#তুমি_আমারই_রবে
#পর্ব_১৭
#Nishat_Jahan_Raat (ছদ্মনাম)
“পারলে আজই ফ্ল্যাটে উঠে যেও রূপা। আমি আমার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে চাই!”
চরম আশ্চর্য হয়ে আমি ভ্রু দুটো কুঁচকে পিছু ফিরে উনার দিকে তাকালাম। উনি এখনো একই ধ্যানে জানালার গ্রীলে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে, মুখে যতো রাজ্যের উদ্বিগ্নতার ছাপ নিয়ে আমি উনার পেছনটায় দাঁড়িয়ে বললাম,,,
“দায়িত্ব মানে? আপনি কোন দায়িত্বের কথা বলছেন?”
উনি স্বাভাবিক ভাবেই বললেন,,,
“মালিক হিসেবে ভাড়াটিয়ার উপর একটা দায়িত্ব থাকে৷ আমি সেই দায়িত্বের কথা বলছি। তাছাড়া আমরা তো এখন ফ্রেন্ড, ফ্রেন্ড হিসেবে ও আমার একটা দায়িত্ব আছে।”
“ফ্রেন্ড হিসেবে দায়িত্বটা আপনি একটু বেশিই দেখাচ্ছেন! রাগ করবেন না আমার এই মুহূর্তে যা মনে হচ্ছে তাই বললাম।”
উনি পিছু ঘুড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“আমি যাকে ফ্রেন্ড হিসেবে ভাবি, তার জন্য সব করতে পারি, এবার তাকে তুমি ওভার দায়িত্ববোধ বলো বা ওভার পজেজিভনেস বলো। আমি এসবে তোয়াক্কা করি না। আসলে আমি একটু এক রোঁখা স্বভাবের। যা ঠিক মনে করি তাই করি।”
উনি কিছুটা থেমে, হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে আমাকে বললেন,,
“তুমি এবার যেতে পারো রূপা। অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে তোমার।”
চোখে, মুখে চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে আমি উনার রুম থেকে বের হয়ে এলাম। রুম থেকে বের হতেই উনি ঠাস করে রুমের দরজাটা লাগিয়ে দিলেন। ভয়ে এক প্রকার কেঁপে উঠেছিলাম আমি। বুকে থুথু ছিটিয়ে আমি দ্রুত পায়ে হেঁটে উনাদের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সোজা আমাদের ফ্ল্যাটে চলে এলাম। বসার রুমে লামিয়া আর নীলা সোফায় বসে চা খাচ্ছে। আমাকে দেখেই দুজনে বেশ উদগ্রীব হয়ে বলল,,,
“কি রে কোথায় ছিলি তুই? পুরো বাড়িতে খুঁজে ও তোকে পেলাম না।”
আমি কপালে হাত দিয়ে ফোঁলা জায়গাটা ওদের দেখিয়ে মেহুলের সাথে ধাক্কা লাগার বিষয়টা বললাম। ওরা ও বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে আরো এক দফা বরফ কপালের ফোলা জায়গাটায় ঘঁষে দিলো। আটটা বাজতেই আমি শাওয়ার নিতে চলে গেলাম। নয়টার মধ্যে নাশতা খেয়ে আমরা তিনজনই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
মেইন রাস্তায় রিকশার জন্য দাঁড়াতেই মেহুল উনার গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলেন। তাড়াহুড়ো করে আমরা তিনজন এক সাইড হয়ে দাঁড়ালাম। গাড়িটা থামিয়ে উনি জানালার কাঁচ খুলে হালকা হেসে আমাদের তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,,
“গাড়িতে উঠে পড়ো সবাই। আজ আমি তোমাদের অফিস পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি।”
আমি কিছু বললাম না। কেবল বিরক্তি নিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। লামিয়া আমতা আমতা করে উনাকে বলল,,,,
“না মিঃ মেহুল। আপনি যান। আমরা যেতে পারব।”
“কোনো কথা না শুনব না আমি লামিয়া। প্রতিদিন আমি তোমাদের ঠিক এভাবে অফিসে নিয়ে যাবো। ফেরার পথে আবার অফিস থেকে পিক করে আনব।”
আমি উনার কথাগুলোকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লামিয়াকে বললাম,,
“তাড়াতাড়ি রিকশা খোঁজ লামিয়া। পনেরো মিনিটের মধ্যে আমাদের অফিসে পৌঁছাতে হবে।”
মেহুল হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। হাত দুটো প্যান্টের পকেটে গুজে উনি বেশ ভাব নিয়ে আমাকে বললেন,,,
“ওকে ফাইন। আমি এখানে গাড়ি নিয়ে পনেরো মিনিট অপেক্ষা করছি। যদি এর মধ্যে তোমরা রিকশা পেয়ে যাও তাহলে রিকশাতে উঠে যাবে, আর যদি রিকশা না পাও তাহলে কিন্তু আমার গাড়ি করেই অফিসে যেতে হবে!”
আমি বেশ ঝাঁঝিয়ে উনাকে বললাম,,,
“আমরা আপনার গাড়িতে কিছুতেই উঠব না৷ বুঝেছেন আপনি?”
