তুমি আমার সেই প্রিয়শী পর্ব-০৬

0
222

#তুমি_আমার_সেই_প্রিয়শী
লেখিকা:#শ্যামলী_রহমান
পর্ব:#৬

তপ্ত দুপুরে কাঠফাটা রোদের মধ্যে কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাফিয়া অপেক্ষা করছে রোহানের আসার জন্য কিন্তু তার কোনো পাত্তা নেই অথচ এই রোদে দাঁড়িয়ে থেকে বেহাল অবস্থা পুরো শরীর ঘেমে শেষ নিজের গাঁ থেকে ঘামের বিচ্ছিরি গন্ধে নাক সিটকে নেয়। আর কত সময় এই রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবো? আশে পাশে ছায়া জায়গাও নেই ওপাশে গাছ থাকলেও কয়েকটা ছেলে বসে আছে বিধায় এখানে থাকতে হচ্ছে।
কলেজ থেকে বেরিয়ে আরো এক ঘন্টা হয়ে গেল রোহানের আসার নাম নেই এবার রাফিয়া বিরক্ত হয় নিজের উপর কেন যে বোকার মতো অপেক্ষা করছি উনার আসার হলে নিশ্চয়ই এতোক্ষণে আসতো।
আসবেন না যখন অপেক্ষা করতে বললো কেন?আর আমিও বোকা পাখির মতো উনার পথ চেয়ে বসে আছি।

ভালোবাসা পাবার আশায় আমি থাকি চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থাকি,
অথচ অপরজন ভালোবাসা দিবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।

এমনটায় হয়তো নিয়তির খেলা তবে আজ সে অপেক্ষার শেষ করছি যে মানুষটার কাছে অপর মানুষটার অপেক্ষার মূল্য নেই তার কাছে ভালোবাসা পেতে চাওয়া বোকামি ছাড়া কিছু না।

হাজারো কষ্ট, অভিমান মনের মধ্যে জমা করে কান্না ভেজা চোখে বাসার পথে রওনা দেয়।

এদিকে হুট করে রোহানের জরুরি মিটিং পড়ায় দুপুরেই ঢাকায় চলে যেতে হয়েছে। রোহানের কাছো রাফিয়ার নাম্বার না থাকায় জানাতেও পারেনি এজন্য রোহানের মনে চিন্তার ছাপ যদি ভুল বুঝে।

মিস্টার রোহান আপনি কি শুনছেন?

রোহান হকচকিয়ে ওঠে মিটিং রুমে রাফিয়ার কথা মাথায় ঘুরছিলো ও কি ভাববে না ভাববে।
জ্বী স্যার আমি শুনছি।

আপনাকে অমনোযোগী মনে হলো তাই বললাম মিটিংয়ের মধ্যে অমনোযোগী হওয়া যাবে না ভালো ভাবে মিটিং এটেন্ট করুন প্লিজ।

সরি স্যার আর এরকম হবে না আপনি শুরু করুন।রোহান আপাতত সব চিন্তা বাদ দিয়ে মিটিংয়ে মনযোগ দেয়।

রিশাদ অফিসে বসে মনযোগ দিয়ে কাজ করছিলো তখনি সুইটি দরজায় নক করে। মে আই কামিং স্যার?
এখন জোর করে স্যার বলাচ্ছো তো বলাও আর কয়দদিন গেলে বউ হয়ে কি করে দেখবে শুধু আংকেলকে হাত করে ফেলেছি অপেক্ষা করো বাছাধন। ( মনে মনে)

ইয়েস কাম ইন।

স্যার আপনার জন্য কফি বানিয়ে আনলাম।

নো থ্যাংকস আমি এখন আর কফি খাবো না এখন আমি বাসায় যাবো।

কিন্তু স্যার অফিস তো আরো পরে ছুটি হবে আপনি গেলে কি করে হবে?

