চৈতালি পূর্ণিমা পর্ব-২+৩

0
1704

#চৈতালি_পূর্ণিমা
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat
#পর্ব-২

“তোমরা মেয়েরা কি চিল্লানো ছাড়া কিছু পারো না? মান-সম্মান সব আমার এখনই যেত।”

কথাটা বলেই নিবার্ণ অন্ধকারে হাতড়ে লাইটের সুইচে জ্বালালো। অকস্মাৎ আঁধার কেটে যাওয়ায়, কৃত্রিম আলোর স্পর্শ সূঁচের মত বিঁধলো স্পর্শীর অক্ষিকাচে। খিঁচে চোখ বন্ধ করে ফেললো সে, বার কয়েক ভারি পল্লব ফেলার পর দৃষ্টি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। অতঃপর নিজের খুব নিকটে নির্বাণকে দেখতে পেয়ে হকচকিয়ে উঠলো সে, কণ্ঠনালী দিয়ে বেরিয়ে এলো উদ্ভট শব্দ। তা দেখে নির্বাণ স্পর্শীর মুখ থেকে হাত সরিয়ে খানিকটা পিছিয়ে গেল। নির্বাণের শক্ত হাতের বাঁধন থেকে ছাড়া পেতেই স্পর্শী লম্বা নিঃশ্বাস নিল। পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো নির্বাণের দিকে, “আপনি আমার রুমে কি করছেন?”

নির্বাণ কন্ঠে কঠোরতা মিশিয়ে বলে, “লুডু খেলছি, খেলবে?”

স্পর্শী শাণিত কন্ঠে বলল, “লাইট অফ করে?”

নির্বাণ প্রত্যুত্তর না করে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো স্পর্শীর দিকে। অতর্কিত নির্বাণের এমন দৃষ্টির মানে বুঝলো না স্পর্শী, ভ্রু যুগল একত্রিত করে তাকালো। অতঃপর নির্বাণের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে চোখ বুলাতেই লজ্জায় কুঁকড়ে উঠলো সে, গায়ে ওড়না নেই। স্পর্শী দ্রুত ভেজা চুলগুলো সামনে এনে মেলে দিল। একপলক নির্বাণের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেল খাটের দিকে। নির্বাণও ততক্ষণে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। স্পর্শী গায়ে ওড়না জড়িয়ে নিতেই তার চোখ যায় বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নির্বাণের পোশাকগুলোর দিকে। ক্ষণেই সে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় নির্বাণের দিকে। তার পড়নে নিজের বাবার পোশাক দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে তার। কৌতূহল দমাতে না পেরে স্বগোতক্তি কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

— আপনি অন্ধকারে করছিলেনটা কি?

নিবার্ণ অন্যদিকেই মুখটা ঘুরিয়ে রেখে স্পষ্টবাক্যে উত্তর দেয়, “চেঞ্জ করছিলাম।”

“কিন্তু কেন?”

নির্বাণ একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে, “আজ রাত আমি এইখানেই থাকছি। তাই আন্টি আঙ্কেলের পোশাক দিয়েছিল চেঞ্জ করতে।”

কথাটা কর্ণগোচর হতেই স্পর্শী বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকায় নির্বাণের দিকে। ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে, “আপনি থাকবেন মানে? কি করতে?”

নির্বাণ নিজের রাগ সংযত করতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “বাসর করতে।”

নির্বাণের কথা শুনে স্পর্শীর মাথায় আগুন ধরে গেল, “কথার কি শ্রী। ছিহ! এই আপনার লজ্জা করলো না নিজের ছাত্রীকে বিয়ে করতে?”

নির্বাণের ত্যাড়া উত্তর, “তোমার লজ্জা করলো না নিজের শিক্ষককে বিয়ে করতে?”

“আমি জানতাম নাকি?”

