#তুমি_শুধু_গল্প_না_আমার_ভালোবাসা
#সূচনা_পর্ব
#আমেনা_আক্তার
দরজা খুলতেই নিজের স্বামীর পাশে নব বধূ সাজে আরেকটি মেয়ে কে দেখে মাথা ঘুরে গেল মহিমার সে কাঁপা কাঁপা স্বরে স্বামী রাজিব কে বোকার জিজ্ঞেস করলো।
এই মেয়ে কে রাজিব?
রাজিব যেনো এই প্রশ্নের অপেক্ষায় করছিল। রাজিব বিনা দ্বিধায় উত্তরে বলল।
তোমার বাবা যদি এই বয়সে তোমার মা থাকা সত্ত্বেও আরেকটি বিয়ে করতে পারে তাহলে আমার আরেক বিয়ে করা অপরাধ নয় নিশ্চয়।আর তুমি চিন্তা করো না আমি তোমার ও আমার বাচ্চা কে কখনো অবহেলা করবো না। তুমি শুধু রিয়ার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিও।ওর সাথে মিলেমিশে থাকলেই তোমার এখানে কেনো সমস্যা হবে না
রাজিবের কথা শুনে মহিমার ঘৃণায় শরীর রি রি উঠলো সে তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলল।
তাহলে এই সুযোগের অপেক্ষায় করছিলো এ কদিন তাইতো বাবার দ্বিতীয় বিয়ের খবর শুনার সাথে সাথে তুমিও বিয়ে করে নিয়ে এসেছে।আর ভাবছো আমি সতিনের সাথে সংসার করবো। তাহলে শুনো আমি এমন কেনো লোকের সাথে সংসার করব না যে নিজের চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে আরেকটি বিয়ে করে নিয়ে এসেছে নিজের স্ত্রী সন্তানদের কথা না ভেবে। আমার সন্তান দুনিয়াতে আসার সাথে সাথে তুমি ডিভোর্স পেপার পেয়ে যাবে কথাটি বলেই মহিমা বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে। মহিমা বের হয়ে গেছে এই অবস্থায় তবুও রাজিব তাকে একটি বারের জন্যও বাধা দিলো না হয়তো মহিমার জন্য এখন আর তার হৃদয়ে ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই।
আচ্ছা ভালোবাসা হৃদয়ের থেকে শেষ হওয়া কি এতোই সহজ হয়তো বা তা নাহলে রাজিব কিভাবে এত সহজে তাকে রেখে বিয়ে করতে পারে রাজিব কে এত ভালোবাসা সত্বেও।
বাপে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে এই কথা শুনে এসেছিস মাকে শান্তনা দিতে নাকি তোর শ্বশুর বাড়ি থেকে তোকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে।
ছোট বোনের কথা শুনে ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মহিমা।
মহিমার দৃষ্টি উপেক্ষা করে সিরাত আবার বলল।
এই চার মাসের পেট নিয়ে কোথায় থাকবি ভেবেছিস। যেখানে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর আমাদের ও মায়ের থাকায় অনিশ্চয়তার ভিতর আছে। সেখানে তোর কি মনে হয় মায়ের সতীন তোকে সহ্য করবে।
সিরাতের কথা শুনে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালো মহিমা তার যে কিছুই বলার নেই। নিজের স্বামী কে এত ভালোবাসার পরেও তাকে ছেড়ে দিলো তার বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনে তার শাশুড়ির এতদিন এটায় চাইছিল যাতে মহিমা নিজে সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় কারণ তিনি মহিমাকে বিশেষ পছন্দ করেন না মহিমার জায়গায় অন্য মেয়ে হলে হয়তো স্বামীর পা ধরে বসে থাকতো একটু আশ্রয়ের আশায় কিন্তু মহিমা কে তার মা কারও সামনে মাথা নিচু করতে শিখায় নি তাই বিনা দ্বিধায় ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে।
মহিমা দৃঢ় কন্ঠে সিরাত কে উদ্দেশ্য করে বলল।
বাবা এমনটা কিভাবে করলো আমাদের কথা কি একবারও উনার মাথায় আসে নি।আর মা বা কেনো ওই মহিলা কে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছে।আর মাকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে বাবা বিয়ে করে নিয়ে এসেছে মা এতটা স্বাভাবিক কিভাবে আছে।