রিশাদ বিরক্ত চাহনিতে তাকায়,
তোমরা আছো কি করতে?আমার কাজ শেষ আমি যাচ্ছি তার কৈফিয়ত নিশ্চয়ই তোমাকে দিবো না।

আমি ঠিক ওভাবে বলিনি।

সানোয়ার আংকেল?

জ্বী বাবা বলো?

আংকেল আমি এখন যাচ্ছি আমার কিছু কাজ আছে আপনি এদিকটা সামলে নিয়েন।

আচ্ছা বাবা তুমি চিন্তা করো না আমি সামলে নিবো বলে চলে গেল।

রিশাদ যেতে পা বাড়ায় পিছন থেকে সুইটি ডাক দেয়।
আমাকে একটু বাসার সামনে নামিয়ে দিয়েন প্লিজ।

রিশাদ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে তুমি কোথায় যাচ্ছো?

কেন স্যার বাসায় যাচ্ছি।

মানেটা কি? তুমি কেন বাসায় যাবে?

আপনি যাচ্ছেন আমি থেকে কি করবো?

তুমি থেকে কি করবে মানে তুমি কাজ করবে। আমি যখন ইচ্ছে যাই আমার সাথে কি তোমার সাথ? এখানে কি বলা হয়েছে বসের সাথে চিপকে থাকতে নাকি কাজ করতে?

কালকের জন্য সকল ফাইল চেক করে বাহির করে রেডি করে তার পর সবার সাথে বাসায় যাবে।
আমি আগেই বলেছিলাম কাজ করার মানসিকতা না থাকলে আসতে হবে না।

রাগে হনহন করে বেরিয়ে যায় অফিসের নিচে গাড়ির কাছে আসতেই আকাশ ফোন দেয়।
রিসিভ করতে ওপাশ থেকে বলে কই আছিস তুই?

আমি অফিস থেকে বাসায় যাবো ভাবছিলাম গিয়ে ফোন দিবো তুই ঢাকা থেকে আসছিস?

মাত্র আসলাম কিন্তু একটা ঘটনা হয়ে গেছে।

কি হয়েছে?

ঢাকা থেকে এসেই শুনি স্কুলের পাশের জমিটা নাকি মিজানুর চৌধুরী পাবে উনার লোকরা দখল করতে আসছে।

উনাদের কাছে লিগ্যাল নোটিস আছে দেখেছিস?

আমি গিয়েছিলাম কিন্তু ওরা বললো নোটিস আছে যাকে দেখার তাকে দেখাবে আমি কে দেখার বলতেছে।

আচ্ছা ঠিক আছে তুই অপেক্ষা কর আমি আসছি।
কল কেটে দিয়ে গাড়ি স্টাট করে স্পিডে চালিয়ে আসছে।

প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে রিশাদ সেখানে উপস্থিত হয় রিশাদ কে দেখে আকাশ এগিয়ে আসে সাথে রয়েছে আরো কিছু ছেলে।

চেয়ারম্যান সাহেব আপনি নাকি বলছেন এ জায়গা আপনার?

রিশাদের কথা শুনে পিছনে তাকায় মিজানুর চৌধুরী,
এসে গেছো তাই তো ভাবছিলাম এখনো এলো না কেন গুন্ডামী করতে তোমার অপেক্ষা করছিলাম।

হাহ মানুষের উপকার করা যদি গুন্ডামী হয় তাহলে তাই করে যাবো সারাজীবন আর আপনার মতো শত্রু পক্ষ হলে তো খেলায় বেশ মজা আছে।

তোমার মতো বেয়াদব ছেলের সাথে কথা বলতে চাইছি না আমার জায়গা আমি দখল করতে আসছি তোমার কি?

