#তুমি_তাই
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ১০
নিলির বিষয়ে সব তথ্য বের করার দায়িত্ব জাহিদের ওপর দিয়েছ ছিলো রেজোয়ান। আশানুরূপ অনেক কিছুই বের করেছে জাহিদ। এই যেমন, নিলির স্বামী মুবিন মারা যাওয়ার পর তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন সম্পত্তি বিক্রি করে দেশের বাইরে সেটেল হয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে এখন আর নিলির কোন যোগাযোগ নেই, তিনবছর আগে পুলিশের গুলিতে নিলির ভাই নিহত হয়েছে ইত্যাদি নানারকম খোঁজখবর।
তাঁর মুখ থেকে সব শুনে গম্ভীর মুখে বসে রইলো রেজোয়ান। নিলি যে আর্থিক সংকটে আছে সেটা ও আগেই বুঝতে পেরেছিলো। এমনি এমনি তো আর তাঁর অফিসে চাকরী করতে আসে নি? তাও আবার সামান্য একটা ক্লার্কের চাকরী।
কিন্তু একটা প্রশ্নই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজামউদ্দিন সাহেবের এমন দুরবস্থা হলো কি করে? তিনি তো বেশ ভালোই অবিস্থাসম্পন্ন লোক ছিলেন।
নিলির কথা জিজ্ঞেস করলো ,’তার খোঁজ পেয়েছো? কোথায় এখন সে?’
-‘এখনো সেরকমভাবে কিছু জানা যায় নি স্যার। তবে শুনেছি রেজা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিক মি.রেজা নাকি উনাকে তাঁর পি.এস এর পোস্টে যোগ দেওয়ার জন্য অফার করেছেন।’
অবাক হলো রেজোয়ান। কিছু দিন আগেই তাঁদের কম্পানীর সঙ্গে রেজা গ্রুপের একটা স্ক্যান্ডাল হয়েছে। এরই মধ্যে মি.রেজা কি করে নিলিকে এমন অফার দিতে পারে? এর মানে কি? ব্যক্তিগত কোন আক্রোশ? হতেও পারে। ইনরফরমেশন চুরি করার অভিযোগে ব্যবিসায়িক সমিতি থেকে সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে রেজার। কিন্তু তার সঙ্গে নিলির কি সম্পর্ক?
চিন্তিত মুখে জাহিদের দিকে একঝলক চাইলো সে। জাহিদ ইতস্তত করে বললো,’মিসেস নিলি বোধহয় অফারটা এক্সেপ্ট করবেন স্যার। স্যালারি ভালোই দেবে শুনেছি। কিন্তু আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না এতে করে রেজা গ্রুপের লাভটা কি হলো? মিসেস নিলি মাত্র অল্প কিছুদিন আমাদের এখানে কাজ করেছেন। উনার পক্ষে এই অল্প সময়ে কম্পানীর সমস্ত প্রটোকল ঠিকমত বোঝাও সম্ভব নয়! তাহলে ওরা মিসেস নিলিকে কেন হায়ার করছেন?’
-‘আমিও তো সেটাই ভাবছি। কোন একটা কারণ তো অবশ্যই আছে। এমনি এমনি তো আর রেজা গ্রুপ সিদ্ধান্তটা নেয় নি?’
বেশ কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলো জাহিদ এবং রেজোয়ান। কিন্তু কোন সুরাহা করতে পারলো না। জাহিদকে নিলির ওপর নজর রাখতে বলে দিলো রেজোয়ান। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাপারটা জানা চাই। বল যায় না কখন কোন ঝামেলা এসে আবার উপস্থিত হয়ে যায়।
★
জাহিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে নিজের রুমে বসে একা একা নিলির কথা ভাবছিলো রেজোয়ান। নিলির সঙ্গে মি.রেজার কোন পূর্বপরিচয় থাকার কথা নয়। তাহলে ঠিক কোন সূত্র ধরে নিলিকে তিনি চাকরীটা অফার করেছেন? আসল উদ্দেশ্যটা কি? রেজোয়ান? কিন্তু নিলির মাধ্যমে?…সেটা কীভাবে সম্ভব?
