#জোছনায়_ঘর_তোর_আমার
#পর্ব১০
#মহুয়া_আমরিন_বিন্দু
শেলিনা বেগমের কথায় যেনো শশী আকাশ থেকে পড়লো।
রাহাদ কতোটা চালাকি করে মিথ্যা টা বললো তার মাকে।
কিছুক্ষণ আগের কথা মনে পড়তেই তার রাগ লাগলো।
শশীর কান্না করার মাঝেই শেলিনা বেগম বলে উঠলেন–,,মা এভাবে কাঁদছিস কেনো? রাহাদের সাথে বিয়েটা নিয়ে আমি তেমন কিছু মনে করিনি ও তো তোর সম্মানের কথা চিন্তা করেই এমন ভাবে বিয়েটা করেছে, বাড়িতে গিয়ে আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়েটা আবার দিবো।রাহাদ ভালো ছেলে মা তোকে ভালো রাখবে তোর বাবাও অমত করবে না দেখিস!
শশী হতবিহ্বল হয়ে বসে,কি থেকে কি হলো,মানে জোর করে বিয়ে করলো যা নয় তা করলো,এখন এসে এতো বড় মিথ্যাটা কি করে বললো রাহাদ?শশী নিজের বাবা মাকে ধোঁ’কায় রাখতে পারবে না কিছুতে।যা হওয়ার হবে বাড়িতে গিয়েই সত্যি টা বলবে ও।
বিকেল নাগাদ নিজের বাড়িতে চলে আসলো শশী।চুপচাপ রুমে গিয়ে বসে রইলো কারন সে একা আসেনি রাহাদ টাও লেজ গুটিয়ে পেছন পেছন চলে এসেছে।এ যেনো মরা’র উপর খাঁ”ড়ার ঘা!
——-
পুষ্পিতা মাথায় শুভ্রতম বেন্ডে’জ নিয়ে বসে আছে গাঁয়ে তার গোলাপি রঙা শাড়ি, রাগে লাল হয়ে বসে আছে শশী সে ভেবে পায় না একটা মানুষের এতো তাড়া কিভাবে থাকতে পারে তার উপর নিজের বাবা মাও কথা শোনার সময় পাচ্ছে না যেনো,আত্নীয় এসেছে তাদের খাতিরযত্নে তারা ভীষণ রকম ব্যস্ত।
রাহাদের বাবা, মা,তিশা,তিহান,রাহাদের চাচী এসেছে তার চাচা নির্বা’চন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেনি।
মূলত ওরা মেয়ে দেখতে এসেছে,যেখানে রাহাদ নামক ব্যক্তি কবেই বিয়ে সেরে ফেলেছে।
তিশা পুষ্পিতার পাশে বসে আছে,পাপড়ি ও জেসি এক পাশে দাড়িয়ে আছে।
পুষ্পিতার ভাই এসে বললো–,,আপু জানিস তো দুইদিন পরই তোর আর রাহাদ ভাইয়ের বিয়ে, কারন ভাইয়ার তো খেলা আছে তাই তাড়াহুড়ো করছেন আংকেল আন্টি!
পুষ্পিতা বিরক্তি নিয়ে বললো–,,আর কয়বার করমু বিয়া!
রাহাদ দরজায় এসে দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো–,,যতদিন আমি বেঁচে আছি ততোদিন চাইলেই বিয়ে করতে পারো!
পুষ্পিতা রাগে দাঁত কিড়মিড় করে তাকালো!
রাহাদ মুচকি হেসে চলে গেলো।
———
পুষ্পিতার গায়ে হলুদ দিয়ে গেলেন তার দাদী আর বলে গেলো রাজ কপাল নিয়া জন্মাইছছ বইন,রাহাদের মতো সোনার টুকরা পোলার বউ হইবার পারছছ!
পুষ্পিতা রোব’টের মতো বসে আছে,না বাবা না তার মা কাউকেই বলার সুযোগ হচ্ছে না রাহাদের করা সব কিছু।সবচেয়ে নিকটবর্তী আত্নীয়দের দাওয়াত করেছেন তারা,সাধ্য মতো আয়োজনের ত্রু”টি রাখেননি পুষ্পিতার বাবা মা।
পুষ্পিতা কেনো যেনো এই মিথ্যা”চার মেনে নিতে পারছে না।
বিয়ের দিন এতো এতো ব্যস্ততা তবুও পুষ্পিতা এক প্রকার টেনে নিজের বাবা মা কে রুমে আনলো,পুষ্পিতার বড় বোন ঈশিতাও ঢুকলো রুমে।
শেলিনা বেগম বিচক্ষণ মহিলা তিনি এক পাশে দাড়ালেন,মেয়েকে এতোটা ছট’ফট করতে দেখে তিনি চিন্তায় পড়লেন মেয়েটা কিছু বলতে চাচ্ছে কবে থেকে তারাই শুনতে চায়নি।
পুষ্পিতার বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো–,,কি হয়েছে মা?
