#তুমি_শুধু_গল্প_না_আমার_ভালোবাসা
#আমেনা_আক্তার
#পর্ব_৩
সকাল নিয়ে এসেছে নতুন দিনের সূচনা।এই নতুন দিন নিয়ে এসেছে কারও জীবনে অবিরাম কষ্ট আবার কারও জীবনকে করবে সুখময়।কালো অন্ধকার কে দূর যেমন করে সকলের সূচনা ঘটে তেমনি কষ্ট কে দূর করে আগমন ঘটে সুখের।এই সুখের আশায় কত মানুষ কত ভালো কাজ করে। আবার এই সুখের আশায় অনেকে জড়িয়ে যায় খারাপ কাজে।সকল মানুষের চিন্তা ভাবনার মাঝে রয়েছে বিস্তর তফাৎ তাই তো সুখের খোঁজে মানুষ কখনো সঠিক পথ বাছাই করে। আবার কখনো ভুল পথ।
সকালে উঠে রেহানা বেগম মেয়েদের জন্য খাবার তৈরি করছে। সকলের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র কাল রাতেই গুছানো হয়ে গেছে। সকালের নাস্তা সেরেই সকলে বের হয়ে যাবে ঢাকার উদ্দেশ্যে। রেহানা বেগম ও তার তিন মেয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলেও শামসুজ্জামান ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী এখনো ঘুম থেকে উঠে নি। রেহানা বেগমের নাস্তা তৈরি করা শেষ হতেই সকলে নাস্তা করতে বসে পরে এবং ঝটপট নাস্তা খেয়ে তৈরি হতে রুমে চলে যায় । তখনি শামসুজ্জামান ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়। এবং রেহানা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল।
তোরা কখন উঠেছিস এত বেলা হয়ে গেছে আমাকে জাগাস নি কেনো নাস্তা তৈরি করেছিস।
শামসুজ্জামান এর কথা শেষ হতেই মহিমা,সিরাত, সাইরা তৈরি হয়ে বাহিরে বের হয়।
সকল কে নতুন পোশাক পড়তে দেখে শামসুজ্জামান রেহানা বেগমকে বলল।
কিরে তোরা কোথায় যাবি এভাবে তৈরি হয়েছিস।
রেহানা বেগম ভাব অলসহীন ভাবে উত্তরে বলল।
আমরা এখান থেকে চলে যাবো।
রেহানা বেগমের কথা শুনে শামসুজ্জামান তার দিকে তেড়ে এসে বলল।
কি তোর এত বড় সাহস তুই আমার মেয়েদের নিয়ে কথায় যাবি।আমি তোকে…
এই বলে শামসুজ্জামান যেই না রেহানা বেগম কে আঘাত করবে সেই সিরাত তার সামনে এসে পরে এবং শক্ত কন্ঠে বলল।
এই সাহস দ্বিতীয় বার করার কথা চিন্তাও করবেন না। আপনি আমার মাকে অনেক আঘাত করেছেন আমার মা ও মুখ বুজে সব সহ্য করেছে শুধু মাত্র আমাদের জন্য। এবং আমাদের কখনো জানতেও দেয়নি। কারন আপনি আমাদের চোখে খারাপ হবেন বলে কিন্তু আর না।আর একবার যদি আপনি আমার মাকে আঘাত করেন তাহলে…
সিরাতের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে শামসুজ্জামান সিরাতের দিকে তেড়ে এসে বলল।
কি করবি তুই কি করবি আমার…
শামসুজ্জামান কথাটি বলেই যেই না সিরাত কে কিছু করবে তার আগেই সিরাত বলল।
আগে বামে তাকিয়ে দেখেন।
সিরাতের কথা মতো বামে তাকাতেই দেখতে পেলো সাইরা মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছে । তখন সিরাত আবার বলল।
এখন যদি একটি আঘাত ও আপনি আমাকে বা মাকে করেন তাহলে এই ভিডিও সোজা যাবে পুলিশের কাছে।আর আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন নারী নির্যাতন এর জন্য বাংলাদেশের আইন কতটা কঠোর।আর হ্যাঁ আমাদের দেশে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য ও কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেওয়া হয়। আপনার ভাগ্য ভালো যে মা আপনার নামে কেস করেনি তাই বলে এটা ভাববেন না যে আপনি বেঁচে গেছেন আপনি আপনার শাস্তি অবশ্যই পাবেন শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।