ইত্যাদি নানারকম প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো মাথায়। হঠাৎ সেলফোনটা বেজে উঠতে চমকে গেলো। অপরিচিত নাম্বার! রিসিভ করলো রেজোয়ান।
ফোন রিসিভ করতেই মি.রেজা প্রথমে তাঁর পরিচয় জানালেন। রেজোয়ান ভেতরে ভেতরে চমকে গেলেও ভদ্রতাসূচক হেসে বললো,’কি খবর মি.রেজা? হঠাৎ আমার কথা মনে পড়লো যে?’
অপরপাশ থেকে রেজাও হাসিমুখে জবাব দিলো,’এখন তো আপনার কথাই বেশি মনে পড়বে ভাই। শেষ সম্বল যে আপনার হাতেই তুলে দিয়েছি।’
মি.রেজা স্পষ্টত ক্ষতিপূরণের টাকার দিকেই ইঙ্গিত করছেন। রেজোয়ান সেটা বুঝতে পেরে অট্টহাসি দিয়ে বললো,’বড় বড় কম্পানীর মালিকেরা এসব বললে আমার মত অভাগাদের উপায় কি? আমরা তো আপনাদের ওপরেই নির্ভরশীল।’
-‘এসব আপনার বিনয়!’
-‘সত্যি বলছি। আপনার সঙ্গে কি আর আমার তুলনা হয়?’
-‘তা জানি না। কিন্তু টাকাটা যে এবার ফেরত দিতে হয় ভাই?’
-‘মানে?’
-‘মানে টাকাটা আপনাকে ফেরত দিতে হবে। সেই সঙ্গে আরো হাফ বিলিয়ন আমার অ্যাকাউন্টে জমা করতে হবে।’
রেজোয়ান তাঁর কথার আগাগোড়া কিছু বুঝতে না পেরে উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললো,’আপনি তো দেখছি বেশ ভালোই ঠাট্টা করেন।
ক্রুর হাসলো রেজা। অত্যাধিক মোলায়েম কন্ঠে বললো,’আপনাদের দুজনকে কিন্তু বেশ ভালোই মানায় মি.মুরসালীন। আমি তো চোখই ফেরাতে পারছিলাম না। দারুণ প্রেম ছিলো বোধহয় আপনাদের তাই না? আমি কার কথা বলছি বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই? আমি আপনার আর আমার সুন্দরী পিএস মিসেস নিলির কথা বলছি।’
বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো রেজোয়ান। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। কি থেকে কি ঘটেছে কিছুই বুঝতে পারছে ন। এদিকে রেজা চুপ করে নেই। ক্রমাগত বলে যাচ্ছে,’মিসেস নিলি বোধহয় ছাত্রজীবনে খুব সুন্দরী ছিলেন? দারুণ ফিগার, একেবারে আগুন! আমিও একটা সুযোগ নেবো ভাবছি।’
চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো রেজোয়ানের। বদমাশটার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে মন চাইলো। কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই মাথায় ঢুকছিলো না। ছবিগুলো তাঁর নিজস্ব ল্যাপটপের খুবই গোপন ফোল্ডারে সেইভ করা ছিলো। সেগুলো রেজার হাতে গেলো কী করে?
রেজা তাঁর মনের কথা বুঝতে পেরে বললো,’সেদিন মিটিংয়ে আপনি ভুল করে ল্যাপটপ রেখে প্রায় দশ মিনিটের মতন বাইরে গিয়েছিলেন? অ্যাম আই রাইট?’
-‘আপনি আমার ল্যাপটপ হ্যাক করেছেন?’
-‘করে খুব একটা লাভ হয় নি। ভেবেছিলাম কম্পানীর কিছু গোপন তথ্য পাবো কিন্তু শেষমেশ দেখলাম পুরো ল্যাপটপই আপনার প্রেমের স্মৃতি দিয়ে ভরা।’
-‘হাউ ক্যান ইউ বি সো চিপ মি.রেজা? আই ডিডন্ট এক্সপেক্ট দিজ ফ্রম ইউ! আপনি তো মেন্টালি সিক!’
