#তুমি_শুধু_গল্প_না_আমার_ভালোবাসা
#আমেনা_আক্তার
#পর্ব_২
সিরাতের কথা শুনে সবাই বিস্ফোরিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল।
কি বলছিস তুই সিরাত ডিভোর্স পেপার রেডি করিয়েছিস কাদের ডিভোর্সের কথা বলছিস তুই।
সিরাত কিছু বলার আগেই রেহানা বেগম বিনা সংকোচে মেয়েদের উদ্দেশ্য বলল।
আমার আর তোর বাবার।
কথাটি শুনে বোধহয় মহিমা ও সাইরার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সাইরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
কি বলছো তোমার আর বাবার ডিভোর্স তুমি বাবাকে এত সহজে ছাড়তে পারবে?যাকে এতটা বছর বিনা স্বার্থে ভালোবেসে এসেছ।
সাইরার কথার সাথে তাল মিলিয়ে মহিমা বলল।
হ্যা মা সাইরা ঠিকই বলছে এমনিতেও আমরা সকলেই জানি তুমি বাবাকে কতটা ভালোবাসে। তাহলে কিভাবে থাকবে তুমি বাবাকে রেখে।এই সংসার তো তোমার। তোমার এই সাজানো গুছানো সংসার ছেড়ে থাকতে পারবে?
মহিমার কথার প্রতি উত্তরে সিরাত বলল।
কেনো থাকতে পারবে না তুই যদি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ও তোর স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রথম দিনেই তাকে ছেড়ে চলে আসতে পারিস তাহলে মাকে যে এত বছর ধরে ধোঁকা দিচ্ছে। মায়ের সাথে যে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। প্রতি নিহত মার কাছে মিথ্যা কথা বলেছে। ব্যবসার নাম দিয়ে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে থেকেছে মায়ের ভালোবাসা কে একটি ছেলের জন্য মূল্যহীন করে দিয়েছে তাকে ছেড়ে কেনো থাকতে পারবে না।
কথাগুলো বলে থামে সিরাত।সিরাতের কথা শুনে মহিমা মাথা নিচু করে ফেলল।আর সাইরার চোখ টলমল করছে অশ্রুতে সিরাত আবার বলা শুরু করলো।
আমি দেখতে কালো ,আমি বড়ো দের কথা শুনি না মুখে মুখে তর্ক করি। উনার সম্মান করিনা আমি বেয়াদব তাই উনি আমাকে পছন্দ করে না মানুষের সামনে নিজের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করে। কিন্তু তোরা তো উনার শান্ত শিষ্ট ভদ্র মেয়ে উনার সব কোথা শুনিস উনার কথা কথায় সব কিছু করিস।আর মহিমা তোর তো পড়ার অনেক ইচ্ছে ছিল তবুও তুই যখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়িস উনি তোকে বিয়ের কথা বলার সাথে সাথে রাজি হয়ে গেছিস।কারন তোর বাবার মনে তুই কষ্ট দিতে চাইনি। উনার জন্য তোরা তোদের জীবন দিতেও কখনো দ্বিধা বোধ করবি না।তাহলে কেনো উনার ছেলের সন্তানের এত প্রয়োজন পড়লো যার জন্য মাকে এত বড়ো ধোঁকা দিতে উনার একবারও রুহ কাপলো না।
সিরাতের কথা শেষ হতেই সাইরা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো।আর মহিমা পাথর বনে বসে রয়েছে কারণ সিরাতের একটি কথাও যে মিথ্যা না তা সে ভালোভাবেই যানে।সাইরা কে এভাবে কাঁদতে দেখে রেহানা বেগম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রেহানা বেগমের তিন মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে দূর্বল মনের হলো সাইরা আর সবচেয়ে কঠিন মনের সিরাত। কারন সিরাত সমাজের বাস্তবতা দেখেছে তার গায়ের রংয়ের জন্য তাকে মানুষের কাছে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অন্য মানুষের কথা আর কি বলবে নিজের বাবা ও তাকে এই গায়ের রংয়ের জন্য কথা শুনানোর কেনো সু্যোগ ছাড়ে না তখন রেহানা বেগম সিরাতকে বুঝিয়েছেন যে সমাজে টিকে থাকতে হলো শক্ত মনের হতে হবে কারণ এই সমাজ শক্তের ভক্ত নরমের যম। কিন্তু মহিমা ও সাইরা তার বাবার ভালোবাসা পেয়ে বড়ো হয়েছে কাওকে কখনো তার বাবা তাদের দুজনের উপর আঙ্গুল তুলেও কথা বলতে দেয় নি তাই ও মহিমার স্বামী রাজীব মহিমা কে ছেড়ে এই কদিন দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা চিন্তাও করতে পারেনি। সিরাত মনে করতো বাবা ওকে ভালো না বাসলেও ওর দু বোনকে ভালোবাসে কিন্তু এখন এটিও মিথ্যা মনে হচ্ছে সিরাতের। আসলে এই লোক শুধু নিজেকে ভালোবাসে আর কাওকে না।
মহিমা নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল।
