#তুমি_শুধু_গল্প_না_আমার_ভালোবাসা
#আমেনা_আক্তার
#পর্ব_৭
সিরাত মহিমার দিকে তার ফোনটি এগিয়ে দেয়। মহিমা ফোনের ভিতরের দৃশ্য দেখে পাথর বনে গেছে। ফোনের ভিতরে রাজিব ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীর অন্তরঙ্গের ভিডিও দেখা যাচ্ছে। সাইরা ও ভিডিও টি দেখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। মহিমা ভিডিও টি দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মহিমা সিরাতের দিকে অশ্রু সিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল।
তুই আমাকে রাজিব ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সুখের সংসার দেখাতে চাইছিস। রাজিব নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে কতটা ভালো আছে এটি দেখাতে চাইছিস।তোর একবারও হৃদয় কাপলো না এই ভিডিও আমাকে দেখানোর আগে। আমার জন্য কি তোর একটুও মায়া লাগেনি।
মহিমার কথায় সিরাত তার দিকে তাকিয়ে বলল।
এটি ওদের বিয়ের পরের না বিয়ের আগের ভিডিও।
সিরাতের কথা মহিমার কানে যেতেই ওর হাত থেকে ফোনটি পরে গেল।ও মহিমা পাগলের মতো করতে লাগলো। মহিমা সিরাত কে উদ্দেশ্য করে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলল।
তুই সব মিথ্যা কথা বলছিস।রাজিব এমনটা কখনো এটা করতে পারে না।ও এত খারাপ না আমার রাজিব এতটা খারাপ না শুনেছিস।
মহিমা সিরাত কে কথাটি বলে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিচ্ছে মহিমা চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাই ওর চিল্লিয়ে কথা বলার কারনে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মহিমা আর কিছু বলবে তার আগেই রেহানা বেগম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো।
সিরাত সত্য কথা বলছে।
মহিমা তার মায়ের কথা শুনে ধপ করে বিছানায় বসে পরে।ও নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছে না রাজিব এতটা জঘন্য।সিরাত মহিমার সামনে আবার হাঁটু গেড়ে বসে।
সিরাত মহিমার হাত নিজের হাতের মধ্যে মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। তারপর মহিমার দিকে তাকিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে বলল।
রাজিব ও এই মেয়ে ওর নাম তিতির।ওর সাথে রাজিব ১ বছরের অবৈধ সম্পর্ক। শুধু একবার না ওরা আরো অনেক বার এভাবে মিলামিশা করেছে। তখন ও একবারও তোর কথা ভাবেনি। তুই চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই সময় যদি ও তিতির কে বিয়ে করলে তোর বা তোর বাচ্চার কিছু হয়ে যেতে পারে।এটা জানার পরেও ও তোর কথা না ভেবে ওই মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। একবারও অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করার আগে তোর কথা ভাবেনি।
তাহলে কেনো তুই এমন লোকের জন্য কাদছিস যে তোর জন্য কাঁদে না।যে নিজের সন্তানের কথা ও একবার ভাবেনি।যে তুই থাকতেও অন্য মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে।যার তুই থাকাতে বা না থাকাতে কিছু যায় আসে না।দয়া করে এমন মানুষের জন্য চোখের পানি ঝড়াস না যে তোর চোখের পানির মূল্য দিতে না পারে।আর তোর কি মনে হয় তুই যদি সেখানে থাকতি।তাহলে তোর সন্তান নিজের বাবার ভালোবাসার থেকে বঞ্চিত হতো না? সত্যি কি তাই?যে এমন নোংরা কাজ করার আগে একবারও না ভেবেছে তোদের সে কি তোর বাচ্চার কথা ভাবতো?কখনোই ভাবতো না হয়তো তোর বাচ্চা হওয়ার পর প্রথমে আদর করতো কিন্তু। সেই আদর তোর সতিনের বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে যেতো। যেমন তিতির ওর জীবনে আসার সাথে সাথে তোর জন্য ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে। তাইতো তুই ওই বাড়ি ছাড়ার পর একদিন ও তোর খোঁজ লাগাবার চেষ্টাও করেনি তুই বেঁচে আছিস নাকি মরে গেছিস।
