তিতির পাখির বাসা পর্ব-৭+৮+৯

0
393

#তিতির_পাখির_বাসা(পর্ব-৭)
#জয়া_চক্রবর্তী

‘ ভাবনার শব্দরা আকাশে এলোমেলো ওড়ে’ ওদের একজায়গায় করতে পকেট থেকে কাগজ-কলম বের করলো সুদর্শন…..
কবি নয় সে,লেখেওনি কখনো,অথচ তিতির জীবনে আসার পর থেকেই…..
আজকাল তো টিকিটের পেছনে,খবরের কাগজের ওপরেও মাঝে মাঝেই দুচারলাইন লিখে ফেলছে সে।

‘এক পৃথিবী দূর পেরিয়ে
মনে মনে,
একটি হাত ছুঁয়ে যে আছে
আরেকটি হাত।
স্বপ্ন কেমন গড়ছে দেখো
রিয়ালিটি,
একটি মাথা লুটিয়ে আছে
বুকের মাটি।

‘কি লিখছো দাদা?’,দিয়ার কৌতুহলী প্রশ্নে কাগজ কলম চটপট পকেটে চালান করে দিলো সুদর্শন।বললো,’হিসেব লিখছি,আরে হিসেব-নিকেষ করেই চলতে হয় আমাদের মতো চাকুরীজীবীদের।’
হঠাৎ অচিন্ত্য গেয়ে উঠলো,’জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখো,হিসাব নিকাশ,কিছুই রবেনা’…
’দিয়া ‘ন’ দিয়ে গান ধরো,চলো অন্ত্যক্ষরী শুরু হোক,তিতির দিয়ার পরেই কিন্তু তুমি’…..
দিয়া মিষ্টি হেসে গান ধরলো,’নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে,চুপি চুপি বাঁশী বাজে বাতাসে বাতাসে’…’স’ দিয়ে তিতির,
স ১,স ২,স ৩..

‘সেই ভালো সেই ভালো,আমারে না হয় না জানো’ তিতির গেয়ে উঠলো।
সুদর্শনের চোখে মুগ্ধতা খেলে গেলো।তিতির গান থামিয়ে বললো,’ল’…ল ১,ল ২,ল ৩।
কিন্তু অচিন্ত্য-দিয়ার বায়নায় আবার পুরো গানটাই গাইতে হলো তিতিরকে।সুদর্শন কাঁচ ফেলা জানালার বাইরে তাকিয়ে মন দিয়ে গানটা শুনলো।

মনে মনে বললো,’তোমায় জানবোই তিতির,তোমাকে আমায় জানতেই হবে।’

‘মুহুর্তরা গড়ার অপেক্ষায়
পেরিয়ে সীমা আলোকবর্তিকার
ইচ্ছে নদীতে আঁকছি আলপনা
তোমার আমার মিলন আকাঙ্ক্ষায়।’

ভাবনার শলাটা মনে মনেই উস্কে নিলো সুদর্শন।

কি হলো দাদা,’ল’ দিয়ে গান ধরো।সুদর্শন বলে উঠলো,’না না দিয়া আমি গান-টান গাইতে জানিনা,তবে আমি ভালো শ্রোতা,অচিন্ত্য তুমিই ধরো ল দিয়ে,প্লিজ আমায় জোড় করোনা’।অগত্যা অচিন্ত্য গান ধরলো।কথায়,গানে জমে উঠলো সান্ধ্য আসর।হঠাৎ সুদর্শন খেয়াল করলো,আধ ঘন্টার মধ্যেই ট্রেন দিল্লী পৌঁছোবে।

কথাটা জানাতেই, দিয়া-অচিন্ত্য দুজনেই ব্যস্ত হাতে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলো।ওরা দিল্লী থেকে সিমলা যাবে।

দিল্লীতে তিতিরের জ্যাঠতুতো দিদির বিয়ে হয়েছে।অসাধারন ভালো গান গায়,দেখতেও অতুলনীয়া।এই দিদিকে তিতির ভীষন ভালোবাসে,তাই ট্রেন দিল্লী আসার পরেই তিতির উদাস হয়ে গেলো।সুদর্শন বললো,’মন খারাপ কোরনা, সিমলাতেই দিয়া,অচিন্ত্যর সাথে দেখা হয়ে যাবে।’