উনি দু কানে হাত দিয়ে পিটপিট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“বাপরে বাপ৷ কানের পর্দা ফাটিঁয়ে দিলে। আমি তো বন্ধু হিসেবে একটা চুক্তি করতে এসেছিলাম। চুক্তিটা নিতান্তই তোমাদের ভালোর জন্য৷”
“আমাদের ভালো আপনার করতে হবে না৷ গাড়ি নিয়ে সাইডে যান।”
লামিয়া আমার হাত চেঁপে ধরে আমতা আমতা করে মেহুলকে বলল,,,
“মিঃ মেহুল আমরা রাজি আপনার চুক্তিতে। রিকশা না পেলে আমরা আপনার গাড়িতে করেই অফিসে যাবো।”
আমি দাঁত কিড়মিড়িয়ে লামিয়ার দিকে তাকালাম। লামিয়া আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,,,
“একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছিস তুই। তোর এই অহেতুক জেদের জন্য আজ আমাদের অফিস কামাই করতে হবে।”
আমি ও লামিয়ার কানে ফিসফিসিয়ে বললাম,,
“মোটে ও অফিস কামাই করতে হবে না। প্রতিদিন কিন্তু আমরা এই সময়ে রিকশা পেয়ে যাই। আজ ও ঠিক পেয়ে যাবো। একটু ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা কর।”
মেহুল গাড়ির সাথে ঢ্যাশ দিয়ে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,,,
“সময় শুরু হয়ে গেছে তোমাদের। এই মুহূর্ত থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যে যদি তোমরা রিকশা না পাও তাহলে আমার গাড়িতে করেই তোমাদের অফিসে যেতে হবে।”
আমি লামিয়ার পাশ থেকে সরে এসে রাস্তার সাইডে দাঁড়ালাম। একটা খালি রিকশার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি আমি। কিছুতেই যেনো সেই কাঙ্ক্ষিত রিকশাটি আমার চোখে দৃশ্যমান হচ্ছে না। প্রতিটা রিকশাই ফুল। মাঝে মাঝে দু একটা অটো, সি.এন.জি আসছে। দুভার্গ্যবশত সমস্ত গাড়িই আজ রিজার্ভ। বিরক্তি আস্তে ধীরে তিক্ততায় পরিণত হচ্ছে। ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছি আমি। ঐ দিকে মেহুল ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে প্রত্যেকটা মিনিটকে কাউন্ট করে যাচ্ছেন। এভাবে প্রায় দশ মিনিট কেটে গেলো। মেহুল এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,,,
“রূপা দশ মিনিট কিন্তু অলরেডি পেরিয়ে গেছে। তোমার হাতে আর মাএ পাঁচ মিনিট আছে।”
আমি বিরক্তি নিয়ে উনার দিকে তাকালাম। উনি এক ভ্রু উঁচিয়ে বাঁকা হেসে আমার দিকে তাকালেন। উনার থেকে চোখ সরিয়ে আমি রাস্তার ডান পাশে তাকাতেই একটা খালি রিকশা দেখতে পেলাম। অমনি খুশিতে আত্নাহারা হয়ে আমি লামিয়া আর নীলার দিকে তাকিয়ে বললাম,,,
“এই লামু, নীলু রিকশা পেয়ে গেছি আমরা।”
অমনি মেহুল হুড়মুড়িয়ে গাড়ি থেকে সরে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। আমি মুখটা বাঁকিয়ে উনার থেকে চোখ সরিয়ে রিকশা ওয়ালাকে ডেকে বললাম,,,
“মামা যাবেন?”
কি হলো জানি না রিকশা ওয়ালা হঠাৎ শুকনো ঢোক গিলে মেহুলের থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“যামু না আফা। অন্য রিকশা খুঁজেন।”
মুহূর্তের মধ্যে রিকশা ওয়ালা আমার সামনে থেকে রিকশা নিয়ে প্রস্থান নিলেন। আমি চোখ ঘুড়িয়ে মেহুলের দিকে তাকালাম। মেহুল বাঁকা হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“সময় কিন্তু শেষ। তোমাকে এখন আমার গাড়িতেই উঠতে হবে।”
আমি চোখ লাল করে মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,,,
“রিকশা ওয়ালাকে আপনি কি বলে তাড়িয়েছেন?”
মেহুলের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশান দেখে মনে হচ্ছে উনি মাএ আকাশ থেকে নেমেছেন। কিছুই বুঝতে পারছেন না। একদম ভাঁজা মাছটা উল্টে খেতে জানেন না। ভোলাভালা ফেইস করে উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“আজব তো৷ আমি কখন রিকশাওয়ালার সাথে কথা বললাম? আমি তো তোমার পাশেই চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
“তাহলে রিকশাওয়ালা আপনার দিকে তাকিয়ে আমার মুখের উপর না করে দিলেন কেনো? বলুন কেনো?”
উনি আবারো প্যান্টের পকেটে হাত গুজে ভাবলেসহীন ভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে আমাকে বললেন,,,
“তুমি আমাকে অযথাই সন্দেহ করছ রূপা। আই থিংক চুক্তিতে হেরে হওয়ার কারণে তুমি ইচ্ছে করে আমার সাথে সিনক্রিয়েট করছ।”
“আমি অযথা সিনক্রিয়েট করছি না মেহুল। আপনি আমাকে সিনক্রিয়েট করতে বাধ্য করছেন। আপনি কেনো এভাবে আমাদের পিছনে আঠার মতো লেগে আছেন বলুন?”