সিরাতের কথা শুনে শামসুজ্জামান শুকনো ঢোক গিলে। কিন্তু নিজের দাম্ভিকতা বজায় রাখতে বলল।
আচ্ছা ঠিক আছে তোরা যেতে চাস তো যা আমি ও দেখবো তোরা এই বাড়ি ছেড়ে গিয়ে কতদিন থাকতে পারিস।
কথাগুলো আয়াত কে বলে রেহানা বেগমের দিকে আঙ্গুল তাক করে আবার বলতে লাগলেন।
কোথায় যাবি তুই তোর ওই বাপের বাড়ি আর তো যাওয়ার জায়গা নেই তোর। যেখানে তোর বাপ ভাই তোকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।সেখানে তোর কি মনে হয় তোর মেয়েদের নিয়ে থাকতে পারবি। তোদের ফিরে আবার আমার কাছেই আসতে হবে।
রেহানা বেগম শামসুজ্জামানের কথা শুনে মুচকি হেসে বলল।
এটা সময় বলে দিবে আর হ্যাঁ শুনুন আপনার জন্য আমি রুমে একটি উপহার রেখে যাচ্ছি।আসা করি সেই উপহার আপনার ও আপনার দ্বিতীয় স্ত্রীর অনেক ভালো লাগবে।
রেহানা বেগমের কথা শুনে শামসুজ্জামান রাগে গজগজ করতে করতে ভিতরে চলে গেলেও শামসুজ্জামানের দ্বিতীয় স্ত্রী অনেক খুশি হয়েছে। কারণ এটাই তো সে চাইছিল তা এত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে কখনো ভাবেনি।ভালোয় হলো পথের কাঁটা নিজেই সরে গিয়েছে এখন আর তাকে কিছু করতে হবে না।
___________________________________
কিছুক্ষণ আগেই সকলে মিলে বের দিয়েছে ঢাকার উদ্দেশে বের হওয়ার আগে ভালোভাবে দেখে নিয়েছে তাদের প্রাণ প্রিয় বাড়িটি।এই বাড়ি জুড়ে রয়েছে কত স্মৃতি।এই বাড়ি ছেড়ে গেলেও কি স্মৃতি ছেড়ে যাওয়া এতটা সহজ। এত সহজে তার পিছুটান ছাড়া যায় না।
দীর্ঘ সময় জার্নি করার পর বাস এসে থেমেছে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে। মহিমার বাসে কিছুটা সমস্যা পোহাতে হয়েছে কারণ এমনিতেও সে প্রেগন্যান্ট। তার উপর এত লম্বা জার্নি সে কখনো করেনি তার শ্বশুর বাড়িও বাপের বাড়ি থেকে বেশি দূর না তাই স্বামীর বাড়ি ছেড়ে আসতে বেশি সমস্যা হয়নি।
সকলে গাড়ি থেকে নেমেছে ঠিকই কিন্তু সিরাত তাদের নিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে কোথাও যাচ্ছে না।আর এদিক দিয়ে মহিমা খুবই ক্লান্ত তাই সাইরা সিরাত কে বলল।
আপু আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেনো। মহিমা আপুর শরীর তো ভালো না।
সাইরা কথাটি শেষ করতেই দ্রুত গতিতে তাদের সামনে এসে একটি প্রাইভেট কার থামে।গাড়িটি এত দ্রুত গতিতে আসায় সাইরা কিছুটা ভয় পেয়ে গেছিলো কিন্তু গাড়িটি যে তাদের জন্যই থেমেছে তা নিশ্চিত। সাইরা প্রবল আগ্রহের সাথে তাকিয়ে আছে গাড়ির দিকে ও মনে মনে ভাবছে।
এই গাড়ির ভিতরে আপুর বয়ফ্রেন্ড নেই তো। এমনিতে আপু যেমন রাগি আপুর বয়ফ্রেন্ড হওয়ার চান্স অনেক কম তবুও সাইরার মনে হচ্ছে গাড়ির ভিতর সিরাতের বয়ফ্রেন্ড হবে যে আপুর এই অবস্থার কথা শুনে তাকে নিতে ছুটে এসেছে। উফ্ আপুর বয়ফ্রেন্ড কথাটি ভাবতেই নাচতে ইচ্ছে করছে।
সাইরার আশায় এক জগ পানি ঢেলে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো একটি মেয়ে। মেয়েটিকে দেখে সিরাত তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