রেজোয়ানের কথা গুলো গায়েই মাখলো না রেজা। উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। একশো কোটি টাকার জন্য একটু আধটু কথা শোনাই যায়। হাসি থামিয়ে বললো,’আপনি টাকাটা কবে পাঠাবেন মি.মুরসালীন?’
-‘এক পয়সাও দেবো না।’
-‘আপনি পাঠাবেন মি.মুরসালীন।’
-‘যদি না পাঠাই?’
-‘সেটা অবশ্যই আপনার ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু আমি আপনাকে পাঠানোর জন্য সাজেস্ট করবো। আফটার অল ব্যবসায়িক মহলে আপনার একটা রেপুটেশন আছে। হঠাৎ করে পুরাতন প্রেমিকার সঙ্গে এসব ছবি ভাইরাল হলে বুঝতেই তো পারছেন….এই দেশে মানুষ তিলকে তাল বানায়। এমনও তো হতে পারে সবাই ভাবলো আপনার সঙ্গে মিসেস নিলির অবৈধ কোন সম্পর্ক আছে। আই মিন পরকীয়া, তাই আপনারা দুজন মিলে মুবিন তালুকদারকে খুন করেছেন। নানারকম পুলিশি ঝামেলা….সেটা কি ভালো হবে?’
এমন নোংরা কথাবার্তা শুনে কপালের শিরা দপদপ করে উঠলো রেজোয়ানের। সে ভাবতেই পারে নি রেজার মত একজন শিক্ষিত মানুষের মনমানসিকতা এত জঘন্য হতে পারে। খুন করতে মন চাইলো কুলাঙ্গারটাকে। তথাপি দাঁতেদাঁত চেপে সহ্য করে নিলো।
রেজে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফের গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,’আচ্ছা ঠিক আছে মি.মুরসালীন, মিসেস নিলির বিষয়টা থাক। উনার সঙ্গে যেহেতু এখন আর আপনার কোন সম্পর্ক নেই তাই উনাকে নিয়ে আপনার চিন্তা না করলেও চলবে। আপনি বরং ক্ষতিপূরণের টাকাটা পাঠিয়ে দিন। আমি ছবি ব্লার করে দেবো। আপনাকে কেউ চিনবে না।’
আন্দাজেই ঢিলটা ছুঁড়লো রেজা। তাঁর ধারণা রেজোয়ান এই প্রস্তাবে রাজি হবে না। নিলির প্রতি এখনো যথেষ্ট ফিলিংস আছে তাঁর। নতুবা এতদিন পর্যন্ত ল্যাপটপে ছবিগুলো রাখার কোন মানেই ছিলো না। নিলির বিয়ের পরই ডিলিট করে দিতে পারতো। কিন্তু খুব যত্ন করে ছবিগুলো গোপনে লুকিয়ে রেখেছে রেজোয়ান। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে নিলির কথা ভেবেই রেজোয়ান এখন পর্যন্ত কোন রিয়েক্ট করছে না। নইলে আরো আগেই চিৎকার চেঁচামেচি করে এক অবস্থা হতো।
তাঁর চিন্তাভাবনা ছেদ ঘটালো রেজোয়ানের শান্ত, গম্ভীর কন্ঠস্বর, ‘তাঁকে এক্সপোজ করে আপনার লাভ?’
-‘কিছু না। জাস্ট একটু মজা নেবো!’
দাঁতেদাঁত দাঁত ঘষলো রেজোয়ান। মেজাজ শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললো,’ঠিক আছে কালকে সন্ধ্যা আগেই টাকা পেয়ে যাবেন। কিন্তু ছবিগুলো ডিলিট করতে হবে।’
-‘হয়ে যাবে।’
-‘হাউ ক্যান আই আই ট্রাস্ট ইউ?’