উনি কিছুটা সিরিয়াস হয়ে আমার আরেকটু কাছে এগিয়ে এসে বললেন,,,
“তুমি আমাকে মন থেকে ফ্রেন্ড হিসেবে মানতে পারছ না রূপা। তাই আমার ফ্রেন্ডলি কেয়ারিংটা তোমার চোখে পড়ছে না। ফ্রেন্ডের মধ্যকার সুন্দর সম্পর্কটাকে তুমি অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছ। তাই হয়তো তোমার মধ্যে বিরক্তি আর অস্বস্তি কাজ করছে।”
আমি উনার থেকে চোখ সরিয়ে লামিয়া আর নীলার দিকে তাকালাম। দুজনই ইশারা করে আমাকে হাত জোর রিকুয়েস্ট করে বলছে ঝগড়া বন্ধ করে গাড়িতে উঠতে। আমি নিজেকে কিছুটা শান্ত করে মেহুলকে ক্রস করে উনার গাড়ির দরজা খুলে ব্যাক সিটে বসে পড়লাম। একে একে আমার পিছু পিছু লামিয়া আর নীলা ও ব্যাক সিটে বসে পড়ল। মেহুল বাঁকা হেসে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লেন। তাড়াহুড়ো করে উনি খনিকের মধ্যেই গাড়ি স্টার্ট করে দিলেন। খেয়াল করে দেখলাম উনি সিট বেল্ট পড়েন নি। আমি পিছন থেকে উনাকে চেঁচিয়ে বললাম,,,
“মেহুল সিট বেল্টটা পড়ুন।”
উনি গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে পিছু ফিরে মুখটা হা করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“ওহ্ মাই গড। তুমি আমাকে এই কথা বলছ রূপা তুমি? আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না। ফ্রেন্ড হিসেবে তুমি ও আমার খেয়াল রাখছ?”
“আমি প্রথম দিন থেকেই আপনাকে ফ্রেন্ড ভেবে আসছি। এতে এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই মেহুল। দয়া করে এখন সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়িটা চালান।”
উনি মৃদ্যু হেসে সিট বেল্টটা পড়ে ড্রাইভিংয়ে মনযোগ দিলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা অফিসের গেইটের সামনে এসে পৌঁছে গেলাম। মেহুলের থেকে বিদায় না নিয়েই আমি হম্বিতস্বি হয়ে অফিসের ভেতর ঢুকে পড়লাম। লামিয়া আর নীলাকে ও সাথে আনি নি। আমি একাই চলে এসেছি। অফিসের ম্যানেজার খুব কড়া। একটু দেরি করলেই ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডারের মতো কানের কাছে বকবক করতেই থাকে। যা আমার চরম অসহ্যকর লাগে।
,
,
কেটে গেলো প্রায় ছয়দিন। এই ছয় দিনে মেহুল রোজ নিয়ম করে আমাদের অফিসে আনা নেওয়া করতেন। ইদানিং উনি বকবক করা একদম কমিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কথা বলেন না। হয়তো বুঝতে পেরেছেন, উনার অহেতুক কথা বার্তায় আমি খুব বিরক্ত হই।
আজ বৃহস্পতিবার। হাফ ডে অফিস। সকাল থেকেই আকাশে মেঘ ধরে আছে। শ্রাবণ মাসের শুরু থেকেই প্রবল ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে৷ বৃষ্টির প্রকোপে বাড়ি থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। সকালে গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই অফিসে আসতে হয়েছে। লামিয়া আর নীলা কিছুক্ষণ আগেই অফিসের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে গেছে। আজ ওদের অফিসিয়াল কাজ আমার আগেই শেষ হয়ে গেছে৷ লামিয়া আর নীলা আমাকে একা ছেড়ে বাড়ি যেতে চাইছিলো না। আমিই ওদের জোর করে ঠেলে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে আছে। কাল নতুন ফ্ল্যাটে শিফট হতে হবে। তার উপর আবার ঘরের রান্না বান্না।
আমার কাজের জায়গাটা জানালার পাশেই। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। কম্পিউটার অন রেখেই আমি জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছি। খুব ইচ্ছে করছে বৃষ্টি গুলোকে একবার ছুঁয়ে দেখতে। বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটাকে হাতে নিয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়তে। কাজে কিছুতেই মন বসছে না আমার। ব্যাকুল হয়ে শুধু বৃষ্টির পাণে তাকিয়ে আছি, আকাশ জোড়া বৃষ্টি দেখছি,শত দল মেঘের ছুটাছুটি দেখছি, গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট পাখিদের বৃষ্টিতে ভেজার উল্লাস দেখছি, রাস্তায় বৃষ্টিবিলাসী লোকজনদের বৃষ্টিতে ভেজা উপভোগ করছি, রিকশার হুড খুলে বসে থাকা জোড়ায় জোড়ায় কাপলদের বৃষ্টিতে ভিজতে দেখছি, বৃষ্টিতে সিক্ত মাটির স্যাঁতস্যাঁত গন্ধকে নাকে অনুভব করছি। সব মিলিযে আমার এক্ষনি বাইরে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। বৃষ্টিতে ভিজে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুহাত প্রসারিত করতে মন চাইছে। ময়ূরদের মতো লাফিয়ে, ঝাঁপিউে নাচতে ইচ্ছে করছে।
