#ছদ্মবেশে_লুকানো_ভালোবাসা
#মৌমি_দত্ত
#পর্ব_২৭
কামাল ফিরে গেছে কিছু কাজ থাকায় খাওয়া দাওয়া শেষ করে। আসিফও তাই নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে চলে গেছে। স্পন্দন,, আফিম,, তাহজিব,, রুহি ও ইনায়াত বসে আছে বাগানে ঘাসের উপর ম্যাট বিছিয়ে। অবশ্যই এটা রুহি ও ইনায়াতের জেদ।
– একটা গান শুনাও না আপুই,, তুমি তো ভালো গান জানো। আর নাচও জানো শুনেছি।
সবাই তাকালো রুহির কথা শুনে সেদিকটায়। ইনায়াতের চোখ ছানাবড়া।
– তোমাকে কে বললো এই কথা??
ইনায়াত প্রশ্ন করলো। রুহি মুচকি হেসে বললো,,
– ওমা!! জানবো না কেন?? বাবা তোমাকে খুঁজে বের করবে বলে তোমার সম্পর্কে অনেক ইনফরমেশন যোগাড় করেছে। ওখান থেকেই সবটা জেনেছি।
– ওহ!!
ইনায়াত মুচকি হাসলো। রুহি একের পর এক অনুরোধ করেই যাচ্ছে। শেষমেশ স্পন্দন চোখের ইশারায় সম্মতি দিতেই ইনায়াত উঠে দাঁড়ালো নাচ দেখাবে বলে। আফিমের চোখ চকচক করে উঠলো। তখনই তাহজিব অস্থির হয়ে বললো,,
– ইনায়াত নাচবে না।
তাহজিবের কথা শুনে সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাহজিবের দিকে। তাহজিব নিজের করা ভুলটা বুঝলো। মাথা নিচু করে চুলকে বললো,,
– ইনায়াতের নাচ করা মানা। কারণ ও একবার এক্সিডেন্ট করেছিলো ১ বছর আগে। ডাক্তার ওকে লাফাতে,,, ছোটাছুটি করতে কিংবা নাচ করতে মানা করেছে। আমিই ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলাম তাই মনে আছে।
ইনায়াতেরও মনে পড়লো বিষয়টা। রুহির সামনে এভাবে তাহজিব কথাটা বলে ফেলাতে তাহজিবের অস্বস্তি হচ্ছে এখন রীতিমতো। আর ইনায়াতেরও অস্বস্তি হচ্ছে।কারণ রুহির সামনে তারই ভালোবাসার মানুষ কিনা ইনায়াতকে নিয়ে বলছে। কিন্তু সবার অস্বস্তি কেটে গেলো রুহির হাসাহাসিতে। রুহি পেট চেপে হো হো করে হাসছে। ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাহজিব রুহির দিকে। রুহি কোনভাবে নিজেকে সামলে বললো,,
– আপি,,, তোমার আর তাহজিবের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তোমাদের দুজনের একটু আগে বিয়ে হয়েছে।
স্পন্দন রুহির কথা স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে হাসলো মৃদু ভাবে। আফিমের হাত মুঠো হয়ে গেছে রাগে অজান্তে। ইনায়াতও অপ্রস্তুত হাসলো। একমাত্র তাহজিবই মলিন মুখে তাকিয়ে রইলো রুহির দিকে। কারণ রুহির হাসিতে একধরনের তাচ্ছিল্য ছিলো। রুহিই তখন বললো,,,
– আরেহ তাহজিব জানবে না তো কি করবে?? ও তোমাকে ভালোবাসে আপি। পাগলের মতো ভালোবাসে।
তাহজিবের চোখ মুখ শুকিয়ে কাঠ। এতোদিন যখন রুহিকে ভালোবাসার কথাটা বুঝেনি। ততোদিন রুহি ওর সাথে থেকে ওকে সামলেছে। অথচ এখন যখন সে রুহির জন্য তড়পাচ্ছে তখনই রুহি সড়ে আসছে তার থেকে। ইনায়াত,, স্পন্দন আর আফিম হা করে তাকিয়ে আছে রুহির দিকে। তাহজিব যখন অভিযোগ করতে ব্যস্ত। তখন রুহির মুখে হাসি থাকলেও চোখের কোণে জল চিকচিক করেছে যা সবার চোখে স্পষ্ট। রুহি হাসতে হাসতেই চোখ বন্ধ করে নিলো। ইনায়াত আফিম আর স্পন্দনকে ইশারা করলো এরপর নীরবেই উঠে এলো সবাই রুহির চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায়। তাহজিব সবার ব্যাপারটা বুঝে নিঃশব্দে রুহির কাছে এসে বসলো। খানিক বাদে রুহি চোখ খুলে দেখলো কেও নেই। তাহজিবকে নিজের পাশে দেখে রুহি চমকে গেলো। পরক্ষনেই নিজেকে স্বাভাবিক করে রুহি উঠে যেতে নিলেই তাহজিব রুহির হাতের বাহু ধরে এক টান দিলো। রুহি পুরোপুরি উঠতে না উঠতেই টান সামাল দিতে না পেরে তাহজিবের কোলে বসে পড়লো। মুখ হা হয়ে আছে রুহির তাহজিবের কাজে। তাহজিব তা দেখে বাঁকা হেসে রুহির কাঁধে নাক ঘষলো। তাহজিবের হঠাৎ আক্রমনে জমে গেছে রুহি নিজের জায়গায়।
.
