথেই গল্প জুড়ে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে টেনে ওকে মৌমির থেকে দূরে সরিয়ে নিতে কিন্তু তাও পারছে না ওর ফুপুর জন্য। সব মুরুব্বিরা আজ আগেভাগে বাসায় চলে এসেছে কিন্তু ওর বড় ফুপুই শুধু বেজে ছিল ওর সাথে। একটু পর পর এসে আবদার করেছে মৌমির সাথে মৃদুলের কিছু ছবি তুলে দিতে। শুধু কী তাই? আবার আহ্লাদে গদগদ হয়ে জানতে চান “ওদের দুজনকে দারুন মানিয়েছে নারে উর্মি?”
উত্তরে “জি ফুপু” এই দুই শব্দই অনেক ভরী হয়ে পড়ছিল ওর উপর। কিন্তু ফুপুর মুখের উপর যা ইচ্ছে তাই বলা যায় না। ফুপু যদি নালিশ তুলে যে উর্মি তার সাথে বেয়াদবি করেছে তবে আর ওর রক্ষা থাকবে না। সবার তোপের মুখে পারতে হবে। তাই এই অসহ্য যন্ত্রণাও মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে। গতকাল কী এমন অন্যায়টা করেছিল উর্মি যার জন্য এত বেশি ভাব দেখাচ্ছে মৃদুল তাই ওর মাথায় খেলে না। একটা সময় স্যরি বলার জন্য কল দিয়েও লাভ হয়নি। এতবার কল দেখেও যে সে ভদ্রতা দেখিয়ে একটা কল করেনি তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে ওটা যেন কোন ব্যাপারই না।

সব ফর্মালিটি শেষ করে যখন অর্নি আর ফয়সাল রুমে গেল রেস্ট নিতে তখনই মৌমির আম্মু অর্নির আম্মুর কাছে গিয়ে য়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন মৃদুলের আম্মুকে বিয়ের কথাটা বলেছেন কি না?
অর্নির আম্মু যখন বললেন উনি এখনো বলার সুযোগ পাননি আর অমনিই তিনি রেগে বেশ উচ্চ স্বরেই বলে উঠলেন
— আজব! এখনো কেন বলোনি? আমরা আসার অনেক আগেই উনি এসেছেন বাসায়। তখন তো নিরিবিলি বসে বিয়ের কথাটা বলতে পারতে। কেন বলোনি তখন? তুমি কী চাও না আমার মেয়েটার একটা ভালো বিয়ে হোক? এত হিংসা তোমার?
— কি হলো এখানে আবার? এই তুই এত চিৎকার করছিস কেন বৌমার উপর।
অর্নির দাদিও এগিয়ে এলেন মেয়ের চিৎকার শুনে। এদিকে উর্মি চা বানিয়ে ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে সবে মাত্র হলরুমে ঢুকেছে এরই মধ্যে ফুপু ওর আম্মুর সাথে চিৎকার করছে শুনে থ মেরে দাঁড়িয়ে গেল বিষয়টা বোঝার জন্য।
মৌমির আম্মুর আচরণে মৃদুল ও মৃদুলের আম্মুও আহম্মক বনে গেল সবার সামনে। একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিল একবার। রুম ভরা ওদেরই আপনজনেরা বসা।

— কি আর হবে? তুমি তো সবসময়ই তোমার বড় বৌয়ের ব্যাপারে অন্ধ। দেখো এখন হাতে নাতেই দেখো বিষয়টা। ওর ভেতরে কত হিংসা দেখো। ছেলের মা কত আগেই বাসায় এসেছে। ও কী পারতো না বিয়ের কথাটা তুলতে? ও তো দায়িত্ব নিয়েছিল বিয়ের কথা বলবে বলে। কী বলো নেয়নি ও?