আশেপাশের সব স্টাফরা খুব মনযোগ দিয়ে কাজ করছেন। পুরো অফিস জুড়ে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। শুধু জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ গুলো কানে বাজছে। অনেক স্টাফরা ম্যানেজারকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। আমি একটু একটু কাজ করে কিছুক্ষণ পর পর জানালার দিকে তাকাচ্ছি। কাজটা কিছুতেই মনযোগ সহকারে একেবারে শেষ করতে পারছি না। খামখেয়ালিপনায় ডুবে আছি। শেষ বারের মতো জানালার দিকে তাকিয়ে কম্পিউটারের দিকে তাকাতেই মনে হলো আমি মেহুলকে দেখেছি। অফিসের গেইটের সামনে গাড়ি নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা অবস্থায় আমি উনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। চোখে, মুখে বিস্ময় নিয়ে আমি আবারো জানালার দিকে তাকালাম। অমনি চোখ দুটো আমার অবিশ্বাস্যভাবে বড় হয়ে গেলো। সত্যি সত্যি মেহুল গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। তা ও আবার বৃষ্টিতে ভিজে। জানালা থেকে চোখ সরিয়ে আমি কোনো রকমে কাজ গুলো শেষ করে ম্যানেজারকে সমস্ত কাজ বুঝিয়ে আধ ঘন্টার মধ্যে অফিস থেকে বের হয়ে এলাম।
বৃষ্টিতে ভিজে আমি দৌঁড়ে গেইটের বাইরে চলে এলাম। ভেজা অবস্থায় মেহুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি এক নিশ্বাসে বললাম,,,
“আপনি এখানে কি করছেন মেহুল? আজ তো আমি আপনাকে আসতে বলি নি।”
ভেজা চুল গুলো উনি পেছনের দিকে টেনে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“এই রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফিরছিলাম। তাই ভাবলাম তোমাকে সাথে নিয়েই বাড়ি ফিরি।”
আমি বেশ সিরিয়াস হয়ে বললাম,,
“আমি এখন বাড়ি যাবো না। খুব বৃষ্টিতে ভিজব। এরপর বাড়ি যাবো। আপনি প্লিজ যেতে পারেন।”
উনি বুকেে উপর দু হাত গুজে আমার কাছাকাছি এগিয়ে এসে বললেন,,,
“ভাবছি আমি ও আজ বাড়ি যাবো না। ঝুম বৃষ্টিতে খুব ভিজব। তোমার সাথে বৃষ্টিবিলাসের সঙ্গি হয়ে!”
কাঁপা কাঁপা চোখে আমি উনার দিকে তাকিয়ে আছি। ভেজা অবস্থায় উনাকে হিমুর মতো শুভ্র, স্নিগ্ধ আর পবিএ লাগছে। উনার চোখে, মুখে এক ধরনের মায়া খুঁজে পাচ্ছি আমি। যে মায়াটাকে আমি দু বছর আগে ছেড়ে এসেছি। আজ হঠাৎ দু বছর পর ঐ মায়াটা আমাকে আবার জঘন্যভাবে তাড়া করছে। কিছুতেই যেনো উনার থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না আমি। আরো বেশি করে আকৃষ্ট হচ্ছি। কেনো জানি না, উনার মাঝে আমি হিমুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। হিমুকে আমার আশেপাশে অুনভব করছি। কেনো আমার এমন মনে হচ্ছে একটু ও বুঝতে পারছি না আমি!
এসব ভাবতেই চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে আমার। হিমুকে এক নজর দেখার জন্য চোখ দুটো তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে৷ বৃষ্টির পানির সাথে চোখের জল গুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মেহুল হঠাৎ চোখে, মুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ ফুটিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,,,,
“কি হলো রূপা? তুমি কাঁদছ কেনো?”
“আপনি কিভাবে বুঝলেন আমি কাঁদছি?”
উনি মাথা নিচু করে বললেন,,,
“জানি না। তবে আমি বুঝতে পারি।”
“বাড়ি ফিরে যান আপনি। আজ আমি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরব।”
উনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“আমি তোমাকে একা ছাড়ছি না রূপা। আমি ও তোমার সাথে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরব।”
“জেদ করবেন না মেহুল। আমাকে একা ছেড়ে দিন।”
কথাটা বলেই আমি উনাকে ক্রস করে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। অমনি উনি আমার ডান হাতটা পেছন থেকে টেনে ধরে বললেন,,,
“আমি তোমাকে আর কখনো একা ছাড়ব না রূপা। সবসময় ছায়া হয়ে তোমার পাশে থাকব। তুমি যেখানে যাবে আমি ঠিক তোমার পিছু পিছু সেখানেই যাবো।”
বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল আমার। মুহূর্তের মধ্যে গাঁয়ের লোম গুলো দাঁড়িয়ে উঠলো। দেহের প্রতিটা শিরা উপশিরা ফুলে ফেঁপে উঠল। উনার এই স্পর্শটা আমার খুব পরিচিত৷ মনে হচ্ছে হিমু আমার হাতটা চেঁপে ধরেছে। উত্তেজনায় আমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠছে। পিছু ফিরে আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,,,
“আপনার স্পর্শটা আমার এতো পরিচিত মনে হচ্ছে কেনো মেহুল?”
উনি নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“আমি তো এই প্রথমবার তোমাকে স্পর্শ করলাম রূপা। পরিচিত মনে হওয়ার কারণ?”
মাথাটা নিচু করে আমি এক ঝটকায় উনার থেকে হাতটা ছাড়িয়ে বললাম,,,
“আর কখনো আমাকে এভাবে স্পর্শ করবেন না মেহুল। আমার থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখবেন।”
“সব মেনে নিলাম। তবে কখনো একা ছাড়তে পারব না!”