” আমি মনে হয় কত জানতাম? সবটাই তো হঠাৎ হয়ে গেল।”

স্পর্শী প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজা ওপাশ থেকে সাহেলার ডাক শোনা যায়। স্পর্শীকে ডাকছেন তিনি। স্পর্শী নির্বাণের দিকে একপলক তাকিয়ে চুপচাপ দরজা খুলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

__________________

ঘড়ির কাটা এসে থেমেছে একটার ঘরে। পুরো রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। নির্বাণ বিছানার এক প্রান্তে বসে মোবাইল দেখছে আর স্পর্শী দাঁড়িয়ে আছে জানালার ধারে। দুইজনের মাঝেই বেশ অস্বস্তিকর পরিবেশ, জড়তা কাটিয়ে কথা বলে উঠতে পারছে না কেউ। দুইজনই ইতিমধ্যে বুঝে গিয়েছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই তারা একে অপরের সাথে জুড়ে গিয়েছে। এখন কোন কিছু বলেও লাভ নেই, বিয়েটা তাদের মানতেই হবে। কিন্তু তবুও কোথায় যেন একটা কিন্তু থেকেই যায়।
কিছু প্রহর নিভৃতেই অতিবাহিত হয়ে যায়। অবশেষে নীরবতা ভেঙ্গে নির্বাণ বলে, “তুমি কি চাও?”

অকস্মাৎ নির্বাণ কথা বলে উঠায় স্পর্শী কিঞ্চিৎ ভড়কে যায়। গোলগোল চোখে তাকায় নির্বাণের দিকে, “কি চাই মানে?”

নির্বাণ মুঠোফোনটা বালিশের পাশে রেখে সোজা হয়ে বসে বলে, ” দেখো, আমাদের দু’জনের জন্যই সম্পর্কটা বেশ আগোছালো। পারসোনাল এবং প্রোফেশনাল দুই জায়গাতেই আমাদের বিয়ে প্রভাব ফেলছে। সবটা এখন গুছাতে হলে আমাদের দুইজনকেই কম্প্রোমাইজ করতে হবে। তাই আমি তোমার থেকে জানতে চাইছি তুমি কি সম্পর্কটা আগাতে চাও নাকি ডিভোর্স নিতে চাও?”

স্পর্শী মিনমিনে স্বরে বলে, “ডিভোর্স কেন চাইবো?”

“মেনে নিতে চাইছো?”

স্পর্শী ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, “বিয়ে যেহেতু হয়েই গিয়েছে, সেহেতু মেনে নেওয়াই শ্রেয়। এমনেও, আমার বিয়েতে অমত ছিল না। তবে..”

সম্পূর্ণ বাক্য শেষ করলো না স্পর্শী, সংশয়ে দৃষ্টি নত করে নিল। নির্বাণ অর্ধাংশ কথাটুকু বুঝতে পেরে বলে, “আমাকে বর হিসাবে মানতেই সমস্যা হচ্ছে তাই তো?”

“আমার কিছুটা সময়ের প্রয়োজন সবটা মেনে নিতে। ”

“আচ্ছা।”

স্পর্শী এইবার ইতস্তত সুরে বলে, “তবে আমি চাই আমাদের বিয়ের বিষয়টা আপাতত গোপন রাখতে। ভার্সিটিতে জানাজানি হলে সমস্যা আছে।”

“সেটা তুমি না বললেও আমি জানি। আর এমনেও আমি আমার পারসোনাল আর প্রোফেশনাল লাইফ আলাদা আলাদা রাখতে চাইছি। আশা করি বুঝবে।”

স্পর্শী মাথা দুলিয়ে বলে, “হুম”

নির্বাণ আর কোন কথা বললো না, চুপচাপ বালিশে মাথা হেলিয়ে শুয়ে পড়লো। স্পর্শী কিছুক্ষণ ইতস্তত করল, নির্বাণের পাশে শুবে কি-না তা নিয়ে দ্বিধার শেষ নেই তার। অস্বস্তি কাজ করছে তার মধ্যে বেশ। সুদীর্ঘ সময় সে আকাশ-কুসুম ভেবে কার্বাড থেকে পাশবালিশ বের করলো। সেটা বিছানার মাঝ বরাবর রেখে লাইট অফ করে কিনার ঘেষে শুয়ে পড়লো। মিনমিনে স্বরে বলল, “ভুলেও এই পাশে আসবেন না। নাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”