কিন্তু মা তুমি যদি বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে দেও তাহলে তো বাবা আর এই বাড়িতে আমাদের থাকতে দিবে না।আমি নাহয় শাশুড় বাড়ির সকল অত্যাচার সহ্য করে সেখানে পরে রইলাম কিন্তু সিরাত ও সাইরা তারা কি করবে।আর তুমিই বা কোথায় যাবে। তোমার বাবার বাড়িতে যদি চলে যাও তাহলে তোমার ভাবিরা তোমার জীবন জাহান্নাম করে দিবে তোমাকে সেখানে থাকতে দিবে না। তুমি তোমার ভাবিদের জন্য দুদিন ও সেখানে যেয়ে থাকতে পারো না।আর সারাজীবন কিভাবে থাকবে।
মহিমার কথা শেষ হতেই রেহানা বেগম চোখ মুখ শক্ত করে বললেন।
তোর মাকে কি তোর এতোই আত্মসম্মানহীন মনে হয় যে আমি কারও পায়ের নিচে যেয়ে পরে থাকবো আর ভিক্ষা চাইবো নিজের আশ্রয়ের জন্য।আর নাতো তোকে এমন কেনো জায়গায় পাঠাবো যেখানে তোর জীবনের অনিশ্চয়তা আছে। যেখানে থাকলে তোর কষ্ট হবে। সেখানে আমি তোকে কখনো থাকতে দিবো আর না সিরাত ও সাইরাকে কখনো একা ছাড়বো। যেই পর্যন্ত আমার দেহে প্রান আছে সেই পর্যন্ত তো অন্তত না।
রেহানা বেগমের কথার প্রতি উত্তরে মহিমা বলল।
কিন্তু আমরা এখান থেকে গিয়ে কোথায় থাকবো এখানে থাকলে তো এই গ্রামের মানুষ আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। আমাদের উপর আঙ্গুল তুলবে আমাদের ভালোভাবে বাঁচতে দিবে না ওরা।
মহিমার কথার প্রতি উত্তরে সিরাত বলল।
আমরা আর এই গ্রামে থাকবো না এখান থেকে চলে যাবো।
সিরাতের কথায় সাইরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
এখান থেকে কোথায় যাবো।
মহিমার কথার প্রতি উত্তরে সাইরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে বলল।
ঢাকা ,
ঢাকা কিন্তু ঢাকাতে তো আমাদের কেউ নেই আর আমরা সেখানে কখনো যাইও নেই আমাদের কাছে তো পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা পয়সা ও নেই ঢাকা গিয়ে আমরা করাবো টা কি?
মহিমার কথায় সিরাত বিরক্ত হয়ে বলল।
এত কথা বলেছিস কেনো এত প্রশ্ন তো আমার ভালো লাগে না।আমি যখন ঢাকা যাওয়ার কথা বলেছি তখন নিশ্চয়ই কেনো ব্যবস্থা না করে বলি নি।তোরা দুজন আমার ও মায়ের সাথে ঢাকা যেতে চাস কি চাস না এটা বল নাকি এখানে থেকে তোদের পচে মরার শখ আছে।
মহিমার সিরাতের কথায় নিরবে সম্মতি প্রকাশ করে কারণ মহিমা এটা ভালোভাবে যানে সিরাত কখনো ভেবে চিন্তা না করে কেনো সিদ্ধান্ত নেয় না। অনেকেই আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয় মহিমা নিজেও অনেক সময় আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয় যেমন তার বিয়ের সময় তার বাবার কথা ভেবে আবেগের বশে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও সেটাকে মাটি চাপা দিয়ে বিয়েতে মত প্রধান করে। এবং সেখানেই পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু সিরাত যে তার সম্পূর্ণ বিপরীত সে কখনো সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।আর মাও যখন তার সাথে সহমত প্রকাশ করেছে তাহলে কেনো ব্যবস্থা না করে সিদ্ধান্ত নেয় নি।
সাইরা এখানো কান্না করছে সে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের উদ্দেশ্যে বলল।
আমিও তোমাদের সাথে যাবো আমি থাকবো না ওই লোকের সাথে যে আমার মাকে এত সহজে চলে যেতে বলতে পারে।যে নিজের মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি নামক জাহান্নামে পাঠাতে চাই ওই লোকের সাথে আমি থাকবো না।আজ প্রথমদিনেই উনি উনার দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাড়িতে এনে আমাদের সাথে যদি খারাপ আচরণ করতে পারে তাহলে আগামীতে উনি আমাদের সামনে আরো খারাপ আচরণ করবে।সিরাত আপুর জন্য বাবা তো অনেক আগেই মরে গেছে। আমরাই বোকা ছিলাম সিরাত আপু বাবার কথা অমান্য করতো দেখে আমরা তাকে ভুল বুঝতাম কিন্তু সিরাত আপুই ঠিক উনি একটি খারাপ লোক উনি আজ থেকে আমার ও বাবা না। আমার দুনিয়াতে মা আর দুইবোন ছাড়া আর কেউ নেই।
রেহানা বেগম স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়েন আর পরিকল্পনা আঁকে মনের মাঝে পরবর্তীতে কি করবেন তিনি। কারন বলাটা যতই সহজ হোকনা কেনো মেয়েদের নিয়ে একা থাকা তারচেয়েও কঠিন। রেহানা বেগমের ভাবনার মাঝে সাইরা বলল।
মা আমরা কি সকলে উঠার আগে ভোর সকালে বের হয়ে যাবো এখান থেকে।
সাইরার কথা শুনে রেহানা বেগম মুচকি হেসে বলল।
আমরা চুপিচুপি কেনো যাবো আম্মু আমরা তো কেনো অপরাধ করিনি।যারা অপরাধ করে তাদের চোরের মতো বাড়ি ছাড়তে হয়। আমরা কেনো অপরাধ করিনি তাই আমরা সবার সামনে বীরের মতো যাবো……
#চলবে….