-‘ইট’স আ ডিল। সো ইউ হ্যাভ টু!…বস্তুত আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া আপনার হাতে আর কোন উপায় নেই। ইউ হ্যাভ নো চয়েস।’
★
রেজার ফোন রাখতেই জাহিদকে নিজের রুমে ডাকলো রেজোয়ান। জাহিদ ভেতরে ঢুকে সামনে চেয়ার টেনে বসলো। নিলির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা তাঁকে খুলে বললো রেজোয়ান।
সব শুনে খুব বেশি চমকালো না জাহিদ। নিলির সঙ্গে যে রেজোয়ানের আগে থেকেই একটা সম্পর্ক আছে সেটা প্রথম দিন দেখেই বুঝে গিয়েছিলো সে। কিন্তু এতদিন ভয়ে জিজ্ঞেস করার সাহস পায় নি। সব শেষে রেজোয়ান প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো তাঁর দিকে,
-‘তোমার কি মনে হয় জাহিদ? ও সত্যি সত্যি চাপের মুখে পড়ে মুবিনকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলো?’
-‘বুঝতে পারছিনা স্যার। তবে আমার মনে উনি সত্যি বলছেন।’
তাঁর জবাবটা রেজোয়ানকে ঠিক আনন্দ দিলো না কি দুঃখ দিলো বোঝা গেলো না। চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো সে। বেশকিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর পুনরায় সোজা হয়ে বসলো। এইবার রেজার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করার সময়।
★
রেজার হুমকির কথা শুনে টাকা না দেওয়ারই পরামর্শ দিলো জাহিদ। কারণ টাকাটা দিলে হিউজ লসের মুখে পড়ে যাবে রেজোয়ান। সবে মাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে কম্পানী। এরই মধ্যে এতগুলো টাকার ধকল কম্পানীর জন্য ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
রেজোয়ানকে নির্লিপ্ত দেখে উদ্বিগ্নস্বরে বললো,’ওয়ান বিলিয়ন ইজ নট আ স্মল অ্যামাউন্ট স্যার! কম্পানীর জন্য এই লস ক্যারি করা টাফ হয়ে যাবে।’
সম্মতি সূচক মাথা দোলালো রেজোয়ান। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,’তোমার চিন্তাটা আমি বুঝতে পারছি জাহিদ। কিন্তু সম্মানের দিকটাও তো দেখতে হবে?’
-‘কিন্তু স্যার…’
-‘ছবিগুলো খুব বেশি যে ইন্টিমেট তেমন না। আবার একেবারেই যে ইন্টিমেট নয় তেমনও নয়। ব্যাপারটা দৃষ্টিভঙ্গির এবং সিচুয়েশনের ওপর নির্ভর করেছে। কে কীভাবে নেবে সেটা তাঁর চয়েস। কিন্তু সমস্যা একটাই, ধরো কোনভাবে ছবিগুলো এক্সপোজ হয়ে গেলো, মানে রেজাই এক্সপোজ করলো তখন কিন্তু সবাই জাজমেন্টাল হয়ে যাবে। ব্যাপারটা তখন আর পজিটিভ থাকবে না। নেগেটিভলিই নেবে সবাই। সত্যিটা খতিয়ে দেখবে না। কারণ একবার যদি কোনকিছু নিয়ে গুজব ছড়িয়ে যায় তখন মানুষ সেটাকেই সত্যি মনে করে।’
#তুমি_তাই
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ১১
চোখের বাঁধন খুলে দিতেই ঘোলাটে দৃষ্টিতে আশেপাশে চারদিকটা চাইলো রেজা। মাথাটা এখনো ঘুরছে তাঁর। ঘাড়ের কাছে রগ চিনচিন করছে। প্রফেশনাল কিডন্যাপার দিয়ে কিডন্যাপ করানো হয়েছে তাঁকে। রেজোয়ানই করিয়েছে। কিডন্যাপার গাড়িতে তোলার আগে চেতনানাশক স্প্রে করে তাই এতটা সময় ধরে হুঁশ ছিলো না রেজার।
হুঁশ ফিরতেই খেয়াল করলো সামান্য একটা সুতার বস্ত্রও নেই তাঁর গায়ে। সম্পূর্ণ নিরাবরণ সে। সামনের ক্যামেরায় তার অনাবৃত দেহের ভিডিও করছে জাহিদ।
ইশারায় তাঁর মুখের বাঁধনও খুলে দিতে বললো রেজোয়ান। মুখের বাধন খুলে দিতেই সক্রোধে চিৎকার করে উঠলো রেজা। বিশ্রি ভাষায় গালাগাল শুরু করে দিলো জাহিদকে।
তার অবস্থা দেখে রেজোয়ান মৃদু হাসলো। অত্যাধিক ভয়ংকর হাসি। বলা বাহুল্য, এই হাসি যে কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিতে পারে। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো রেজার।যথাসম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করলো।
-‘আমাকে কিডন্যাপ করার মানে কি?’