“কেনো এমন করছেন মেহুল? কেনো আমাকে একা ছাড়তে চাইছেন না?”
“তুমি বুঝবে না রূপা। বুঝার হলে প্রথম দেখাতেই বুঝে নিতে!”
“কি বুঝি নি আমি মেহুল? দয়া করে একটু খোলসা করে বলবেন?”
উনি হঠাৎ মলিন হেসে বললেন,,,
“কিছু না। চলো আমরা হাঁটি।”
আমি নাক টেনে বললাম,,,
“গাড়িটার কি হবে?”
“তুমি চাইলে গাড়িতে করে আমরা একটা খোলা মাঠে যেতে পারি। যেখানে তুমি ইচ্ছে মতো বৃষ্টিকে উপভোগ করতে পারবে। কেউ তোমার দিকে তাকাবে না।”
“এখান থেকে কতোদূর?”
“বেশি দূর না। ধরো, এখন থেকে প্রায় দশ মিনিটের রাস্তা।”
“তাহলে চলুন।”
উনি মৃদ্যু হেসে গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। আমি ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটটায় বসে পড়লাম। মেহুল ড্রাইভিং সিটে বসে সিট বেল্ট লাগিয়ে গাড়িটা ছেড়ে দিলেন। আমি জানালার কাঁচ দিয়ে উড়ে আসা মেঘ গুলোকে দু হাতের মুঠোয় পুড়ে নিচ্ছি। মলিন হেসে বৃষ্টির পানি গুলোকে নিজেই নিজের চোখে, মুখে ছিটাচ্ছি। মেহুলের দিকে তাকাতেই দেখলাম উনি এক ধ্যানে সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভ করছেন৷ মাথায় শয়তানি বুদ্ধি এঁটে আমি বাঁকা হেসে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো হাতে নিয়ে মেহুলের চোখে, মুখে ছিটিয়ে দিলাম। অমনি মেহুল নাক, মুখ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। এক্কেবারে বাচ্চাদের মতো লাগছে উনাকে। উনার এই বাচ্চা বাচ্চা মুখ দেখে আমি হু হা করে হেসে দিলাম। অমনি মেহুল গাড়িটা থামিয়ে জানালা দিয়ে বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা হাতে নিয়ে খুব ক্ষুদ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“এবার তোমার পালা।”
বৃষ্টির ফোঁটা গুলো উনি আমার দিকে ছিঁটাতে নিলেই আমি হাসতে হাসতে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। মেহুল ও আমার পিছু পিছু গাড়ি থেকে নামছেন আর হেসে হেসে বলছেন,,,
“দাঁড়াও রূপা৷ কোথায় যাচ্ছ!”
আমি সামনে দৌঁড়াচ্ছি আর বলছি,,,
“কেউ একজন বলেছিলো বৃষ্টিতে খুব জোরে দৌঁড়াতে। বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতে। তাহলে নাকি দেহ, মন দুটোই প্রফুল্ল হয়ে উঠে।”
মেহুল প্রতি উত্তরে কি বললেন আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দে উনার কথা আমার কান অব্দি পৌঁছায় নি। সামনে দৌঁড়াতে গিয়ে ও আমি হুট করে থেমে গেলাম। পিটপিট চোখে রাস্তার দিকে তাকাতেই হুড খোলা রিকশায় আকাশকে দেখতে পেলাম! আকাশের পাশে একটা সুন্দুরী মেয়েকে ও দেখতে পেলাম!
#চলবে,,,,,🥱
#তুমি_আমারই_রবে
#বোনাস_পর্ব
#Nishat_Jahan_Raat (ছদ্মনাম)
মেহুল প্রতি উত্তরে কি বললেন আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দে উনার কথা আমার কান অব্দি পৌঁছায় নি। সামনে দৌঁড়াতে গিয়ে ও আমি হুট করে থেমে গেলাম। পিটপিট চোখে রাস্তার দিকে তাকাতেই হুড খোলা রিকশায় আকাশকে দেখতে পেলাম! আকাশের পাশে একটা সুন্দুরী মেয়েকে ও দেখতে পেলাম!
রিকশাটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার সামনে থেকে অনেকটা সামনে এগিয়ে গেলো। সম্মতি ফিরে আসতেই আমি অহেতুক রিকশাটার পেছনে ছুটছি আর জোরে জোরে চিৎকার করে বলছি,,,
“আকাকাকাকাশ। প্লিজ থামো। আমি রূপা বলছি। প্লিজ একবার পিছনে তাকাও।”
জানি না আকাশ আমার কথা শুনছে কি না। একবারের জন্যে ও সে পিছু ফিরে তাকাচ্ছে না। হয়তো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে আমার গলার আওয়াজ তার কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না। আমি ছুটছি রিকশার পিছনে। আর মেহুল ছুটছেন আমার পিছনে। উনি পিছন থেকে চিৎকার করে আমাকে ডেকে বলছেন,,,
“রূপা দাঁড়াও। আকাশ কে? তুমি কাকে ডাকছ?”
হেচকি তুলে কেঁদে আমি সামনের দিকে তাকাতেই দেখলাম রিকশাটা হাওয়া হয়ে গেলো। দু চোখে হতাশা নিয়ে আমি থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মেহুল হাঁফাতে হাঁফাতে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন,,,
“কি হয়েছে রূপা? তুমি কার পিছনে ছুটছিলে?”
