#চারুকাব্য ২৭ (শেষ পর্ব)
লেখা : #azyah_সূচনা
নিজের দেহের উপর কোনো কন্ট্রোল নাই কাব্যর।ছটফট করছে।নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা নেই নিজের মধ্যেও।কি করবে?কি করলে চারুর কষ্ট কমবে? প্রসব বেদনা এতোটা ভয়াবহ?ভেতরের সবটা দুমড়ে মুচড়ে নিয়ে যায়।সে নিজে সহ্য করতে পারছে না চারুর কষ্ট।তাহলে চারুর নিজের কি অবস্থা।সেতো সহ্য করছে।ঘামে ভেজা মুখটা দেখে হৃদয়ে ছুরি চালাচ্ছে যেনো কেউ। স্ট্রেচারে হাতটা ছুটে যাওয়ায় মনে হলো কেউ জানটা কেড়ে নিয়ে গেলো। সবকিছু ভেঙে চুরমার করে করে দেওয়ার ইচ্ছা।পুরো করিডোরে বুট জুতোর আওয়াজের খটখট।অল্প নয় বেশ জোরেশোরেই শব্দ করছে।কয়েকবার ওয়ার্ণিং এসেছে অন্য পেশেন্টদের সমস্যা হচ্ছে এতে।কোনো হেলদোল নেই কাব্যর।
আকস্মিক কি যেনো হলো।পকেট হাতড়ে মোবাইল ফোন বের করে নিলো।কাকে যেনো ফোন করছে।অস্থির গলায় বললো,
“হ্যালো হ্যালো”
ফোনের অপরপাশে থেকে সাবিনা বললেন, “কাব্য?”
“হ্যা আমি কাব্য।”
“বলো আমাকে কল করলে যে হটাৎ?”
কাকুতি ভরা গলায় কাব্য বলে উঠলো, “জন্মের সময় অনেক কষ্ট দিয়েছি আপনাকে।আমাকে মাফ করে দিবেন।আমার বাচ্চাটা আর আমার চারুলতার জন্য দুআ করবেন।”
নিজের মায়ের কথা মনে পড়েছে। নিশ্চয়ই সেও এতটাই কষ্ট করেছে কাব্যকে জন্ম দিতে গিয়ে।হয়তো তখনও কবির আফনান নামক খারাপ লোকটা তার জন্য এতোটা কাতর ছিলো না। প্রখর সহানুভূতি জাগে।মায়ের কথা মনে পড়ে ব্যথিত হয়ে উঠে।
সাবিনা কেঁদে উঠলেন।বললেন, “বাবা আমি অবশ্যই দুআ করবো তোমার স্ত্রী আর সন্তানের জন্য।তারা দুজনই সুস্থ থাকবে।দেখে নিও”
“হুঁ” ছোট্ট শব্দে উত্তর দেয় কাব্য।
“বাবা আমি আসি?তুমি রাগ করবে নাতো?”
খানিকটা থমকায় কাব্য।ভাবনা চিন্তার জন্য সময় নেয়।পরপর বললো, “আসেন।”
ধপ করে চেয়ারে বসেছে কাব্য।নিজের উপর জোর খাটিয়ে স্থির হওয়ার চেষ্টা করলো। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আসাঢ় হয়ে উঠছে। সেটাও বেশিক্ষণ করতে পারলো না।একজন নার্স বেরিয়ে এসে ‘ মিস্টার কাব্য আফনান ‘ বলে ডেকে উঠে। সটাং করে উঠে দাড়ায় কাব্য।দৌড়ে যায় সেদিকে।
নার্স বললো, “আপনি হাসবেন্ড?”
“জ্বি”
“প্লিজ স্যানিটাইজ করে নিন হাত।”
“কেনো?”