-‘আপনি আমাকে বাধ্য করেছেন। এই ছাড়া আমার হাতে আর কোন উপায় ছিলো না।
ভেবে দেখলাম, আপনাকে একশো কোটি টাকা দেওয়ার চাইতে দুইএককোটি টাকা খরচ করে কিডন্যাপ করাটাই বেশি লাভজনক। তাছাড়া আমার মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য একশোকোটি টাকা অ্যাফোর্ড করাটাও অসম্ভব ব্যাপার।’
একেই বলে যেমন কুকুর তেমন মুগুর। হতবম্ভ হয়ে গেলো রেজা। তাঁর হাত থেকে বাঁচার জন্য রেজোয়ান এমন একটা বুদ্ধি বের করবে একথা সে স্বপ্নেও ভাবে নি। তাঁর ধারণা ছিলো রেজোয়ান হয়ত টাকার অংকটা কমানোর জন্য ট্রাই করবে কিন্তু একেবারেই যে দিতে চাইবে না এটা সে ভাবতে পারে নি।
সাধারণত এইসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষই চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে। অত্যাধিক ভয়ে বুদ্ধিভ্রষ্ট হয় অনেকের। কিন্তু রেজোয়ানের ব্যাপারটাকে অন্যরকম ভাবে সামলেছে। খুব স্মুথলি খেলাটা খেলেছে সে।
হতাশায়, ক্রোধে রেজার চোখ দিয়ে আগুন ঝরলো। দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,’কাজটা আপনি একটা ভালো করেন নি মি.মুরসালীন। এর পরিণাম খুব খারাপ হবে, আমাকে এভাবে কিডন্যাপ করে মস্ত বড় ভুল করেছে আপনি। এর ফল আপনাকে ভোগ করতে হবে।’ ইত্যাদি নানারকম হাবিজাবি কথাবার্তা।
রেজোয়ান সেগুলো পাত্তাও দিলো না। তাঁর সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চেয়েছিলো রেজা। এত সহজে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ক্রুর হেসে বললো,’ভিডিও আমার হাতে মি.রেজা আর হুমকি দিচ্ছেন আপনি? ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে না? ইজন্ট ইট উইয়ার্ড?’
-‘এর জন্য আপনাকে পস্তাতে হবে।’
-‘আই ডোন্ট থিংক সো। কারণ আমি চাইলে এইমুহূর্তে আপনার এই অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল করে দিতে পারি। এর আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না আপনি।’
হুমকি শুনে ভড়কে গেলো রেজা। ভয়ে মুখ শুকিয়ে এলো। সত্যি যদি এই ভিডিও ভাইরাল হয় তবে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে তাঁকে। নরম অনুতপ্ত হয়ে এলো গলার স্বর। রেজোয়ানকে চটিয়ে লাভ হবে না বুঝে গেলো। কাঁদোকাঁদো কন্ঠে অনুনয় করে বললো,’ভুল হয়ে গেছে মি.মুরসালীন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি সব ছবি ডিলিট করে দেবো। কিন্তু আপনি প্লিজ এই ভিডিও ডিলিট করুন। আমি বলছি আর জীবনেও এমন ভুল হবে না।’
ইশারায় জাহিদকে ভিডিও বন্ধ করতে বললো রেজোয়ান। গলার স্বরে খানিকটা দৃঢ়তা এনে বললো,’ভিডিও এখন ডিলিট হবে না। আগে ছবি ডিলিট হবে তাঁরপর ভিডিও।’
রেজার ভয় কমলো না। তাঁর বুঝতে বাকি নেই এই ভিডিও এত সহজে ডিলিট করবে না রেজোয়ান। এই ভিডিওটাকে কাজে লাগিয়ে যখন খুশি তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে সে। তাই যথাসম্ভব নরম হয়ে কথা বলার চেষ্টা করলো। অত্যাধিক করুণ গলায় বললো,’আমি আপনার কাছে হাতজোড় করছি, ভিডিওটা আমাকে দিয়ে দিন প্লিজ! এটা ভাইরাল হলে আমার মানইজ্জত আর কিছু থাকবে না। দেশ ছেড়ে পালাতে হবে আমাকে। আই স’য়্যার অন মাই মম, আমি ছবি ডিলিট করে দেবো। প্লিজ ক্যামেরাটা আমাকে দিয়ে দিন।’
‘সয়্যার অন মাই মম?’