তিতির আর কথা না বাড়িয়ে খাওয়ারের ব্যাগ খুলে পাউরুটিতে জ্যাম মাখিয়ে কলা,মিষ্টি,ডিমসেদ্ধ দিয়ে সুদর্শন কে খেতে দিলো।নিজেও একটা ডিমসেব্ধতে কামড় বসালো।

রাতের খাওয়ার সেরে এখন যে যার মতো বাঙ্কে শুয়ে।
তিতির ক্লাস টুয়েলভে, কলেজের চেন্নাই ট্যুরের পর এই আবার ট্রেনে চাপলো।

সেবার চেন্নাই থেকে ফেরার সময় ট্রেনে ওর উল্টোদিকের বাঙ্কের ছেলেটি একটা কাগজ মুড়ে ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলো।তিতির খুলে দেখেছিলো তাতে লেখা,’লাভ ইউউউ ডিয়ার’,সঙ্গে একটা ফোননাম্বার।তিতির ছেলেটাকে দেখিয়েই কাগজটা ছিঁড়ে ফেলেছিলো।

তিতির তো বুঝেই পায়না,ছেলেরা এতো তাড়াতাড়ি কি করে ভালোবেসে ফেলে!!

তিতির বাঙ্ক থেকে নেমে সেকেন্ড ইয়ারের সজলদাকে রিকোয়েস্ট করেছিলো,জায়গা এক্সচেঞ্জ করার জন্য।সজলদা এক কথায় রাজি হয়ে তিতিরকে নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলো।

এবার ও তিতিরের উল্টো দিকে একটি ছেলে শুয়ে ওর দিকেই এক দৃষ্টে তাকিয়ে।ছেলেটা দিল্লী থেকেই উঠেছে ট্রেনে।চেহারা দেখে মনে হয়না বাঙালী।ট্রেনে উঠবার পর থেকেই তিতিরকে মাপছে।

আচ্ছা ছেলেটা কি বোঝেনি তিতির বিবাহিতা?কলেজের বান্ধবী মধুরিমা বলেছিলো,’বিবাহিতা মেয়েদের প্রতিই ছেলেদের ঝোঁকটা বেশী থাকে’..কথাটার সত্যতা আজ অনুভব করলো।

সুদর্শনের সাথে জায়গা এক্সচেঞ্জ করে নেওয়ার জন্য তিতির নীচে নেমে আসলো।কিন্তু সুদর্শন অকাতরে ঘুমোচ্ছে।ডাকতে গিয়েও কি মনে হতে আর ডাকলোনা।নীচু হয়ে গিয়ে নিজেই সুদর্শনের পায়ের সামনে গুটিসুটি মেরে বসে পরলো।

ঘুম ভাঙতেই পায়ের মধ্যে নরম কিছুর অনুভব হওয়াতে সুদর্শন চোখ খুললো,দেখে তিতির বসে বসে ঘুমোচ্ছে।
‘কি হলো তিতির?এখানে বসে?’কিন্তু সুদর্শনের কথা তিতিরের কানে পৌঁছোলো বলে মনে হলোনা।তবে ঘুম ভেঙেই তিতিরকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেলো সুদর্শনের।

‘রোদ ঝলমল মিষ্টি
তিতির পাখি,
ঝর্না রোদে ভাসছে এলোমেলো,
তিলেক খুশীতে হাসছে
চোখের তারা..
শঙ্কিত মন রোদের
ছোঁয়া পেলো।’

সুদর্শন নিজের কম্বলে তিতিরকে মুড়ে দিলো।তারপর টয়লেট ঘুড়ে এসে ব্যাগ গোছাতে বসলো।ওদের ও নামবার সময় হয়ে গেলো।

এর আগে সুদর্শন একবার ফ্যামিলির সাথে দিল্লী হয়ে বাই বাস সিমলা গিয়েছিলো, আর একবার বন্ধুদের সাথে চণ্ডীগড় থেকে বাই বাস মানালি গিয়েছিলো।তবে মানালি ঘোরার পর সিমলার সৌন্দর্য তেমন চোখ কাড়তে পারেনা।তাই বেস্ট সিমলা হয়ে মানালি যাওয়া।

