তুমি আমার সেই প্রিয়শী পর্ব-০৯

0
197

#তুমি_আমার_সেই_প্রিয়শী
লেখিকা#শ্যামলী_রহমান
পর্ব:৯

কলেজ সবে ছুটি দিয়েছে রুহি আর রাফিয়া হেঁটে কলেজ থেকে বাহির হয়ে আসছে। রুহির মখে গম্ভীর ভাব যেন মন খারাপে বাসা বেঁধেছে, কারণটা হলো রিশাদের সাথে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা নিয়ে। সকালে রাগের কারন সব সেদিনের বলা শত্রুর মেয়েকে বিয়ে করবে কে?
যতই রাগ দেখাই এই আমাকে তোরে বিয়ে করতে হবে তবে রাগ ততদিন পর্যন্ত থাকবে যতদিন না মিস্টার রিশাদ মির্জা নিজে মুখে বলবে ভালোবাসি এবং তোমাকেই বিয়ে করবো।
অন্য দিকে রাফিয়ার মুখে হাঁসি,মন ফুরফুরে কারণ আজকে রোহানের সাথে দেখা হবে, কথা হবে।

দুজনের গন্তব্য বাসার দিকে রুহি এক রিকশায় ওঠে পড়লো রাফিয়াকে আর একটা রিকশা ডেকে ওঠতে বলছে।

রাফিয়া পড়েছে মহা ঝামেলায় ওর তো যাওয়া যাবে না রোহান তো এখান থেকে নিয়ে যাবেন বলেছিলেন এখন রুহিকে কি বলি?সত্যিটা উনি বলতে নিষেধ করেছেন। কি করি? কি করি?
ভাবতেই বুদ্ধি পেল।

“রুহি তুই যা আমি একটু পর যাবো ভাইয়া কেবল মেসেজ দিলো আমায় নিতে আসবে।

‘রুহি বাঁকা চোখে তাকায় একবার ভাবে আমিও থেকে যাই? তার পর ভাবে না উনারে দেখার জন্য আর বেহায়াপনা করবো না। সব সময় আমি কেন ভালোবাসবো? আমি কেন দেখতে ছুটে যাবো?উনি ভালোবাসলে নিজে দেখতে ছুটে আসবেন,নিজেকে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। সেদিন আমিও নিজেকে ধরা দিবো আবারো শুরু করবো বেহায়াপনা।

অনেকে বলে, ভাবে মেয়ে মানুষের এতো বেহায়াপনা করতে নেই,
কিন্তু আমি বলি ভালোবাসলে একটু বেহায়া হতে হয়,নয়তো ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া যায় না।
ভালোবাসে ছেলে মেয়ে উভয়ই তবে সব সময় ছেলেদের বেহায়া হওয়া মানায় মেয়েদের নয় কেন?
মেয়েরা কি ভালোবাসে না?
ভাবনা বদলাতে হবে ভালোবাসলে ছেলে মেয়ে দুজনকেই একে অপরকে পাওয়ার জন্য বেহায়া হতে হলেও তাই হতে হবে।
এখানে অবশ্যই দুজনের ভালোবাসা থাকা উচিত।

আম্মা আর কত সময় দাঁড় করিয়ে রাখবেন আপনি যদি না যান তাইলে নামেন আমি অন্য লোক ওঠাই।

রিকশা ওয়ালার কথায় ধ্যান ভাঙ্গে শুপ্ত কন্ঠে বলে,
দুঃখিত চাচা আপনি নিয়ে চলুন আমি দশটাকা ভাড়া বেশি দিয়ে দিবোনে।
রাফিয়া থাক গেলাম আর শোন রাতে কল দিবো কিছু কথা আছে।
রিকশা ছেড়ে দিছে তার পর ও চেঁচিয়ে বলা লাগবে এই মেয়েটা এতো বাচ্চামো করে।