চিৎকার করে কেঁদে আমি মেহুলকে বললাম,,,
“আকাশ চলে গেলো মেহুল। একবারের জন্যে ও পিছু ফিরে আমার দিকে তাকালো না।”
উনি আমাকে ঝাঁকিয়ে বললেন,,,
“আকাশ রে রূপা?”
“আকাশ আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড, মেহুল। আজ থেকে চার বছর আগে আকাশের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিলো!”
উনি আমার থেকে কিছুটা দূরে সরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললেন,,,
“মামামানে? আআআকাশ সত্যি তোমার এএক্স বয়ফ্রেন্ড ছিলো?”
“হুম মেহুল। আকাশ কথা দিয়ে কথা রাখে নি। আমাকে বিয়ে করতে আসে নি। সারা দিন আমি রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে চাতক পাখির মতো আকাশের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। রাতে হতাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে যখন আকাশের নাম্বারে কল করলাম তখন থেকে দুই বছর আগ পর্যন্ত আমি আকাশের নম্বরটা একটানা বন্ধ পেয়েছিলাম। একবারের জন্যে ও নাম্বারটা খোলা পাই নি।”
কাঁদতে কাঁদতে আমি মাটিতে হাঁটু গুজে বসে পড়লাম। মেহুল নিবার্ক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি নাক টেনে কেঁদে মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,,,
“আকাশ আমাকে ঠকিয়েছে, এতে আমার কোনো আপসোস নেই। তবে আকাশ কেনো আমাকে ঠকিয়েছিলো, কেনো ঐ দিন আমাকে বিয়ে করতে আসে নি শুধু এই প্রশ্নের উত্তর গুলোই আমি আকাশের থেকে জানতে চাই। এই কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর এখনো আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। ভিতরটাকে ভীষণভাবে যন্ত্রণা দেয়, জীবনের কাছে বার বার ঠকে যাওয়ার ব্যর্থতা গুলো মনে করিয়ে দেয়। বার বার নিজেকে নিজের কাছে হারিয়ে দেয়। এতো কষ্ট, যন্ত্রণা নিয়ে আমি বাঁচতে পারছি না মেহুল। আমার একটু শান্তি চাই, একটু সুখ চাই।”
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছি আমি। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে বুকটায়। মেহুল হঠাৎ হাঁটু গুজে আমার পাশে বসে উনার গাঁয়ের শার্টটা আমার গাঁয়ে জড়িয়ে দিয়ে বললেন,,,
“আকাশকে খুঁজে আনার দায়িত্ব আমার। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর তুমি খুব শীঘ্রই পাবে রূপা। এখন বাড়ি চলো। যে কোনো সময় বৃষ্টি থেকে ঝড়, তুফান হতে পারে।”
আমি পিটপিট চোখে উনার দিকে তাকালাম। গাঁয়ে আলাদা একটা টি শার্ট আছে উনার। উনি আমাকে চোখ দিয়ে ইশারা করে বললেন বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে। উনার শার্ট টা দুহাতে আঁকড়ে ধরে আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। উনি কাঁপা কাঁপা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“একটু হাঁটতে রূপা। গাড়িটা অনেক পিছনে পড়ে গেছে।”
আমি মাথা নাঁড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালাম। ফুটপাতের রাস্তা ধরে দুজন হেঁটে চলছি৷ দুজন খুব পাশাপাশি হাঁটলে ও একজন আরেকজনের গাঁয়ের সাথে লাগছি না। মেহুল নিচের দিকে তাকিয়ে এক ধ্যানে হেঁটে চলছেন। আমি কিছুক্ষণ পর পর আড়চোখে উনার দিকে তাকাচ্ছি। মুখটা খুব বিষন্ন হয়ে আছে উনার। কেনো জানি না মনে হচ্ছে উনি কাঁদছেন। নাক টেনে আমি উনাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,,,
“মেহুল? আপনি কাঁদছেন?”
সাথে সাথেই উনি মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে উনার। খুব বেশি লাল হয়ে আছে। আমি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,,,
“আপনার চোখ দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি খুব কেঁদেছেন মেহুল। কি হয়েছে আপনার বলুন তো?”
উনি হঠাৎ অট্ট হেসে বললেন,,,
“ছেলেরা কখনো কাঁদে না রূপা। তুমি ভুল দেখেছ।”
“তাহলে আপনার চোখ গুলো এমন লাল হয়ে আছে কেনো?”
“বললাম তো ছেলে রা কাঁদে না। তাদের চোখ থেকে জল পড়ে না। ভেতরে ভেতরে তারা গুমড়ে মরে, তাই বাইরে এর তীব্র প্রতিফলন দেখা যায়। আর এজন্যই হয়তো চোখ লাল হয়ে আছে।”
আমি উনার কথার আগা মাথা কিছু বুঝলাম না। তবে এটা বুঝতে পারছি উনি ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পাচ্ছেন। হয়তো কষ্টের কারণটা আমাকে বলতে চাইছেন না। কিছুদূর হাঁটার পর আমরা গাড়ির কাছে এসে পৌঁছে গেলাম। মেহুল গাড়ির দরজাটা খুলে দিলেন। আমি গাড়ির ভেতর ঢুকতেই মেহুল দরজাটা লাগিয়ে ঐ দিক দিয়ে ঘুড়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লেন। সিটবেল্ট লাগিয়ে উনি গাড়িটা ছেড়ে দিলেন। ব্যাক সিটে হেলান দিয়ে আমি সামনের দিকে তাকিয়ে কাঁচে লেগে থাকা বৃষ্টি গুলোকে দেখছি। চোখে জল নিয়ে কৌতুহল নিয়ে আমি মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,,,
“আপনি সত্যিই আকাশকে খুঁজে দিবেন মেহুল?”