পুষ্পিতা কিছুই বলতে পারলো না প্রথমে কেঁদে উঠলো।শেলিনা বেগম পাশে এসে বসলো।ঈশিতা অধৈর্য কন্ঠে বললো–,,কি হয়ে পুষ্প কাঁদছিস কেনো?বিয়েতে কোনো অসুবিধে?
পুষ্পিতা কেঁদে উঠলো ফুপিয়ে বললো–,,বি,,য়ে বিয়ে তো আগেই হয়ে গেছে!
ঈশিতা কিছুটা জোড়েই বললো–,,মানে?
পুষ্পিতা পুরো কাহিনি বললো।কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে মেয়েটার। মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন শেলিনা বেগম।মেয়েটা একা একা এতো কিছু সহ্য করেছে?সে কি এতোটাই কঠোর মা যার জন্য মেয়েটা তাকে বলতেও সংকোচ বোধ করলো,ভয়ে ভয়ে একা একা কষ্টে থেকেছে!
ইতিমধ্যে বর যাত্রী চলে এসেছে,পুষ্পিতা বউ সেজেছে পরনের লাল শাড়ি সাথে কেঁদে কে’টে সে নিজেও লাল টমেটো হয়ে গেছে।
বর যাত্রী বলতে শুধু রাহাদের কিছু আত্মীয় পনেরো জনের মতো। বউ দেখতে না পেয়ে নিচে কিছুটা কথা বার্তা শুরু হলো,পাত্রীর সাথে তার বাবা মা বোন কাউকে দেখা যাচ্ছে না বরের সাথে লোকজন এসেছে তাদের কে ও কিছু দেওয়া হলো না এখনো।কারো কি কোনো খেয়াল নেই নাকি?পুষ্পিতার দাদী রাগলো বেশ,তিনি ছুটলেন পুষ্পিতার ঘরের দিক,রাহাদ কেনো যেনো অধৈর্য হলো,সে নিজেও গেলো বসার স্থান ছেড়ে।
পুষ্পিতার ঘরে ঢুকা মাত্ররোই একটা চ’ড় পড়লো রাহাদের গালে!
শেলিনা বেগম রেগে ধম’কের সুরে বললো–,,সবাই এখন রুম থেকে যাবে,শুধু রাহাদ থাকবে ভিতরে!
পুষ্পিতার দিক পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো রাহাদ,এখনও হেঁচকি তুলে ফোপাঁচ্ছে!রাহাদ কোনো যেনো হাসলো,বোকাটার জন্য মিথ্যা বললো আর সে কিনা নিজেই সব বলে দিলো?রাহাদের নিজেকে নিয়ে চিন্তা কখনো ছিলো না,আর না সে নিজেকে ভালো প্রমান করতে চায়!
শেলিনা বেগমের কর্ক’স কন্ঠ–,,আমার মেয়ের সাথে এমন করার কারন কি রাহাদ!
রাহাদের নির্লিপ্ত সোজাসাপটা জবাব–,,আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি।আর আমার ধারনা সেও আমাকে ভালোবাসে শুধু আপনাদের সম্মানের কথা ভেবেই এসব থেকে পিছিয়ে থেকেছে বরাবর!
–,,কতোটা ভালোবাসো?ভালোবাসার মানে বুঝো তুমি?
–,,ভালোবাসা মানে কি জানার প্রয়োজন মনে করছি না!আমার কাছে ভালোবাসা মানেই শশী!তার সম্মান, তার ভালোথাকা।
–,,না চাইতেও বিয়েটা মানতে হবে ভাবলে তুমি ভুল করবে রাহাদ!
–,,আমি জানি আপনি শশীকে আমার হাতেই তুলে দিবেন!
–,,কেনো এমন মনে হলো তোমার?
–,,কারন আপনি শশী কে বেশি ভালোবাসেন তাই,আপনি জানেন সে কোথায় ভালো থাকবে,তাকে ভালো রাখার যোগ্যতা আমার আছে কিনা এটাও আপনি জানেন না হয় আজ বিয়েটা দিতেন না!