_____________

প্রভাতের আলো ফুটেছে ঘন্টাখানেক হলো। মেঘে মেঘে খেলা করছে দুরন্তপনা রোদ্দুর। আকাশে উড়ছে বেড়াচ্ছে চড়ুইপাখির দল, রোদ মাখাচ্ছে গায়ে। নির্জীব শহরটি হয়ে উঠছে ব্যস্ততায় পরিপূর্ণ। নিত্যদিনের তুলনায় আজ ঘুমটা আগেই ভেঙে গেল স্পর্শীর। না নিজ থেকে নয়, ফোনের কর্কশ ধ্বনিতে। স্পর্শী ঘুমের ঘোরেই হাতড়ে মোবাইলটা খোঁজার চেষ্টা করলো কিন্তু পেল না কোথাও। এইদিকে ফোনটা অনাবরত ফোনটা বেজেই চলেছে, অবশেষে বিরক্ত হয়ে চোখ খুললো সে। হঠাৎ মুখের সম্মুখে পুরুষালী চেহেরার কাউকে শুয়ে থাকতে দেখে ভড়কে গেল সে। মিনিট কয়েক তার লাগলো বুঝতে আসলে মানুষটি কে? নির্বাণের ঘুমান্ত মুখশ্রীর দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকার পর নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবগত হতেই হকচকিয়ে উঠলো সে। রাতে স্পর্শী যে পাশবালিশ দুইজনের মাঝে বোর্ডার হিসাবে দিয়ে নিবার্ণকে তা অতিক্রম না করার হুমকি দিয়েছিল। তা সে নিজেই ভঙ্গ করে বসে আছে। পাশবালিশের উপর দিয়েই নির্বাণের গায়ে পা উঠিয়ে ফেলেছে স্পর্শী। সেই সাথে, নির্বাণের গা ঘেষেই শুয়ে আছে সে। মুহূর্তেই এক ঝাঁক লজ্জা ভীড় করলো তার মনের দুয়ারে। নির্বাণ জাগার আগেই দ্রুত সরে আসলো সে, ভরাট গাল দু’টিতে ছেঁয়ে আছে রক্তিমা ভাব। সে ভেবেই কূল পাচ্ছে না, তার আগে যদি নির্বাণ জেগে যেত তাহলে কি হতো? একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছে সে, নাহলে এই মুখ লুকানোর আর জায়গায় থাকতো না।
পুনরায় ফোন বেজে উঠতেই স্পর্শী আপন ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। চারদিকে চোখ বুলিয়ে খুঁজতে থাকে নিজের ফোনটা। অতঃপর স্টাডি টেবিলের উপরে ফোনটা দেখতে পেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। এগিয়ে যায় সেদিকে, ফোন হাতে নিতেই দেখতে পায় কলটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আসছে। ক্ষণেই স্পর্শীর ভ্রু কুঁচকে আসে, সে ফোন রিসিভ করতেই কেউ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠে,

— এট লাস্ট তুমি ফোনটা ধরেছ স্পর্শী।

সদ্য ঘুম থেকে উঠায় নিম্প্রভ মস্তিষ্ক কন্ঠটা সনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো। তাই সে জিজ্ঞেস করলো, “কে?”

“আমি রুদ্র।”

#চলবে

#চৈতালি_পূর্ণিমা
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat
#পর্ব-৩

— এট লাস্ট তুমি ফোনটা ধরেছ স্পর্শী।

সদ্য ঘুম থেকে উঠায় নিম্প্রভ মস্তিষ্ক কন্ঠটা সনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো। তাই সে জিজ্ঞেস করলো, “কে?”

“আমি রুদ্র।”

‘রুদ্র’ নামটা কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতেই স্পর্শীর চোখে-মুখে কাঠিন্য ভাবটা ছড়িয়ে যায়। সে কোন প্রকার দ্বিরুক্তি না করে নিভৃতেই লাইনটা কেটে দেয়। রুদ্র নামক ব্যক্তির সাথে আপাতত তার কোন কথা নেই। লাইন কাটার পর, যেই নাম্বারটা ব্ল্যাকলিস্টে ফালাতে যাবে ঠিক তখনই পুরো দম নিয়ে ফোনটা বাজতে শুরু করে। স্পর্শী লাইনটা একবার কাটতে গিয়ে কাটলো না, কলটা রিসিভ করলো। ক্ষণেই রুদ্র কাতর কন্ঠে বলে উঠলো, ” প্লিজ স্পর্শী, আমাকে কথা বলার একটু সুযোগ দাও। ফোনটা কেট না। ”

স্পর্শী কন্ঠের তীক্ষ্ণতা প্রখর করে বলে, “আমাকে ফোন করার সাহস আসে কোথা থেকে তোমার, হ্যাঁ?বলি নি আমি,তোমার সাথে কথা বলার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই?”