“আকাশ যদি এই শহরেই থাকে কথা দিচ্ছি কয়েকদিনের মধ্যেই আমি আকাশকে খুঁজে তোমার মুখোমুখি এনে দাঁড় করাব।”
“সত্যিটা জানার পরই আমি আকাশকে মুক্ত করে দিবো। মন থেকে তাকে ক্ষমা করে দিবো। শুধু আমি একটা বারের জন্য সত্যিটা জানতে চাই।”
“সব জানতে পারবে রূপা। এই মেহুল তোমাকে সব সত্যি জানার সুযোগ করে দিবে। শুধু আমার উপর ভরসা রাখো আর ধৈর্য্য ধরো।”
আমি নাক টেনে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালাম। মেহুল হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে গলা জড়ানো কন্ঠে বললেন,,,
“শুধু একটাই রিকুয়েস্ট রূপা। আর কখনো, আমার সামনে তুমি এভাবে কাঁদবে না। নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না আমি। ইউ নো হোয়াট? আমার ভেতরটা ভেঙ্গে, চূড়ে আসে। একটা অদৃশ্য যন্ত্রণা হয় ভেতরটায়। তুমি হয়তো বুঝবে না রূপা!”
“আপনার কথার মাঝে আমি কেনো এতো টান খুঁজে পাই মেহুল? হারিয়ে যাওয়া কিছু অনুভূতি খুঁজে পাই। আপনি জানেন কেনো এমন হয়?”
উনি ঠোঁট দুটো চেঁপে ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাঁড়িয়ে না বুঝালেন। মনে হচ্ছে উনি কান্না চেঁপে আছেন। কেনো যেনো লোকটা আমার কাছে দিন দিন রহস্যময় হয়ে উঠছে। কিছু একটা অজানা সত্য উনার মাঝে লুকিয়ে আছে। যা আমি ধীরে ধীরে টের পাচ্ছি। তবে সঠিক ধরতে পারছি না।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই আমার হঠাৎ তীব্র ঠান্ডার অনুভূতি হলো। কিছুক্ষণ পর পর গাঁ টা কেঁপে কেঁপে উঠছে, গাঁয়ে থাকা ভেঁজা জামাটা বরফের মতো লাগছে। শরীরে মোটে ও জোর পাচ্ছি না। খুব দুর্বল লাগছে। হাত, পা নিস্তেজ হয়ে আসছে, মাথা টা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। বুঝতে পারছিলাম আমার জ্বর আসছে। আজ রাতেই হয়তো খুব ভয়াবহভাবে জ্বর উঠবে।
বাড়ির পার্কিং এরিয়ায় গাড়িটা পার্ক করে মেহুল গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন। আমি ও গাড়ির দরজা খুলে যেই না পা টা মাটিতে রাখতে যাবো অমনি আমার মাথাটা ঘুড়ে এলো। ছোট আওয়াজে “আহ্” করে আমি গাড়ির ব্যাক সিটে মাথাটা হেলিয়ে দিলাম। মেহুল জলদি দৌঁড়ে এসে আমাকে দুহাত দিয়ে ঝাপটে ধরে বললেন,,,
“কি হয়েছে রূপা? ব্যাথা পেয়েছ?”
আমি অস্পষ্ট স্বরে বললাম,,
“আমার মাথাটা খুব ঘুড়ছে মেহুল৷ প্লিজ আমাকে রুমে নিয়ে চলুন।”
মুহূর্তের মধ্যেই চোখ দুটো বুজে ফেললাম আমি। তবে টের পাচ্ছিলাম মেহুল আমাকে কোলে নিয়েছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় শক্তির মধ্যে শুধু আমার অনুভূতি শক্তিটাই জাগ্রত আছে। বাকি সব ঘুমিয়ে পড়েছে। আস্তে আস্তে অনুভূতি শক্তিটা ও আমার নুইয়ে পড়ছে। কিছুক্ষন পর সব শক্তি কাজ করা বন্ধ করে দিলো আমার। পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম আমি।
জানি না কতোক্ষন এভাবে অজ্ঞান ছিলাম। চোখ খুলতেই টের পেলাম আমি আমাদের ফ্ল্যাটে নেই৷ সফট ফোমের গদিতে শুয়ে আছি। পিটপিট চোখে আমি আশপাশটাতে ও চোখ বুলাচ্ছি। বুঝতে আর দেরি হলো না এটা মেহুলের রুম। একটু সামনে তাকাতেই দেখলাম মেহুল ভেঙ্গে চূড়ে, সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখতে উনাকে খুব বিষন্ন লাগছে। ছন্নছাড়া বৈরাগ্য একজন মানুষ। সাজানো গোছানো চুল গুলো লেপ্টে আছে, শার্টের বোতাম দুটো খোলা, ফর্সা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে, শার্টের হাতা গুলো ঝুলে আছে, চোখে, মুখে চিন্তার ছাপ, ভীষণ ক্লান্ত ও দেখাচ্ছে উনাকে। আমি মুখটা হা করে উনাকে কিছু বলার আগেই উনি আমার পাশে বসে আমার ডান হাতটা চেঁপে ধরে বললেন,,,
“আর কখনো বৃষ্টিতে ভিজবে না তুমি। ১০৩° জ্বর হয়েছে। এবার বুঝতে পারছ তো তোমার শরীর কতোটা খারাপ?”