এবার ইচ্ছে কালকা থেকে টয়ট্রেনেই সিমলা যাবে।যদিও সময় একটু বেশীই লাগবে।কিন্তু পথের অভিজ্ঞতা নাকি অসাধারন।

ট্রেনটা কালকা থেকে সিমলা ওই ৯৬ কিলোমিটার পথ ১০৩ টি সুড়ঙ্গ পথ আর ৮০৬ টি সেতুর মধ্যে দিয়ে যায়।

ট্রেন কালকা স্টেশনে ঢোকবার প্রায় কুড়ি মিনিট আগে তিতিরকে ফ্রেস হয়ে আসতে বলে, কম্বলটা ভাজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো,হাওয়া বালিশের হাওয়া বের করে ভাজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো।তিতির আসতেই ওকে জ্যাকেট এগিয়ে দিয়ে পরে নিতে বললো।তিতির যে রাতে ওর বাঙ্কে এসে বসেছিলো,তাতেই দারুন খুশী খুশী মন সুদর্শনের।

কালকা স্টেশন থেকে বেড়িয়ে, তিতিরকে নিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলো।টয়ট্রেনের দুটো টিকিট কাটলো।তারপরে
এস.টি.ডি বুথ থেকে দুজনের বাড়ীতেই ফোন করে জানিয়ে দিলো ওদের কালকায় পৌঁছে যাওয়ার কথা।

টয়ট্রেনে বসে তিতির হঠাৎ কেঁদে ফেলে বললো,’আমায় বাড়ী নিয়ে চলো,আমি আর থাকতে পারছিনা,আমি আর থাকতে চাইছিনা’।

সুদর্শন এবার আর পারলোনা নিজের মেজাজ ধরে রাখতে।

বললো,’তোমার সমস্যাটা কি বলবে?কি এমন খারাপ দেখেছো আমার মধ্যে?আমি কি তোমায় মারি না বকি?প্রায় সাড়ে তিনমাসের ওপর তোমায় বিয়ে করেছি,স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক টা পর্যন্ত করিনি।’

একটু চুপ করে থেকে আবার বললো,’প্রতিদিন তোমার ঘুমের পরে ছাদে পায়চারি করি,আমিও তো রক্তমাংসের মানুষ।’

সুদর্শন বলেই যাচ্ছে,
‘আমি চেয়েছিলাম, আমাদের সম্পর্কটার ভিত হবে ‘বন্ধুক্ত’।’ভরসা’-‘বিশ্বাস’-‘শ্রদ্ধা’ -‘নির্ভিরতা’ দিয়ে গড়া থাকবে চার দেওয়াল,মাথার ওপর থাকবে নির্ভেজাল ভালোবাসার ছাদ।আর সেই ঘরে ছোট্ট দুটো শয়তানের সাথে পরম নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেবো সারাটা জীবন।

তিতিরের মুখে কোন কথা নেই।সুদর্শন বললো,
‘আমি তো অবাক,আসার আগের দিন বললে ডিভোর্স চাও,আমি কিন্তু তখনো কারন জানতে চাইনি….
এবার চাইছি, বলো,কেন?কেন এমন ছেলেমানুষি করছো তুমি?কেন ভেঙে দিতে চাইছো আমাকে?আমার স্বপ্নকে?তুমি কি পাথর দিয়ে তৈরি?’

তিতির এবারো কোন উত্তর দিলোনা।কিন্তু সুদর্শন দেখলো ওর চোখের জল পরেই যাচ্ছে।নিজেকে নিজেই শান্ত করলো সুদর্শন।
রুমালটা এগিয়ে নিয়ে যত্ন করে চোখের জল মুছে,তিতিরের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,’মাত্র কয়েকটা দিনেরই তো ব্যাপার।ফিরে যাওয়ার পর তুমি যা চাইবে তাই হবে।’….(চলবে)

