ঝরা পাতা পর্ব-০১ (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

0
353

#ঝরা_পাতা
#Samiha_Jannat

(#সত্য_ঘটনা_অবলম্বনে)
এক ভোরে ঘুম থেকে তুলে বাবা আমার হাত দু’টি শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, ” আজ থেকে আমিই তোর বাবা এবং আমিই তোর মা। ” বাবার কথার অর্থ না বুঝলেও সেদিন আমি ভীষণ খুশী হয়েছিলাম। এ যেন দীর্ঘদিন খাঁচায় বন্ধী থাকার পর মুক্ত হওয়ার আনন্দ। মায়ের ছায়া কোনোদিনও আমার উপরে ছিল না। তাকে খুব ভয় পেতাম।

মা’কে কখনো আমি হাসতেও দেখি নি। সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকতেন। দিনের পর দিন, কখনো সপ্তাহ পাড় হয়ে যেতো মায়ের সাথে আমার কোনো কথা হতো না। মা সবার সাথে খুব মেপে মেপে কথা বলতেন।
আমাকেও যে দু’টি কথা বলতেন তা ছিল,

” পড়াশোনা কি কিছু করো? না-কি বাপের মতো অন্যের পায়ের তলায় পড়ে থাকার খেয়াল করছো ? ”

বাবার সাথেও মায়ের তেমন একটা কথা হতো না। প্রয়োজনে যে কয়টা কথা হতো তাতে স্পষ্ট বাবার প্রতি মায়ের ঠাট্টা-বিদ্রুপ, কটাক্ষ ফুটে ওঠত। বাবা সেসব গায়ে মাখান না। এমন ভান করেন যেন খুব তুচ্ছ ব্যাপার। মা তার সাথে মশকরা করছেন।

মা’কে আমি কাছে পাই নি। তিনি তার চাকুরী নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আমার বেড়ে ওঠা বাবার সাথে। যত্ন-আত্তি, গল্পগুজব সবকিছুর জন্য আমি শুধু বাবাকে পেয়েছি। বাবা আমাকে দিয়েছিলেন স্বাধীন এক জীবন৷ যে জীবনে নেই ক্লান্তি-অবসাদ, কিংবা পড়াশোনার চাপ।

পড়াশোনায় তেমন একটা ভালো করি নি। পড়তে একদমই ভালো লাগতো না। বাবা এ নিয়ে কোনোদিন চাপ দেন নি৷ প্রতিবার পরীক্ষার সময়ে ফলাফল খারাপ আসতো৷ তা দেখে বাবা হেসে বলতেন,

” এটা কিছুই না। পরীক্ষার ফলাফল কখনো জীবন নির্বাচন করে না। ”

মা এ কথা শুনে গম্ভীরমুখে বলতেন, ” পরীক্ষার ফলাফল জীবন নির্বাচন করে বলেই আমি এখানে, আর তুমি এখানে। আমি আছি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। আর তুমি পায়ের নিচে। তোমার কথাবার্তার ধরণ বুঝিয়ে দেয়, তুমি কতোটা অযোগ্য। যে জীবন অন্যের দ্বারে নত হয়ে কাটিয়ে দিচ্ছো, যদি চাও মেয়েও তাই করুক, তোমার মতো হোক, তবে তাই বানাও৷ আমার আপত্তি নেই। রক্তের দোষ কখনোই যায় না। ”

মায়ের কথা শুনে বাবার মুখটা মলিন হয়ে যেতো। আমার দিকে তাকিয়ে ফেকাসে হাসি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতেন। বাবা একজন গৃহস্থ কর্মী। তার কতো কাজ! আমরা যেখানে থাকি সেটা আমার নানাবাড়ি। বাবা নানাবাড়ির সমস্ত কাজ দেখাশোনা করেন।

নানা ছিলেন গ্রামের গণ্যমান্য ধনাঢ্য একজন ব্যক্তি। মা হলেন তার একমাত্র সন্তান। সে হিসেবে শৈশব থেকেই মায়ের অর্থ-প্রাচুর্যতার মধ্যে বেড়ে ওঠা। চলার পথে বাধা-বিপত্তি ছিল না। তার কোনো চাওয়া অপূর্ণ থাকে নি। একমাত্র সন্তান হিসেবে তার অন্যায় আবদারও মেনে নেওয়া হতো। জীবনে তিনি যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। কলেজ শেষ করার পরেই নানা চাইলেন মায়ের বিয়ে দিতে। কিন্তু, মা রাজি হলেন না। তার আকাঙ্খা তিনি চাকুরী করবেন।

নানা তা মানতে নারাজ। অঢেল সম্পত্তি থাকার পরেও কীসের চাকুরী? মা জেদ ধরে রইলেন। তিনি তার জীবন সংসারে নষ্ট করার আগে ভালোভাবে উপভোগ করতে চান।
বন্ধুত্ব-আড্ডা এগুলো নিয়েই মায়ের দিনকাল ছিল।