তো কি করবে মা বসে বসে তোর মতো আহাজারি করবে কান্না করবে । নাকি নিজের কপালের দোষ দিবে আর তুই বাবার বিয়ের কথা বলছিস ওনি আরো দশ বছর আগে বিয়ে করেছে শুধু বাড়িতে তুলেছে আজ। উনার সাথে নবছরের একটি ছেলেও আছে।
সিরাতের কথা শুনে মহিমা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
কি বাবা আরো দশ বছর আগে বিয়ে করছে এটা কিভাবে করতে পারে বাবা উনি কি ভুলে গেছেন ওনার যে তিনটি মেয়ে আছে ঘরে।মা উনাকে কত ভালোবাসেন আর মায়ের প্রতি ও উনার ভালোবাসার কখনো কমতি দেখিনি।তাহলে বাবা কিভাবে এমন জঘন্য কাজ করতে পারে।
সেভাবেই যেভাবে তোর স্বামী তোকে রেখে বিয়ে করেছে তোর এই অবস্থা থাকার সত্তেও। আরও একটি কথা উনার তিনটি না শুধু দুটি মেয়ে তুই আর সাইরা।না উনি কখনো আমাকে নিজের মেয়ে ভেবেছেন আর না আমি উনাকে নিজের বাবা উনি শুধু নামেই আমার বাবা হয়।
সিরাত ও মহিমার কথার মাঝে ঘর থেকে ভেসে আসে কারো কান্নার আওয়াজ।সিরাত সেই দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর কন্ঠে বলল।
এই মেয়ের কি সমস্যা আল্লাহ যানে যখন থেকে শুনেছে বাবা আরেকটি বিয়ে করেছেন তখন থেকেই কেঁদে চলেছে।এত ড্রামা মানুষ কিভাবে করতে পারে আমি বুঝিনা।
কি বলছিস তুই জানিস না সাইরা বাবা কে কতটা ভালোবাসে তাই তো মেয়েটি এতটা ভেঙে পরেছে। কিন্তু তোর মন তো পাথরের তৈরি তোর তো কষ্ট লাগে না।আর আমি বুঝতে পারছি না মা এত শান্ত কিভাবে বসে আছে।মা কত ভালোভাবে বাবাকে কিন্তু আরেকটি বউ নিয়ে বাবা বাসায় ফিরার পরে ও একটি কথাও বলেনি মা। এমন ভাবে নিজের কাজ করছে যেনো কিছুই হয়নি। আমার আর রাজীবের মাত্র তিন বছরের সংসার তাতেই আমার ভিতরটা ছারখার হয়ে যাচ্ছে।আমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী কে তার সাথে সহ্য করতে পারবো না দেখে চলে এসেছি। বাবা মায়ের সম্পর্কের বয়স ও গভীরতা তো আরো বেশি কিন্তু মা কে দেখে কেউ বুঝতে পারবে না যে বাবা তাকে ধোঁকা দিয়েছে।
মহিমার কথায় সিরাত মুচকি হাসি দিয়ে বলল।
মায়ের এমন ব্যবহারের কারণ অনেক তাড়াতাড়ি বুঝবে পারবি।
বলেই সেই স্থান ত্যাগ করে।আর মহিমা সিরাত যাওয়ার পরে আবার চোখের পানি ব্যয় করতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
শামসুজ্জামান হাত ভর্তি বাজার নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। এখন তিনি অনেকটাই টেনশন মুক্ত উনি মনে করেছিলেন নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী নীলা কে নিয়ে বাড়িতে আসার পর হয়তো রেহানা বেগম তার দ্বিতীয় স্ত্রী কে বাড়িতে ঢুকতে দিবেন না। অনেক চিল্লাচিল্লি করবেন কাঁদবেন কিন্তু রহিমা বেগম এই সকল কিছু না করায় উনার মনে একটু ভয় ঢুকে গিয়েছিল কিন্তু নিজের মনকে এই বলে তিনি শান্তনা দিয়েছেন হয়তো রেহানা বেগমের তার দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আপত্তি নেই।
রেহানা বেগম বসে তরকারী কাটছেন রাতের খাবারের জন্য তখনি শামসুদ্দিন বাজারের ব্যাগ এনে রেহানা বেগমের সামনে রেখে বলে।এই নে আমি আজ সবার পছন্দ অনুযায়ী বাজার এনেছি আজ সবার পছন্দের খাবার রান্না হবে।
শামসুজ্জামানের কথা শুনে রেহানা তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে বলল।
আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী কে বাড়িতে তোলার খুশিতে এনেছেন এই সকল কিছু।