#তিতির_পাখির_বাসা(পর্ব-৮)
#জয়া_চক্রবর্তী

সিমলা মলের কাছেই একটা হোটেলে উঠেছে তিতিররা।হোটেলে ঢুকেই সুদর্শনের কথায় গরম জলে স্নান করে নিলো তিতির।কিন্তু ডাইনিং এ খেতে যাওয়ার আর ক্ষমতা নেই তিতিরের।কম্বলের ওমে নিজেকে মুড়িয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলো।
অগত্যা সুদর্শন সার্ভিসিং এ ফোন করে রুমেই খাওয়ারটা দিতে বললো।

একপ্রকার জোড় করেই ঘুমন্ত তিতিরকে বসিয়ে নিজের হাতে একটা রুটি চিকেনকারি দিয়ে খাইয়ে,যত্ন করে মুখ মুছিয়ে দিলো সুদর্শন।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো সুদর্শনের।তিতিরের নিশ্বাস পরছে সুদর্শনের ঘাড়ে।ঘুমের মধ্যেই তিতির কখন জড়িয়ে ধরেছে সুদর্শনকে।তিতিরের অর্ধেক শরীর সুদর্শনের শরীরের সাথে মিশে যাওয়ার, সারা শরীর যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে সুদর্শনের।তিতিরের বুক ওঠানামা করছে সুদর্শনের গায়ে।এই ঠান্ডাতেও ঘামছে সুদর্শন।

না এরপর আর ঘুম আসেনি।নিজেকে সংযত রেখে,অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলো সুদর্শন।তারপর সময়ের গাড়ি চেপে আলো এলো,জল এলো,খবরের কাগজ এলো,শুরু হলো পথ চলা,কোথাও যানজট,কোথাওবা মুক্তি মন্ত্র- প্রভাতি সঙ্গীত।
কিন্তু সুদর্শনের অসহায় দিনলিপি যেন তিতির দিয়েই শুরু,তিতির দিয়েই শেষ।
সুদর্শনের গানের লাইনটা মনে পরলো,”সব পথ এসে মিলে গেল শেষে,তোমারি দুখানি নয়নে।”

অবশেষে ঘড়ির কাঁটার বাঁধা নিয়মের দোসর হয়ে,তিতিরকে সরিয়ে বিছানা ছাড়লো সুদর্শন।কাল রাতেই হোটেলে ঢুকে ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কথা বলে দুদিনের প্রোগ্রাম ঠিক করে নিয়েছে সে।
সেই অনুযায়ী আজ ৮ টার মধ্যেই গাড়ী আসবার কথা।

তিতির ঘুমোচ্ছে।সুদর্শন প্রথম দর্শনেই,নিজের অজান্তে হৃদয় গোলাপটা তুলে দিয়েছিলো এই মেয়েটির হাতে(যে হাত এখনো আশ্চর্য রকমের শীতল)।

জানলার বড়ো বড়ো পর্দা সরিয়ে দিতেই প্রকৃতির অসাধারণ রূপ।

মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সুদর্শন। হঠাৎ দেখলো ওর পাশে তিতির।ওর চোখেও একরাশ মুগ্ধতা।কাল রাতে টয়ট্রেনে আসার সময়ও এই একই রকম মুগ্ধতা ছিলো ওদের দুজনের চোখে।পাহাড়ের গা বেয়ে টয়ট্রেন চলছিলো,কখনো অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ, কখনো বা টানেল দিয়ে।চার ঘন্টার পথ কিভাবে যে কেটে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি ওরা।

তিতিরকে চটপট রেডি হতে বলে,নিজেও রেডি হয়ে নিলো সুদর্শন।তারপর বেড়িয়ে গেলো গাড়ীর খোঁজে।তিতির আজ ডেনিম ব্লু-জিন্সের সাথে লাল জ্যাকেট পরলো।দীর্ঘ চুলটা আঁচড়ে নিয়ে,হাল্কা লিপস্টিক বুলিয়ে নিলো ঠোঁটে।

গাড়ীতে এসে বসতেই পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো গাড়ি।আজ জাখুপাহাড়ের জাখুমন্দির,ক্রাইস্ট চার্চ,সেন্ট মাইকেল চার্চ,রিজ,সামারহিল,গেইটি থিয়েটার কভার করার ইচ্ছে।কাল কুফরি, ফাগু হয়ে পরশু সকালেই মানালির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরবে,এমনটাই প্ল্যানিং সুদর্শনের।