নানারও এককথা, এখন বিয়ে বসতে হবে। কিন্তু, মা অনেক কান্নাকাটি করায় সিদ্ধান্ত হলো অন্তত মা কেবল পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে একটাই শর্ত, নানার পছন্দে বিয়ে করতে হবে। মা বাধ্য হয়ে মেনে নিলেন।

আমার বাবা হলের নানার দূরসম্পর্কের ভাগিনা। বাবা শৈশব থেকেই এতিম৷ একূল-অকূল তার কেউ নেই। চৌদ্দ বছর বয়সে নানার বাড়িতে আশ্রয় খুঁজে পান। প্রথম জীবনে নানার কয়েকটি গরুর দেখাশোনা করতেন। পরবর্তীতে একে একে সব কাজের দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নেন। বাবা বেশ সাদাসিধা, নরম মনের মানুষ ছিলেন। তার চেহারার মধ্যে আভিজাত্য ভাব ছিল।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাবা আরো সুদর্শন হয়ে ওঠলেন। তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই, তার জীবন কতোটা ম্লান।

তিনি ছিলেন নানার বিশস্ত সেবক। চোখ বন্ধ করেও নানা-নানি তাকে বিশ্বাস করতেন। এককথায় বাবার আচার-আচরণ, ভদ্রতা, বিশস্ততায় নানা-নানি দু’জনেই মুগ্ধ ছিলেন৷ তারা আকাঙ্খা করলেন এমন একজন সৎ পাত্র যদি পাওয়া যেতো!

নিজের সেবকের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিবেন কীভাবে? কোনোভাবে হলেও মেয়ে কি তা মানতে পারবে? সব মিলিয়ে এগুলো নিয়ে তারা খুব চিন্তিত ছিলেন। একদিকে তাদের বয়স বাড়ছে, নানান রোগ এসে শরীরে বাসা বেঁধেছে। অপরদিকে দিন যত যাচ্ছে, মেয়ে ততই তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। দিনদিন বেপরোয়া হয়ে ওঠছে। মেয়েকে তারা কোনোভাবেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। ইচ্ছে হলেই মেয়ে তার বন্ধুদের সাথে ভ্রমণ করতে চলে যায়। ইচ্ছে হলেই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

নানা একদিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। মা’কে এনে কঠোরভাবে বলে দিলেন এই ছেলেকে বিয়ে করতে হবে। এতদিন যাবত যা যা করেছো, এটাই তার শাস্তি। মা অনেক ক্ষমা চাইলেন, তাদের বাধ্য মেয়ে হয়ে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন, যেন এই বিয়ে না হয়। কিন্তু, নানা রাজি হলেন না। তার বিশাল সম্পত্তি এবং একমাত্র মেয়েকে দেখে রাখার উপযোগী পাত্রকে তিনি হারাতে চান না।

তার চোখে বাবার মতো ছেলে আর হয় না। এমন লোভ-লালসাহীন পাত্র সাধনায়ও মিলে না।

অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মাকে এই বিয়ে করতে হলো। তিনি মেনে নিলেন। তবে শর্ত দিলেন তাকে চাকুরী করতে দিতে হবে।

তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। নানা তা মেনে নিলেন। ভাবলেন, একবার বিয়ে হয়ে গেলে মেয়ে এমনিও বশে চলে আসবে। সংসারে মন দিবে, স্বামীর প্রতি মনযোগী হবে। তখন এসব চাকরি-বাকরি তাকে টানবে না। মেয়ে নিজে থেকেই সংসার আঁকড়ে ধরে রাখবে। বাকি জীবন নিজের সংসার সাজানোতে ব্যস্ত থাকবে।

দীর্ঘ একটা সময় বাবা ও মায়ের একে-অপরের সাথে দেখা হলেও কখনোই ভালোভাবে দু’টো কথা হয় নি। মা প্রচণ্ড বিরক্তবোধ করতেন। তিনি নিরক্ষর মানুষ দু’চোখে সহ্য করতে পারতেন না। অথচ, এখন সেই নিরক্ষর মানুষটাকে বিয়ে করতে হলো!

রাগে-দুঃখে মা না-কি সেদিন খুব কাঁপছিলেন। তার মতো উচ্চ শিক্ষিত মেয়ের কপালে এই ছিল? নিজের অনাগ্রহে, অমতে মা দাঁতে দাঁত পিষে নামমাত্র সংসার শুরু করলেন। তিনি কোনোদিন বাবাকে সম্মান দেন নি, গুরুত্ব দেন নি। কখনোই বাবার জন্য একবেলা রান্না করেন নি। মায়ের চাকরি হওয়ার পর তিনি অন্যত্র চলে যান।

নানা-নানী তাদের দূরত্ব টের পেয়েছেন বলে পুনরায় জোর করে তাদের মেয়েকে নিয়ে আসেন। এরপর সরাসরি বলেন, মৃত্যুর আগে তারা নাতি/নাতনি দেখে যেতে চান। তাই হয় তাদের ইচ্ছে পূর্ণ করবেন, নয়তো পরিত্যক্ত হবেন।

চলবে…