.
ইনায়াত,, স্পন্দন,, আফিম বাসার ভিতরে এসে গেছে। ইনায়াত একবার পিছু ফিরে তাকালো রুহি আর তাহজিবের দিকে। মুচকি হেসে ইনায়াত ঘরের ভিতর এলো। আফিম ভাবছে তাহজিব যেমনটা রোমান্সের সুযোগ পেয়েছে,, তেমন একটা সুযোগ আফিমের কবে আসবে। রোমান্সের বাদই দিলো,, ইনায়াতকে বুঝানোর সুযোগ তো লাগবে। কিন্তু স্পন্দন কি ছাড়বে ইনায়াতকে একা?? আফিম একবার ট্রাই করবে ভেবে ইনায়াতের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। তখনই স্পন্দন এসে ইনায়াতের পাশে দাঁড়ালো আফিমের দিকে কটমট করে তাকিয়ে। আফিম দুই পা পিছিয়ে নিজের ফোন নিয়ে টিপার ভাণ করতে লাগলো। তখনই মাথায় বদবুদ্ধি এলো আফিমের। ইনায়াত চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। স্পন্দন বসে আছে ইনায়াতের পাশে। আফিম দ্রুত আফরাকে মেসেজ করলো,,
– বোনু,,, আর্লি তোর আশিককে কল দে। নাহয় তোর জামাইয়ের জন্য ইনায়াতকে পটানো হবে না। ফলস্বরুপ তুই জীবনেও ভাবী পাবিনা,,, ভাইয়ের ছেলে মেয়েকে দেখতে পাবি না।
আফরা তখন ফেসবুকে স্ক্রলিং করছিলো। হঠাৎ আফিমের এমন একটা মেসেজ দেখে অবাক হলো। আগপিছ না ভেবে কল করলো স্পন্দনকে।
স্পন্দন ইনায়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। ইনায়াত যতোই দেখাক যে ইরশাদের ব্যাপারটা সে মেনে নিয়েছে। সবটা সে মেনে নিতে পারেনি। অতিরিক্ত ডিপ্রেশনের বেশ কিছু পূর্বলক্ষণ থাকে। তার একটিই হলো ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব। ইনায়াতের মাঝে তা খেয়াল করেছে স্পন্দন। ইনায়াত খুবই চটপটে মেয়ে। তাই সহজেই বুঝা যাচ্ছে তার হাবভাব দেখে।
হাজারটা ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত স্পন্দনের মোবাইল হঠাৎ জোড় শব্দে বেজে উঠলো। ইনায়াত চোখ খুলে তাকালো স্পন্দনের দিকে। স্পন্দন মোবাইল বের করে দেখলো আফরার কল। চোখে মুখে আলাদা একটা খুশীর ঝলক খেলে গেলো যেন নিজের অজান্তেই। স্পন্দন ফোনটা হাতে নিয়েই উঠে এলো মুচকি হেসে। ইনায়াতের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে আফরা কল করেছে। ইনায়াত মুচকি হাসলো। তখনই একপ্রকার দ্রুত গতিতে আফিম এসে হালকা দূরত্ব বজায় রেখে বসলো ইনায়াতের পাশে সোফায়। ইনায়াত হঠাৎ এমন হওয়ায় চমকে তাকালো পাশে। আফিমের দিকে তাকাতেই অস্বস্তি ঘিরে ধরলো ইনায়াতকে। মনে পড়লো কিভাবে আফিম তাকে প্রোপোজ করেছিলো,, ইনায়াতকে আজকে সামাল দিতে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলো। ইনায়াত উঠে আসতে চাইলো। তখনই আফিম ইনায়াতের এক হাত খপ করে ধরলো।
– একটু থাকো ইনায়াত!! প্লিজ??