গাড়ীর ড্রাইভারকেও সেই ভাবেই বোঝানো আছে।যেহেতু আগে দুবার ঘোরা আছে,তাই তিতিরকে প্রতিটি জায়গার বিশেষত্ব নিয়ে খুব সুন্দর করে গল্প শোনাতে পারছে সুদর্শন।গেইটি থিয়েটার দেখে তিতির ভীষন উচ্ছ্বসিত। এটা মূলত ব্রিটিশদের বিনোদনের জন্য এক প্রদর্শনী সভা।সিমলার চার্চগুলোতে অসাধারণ কাজ করা কাঁচের জানলা,মার্বেলের বেদী,পাইপ অর্গান দেখে তিতির মুগ্ধ।নিজে থেকেও অনেক প্রশ্ন করছে সুদর্শনকে।তিতিরের উচ্ছ্বাস ভালো লাগছে সুদর্শনের।

ওক,সেডার,রডোডেনড্রন ইত্যাদি পাহাড়ি গাছ,যা এতোদিন শুধুমাত্র ভূগোল বই এ পড়েছিলো সেগুলো সুদর্শন চিনিয়ে দিলো সামারহিলে যাওয়ার পথে।

হোটেলে ফিরেই দেখলো অচিন্ত্য আর দিয়া ওদের সাথে দেখা করার জন্যই বসে আছে।ওরা পরেরদিন সকালেই বেড়িয়ে পরবে মানালির উদ্দেশ্যে।ডিনারটা চারজন একসাথেই করলো।

রাতে শোয়ার পরে আজ আর ঘুমিয়ে পরলোনা তিতির।সদ্য ঘোরা জায়গা গুলো নিয়ে অনর্গল কথা বলে চলেছে।
সুদর্শন একসময় বললো,’আমি কি তোমার চুলে বিলি কেটে দেবো?কাল সকালে উঠতে হবে যে।’
তিতির বাধ্য মেয়ের মতো চোখ বুজে,নিজেই সুদর্শনের হাতটা টেনে মাথায় রাখলো।সুদর্শন মুখটা নামিয়ে তিতিরের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ওকে শুভরাত্রি জানালো। তিতিরের চুলে বিলি কেটে ঘুম পারিয়ে,নিজেও ঘুমিয়ে পরলো দুচোখে স্বপ্ন মেখে।

স্বপ্নরা ফিরে ফিরে আসে,
স্বপ্নরা ফিরে ফিরে যায়।
রক্ত পায়ে জীবন চলার পথ,
চলার ছন্দে থেমে থেমে যায়।
হঠাৎ আসে দুঃখ মেঘের ঝড়,
এলোমেলো হাওয়ার কথকতা
হঠাৎ কোথাও সুখের টলোমল
দুঃখ তখন সুখের সাথে মিতা।

ঘুম ভাঙলো তিতিরের ডাকে।সার্ভিসিং রুমে ফোন করে তিতির নিজেই ব্রেকফাস্ট এর অর্ডার দিয়ে দিয়েছিলো।সুদর্শন দাঁত মেজে,চোখে মুখে জল দিয়ে, একসাথে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলো।
তিতির রেডিই ছিলো,সুদর্শন গরম জলে স্নান সেরে, নিজেও চট করে রেডি হয়ে নিলো।আজ সিমলায় তাদের দ্বিতীয় আর শেষ দিন।দুজনেই এক সাথে বেড়িয়ে গাড়ীতে গিয়ে বসলো।

সুদর্শন জানালো,আজ ওরা কুফরি আর ফাগু কভার করবে।
কুফরি সিমলা থেকে প্রায় ১৩/১৪ কিলোমিটার দুরের একটা ছোট্ট হিল স্টেশন।এখানেই হিমালায়ান ওয়াইল্ড লাইফ জু আছে।ফেব্রুয়ারি মাসে কুফরিতে উইন্টার স্পোর্টস ফেস্টিভাল হয়।
আর দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক তখন কুফরিতে ভীড় জমায়।

