#তুমি_শুধু_গল্প_না_আমার_ভালোবাসা
#আমেনা_আক্তার
#পর্ব_৫৭
চারদিকে হৈচৈ পড়ে গিয়েছে। সকলের মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে। আয়শা চৌধুরী বাড়ির ভিতর থেকে দৌড়ে আসল।এসেই তিনি একটি মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আয়শা চৌধুরী ও আফজাল চৌধুরী খবরটি পেতেই ছুটে আসে ভিতর থেকে। আয়শা চৌধুরী মেয়েটির চেহারা দেখতেই ওনার অন্তত আত্মা সহ যেনো কেঁপে উঠলো।আয়শা চৌধুরী মেয়েটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরলেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল।
সারা কি হয়েছে তোমার।সারা চোখ খুলো আম্মু এই দেখো খালামনি তোমার সামনে আছি। প্লিজ আম্মু চোখ খুলো। কিছু বলো সারা। তোমার এই অবস্থা কিভাবে হলো সারা কিছু বলো সারা কিছু বলো।
আয়শা চৌধুরীর এতো ডাকার পরেও সারা নিজের চোখ দুটো খুলে না। দোতলা থেকে পড়ার কারনে প্রচুর আঘাত পেয়েছে সারা।যার ফলে অচেতন হয়ে পরে আছে ও।আর মাথা ও হাত পা থেকে রক্ত বের হচ্ছে।
কিছুদূর দাঁড়িয়ে সারাকে দেখে চলেছে আদিত্য। আদিত্যর মুখে লেপ্টে আছে বাঁকা হাসি। আদিত্যর সাথেই দাঁড়িয়ে নূর এখনো জমে আছে।একটু আগে ওর চোখের সামনে যা ঘটেছে তা যেনো এখনো ভাসছে নূরের চোখের সামনে।
কিছুক্ষণ আগে….
নূর যখনি ছাদে পৌছায় সেখানে আগের থেকেই সারা উপস্থিত ছিল।সারায় মূলত নূরকে ডেকে পাঠিয়েছে নূরকে মারার প্ল্যান করে। নূরকে আদিত্যর পাশে দেখে সারার মাথা যেনো খাবার হয়ে গিয়েছে।ও যেই কোনো ভাবেই হোক নূরকে ওর আর আদিত্যর রাস্তা থেকে সরিয়ে ছাড়বে।তাই তো নূরকে এখানে ডেকেছে ও।সারাই পুতুলটিকে ওইখানে রেখেছে যেনো নূর ছাদের কর্ণারে নিজেই পৌঁছে যায় আর সারার কোনো কষ্ট করা না লাগে।
নূর যখন ছাদের কর্ণারে পুতুলটির সামনে যায় তখনি সারা ও পা টিপে টিপে নূরের পিছনে যেয়ে দাঁড়ায় নূর পুতুলটিকে দেখে ফিরে আসার জন্য পিছনের দিকে ফিরতে নিলেই সারা নূরকে পিছন থেকে ধাক্কা মারে। নূর কিছু ভেবে উঠার আগেই নূরের হাত কেউ শক্ত করে ধরে ফেলে কেউ এবং সময় ব্যয় না করে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নেই নূরকে। নূরের পুরো শরীর কাঁপছে ভয়ে। কিন্তু নূর এটি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে ওকে বুকে আগলে রাখা ব্যক্তি আর কেউ না আদিত্য। আদিত্য রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকায় সারার দিকে। আদিত্য নূরকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরার সাথে সাথে সারার ওপাশ ফিরে থাকায় ওর পিঠ বরাবর একটি লাথি মারে।আর সারা যেয়ে পরে ছাদের নিচে। এবং বিকট শব্দ হয় সারার নিচে পড়ার ফলে।
নূর এখনো ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারেনি আসলে কি হয়েছে। নূর যখনি সারার পরে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আদিত্যর বুকের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ছাদের কর্ণারে গিয়ে দেখতে চায় সারার অবস্থা তখনি আদিত্য নূরকে কুলে তুলে নেয়।নূর তাকায় আদিত্যর মুখের দিকে। আদিত্যর মুখে লেপ্টে আছে অদ্ভুত হাসি। আদিত্য কে দেখে সামান্য পরিমাণও মনে হচ্ছে না যে আদিত্যর ভিতরে সামান্য পরিমাণও অপরাধ বোধ জাগ্রত হয়েছে বা সারাকে লাথি মেরে নিচে ফেরার জন্য অপরাধ বোধ আছে। আদিত্যর অভিব্যক্তি একদম শান্ত।
বর্তমান..