“বেবিকে নিয়ে আসছি।সেফটির জন্য দরকার।”
সোজাসাপ্টা কথা বলে নার্স চলে গেলো পূনরায় ভেতরে।কাব্য বোকার মতোন দাড়িয়ে আছে স্যানিটাইজার হাতে নিয়ে।সে যে ‘ বেবিকে নিয়ে আসছি ‘ এই কথায় আটকে গেছে।আমজাদ এগিয়ে আসলো।
স্যানিটাইজার এর বোতল হাতে নিয়ে নিজের হাতে সর্বপ্রথম মেখেছে।মূর্তি হয়ে দাড়িয়ে থাকা কাব্যর হাতেও দিয়ে দিলো।কোনো প্রতিক্রিয়া নেই কাব্যর।অন্যদিকে মৃদুলা এই দৃশ্যে ওড়নায় মুখ চেপে হেসে ফেললো।
বাচ্চার কান্নার আওয়াজই হুশে এনেছে কাব্যকে।নার্সের কোলে থাকা বাচ্চার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে দেখলো ড্যাবড্যাব করে।এটা তার বাচ্চা? বিশ্বাসে ঘাটতি আছে।
নার্সের দিকে চেয়ে কাব্য প্রশ্ন করলো,
“ও ছেলে না মেয়ে?”
বাবার এমন কথায় নার্স বোকার মতন চাইলো কাব্যর দিকে।বললো,
“ছেলে। নিন”
কাব্য দ্রুত গতিতে বলে উঠে, “না পড়ে যাবে।”
আমজাদ কপালে হাত রাখলো।কলিজার পাটা বড় করে বলল, “বাচ্চা জন্ম দিতে পেরেছেন এবার পালতেও শিখেন স্যার।দেন আমি দেখাছছি কিভাবে নিতে হয় কোলে”
“খবরদার আমজাদ!আমি ওর বাবা।আমি নিবো কোলে।”
“আপনি না ভয় পেলেন মাত্র?”
তাঁদের তর্কে নার্স রেগে যায়।তার হাজারো কাজ।বাচ্চা নিয়ে দাড়িয়ে থেকে এদের তামাশা দেখবে নাকি?তেতে বলতে লাগলো, “যার নেওয়ার নেন।কিন্তু বাচ্চাটাকে কেউ একজন কোলে নেন।”
কোনরকম কোলে তুলে নিয়েছে। শায়লা এসে সাহায্য না করলে এখানে একটা কেলেঙ্গারি হয়ে যেতো আমজাদ আর কাব্যর মধ্যে।চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।অনেকটা ঘাড় নামিয়ে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বললো,
“আমার জানবাচ্চা।তুমিতো একদম তোমার মায়ের মতন”
মুহিত, সাবিনাসহ তাদের ছেলে মেয়েও এসে হাজির।বাচ্চাকে বুকে নিয়ে কুকড়ে থাকা কাব্যর দিকে নজর যেতেই সস্তির হাসি হাসে সকলে।আধ ঘন্টা পাড় হয়েছে।একটা কাউকে ছুঁতে দেয়নি ছেলেকে।নিজে নিজেই কানে আযান দিয়ে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।মাথা তুলে সাবিনাকে দেখতে পেলো।
হাসি মুখে ছেলের দিকে ইশারা করে বললো, “আমার ছেলে”
সাহস করে কাপা হাতটা কাব্যর মাথায় ছোঁয়ায় সাবিনা। ভয়েভয়ে।
আশ্চর্য্যজনকভাবে কাব্য কিছুই বললো না।সাবিনা বললেন,
“অভিনন্দন বাবা।তুমি আর চারু পৃথিবীর শ্রেষ্ট বাবা মা হয়ে উঠো।আমাদের ছায়াও যেনো না পড়ে তোমাদের উপর।”
“এখন এসব কথা বলার সময় না।আমি ভীষণ খুশি আজ।”
অবশেষে বাচ্চাকে নানি,দাদীর হাতে হস্তান্তর করে ছুটে চললো নিজের প্রণয়িনীর কাছে।তার চারুলতা।প্রতিটা এগোনো কদম স্মৃতিচারণ করাচ্ছে তাকে। যেখানে তাদের মিলন ছিলো দুষ্কর সেখানে আজ সন্তানের বাবা মা তারা।
দুর্বল চারুর গালে হাত রেখে বলতে লাগলো,
“কি বলে ডাকবো তোমায়?আমার সুন্দর লতা নাকি আমার ছেলের মা?”