–,,তুমি আমার মেয়েকে ভালোবাসো এটা মানলাম,কিন্তু আমার মেয়ে তো ভালোবাসে না তোমাকে, তাহলে কেনো আমি তোমার হাতে মেয়ে তুলে দিবো?
–,,এক মাস সময় চাই ম্যাম তার পরও যদি শশী ফিরে আসতে চায় আমি তাকে নিজে পৌঁছে দিয়ে যাবো।ওয়া’দা করছি!
–,,বিয়ের আসরে বসো,বিয়ে হবে!
শেলিনা বেগম থমথমে মুখে বেরিয়ে গেলেন।রাহাদ ও চুপচাপ বসলো,পুষ্পিতা মায়ের দিকে তাকিয়ে, শেলিনা বেগম মেয়ের পাশে বসে রইলেন কিছু সময় পর হুজুর আসলেন চাদর টেনে দেওয়া হলো সামনে।
ঈশিতা বোনের পাশে বসলো ছোট্ট রাঈমা পুষ্পিতার কোলে বসে আছে।আলভি হুজুরের পাশে দাঁড়ানো।
পুষ্পিতা অনুভূতি শূন্যের মতো বসে আছে,সে জানে এখন বিয়ে না হলে তার বাবাার সম্মান শেষ হবে,তারাও কিছু করতে পারবে না তাই হয়তো সব মেনে নিতে হচ্ছে,কিন্তু রাহাদের সাথে কি কথা হলো তার মায়ের জিজ্ঞেস করার সুযোগ টুকুও হলো না।
পুষ্পিতার ভাবনায় ছেদ পড়লো হুজুরের কথায়।পূর্বে তাদের শুধু রেজিষ্টি হয়েছিলো কবুল বলা হয়নি!
পুষ্পিতার কানে হুজুরের কথা গুলো বাজলো কিছুক্ষণ বিয়েতে রাজি থাকলে বলুন মা কবুল!
ঈশিতা কানে কানে বললো–,,বলে দে পুষ্প!
পুষ্পিতা নিজের মাকে খুঁজলো বাবাকে খুঁজলে পর্দার আড়ালে থাকায় দেখার সুযোগ হলো না।
কিছু সময় নিজের হাত কচলে মুষ্টিবদ্ধ করলো।শেষে কেঁদে বলে দিলো কবুল!
আলহামদুলিল্লাহ বলে বিয়ে সম্পন্ন হলো যেনো।সবাইকে খেজুর দেওয়া হলো।মানুষ জনের ভীড় কমলো,এবার বুঝি বিদায়ের পালা।
পুষ্পিতা চুপ রইলো তার কান্না পাচ্ছে না এখন,শেলিনা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।কানে মুখ গুঁজে বললেন–,,মা সব সময় তার শশীর পাশে আছে মা,নিয়তি অনেক সময় আমাদের পরীক্ষা করে,আমাদের সে সমস্যার মোকা’বেলা করতে শিখতে হয়,মনে করবে না আমরা তোমাকে নিজেদের সম্মান বাঁচাতে রাহাদের হাতে তুলে দিচ্ছি,রাহাদ যদি তোমার মনে জায়গা করে নিতে পারে তবেই তুমি তার সাথে থাকবে,প্রথমেই হার মেনে নিলে হয় না মা,আশা করি আমার শশী বুদ্ধিমান।ভুল বুঝা বুঝি থাকবেই,ভালোটা খুঁজবে সব সময়।আর আমি খুশি তুমি বাবা মাকে সব সময় আগে প্রাধান্য দিয়েছো।বাবা মা সন্তানের খারা’প কখনো চায় না বিশ্বাস রাখবে,নতুন জীবন ভাল কাটুক মা, মায়ের দোয়া সব সময় থাকবে!এবার এসো চোখে জল নয় হাসি নিয়ে স্বামীর সংসারে যাও।
পুষ্পিতা মৃদু কেঁপে উঠলো, কান্নারা দলা পাকিয়ে আসলো তার,নিজের বাবাকে শুধু জড়িয়ে ধরলো।দুই বাবা মেয়ের নিরব দুঃখ প্রকাশ ঘটলো যেনো তাদের নিঃশ্বাসের শব্দে ভারি হলো চারপাশ।
হামিদ মেয়ের হাত রাহাদের হাতে দিয়ে উল্টো ঘুরে ফেললেন হয়তো মেয়ে রুপে মাকে বিদায় দেওয়াটা সত্যি ভীষণ কষ্টের!