“জান, শুধু একটা বার দেখা করো আমার সাথে। প্লিজ! আমি সবটা ক্লিয়ার করে দিব। আমাকে বুঝানোর একটা সুযোগ দাও।”

“দেখা করবে কি আবার থাপ্পড় খেতে? আর সকল বোঝা-বুঝির পাঠ আমি আগেই চুকিয়ে নিয়েছি। এখন কিছু বোঝার নেই আমার, তোমার থেকে তো একদমই না। নেক্সট…”

স্পর্শীর কথার মাঝেই রুদ্র ফোড়ন কেটে বলে, “আমি জানি, আমি ভুল করেছি। এর জন্য আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমার কাছে ক্ষমাও চাইছি।”

“ক্ষমা মাই ফুট! এইসব নকল অভিনয় অন্যের সামনে করো আমার সামনে নয়। আর যদি তুমি আমার নাম্বারে ফোন করেছ তাহলে আমার দু’মিনিটও লাগবে না, তোমার নামে হ্যারাসমেন্টের ক্যাস দিতে। মাইন্ড ইট!”

রুদ্রকে আর কথা বলার সু্যোগ না দিয়ে স্পর্শী ফোনটা কেটে, নাম্বারটা ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিল। এই নিয়ে বোধহয় স্পর্শী রুদ্রের মোট পাঁচটি নাম্বার ব্লকে ফালালো। কিন্তু তাও যুবকটির নতুনত্ব নাম্বার থেকে ফোন দেওয়া-দেওয়ির নিশ্চলতা নেই। স্পর্শী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মোবাইলটা টেবিলের উপর রেখেই ঘুরে দাঁড়ালো সে, ক্ষণেই নির্বাণকে জাগ্রত অবস্থায় দেখে ভড়কে গেল সে। নির্বাণ বিছানার উপর সটান হয়ে বসে, ভ্রু যুগল একত্রিত করে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুহূর্তেই তীব্র অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে। সে সাথে ভাবনায় আসে, “নিবার্ণ কি তার কন্ঠে উঠে গিয়েছে? কিছু কি শুনেছে সে?”

স্পর্শী একপলক নির্বাণের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় সে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বাণ ওয়াশরুমে যেতেই স্পর্শী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।

_________________

বাসায় এখন তেমন কোলাহল নেই, গত রাতেই সকলে যে যার বাসায় চলে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে শুধু চার সদস্যের পরিবারটির সাথে নির্বাণ। নিত্যদিনের তুলনায় আজ একটু পূর্বে উঠেই চুলো ধরিয়েছেন সাহেলা, দ্রুত কাজ শেষ করার আশায়। কিন্তু সে গুড়োর বালি, ঘড়ি কাটা নয়টার ঘরে এসে স্থির হতে না হতেই গ্যাস ফুরিয়ে গেল। হায়-হুতাশ বাড়লো তার মনের। ঘরে নতুন জামাই, কখন না কখন উঠে পড়ে। সময় মত নাস্তা সামনে পেশ করতে না পারলে কি এক বিড়ম্বনাতেই না পড়তে হবে তাকে। হায়-হতাশ করতে করতেই তিনি সেই জ্বালেই কোনমতে রান্না শেষ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

স্পর্শী ফ্রেশ হয়ে ডায়নিং টেবিলের কাছে আসতেই দেখে সকলে খেতে বসে পড়েছে। স্পর্শী আড়চোখে একবার নির্বাণকে দেখলো, সে মিজান সাহেবের পাশের চেয়ারে বসেছে। টুকটাক কথা চলছে দুইজনের মাঝে। অকস্মাৎ নির্বাণ চোখ তুলে তাকাতে দৃষ্টি মিললো তাদের। জড়তা ও সংশয় স্পর্শী দ্রুত দৃষ্টি সরালো, “মা, পার্শিয়া কোথায়?”

সালেহা নির্বাণের প্লেটে খাবারা সাজাতে সাজাতে বলে, ” স্পৃহার কাছেই হবে হয়তো, রাতে ওর সাথেই ছিল।”

“রাতে খেয়েছিল ও?”