“চারুলতা বলে ডাকবে”
“ভালোবাসি”
“আমিও”
তিনদিন পর বাড়ি ফিরেছে। সকলের মুখ হাস্যোজ্জ্বল।ঘরের নতুন সদস্যের আগমনে রঙিন চারিদিক।চয়ন আর মৃদুলা মিলে পুরো ঘর সাজিয়েছে।আমজাদকে এই খুশির ভাগীদার হতে দিলো না কাব্য।কাজে পাঠিয়েছে। এতিমখানার বাচ্চাদের জন্য মিষ্টি আর প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে। হিংসুটে কাব্য।ছেলেকে মায়ের কাছ থেকে দূরে রেখেছে।মাত্র তিনদিনেই বাচ্চা কোলে নেওয়ার ডিগ্রি অর্জন করে।ক্ষিদে পেলেই মার কাছে যাওয়ার সুযোগ পায়।নাহয় সারাক্ষণ বাবাই ওর সব।বাড়িতে প্রবেশ করেই সর্বপ্রথম চঞ্চল সাহেবের ঘরে পা বাড়ায়।ভিন্ন ভিন্ন ডক্টর দেখিয়ে তার অবস্থায় উন্নতি আনতে পেরেছে। একটু উঠে বসে এখন।
চঞ্চল সাহেবের সামনে বসে কাব্য বললো, “বাবা দেখেন আপনার নাতি।পুরো আপনার চারুর কার্বন কপি।”
নার্স সাহায্য করে হাত তুলতে।এগিয়ে দিলো হাতটি নাতির মুখে।সেও আজ কান্নারত।কাব্য শায়লাকে ডাকলো।বললো,
“বাবুর নানুমনী এখানে এসে আপনার স্বামীর সাথে বসুন।একটা ছবি তুলি”
___
“তোমাকে আমি বন্দুক দিয়ে ধিশকাও করে দিবো ছোট্ট পুঁচকে!”
দশ মাসের বাচ্চার মাথায় খেলনা বন্দুক ধরে আছে প্রণয়।পুলিশ আসামির খেল খেলছে। আরশও বোকার মতন চেয়ে আছে।হচ্ছেটা কি?
“এই পুঁচকে!কথা বলো না কেন তুমি?গুলি করবো কিন্তু কথা বলো বলছি!”
আরশ কিছুই বুঝল না।ঝাঁঝালো গলা শুনে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগলো। হামাগুড়ি দিয়ে চলে যেতে চায় অন্য জায়গায়।ভয় পাচ্ছে এখানে। প্রণয় এগিয়ে যায়।নিজের ছোট হাতে আরশের কাপড় টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গেলো ডাইনিং রুমে।
একহাতে আরশকে ধরে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো, “আম্মু আসামি ধরেছি”
আসামি ধরেছে?কি বলে এই ছেলে।চায়ের কাপ টেবিলে রেখে নিচে তাকায় চারু।সাথেসাথে চোখ কপালে উঠে গেলো। একি কাণ্ড!এইটুকু বাচ্চাকে মাটিতে ফেলে টিশার্ট টেনে ধরে আছে।একলাফে উঠে দাড়ায়। আরশকে কোলে তুলে অগ্নিদৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো প্রণয়ের দিকে।
বললো, “এটা কি করেছ তুমি?”
“আসামি ধরেছি।”
“থাপ্পড় দিবো বেয়াদব ছেলে।”
হাতের বন্দুক মায়ের দিকে তাক করে প্রণয় বলে উঠলো , “আমি গুলি করবো।”
“রক্ত কথা বলে! তোর বাপ আসুক আজ।তোর ব্যবস্থা করছি।”
চারু গলা উচু করে ডাকলো মৃদুলাকে, “মৃদুলা আপা?এখানে আসেন।”
নিজের ঘর গুছিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসে মৃদুলা।ছেলেকে কাদতে দেখে ঘাবড়ে উঠলো।দ্রুত কোলে নিয়ে বললো, “কি হয়েছে?”