ঈশিতা বোনকে বিদায় দিলো রাঈমা ঠোঁট উল্টে কাঁদলো সে তার মাম্মামের সাথে যাবে।
বেশি কষ্ট হলো আলভির, ছেলেটা চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে বিদায় দিলো বোনকে।যদিও স্বল্প রাস্তার দূরত্ব তবুও যেনো মনে হয় বহুদূর। বহুকাল আর দেখা হবে না,চাইলেই আর আগের মতো সময় করে মারা’মারি করা হবে না, শব্দ জমিয়ে ঝগ’ড়া করে উঠা হবে না।অতীত নাকি স্মৃতি? কোনটা মনে হবে এখন ঘরের ভিতর ঢুকলে,সব কিছুই কেমন লাগবে ফাঁকা ফাঁকা! আহ’ প্রিয়জনের বিদায় বুঝি এতোটাই নিদারুণ যন্ত্র”ণার।
***
পুষ্পিতা চুপচাপ বসে আছে ফুলসজ্জিত খাটে,রাহাদ আসবে কি করবে না করবে এসব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তার তিশা বসে বসে দাঁত দিয়ে নখ কাট’ছে তিহান তিশাকে বিরক্ত করেছিলো এতোক্ষণ। তিশা এসে তো পুষ্পিতা কে বলেছে,রুবাইদা নাকি বাড়ি নেই,সাথে রুবাইদার সাথে রাহাদের ঘটনাও বলেছে।প্রতিক্রিয়া দেখায়নি পুষ্পিতা।এই রুবাইদার জন্যই তার মাথায় এখনো কা’টা দাগ!ভাই ভালোবাসলে বিয়ে করে নিতা, আমাকে নিয়ে কেন টানাটানি করলা দুজন যত্তসব!
কখন রুম থেকে তিশা বের হয়েছে পুষ্পিতা জানে না।মাথা যখনই বালিশে দিয়ে চোখ বন্ধ করবে ভাবলো তখনই কেউ ধম’কে বলে উঠলো–,,এই একদম ঘুমাবে না পুষ্প কানন!আজ আমাদের বাসর রাত।
পুষ্পিতা রাগী চোখে তাকালো,রাহাদ হেসে এসে পাশে বসে পুষ্পিতা কে একটা ঠেস মার’লো!
পুষ্পিতা হাত উচিয়ে মা’রতে গেলেই হাত ধরে রাহাদ বললো–,,ভালোবাসি, ভালোবাসবে?
পুষ্পিতা রাহাদের হাতে কাম’ড়ে দিয়ে বললো –,,কচু বাসবো দূরে সরুন অসহ্য!
–,,বাসর রাতে গিফট দিতে হয় জানো না!
–,,না নিলে জোর করে দিতে হয় না জানো না?
–,,ভালোবেসে দিতে হয় বুঝলে পিচ্চি!
–,,কেনো বিরক্ত করছেন?
–,,ঢাবিতে আপনাকে স্বাগতম মিসেস!
পুষ্পিতা প্রথমে কিছু বুঝলো না,পরক্ষণেই মনে পড়লো আজ তো রেজাল্ট দেওয়ার কথা!
পুষ্পিতা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো জড়িয়ে ধরলো রাহাদ কে।স্বপ্ন পূরণ হলে বুঝি মানুষ এভাবেই খুশি হয়!
রাহাদ ও হাসলো।পুষ্পিতার হঠাৎ মনে হলো সে রাহাদ কে জড়িয়ে ধরেছে দ্রুত ছেড়ে দিলো,দূরে গিয়ে এলোমেলো চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে বললো–,,আপনার মোবাইলটা দিন আম্মুকে জানাবো!
–,,জানিয়ে দিয়েছি!শাশুড়ী মা তো বললো বাসর করায় মনোযোগ দিতে।
পুষ্পিতা হতাশ শ্বাস ছেড়ে বললো–,,এগুলা ছাড়া আর কিছু কি বলতে পারেন না?
–,,ঘুমাও!
পুষ্পিতা বললো–,,ধন্যবাদ!
রাহাদ আবার বলে উঠলো–,,শশী!
পুষ্পিতা আনমনে বললো–,,হুম?
রাহাদ বাহিরে তাকিয়ে দেখলো আজ আকাশে চাঁদ নেই।সে সেভাবে থেকেই বললো–,,পুষ্প!
তুমি আমার কল্পনার চাঁদ, আমি সেই কল্পনায় এক অমাবস্যার রাত।
জানো কল্পনা জুড়ে অনেক অনেক জোছনা,আমি সেই জোছনায় তোমার আর আমার একটা ঘর বানাতে চাই।যেখানে তুমি হবে চাঁদ আর আমি হবো রাত।
জোছনায় ঘর হবে তোমার আমার!
চলবে,,,,