এই অশ্রু অনেক দামি আমার বোন এই অশ্রুকে কেনো ভুল মানুষের জন্য ঝড়াস না একটু কঠোর হ নিজের জন্য না হলেও নিজের অনাগত সন্তানের জন্য।এই দুনিয়ায় বাঁচতে হলে যে কঠোর হওয়া অনেক জরুরী। নাহলে এই সমাজের মানুষ তোর সাথে তোর সন্তান কেও ছাড়বে না। বাঁচতে দিবে তাদের বিষাক্ত কথা তোকে ও তোর অনাগত সন্তান কে।তোর সন্তানের জন্য হলেও ওদের সকল বিষাক্ত কথার উত্তর তোকেই দিতে হবে।
সিরাতের কথা শুনে মহিমা সিরাত কে জাপটে। এবং নিজেকে শক্ত করে বলে।
তুই ঠিক বলেছিস আমি আমার জন্য না হলেও আমার সন্তানের জন্য নিজেকে কঠোর করব।আমি আমার সন্তানের জন্য একাই যথেষ্ট। রাজিব মনে করেছে আমি তাকে ছাড়া নিজের সন্তান কে লালন পালন করতে পারবো না। কিন্তু আমি এই সমাজ ও রাজিব কে দেখিয়ে দিবো। একজন নারী চাইলে কত কিছু করতে পারে।আমি এখন থেকে আমার সর্বত্র চেষ্টা করব ওর কথা না ভাবতে একটু সময় লাগলেও আমি পারবো। আমার সন্তানের তার বাবার প্রয়োজন নেই।ওর জন্য ওর মা যথেষ্ট।
সিরাত মহিমা কথা শুনে কে ছেড়ে দিয়ে তার দুধ গালে হাত রেখে বলল।
এত সহজ না রাজিব কে ভুলা ও তোর জীবনে প্রথম পুরুষ যাকে তুই নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিলি ওই শয়তান কে। কিন্তু তুই চিন্তা করিস না আমরা সবাই তোর সাথে আছি। আমরা সবাই কষ্টগুলোকে ভাগাভাগি করে নিবো।এই সমাজের বিষাক্ত ছোবল থেকে তোকে বাচাবো। কিন্তু কেউ কিছু তোকে বললে ভেঙে পড়বি না। নিজের সর্বত্র দিয়ে তাদের সামনা করবি।যারা তোকে দূর্বল ভেবে তোকে কষ্ট দিয়েছে তাদের কে নিজের হাতে শাস্তি দিবি বুঝেছিস?
সিরাতের কথায় মহিমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। রেহানা বেগমের মুখে প্রশান্তির হাসি।সাইরা দৌড়ে গিয়ে সিরাত ও মহিমাকে একসাথে জাপটে ধরে।তিন বোনকে আজ প্রথম বার একসাথে দেখে রেহানা বেগমের চোখে পানি এসে পরেছে।এই মুহূর্তের জন্য কতকাল তিনি অপেক্ষা করেছেন শুধু তিনিই জানেন।
___________________________________
রুদ্র টলতে টলতে বাড়িতে প্রবেশ করেছে।
রুদ্র কে দেখেই বুঝা যাচ্ছে ও ড্রিংক করেছে।রুদ্রের মা শাহানারা এতক্ষণ বসে রুদ্রের জন্য অপেক্ষা করছিল।রুদ্রের অবস্থা দেখে দ্রুত তিনি রুদ্রের দিকে এগিয়ে যান। রুদ্রকে সামলিয়ে রুদ্র কে রুমে নিয়ে যান তিনি। রুদ্রের এই অবস্থা মা হয়ে সহ্য করতে পারছেন না। শাহানারা বেগম জানেন রুদ্রের এই অবস্থার কারণ যে একটি মেয়ে। সেই মেয়েটিকে রুদ্রের বাবা মা পছন্দ না করলেও অনেকবার রুদ্রের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটি বারবার তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। রুদ্র তাদের একমাত্র ও খুব আদরের সন্তান হওয়ার ফলে রুদ্র যা চায় সব কিছু রুদ্র কে এনে দেয় তার বাবা মা।তাই রুদ্র হয়েছে খুবই জেদি টাইপের । রুদ্র একবার যা চাই তাই ওর পেতে হবে।ওই মেয়ের ব্যাপারে ও ঠিক এই রকমটি হয়েছে। রুদ্র ও মেয়েটির মধ্যে এক সময় গভীর প্রেম ছিল কিন্তু মেয়েটি কেনো এক কারনে রুদ্র থেকে ব্রেকাপ করে নিয়েছে। তখন থেকেই রুদ্র ড্রিংক করা শুরু করে। কিন্তু প্রতিদিন করে না মাঝে মাঝে ড্রিংক করে রুদ্র।
রুদ্রের মা যখন এই সকল কথা ভাবছিল তখন রুদ্রের বাবা ঘরে প্রবেশ করে। এবং শাহানারা মির্জার উদ্দেশ্যে বলল।
আজ আবার ও ড্রিংক করে এসেছে?