এই প্রথম তিতিরের বেড়াতে এসে ভালো লাগছে,কারন সুদর্শন প্রতিটি জায়গায় যাওয়ার আগে ও সেই স্পটে পৌঁছে সেই জায়গা নিয়ে অনেক খুঁটিনাটি খবর দিচ্ছে।সুদর্শনের সাথে কথা বলতে বলতে আর পথের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে তিতিরদের গাড়ি থেমে গেলো।বাকী পথ ঘোড়ায় যেতে হবে।এবার তিতিরের ভয় করতে শুরু করলো।ঘোড়া সে চড়েনি কখনো। কিন্তু ঘোড়া ছাড়া ওই পথে যাওয়া অসম্ভব।সুদর্শন ভরসা দিয়ে কোলে তুলে নিজেই তিতিরকে ঘোড়ায় বসিয়ে দিলো।তিতির ভয়ে চোখ বুজে ছিলো।চোখ খুলতেই দেখলো সুদর্শনের মুখে দুষ্টু হাসি।তিতির হেসে ফেললো।

ঘোড়াগুলো সব পর্যটকদের পিঠে নিয়ে এক লাইনে,এক ছন্দে, খাদের গা ঘেঁষে হেঁটে চলছে।
সিনেমায় দেখা ঘোড়া গুলোর মতো এই ঘোড়া গুলো ছুটছে না দেখে,তিতিরের ভয়টা অনেকটাই কেটে গেছে।ও আনন্দের সাথে চারদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে চলছে গন্তব্যে।মাঝে মাঝে সুদর্শনের সাবধান বানী শুনতে পাচ্ছে,’লাগাম শক্ত করে ধরে রেখো’ বা ‘নীচের দিকে তাকিও না’।

অবশেষে ওরা কুফরি পৌঁছোলো।সুদর্শন এবারো কোলে করে নামিয়ে দিলো তিতিরকে।সুদর্শনের পুরুষালি গন্ধ তিতিরের অজান্তেই আচ্ছন্ন করে দিলো শরীর।তিতির লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।

কুফরি থেকে ফাগু প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে ।শীতকালে ফাগুতে স্কিয়িং আর উইন্টার স্পোর্টস এর জন্য পর্যটকরা ভিড় করে।স্থানীয় মানুষরা গরমকালে এখানে এসে পিকনিক ও করে। কুফরি আর ফাগু দুটোই ভীষন এঞ্জয় করলো তিতির।এর আগে বেশ কয়েকবার সমুদ্রে গেলেও পাহাড়ে এই প্রথম।
মনের মনিকোঠায় সঞ্চয় হয়ে রইলো এক আকাশ ভালো লাগা।

শোয়ার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে রাখলো সুদর্শন কারন পরের দিন সকালেই ওদের গন্তব্য বরফের রাজ্য মানালি।(চলবে)

#তিতির_পাখির_বাসা(পর্ব-৯)
#জয়া_চক্রবর্তী

বসন্ত এসে থামে আমার চোখে,
যখনই তোমায় দেখি,
যেন পূর্নিমা তুমি,
আমি চন্দ্রাহত একলা পথিক।

তিতিরের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই আওড়ালো শব্দগুলো।একটু আগেই তারা মানালির হোটেলে চেকইন করেছে।

সিমলা থেকে মানালি এই ২৫০কিমি পথ অতিক্রম করতে তিতিরদের প্রায় ১০ ঘন্টা লেগে গেলো।

রাস্তার ধকলে দুজনেরই ক্লান্ত হওয়ার কথা ,কিন্তু রাস্তার সৌন্দর্য সঙ্গে ভয়াবহতা তাদের সকল ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে।

পাহাড়ের বুক চিরে রাস্তা। কখনো মাথার ওপরেই বিশাল পাথরের খন্ড,কখনো বা রাস্তার মাঝেই পরে আছে বড় বড় পাথরের চাঁই।
মাঝে মাঝে তো তিতিরের মনে হচ্ছিলো ওপর থেকে পাথরের চাঁই পরে থেঁতলে যাবে গাড়ি,নয়তো খাদই হবে তাদের অন্তিম গন্তব্য।

প্রতিবার গাড়ি বাঁক নেওয়ার সময় চোখ বুজে সে সুদর্শনের হাত চেপে ধরছিলো।আর সুদর্শন প্রতিবারই তার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে আশ্বস্ত করছিলো।