রাফিয়া কলেজ গেট থেকে একটু দূরে একটা আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সময়টা দুপুর হলেও অন্যদিনের মতো আজকে রোদ, গরম কোনোটাই নেই। কালকে রাতে ভারী বর্ষনের কারণে প্রকৃতির তেজ নেতিয়ে শান্ত পরিবেশে মিলিয়েছে। আকাশটা একটু ভার ভার হয়তো বিকেলে বা রাতে আবারো বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির সময়টা বেশ ভালো লাগে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে আনন্দ, আর ঘুম তবে বৃষ্টির পানিতে কাঁদার শেতশেতে পথটা শুধু ভালো লাগে না।

গাড়ির ব্রেক কষার শব্দে রাফিয়া সামনের দিকে তাকায়।
রোহান গাড়ি থেকে বাহির হয়ে আসে।
গায়ের ড্রেস দেখে বুঝা যাচ্ছে হসপিটাল থেকে সোজা এসেছে।
এ লুকে রোহানকে দেখে রাফিয়ার পলক পড়ছে না সাদা ড্রেসে সবাইকে সুন্দর লাগে কিনা জানিনা তবে উনাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

রোহান সামনে এসে দাঁড়ায়। রাফিয়া কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখের সামনে তুড়ি বাজায়।
‘আমায় দেখা শেষ?

“রাফিয়া লজ্জা চোখ নামিয়ে নেয়। ছি ছি উনি কি ভাবছেন? আমি উনার দিকে বেহায়ার মতো তাকিয়ে ছিলাম ভাবলেও কেমন লাগছে। কিন্তু এতে আমার কি বা দোষ সে সুন্দর তাই চোখ ফেরাতে পারিনা অন্য কারো দিকে তো তাকাইনি।

‘লজ্জা পেতে হবে না আমাকে দেখতেই পারো তবে অন্য কাউকে নয়,
আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখছো, কাল যেন রুমে পাশাপাশি বসে খুব নিকটে থেকে আমাকে অনুভব করতে পারো সে সময়টা আনতে হবে।

রাফিয়া চট করে প্রশ্ন করে,
“কালকে টা কবে হবে? সে কালকে যে নিকটে নেই, আছে বহুদূর।

‘এখানে দাঁড়িয়ে করা বলা ঠিক হবে না কেউ দেখতে পেলে সমস্যা হবে।

” আপনি ভয় পান?

‘রোহান হাঁসে!
আমি ভয় পাই তবে নিজেকে নিয়ে নয়,
আমার মায়াবিনীর জন্য ভয় পাই।

এবার চলো আর কোনো কথা নয়। রোহান গাড়িতে বসে পড়লো রাফিয়া এসে পড়ে সামনে সিটে বসে। গাড়ি চলছে কিন্তু কথা নেই কারো মুখে গন্তব্য শেষ হলে কথার শুরু হবে এই ভেবে একজন অপেক্ষা করছে,
অন্য অপেক্ষার প্রহর শেষ করে ভালোবাসি কথাটা শোনার আশায় আছে।

রিশাদ ফোন করে আকাশকে ডাকে।
আজকে একবার অফিসে আসিস তো।

‘কেন? কিছু হয়েছে?

“হ্যাঁ কিছু কথা আছে আজ মনে হয় অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে পারবো না বাহিরের কাজ ও হবে না তাই তুই অফিসে আয়।

‘ঠিক আছে আসছি কিন্তু আংকেল যদি কিছু বলে? নস মানে আংকেল আমায় একটু কম পছন্দ করে কারণটা তো জানিস।

” কিছু বলবে না আমি আগেই বলেছি অফিস সামলাবো সাথে বাহিরে কাজ করবো যেখানে অন্যায় হবে রুখে দাঁড়াবো।

সুইটি অফিসে এসেছে কিছুক্ষণ আগে রিশাদ ওকে একটা ফাইল তৈরি করতে বসিয়ে দিয়েছে যাতে সামনে এসে মুড নষ্ট না করে।

রিশাদ কেবিনে বসে লেপটবে কাজ করছিলো তখনি আকাশ এসে ওর সামনে চেয়ারে বসে।

‘বল এখন কি বলবি?

