জানি ভালোবাসো পর্ব-০৩

0
450

#জানি ভালোবাসো
#তাশফিয়া রহমান
#পর্ব:৩

-মামনির কথামতো ঘরে আসলাম। লাল খয়েরি রঙের মধ্যে গোল্ডেন রঙের শাড়ি, কাজ কি সুন্দর মনটাই ভালো হয়ে গেল। আমাকে সাজানো শুরু করতেই আমার আজ বিয়ে কেমন এক অজানা অচেনা অনুভূতি হচ্ছে। মনের ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে, এ কেমন অনুভূতি! বিয়ে নিয়ে প্রতিটা মেয়ের অনেক স্বপ্ন থাকে আমার ও ছিল। বিয়ে তো হবেই ইন শাহ আল্লাহ। কিন্তু যাকে কখনো কল্পনা করিনি তার সাথে, হ্যাঁ মানুষটিকে আমার ভীষণ পছন্দ কিন্তু বিয়ে হবে তা কখনো ভাবি নাই ,এসব ভাবনার মাঝেই আমার সাজুগুজু শেষ হয়ে গেছে। হঠাৎ সামনে দেখি রাদিব বাবু দাড়িয়ে ..

রাদিব: অবাক হয়ে তাকিয়ে দুই হাত মুখে দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম রাতের পরী তুমি কি আমার সেই রাতের পরী! এত সুন্দর সাজুগুজু উফ এক মিনিট মা এর ফোন এ কিছু পিক তুলি পোজ দাও।

-রাদিব এর কথা শুনে একটু হেসে পোজ দিচ্ছিলাম তখন দেখলাম, দরজায় কেউ হেলান দিয়ে দুই হাত ভাজ করে শেরওয়ানি পরে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ রোদ ভাইয়া আজ তার সৌন্দর্য আরো এক ধাপ বেশি মনে হচ্ছে।
এদিকে রাদিব চিৎকার করে বলছে –

রাদিব: ঐ দিকে ভাইয়ার এ কি দেখো? পিক তুলি আমি আর তুমি তাকায়ে আছো ভাইয়ার দিকে তাহলে কীভাবে হয়?

-রাদিব এর কথায় লজ্জা পেলাম ভীষণ, এই ছেলেটা মুখের উপর বলার কি খুব দরকার ছিল, রোদ ভাইয়া কি ভাবলো কে জানে অবশ্য তার ভাবনা তো আমার জানা আছে ভাবছেন হয়তো বেয়াদব মেয়ে এর বেশি আর কি ভাববেন। কিন্তু এক মিনিট উনি কেন এখানে আসছিল আর আমার দিকে বা কেন তাকিয়ে ছিল! ধুর ওনাকে বোঝা আমাকে দিয়ে হবে না। এসব ভাবনার মাঝেই মাম এসে খুব আদর করলো আর আমাকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসলো সবাই, বিয়ের কাজি নাকি এখানে আসবেন। এখানে বিয়ে হবে।

অবশেষে রাত ১০ টা নাগাদ কাজি এলেন। আমার কেমন যেন লাগতে শুরু করলো, যার সাথে আমি ভীষণভাবে অপরিচিত। বাড়ির পাশেই রোদ ভাইয়ার বাড়ি তবুও কেন এত কষ্ট হচ্ছে নিজের মাঝে কথা গুলো ভাবছিলাম হঠাৎ কানে আসলো বলো মা কবুল আমি থমকে গেলাম ,কখন কাজি এসে
পরেছিল ঠিক ই পায়নি! শুধু একটা কথা কানে আসছে যা সবাই বলে চলছিল অনবরত বলো কবুল কিন্তু আমি পারছি না। দাদীর কথার মুল্য দিতে গিয়ে রাজি হয়েছি ঠিক কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সব হব সেটা ভাবিনি। ভাবনার মাঝেই রাদিব বলে উঠলো
রাদিব: রাতের পরী জানো রোদ ভাইয়া তো সাথে সাথে কবুল বলে দিছে, তুমি বলছো না কেন? তুমি কি আমাদের কাছে থাকতে চাও না?

-আরো অবাক হলাম রোদ ভাইয়া এত তাড়াতাড়ি কবুল বলে দিল! শুধুই কি দাদীর কথার মুল্য দিতে সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে কিছু বুঝতে পারছি না।

হঠাৎ মামনি এসে পাশে বসলেন বললেন
মামনি:সোনা মা আমার, কোন অস্থিরতা হলে আমাকে বলো বিয়ে যে সব মেয়েকে করতেই হয় এটি ফরজ প্রত্যেককে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্। আমার রোদ এর সাথে তোমার ভাগ্যের জোড়া ঠিক করে রেখেছিল আল্লাহ্ তাই বিয়ে হচ্ছে। আমার উপর বিশ্বাস রাখো আমার রোদ তোমায় ভীষণ সুখী রাখবে ইন শাহ আল্লাহ্। কবুল বলে দাও।