ড্রাইভার ছেলেটি পুরো সময়টাই আঞ্চলিক ভাষায় গান চালিয়ে রেখেছিলো।কিছু না বুঝলেও গানের সুরের অদ্ভুত মাদকতা গ্রাস করছিলো তিতিরদের।একটা ঝিম ধরা ভালো লাগায় হারিয়ে যাচ্ছিল মন।

গাড়ি কখনো বা মনে হচ্ছিলো পাহাড়ের পদতলে এসে পরেছে,কখনো বা মনে হচ্ছিলো পাহাড়ের চুড়োয় এসে গেছে।এক অসাধারণ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য,পাহাড়ের গায়ে দুধ সাদা বরফের আলপনা,কোথাও বা পাহাড়ি ঝর্না, গাছেরাও যেন আবহমান কাল ধরে নীরব সঙ্গী হয়ে পাহাড়ের সাথে দাঁড়িয়ে।

রুমে ঢুকেই সুদর্শন কাঁচের জানলার ভারি পর্দাগুলো একপাশে সরিয়ে দিলো।

আজ সেই পূর্নিমা।নির্জন সন্ধ্যায় বুনো চাঁদের রুপালী আবেশ শ্বেতশুভ্র বরফের পাহাড়কে আরো মোহময় করে তুলেছে।

তিতির হাঁ করে শুধু পাহাড়ের রূপসুধা পান করে চলেছে। সুদর্শন কিন্তু পাহাড়ের সাথে সাথে তিতিরের ভালো লাগার উত্তেজনাকেও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে।
কারন সুদর্শন জানে প্রথম বার সমুদ্র বা প্রথম বার পাহাড় দর্শনের রোমাঞ্চ অবর্ণনীয়।

সময় বয়ে যেতে লাগলো।একসময় সুদর্শন বললো,’চেঞ্জ করে নাও পাখি,আমি বাইরে যাচ্ছি’।সুদর্শন বেড়িয়ে যেতেই তিতির একটা একটা করে পোশাক ছাড়তে শুরু করলো।ঠান্ডাটা এবার যেন আরো সূঁচের মতো বিঁধছে তিতিরের শরীরে।

একটা ব্যাগি টি-সার্ট মাথা দিয়ে গলিয়ে, ফেসওয়াশ হাতে মুখে লাগিয়ে তিতির চোখ বুজেই টয়লেট গেলো, হাতড়ে হাতড়ে কল ঘোরাতেই বরফ ঠান্ডা জলের বৃষ্টি তিতিরকে ভিজিয়ে দিলো।চোখ বুজে ভুল করে শাওয়ারের কল চালিয়েছে সে।

কোনরকমে বন্ধ করে বাইরে এলো তিতির,টপ টপ করে জল পরছে গা থেকে।টাওয়াল টা ব্যাগ থেকে কোনরকমে নিয়ে কাঁপা হাতে ওপর ওপর জল মুছে সোজা কম্বলের ভিতর।

কিছু সময়ের মধ্যেই সুদর্শন খাওয়ার নিয়ে রুমে এলো।তিতিরকে দুবার ডাকলো।শুনতে পেলেও তিতিরের কথা বলার কোন ক্ষমতা নেই।আধভেজা টি-সার্টে সে তখন আরো ঠকঠক করে কাঁপছে।সুদর্শন খাটের পাশে দাঁড়িয়ে মুখের দিকের কম্বলটা নামালো।

তিতিরকে দেখে সুদর্শন অবাক।চোখ বোজা,মুখ লাল,ভেজা চুল।থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা।
টয়লেটের দিকে তাকিয়েই চিত্রটা পরিস্কার হয়ে গেলো।দ্রুত হাতে টাওয়ালটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে তিতিরের চুল মুছতে শুরু করলো।

সার্ভিসিং এ ফোন করে আরো একটা কম্বল আনিয়ে ওর ওপর দিয়েই চাপা দিয়ে দিলো কিন্তু তিতিরের কাঁপুনি থামবার কোন লক্ষণই দেখা গেলোনা।এমনকি অনেকবার ডাকার পরেও মেয়েটা চোখ খুলে তাকাচ্ছে না।

কি যে করে সুদর্শন!!