ইনায়াত একবার আফিমের ধরে থাকা হাতের দিকে তাকালো। আফিম দ্রুত হাতটা ছেড়ে দিলো। ইনায়াত বসে পড়লো আবারও মাথা নিচু করে। আফিম বুঝলো সময় অপচয় করা একদমই ঠিক হবে না। তাই সে বলতে শুরু করলো,,
– ইনায়াত!! আমি জানি তুমি কেন আমাকে মেনে নিচ্ছো না বা কখনো মেনে নেবে না। কারণ আমি চরিত্রহীন। তোমার সামনেই সবটা ঘটেছে। আর আমি নেশাপানি খাই। আমি জানি কোনো মেয়েই এমন ছেলেকে মেনে নেবে না। তুমিও ঠিক তাই। কিন্তু আমি বদলে গেছি ইনায়াত। সম্পূর্নটা না বদলালেও অনেকটাই বদলেছি। আমি আরো বদলাবো। জানি ভালোবাসায় সব সম্ভব। আমাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখো। যদি মনে হয় আমি কখনো তোমার যোগ্য হয়ে উঠতে পারবো না। তাহলে নাহয় সেই সুযোগ,, অধিকার কেড়ে নিও।
আফিমের কথায় কি যেন ছিলো যা ইনায়াতের মনে গিয়ে আঘাত করেছে। ইনায়াত চুপ করে সেভাবেই বসে রইলো। একটু বাদেই ইনায়াত উঠে দাঁড়ালো। আফিম অসহায় চোখে তাকালো ইনায়াতের দিকে। ইনায়াত একবার আফিমের দিকে তাকালো। পরক্ষনেই বললো,,
– আমি কখনো কাওকে ভালোবাসিনি। ভালোবাসা কি,, কিভাবে হয় তা নিয়ে আমার কোন ধারণা নেই। যদি কখনো ধারণা হয়,,, যদি সেদিনও আপনি আমাকে ভালোবেসে থাকেন। তাহলে হয়তো আপনি সুযোগ পাবেন স্যার।
ইনায়াত এটুকু বলেই চলে এলো।
.
.
তাহজিব রুহির ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে বসে আছে। রুহি এতোটা সময়ে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তবুও লজ্জায় তাহজিবের দিকে তাকাতে না পেরে তাহজিবের বুকে মুখ লুকিয়ে বসে আছে তাহজিবের কোলে।
– রুহি,,, তোমার বাবা কবে ফিরবে?? আমি বিয়েটা করে নিতে চাই।
রুহি কথাটা শুনেই খামচে ধরলো তাহজিবের বুকের কাছের শার্ট। তাহজিব বিষয়টা বুঝতে পেরে হাসলো মৃদু। রুহির হাতের বাঁধন আলগা করতে করতে বললো,,
– চলো ভিতরে যাই। গেস্টরা আছে।
তখনই রুহি বলে উঠলো,,
– ভালোবাসা ছাড়া একটা সম্পর্ক সারাজীবন মেনে নিতে পারবে?? আমি তো ভালোবাসি তোমাকে। তাই হয়তো মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু তোমার আর আমার এক হওয়া লেখা নেই হয়তো। আমি তো বেশিদিন,,,,
রুহি তাহজিবের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলছিলো। রুহির কথা শেষ করতে না দিয়েই তাহজিব নিজের ঠোঁট দিয়ে আঁকড়ে ধরলো রুহির ঠোঁট। হঠাৎ আক্রমনে রুহি চমকে উঠলো। কিছু সেকেন্ড সময় লাগলো তার কি হচ্ছে বুঝতে। তাহজিব চোখ বন্ধ করে রুহির ঠোঁটের মাঝে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছে বুঝতে পেরে রুহি সড়ে এলো দ্রুত এক ঝটকায়। রুহি উঠে চলে আসছিলো। তখনই তাহজিব হাত টেনে ধরলো। রুহি পিছু না ফিরেই লজ্জায় লাল হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তাহজিব এক হাতে রুহির হাত আটকে,, আরেক হাতে মাথা চুলকে মৃদু অস্বস্তি নিয়ে বললো,,