রেজোয়ান উচ্চশব্দে হাসলো। যে মানুষ শুধুমাত্র টাকার লোভে নির্দ্বিধায় কারো চরিত্রে কালিমা লাগানোর কথা ভাবতে পারে তাঁকে আর যাই হোক বিশ্বাস করা যায় না। তা সে যতই মায়ের দিব্যি দিক না কেন।
রেজা যদি ভেবে থাকে তাঁর এইসব ইমোশনাল কথা শুনে রেজোয়ান তাঁকে ক্যামেরা দিয়ে দেবে তাহলে সে ভুল ভেবেছে। এতটা বোকা রেজোয়ান নয়।
স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলো যতদিন পর্যন্ত না সে পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে,রেজা সব ছবি ডিলিট করেছে ততদিন পর্যন্ত এই ভিডিওটাই তাঁর কাছে থাকবে। এটাই তাঁর প্রধান অস্ত্র। রেজার মতন মানুষের শিক্ষা দিতে হলে তাঁদের ভাষাতেই দিতে হবে।
★
রেজার বাসা থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি পার্ক করে ওকে নামিতে দিলো রেজোয়ান। যাওয়ার সময় মুচকি হেসে কাঁধে হাত রেখে বললো,’আশা করছি এই ব্যাপারে আর কখনো কথা বলার প্রয়োজন হবে না আমাদের। ছবিগুলো আপনি ডিলিট করে দেবেন। অবশ্যই ছবিগুলো ডিলিট না হলে আমার তেমন কোন ক্ষতি নেই ভিডিওটাও ডিলিট না হলে কি হবে বুঝতে পারছেন? সেগুলো কোথায় কোথায় যাবে এটা নিশ্চয়ই আপনাকে আর বলে দিতে হবে না?
কথা শেষ করে রেজার জবাবের অপেক্ষা না করেই গাড়িতে উঠে গেলো রেজোয়ান। তাঁর কন্ঠে বোধহয় খানিকটা হুমকি ছিলো। ভয় পেলো রেজা। ঘনঘন ঢোক গিললো। রেজোয়ানকে ফাঁসাতে গিয় ভয়ংকর ভাবে ফেসে গেছে সে নিজে। এখন আর কিছুই করার নেই। রেজোয়ান যা বলে তাই শুনতে হবে।
★
কিন্তু পরেরদিন সকালে অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা ঘটে গেলো। রেজোয়ানের অফিসে নিলি এলো দেখা করতে। প্রথমে তাঁকে দেখে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না রেজোয়ান। ফরমাল গেটাপে একেবারে অন্যরকম লাগছে নিলিকে। বেশকিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সে। কিন্তু নিলির মেজাজ তিরিক্ষি। তিক্ত কন্ঠে টেবিলে চাপড় মেরে বললো,’মি.রেজোয়ান?কোন সাহসে আপনি মি.রেজাকে কিডন্যাপ করেছেন?’