মৃদুল যা বোঝার তা বুঝে গেল। তাই নিজেই ওর আম্মুকে টেক্সট পাঠালো “আম্মু প্লিজ তুমি আমার আর উর্মির বিয়ের কথাটা আজ এখনই সবাইকে বলে দাও। এখনই বিয়ের প্রস্তাব দাও। এই মহিলা কোনো ঝামেলা পাকানোর আগেই বলো আম্মু প্লিজ।”।
মৃদুলের মা টেক্সটটা পড়ে কিছু একটা ভাবলেন। এরপর নিজেই এগিয়ে এসে অর্নির দাদিকে উদ্দেশ্য করে বললেন
— খালা আজ কিন্তু আমি আপনার কাছে একটা জিনিস চাইতে এসেছি। গতবার এসে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে, এবার কিন্তু আর খালি হাতে ফিরব না।
হঠাৎ করেই মৃদুলের আম্মুর মুখে এমন কথা শুনে সবাই বেশ অবাক হয়ে গেল। অর্নির চাচিরাও ওনার কথা শুনে পাশের রুম থেকে দৌড়ে এল হলরুমে তার পুরো কথাটা শোনবার জন্য। বাসায় এমনিতেই বাতাসে মৌমির বিয়ের কথা উড়লেও তারা কেউ তেমন একটা খুশি হতে পারেনি। তারা মৃদুলকে খুব পছন্দ করে, কিন্তু মৌমির জন্য কেন যেনো এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি।
অর্নির আম্মুর চোখ ছলছল করছে। সবার সামনে এমন অপমান সহজেই কী আর হজম হয়? কিন্তু তিনি এর উত্তরে কিছুই বললেন না, এমন তো আর নতুন না, তিনি জানেন তিনি কিছু না বললেও তার শাশুড়ি ঠিকই মেয়েকে শাসন করবেন। কিন্তু এখন সমস্যা তা নয়, এখন সমস্যা হল মৃদুলের আম্মু কী চাইবেন? উনি খুব ভালো করেই জানেন উর্মি খুব ভালোবাসে মৃদুলকে। মেয়ের ভালোবাসাকে তিনি কীভাবে অন্যের হাতে তুলে দিবেন? দিন শেষে সেও যে এক মা, মেয়ের মা। মেয়ের কষ্টের কথা তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেননি, তাই তো সময় পেয়েও মৌমির সাথে মৃদুলের বিয়ের কথাটা তুলতে পারেননি।
— কি চাইবেন আপা বলেন। মা দিবে, আপনি যা চাইবেন তাই দিবে। কি মা দিবা না? বলো তুমি বলো। মৌমির আম্মু আগ বাড়িয়ে কথাটা বলে তার মা’কে ইশারা করল কিছু বলতে।
— কী চাইবেন খালা বলেন, আপনি যা চাইবেন আমি তাই দিবো। প্রথম বারের কথা বলে আর লজ্জা দিয়েন না।
কথা বাতাসে ভেসে অর্নিদের রুম পর্যন্ত যেতেই ফয়সাল সহ অর্নি ছুটে এল ঘটনা বুঝতে। দুজনই প্রস্তুত যদি ওর বড় ফুপু উলটা পালটা কিছু করে তবে ওরা ছাড়বে না। মৃদুল আর উর্মির মাঝে আর কেউ ঢুকবে না। এটাই ফাইনাল।
— আচ্ছা থাক আর বলব না। বরং প্রথমবার খালি হাতে গিয়ে ভালোই হয়েছে। তাই ওই প্রসঙ্গ এড়ানোই ভালো। কারণ অর্নি আর মৃদুলের ম্যাচিং ভালো ছিলো না। আমার ছেলেটা একটা পাগল। যখন থেকেই ওর বিয়ের কথা বলা হচ্ছিল তখন থেকেই বলতো ও নিজে যেমন চাখোর ঠিক তেমনই আরেক চাখোরকে বিয়ে করবে। যাতে ওর চায়ের প্রতি ভালোবাসায় কখনো ভাটা না পড়ে। বহুমেয়ে দেখেছি কখোনো কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি মেয়ে চা পছন্দ করে কি না। কারণ আমি
ওর কথাকে কখনো পাত্তাই দেইনি। ওর করা কোনো জোকস মনে করে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু
গতরাতে হঠাৎ করেই ছেলে আমাকে বলল ও নাকি ওর চায়ের পার্টনার খুঁজে পেয়েছে। যার সাথে ও ওর পছন্দের চা শেয়ার করতে পারবে। আমি বেশ অবাক হয়েছি, কেন না আমরা এমন কাউকে খুঁজি যার সাথে সারাজীবন শেয়ার করতে পারি। এই প্রথম আমার পাগল ছেলেটা আমাকে বলল ও সারাজীবন কারো সাথে চা শেয়ার করতে চায়। আমিও এক পাগল মা। তাই তো রাজি হয়ে গেলাম। যাহ তোরা সারাজীবন চা শেয়ার করেই কাটিয়ে দে। এতে যদি তোরা সুখে থাকিস তাতেই আমার শান্তি।
— চা শেয়ার করবে মানে? এটা কেমন কথা?
অর্নির ছোট চাচি ঠোঁট উলটে জিজ্ঞেস করতেই মৌমির মা একটু হেসে বললেন
— আরে আমার মৌমিও তো ইদানীং খুব চা খাওয়া শিখেছে। দিনরাত শুধু চা খায়। এখন ভাত খায় না। এক লিটার দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে তাতে পাতি দিয়ে চা বানায়…
— আহা, আম্মু তুমি থামোতো!
মৌমি একটু বিরক্ত হয়েই ধমকে উঠল।
— আহা! তুই ধমকাস কেন? না বললে তারা জানবে কীভাবে যে তুই ও চাখোর।
— আরে আম্মু চা মানে শুধু চা নয় এই চায়ের একটা লেভেল আছে বুঝলা? কড়া লিকারে চা হবে তিতা আর তাতে ঢালবে ঘন দুধ, চিনি আর সবশেষে তাতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে মালাই।
—আমাদের বাসায় এমন চা দুজন পছন্দ করে আপনি কার কথা বলছেন আপা? কাকে পছন্দ করেছে আপনার ছেলে? অর্নির মেঝচাচি এবার প্রশ্নটা তুললেন।
— চুপ করে আছিস কেন বোকা? বাকিটাও আমি বলবো। নামটা তুই বল।
হঠাৎ করেই মৃদুল একটু লজ্জায় পড়ল। হল রুমের সব কেমন ড্যাবডাব করে তাকিয়ে আছে মৃদুলের দিকে। ও ঘাড়টা ঘুরিয়ে একবার সবার দিকে তাকাতেই উর্মিকে দেখতে পেল। এই মেয়েটাও অবাক হয়ে সবার মতো নামের প্রতিক্ষায় আছে।
— মৃদুল নামটা বলো, আমরাও শুনতে চাই।
— ইয়ে মানে দাদি, জি দাদি আর আমার ম্যাচিংটা….
এইটুকু বলতেই উর্মির মেজাজ গেল খারাপ হয়ে। ও আর থাকতে পারল না রেগে হলরুম থেকে হনহন করে হেটে বেরিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল। ও ভেবেছিল ওর নামটা বলবে। ও নিজের কানে শুনবে সেই নাম। যা দিয়ে বাকিজীবন ওকে কথা শোনাবে এই বলে যে বেহায়ার মতো সবার সামনে আমার নাম বলে আমাকে চেয়ে এনেছো তাই এখন থেকে আমি যা বলবো তাই তোমাকে করতে হবে। কিন্তু না, তিনি নাম বললেন দাদির। যাও তাহলে দাদির সাথেই সংসার কর, চাঁদনি রাতে ছাদে বসে দাদিকে বুকে জড়িয়ে এক কাপ চা শেয়ার করো। এক চুমুক তুমি আর এক চুমুক আমি….