– এই যে মামনি এত আদর ভালবাসা দিয়ে বোঝালো যে আমি আর না করতে পারলাম না। অবশেষে তিন কবুলের মাধ্যমে বিয়ে সমাপ্ত হলো। রাত ১১ টাই বিদায় এর ব্যবস্থা করা হলো। সবকিছু কেমন স্বপ্ন এর মতো মনে হচ্ছে, আমরা যা কল্পনা করিনা তা হঠাৎ জীবনে ঘটলে স্বপ্ন ব্যতীত আর কিছু মনে হয় না, যার সত্যটা উপলব্ধি করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। আজ রোদ ভাইয়ার জন্মদিন ছিল, জন্মদিন খেতে গিয়ে ওই বাড়ির বউ হয়ে যাবো তা ভাবিওনায়।

এসব ভাবনার মাঝেই আমার ছোট ভাই রোহিত এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলো, আমি ও নিজেকে সামলাতে পারলাম না । আমি ও জোরে কান্না করে দিলাম। আমার ভাইটা আমার বন্ধু বেশি।

-রোহিত: আপু চলে যেও না। তুমি জানোনা রাতে আমি ভয় পেলে তোমায় ডাকি, এবার আমি কাকে ডাকবো আপু তুমি যেওনা।

– আমার ভাইটা 5 এ পড়ে। আমিও ওকে ছাড়া কখনো থাকিনি কি করে থাকবো এত কেন কষ্ট হচ্ছে।

-রোহিতকে আদর করে সরে আসতেই আমার মাম আমার পাশে বসলো বললো
মাম : জীবন এ সব মেয়ের বিয়ে হয় ,আর বিয়ে হলে শশুর বাড়ি যেতে হয় এটাই নিয়ম। ওখানে তুমি বাড়ির বউ তোমার আলাদা দায়িত্ব আছে সবাইকে খুশি রাখার, ভালো রাখা সবাইকে ভালোবেসে পরিবারটাকে নিজের পরিবার বলে ভালো রাখবে। রান্না করার চেষ্টা করবে।রান্না করতে না পারলেও অন্তত চা বানিয়ো এসব বলে আমাকে আদর করে উঠে গেলো। বাবাকে জড়িয়ে ধরে যেন বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবা বলল
বাবা: মা তোমার যখন খুশি বাসায় আসবা ,আমরা যাব আর আমাদের বাসা থেকে রোদের বাসা দেখাও যায় তাই আর মন খারাপ না রোদ ভালো ছেলে, তোমরা ভালো থাকবে বলে ,

-আমার হাত রোদ ভাইয়ার হাতে দিয়ে –
রোদ ভাইয়াকে বলল,আমাকে যেন কখনো কষ্ট না দেয়।

-রোদ ভাইয়া হাত ধরাতে কেমন যেন কেপে উঠলাম!

রোদ ভাইয়া বলল –

রোদ: ভীষণ ভালো রাখবো চিন্তা করবেন না চাচা।

– এদিকে আমার কান্না থামাতে আমি ব্যর্থ। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুক ফেটে কেমন কান্না পাচ্ছে। এর মাঝেই হঠাৎ কারো নি:শ্বাস উপলব্ধি করলাম কানের কাছে তাকাতেই রোদ ভাইয়াকে দেখে অবাক হলাম!

রোদ ভাইয়া বলে উঠল –
রোদ: শোনো সবার জীবনে কখনো একটু মেঘ জমে, আর জমে থাকা মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে ।কিন্তু সবার জীবনে রোদ থাকে না, তোমার জীবনে মেঘ জমলেও বৃষ্টি হওয়াটা শোভা পায় না, কারণ তোমার জীবনে রোদ আছে।

– রোদ ভাইয়ার এই কথায় থমকে গেলাম আর এই প্রথম সে আমাকে তুমি বলল!কেমন যেন হার্ট বিট বেড়ে গেল অন্যরকম অস্থিরতা শুরু হলো কি জানি রোদ ভাইয়া বুঝলো কিনা ধীরে ধীরে আমার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে একটু দুরে দাড়ালেন। আমি যেন একটু সস্তি পেলাম। তারপর রাদিব হুট করে কোথা থেকে এসে আমার হাত ধরে বলল,

রাদিব : রাতের পরী চলো বাসায় যেতে হবে তো তুমি কান্না করো না, আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসিতো।

– এই বাবুটাকে ভালো না বেসে কেউ থাকতে পারবে না। ওর এই কথাগুলো ভীষণ মায়া সৃষ্টি করে, তাই ওর হাত ধরে বেরিয়ে এলাম নিজের বাড়ি থেকে মামনির বাড়ি অথ্যাৎ আমার শশুর বাড়ি। মামনি আমাকে আর রোদ ভাইয়াকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে মিষ্টি খাওয়ালেন । তখন রাদিব বাবু ও খেতে চাইলো ওকে ও খাওয়ালো। তারপর আমাকে রোদ ভাইয়ার ঘরে মামনি বসিয়ে চলে গেলেন। রোদ ভাইয়ার ঘরটা ভীষণ পরিপাটি গোছানো ভালো লাগছে। গোছানো ঘর কার না ভালো লাগে কিন্তু আমি পুরায় ওগোছালো কোন কাজ ই ঠিক মতো করতে পারিনা।

বাসর ঘর নিয়ে ভাবতাম আমার বাসরঘর হবে শুধুই গোলাপ ফুল দিয়ে কারণ গোলাপ ফুল ভীষণ পছন্দের। কিন্তু এই ঘরে গোলাপ কেন কোন ফুলের ফ নেই। এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ রোদ ভাইয়া ঘরে প্রবেশ করলেন ……

চলবে।।।