– সরি। আসলে,, আমি এখন এভাবে তোমাকে স্পর্শ করতে চাইনি। তবে কি করার!! তবে এই স্পর্শ আমি হালাল করবোই। তুমি না চাইলেও তুমি মিসেস তাহজিব খান হচ্ছো।
রুহির হাত ছেড়ে দিতেই রুহি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে পা বাড়ালো বাসার দিকে। তখনই তাহজিব নিজের অন্য পাগলামি করলো শুরু। দ্রুত পায়ে এসে রুহিকে কোলে তুলে নিলো। রুহি চমকে কিছু বলতে যাবে। তাহজিবকে দেখে আর কিছু বলতে পারলো না। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। কেননা তাহজিব বাঁকা হেসে রুহির ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে।
স্পন্দন আফরার সাথে কথা বলার মাঝখানেই মনে পড়লো ইনায়াত একা আর আফিমও সেখানটায় আছে। স্পন্দন দ্রুত ফোন কেটে দিলো। চলে এলো বাইরের ঘরে। বাইরের ঘরে এসে ইনায়াতের শেষ কথাগুলো সবটাই শুনতে পেলো আড়াল থেকে। তাহজিবও দরজায় রুহিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলো। তাহজিব ও রুহি একে অপরের দিকে তাকালো একবার। রুহি ইশারায় তাহজিবকে নামাতে বললো। তাহজিব না নামাতে চাইলেও নামিয়ে দিলো। রুহি চলে গেলো ইনায়াতের রুমে। স্পন্দন আর তাহজিব গম্ভীর মুখ করে এগিয়ে এলো আফিমের কাছে। আফিমের দুই পাশে বসলো দুইজন। আফিম মাথা নিচু করে বসে আছে।
– আমার বোন সুযোগ দিলে আমার কোনো বাঁধা নেই।
স্পন্দন বলে উঠলো। খুবই ধীরগতিতে আফিম মাথা তুলে নিজের ডান দিকে তাকালো। স্পন্দনের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য ভরে হাসলো।
– ইনায়াত পরোক্ষ ভাবে তোমাকে বলে গেছে তার মাঝে ভালোবাসার অনুভুতিগুলো জাগিয়ে দিতে। সে তোমাকে সু্যোগ দিয়ে গেছে।
আফিম ঝট করে মাথা তুলে তাহজিবের কথা শুনে তাহজিবের দিকে তাকালো। তাহজিব বাঁকা হেসে বললো,,
– তুমি কি প্ল্যানিং করছো?? অন্য কেও ভালোবাসার অনুভুতিগুলোর সাথে পরিচয় করাবে আর ইনায়াত সুযোগ দেবে তোমাকে?? এভাবে ঝিমিয়ে না পড়ে প্রেমিকের মতো পিছু নাও। ইনায়াত ভালোবাসা কি বুঝবে তখন।
আফিম মনে মনে হাজারটা ধাপ কল্পনা করে হাসলো। স্পন্দন আর তাহজিব একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে উঠে এলো আফিমের পাশ থেকে। দুজনে দুদিকে যাচ্ছিলো। তখনই আফিম দ্রুত পায়ে উঠে এলো।
– কিন্তু প্রেমিক হতে কি কি লাগে?? কি করতে হয় কিছুই ,,, বুঝতে পারছিনা। একটু হ্যাল্প লাগবে।
আফিমের কথা শুনে বোকা বনে তাকালো তাহজিব আর স্পন্দন। স্পন্দন বিড়বিড়িয়ে ” ইডিয়ট ” শব্দটা উচ্চারণ করলো। আর তাহজিব আফিমের দিকে সহানুভুতির নজরে তাকালো। ইনায়াতকে ভালোবাসে ভেবে সেও রুহির ভালোবাসা বুঝেনি। আফিমের মতো অবস্থায় অনেকটা সেও আছে।
কি হবে রুহি আর ইনায়াতের?? আফিম আর তাহজিব কি পারবে ওদের ভালোবাসা বুঝাতে??
চলবে,,,,,,