তাঁর এমন প্রশ্নে অবাক হলো রেজোয়ান। হাঁ করে চেয়ে রইলো নিলির মুখের দিকে। সে ভাবতেই পারে নি রেজার কিডন্যাপের ব্যাপারটা নিলি অব্দি পৌঁছাবে। এবং সেই কৈফিয়ত চাইতে তাঁর অফিসে আসবে নিলি। বিস্ময়ভাব কাটিয়ে শান্ত গলায় বললো,’সেটা জেনে তোমার লাভ?’
-‘উনি আমার বস। আপনি উনাকে এভাবে কিডন্যাপ করতে পারেন না।’
-‘একশোবার পারি। আমার সম্মানে কেউ আঘাত করলে আমি তাঁকে যা খুশি তাই করতে পারি। ওর ভাগ্য ভালো যে ওকে জানে মারি নি।’
-‘এত ঔদ্ধত্য কিসের আপনার হ্যাঁ? নিজেকে কি মনে করেন আপনি? মানুষকে কি মানুষ মনে হয় না?’
-‘মানুষকে মানুষই মনে হয় কিন্তু জানোয়ার কে নয়। ও একটা জানোয়ার। তুমি জানো সে কি করেছে?’
-‘কিচ্ছু জানার দরকার নেই আমার। আমি ভালো করেই জানি আপনি কেন উনাকে কিডন্যাপ করেছেন।’
-‘কেন?’
-‘উনি যেন আমাকে চাকরী ছাড়তে বাধ্য করে তাই।’
এতক্ষণ যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে কথা বলার চেষ্টা করছিলো রেজোয়ান। কিন্তু আর পারলো না। নিলিকে রেজার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখে মেজাজ চটে গেলো। তাঁর ওপর রেজার অফিসে চাকরী নিয়েছে শুনে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো। দাঁতেদাঁত চেপে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,’তো?’
-‘তো মানে?’
-‘তো মানে আমি তাঁকে বলেছি তোমাকে চাকরী থেকে ফায়ার করে দিতে। এখন বলো কি সমস্যা! কি করবে তুমি? পুলিশে দেবে আমাকে? জেলে ঢোকাবে! ঢোকাও। দেখি তোমার কত ক্ষমতা।’
অত্যাধিক রাগে বাক্যশূন্য হয়ে গেলো নিলি। হতাশভাবে দুদিকে মাথা দোলালো। স্মিত হেসে বললো,’তোমাকে জেলে ঢোকানোর ক্ষমতা হয়তো আমার নেই রেজোয়ান কিন্তু মনে রেখো কর্মফল বলে একটা কথা আছে। এটা কাউকে ছাড় দেয় না।’
-‘যেমনটা তোমাকে দেয় নি? তাইতো?’, রেজোয়ানের চোখেমুখে তিরস্কার।
-‘আমি কোন অন্যায় করি নি। যা হয়েছে সেটা আমার ভাগ্য ছিলো। এর জন্য আমি কাউকে দায়ী করি না। কিন্তু তুমি যা করছো তাতে করে নিজের ধ্বংস ডেকে আনছো। এতটা ঔদ্ধত্য কিন্তু ভালো নয়। কাউকে বিনা অপরাধে কষ্ট দেওয়া খুবই খারাপ জিনিস। রেজা সাহেব অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমার জন্য তুমি উনাকেও কষ্ট দিচ্ছো।’
-‘ভালো মন্দের জ্ঞান অন্তত তোমার কাছ থেকের শেখার কোন আগ্রহ আমার নেই। যার নিজের চরিত্রের ঠিক নেই সে এসেছে অন্যকে জ্ঞান দিতে।’
নিলি ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে পলকহীনভাবে চেয়ে রইলো রেজোয়ানের দিকে। এই মানুষটা একদিন নিজের চাইতেও বেশি ভালোবেসেছিলো তাঁকে। অথচ আজ তার ছিটেফোঁটা পর্যন্ত নেই। চোখজোড়া আর্দ্র হয়ে উঠলো তাঁর। উঠে দাঁড়ালো সে।
-‘রেজা নিশ্চয়ই পার নাইট আমার চাইতে বেশি অফার করেছে? সেইজন্যই তাঁর জন্য এত দরদ?’