নূর সারার উপর থেকে চোখ সরিয়ে আদিত্যর দিকে তাকায় আদিত্য ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। যেনো কোনো রহস্য খেলা করছে আদিত্যর চোখে।যা নূরের সম্ভব না সমাধান করার।
কিছুক্ষণের মধ্যে এম্বুলেন্স এসে থামে চৌধুরীর বাড়ির সামনে।যেই বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও উৎসবের আমেজ বিরাজমান ছিল। এখন সেখানেই ছেয়ে আছে শোকের ছায়া। কিন্তু আদিত্যর ভিতরে এই সকল কিছুরই ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না। আদিত্য নূরকে নিয়ে চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে বসে। এবং গাড়ি চলতে শুরু করে নিজ গন্তব্যে।
___________________________________
রুদ্র যত দ্রুত সম্ভব অফিসের কাজগুলো শেষ করতে ব্যস্ত। কেননা সিরাত ওকে আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছে।আর সিরাত যখন ওকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে বলেছে তাহলে নিশ্চয়ই জরুরি কিছু হবে। রুদ্র এটি খুব ভালোভাবে জানে সিরাত ওকে কোনো ফালতু কাজের জন্য ডাকবে না।তাই তো তাড়াতাড়ি হাত চালাচ্ছে। কিন্তু আজ এই কাজ যেনো শেষই হতে চাইছে না।যত কাজ করছে ততো মনে হচ্ছে কাজ বাড়ছে রুদ্র বিরক্ত হয়ে গিয়েছে নিজের কাজের জন্য।
রুদ্রের এত ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ ওর কেবিনে কেউ টোকা দিয়ে ভিতরে আসার অনুমতি চাইলো। রুদ্র ল্যাপটপের দিকে চোখ স্থির রেখে ব্যক্তিটি কে ভিতরে আসার অনুমতি দিলো। অনুমতি পেতেই হুড়মুড়িয়ে রুমে প্রবেশ করলো সোফিয়া। রুদ্রের ধ্যান এখনো ল্যাপটপের মধ্যে সীমাবদ্ধ তাই ও এখনো সোফিয়া কে খেয়াল করেনি। রুদ্র ওকে খেয়াল না করায় এই সুযোগের অসৎ ব্যবহার করলো সোফিয়া। সোফিয়া দ্রুত রুদ্রের কাছে গিয়ে ওর কুলে বসে পরলো। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না কেননা রুদ্র এক ঝটকায় সোফিয়া কে নিজের কুল থেকে ফেলে দেয়।আর চোখ গরম করে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সিকিউরিটি গার্ড কে ডাকতে লাগলো।
সোফিয়া আর কিছু করার সুযোগ পেলো না তার আগেই কেবিনে গার্ড প্রবেশ করালো। রুদ্র গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলল।
এই নর্দমার কীট আমার অফিসে প্রবেশ করলো কি করে? আপনারা কি কাজ রেখে বসে বসে ঘুমান।এখনি এই আবর্জনা কে আমার অফিস থেকে বের করুন। রুদ্রের কথা শুনে সোফিয়া তাকায় রুদ্রের দিকে।ও যেনো এত তাড়াতাড়ি রুদ্রের এত পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে না। যেই ছেলে সোফিয়া বলতে পাগল ছিল আজ সেই ওকে অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। সোফিয়া রুদ্রের উদ্দেশ্যে বলল।
রুদ্র তুমি আমার সাথে এমন আচরন করছ কোনো? তুমি কি ভুলে গেছো আমাকে রুদ্র আমি তোমার ভালোবাসা সোফিয়া।যার জন্য তুমি সব কিছু করতে পারো।
সিকিউরিটি গার্ড সোফিয়া কে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখনি রুদ্রের হাতের ইশারা পেয়ে গার্ড গুলো থেকে যায়। রুদ্র গার্ড গুলো কে থামতে বলায় সোফিয়া খুব খুশি হয় ও ভাবে রুদ্র হয়তো ওকে আর এখান থেকে বের করবে না। রুদ্র নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু ওকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে রুদ্র বলল।
ভালোবাসা, ভালোবাসা কাকে বলে যানো কিছু। তোমার কথা আর কি বলবো আসলে ভালোবাসার সঠিক অর্থ আমিও জানতাম না। তাইতো তোমাকে পাওয়ার জন্য তোমার পিছে পরে থাকতাম। কিন্তু তুমি শুধু মাত্র আমার জেদ ছিলে। আমার ভালোবাসা না। কিন্তু এখন আমি ভালোবাসার সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানি। কিভাবে জানো আমার স্ত্রী সিরাতের জন্য আমি ওকে ভালোবাসি। সঠিক শুনেছ তুমি, আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, কতটা এটা আমি বলতে পারবো না। এখন তো বুঝে গেছ আমার জীবনে তোমার কোনো জায়গা নেই। এখন তুমি যেতে পারো।