চারু প্রণয়কে দেখিয়ে বললো, “এই অসভ্য ছেলেটার থেকে দূরে রাখবেন আরশকে।কোনদিন কোন বিপদ ঘটাবে।”
মৃদুলা কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। প্রনয়ও ছোট।ওকেই দোষ দিয়ে কি লাভ।চারুকে শান্ত হতে বলে আরশকে কোলে নিয়ে হাটতে লাগলো।ঘুম পারাবে।আরেক হাতে প্রনয়কেও নিয়ে গেলো।তার মায়ের মাথা গরম।উত্তম মধ্যম খাওয়ার আগেই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিলো।
“আমজাআআদদদ”
সুরেলা ডাক শুনতে শুনতেই বাকি জীবন পাড় হবে।আজকাল মেজাজ খারাপ হয়না।ভালোই লাগে শুনতে।নিজের বউওতো এভাবে ডাকে না। কাব্যের ডাক ভিন্ন।আজকাল আবার সাহস বেড়েছে।
আমজাদ উত্তর দেয়, “বলেন”
কিঞ্চিত কপাল কুঁচকে কাব্য বললো, “বিয়ের পর তোমার দেমাগ বেড়েছে দেখছি।ভয় পাও না আমাকে?”
“সরি ভুল হয়ে গেছে স্যার”
এবারও মন মানেনি কাব্যর।বললো, “তোমার কণ্ঠে আমি এখনও তেজের আভাস পাচ্ছি।”
“মাননীয় কাব্য স্যার আপনি কি বলতে চান তাহা বলিয়া আমাকে বাধিত করেন”
“জমলো না।”
কপালে আঙ্গুল চেপে ধরে আমজাদ।জীবনেও শান্তি দিবে না।কোনোদিন না।কাজের কথা না বলে পেচাচ্ছে শুধু।মুখটা আগের মতোন করুন করে ফেললো।বললো,
“সরি স্যার।বলেন কি আদেশ আমার জন্য?”
“চিপস,চকোলেট আর জ্যুস নিয়ে আসো।যা আনবে দুইটা করে আনবে।”
চারুকাব্যর প্রণয়ের চিহ্ন তাদের প্রনয়।নামটা সেই ভাবনা থেকেই এসেছে।আমজাদ বাবা হয়েছে দশ মাস। যেখানে তার বাবা হওয়ার কথা।যেখানে কাব্য এগিয়ে।এখানেও সুযোগ দেয়নি। ছেলেটা হয়েছে তার মতন। স্বভাব চরিত্র একদম কাব্য। এই বয়সেই পিস্তল তার প্রিয় খেলনা।যেখানে বাবা নিজে সব সারেন্ডার করে দিয়েছে।ছেলে পরম্পরা পূনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টায়।সাবিনা মুহিত আসেন মাঝেমধ্যে।তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নতি না হলেই কাব্য আসা যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দিয়েছে।
গাড়ি টেনে যারযার বাবারা তাদের সন্তানদের কাছে।দুজনের বুকে ঠায় মিলেছে দুই সন্তানের।এই সময়ে জমজমাট থাকে বাড়ির পরিবেশ। বাবা,মা, নানা,নানি আর একমাত্র মামা মিলে আড্ডায় বসে।মাটিতে পাটি বিছিয়ে তাদের আড্ডা জমে।
প্রণয় বললো, “আম্মু বকেছে।”
“কেনো জানবাচ্চা?কিছু করেছো?”
চারুলতা আওয়াজ তুললো।বলে উঠে, “আরশকে মাটিতে টেনে হিঁচড়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে এনেছে।”
প্রণয়ের বাবা আরশের বাবার উপর অত্যাচার চালিয়েছে। প্রনয় কেনো পিছিয়ে থাকবে।সেও অত্যাচার চালায় তার ছেলের উপর।মায়ের মতন রেগে গিয়ে নয় নিজের মতন করে বুঝাতে শুরু করে কাব্য ছেলেকে। বেশিনা কয়েক মিনিটের কথোপকথন। ব্যস এতেই ছেলে বিশাল বুদ্ধিমত্তা দেখিয়ে ঠান্ডা।বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার কথাও দিলো। চারু হতাশায় মাথা দোলায় দুইদিকে।সে কি জাপানি ভাষায় বুঝায়?তাহলে কেনো মায়ের কথা বুঝে না এই ছেলে?