সাহেলা স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে বলেন, “অন্যের হাতে আজ পর্যন্ত খেয়েছে যে জিজ্ঞেস করিস? তুই কালকে ওকে খাবার দেসও নি, সে খায়ও নি।”

“তাই বলে, ওকে জোর করে কিছু খাওয়াবা না? উফফ! কি যে করো না। আমি না থাকলে তো ওকে না খায়িয়ে মারবা।”

সাহেলা কিছু বলতে নিলেও মিজান তাকে চুপ করিয়ে দেন। অতঃপর নেই মৃদুস্বরে স্পর্শীকে বললেন, “তোমার মা আর স্পৃহা অনেক চেষ্টা করেছিল খাওয়ানোর, ও খায়নি। তুমি যাও এখন, ওকে গিয়ে খাবার দিয়ে আসো।”

স্পর্শী মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর রান্নাঘরে গিয়ে পার্শিয়ার জন্য বরাদ্দ করা পাত্রে খাবার নিয়ে ছুটলো স্পৃহার রুমের দিকে।

এতক্ষণ ধরে নির্বাণ নীরব দর্শক হয়ে সবটা দেখছিল৷ পার্শিয়াকে তা জানা কৌতূহলী মনে জাগ্রত হলেও তা প্রকাশ করলো না সে। নীরবে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়।

_____________

নির্বাণ রুমে আসতেই সর্বপ্রথম তার চোখে পড়লো কৃষ্ণ ধূসর রঙ্গে আবৃত লোমশ বিড়ালটির দিকে। সে বিছানার ঠিক সামনে বসেই লেজ দুলিয়ে খাবার খাচ্ছে আর স্পর্শী হাটু মুড়ে বসে অতি আদর সহিত তার লোমশ পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে মিষ্টি হেসে বিরবির করে কি যেন বলছে। বিড়ালটি আদৌ কথা বুঝছে কি-না কে জানে, কিন্তু মিনিট দুই-এক পর পর মৃদুস্বরে ডাকছে আর মাথা হেলিয়ে দিচ্ছে স্পর্শীর দিকে। বিড়ালটির খাওয়া শেষ হতেই স্পর্শী সপ্তপর্ণে ওকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসে। পরক্ষণে দরজার দিকে চোখ যেতে নির্বাণের সাথে তার পুনরায় দৃষ্টি অদলবদল হয়। নির্বাণ বলল, “তুমি বিড়াল পালো?”

স্পর্শী দৃষ্টি নত করে মিনমিনে কন্ঠে বলে, “হ্যাঁ!পার্শিয়া নাম ওর।”

নির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে তীক্ষ্ণ বলে, “ওকে রুম থেকে বের করো।”

নির্বাণের কথায় স্পর্শী হতবিহ্বল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়, “বের করবো মানে? কেন?”

নির্বাণ কিছু বলতে যাবে তার আগেই পার্শিয়া উচ্চস্বরে ডেকে উঠে আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় নির্বাণের দিকে। যার অর্থ, নির্বাণের কথা তার মোটেও পছন্দ হয়নি। নির্বাণ ভ্রু কুঁচকে তাকায় পার্শিয়ার দিকে, মনে মনেই তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে সে। তিক্ত কন্ঠে বলল, “আমার প্রবলেম আছে।”

“আপনার প্রবলেম আছে বলে কি আমাকে ওকে বের করতে হবে? আজব! আপনার প্রবলেম হলে আপনি রুমের বাহিরে যান। ”

“আমি তোমার স্যার ভুলে যেও না। তুমি আমার কথা মানতে বাধ্য।”

স্পর্শী মুখ বাঁকিয়ে বলে, “সেটা ভার্সিটিতে। ভার্সিটির বাহিরে আপনি আমার স্যার নন এবং আমিও আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই। উপরন্তু, এইটা আমার বাসা। এইখানে আমার রাজত্ব বেশি, আপনার না।”

নির্বাণ বিতৃষ্ণায় ‘চ’ উচ্চারণ করার মত শব্দ করে সূক্ষ্মাগ্র দৃষ্টিতে স্পর্শীর পানে তাকায়। স্পর্শী সে দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে বিছানায় বসে পার্শিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। নির্বাণ দ্বিরুক্তি করতে যাবে তার আগেই স্পৃহা এসে বলে, “আপু, একটু এদিক আয় তো। মা তোকে ডাকছে।”

” যা তুই আমি আসছি।”

স্পৃহা যাওয়ার আগে নির্বাণের দিকে তাকিয়ে ছোট হাসি দিয়ে বলে, “ভাইয়া, আপনার কোন সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় আমাকে জানাবেন। আম্মু বলেছে, আপনার যাতে কোন সমস্যা না হয় সে খেয়াল রাখতে আমায়।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ!”