থমকে গেলো নিলি। আচমকা রেজোয়ানের বিষাক্ত বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে গেলো সমস্ত শরীর। মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে রেজোয়ানের কলার চেপে ধরলো সে। কান্নাভেজা গলায় আর্তনাদ করে বললো,’কেন তুমি আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছো রেজোয়ান? কেন তুমি বিশ্বাস করতে পারছো না আমি তোমাকে ধোঁকা দেই নি? দেই নি আমি তোমাকে ধোঁকা।’
বলতে বলতেই রেজোয়ানের বুকে এলোপাথাড়ি কিলঘুষি বসালো সে। রেজোয়ান মূর্তির মতন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাঁর দৃষ্টি ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসছে। অসহায়ভাবে তাঁর বুকে লুটিয়ে পড়লো নিলি। বিরতিহীন ক্রন্দনে রেজোয়ানের বুক ভিজিয়ে দিলো সে।
রেজোয়ান ঢোক গিললো। তাঁর ভেতরটা মোমের মত গলতে শুরু করেছে। এতদিনের জমাটবাঁধা সব অনুভূতিগুলো আবার নতুন করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিতে মন চাইছে ক্রন্দনরত প্রেয়সীকে। কিন্তু তাঁর আত্মসম্মানবোধ, অন্তঃকরণের তীব্র আর্তনাদ, পারিবারিক অসম্মানের কুৎসিত স্মৃতি তাঁকে সেটা করতে দিলো না। নিজেকে দ্রুত সামলে নিলো।
একটা সময় এই মেয়েটাকে ভালোবাসার অপরাধে পুরো মহল্লা ভর্তি লোকজনের সামনে তাঁকে জুতোপেটা করেছিলো তাঁর বাবা। তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা, পারিবারিক স্ট্যাটাস নিয়েও কুৎসিত রকমের গালাগাল করেছিলো। অথচ সেদিন একফোঁটাও প্রতিবাদ করে নি নিলি। ঘরের দরজা বন্ধ করে চুপটি করে লুকিয়ে ছিলো। সত্যিটা অস্বীকার করে সর্বসম্মুখে জোর গলায় বলেছিলো রেজোয়ানের সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই। রেজোয়ানকে ভালোবাসে না সে। সেদিনের সেই অপমান, সেই লাঞ্ছনা আজও ভুলতে পারে নি রেজোয়ান।অসহায়ের মত নিজামউদ্দিন সাহেবের পায়ে ধরে কেঁদেছিলো। কিন্তু তাঁর দয়া হয় নি।
পুরোনো স্মৃতি মনে পড়তেই চোখ ছলছল করে উঠলো রেজোয়ানের। চাপা কষ্ট বুকের ভেতরটা গুমোট হয়ে এলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্লান্ত গলায় বললো,’আজ থেকে তুমি মুক্ত নিলি। তোমাকে আমি আর বিরক্ত করবো না।’
রেজোয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে তখনো কাঁদছিলো নিলি। অবাক দৃষ্টিতে মাথা তুলে চাইলো। তাঁর হাত ছাড়িয়ে নিলো রেজোয়ান। খানিকটা দূরে সরে গিয়ে বললো,’তোমার জীবনে রেজোয়ানের নামের কেউ ছিলো সেটা ভুলে যাও। আজ থেকে আমরা একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ অপরিচিত।’
সম্বিত ফিরে পেলো নিলি। রেজোয়ানের কাছে ভালোবাসা ভিক্ষে চাইতে সে আসে নি। এসেছিলো সব যন্ত্রনা থেকে মুক্তি চাইতে। মুক্তি তাঁর ঠিকই মিলেছে কিন্তু যন্ত্রণার অবসান ঘটে নি। বরং বেড়েছে। ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা আরো একবার, আরো একবার তাঁর সমস্ত হৃদয়টাকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিলো।
চোখ মুছে মলিন হাসলো। ঠোঁট কামড়ে কান্না চাপার চেষ্টা করে বললো,’থ্যাংকস। আশাকরি তুমি তোমার কথা রাখবে। আমার প্রতি কোন রাগ রাখবে না। সে যাইহোক, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাকে।’
চলবে।