কাঁপা কাঁপা চোখে আমি, আমার গাঁয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঐ সময়ের ড্রেসটা আমার গাঁয়ে আর নেই। অন্য একটা ড্রেস আমার গাঁয়ে। সাথে সাথেই আমি খানিক চেঁচিয়ে মেহুলকে বললাম,,
“মেহুল, আমার ড্রেস পাল্টেছে কে?”
“এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই রূপা। আমি তোমার ড্রেস পাল্টাই নি। লামিয়া এসে তোমার ড্রেস পাল্টে দিয়ে গেছে। এতোক্ষন সবাই এই রুমেই ছিলো। তোমার জ্ঞান ফেরার কিছুক্ষন আগেই ওরা রুম থেকে বের হয়ে গেছে।”
মেহুল এখনো আমার হাত ধরে বসে আছেন। খুব অস্বস্তি হচ্ছে আমার। আমি এক ঝটকায় উনার থেকে হাতটা সরিয়ে মাথায় হাত দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উনাকে বললাম,,,
“এভাবে হুটহাট আমার গাঁয়ে হাত দিবেন না মেহুল৷ “আমি বিবাহিত।” বিবাহিত মহিলাদের গাঁয়ে এভাবে হুটহাট হাত দেওয়া যায় না।”
কি হলো বুঝলাম না। মেহুল হঠাৎ হালকা হেসে বললেন,,,
“কি বললে আবার বলো?”
“আমি বিবাহিত মেহুল।”
মুহূর্তের মধ্যে উনি মুখটা কালো করে বসা থেকে উঠে আমার থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে বললেন,,,
“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না রূপা, তুমি বিবাহিত!”
“সত্যি বলছি মেহুল, আমি বিবাহিত।”
“আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না রূপা। তুমি মিথ্যে বলছ!”
“এক সত্যি, দুই সত্যি, তিন সত্যি মেহুল। আমি সত্যি বিবাহিত। আমার হাজবেন্ডের নাম হিমু! আমি একটু ও মিথ্যে বলছি না।”
চোখে জল নিয়ে মেহুল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“কিন্তু হিমু তো তোমার বন্ধু ছিলো!”
“বন্ধু + স্বামী ছিলো।”
“তাহলে, আগে বললে না কেনো তুমি বিবাহিত? হিমু তোমার হাজবেন্ড?”
“কারণ, আমার তরফ থেকেই কেবল হিমু আমার হাজবেন্ড ছিলো এবং আছে। উনার তরফ থেকে আমি নার্থিং। কিছু ছিলাম না। না কখনো হবো!”
উনি হঠাৎ ঘাঁড়ের রগ গুলো টান টান করে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে লাইটার দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে সমানে সিগারেটটা ফুঁকছেন আর আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন,,
“তোমার হাজবেন্ড এখন কোথায় রূপা?”
“কিচ্ছু জানি না আমি। উনার ব্যাপারে আমি কিচ্ছু জানি না।”
“না জানার কারণ? হাজবেন্ডের খোঁজ খবর রাখো না তুমি?”
“প্রয়োজন নেই আমার উনার খোঁজ খবর রাখার। কারণ, দুই বছর আগেই আমি উনাকে ছেড়ে এসেছি।”
“কেনো ছেড়ে এলো? কি কারণে? তোমার হাজবেন্ড তোমাকে কষ্ট দিতো?”
আমি খুব জোরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,,,
“আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে মেহুল। এসব বিষয় নিয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে চাইছি না।”
উনি সিগারেটটা টানতে টানতে বেডের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ক্ষীপ্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“এই বিষয়ে তোমার কথা বলতেই হবে রূপা। বলো, কেনো তুমি তোমার হাজবেন্ডকে ছেড়ে এলে?”
“বললাম তো আমি এই বিষয় নিয়ে কোনো বলতে চাই না। মাথায় যন্ত্রণা হয় আমার। ভেতরটা কষ্টে ফেঁটে যায়।”
চোখে ভাসা ভাসা জল নিয়ে উনি শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“কেনো কষ্ট হয় তোমার? এখনো ভালোবাসো হিমুকে?”
কিছু বললাম না আমি৷ উনার চোখের দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছি। হঠাৎ আমার চোখ গেলো মেহুলের সিগারেট খাওয়ার দিকে। আমি টলটল চোখে উনার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,,,
“আপনি বাম হাতে সিগারেট খাচ্ছেন মেহুল? হিমু ও সবসময় বাম হাতে সিগারোট খেতো!”
উনি তাড়াহুড়ো করে ডান হাতে সিগারেটটা নিয়ে চোখ লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“হিমু নামটার প্রতি আমার খুব হিংসে হচ্ছে রূপা। প্লিজ এই নামটা আর ভুলে ও আমার সামনে উচ্চারণ করবে না।”
হনহনিয়ে উনি রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। কৌতুহল নিয়ে আমি উনার যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছি৷ উনাকে একটু ও বুঝতে পারছি না আমি। এই মুহূর্তে উনাকে সম্পূর্ণ হিমুর মতো লাগছে আমার। রাগলে হিমুকে যেমন দেখাতো উনাকে ও ঠিক তেমন দেখাচ্ছে৷ তবে এটাই বুঝতে পারলাম না, হিমুর নাম শুনে কেনো উনার হিংসে হচ্ছে!
#চলবে…..🥴