চা কিংবা জহর (অনুগল্প)

0
44

#চা_কিংবা_জহর
#অনুগল্প
সুমাইয়া আমান নিতু

“চা খাবে?”
“খাওয়া যায়।”
“চা খেতে খেতে একটা গল্প শোনো।”
“বলুন।”
“আগে বলো চিনি কতটুকু?”
“ওয়ান কিউব।”
“আমাকে চা বানানো কে শিখিয়েছে জানো?”
“কে?”
“আমার শ্বশুর।”
“বাহ!”
“উনি খুব ভালো চা বানাতেন। চায়ের নেশা ছিল। শৌখিন ছিলেন৷ তখন বাড়িতে দার্জিলিং থেকে চা-পাতা আসতো। উনার খুব প্রিয় একটা টি সেট ছিল। ছুটির দিনে সেটাতেই নিজের হাতে সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়াতেন।”
“দারুণ তো!”
“হুম। আমার শাশুড়িকে সবসময় সেজেগুজে থাকতে হতো জানো? এলোমেলো থাকলে বাবা পছন্দ করতেন না। দু’জনের মাঝে প্রেম ছিল চোখে পড়ার মতো। বাবার কথায় মা লজ্জায় গলে পড়তেন, আমরা দূর থেকে দেখেও উপলব্ধি করতে পারতাম সেই ভালোবাসার আঁচ ঝাঁঝ।”
“উনারা বেঁচে থাকলে আমিও একবার দেখতে পেতাম।”
“হুম। ইফতেখার তোমাকে কখনো বলেছে তারা কী করে মারা গেলেন?”
“না তো।”
“সেই গল্পটাই শোনাতে চাচ্ছিলাম।”
“হ্যাঁ শোনান না। জানতে ইচ্ছে করছে।”
“বাবা হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন আর মা মারা গিয়েছিলেন সুই/ সাইড করে।”
“ও মাই গড! কেন?”
“বাবা পঞ্চান্ন বছর বয়সে এসে তার তরুণী সেক্রেটারির প্রেমে পড়েন। মা বিষয়টা জানার পর মেনে নিতে পারেননি। তিনি একদিন খালি বাড়িতে সেক্রেটারি মেয়েটাকে ডেকে আনেন। গল্প করতে করতে চা পরিবেশন করেন৷ চায়ে যে সুগার কিউব মেশানো হয়েছিল তাতে তিনি বি/ষ মিশিয়ে রেখেছিলেন। বি/ষ মেশানো চা দু’জনেই খেয়েছিলেন। দু’জনেই স্পট ডে/ড।”
চায়ের কাপটা কাঁপতে কাঁপতে হাত থেকে পড়ে গেল আইলীনের। “বি…বি…বি…ষ?”
“হ্যাঁ। তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন?” মৌপ্রিয়া টিস্যুবক্স থেকে টিস্যু বের করে এগিয়ে দিল আইলীনের দিকে।
আইলীন হাতে পড়া চা মুছতে মুছতে মৌপ্রিয়ার দিকে তাকাল। তার মুখ ঘামে ভিজে গেছে। মৌপ্রিয়া সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই বলে গেল, “বাবা খবর পেয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখেন একইসাথে তার প্রিয়তমা স্ত্রী এবং প্রিয়তমা সেক্রেটারি মরে পড়ে আছে। ভেঙে গেছে তার শখের টি সেটের দুটো কাপ। তিনি সহ্য করতে পারলেন না বিষয়টা। সেদিনই হার্ট অ্যাটাক করলেন।”
“আমি… আমি এখন যাব।”
“কোথায় যাবে?”
“আমার শরীর খারাপ লাগছে।”
“আরে তুমি এত ঘামছ কেন আইলীন? এখন তো গরমও না। নাও ঘাম মুছে ফেলো।” আরেকটা টিস্যু এগিয়ে দিল মৌপ্রিয়া।
আইলীন গলায় হাত দিয়ে বলল, “বি..বি..ষ…”
“অদ্ভুত তো! বি/ষের কথা শুনে বুঝি মনে হচ্ছে তোমার চায়ে বি/ষ ছিল? রিলাক্স আইলীন। সেরকম কিছু ছিল না তোমার চায়ে।”
মৌপ্রিয়ার বরফের মতো শীতল কণ্ঠ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আইলীনের।
মৌপ্রিয়া হেসে বলল, “আমি মায়ের মতো বোকা নই। একটা খু/ন করে সাথে নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তবে মায়ের সাথে একটা মিল আমার আছে, আমিও আমার স্বামীকে ভীষণ ভালোবাসি৷ তাই এবার বেঁচে গেলেও পরেরবার যে বাঁচবে তেমন কোনো গ্যারেন্টি নেই, বুঝলে আইলীন? তুমি প্রচন্ড বুদ্ধিমতী। নিশ্চয়ই জানো তোমার কী করা উচিত?”
আইলীন উঠে দাঁড়াল। “আমি যাচ্ছি।”
“যাও। আশা করি আর কখনো আমাদের দেখা হবে না।”

সেদিন ইফতেখার বেশ বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরল। মৌপ্রিয়া তার টাই খুলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো এত আনপ্রফেশনাল যে কী বলব! আজ আইলীন কিছু না বলে কয়েই হুট করে রেজিগনেশন লেটার রেখে চলে গেছে। কোথায় গেছে সেটা পর্যন্ত ট্রেস করতে পারলাম না। হঠাৎ কী হয়েছিল কে জানে!”
“ইটস ওকে! নতুন সেক্রেটারি রেখে নেবে।”
“তা তো রাখতেই হবে। কিন্তু নতুন একজনের কাজ বুঝতেও তো সময় লাগে। আইলীন সবকিছু দারুণভাবে হ্যান্ডেল করত। আমার কাজের প্রেশার অর্ধেক কমে যেত। ভালো সেক্রেতারি পাওয়াও ভাগ্যের বিষয়।”
মৌপ্রিয়া ইফতেখারের গলা জড়িয়ে ধরে কাছাকাছি এসে বলল, “পরেরবার সেক্রেটারি রাখার আগে বুঝেশুনে রেখো। ইয়াং মেয়েগুলোর কোনো গ্যারেন্টি থাকে না। গ্যারেন্টি তাদের বসের ক্যারেক্টারেরও থাকে না। তোমার মা বাবা মারা যাবার পর তোমাদের যেরকম ভয়ানক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছিল, আমি চাই না আমার ছেলেমেয়েদেরও সেরকম কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হোক।”
“তুমি কী বলতে চাইছো?” ইফতেখারের গলায় অস্বস্তি।
মৌপ্রিয়া সেকথার উত্তর না দিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “আইলীনের হাতের এমারেল্ডের আংটিটা কোথা থেকে কিনেছিলে? ডিজাইনটা দারুণ!”
ইফতেখার উত্তর দিল না। মৌপ্রিয়া তার দিকে ফিরে বলল, “ওমা! ঘামছ কেন? যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। চা বানাচ্ছি।”

সমাপ্ত।