লিগ্যাল নোটিস দেখান চলে যাচ্ছি। আমিও দেখি খেলার মাঠ দখলের জন্য কে আপনাকে নোটিশ দিলো।

মিজানুর চৌধুরী তার লোককে বলে,
এই খোরশেদ কাজটা দেখা তো চলে যাক আমার আবার কারো ঘেউ ঘেউ শুনতে ভালো লাগে না।

খোরশেদ কাগজটা কাঁপা কাঁপা হাতে রিশাদের কাছে দেয় সবাই ওকে একটু ভয় পায়।

দু’মিনিট হলো রিশাদ কাগজটা দেখছে।

কি হলো কিছু বলার ভাষা পাচ্ছো না? ইস রে ঘেউ ঘেউ বন্ধ হলো?

রিশাদ বাঁকা হাসে।
কি যে বলেন চেয়ারম্যান সাহেব আমি ঘেউ ঘেউ না বাঘের মতো গর্জন করতে জানি আর সে গর্জন এখন শুরু হবে যদি আপনি এখনি এখান থেকে চলে না যান।

চলে যাবো মানে?নোটিশ কি পড়ে দেখোনি?

আমি তো পড়ে দেখেছি আপনি নিশ্চয়ই ভালো করে পড়ে দেখেননি। এটা নকল নোটিশ ভালো করে পড়ে দেখুন।

মিজানুর চৌধুরী কাগজা হাতে নেয় ভালো করে দেখে বুঝতে পারে সত্যি তো এটা নকল। খোরশেদ এটা কি দেখছি নকল নোটিশ কেন?

না মানে স্যার আসল নোটিশ কোনো ভাবে পাওয়া যাবে না তাই…?

গালে থাপ্পড় মারে বলে,
নকল নোটিশ এনে আমার মান সম্মান ডোবালি এজন্য তোকে টাকা দেই।

কি হলো চেয়ারম্যান সাহেব ওকে মারছেন কেন?
এবার বুঝতে পারলেন তো কার ঘেউ ঘেউ বন্ধ হলো।

রিশাদের কথায় স্পষ্ট অপমান ইঙ্গিত কিন্তু কিছু বলার নেই রাগে অপমানে সেখান থেকে চলে আসে।

আকাশ রিশাদের কাছে আসে।
তুই যে চেয়ারম্যানের সাথে শত্রুতা বাড়াচ্ছিস পরে কি হবে ভাবতে পারছিস?উনি এমনিতেও তোকে পছন্দ করেননা রুহিকে ভালোবাসিস জানতে পারলে জীবনেও দিবেন না।

না দিলে না দিবে। রিশাদ মির্জা তার জিনিস নিজের কি করে নিতে হয় সেটা জানে।
আর সেখানে যদি সেই জিনিস নিজে আসতে চায় তাহলে তাহলে তো কথাই নেই।

কিন্তু তোর পরিবার ও তো মেনে নিবে না বিশেষ করে তোর বাবা।

সেটা আমি বুঝে নিবো আর একটা কথা মিজানুর চৌধুরী ওতোটাও খারাপ না কিন্তু উনাকে কেউ আমার বাবা আর আমার বিরুদ্ধে উস্কায় কে সেটা খুঁজে বাহির করতে হবে।
সাথে প্রথম শত্রুতার কারণটাও শেষ করতে হবে।
এতো রহস্যের বেড়াজাল থেকে বের যে কবে হবে। খোলাখুলি ভাবে সব না জানলেও আব্বু আম্মুর মুখে চুপ করে অল্প সল্প শুনেছি।
তবে খোঁজ লাগিয়েছি খুব শিগগিরই সব খবর পাবো।

এখন বাজে রাত দশটা একটু আগে রুহি রাফিয়াকে ফোন করেছিলো।

কি রে ফোন দিয়েছিলাম ধরলি না ভাবলাম ক্লাস করছিস তাই ধরিসনি কিন্তু পরেও আর কল ব্যাক করলি না যে?

সরি মনে ছিলো না রোদের মধ্যে অবস্থা খারাপ ভালো লাগছিলো না তাই কল করতে পারিনি।

কি হয়েছে তোর গলাটা এমন লাগছে কেন?
মন খারাপ নাকি শরীর খাবাপ কথা গুলো কেমন লাগছে কোনো বিষয় নিয়ে আপসেট?