আর ভাবতে পারল না, তার আগেই দেখল এক কাপ মালাই ভাসানো দুধ চা ওর মুখের সামনে ধরে মৃদুল বলছে —-

উদাসী মন
ধোঁয়ায় উড়ুক।
অব্যক্ত কথারা
অধরে কাঁপুক।
পাওয়ার আকুতি
হৃদয় নাড়ুক।
টোল পড়া গালে
আবেগ হাসুক।
কড়া লিকারের তেতো গন্ধ
কেবলই কাছে টানুক।
কাপে দুধ চিনির সাথে
খানিক ভালোবাসাও পড়ুক
সব অনুভূতি এবার
শুষে নেক ছোট্ট একটা চুমুক।
তবে চায়ের কাপেই
আমাদের প্রেম জমুক।

উর্মি কেন যেনো কোনো কথাই বলতে পারল না, দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ভেউভেউ করে কেঁদে উঠল। পরক্ষনেই শুনতে পেল সারারুম জুড়ে সবার হাসির শব্দ। উর্মি কান্নার বেগ আরো বাড়লো। মৃদুলও ওকে বাঁধা দিল না। মেয়েটা ওকে হারানোর ভয়ে এতদিন সংকুচিত হয়েছিল ওর মনের আকাশে পরতে পরতে ভয়গুলো মেঘ হয়ে জমেছিল। আজ সব ভয় বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ুক। স্বচ্ছ সুন্দর ঝলমলে আকাশেই হোক ওদের নতুন জীবনের ভালোবাসার গল্প রচনা।
ভাবতে ভাবতেই মৃদুল এবার উর্মির বানানো চায়ে চুমুক দিল…

সমাপ্ত