নির্বাণ একপলক স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে বলে, “তা সমস্যা আছে একটা। তোমার আপু…..”

কথার মাঝে স্পর্শী ফোড়ন কেটে একটু চেঁচিয়েই বলে, ” এই তোকে না বললাম যেতে। আমার কোন কথাই শুনোস না।”

কথাটা বলেই দ্রুত স্পর্শী উঠে দাঁড়ালো। নির্বাণ বা স্পৃহাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে স্পৃহার কোলে পার্শিয়াকে দিয়ে একপ্রকার টেনেই নিয়ে গেল নিজের সাথে। তবে, যাওয়ার আগে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নির্বাণের দিকে তাকাতে ভুললো না।
নির্বাণ তাতে তাচ্ছিল্য হেসে রুমে প্রবেশ করলো। বিছানায় বসে রুমের চার দেয়ালে চোখ বুলাতেই দৃষ্টি স্থির হলো মনকাড়ার মত বেশ কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্যের পোট্রের্টের উপর। রঙ তুলির সংমিশ্রণে খুব নিখুঁত ভাবেই দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, জীবন্ত লাগছে। নির্বাণ ভ্রু কুঁচকালো, চিত্রগুলো মোটেও বাজার থেকে কেনা মনে হচ্ছে না। সে ভালোমতো এদিক-সেদিক চোখ বুলাতেই দেখতে পেলো কাঠের আলমারির এক চিপা দিয়ে উঁকি মারছে বেশ কিছু শুভ্র ক্যানভাসের দল, স্টাডি টেবিলের উপর হামাগুড়ি খাচ্ছে কিছু সংখ্যক রঙের টিউব, কোটা, ব্রাশ। নির্বাণ বিরবির করে বলে, “মেয়েটার মধ্যে আর কত রহস্য আছে কে জানে? তবে তার আঁকার হাত সত্যি প্রশংসনীয়।”

_________________

রূপ-রঙ-সৌরভের স্মৃতির বার্তাবাহক ফাল্গুনকে বিদায় জানানো হয়েছে বহু পূর্বেই৷ চৈত্রের রৌদ্রজ্বল রক্তিম প্রভাতের অপার্থিব সৌন্দর্যে শুরু হচ্ছে দিনগুলো। মাধবীলতার মোহ ঘুরে বেড়াচ্ছে অনিলে৷ এমনই এক তপ্ত দুপুরে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে জাবির শহীদ মিনারের সিড়িতেই আড্ডায় মেতে উঠেছে বন্ধুমহলের সকলে। তবে আজ বন্ধুমহলের আড্ডায় মন নেই একজনের, সে হারিয়ে আছে আপন ভাবনাতে। হঠাৎ পাশ থেকে তার উদ্দেশ্য কেউ বলে উঠে,
“এই স্পর্শী কোন ভাবনাতে ডুবে আছিস? কখন থেকে দেখছি কোন কথাই বলছিস না।”

স্পর্শী নিজ ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নিধির উদ্দেশ্যে বলে, “আরেহ না এমনি।”

বিপরীত পাশ থেকে মাহিন বলে, “গত সপ্তাহের একদিনও ভার্সিটি আসোস নি। তার উপর এখন মনমরা হয়ে বসে আছিস। বুঝলাম ভার্সিটি আসিস নি রুদ্রের জন্য। কিন্তু এখন কি মন মরা হয়ে আছিস ওর জন্যই? ”

নিধি মাহিনের মাথায় একটা চাপড় দিয়ে বলে, “রুদ্রের কথা তুলোস কেন হারামি? মরার শখ জাগসে?”