রিশাদ লেপটাবে কাজ করতে করতে না তাকিয়ে উত্তর দেয়,
“পড়ালেখা তো শেষ আমার মতো কিছু করলি না অন্তত্য আংকেলের অফিসে বস আর বিয়েটা করে নে।

আকাশ বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,

‘তোকে কি আমার আব্বু আম্মুর আত্না ভর করেছে নাকি?
আব্বু বলে তার অফিসে বসতে আর আম্মু বলে বিয়ে করে বউ আনতে।

“ঠিকই বলেছে বলেছে বিয়েটা করে নে মৌরি মেয়েটা খারাপ নয় ভালোবাসলে ঠকবি না।

আকাশ রিশাদের মুখে মৌরির নাম শুনে একটু চমকায়।

” এতে চমকানোর কিছু নেই মেয়েটার সাথে কালকে আমার দেখা হয়েছিলো তখন সব বলেছে। মেয়েটা তোকে অনেক ভালোবাসে তুই বাসলে সমস্যা কি?সবাই তো আর রিংকির মতো হবে না। যতোটা বুঝেছি মেয়েটা তোকে অনেক ভালোবাসে। জীবনে সঠিক মানুষ এলে দ্বিতীয় বার সুযোগ দেওয়া উচিত।

‘তাহলে কি করতে বলছিস?আমার যে দ্বিতীয় বার ভালোবাসতে ভয় লাগে প্রথম বার কি হয়েছিল জানিস তো।

“আমি বলবো আংকেল আন্টিকে বলে বিয়ে করে নিবি অতীত ভুলে তাকে ভালোবাসবি।

‘আচ্ছা চেষ্টা করবো। এখন যাই আম্মু বিকেলে বাসায় যেতে বলেছে কি জানি কাজ আছে।
আকাশ বেরিয়ে গেল রিশাদ কাজে মনোযোগ দিলো।

গাড়ি থেমে যায় গন্তব্যে পৌঁছে গেছি আসতে প্রায় এক ঘন্টা লাগলো এখন সময় তিনটে দিশ মিনিট।
রাফিয়া আশে পাশে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করছে এটা আসলে কোথাই? সামনে তাকালে দেখতে পাচ্ছে গ্রামের কাঁচা রাস্তা তার আশে পাশে মাটির বাড়ি রয়েছে।
তার মানে এটা কোনো গ্রাম তবে দূর থেকে খুব সুন্দর দেখাছে।

রোহান রাফিয়ার কাছে আসে।

চলো আজকে গ্রামটা ঘুরি গ্রামের মেঠোপথে হাত হাত রেখে হেঁটে চলি।

তুমি কি অনুমতি দিবে হাত ধরার?রোহান হাত এগিয়ে দেয়।
রাফিয়া ধীরে ধীরে হাত এগিয়ে দেয় মিলত হয় দুটো হাতের বন্ধন।
রাফিয়া একটু কেঁপে ওঠে সাথে হদয়ে আনন্দের বন্যা। প্রথম হাত ধরার অনুভূতি হয়তো এটাই কিছুটা ভয় কিছুটা ভালোবাসা আর আনন্দ সব কিছুর সংমিশ্রণে তৈরি অনুভূতি।

রোহান রাফিয়ার মুখ পানে চায় কি স্নিগ্ধ সে মুখখানা দেখতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তার মায়ায় নিজেকে বাঁধতে ইচ্ছে করে তার কাছে নিজেকে শপে দিতে মন চায়।

“ভয় পেও না মায়াবিনী এই যে প্রথম হাত ধরলাম লাস্ট হাতটা আমার হাতে থাকবে কথা দিলাম।