স্বামীর কথায় শাহানারা অশ্রু সিক্ত নয়নে স্বামীর দিকে তাকায়।
শাহানারা মির্জা এমন করুন চাওনি দেখে রুবেল মির্জা তার কাছে এসে বসে এবং শাহানারা মির্জার হাত ধরে বলল।
আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছে রুদ্রের অবস্থা দেখে। কিন্তু আমরা ও কি করতে পারি। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল ওই সব কিছু আমরা করার চেষ্টা করেছি ।ওই মেয়েকে আমাদের পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও আমরা রুদ্রের জন্য ওই মেয়ের কাছে গিয়ে নিজের ছেলের জীবন ভিক্ষা পর্যন্ত চেয়েছি। কিন্তু বলেনা আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন ওই মেয়ে আমাদের ছেলের জীবনে থাকলে ওর জীবন পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতো। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের ছেলের জন্য আরো ভালো জীবন সঙ্গী রেখেছেন।যে রুদ্রের অগোছালো জীবন গুছিয়ে ফেলবে।ওর বেপরোয়া ও ছন্নছাড়া জীবন থেকে বের করে আনবে রুদ্র কে সত্যিকারের ভালোবাসা কি সেটা বুঝাবে। ওকে কেনো খারাপ পথে যেতে দিবে না।
রুবেল মির্জার কথা শুনে শাহানারা মির্জা বলল।
কবে আসবে সেই মেয়ে আমার রুদ্রের জীবনে।আর তাছাড়া রুদ্র কি শুনবে অন্য কেনো মেয়ের কথা যেখানে ও আমাদের কথায় শুনে না।আমি আর আমার ছেলেকে এই অবস্থায় দেখতে পারছি না। আমার অনেক কষ্ট হয় ওকে এই অবস্থায় দেখে।
শাহানারা মির্জার কথা শুনে রুবেল মির্জা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।এই প্রশ্নের উত্তর যে তার কাছেও নেই। শুধু তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন এমন মেয়ে রুদ্রের জীবনে অনেক তাড়াতাড়ি চলে আসুন।
___________________________________
অন্ধকার একটি রুমে গুটিসুটি মেরে খাটের কিনারায় বসে আছে কেউ। ঘরের ভিতর এত অন্ধকার হয়ে আছে যে কোথাও দিয়ে আলো প্রবেশ করার কেনো রাস্তা নেই।
নূর রুমটির ভিতর প্রবেশ করে খাবার নিয়ে। নূর তাকায় সেই লোকটির দিকে আর ভাবে।যেই মানুষটি আগে নূরের জীবনের আলো ছিল আজ সেই মানুষের জীবন অন্ধকারে ডুবে রয়েছে।যে নূরকে সকল কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে সেই মানুষটি আজ তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে মরছে। নূরে চেয়েও কিছুই করতে পারছে না।নূর লোকটির সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলল…
#চলবে…