রুদ্র কথাটি বলতেই সিকিউরিটি গার্ড আবার সোফিয়া কে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো।আর এদিকে সোফিয়া মিনতি করতে লাগলো ওকে একটি সুযোগ দিতে ও রুদ্র কে অনেক ভালোবাসে রুদ্র কে ছাড়া ও থাকতে পারবে না। রুদ্র সোফিয়ার করে শুনে শুধু একটি তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়।
রুদ্র ক্লান্ত অবস্থায় বাড়িতে প্রবেশ করলো।এক তো আজ রুদ্র ক্লান্ত দ্বিতীয় রুদ্রের মাথা গরম হয়ে আছে সোফিয়ার জন্য।একটি মানুষ কতটা বেহায়া হতে পারে তা রুদ্র সোফিয়া কে দেখে বুঝেছে। রুদ্রের এখন নিজের উপর আফসোস হয়। কারণ রুদ্র একটি সময় নিজের কত মূল্যবান সময় এই মেয়ের পিছনে নষ্ট করেছে।এই সময় গুলো যদি ও ওই মেয়ের পিছনে নষ্ট না করে আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করতো তাহলে সিরাত হয়তো ওর জীবনে আরো আগে আসতো।সিরাতের সাথে ওর আরও কিছু মধুর স্মৃতি থাকত।নাহ রুদ্র জীবনে অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছে এখন এই ভুল শুধরাবো সিরাত কে বেশি বেশি ভালোবেসে। কথাটি ভাবতেই রুদ্রের ঠোঁটে স্মিত হাসি ফুটে উঠল।
রুদ্র নিজের ভাবনায় মগ্ন থাকায় বাড়িতে যে কেউ নেই এই বিষয়ে খেয়াল করলো না।ও ক্লান্ত শরীরে রুমে প্রবেশ করলো।রুদ্র ক্লান্ত শরীরে রুমে প্রবেশ করলেও রুমের অবস্থা দেখে ওর ক্লান্তি যেনো মুহুর্তের মধ্যে গায়েব হয়ে গেল। কারণ রুমের চারপাশে জ্বলছে ক্যান্ডেল লাইট এবং পুরো রুমে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো ছিটানো। রুদ্র বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের রুম পর্যবেক্ষণ করছে তখনি উপরের থেকে গোলাম ফুলের কিছু পাপড়ি এসে রুদ্রের উপর পরলো। রুদ্র উপরে তাকিয়ে সেই পাপড়ি গুলোকে দেখলো।
রুদ্র সামনের দিকে তাকাতেই এবার যেনো ঝটকা খায় কারণ রুদ্রের সামনে সিরাত দাঁড়িয়ে আছে তাও সম্পূর্ণ আবেদনময়ী রুপে। রুদ্র যেনো সিরাতের উপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। রুদ্রের মনে হচ্ছে ও এখন স্বপ্ন দেখছে।সিরাত হাসি মুখে আস্তে আস্তে রুদ্রের কাছে এসে ওর কানের সামনে নিজের দু ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
কেমন লাগছে আমাকে?
সিরাতের কথা শুনে রুদ্রের মুখ থেকে অস্পষ্ট স্বরে বের হয়ে আসলো।
পরী,
রুদ্রকে অস্পষ্ট ভাবে কথাটি সিরাতের কান পর্যন্ত ও পৌছালো।সিরাত রুদ্রের কথা শুনে হালকা করে নিজের ঠোঁট ধারা রুদ্রের ঠোঁট ছোঁয়ায়।সিরাতের ঠোঁট দুটো রুদ্রের ঠোঁট ছোয়াতেই হঠাৎ যেনো কারেন্ট মারলো রুদ্রের শরীরে। রুদ্র নিজের বুকে হাত রেখে জোরে শ্বাস ছেড়ে বলল।
আজ বোধহয় তুমি আমাকে মারার প্ল্যান করেছে। তুমি যদি আমাকে মারতে চাও আমিও মরতে রাজি।
কথাটি বলেই রুদ্র হঠাৎ সিরাতকে নিজের কুলে তুলে নেয়। এবং রুদ্র সিরাতের কানের কাছে খুব ধীরে বলল।
আই লাভ ইউ বউ।
সিরাতের কানে কথাটি পৌঁছাতেই ওর সারা শরীরে যেনো শিহরণ বয়ে গেল।সিরাত নিজের চোখ বন্ধ করে অনুভব করল রুদ্রের বলা কথাটি। রুদ্র সিরাতকে নিজের আগে বাড়তে থাকে ওদের সম্পর্কের নতুন এক সূচনার দিকে…
রাত শেষ হয়ে সকালের সূচনা ঘটেছে অনেক আগেই। রুদ্র ও সিরাত এখনো একজন আরেকজনকে লেপ্টে ধরে শুয়ে আছে। দুজনের চোখে এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। দু’জনে তলিয়ে আছে গভীর ঘুমে।আজ ওদের ডিস্টার্ব করার মতো ও কেউ নেই।
___________________________________
প্রতিদিনের মতো আজও আব্রাহাম তৈরি হয়ে বের হচ্ছে আয়নার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে। আব্রাহামের মুখে জুড়ে আছে হাসি। যখনি আব্রাহাম আয়নার সাথে দেখা করতে যায় তখনি শুধু আব্রাহামের মুখ জুড়ে এই হাসির মেলা দেখা যায়।অন্য সময় আব্রাহাম যখনি হাসে তা শুধু অন্যদের কে দেখানোর জন্য।
আব্রাহাম বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আব্রাহামের মা আব্রাহামের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। আব্রাহাম হঠাৎ মাকে ওর সামনে দাঁড়াতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো।
কিছু বলবে,
তখনি আব্রাহামের মা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল।
#চলবে…