কথায় কথায় মাহিন ও নিধির খুটিনাটি ঝগড়া বেঁধে যেতেই কেয়া আর সামি ওদের দুইজনকে শান্ত হয়ে ব্যস্ত পড়ে। আর স্পর্শী, সে তো এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে প্রবেশ দুয়ার দিয়ে আসতে থাকা কালো গাড়িটির দিকে। দুই ধারের কাঁচ উঠিয়ে রাখা সত্ত্বেও স্পর্শী জানে ভিতরে বসে থাকা মানুষটিকে। মানুষটি বরং কেউ নয় নির্বাণ। শেষ তার দেখা মিলেছিল পরশুদিন, চলে যাওয়ার সময়।
সেদিন রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর স্পর্শী ভুলেও ওই রুমে যায়নি, রাগ জমেছিল তার উপর। অবশ্য, নির্বাণও তার খোঁজ করেনি। তবে, বিকালে নিবার্ণ চলে যাওয়ার সময় সাহেলা এক প্রকার টেনে এনেই স্পর্শীকে তার সম্মুখে দাঁড় করিয়েছিল। দুইজন দুইজনের সামনে দাঁড়ালেও কথা হয়নি কিঞ্চিৎ পরিমাণ, নির্বাণ নীরবেই বিদায় নিয়েছিল তার থেকে। অতঃপর তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ হয়নি।

নির্বাণের গাড়ি পার্কিং এরিয়ার কাছে চলে যেতেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। স্পর্শী এইবার সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নিধি,মাহিন,কেয়া ও সামির দিকে তাকায়। নিধি ও মাহিনের ঝগড়া ইতি টানার পরমুহূর্তেই স্পর্শী কোন প্রকার ভূমিকা ছাড়াই বলে উঠে,
“আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।”

কথাটা সকলের কর্ণধারে এসে বারি খেতেই সকলে গোলগোল দৃষ্টিতে তাকায় স্পর্শীর দিকে। নিধি ভরাট কন্ঠে বলে, “তোর কি নামের পাশে বিবাহিত মহিলা ট্যাগ লাগানোর শখ জাগসে? নাকি মেয়াদ উত্তির্ন কিছু খেয়ে টাল হয়ে আছিস, কোনটা?”

সামি বলে, “তুই কি রুদ্রের বিরহে উন্মাদ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিস নাকি? লক্ষণ তো ভালো না।”

স্পর্শী শীতল কন্ঠেই বলে, “বার বার রুদ্রকে এইসবের মাঝে আনা বন্ধ কর। ও আমার লাইফে জাস্ট একটা আবর্জনা ছিল, যা আমি প্রথমে ধরতে না পারলেও পরে পেড়েছি এবং ছুঁড়েও ফেলেছি। এখন সেই চ্যাপ্টার ক্লোসড্। আর রইলো বিয়ের কথা, সত্যি আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বিশ্বাস নাহলে মাকে ফোন দে আমার।”

স্পর্শীর কথা শুনে সকলে থম মেরে বসে থাকে। হতবিহ্বল চাহনিতে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকে। তাদের বোঝা হয়ে গিয়েছে স্পর্শী তাদের সাথে মিথ্যে বলছে না। কিন্তু তাও সব যেন কোথাও জটলা পাঁকিয়ে যাচ্ছে। স্পর্শী নীরবেই তাদের পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। নিজেদের বিস্ময় কাটিয়ে নিধি আর সামি একত্রেই জিজ্ঞেস করে, “কাকে বিয়ে করেছিস তুই? সে কি করে? আর কিভাবে বিয়ে হলো তোদের? মানে কিভাবে কি?”

“আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে তাকে তোরা চিনিস।”

কথাটা বলে স্পর্শী থামে। সকলে এইবার বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়, বুঝে উঠার চেষ্টা করে তাদের চেনা-জানা এমন কোন ব্যক্তি আছে যার সাথে স্পর্শী বিয়ে হতে পারে। হাজারটা সমীকরণ মিলিয়েও যখন কারো নিকটেই উত্তর ধরা দিল না তখন তারা স্পর্শীকে ওই ব্যক্তি সন্ক্রান্ত প্রশ্ন করার জন্য উদ্যোগী হলো। কিন্তু সেই সময় কেউ ঝড়ের গতিতে এসে হাজির হলো তাদের সামনে, মুহুর্তেই স্পর্শীর একহাত হাতের মুঠোয় নিয়ে কাতর কন্ঠে বললো,

— অবশেষে তুমি এসেছ।

#চলবে