সবার মাঝে কাব্য বলে উঠে, “আমরা সন্দীপ যাচ্ছি আগামী সপ্তাহে।”
চারুর পদোন্নতি হয়েছে এই কয়েক বছরে। তানভীরও বিয়ে করে নিয়েছে বছর দুয়েক হলো। প্রণয়কে দেখতে এসেছিল স্ত্রীকে সাথে নিয়ে।সুখী সংসার সকলের। মান,অভিমান, ভালোবাসায় পূর্ন।একটি গাড়ি দ্রুত বেগে টানছে চট্টগ্রামের দিকে। ফ্লাইটে চরবে না।রাস্তা উপভোগ করতে করতে যাবে সকলে।শুধু চঞ্চল সাহেব,আমজাদ, মৃদুলা ও তার আরশকে ফ্লাইটে পাঠিয়েছে।চঞ্চল সাহেব অসুস্থ।আরশ ছোট।তাদের এতোটা পথ জার্নি করানো কষ্টকর।চারুর পক্ষে প্রণয়কে একা সামলানো কষ্টকর।শায়লা আর চয়ন আছেন তার সাথে।ভারী চঞ্চল সে।একহাতে সামলানো কষ্টসাধ্য।চারু হাপিয়ে উঠে।বাবা মা কেউইতো এত ছটফটে নয়।এই বাচ্চাটা হলোতো হলো কার মতন?মুহিত সাহেব ভিডিও কলে জানিয়েছেন ছেলে মেয়ের পরীক্ষা শেষ হলে তারাও আসবেন।ঘুরে যাবেন চারুকাব্যের নীড়ে।
বড়রা ক্লান্ত কিন্তু ক্লান্ত নয় সেই ছোট্ট দেহ।সমুদ্র দেখে কাউকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে দৌড় লাগায়।তার পিছু পিছু ছুটেছে তার বাবা।চিৎকার চেঁচামেচি করেও লাভ হলো না। অগ্যতা পরিহিত কালো কোর্ট প্যান্ট ভিজে একাকার। প্রণয়কে কাঁধে চড়িয়ে ঘরের দিকে ফিরে এলে চারু হেসে উঠে।বলে,
“একি অবস্থা।দুজনই কাক ভেজা।”
কাব্য উত্তর দেয়, “আমার আব্বাজান দায়ী এসবের পেছনে”
“আপনি এই কোর্ট প্যান্ট কবে ছাড়বেন? নরমাল কাপড় পড়েন না কেনো?”
“তুমি কি বুঝবে চারুলতা এসব কাপড়ে একটা সাহেবী ভাব পাওয়া যায়।ছোটবেলার শখ।সাহেব সেজে ঘুরে বেড়ানোর।”
কাব্যের এমন কথায় চারু মুখ ভেংচিয়ে উত্তর দেয়, “ঢং!”
রাতের আড্ডা জমেছে।সমুদ্র তীরে আগুন জ্বালিয়ে। নারীরা এখানেই আগুন জ্বালিয়ে খাবার রান্নায় ব্যস্ত।মুহিত সাহেবরা পথেই আছেন।কাব্যর নজরের সামনে আরশের সাথে কোনো রকম ঝামেলায় লিপ্ত হচ্ছে না প্রনয়ও।খাওয়া দাওয়া আলাপ আলোচনার ভিড়ে তৃষ্ণার্ত চোখ ঘেমে একাকার চারুর দিকে।মন বলছে এই সুন্দর প্রহরে একাকী সময় দরকার দুজনার।কাজ,সংসার আর প্রণয়ের দেখভালে নিজেদের জন্যে সময় খুব অল্পই পাওয়া যায়।কিন্তু কাব্য যে চায় শতশত ঘণ্টা,বছর।চোখের সামনে বসিয়ে রাখবে।ভালোবেসে দুটো বাক্য বলবে আদরে ভরিয়ে দিবে।মা হওয়ার পর কত পরিবর্তন! কতোটা বদলে গেছে মসৃণ চামড়ার মুখটা।চারুর পাতলা হয়ে যাওয়া কেশ,ভাজ পড়া চোখের নিচ যেনো আরো টানে। নতুনভাবে আকর্ষিত করে।প্রেমময় অনুভূতি কোনোভাবেই কমেনি। বরং বেড়েছে, বেড়ে চলেছে।
কাব্যর নিঃশব্দে আবদার চারুর চোখে পড়ে।নির্লজ্জ্ব বেহায়ার মতন এখান থেকে উঠে যাওয়াও যায় না।কি ভাববে সবাই?এক বাচ্চার বাবা মা হয়েও নিজেরা নিজেরা একাকী প্রেমে মজে?একবার এড়িয়ে গেলেও কাব্যর নেতিয়ে পড়া মুখটা দেখে ভীষণ মায়া হচ্ছে। আকষ্মিক বিরক্ত দেখালো তাকে।খাওয়া দাওয়া কোনোভাবে চুকিয়ে হেঁটে চলে গেলো। দশ মিনিট অপেক্ষা করেছে চারু।কই ফিরলো না যে?সবাইকে বুঝ দিয়ে নিজেও এগিয়েছে।
“মুখ ফুলিয়েছেন কেনো?”