আরে না তেমন কিছু না একটু আগে ঘুম থেকে ওঠলাম এজন্য এমন শুনচ্ছে।
রাফিয়া মিথ্যা বললো তাছাড়া কি বলবে তোর ভাইকে ভালোবেসে এই অবস্থা।

শোননা রাফিয়া তোকে পরে কল করছি ভাইয়া ফোন করছে ধরি নয়তো বলবে কার সাথে কথা বললাম।

তোর ভাই বাসায় নেই? প্রশ্ন করার আগে রুহি ফোন কেটে দেয় বিধায় শুনতে পায় না।

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দূর পান্তে তাকিয়ে ভাবছে জীবন এমন কেন?
তাকে যদি পাওয়া সহজ হতো তাহলে জীবনে এমন বিষাক্ততা না হয়ে সুন্দর হতো।
থাকতো না কোনো না পাওয়াী যন্ত্রণা।

ফোনের রিংটনে পাশ ফিরে চায় ফোনটা পাশে মোড়ায় রাখা অপরিচিত নাম্বার জ্বলজ্বল করছে কিন্তু ওর মুড নেই ধরার দুইবার বেজে কেটে যায় তৃতীয় বার কল আসলে বিরক্ত হয়ে ধরে।
কি সমস্যা ফোন ধরছিনা দেখছেন তো তার পর ও বার বার কল দিচ্ছেন কেন?আপনার কি কোনো কাজ নেই?

জ্বী কাজ আছে কালকে তবে এখন আপাততঃ কাজ হলো কারো অভিমান ভাঙানো।

রোহানের কন্ঠ শুনে রাফিয়ার কথা থেমে যায় চুপ করে শোনে।

এক্সট্রিমলি সরি আমি যেতে চেয়ে যেতে পারিনি।

আপনাকো সরি বলতে হবে না। আপনার সময়ের কত মূল্য আমার মতো কারো জন্য সেই সময় নষ্ট করার দরকার নেই আমি বোকা তাই অপেক্ষা করছিলাম।

ভালোবাসলে অপেক্ষা করতে হয় আর একটু আধটু বোকা হলে ক্ষতি নেই।

আপনার সাথে কথা বলার মুড নেই রাখি?

আরে শোনো তো আমার জরুরি একটা মিটিং পড়ায় দুপুরেই ঢাকায় আসতে হয় এজন্য যেতে পারিনি তোমাকে জানাতে পারিনি কারণ তোমার নাম্বার ছিলো না একটু আগে রুহির থেকে নিয়ে কল করলাম।
আমার দিকটা বুঝো একটু অভিমান দূরে রাখো ফিরে আসবো তিনদিন পর কথা দিলাম এসে সমস্ত অভিমান মুছে যাবে বলে দিবো হৃদয়ের অব্যক্ত কথা।

শত কিলোমিটার দূরে থাকলেও অনুভব করতে পারছি। না দেখে থাকতে হবে কয়দিন।

আপনি তো আগেও দেখে থেকেছেন?

আমি দেখি না কি করি সে খরব কি পাও?সেটা শুধু আমার হৃদয় আর তৃষ্ণীত চোখ জানে। একদিন না দেখেই যে অবস্থা,

দূরত্বের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, মনে হয় সময় থেমে গেছে,
তৃষ্ণায় বুক চিরে ওঠছে, তোমার স্মৃতি যেন নদীর স্রোত। মনে হচ্ছে চোখের সামনে তুমি, অথচ হাতের নাগাল থেকে দূরে,
ভালোবাসার এই নীরবতা, কতটা কষ্ট নিয়ে আসে।

কখনও মুখ ফুটে বলতে ইচ্ছে করে,
তবে ভয়, যেন শব্দগুলো হারিয়ে যায় হাওয়ায়।
তবুও, এই অন্তরে পুষে রাখা ভালোবাসা,
একদিন নিশ্চয়ই প্রজ্বলিত হবে,
যখন বলব— “ভালোবাসি।”

চলবে………….?