কেমন আছো নূর,
হুম ভালো, কিন্তু আমার জানা মতে তোমরা অবশ্য ভালো নেই।
সিরাত তার কথায় কেনো প্রতি উত্তর করলো না। সিরাতের জবাব না পেয়ে মেয়েটি ও মাথা ঘামালো না।সিরাত ও পরিবার কে গাড়িতে উঠতে বলে নূর ড্রাইভার এর পাশের সিটে এসে বসলো।
নূরের এরুপ আচরণ দেখে সাইরা কিছুটা অবাক হলো। ভদ্রতার জন্য ও তাদের তো একটু জিজ্ঞেস করতে পারতো কেমন আছে। আপুর বান্ধবী মনে হয় আপুর মতোই।
গাড়ি চলছে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কিন্তু সিরাত ও নূর ছাড়া কেউ জানেনা গাড়িটি কোথায় গিয়ে থামবে। মহিমা ক্লান্তিতে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে মায়ের কাঁধে রেহানা বেগম যত্ন সহকারে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মেয়ের মাথায়।মা মেয়ের সুন্দর মুহূর্ত দেখে নূর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে গাড়ির মিরর দিয়ে তার কিছুক্ষণ পরই নিজের চোখ সরিয়ে নেয় সেখান থেকে।
গাড়ি এসে থামে একটি আটতালা বিল্ডিং এর সামনে। গাড়ি থেকে নেমে নূর সকলের উদ্দেশ্যে বলল।
সবাই আমার সাথে আসুন।
নূরের কথা অনুযায়ী সকলে তার পিছে যায়। নূর এসে লিফটে উঠে চারতলার বাটন ক্লিক করে। সাইরা শুধু এদিক সেদিকে তাকিয়ে দেখছে সব কিছু। কৌতূহল বশত লিফটে উঠতেই সাইরা সিরাতের হাত চেপে ধরে কারন আগে কখনো লিফটে না উঠার কারণে তার কিছুটা ভয় লাগছে।লিফট থেকে নেমে নূর একটি ফ্ল্যাটের দরজা খুলে তাদের ভিতরে প্রবেশ করতে বলে। ভিতরে প্রবেশ করতেই সকলের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ফ্ল্যাটের ভিতর তাদের সকল প্রয়োজনীয় জিনিস আগের থেকেই আছে। নূর সিরাতের সামনে এসে তার উদ্দেশ্যে বলল।
তুমি যেই সকল জিনিসের কথা বলে ছিলে তা সব এখানে আছে।আশা করি তোমাদের থাকতে সমস্যা হবে না।আর এখানে তোমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারো এটি তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ সেফ। তোমার ছোট বোনের এডমিশন ও হয়ে গেছে আমার কলেজে ও কাল থেকে ক্লাস এটেন্ড করতে পারবে।
নূরের কথা শেষ হতেই সিরাত মুচকি হেসে তাকে বলল।
ধন্যবাদ,
ধন্যবাদ দেওয়ার কিছুই নেই তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছিলে আমি সেই জন্যই শুধু তোমার সাহায্য করেছি।আর ঘরের সব কিছু তো তোমাদের টাকা দিয়েই কিনা।
নূরের কথা শুনে সিরাত মুচকি হাসি দিলো। সাইরা তার বোনকে নূরের কথায় হাসতে দেখে কিছুটা অবাক হলো। কারন সিরাত বিনা কারনে বেশি হাসে না।
এদিকে মহিমা ও প্রচুর অবাক হয়েছে এইসব কিছু দেখে।কারন একদিনের মধ্যে এত কিছু ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব।তার ভিতর আবার নূর বলছে এই সব কিছু নাকি তাদের টাকায় কিনা।এত টাকা কোথা থেকে পেয়েছে মা ও এই বিষয়ে নিশ্চয়ই জানেন তাই সিরাত কে কেনো প্রশ্ন করেনি। মহিমার মাথায় এখন অনেক প্রশ্ন আসছে কিন্তু শরীর ক্লান্ত থাকায় কিছুই জিজ্ঞেস করা তার পক্ষে সম্ভব না। দীর্ঘ সময় জার্নি করে সবাই ক্লান্ত তাই নূর যেতেই সকলে নিজের জন্য বরাদ্দ রুমে চলে যায়।
#চলবে