পেছনের বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট হাতে চেপেছিল।চারুকে দেখে ততক্ষনাত ফেলে দেয়।চোখে পড়ার আগেই।নাহয় আস্ত রাখবেনা।
“যখন যখন দেখবে আমার মুখ গোমড়া তখন কোনো চিন্তা ছাড়াই বুঝে নিবে আমার তোমাকে প্রয়োজন”
কাছে এসে কাব্যকে জড়িয়ে ধরে চারু বললো, “আমার অবস্থা দেখেছেন?আপনার ছেলের পেছনে খাটুনি করে আমার এই অবস্থা।তারপরও আমাকে প্রয়োজন আপনার?”
চারুর বাহু চেপে সোজা করে দাড় করায় তাকে। বিরক্তিভরা মুখ নিয়ে কাব্য বলে, “এটা কেমন কথা বললে?আমার প্রথম ভালোবাসা,আমার স্ত্রী আমার ছেলের মা তুমি।তোমাকে প্রয়োজন না হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না মনোহরী ”
কাব্যর এগোনো কদম দেয়ালে পিঠ ঠেকে চারুর। নেশাতুর চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। উত্তপ্ত শ্বাস প্রশ্বাসে প্রণয়িনীর আলিঙ্গন পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল।চারু ফোড়ন কেটে বলে,
“আপনি লজ্জা পান না এখন আর কাছে আসতে।বেহায়া হয়ে গেছেন।”
“তুমিই সাহস দিয়েছো”
ঠান্ডা হাত চারুর গালে ছুঁয়ে দিলো।শক্ত করে টেনে নিজের সন্নিকটে নিয়ে আসে। অধর অগ্রসর হলেই বাচ্চা কন্ঠ শোনা গেলো। কোমরে দুহাত রেখে বলতে লাগলো,
“তোমরা এখানে কি করছো? আম্মুকে এভাবে আটকে রেখেছ কেনো বাবা?”
থতমত খেয়েছে দুজনেই।ভালো সময়ে কাব্যর জানবাচ্চা এসেছে বাঁধা হতে।একে না মাত্র সবার মধ্যে দেখে আসলো?এখানে এলো কি করে?হয়তো বাবা মায়ের খোঁজ করতে করতেই এখানে এসেছে।
কাব্য সরবে না কোনমতে। চারুর হাতের জোর চললো না।
কাব্য বললো, “আব্বু আমরা লুকোচুরি খেলছে।তোমার আম্মুকে লুকিয়ে রেখেছি।তুমিও বাড়ির সামনের গাছটার পেছনে গিয়ে এক থেকে দশ গুনো ”
“ওকে আমি দশ গুনে তোমাদের খুঁজতে আসবো।”
“এনাফ টাইম।তুমি যাও”
কাব্য জানে এক থেকে দশ গুনতে তার সারারাত পার হবে। প্রনয় চলে যেতেই চট করে অধর ছোঁয়ায় চারুর অধরে। ততক্ষনাত কোলে তুলে নিলো চারুকে।বললো,
“লতা?আমার একটা মেয়ে দরকার।”
“কিসের মেয়ে?”
“প্রণয়ের ছোট বোন দরকার।প্রনয় যথেষ্ট বড় হয়েছে।বাচ্চাদের মধ্যে বেশি বয়সের গ্যাপ দেওয়া ঠিক হবেনা।চলো”
‘ প্রেম সাগরে ডুবে বিষকে মনে হলো অমৃত ‘
সমাপ্ত~