শামসুজ্জামান কথাটি শুনা মাত্রই তার হাসি মুখ খানি মূহুর্তেয় চুপসে গেল। তিনি থমথমে গলায় বলল।
না ওর জন্য আনবো কেনো ও আসায় কি তোমাদের জন্য আমার ভালোবাসা কমে যাবে একটু ও না। আমিতো আমার বড়ো মেয়ের জন্যে এনেছি ও বেড়াতে এসেছে এই খুশিতে।
ও বেড়াতে আসে নি একবারের জন্য চলে এসেছে রাজিব আরেকটি বিয়ে করেছে তাই।
রেহানা কথা শুনে শামসুজ্জামান তেজি গলায় বলল।
কি ও আমার মেয়েকে রেখে আরেকটি বিয়ে করেছে আমি ওকে ছাড়বো না।
কেনো আপনি আরেকটি বিয়ে করতে পারলে ও কেনো পারবে না। আপনি যা করেছেন তারপরও মনে করেন ওই বাড়ির ভাত আমার মেয়ের কপালে জুটবে।
আমি তো বিয়ে করেছি শুধু…
শুধু একটি ছেলের জন্য তাই তো আপনার মতো চরিত্রহীন পুরুষ আর কি অজুহাত দিতে পারে আপনি যদি তিন মেয়ের বাবা হয়ে আরেকটি বিয়ে করতে পারো তাহলে তো ওর বিয়ে করায় কেনো দোষ দেখছি না।
রেহানা বেগমের কথা শুনে তেতে উঠল শামসুজ্জামান এবং বলল।
কি তুই আমাকে চরিত্রহীন বলিস তোর এত বড়ো সাহস। হ্যা আমি বিয়ে করেছি ছেলের জন্য ও আমাকে ছেলে সন্তান দিয়েছে কিন্তু তুই তিন বাচ্চার মা হয়ে ও আমাকে ছেলে সন্তান দিতে পারিস নি। তার ভিতর একটি মেয়ের গায়ের রং দেখলেই আমার গা জলতে থাকে।আমি নীলাকে বিয়ে করার পরেও তোদের কেনো কিছুতে কেনো কমতি হতে দেয়নি আর কি চাস তুই।যদি এতে তোর মন না ভরে তাহলে এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পারিস।আর হ্যাঁ তোর বড়ো মেয়েকে বলে দিবি যাতে স্বামীর বাড়ি ফিরে যায় আমি ওর বোঝা বয়তে পারবোনা।
কথাগুলো বলে থামে শামসুজ্জামান। শামসুজ্জামানের কথা শুনে রেহানা মুচকি হেসে বলল।
ঠিক আছে আপনি যখন চান তাহলে চলে যাবো আর আমার মেয়েদের বোঝা যখন আপনি বয়তে পারবেন না তাহলে ওদের সাথে নিয়ে যাবো। তারপর নিশ্চিতে আপনি ও আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী সংসার করতে পারবেন আপনার ছেলেকে নিয়ে।
শামসুজ্জামান রেহানার কথায় গুরুত্ব দেয় না কারণ উনি যানেন রেহানা বেগমের যাওয়ার কেনো যায়গা নেই বাবার বাড়িতে গেলে তার ঠাঁয় মিলবে না ফিরে এই বাড়িতে আসতে হবে তাই তো এত বড়ো কান্ড ঘটানোর আগে একবার ও ভাবেনি।
সাইরা বাবার আওয়াজ শুনে ঘর থেকে বের হয়েছিল বাবাকে জিজ্ঞেস করতে তার বাবা এমনটি কিভাবে করলো। কিভাবে তার মাকে ছেড়ে অন্য নারী কে বিয়ে করেছে তিনি। কিন্তু তার বাবা ও মায়ের কথা শুনে যেনো সে পাথরের মতো জমে গিয়েছে কি শুনেছে সে এইসব যেই বাবাকেও নিজের আইডেল হিসেবে জানতো সেই বাবা একটি ছেলের জন্য অন্য নারী কে তার মায়ের জায়গা দিয়ে দিয়েছে এত সহজে।
এদিকে মহিমা বালিশে মুখ বুজে কান্না করছে মহিমা এমনিতেই ভেঙে পড়েছে কিন্তু এখন বাবার কথা শুনে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বাবা যদি তাকে না রাখে তাহলে তো তার জীবন জাহান্নাম বানিয়ে দিবে শ্বশুর বাড়ির মানুষ মিলে ।রাজিবকেই বা কি করে সহ্য করবে সে অন্য মেয়ের সাথে তার জন্য যে সম্ভব না এই সকল কিছু সহ্য করা সে যে মায়ের মতো এতটা শক্ত মনের মানুষ না।
রাতের খাবার এনেছে রেহানা বেগম মেয়েদের কে একসাথে নিয়ে বসেছে খাবার খেতে। তখনি সিরাত মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো।
ডিভোর্স পেপার রেডি হয়ে গেছে সাথে করে নিয়ে এসেছি।
সিরাতের কথাটি বলা মাত্রই সকলে বিস্ফোরিত নয়নে তার দিকে তাকালো…
চলবে