‘রাফিয়া পাশে থাকা মানুষটার দিকে চায় তার কথায় অপার শান্তি মিলে প্রাণের ডগায়।

দুজন মানব মানবী হাত ধরে হাঁটছে গ্রামের শরু কাঁচা রাস্তায় আশে পাশে মানুষ জন তাদের কাজে ব্যস্ত কেউ বা মাঠের কাজে আবার কেউ বাসার কাজে। কয়েকটা ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা রাস্তার পাশে একটা ফাঁকা জায়গার খেলা করছে তাদের মুখে স্নিগ্ধ হাঁসি দূর থেকে রাফিয়া দেখছে।
” ছোট বেলাটা কত সুন্দর ছিলো তাই না?পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা বুঝতাম না দুঃখ কষ্টের সাথে পরিচিত ছিলাম তখন ছিলো শুধু মায়ের কাছে খেলতে যাওয়ার বায়না দুষ্টুমি করা, মা কে অকারণে জ্বালানো সেসব দিনগুলো ভালো ছিলো।

রোহান রাফিয়ার হাত ধরে পাশে থাকা বটগাছটার নিচে শেকড়ে বসে অতঃপর বলে,

‘শৈশব রঙিন ছিলো ঠিকই। আর জীবনে দুঃখ কষ্ট থাকবে সেসবে ভেঙে পড়লে চলবে না নিজেকে শক্ত করে এগিয়ে যেতে হবে।
উদাহরণ স্বরুপ ধরো,
তোমার আমার সম্পর্কে অনেক বাঁধা বিপত্তি আসবে তাহলে কি আমায় ছেড়ে দিবে?

রাফিয়া মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়।
‘কখনো না।

“তাহলে আমাদের ভালোবাসার জন্য লড়াই করতে হবে ঠিক তেমনি জীবনে বেঁচে থাকতে হলে বহু লড়াই, সংগ্রাম পেরিয়ে যেতে হবে তবেই জীবন সুন্দর।

‘এই যে আপনি বললেন আমাদের ভালোবাসা কিন্তু আপনি তো মুখে কখনো বলেননি ভালোবাসেন।

রোহান হাঁসে।
” মায়াবিনী ভালোবাসলে যে মুখে বলতে হবে সেরকম কোনো কথা আছে? অনুভবেও ভালোবাসা যায়। এই যে এখানে এসেছি হাত ধরে কথা দিয়েছি শেষ পর্যন্ত এই হাত ধরে রাখবো সেগুলো কি মিথ্যা মনে হচ্ছে? ভালো না বাসলে কি এমনি বলতাম।

‘ভালোবাসলে বার বার ভালোবাসি না বললেও একবার তো বলা যায় আপনি তো সেটাও বলেননি?

রোহান রাফিয়ার হাত ছেড়ে দেয় একটু নিকটে এসে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ভীষণ ভালোবাসি তোমায় মায়াবিনী,
পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্ত যেমন চিরন্তন সত্য, ঠিক তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা নিখুঁত সত্য।

ভালোবাসর মানুষের মুখে ভালোবাসি শোনার মধ্যে এক অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করে।
রাফিয়ার মনে তেমন আজ হাজারো সুখ পায়রা ধরা দিয়েছে। তবো চিরস্থায়ী সুখ পায়রা বাঁধা থাকবে তো? পাবো তো সারাজীবনের জন্য মানুষটাকে।

” বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে চলো বাসায় যাই নয়তো তোমার সমস্যা হবে। এই যে বাসায় দেরিতে যাবে এজন্য বোকা দিবে না?দেরির কারণ জানতে চাইলে কি বলবে?

‘আব্বু তো অফিসে ভাইয়া থাকবে না নিশ্চয়ই আম্মুকে বলবো রুহির সাথে এক জায়গায় গেছিলাম।

“রুহির সাথে ঘোরো তোমার আম্মু জেনে কিছু বলেনা?

‘না কিছু বলেনা তবে আব্বুর কানে যেন না যায় উনার সামনে লুকিয়ে থাকতে বলে।

“রোহানের মনে পড়ে যায় মির্জা বাড়িতে কত স্মৃতি কত গিয়েছে, ছোটবেলায় কত খেয়েছি থেকেছি রিশাদের সাথে আর আজ সম্পর্ক নেই। কেন নেই? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অস্পষ্ট আবছা এর উত্তর খুঁজতে হবে, জুড়তে হবে ভাঙা সম্পর্ক।

চলবে………………?