কয়েকবার একা একাই ঘরে পায়চারি করলো সে।তারপর কি মনে হতে কম্বলের ভিতরে নিজেও ঢুকে তিতিরকে জড়িয়ে ধরলো।বুঝলো তিতিরের পরনের ড্রেসটা ভেজা।দুএকবার ইতস্তত করে আবরণ মুক্ত করে তিতিরের বরফ ঠাণ্ডা তুলতুলে শরীরটা নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।

তিতিরের তিরতির করে কাঁপা অল্প ফাঁক হওয়া বরফ ঠাণ্ডা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে নিলো।একসময় সুদর্শনের উষ্ণতায় তিতিরের শরীর উষ্ণ হতে শুরু করলো।

কিন্তু তিতিরের আবরণহীন শরীরের সংস্পর্শে এসে সুদর্শনের হার্টবিট ততক্ষনে প্রচন্ডই বেড়ে গেছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পরছে,প্রবল উত্তেজনায় সুদর্শন ঘামছে।

এভাবে সত্যিই সে পেতে চায়নি তিতিরকে,কিন্তু পরিস্থিতি আজ তার হাতের নাগালের বাইরে।সুদর্শনের উপোষী ঠোঁট এলোপাথাড়ি চুমুতে পাগল করে দিতে থাকে তিতিরকে।আজ সুদর্শনের সংযমের বাঁধ ভেঙে গেছে।ভালো লাগার তুষারপাতে ভিজতে ভিজতে তিতিরকে পূর্ন ভাবে গ্রহন করলো সুদর্শন ।সাক্ষ্মী রইলো বুনো চাঁদ,শৈতালি চাদরে মোড়া পাহাড়,ভেসে বেড়ানো মেঘ।

সুদর্শনের বায়নায় রাতের খাওয়ারটা খেতেই হলো তিতিরকে।কিন্তু আজ আর সুদর্শনের চোখে চোখ রাখতে পারছেনা তিতির।প্রচণ্ড লজ্জায় আচ্ছন্ন শরীর আর মন।এখনো সারা শরীরে সুদর্শনের আদরের রেশ।সুদর্শন বিছানাতেই তিতিরের মুখ রুমাল ভিজিয়ে মুছিয়ে দিলো।তারপর তিতিরকে ঘুমিয়ে পরতে বলে নিজে গিয়ে চেয়ার টেনে জানলার সামনে বসলো।

ঘটনার আকস্মিকতায় সুদর্শন নিজেও কিছুটা বিহ্বল।নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় চাই সুদর্শনের।

চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে একসময় চোখ জুড়িয়ে আসলো তিতিরের।ঘুমের কোলে হারিয়ে গেলো তিতির।

ঘুমন্ত তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে সুদর্শন,মনে মনে বললো,

তুমি ছিলে আমার অসংখ্য ঘুমহীন রাত হয়ে,
সেসব রাতের নাম না জানা তারা হয়ে,
কিংবা কোজাগরী রাতে নিভু নিভু ফানুসের ভিড়ে,
ছিলে অনেক যত্নে-আলতো আদরে গড়া প্রেম,
উড়িয়ে দেওয়া নীল আকাশে।

তৃষ্ণার্ত চোখে শুধু চেয়েছিলাম,আকাশের মায়া ভুলে মাটির দেহের প্রেমে আছড়ে পরবে বলে।
আজ অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান তুমি,তোমাকে পেয়েছি আমি অজানার পথ ধরে।

কিন্তু সত্যিই কি সে তিতিরকে পেয়েছে?এভাবে পাওয়াকে কি পাওয়া বলা যায় ?তিতির কি আদৌ শুনতে পেলো, সুদর্শনের বুকের পায়রাগুলোর ঝটপটানি?
না উত্তর জানা নেই।তবু সাদা কালো চোখ দুটো রঙিন স্বপ্নে ভেসে যেতে চায়।

বিছানায় শুতে এসে, সুদর্শনের ইচ্ছেরা আবার বাঁধভাঙা হয়ে তিতিরকে আদরে ভরিয়ে দিতে চাইলো।কম্বলের ভিতরে গিয়ে তিতিরের ঠোঁটে আবার ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে হারিয়ে গেলো সুদর্শন সব পেয়েছির দেশে।(চলবে)